কার দৌড় কদ্দূর
শিবতোষ মুখোপাধ্যায়
প্রবন্ধ
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • চতুর্থ পাঠ
গতি ও দৌড়
ক্রমবিকাশ
প্রাণীজগৎ
উদ্ভিদ
মনের দৌড়
শিবতোষ মুখোপাধ্যায় (১৯২৬ - ১৯৯৩)
বিশিষ্ট অধ্যাপক এবং প্রাণিবিজ্ঞানী। কলকাতার প্রেসিডেন্সি ও দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়-সহ আমেরিকার রকেফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। জীববিদ্যার উন্নয়নমূলক গবেষণার জন্য জুলজিকাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে পেয়েছেন অসংখ্য স্বীকৃতি ও সম্মান। স্যার দোরাবাজি টাটা স্বর্ণপদক, জগদীশচন্দ্র বসু স্বর্ণপদক প্রভৃতি এর মধ্যে অন্যতম। বিজ্ঞানভিত্তিক জনপ্রিয় লেখালেখিতেও তাঁর কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়।
👤
লেখক
শিবতোষ মুখোপাধ্যায়
📚
পাঠ
চতুর্থ পাঠ (সাহিত্য মেলা)
🎯
ধরন
বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ
প্রবন্ধের সারাংশ ও মূলভাব
মূলভাব: "কার দৌড় কদ্দূর" প্রবন্ধে লেখক শিবতোষ মুখোপাধ্যায় প্রাণীজগতের গতি ও চলন নিয়ে এক চমৎকার বৈজ্ঞানিক আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী—ক্ষুদ্র অণুজীব থেকে শুরু করে বিশাল তিমি মাছ পর্যন্ত—সকলেরই চলার নিজস্ব পদ্ধতি ও গতি রয়েছে। শুধু প্রাণী নয়, উদ্ভিদজগতেও চলন লক্ষ্য করা যায়। লেখক ক্রমবিকাশের ধারণা ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন কীভাবে প্রাণীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী চলার ক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মনের দৌড়-এর মাধ্যমে সে পৌঁছে গেছে চাঁদে, মঙ্গলে—এমনকি মহাকাশেও।
কেন্দ্রীয় চেতনা: শারীরিক গতির পাশাপাশি মানুষের মনের গতিই তাকে প্রকৃত চ্যাম্পিয়ন করে তুলেছে।
১. সঠিক উত্তর বেছে নিয়ে লেখা
৫ টি
১.১ উপনিষদে উক্ত 'চৈরেবিতি' শব্দের অর্থ —
উপনিষদে উক্ত 'চৈরেবিতি' শব্দের অর্থ এগিয়ে যাও। এটি জীবনের গতিশীলতাকে বোঝায়—সব সময় এগিয়ে চলাই জীবনের মূল মন্ত্র।
১.২ পৃথিবী যে নিজের কক্ষপথে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে তা প্রথম বলেন —
পৃথিবী যে নিজের কক্ষপথে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে তা প্রথম বলেন কোপারনিকাস। এর আগে টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রচলিত ছিল। গ্যালিলিও পরবর্তীকালে কোপারনিকাসের মতকে সমর্থন করেন।
১.৩ ভাস্কো-ডা-গামা ছিলেন —
ভাস্কো-ডা-গামা ছিলেন পর্তুগিজ নাবিক। তিনিই প্রথম ইউরোপ থেকে আফ্রিকা ঘুরে সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে (১৪৯৮ সালে কালিকট বন্দরে) পৌঁছান।
১.৪ যে বৈজ্ঞানিক কারণে 'আপেল দৌড়ায় মাটির দিকে', সেটি হলো —
আপেল মাটির দিকে দৌড়ায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে। নিউটন এই মহাকর্ষ বল আবিষ্কার করেন যা প্রতিটি বস্তুকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টানে।
১.৫ আইনস্টাইন ছিলেন —
আইনস্টাইন ছিলেন বিংশ (২০শ) শতাব্দীর মানুষ। তিনি ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৫ সালে মারা যান। তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (Theory of Relativity) আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
২. শূন্যস্থান পূরণ করো
৫ টি
২.১ এফিড উড়বার সময় প্রতি সেকেন্ডে _____ বার ডানা নাড়ায়।
এফিড উড়বার সময় প্রতি সেকেন্ডে তিনশো (৩০০) বার ডানা নাড়ায়। এটি পতঙ্গদের মধ্যে অন্যতম দ্রুত ডানা নাড়ানোর ক্ষমতা।
২.২ গমন শক্তিকে বিচার করতে হয় সবসময় _____ হিসাব করে।
গমন শক্তিকে বিচার করতে হয় সবসময় আকারের হিসাব করে। অর্থাৎ, প্রাণীর আকার অনুযায়ী তার চলার গতি ও শক্তি নির্ধারিত হয়।
২.৩ গোবি মরুভূমিতে _____ নামক এক হরিণ আছে।
গোবি মরুভূমিতে গজেল নামক এক ধরনের হরিণ আছে। এটি অত্যন্ত দ্রুতগামী প্রাণী।
২.৪ _____ টার্নস প্রতি বছর এগারো হাজার মাইল একবার উড়ে আসে আবার পরেই ফিরে যায়।
আর্কটিক টার্নস প্রতি বছর এগারো হাজার মাইল একবার উড়ে আসে আবার পরেই ফিরে যায়। এটি পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ পরিযানের রেকর্ড।
২.৫ AITP-র পুরো কথাটি হলো _____।
AITP-র পুরো কথাটি হলো All India Tour Programme বা সর্বভারতীয় ভ্রমণ পরিকল্পনা।
৩. অতি-সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
9 টি
৩.১ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায় এমন দুটি প্রাণীর নাম লেখো।
অ্যামিবা ও প্যারামোসিয়াম—এই দুটি এককোষী প্রাণীকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়। এরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এবং জলে বসবাস করে।
৩.২ "শামুক চলে যাবার সময় রেখে যায় জলীয় চিহ্ন"—সেটি আসলে কী?
শামুক চলার সময় যে জলীয় চিহ্ন রেখে যায়, সেটি আসলে শ্লেষ্মা বা মিউকাস। এই পিচ্ছিল পদার্থ শামুকের দেহ থেকে নিঃসৃত হয় যা তাকে মসৃণভাবে চলতে সাহায্য করে এবং দেহকে শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
৩.৩ "আমাদের নিজেদের শরীরের মধ্যে একরকম ভবঘুরে কোষ আছে।"—কোষটিকে \'ভবঘুরে\' বলা হয়েছে কেন?
শ্বেত রক্তকণিকাকে (WBC) \'ভবঘুরে\' বলা হয়েছে কারণ এটি রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ঘুরে বেড়ায় এবং প্রয়োজনমতো যেকোনো স্থানে পৌঁছে রোগজীবাণু ধ্বংস করে। আমিবার মতো এর কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই বলেও এটি ভবঘুরে প্রকৃতির।
৩.৪ "নানা জাতের খরগোশের মধ্যে গতির তারতম্য দেখা যায়"—কয়েকটি খরগোশের জাতির নাম লেখো।
বিভিন্ন জাতের খরগোশের মধ্যে জ্যাকর্যাবিট (খরগোশ-জাতীয় বন্য প্রাণী, অত্যন্ত দ্রুতগামী) ও সাধারণ গৃহপালিত খরগোশের মধ্যে গতির অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। জ্যাকর্যাবিট ঘণ্টায় ৪৫ মাইল পর্যন্ত দৌড়াতে পারে।
৩.৫ "কোনো কোনো পতঙ্গ উড়বার সময় তাদের ডানা প্রচণ্ড জোরে নাড়ে" — তোমার চেনা কয়েকটি পতঙ্গের নাম লেখো।
প্রচণ্ড জোরে ডানা নাড়ে এমন পতঙ্গের উদাহরণ: মৌমাছি (প্রতি সেকেন্ডে ২০০ বার), মশা (প্রতি সেকেন্ডে ৬০০ বার), এফিড (প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ বার), ফড়িং এবং প্রজাপতি।
৩.৬ "কত সামুদ্রিক জীব গা ভাসিয়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দেয় তার হিসাব আর রাখি না" — কয়েকটি সামুদ্রিক জীবের নাম লেখো।
সামুদ্রিক জীবের উদাহরণ: তিমি, ডলফিন, হাঙর, সামুদ্রিক কাছিম, স্যালমন মাছ। এরা সবাই হাজার হাজার মাইল পথ সাঁতরে পাড়ি দেয়।
৩.৭ "রক্ষে এই যে......" — লেখক কোন বিষয়টিকে সৌভাগ্য বলে মনে করেছেন এবং কেন?
লেখক উদ্ভিদের চলাচল করতে না পারাকে সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করেছেন। কারণ, যদি বটগাছ বা কুমড়ো গাছও ছুটতে শুরু করত, তাহলে পৃথিবী অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠত এবং পথেঘাটে চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।
৩.৮ প্যারামোসিয়াম কীভাবে চলাচল করে?
প্যারামোসিয়াম তার দেহের চারপাশে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র সিলিয়া বা রোমের সাহায্যে চলাচল করে। রোমগুলো সারিবদ্ধভাবে নড়ে প্যারামোসিয়ামকে জলের মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যায়—অনেকটা নৌকার দাঁড় বাওয়ার মতো।
৩.৯ প্যারামোসিয়াম ছাড়া দুটি এককোষী জীবের নাম লেখো।
প্যারামোসিয়াম ছাড়া আরও দুটি এককোষী জীবের নাম: অ্যামিবা (ক্ষণপদের সাহায্যে চলে) এবং ইউগ্লিনা (ফ্ল্যাজেলা বা কশার সাহায্যে চলে)।
অতি-সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (বাকি অংশ)
6 টি
৩.১০ "তার চলার ভঙ্গিটি ভারি মজার" — কার চলার ভঙ্গির কথা বলা হয়েছে? তা \'মজার\' কীভাবে?
এখানে শ্লথ বা স্লথ ভালুকের চলার ভঙ্গির কথা বলা হয়েছে। এটি গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে এবং অত্যন্ত ধীরগতিতে চলে। এর চলার ভঙ্গি এতই অদ্ভুত ও ধীর যে তা দেখে হাসি পায়, তাই একে \'মজার\' বলা হয়েছে।
৩.১১ গমনে সক্ষম গাছ ও গমনে অক্ষম প্রাণীর নাম লেখো।
গমনে সক্ষম গাছ: ভলভক্স, ক্ল্যামাইডোমোনাস (এককোষী শৈবাল, ফ্ল্যাজেলার সাহায্যে চলে)। গমনে অক্ষম প্রাণী: স্পঞ্জ, প্রবাল—এরা এক জায়গায় আটকে থাকে এবং নড়াচড়া করতে পারে না।
৩.১২ কয়েকটি \'হক\' জাতীয় পাখির নাম লেখো।
\'হক\' বা বাজ জাতীয় পাখির উদাহরণ: শাহিন বাজ, ঈগল, চিল, পেরেগ্রিন ফ্যালকন (বিশ্বের দ্রুততম পাখি, ঘণ্টায় ২০০ মাইল বেগে ছুটতে পারে)।
৩.১৩ আফ্রিকার কী জাতীয় পাখি ওড়া ছেড়ে হাঁটায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে?
উটপাখি ওড়া ছেড়ে হাঁটায় অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে উঠেছে। এর পা দুটি লম্বা ও শক্তিশালী—ঘণ্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। আফ্রিকার এই পাখি উড়তে না পারলেও ছোটায় সিংহকেও পিছনে ফেলে দিতে পারে।
৩.১৪ ক্রমবিকাশের পথ পরিক্রমায় ঘোড়ার আঙুলের কোন পরিবর্তন ঘটেছে?
ক্রমবিকাশের ধারায় প্রাচীন ঘোড়ার একাধিক আঙুল ছিল, কিন্তু আধুনিক ঘোড়ায় এসে মাত্র একটি আঙুল (খুর) অবশিষ্ট আছে। বাকি আঙুলগুলো ক্রমে লুপ্ত হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে ঘোড়া আজ আরও দ্রুত ও দক্ষভাবে ছুটতে পারে।
৩.১৫ পাঠ্যাংশে রেয়েছে এমন একটি নিশাচর প্রাণীর নাম লেখো।
পাঠ্যাংশে উল্লেখিত নিশাচর প্রাণী: বাদুড়। বাদুড়ই একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী যে সত্যিকারের ওড়ার ক্ষমতা রাখে। অন্ধকার রাতে চলার জন্য সে শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে (ইকোলোকেশন পদ্ধতি)।
১ ইডউইন স্মিথ
ইডউইন স্মিথ ছিলেন একজন বিখ্যাত আমেরিকান স্পোর্টস রাইটার বা ক্রীড়া সাংবাদিক। তিনি তাঁর লেখায় মানুষের শারীরিক দৌড়ের অসম্ভব সীমা ও রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করতেন।
২ শ্রীজ্ঞান দীপঙ্কর
শ্রীজ্ঞান দীপঙ্কর (অতীশ দীপঙ্কর) ছিলেন পাল যুগের একজন প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত। তিনি খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দীতে ভারত থেকে তিব্বতে গমন করে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। তাঁর দীর্ঘপথযাত্রা প্রাণীর গমন ও ভ্রমণের একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।
৩ ভাস্কো-ডা-গামা
ভাস্কো-ডা-গামা ছিলেন পর্তুগালের বিখ্যাত নাবিক ও অভিযাত্রী। ১৪৯৮ সালে তিনি প্রথম ইউরোপ থেকে সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে (কালিকট) পৌঁছান। আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে আসা এই সমুদ্রপথ আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বের বাণিজ্য ও গমনপথে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে।
৪ শঙ্করাচার্য
আদি শঙ্করাচার্য (খ্রি. ৮ম শতাব্দী) ছিলেন ভারতের একজন মহান দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক। তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ পদব্রজে পরিভ্রমণ করে অদ্বৈত বেদান্ত দর্শন প্রচার করেন। চার কোণে চারটি মঠ স্থাপন করেন। তাঁর এই বিপুল ভ্রমণ প্রাণী ও মানুষের চলন ক্ষমতার এক অসাধারণ নিদর্শন।
৫. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো
11 টি
৫.১ প্রাণী মাত্রকেই খাবার সংগ্রহ করতে হয়—গাছ কীভাবে না দৌড়ে তার খাবার সংগ্রহ করতে পারে?
গাছ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেও কীভাবে খাবার সংগ্রহ করে—এটি প্রকৃতির এক চমৎকার ব্যবস্থা। গাছের পাতা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যের আলো, পানি ও বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে। মূল মাটির গভীর থেকে পানি ও খনিজ পদার্থ শোষণ করে। অর্থাৎ, গাছ তার প্রয়োজনীয় খাবারের উৎসের কাছেই থাকে—তাই তাকে দৌড়াতে হয় না। উপরন্তু, কিছু উদ্ভিদ যেমন কলসপত্রী, সূর্যশিশির পোকামাকড় ফাঁদে ফেলে খাদ্যের চাহিদা মেটায়।
৫.২ প্রবন্ধে লেখক জেনেছেন যে খাবার সংগ্রহের কারণেই \'প্রাণীরা এক জায়গায় থেমে না থেকে দেশে দেশে পরিব্রমণ করে\'।— তুমি কি এই মতটিকে সমর্থন করো? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
হ্যাঁ, আমি লেখকের মত সম্পূর্ণ সমর্থন করি। খাদ্যের সন্ধানই প্রাণীদের স্থান পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার সেরেঙ্গেটি সমভূমিতে লক্ষ লক্ষ বন্যপ্রাণী (ওয়াইল্ডবিস্ট, জেব্রা) ঘাসের সন্ধানে বছরে প্রায় ২০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। আর্কটিক টার্ন পাখির কথাই ধরা যাক—এরা মেরু অঞ্চলের গ্রীষ্মকালে প্রচুর খাদ্য (ছোট মাছ) পায় বলেই প্রতি বছর ১১,০০০ মাইল পথ উড়ে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরুতে যায়। তবে শুধু খাদ্য নয়—প্রজনন, নিরাপদ বাসস্থান ও অনুকূল জলবায়ুর জন্যও প্রাণীরা স্থান পরিবর্তন করে।
৫.৩ "গমনাগমনের প্রকৃত মাধুর্য আমরা চোখে পাই সাধারণত উচ্চতর প্রাণীর মধ্যে"।—পাঠ্যাংশে উচ্চতর প্রাণীদের গমনাগমনের মাধুর্য কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আলোচনা করো।
উচ্চতর প্রাণীদের গমনাগমন সত্যিই বিস্ময়কর মাধুর্যময়। প্রবন্ধে এর চমৎকার বর্ণনা আছে:
• পাখির উড়ান: আর্কটিক টার্ন বা অ্যালবাট্রস পাখির অবিরাম উড়ে চলার ছন্দ ও পরিযানের নিখুঁত নকশা মাধুর্যময়।
• চিতাবাঘের দৌড়: শিকারের সময় চিতার বিদ্যুৎগতি (ঘণ্টায় ১২০ কিমি) আর থাবা বসানোর নিখুঁত সমন্বয় এক শিল্পের মতো।
• তিমির সাঁতার: বিশাল তিমির গভীর সমুদ্রের বুকে নিঃশব্দ সাঁতার ও নির্দিষ্ট সময় অন্তর জলপৃষ্ঠে ওঠা এক অপূর্ব ছন্দ তৈরি করে।
• মানুষের ক্ষেত্রে: ব্যালে নৃত্য বা অলিম্পিক অ্যাথলিটের নিখুঁত দৌড়—এসবই উচ্চতর প্রাণীর গমনের শৈল্পিকতার উদাহরণ।
মূলত, স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের উন্নতির কারণেই উচ্চতর প্রাণীদের গমন এতটা নিয়ন্ত্রিত, নিখুঁত ও শিল্পগুণে মণ্ডিত।
৫.৪ "এ পথে আমি যে গেছি"— রবীন্দ্রসংগীতের অনুসঙ্গটি পাঠ্যাংশে কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের \'শেষের কবিতা\' উপন্যাসের বিখ্যাত সংগীত "এ পথে আমি যে গেছি বারে বারে..." লাইনটি প্রাবন্ধিক ব্যবহার করেছেন মানুষের নিরন্তর চলার ইতিহাস বোঝাতে। প্রসঙ্গটি হলো: মানুষ বরাবরই পথিক—আদিম যুগে খাদ্যের খোঁজে, পরে বাণিজ্যের তাগিদে, তারপরে জ্ঞানের অন্বেষণে। ভাস্কো-ডা-গামা, কলম্বাস, দীপঙ্কর, শঙ্করাচার্যদের কথা ভাবলে বোঝা যায় হাজারো পথ পেরিয়ে এসেছে মানুষ। এই অনুসঙ্গের মাধ্যমে লেখক কবিতার সুরে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষের চলার গল্প চিরন্তন, তা কোনো একক ঘটনা নয়।
৫.৫ "এরকম মনে করলে ভুল হবে।"—কোন দূরবর্তী বিষয়ের ভুল সাপেক্ষে এমন মন্তব্য করা হয়েছে?
লেখক বলেছেন যে, শুধুমাত্র বড় প্রাণীরাই দ্রুত চলে বা কেবল দৌড়াই প্রাণীর গতির একমাত্র মাপকাঠি—এরকম মনে করলে ভুল হবে। কারণ, আকারের তুলনায় ক্ষুদ্র প্রাণীরাও অবিশ্বাস্য গতিসম্পন্ন। যেমন, এফিড পোকা প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ বার ডানা নাড়ায় যা কম বিস্ময়কর নয়। আবার, বাদুড় যে ইকোলোকেশন দিয়ে অন্ধকারে বাধা এড়িয়ে চলে, বা প্যারামোসিয়ামের রোমের সাহায্যে চলা—এসব গতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, গতি কেবল দৈহিক দ্রুততায় নয়, বরং খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল ও দক্ষতায় বিচার্য।
৫.৬ উচ্চতর জীবের পেশি কাজ করার ক্ষেত্রে কীভাবে শক্তি উৎপাদিত হয়?
উচ্চতর প্রাণীর পেশিকোশে শক্তি উৎপাদনের পদ্ধতিটি জটিল ও চমৎকার। খাদ্যের গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে পেশিতে পৌঁছায়। সেখানে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মাইটোকন্ড্রিয়া নামক অঙ্গাণুতে গ্লুকোজ ভেঙে ATP (অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট) নামক শক্তি-অণু তৈরি হয়। এই ATP-ই পেশির সংকোচন-প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক শক্তি সরবরাহ করে। সংক্ষেপে:
গ্লুকোজ + অক্সিজেন → ATP + কার্বন-ডাই-অক্সাইড + পানি + শক্তি
আর এই শক্তিতেই প্রাণীরা দৌড়ায়, ওড়ে, সাঁতার কাটে।
৫.৭ "ক্রমবিকাশের ইতিহাস জানা যায়" — এ প্রসঙ্গে লেখক কোন তথ্যের অবতারণা করেছেন?
ক্রমবিকাশের ইতিহাস প্রসঙ্গে লেখক ঘোড়ার আঙুলের বিবর্তনের তথ্য দিয়েছেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগের ঘোড়া \'হাইরাকোথেরিয়াম\'-এর পায়ে একাধিক আঙুল ছিল—সামনের পায়ে ৪টি ও পিছনের পায়ে ৩টি। যুগের পর যুগ ধরে এরা যত দ্রুত দৌড়ানোর প্রয়োজন অনুভব করল, আঙুলগুলো ক্রমে লুপ্ত হয়ে মাত্র একটি শক্ত খুরে পরিণত হলো। এভাবে প্রায় ৫ কোটি বছরের ক্রমবিবর্তনের ধারায় আধুনিক এক আঙুলবিশিষ্ট ঘোড়া \'ইকুয়াস\' এসেছে। এ থেকে বোঝা যায় গতির চাহিদা কীভাবে প্রাণীর দেহ-গঠন বদলে দিতে পারে।
৫.৮ "মনের দৌড়ে মানুষ চ্যাম্পিয়ন" —এমন কয়েকজন মানুষের কথা লেখো যাদের শারীরিক অসুবিধা থাকলেও মনের দৌড়ে সত্যই তাঁরা প্রকৃত চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠেছেন।
ইতিহাস এমন অনেক মানুষের নামে ভরা যাঁরা শারীরিক সীমাবদ্ধতা তুচ্ছ করে মনের জোরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন:
• স্টিফেন হকিং: মাত্র ২১ বছর বয়সে ALS রোগে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হন, জীবনের শেষভাগে কেবল চোখের পেশিই সচল ছিল। তবু তিনি \'A Brief History of Time\'-এর মতো বই লিখে বিশ্বতত্ত্বে নতুন দ্বার খুলেছেন।
• হেলেন কেলার: দেড় বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারান। অথচ র্যাডক্লিফ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে লেখিকা ও সমাজকর্মী হয়ে ওঠেন।
• সুধা চন্দ্রন: ভারতের এক দুর্ঘটনায় পা হারানো নৃত্যশিল্পী, যিনি কৃত্রিম পা নিয়েও অপূর্ব নৃত্য করে বিশ্বজয় করেছেন।
• অরুণিমা সিনহা: জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড়ের ট্রেনে দুর্ঘটনায় পা কাটা যায়। তবু কৃত্রিম পা নিয়ে এভারেস্ট জয় করেন—প্রথম প্রতিবন্ধী ভারতীয় হিসেবে।
৫.৯ "মানুষ এখন শুধু নিজে চলেই ক্ষান্ত নয়।" —নিজের চলা ছাড়া বর্তমানে মানুষ কী কী জিনিস চলাতে সক্ষম?
শুধু নিজে চলাই নয়, মানুষ এখন অবিশ্বাস্য সব বস্তু ও যন্ত্রকে গতিমান করতে সক্ষম হয়েছে:
• যানবাহন: সাইকেল থেকে সুপারসনিক বিমান—সবই মানুষের সৃষ্টি। বুলেট ট্রেন ঘণ্টায় ৩০০+ কিমি বেগে চলে।
• মহাকাশযান: রকেট ও স্পেস প্রোবের সাহায্যে মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, মঙ্গলে রোভার পাঠিয়েছে। ভয়েজার-১ আজ মহাকাশের আন্তঃনাক্ষত্রিক অঞ্চলে পৌঁছে গেছে।
• তথ্যপ্রবাহ: ইন্টারনেট ও ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে তথ্য ছুটছে আলোর বেগে।
• পরমাণু কণা: সার্নের LHC-তে প্রোটনকে আলোর প্রায় সমান গতিতে ছুটিয়ে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করছেন।
এভাবেই মানুষ নিজের সীমাবদ্ধ দেহ নয়, বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো দুনিয়াকে ছুটিয়ে চলেছে।
৫.১০ "এখন মানুষ আকাশটাকে নতুন করে ঘোড়দৌড়ের মাঠ করে তুলেছে।" —মানুষের মহাকাশ-অভিযানের সাম্প্রতিকতম সাফল্য নিয়ে বন্ধুকে একটি চিঠি লেখো।
প্রিয় বন্ধু অর্ণব,
কেমন আছিস? অনেক দিন তোর চিঠি পাই না। আজ তোকে একটা দারুণ খবর দিতে লিখছি। পড়েছিলি নিশ্চয়ই, ইন্ডিয়ার চন্দ্রযান-৩ মিশন সম্প্রতি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে অবতরণ করেছে! এই কৃতিত্ব দেখিয়ে ভারত হয়ে গেল পৃথিবীর প্রথম দেশ, যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামতে পারল।
আর জানিস, নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশের এত গভীর থেকে এত অসাধারণ ছবি পাঠাচ্ছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। মনে হয় যেন \'নতুন করে ঘোড়দৌড়ের মাঠ\' সৃষ্টি হয়েছে সত্যিই। স্পেস-এক্স তো আবার মার্সে মানুষ পাঠানোর জন্য রীতিমতো রকেট তৈরি করছে—দ্যাখ একদিন সাধারণ মানুষই ছুটি কাটাতে যাবে মঙ্গলে!
লেখক শিবতোষবাবু যে বলেছিলেন, \'মনের দৌড়ে মানুষ চ্যাম্পিয়ন\', এগুলো যেন তারই প্রমাণ। তুই কবে আসছিস আমাদের বাড়ি? একসঙ্গে বসে এসব নিয়ে গল্প করব।
ইতি,
তোর বন্ধু
অভিষেক
৫.১১ "এ যাত্রা তোমার থামাও" —লেখক কাকে একথা বলেছেন? এর কোনো উত্তর তিনি কীভাবে পেয়েছেন?
লেখক প্রবন্ধের শেষ দিকে মানুষ বা মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন \'এ যাত্রা তোমার থামাও\'। এখানে \'যাত্রা\' বলতে মানুষের অবিরাম ছুটে চলা—এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহ। কিন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, এর উত্তর তিনি পাননি—মানুষ কখনো থামেনি বা থামবে বলেও মনে হয় না।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ ভাস্কো-ডা-গামা থেকে ইলন মাস্ক—সব যুগেই চলতে থামেনি। উপনিষদের \'চৈরেবিতি\' (এগিয়ে চলো) মন্ত্রটিই যেন মানুষের মূল সুর। উত্তর হতে পারে এটাই: মানুষ থামতে জানে না, থামা তার ধর্মই নয়।
চলার শিক্ষা
মনে রেখো: শিবতোষ মুখোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধ শুধু প্রাণীদের দৌড়ের গল্প নয়—এটা জীবনের গল্প।
'চরৈবেতি'—এগিয়ে চলো। বাধা আসবেই, কিন্তু উদ্ভিদের মতো স্থাণু হয়ে গেলে জীবন অর্থহীন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু মনের দৌড়ের কোনো শেষ নেই।