একুশের কবিতা

আশরাফ সিদ্দিকী রচিত 'একুশের কবিতা'র সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, ব্যাকরণ, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও সমাধান | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

🕊️ একুশের কবিতা

আশরাফ সিদ্দিকী ভাষা-আন্দোলনের কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • দ্বিতীয় পাঠ • ২১ ফেব্রুয়ারি

ভাষা প্রেম ১৯৫২ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শহীদ মিনার

আশরাফ সিদ্দিকী (জন্ম: ১৯২৭)

বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি, লেখক এবং খ্যাতনামা লোকতত্ত্ববিদ। জন্ম টাঙ্গাইলে। পাক্ষিক 'মুকুল' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'বিষকন্যা', 'উত্তর আকাশের তারা', 'কাগজের নৌকা' প্রভৃতি। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। 'একুশের কবিতা' তাঁর দেশপ্রেম ও মাতৃভাষা-চেতনার এক অনন্য দলিল।

📜

কবিতা

একুশের কবিতা

👤

কবি

আশরাফ সিদ্দিকী

📅

প্রেক্ষাপট

১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন

📚

পাঠ

দ্বিতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)

ভাষা আন্দোলন ও ভাষা শহীদ দিবসের ইতিহাস

📖 পটভূমি (১৯৪৭ - ১৯৫২)

১৯৪৭-এ স্বাধীনতা পাবার পর ভারতবর্ষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়—ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের অংশ নিয়ে, যাদের মধ্যে ভৌগোলিক ও ভাষা-সংস্কৃতিগত কোনো যোগাযোগ ছিল না। দেশের মূল শাসনক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে।

পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাংলার বদলে উর্দুকে রাষ্ট্রীয়ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পূর্ববঙ্গের মানুষ মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতায় উত্তাল হয়ে ওঠেন।

২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ছাত্র এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে তৎকালীন নাজিমুদ্দিন সরকারের পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়।

ভাষা শহীদগণ: আব্দুল সালাম, রফিক উদ্দিন আহমেদ, সফিউর রহমান, আবদুল বরকত এবং আব্দুল জব্বার—এই পাঁচ তরুণ শহীদ হন। এদের আত্মত্যাগ পরবর্তী গণআন্দোলনকে তুঙ্গে তোলে এবং ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে তা পূর্ণতা পায়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বর UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এর মর্যাদা প্রদান করে।

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

সারমর্ম: "একুশের কবিতা" আশরাফ সিদ্দিকী রচিত একটি গভীর দেশপ্রেম ও ভাষাচেতনার কবিতা। পাখির ডাক, নদীর কলতান, কোকিলের সুর—প্রকৃতির প্রতিটি ধ্বনির মধ্যে কবি খুঁজে পান তাঁর বাংলা ভাষার সুর। তিনি বলেছেন, এই সুর কোনো সাধারণ সুর নয়—এটি স্মৃতির মধুভাণ্ডার, যা তাঁর দেশ, মাঠ, বন, নদী ও গোটা অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৫২-এর ভাষা শহীদদের প্রসঙ্গ এতে প্রত্যক্ষ না থাকলেও, একুশের চেতনা—মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা, ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মাহাত্ম্য এবং বাংলা ভাষার অপরিসীম সৌন্দর্য—কবিতাটির প্রাণ।

কেন্দ্রীয় চেতনা: মাতৃভাষাই আমাদের প্রাণের ভাষা, অস্তিত্বের ভাষা। এই ভাষার জন্য একদিন রাজপথে রক্ত ঝরেছে, আর সেই ইতিহাসই এ কবিতায় সুর হয়ে বেজেছে।

১. চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত ক্রিয়া দিয়ে পাঁচটি বাক্য

ক্রিয়াবাক্য
হাঁটাপ্রতিদিন সকালে আমি পার্কে হাঁটতে যাই।
গুঁজামা ফুলের মালায় সুতো গুঁজে দিচ্ছেন।
ফোঁটাগোলাপ ফুলে শিশির ফোঁটা ফোঁটা জল জমেছে।
বোঁটাআম পাড়তে গিয়ে আমের বোঁটা ছিঁড়ে গেল।
ফোঁসারেগে গিয়ে লোকটা ফোঁস করে উঠল।
কোঁকানোঠান্ডায় সবাই কোঁকিয়ে উঠল।

২. ধ্বন্যাত্মক বা অনুকারী শব্দ (অনুকরণমূলক)

ধ্বন্যাত্মক শব্দবাক্য
কল কলখালের জল কল কল করে বয়ে চলেছে।
বন বনমাছিগুলো বন বন করে ভনভন করছে।
কড় কড়তালা খুলতে গিয়ে চাবি কড় কড় করছে।
বন বননদীর জল বন বন করে ঘুরছে।
সন সনশীতের বাতাস সন সন করে বইছে।
ধূপ ধাপবাজ পড়ল ধূপ ধাপ করে।
ফর ফরঘুড়িটা ফর ফর করে উড়ছে।
ভন ভনকাগজটা ভন ভন করে উড়ে গেল।
দুম দামঢোল বাজল দুম দাম করে।

৩. বিশেষণ হিসেবে 'মায়ের গাওয়া'-র মতো পাঁচটি প্রয়োগ

৩ 'মায়ের গাওয়া গান'-এর মতো বিশেষণ পদ তৈরি
  • মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় (উদাহরণ)
  • বাবার কেনা বই
  • দিদার বানানো পিঠে
  • শিক্ষকের বলা গল্প
  • কবির লেখা কবিতা
  • ঠাকুমার শোনানো রূপকথা

৪. বিশেষ্য-বিশেষণ পরিবর্তন ও বাক্য রচনা

মূল শব্দপরিবর্তিত রূপবাক্য
সুর (বি.)সুরেলা (বিণ.)তাঁর কণ্ঠ অত্যন্ত সুরেলা।
দেশ (বি.)দেশীয় (বিণ.)আমি দেশীয় খাবার পছন্দ করি।
মাঠ (বি.)মেঠো (বিণ.)সে মেঠো পথ ধরে হাঁটছে।
বন (বি.)বন্য (বিণ.)এটি একটি বন্য প্রাণী।
মিছিল (বি.)মিছিলবাহী (বিণ.)মিছিলবাহী জনতা স্লোগান দিচ্ছিল।
মুখর (বিণ.)মুখরতা (বি.)সকাল হলেই পাখির কলরবে চারদিক মুখরতা পায়।
ইতিহাস (বি.)ঐতিহাসিক (বিণ.)এটা এক ঐতিহাসিক দিন।
ফুল (বি.)ফুল্ল (বিণ.)বসন্তে বনভূমি ফুল্ল হয়ে ওঠে।

৫ ও ৬. শব্দের ভিন্নার্থে প্রয়োগ

৫ 'রব' শব্দটি বিশেষ্য ও ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার

বিশেষ্য (অর্থ: শব্দ, ধ্বনি): পাখির রবে সকালে ঘুম ভাঙল।

ক্রিয়া (অর্থ: রওনা হওয়া, যাত্রা করা): দেশের সেবায় তুমি রও (রব) দীর্ঘ পথে।

৬ 'কলি', 'সুর', 'পাল' শব্দগুলির দুই অর্থে বাক্য

কলি:

  • গানের কলি: রবীন্দ্রনাথের গানের কলিটি অসাধারণ।
  • সোনার কলি: আমগাছে নতুন কলি এসেছে।

সুর:

  • সঙ্গীতের সুর: গায়কটি সুর ভুলে গান করছিলেন।
  • শূর (বীর): চাঁদ সুলতানা ছিলেন এক শূর বীরাঙ্গনা।

পাল:

  • নৌকার পাল: নৌকার পাল বাতাসে ফুলে উঠেছে।
  • গরুর পাল: রাখাল গরুর পাল নিয়ে মাঠে যাচ্ছে।

৭. 'মুখ' শব্দটির পাঁচটি আলাদা অর্থে বাক্য

অর্থবাক্য
মুখমণ্ডল (Face)তাঁর মুখে হাসি লেগেই আছে।
সামনের অংশ (Front)বাড়িটার মুখ রাস্তার দিকে।
নদীর মোহানা (Mouth)নদীটির মুখ সাগরে গিয়ে মিশেছে।
সূচনা বা শুরু (Beginning)মুখে মুখে উত্তর দিতে পারলেই হবে না, লিখেও জানতে হবে।
প্রতিনিধিত্ব (Representation)সেই পরিবারের মুখ হয়ে তিনি কথা বলেছিলেন।

৮. প্রত্যয় নির্ণয় করো

শব্দমূল শব্দ + প্রত্যয়
কথকতাকথক + তা (ভাববাচক প্রত্যয়)
মুর্শিদমুরশিদ (আরবি) — বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত
মুখরমুখ + র (কর্তৃবাচক প্রত্যয়: যে মুখরিত করে)
পোড়ালিপোড়া + আলি (গান বোঝাতে)
ভাটিয়ালিভাটি + আলি (ভাটি অঞ্চলের গান)

৯. নিম্নরেখ অংশগুলির কারক-বিভক্তি নির্ণয়

বাক্যরেখাঙ্কিত অংশকারকবিভক্তি
পাখি সব করে রব।পাখিকর্তৃকারকশূন্য
কাননে কুমুমকলি সকলি ফুটিল।কাননেঅধিকরণ কারকএ
তাই তোরা সহজ পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর।দিগন্তকর্তৃকারকশূন্য
তিনি বাংলাভাষায় কথা বলতে বড় ভালোবাসেন।বাংলাভাষায়অধিকরণ কারকয় (এ)
রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে।রাখালকর্তৃকারকশূন্য

১০. একটি-দুটি বাক্যে উত্তর দাও

৮ টি
১০.১ "পাখি সব করে রব"— উদ্ধৃতাংশটি কার লেখা কোন কবিতার অংশ? কবিতাটি তাঁর লেখা কোন বইতে রয়েছে?
উদ্ধৃতাংশটি মদনমোহন তর্কালঙ্কার (১৮১৭-১৮৫৮) রচিত \'প্রাতঃভ্রমণ\' কবিতার অংশ। কবিতাটি তাঁর \'শিশুশিক্ষা\' (প্রথম ভাগ) বইতে রয়েছে। তিন খণ্ডে সমাপ্ত এই বইটি বাংলা শিশুশিক্ষামূলক রচনার পথিকৃৎ।
১০.২ এই পঙ্ক্তির সুরকে \'মায়ের মতা\' বলা হয়েছে কেন?
মা যেমন সন্তানের সবচেয়ে কাছের, আপনার, একান্ত নিজের—ঠিক তেমনই এই মাতৃভাষার সুরও কবির সবচেয়ে কাছের ও আপন। এই সুর আর পাঁচটা সাধারণ সুর নয়; এটি আত্মার সুর, যা শৈশব থেকেই রক্তে মিশে আছে। তাই একে \'মায়ের মতো\' বলা হয়েছে।
১০.৩ এই সুরকে কেন \'স্মৃতির মধুভাণ্ডার\' বলা হয়েছে? তা কবির মনে কোন স্মৃতি জাগিয়ে তোলে?
এই সুর কেবল ধ্বনি নয়, এটি স্মৃতির মধুভাণ্ডার। কারণ এর মধ্যে জমা হয়ে আছে তাঁর দেশ, মাঠ-বন-নদী, শৈশব, মায়ের গান, লোকসংস্কৃতি, পালাগান—সব মধুর স্মৃতি। এই সুর বেজে উঠলেই কবির চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর জন্মভূমির অপূর্ব রূপ—রাখালের গান, ভাটিয়ালি, জারি-সারি-মুর্শিদি গানের সুর।
১০.৪ "সেই আমার দেশ-মাঠ-বন-নদী"— দুই বাংলা মিলিয়ে তিনটি অরণ্য ও পাঁচটি নদীর নাম লেখো।
তিনটি অরণ্য: ১. সুন্দরবন (বাংলাদেশ/ভারত), ২. মধুপুর বন (বাংলাদেশ), ৩. জয়চণ্ডী পাহাড়ের বন (ভারত) বা গাজনী অববাহিকা।
পাঁচটি নদী: ১. পদ্মা, ২. মেঘনা, ৩. যমুনা, ৪. গঙ্গা, ৫. তিস্তা।
১০.৫ টীকা লেখো: জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, রসময় ধান, কথকতা, রূপকথা।
জারি: বাংলার মুসলমানি পল্লীসংগীত, কারবালার শোকগাথা। সারি: মাঝি-মাল্লাদের গান, নৌকা বাওয়ার সময় গীত হয়। ভাটিয়ালি: ভাটি অঞ্চলের সুরেলা গান। মুর্শিদি: দেহতত্ত্বের বাস্তব বিষয়ক গান। রসময় ধান: জমা জলে চাষ করা একপ্রকার আউশ ধান, এর খই ভালো হয়। কথকতা: ধর্মীয় বা পৌরাণিক কাহিনির ব্যাখ্যা-সহ পাঠ। রূপকথা: কল্পনা-আশ্রিত উপদেশমূলক গল্প।
১০.৬ তোমার জানা দুইটি পৃথক লোকসংগীতের ধারার নাম লেখো।
বাংলার দুইটি পৃথক লোকসংগীতের ধারা: বাউল গান (লালন ফকিরের গান) এবং ভাওয়াইয়া গান (উত্তরবঙ্গের মাটি ও হৃদয়ের গান)। এছাড়া ভাটিয়ালি, গম্ভীরা ইত্যাদিও উল্লেখযোগ্য।
১০.৭ "ইতিহাস খেমে দাঁতেছে লিখে নিলো সব"— 'সব' বলতে এখানে কী কী বোঝানো হয়েছে?
\'সব\' বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে—পাখির রব, কোকিলের গান, জারি-সারি-ভাটিয়ালি-মুর্শিদি গানের সুর, কথকতার কাহিনি, রূপকথা, রাখালের গান—অর্থাৎ বাংলার চিরন্তন লোকসংস্কৃতির প্রতিটি উপাদান। ইতিহাস যেন ক্ষান্ত হয়ে এই সব স্মৃতি নিজের খাতায় লিখে নিচ্ছে।
১০.৮ "তাই তোরা সহজ পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর"— 'সহজ পাখি' কাদের বলা হয়েছে?
\'সহজ পাখি\' বলতে এখানে ভাষাশহীদদের (আব্দুল সালাম, রফিক, বরকত, সফিউর, জব্বার) বোঝানো হয়েছে। সহজ অর্থ সরল, স্বাভাবিক—যাঁরা কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়াই কেবল ভাষার টানে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁদের আত্মার মুক্তি পাখির মতো সহজ ও স্বাধীন। তাঁদেরই কলতানে (কণ্ঠস্বর) আজ বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত।

১১. ব্যাখ্যা করো

৪ টি
১১.১ 'কয়েকটি পাখি... পড়ে গেল মাটিতে'

এই পঙ্ক্তিটি ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারির মর্মন্তুদ ঘটনার প্রতীকী রূপক। 'পাখি' দ্বারা ভাষাশহীদদের বোঝানো হয়েছে। পাখিরা যেমন অবাধে আকাশে উড়ে বেড়ায়, তেমনই বাংলার ছাত্র-যুবকেরা শান্তিপূর্ণ মিছিলে নিজেদের প্রাণের ভাষার জন্য আকাশ-বাতাস মুখর করছিল। কিন্তু নির্মম পুলিশের গুলিতে সেই সরল-সহজ পাখিগুলো একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

১১.২ 'সেই শোককে কালবৈশাখীর বড় উঠলা আকাশে'

১৯৫২-র ভাষাশহীদদের মৃত্যু গোটা জাতিকে নিমেষে শোকের সাগরে ডুবিয়েছিল। এই শোককে কবি 'কালবৈশাখীর বড় উঠলা আকাশ'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কালবৈশাখী ঝড় যেমন হঠাৎ বিশাল আকাশ জুড়ে উত্তাল হয়ে ওঠে, তেমনই ভাষাশহীদদের মৃত্যুশোক ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে গোটা পূর্ববঙ্গের আকাশে-বাতাসে বিপ্লবের ঝড় তুলেছিল।

১১.৩ 'কথায় কথায় কথকতা কোথা রূপকথা'

এই পঙ্ক্তিতে কবি বাংলার লোকজীবনের চিরন্তন রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে নানা গল্প, উপকথা ও ধর্মীয় কাহিনির ব্যাখ্যা (কথকতা)। ভাষাশহীদদের আত্মদানের পর বাংলার সেই চিরায়ত সংস্কৃতির অস্তিত্ব এক অর্থে সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছিল, আবার অন্যদিকে নতুন চেতনার জন্মও হয়েছিল। পঙ্ক্তিটি বেদনা ও আত্মপরিচয়ের দ্বৈত টানকে ধারণ করে আছে।

১১.৪ 'তাই তোরা আজ দেখো এ মিছিলে এসে দাঁড়িয়েছেন আমার মা'

এটি কবিতার একটি মর্মস্পর্শী পঙ্ক্তি। 'মা' বলতে কেবল কবির নিজের জন্মদাত্রী নন, বরং বাঙালি জাতির জননী, বাংলা ভাষা এবং বঙ্গভূমি। শহীদদের আত্মত্যাগের পর গোটা জাতি যখন শোকে মুহ্যমান, তখন মা-ও নেমে এসেছেন এই মিছিলে। এর অর্থ, শহীদদের রক্ত শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, তা গোটা বাংলার মাতৃচেতনাকে জাগ্রত করেছে।

১২. আট-দশটি বাক্যে উত্তর দাও

২ টি
১২.১ এই কবিতায় 'পাখি'-শব্দের ব্যবহার কতখানি সার্থক হয়েছে তা কবিতার বিভিন্ন পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে আলোচনা করো।

আশরাফ সিদ্দিকীর 'একুশের কবিতা'য় 'পাখি' ব্যবহৃত হয়েছে একইসঙ্গে বাস্তব ও প্রতীকী—এই দুই অর্থেই, যা কবিতাটিকে দিয়েছে অসাধারণ শৈল্পিক উচ্চতা।

বাস্তব অর্থে: কবিতার শুরুতেই—"পাখি সব করে রব"—মদনমোহন তর্কালঙ্কারের পঙ্ক্তি উদ্ধৃতির মাধ্যমে প্রকৃতির অবাধ ও চিরন্তন সৌন্দর্যের ছবি আঁকা হয়েছে। এটি বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক স্বর্গীয় রূপ।

প্রতীকী অর্থে: কিন্তু ক্রমেই পাঠক বুঝতে পারেন, এই 'পাখি' নিছক প্রাণী নয়। "কয়েকটি পাখি... পড়ে গেল মাটিতে"—এই পঙ্ক্তিতে 'পাখি' হয়ে উঠেছে ভাষা শহীদদের রূপক। পাখির গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাওয়া আসলে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া বোঝাচ্ছে।

সার্থকতা: পাখি একাধারে স্বাধীনতা ও সরলতার প্রতীক। ভাষাশহীদেরাও স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়াতে চেয়েছিলেন তাঁদের মাতৃভাষার আকাশে। সুতরাং, 'পাখি' শব্দটি কবিতার বক্তব্য ও নান্দনিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সার্থক ও যথার্থ।

১২.২ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

'একুশের কবিতা' নামকরণ একাধিক কারণে বিশেষ সার্থক:

ঐতিহাসিক নির্দেশ: একুশে ফেব্রুয়ারি (২১ ফেব্রুয়ারি) বাংলা ভাষার ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনেই বাংলার দামাল ছেলেরা মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য রাজপথে শহীদ হন। সমগ্র কবিতাটি এই দিনটির শোক, গৌরব ও চেতনাকে কেন্দ্র করে রচিত।

অমরতার প্রকাশ: একুশ সংখ্যাটি আর দশটা সাধারণ সংখ্যা নয়—এটি এখন মায়ের ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের প্রতীক। নামকরণের মাধ্যমেই কবি গ্রন্থিত করে দিয়েছেন এক অমর অধ্যায়কে।

সর্বজনীনতা: ১৯৯৯ সালে UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে নামটি এখন গোটা বিশ্বের কাছে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতিচ্ছবি। সুতরাং, নামকরণটি শুধু কাব্যিক নয়, তা ঐতিহাসিকভাবেও সার্থক ও মহিমান্বিত।

১৩-১৫. রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

১৩ "শুধু মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার প্রকাশ নয়, এই কবিতায় রয়েছে আবহমানের ও অমরতার প্রতি বিশ্বাস"—পাঠ্য কবিতাটি অবলম্বনে উপরের উক্তিটি আলোচনা করো।

উক্তিটি সম্পূর্ণ সত্য। 'একুশের কবিতা' নিছক একটি ভাষা-আন্দোলনের কাহিনি নয়, এটি বাংলার চিরন্তন রূপ, আবহমান সংস্কৃতি ও অমরতার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করে।

আবহমানের প্রকাশ: কবিতায় আমরা দেখি পাখির রব, কোকিলের গান, জারি-সারি-ভাটিয়ালি, মায়ের গান, কৃষক-জেলের জীবন—যেমন ছিল হাজার বছর ধরে। এই সব কিছুই বাংলার চিরন্তন রূপ, যা সময়ের বাঁধন মানে না। ভাষাশহীদের মৃত্যুতেও এই আবহমানতা ক্ষুণ্ণ হয়নি, বরং আরও বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছে।

অমরতার বিশ্বাস: পাখিরা মরে গিয়ে মাটিতে পড়ে, কিন্তু তাদের গান থেমে যায় না। "তাই তোরা সহজ পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর"—শহীদেরাও দেহে মরলেও তাঁদের স্বর আজ বাংলার আকাশ-বাতাসে চির অমর। এই বিশ্বাস কবিতাটিকে নিছক শোকগাথা না করে অমরতার জয়গানে পরিণত করেছে।

১৪ মনে করো তুমি এমন কোনো জায়গায় দীর্ঘদিনের জন্য যেতে বাধ্য হয়েছ যেখানে কেউ তোমার মাতৃভাষা বোঝেন না। নিজের ভাষায় কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা জানিয়ে বন্ধুকে একটি চিঠি লেখো।

উত্তর (নমুনা চিঠি):

১৫ আগস্ট, ২০২৫
রাঁচি, ঝাড়খণ্ড

প্রিয় সায়ন,

কেমন আছিস? অনেকদিন তোদের কোনো খবর পাই না। আজ তোর কাছে মনের একটা কষ্টের কথা জানাতে চাই।

বাবার বদলির চাকরির জন্য আমাদের থাকতে হচ্ছে উত্তর ভারতের এই শহরে, যেখানে প্রায় কেউ বাংলা বোঝে না। স্কুলে, খেলার মাঠে—সব জায়গায় হিন্দি বলতে হয়। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম, শিখে নেব। কিন্তু মনটা যে কিছুতেই মানতে চায় না। মনের ভাব প্রকাশ করতে গেলে ইংরেজি বা হিন্দি আশ্রয় নিতে হয়, কিন্তু জানিস, মায়ের ভাষায় যে গভীর অনুভূতি মেশানো থাকে, তা অন্য ভাষায় কখনো প্রকাশ করা যায় না।

মনে পড়ে আমাদের বাংলা মিডিয়ামের স্কুলের সেই আড্ডা, মাস্টারমশাইয়ের বাংলা গল্প বলা, টিফিনে তোদের সঙ্গে গান গেয়ে ওঠা। এখানে সেসব কিছুই নেই। নিজেকে বড্ড শিকড়বিহীন গাছের মতো লাগে।

এখন খুব করে বুঝতে পারছি, যাঁরা ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের ত্যাগ কত বড়ো ছিল। তোরা জানিসই, আমাদের প্রাণের ভাষাই আমাদের আসল পরিচয়।

ইতি তোর শুভানুধ্যায়ী,
[তোমার নাম]

১৫ তোমার বিদ্যালয়ে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' কীভাবে পালিত হয়, তা জানিয়ে প্রিয় বন্ধুকে চিঠি লেখো।

উত্তর (নমুনা চিঠি):

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
কৃষ্ণনগর, নদিয়া

প্রিয় অর্পিতা,

তোর চিঠি পেয়ে খুব ভালো লাগল। জানতে চেয়েছিস, আমাদের স্কুলে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' কীভাবে পালিত হয়। তাই ভাবলাম, বিস্তারিত জানাই।

প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি আমাদের স্কুলে খুব ধুমধাম করে পালিত হয়। সকালবেলাই শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমাদের নিয়ে স্কুলের অ্যাসেম্বলি হলের সামনে জড়ো হন। প্রথমে জাতীয় সংগীত, তারপর গোটা স্কুল একসঙ্গে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' গানটি গায়। সত্যি বলতে কী, গানটা গাওয়ার সময় গলা ধরে আসে।

এরপর শুরু হয় নানা অনুষ্ঠান। কেউ বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে, কেউ ভাষা শহীদদের নিয়ে ছোটো নাটক দেখায়, আবার কেউ পোস্টার এঁকে দেখায়। আমাদের বাংলা স্যার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে খুব সুন্দর বক্তৃতা দেন। শেষে সবার জন্য থাকে একুশের বিশেষ চিত্র প্রদর্শনী ও মিষ্টিমুখ।

সবচেয়ে ভালো লাগে যখন দেখি স্কুলের সব ছাত্রছাত্রী, তারা যে ভাষারই হোক না কেন, বাংলাভাষার সম্মানে সেদিন বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে। জানিস, এই দিনটাতে নিজেকে বাঙালি বলে সত্যি গর্ব হয়।

আশা করি তোদের স্কুলেও দিবসটি সুন্দরভাবে পালিত হয়। চিঠি দিস।

ইতি তোর প্রিয় বান্ধবী,
[তোমার নাম]

একুশের চেতনা চির অমর

২১ ফেব্রুয়ারি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশ্বের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ শুধু বাংলা ভাষাকেই রক্ষা করেনি, বরং পৃথিবীর প্রতিটি জাতির কাছে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার অমর বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। 'একুশের কবিতা' আমাদের শেখায়—নিজের ভাষাকে ভালোবাসতে, সম্মান করতে, এবং প্রয়োজনে রুখে দাঁড়াতে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'একুশের কবিতা' বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি ও লোকতত্ত্ববিদ আশরাফ সিদ্দিকী (জন্ম ১৯২৭) রচিত। এর প্রেক্ষাপট হল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন, যেখানে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালালে সালাম, রফিক, বরকত, সফিউর ও জব্বার শহীদ হন। কবিতাটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় পাঠে অন্তর্ভুক্ত।

'একুশের কবিতা'য় 'পাখি' হল ভাষা শহীদদের প্রতীক। পাখিরা যেমন অবাধে আকাশে উড়ে বেড়ায়, তেমনই বাংলার ছাত্র-যুবকেরা মাতৃভাষার জন্য রাজপথে নেমেছিলেন। 'কয়েকটি পাখি পড়ে গেল মাটিতে'—এই পঙ্ক্তিটি পুলিশের গুলিতে শহীদের মৃত্যুকে নির্দেশ করে। সহজ-সরল ও স্বাধীনচেতা বলেই শহীদেরা 'সহজ পাখি'রূপে চিহ্নিত।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি অমর হয়ে আছে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' (International Mother Language Day) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে দিনটি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।