🙏 তুমি নির্মল করো মঙ্গল-করে
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • ষষ্ঠ পাঠ
গান
তুমি নির্মল করো মঙ্গল-করে
রচয়িতা
রজনীকান্ত সেন
ধরন
ভক্তিমূলক / প্রার্থনা সঙ্গীত
পাঠ
ষষ্ঠ পাঠ (সাহিত্য মেলা)
গানের সম্পূর্ণ কথা
কল্যাণীমলিন মম রে মুছায়ে;
তব পুণ্য কিরণ দেয় যাক, মোর
মোহ কালিমা ঘুচায়ে॥
লক্ষ্য-শূন্য লক্ষ বাসনা ছুটে
গভীর আঁধারে
আমি জানি না কখন তুবে যাব কোন
অকুল গরল-পাথারে।
পতি, বিশ্ব-বিপদ-হস্তা, তুমি
দাঁড়াও বুঝিয়া পথা
তব শ্রীচরণ-তল নেয় এসো, মোর
মত্ত বাসনা গুছায়ে॥
আছ অনল-অনিলে চির নভোনীলে,
ভূধর-সলিলে গহনে,
আছ বিটপীলতায়, জলের গায়
শশী-তারকায় তপনে,
আমি নয়ন-বসন বাঁধিয়া,
বসে আঁধারে মরি গো কাঁদিয়া
আমি দেখি নাই কিছু, বুঝি নাই কিছু
দাও হে দেখায়ে বুঝায়ে॥
গানের সারমর্ম ও মূলভাব
সারমর্ম: "তুমি নির্মল করো মঙ্গল-করে" রজনীকান্ত সেন রচিত এক গভীর ভক্তিমূলক প্রার্থনা-সঙ্গীত। কবি ঈশ্বরকে \'মঙ্গল-কর\' (যিনি মঙ্গল করেন) বলে সম্বোধন করে প্রার্থনা করছেন—হে প্রভু, আমার মনের (মম) সমস্ত মলিনতা তুমি মুছে দাও। তোমার পবিত্র জ্যোতির্ময় কিরণ আমার ওপর এসে পড়ুক, যাতে আমার মোহ (অজ্ঞানতা) ও কালিমা (পাপ, অন্ধকার) ঘুচে যায়।
কবি স্বীকার করছেন—আমার অগণিত বাসনা (লক্ষ্য-শূন্য লক্ষ বাসনা) ছুটে চলেছে নিবিড় অন্ধকারের দিকে। আমি জানি না, কখন কোন \'অকুল গরল-পাথারে\' (অথৈ বিষ-সমুদ্রে) গিয়ে তুবড়ে (ডুবে) যাব। হে বিশ্বের বিপদ-হর্তা প্রভু, তুমি আমার পথ বুঝে দাঁড়াও এবং তোমার শ্রীচরণে আমাকে নিয়ে এসো।
শেষ স্তবকে কবির উপলব্ধি—ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজ করছেন। তুমি আছ আগুনে (অনলে), বাতাসে (অনিলে), চির আকাশে (নভোনীলে), পর্বতে-জলে (ভূধর-সলিলে) ও নিবিড় অরণ্যে (গহনে)। কিন্তু আমি চোখ বেঁধে অন্ধকারে বসে কাঁদছি। আমি কিছুই দেখিনি, কিছুই বুঝিনি—তাই হে প্রভু, আমাকে সব দেখিয়ে ও বুঝিয়ে দাও।
কেন্দ্রীয় চেতনা: আত্মশুদ্ধি, মোহমুক্তি ও প্রকৃত জ্ঞানলাভের জন্য ঈশ্বরের কাছে একান্ত প্রার্থনা।
পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ
গভীর ব্যাখ্যাপ্রথম স্তবক: আত্মশুদ্ধির প্রার্থনা
অর্থ: হে মঙ্গলকারী প্রভু, তুমি আমার চিত্তকে নির্মল করে দাও—আমার মনের (মম) সমস্ত ময়লা, পাপ ও ক্লেদ মুছে দাও। তোমার পবিত্র জ্যোতির্ময় কিরণ (আলোকচ্ছটা) আমার ওপর এসে পড়ুক, যাতে আমার মোহ (অজ্ঞানতা, ভ্রম) ও কালিমা (কালো দাগ, পাপ) সম্পূর্ণ ঘুচে যায়।
ভাব: কবি এখানে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন। \'মঙ্গল-কর\’ সম্বোধনটি তাৎপর্যপূর্ণ—তিনি বিশ্বাস করেন, ঈশ্বর একমাত্র মঙ্গলের উৎস। তাই তাঁর কাছেই তিনি আত্মশুদ্ধির প্রার্থনা করছেন।
দ্বিতীয় স্তবক: পথহারা জীবনের আর্তি
অর্থ: কবি স্বীকার করছেন—আমার হাজারো বাসনা (কামনা-আকাঙ্ক্ষা) উদ্দেশ্যহীনভাবে গভীর অন্ধকারের দিকে ছুটে চলেছে। আমি জানি না, কখন কোন \’অকুল গরল-পাথারে\’ (কূলহীন বিষের সমুদ্রে) গিয়ে ডুবে যাব।
ভাব: এটি এক শক্তিশালী আত্মসমালোচনা। \’অকুল গরল-পাথার\’ (অকূল = যার কূল নেই, অসীম; গরল = বিষ; পাথার = সমুদ্র) একটি রূপক—সংসারের ভোগ-বাসনার সীমাহীন বিষময় সাগর, যেখান থেকে ফেরা মুশকিল। কবি অনুভব করছেন—আমি এই পথেই চলেছি, অথচ হুঁশ নেই।
তৃতীয় স্তবক: পথপ্রদর্শনের আকুতি
অর্থ: হে প্রভু (পতি = অধীশ্বর), তুমি সমগ্র বিশ্বের যাবতীয় বিপদ-আপদ দূর করো (হস্তা = হরণকারী)। তুমি আমার পথ বুঝে দাঁড়াও, আমাকে সঠিক পথ দেখাও। আর তোমার শ্রীচরণের তলায় আমাকে নিয়ে এসো—যাতে আমার এই \’মত্ত বাসনা\’ (উন্মত্ত কামনা-বাসনা) গুছিয়ে যায়, অর্থাৎ দূর হয়।
ভাব: একমাত্র ঈশ্বরের চরণ ছাড়া আর কোনো গতি নেই। কবি চান—ঈশ্বর যেন করুণা করে পথ আটকে দাঁড়ান এবং তাঁর চরণে স্থান দেন, যাতে মত্ত বাসনার চক্রব্যূহ থেকে মুক্তি পান।
চতুর্থ স্তবক: অন্ধত্বের স্বীকারোক্তি
অর্থ: শেষ স্তবকে কবি নিজের অন্ধত্ব স্বীকার করছেন। আমি যেন চোখে কাপড় বেঁধে (নয়ন-বসন বাঁধিয়া) অন্ধকারে বসে কাঁদছি! আমি কিছু দেখিনি, কিছু বুঝিনি। অথচ হে প্রভু, তুমি তো সর্বত্র—আগুনে, বাতাসে, আকাশে, পাহাড়ে-জলে, গাছে-লতায়, চাঁদ-তারায়, সূর্যে (তপনে)। সব জায়গায় তুমি বিরাজ করছ, কিন্তু আমি চোখ বুজে থাকায় কিছুই দেখতে পাইনি। তাই এখন আমার একটাই প্রার্থনা—হে প্রভু, তুমি আমাকে সব দেখিয়ে-বুঝিয়ে দাও।
ভাব: এটি গানের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ। কবির উপলব্ধি—জগতে ঈশ্বরের প্রকাশ অসীম, কিন্তু নিজের অজ্ঞানতার জন্যই মানুষ তা দেখতে পায় না। তাই তিনি শেষ ভরসা হিসেবে ঈশ্বরকেই ধরছেন—তোমাকে ছাড়া আমার আর কেউ নেই।
শব্দার্থ ও টীকা
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| মঙ্গল-কর | যিনি মঙ্গল করেন; ঈশ্বর। |
| মলিন | ময়লা, কলুষিত, পাপে ঢাকা। |
| মম | আমার (কবির নিজের অন্তর বা চিত্ত)। |
| পুণ্য কিরণ | পবিত্র আলোক-রশ্মি; ঈশ্বরের দিব্যজ্যোতি। |
| মোহ | অজ্ঞানতা, মায়া, ভ্রান্তি। |
| কালিমা | কালো দাগ, পাপ, অন্ধকার। |
| অকুল | যার কূল বা সীমা নেই; অসীম। |
| গরল-পাথার | বিষের সমুদ্র (গরল = বিষ; পাথার = সমুদ্র)। |
| হস্তা | হরণকারী, যে দূর করে (বিপদ-হস্তা = বিপদ দূরকারী)। |
| মত্ত বাসনা | উন্মত্ত কামনা-আকাঙ্ক্ষা। |
| নভোনীল | আকাশের নীলিমা, নীল আকাশ। |
| ভূধর | পৃথিবীকে ধারণ করে যে—পর্বত। |
| বিটপ | গাছ, বৃক্ষ, তরু। |
| তপন | সূর্য। |
| নয়ন-বসন | চোখের কাপড় (রূপকার্থে—অজ্ঞানতার আবরণ)। |