🕊️ একুশের কবিতা
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • দ্বিতীয় পাঠ • ২১ ফেব্রুয়ারি
কবিতা
একুশের কবিতা
কবি
আশরাফ সিদ্দিকী
প্রেক্ষাপট
১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন
পাঠ
দ্বিতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)
ভাষা আন্দোলন ও ভাষা শহীদ দিবসের ইতিহাস
📖 পটভূমি (১৯৪৭ - ১৯৫২)
১৯৪৭-এ স্বাধীনতা পাবার পর ভারতবর্ষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়—ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের অংশ নিয়ে, যাদের মধ্যে ভৌগোলিক ও ভাষা-সংস্কৃতিগত কোনো যোগাযোগ ছিল না। দেশের মূল শাসনক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে।
পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাংলার বদলে উর্দুকে রাষ্ট্রীয়ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পূর্ববঙ্গের মানুষ মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতায় উত্তাল হয়ে ওঠেন।
২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ছাত্র এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে তৎকালীন নাজিমুদ্দিন সরকারের পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়।
ভাষা শহীদগণ: আব্দুল সালাম, রফিক উদ্দিন আহমেদ, সফিউর রহমান, আবদুল বরকত এবং আব্দুল জব্বার—এই পাঁচ তরুণ শহীদ হন। এদের আত্মত্যাগ পরবর্তী গণআন্দোলনকে তুঙ্গে তোলে এবং ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে তা পূর্ণতা পায়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বর UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এর মর্যাদা প্রদান করে।
কবিতার সারাংশ ও মূলভাব
সারমর্ম: "একুশের কবিতা" আশরাফ সিদ্দিকী রচিত একটি গভীর দেশপ্রেম ও ভাষাচেতনার কবিতা। পাখির ডাক, নদীর কলতান, কোকিলের সুর—প্রকৃতির প্রতিটি ধ্বনির মধ্যে কবি খুঁজে পান তাঁর বাংলা ভাষার সুর। তিনি বলেছেন, এই সুর কোনো সাধারণ সুর নয়—এটি স্মৃতির মধুভাণ্ডার, যা তাঁর দেশ, মাঠ, বন, নদী ও গোটা অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৫২-এর ভাষা শহীদদের প্রসঙ্গ এতে প্রত্যক্ষ না থাকলেও, একুশের চেতনা—মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা, ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মাহাত্ম্য এবং বাংলা ভাষার অপরিসীম সৌন্দর্য—কবিতাটির প্রাণ।
কেন্দ্রীয় চেতনা: মাতৃভাষাই আমাদের প্রাণের ভাষা, অস্তিত্বের ভাষা। এই ভাষার জন্য একদিন রাজপথে রক্ত ঝরেছে, আর সেই ইতিহাসই এ কবিতায় সুর হয়ে বেজেছে।
১. চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত ক্রিয়া দিয়ে পাঁচটি বাক্য
| ক্রিয়া | বাক্য |
|---|---|
| হাঁটা | প্রতিদিন সকালে আমি পার্কে হাঁটতে যাই। |
| গুঁজা | মা ফুলের মালায় সুতো গুঁজে দিচ্ছেন। |
| ফোঁটা | গোলাপ ফুলে শিশির ফোঁটা ফোঁটা জল জমেছে। |
| বোঁটা | আম পাড়তে গিয়ে আমের বোঁটা ছিঁড়ে গেল। |
| ফোঁসা | রেগে গিয়ে লোকটা ফোঁস করে উঠল। |
| কোঁকানো | ঠান্ডায় সবাই কোঁকিয়ে উঠল। |
২. ধ্বন্যাত্মক বা অনুকারী শব্দ (অনুকরণমূলক)
| ধ্বন্যাত্মক শব্দ | বাক্য |
|---|---|
| কল কল | খালের জল কল কল করে বয়ে চলেছে। |
| বন বন | মাছিগুলো বন বন করে ভনভন করছে। |
| কড় কড় | তালা খুলতে গিয়ে চাবি কড় কড় করছে। |
| বন বন | নদীর জল বন বন করে ঘুরছে। |
| সন সন | শীতের বাতাস সন সন করে বইছে। |
| ধূপ ধাপ | বাজ পড়ল ধূপ ধাপ করে। |
| ফর ফর | ঘুড়িটা ফর ফর করে উড়ছে। |
| ভন ভন | কাগজটা ভন ভন করে উড়ে গেল। |
| দুম দাম | ঢোল বাজল দুম দাম করে। |
৩. বিশেষণ হিসেবে 'মায়ের গাওয়া'-র মতো পাঁচটি প্রয়োগ
- মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় (উদাহরণ)
- বাবার কেনা বই
- দিদার বানানো পিঠে
- শিক্ষকের বলা গল্প
- কবির লেখা কবিতা
- ঠাকুমার শোনানো রূপকথা
৪. বিশেষ্য-বিশেষণ পরিবর্তন ও বাক্য রচনা
| মূল শব্দ | পরিবর্তিত রূপ | বাক্য |
|---|---|---|
| সুর (বি.) | সুরেলা (বিণ.) | তাঁর কণ্ঠ অত্যন্ত সুরেলা। |
| দেশ (বি.) | দেশীয় (বিণ.) | আমি দেশীয় খাবার পছন্দ করি। |
| মাঠ (বি.) | মেঠো (বিণ.) | সে মেঠো পথ ধরে হাঁটছে। |
| বন (বি.) | বন্য (বিণ.) | এটি একটি বন্য প্রাণী। |
| মিছিল (বি.) | মিছিলবাহী (বিণ.) | মিছিলবাহী জনতা স্লোগান দিচ্ছিল। |
| মুখর (বিণ.) | মুখরতা (বি.) | সকাল হলেই পাখির কলরবে চারদিক মুখরতা পায়। |
| ইতিহাস (বি.) | ঐতিহাসিক (বিণ.) | এটা এক ঐতিহাসিক দিন। |
| ফুল (বি.) | ফুল্ল (বিণ.) | বসন্তে বনভূমি ফুল্ল হয়ে ওঠে। |
৫ ও ৬. শব্দের ভিন্নার্থে প্রয়োগ
বিশেষ্য (অর্থ: শব্দ, ধ্বনি): পাখির রবে সকালে ঘুম ভাঙল।
ক্রিয়া (অর্থ: রওনা হওয়া, যাত্রা করা): দেশের সেবায় তুমি রও (রব) দীর্ঘ পথে।
কলি:
- গানের কলি: রবীন্দ্রনাথের গানের কলিটি অসাধারণ।
- সোনার কলি: আমগাছে নতুন কলি এসেছে।
সুর:
- সঙ্গীতের সুর: গায়কটি সুর ভুলে গান করছিলেন।
- শূর (বীর): চাঁদ সুলতানা ছিলেন এক শূর বীরাঙ্গনা।
পাল:
- নৌকার পাল: নৌকার পাল বাতাসে ফুলে উঠেছে।
- গরুর পাল: রাখাল গরুর পাল নিয়ে মাঠে যাচ্ছে।
৭. 'মুখ' শব্দটির পাঁচটি আলাদা অর্থে বাক্য
| অর্থ | বাক্য |
|---|---|
| মুখমণ্ডল (Face) | তাঁর মুখে হাসি লেগেই আছে। |
| সামনের অংশ (Front) | বাড়িটার মুখ রাস্তার দিকে। |
| নদীর মোহানা (Mouth) | নদীটির মুখ সাগরে গিয়ে মিশেছে। |
| সূচনা বা শুরু (Beginning) | মুখে মুখে উত্তর দিতে পারলেই হবে না, লিখেও জানতে হবে। |
| প্রতিনিধিত্ব (Representation) | সেই পরিবারের মুখ হয়ে তিনি কথা বলেছিলেন। |
৮. প্রত্যয় নির্ণয় করো
| শব্দ | মূল শব্দ + প্রত্যয় |
|---|---|
| কথকতা | কথক + তা (ভাববাচক প্রত্যয়) |
| মুর্শিদ | মুরশিদ (আরবি) — বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত |
| মুখর | মুখ + র (কর্তৃবাচক প্রত্যয়: যে মুখরিত করে) |
| পোড়ালি | পোড়া + আলি (গান বোঝাতে) |
| ভাটিয়ালি | ভাটি + আলি (ভাটি অঞ্চলের গান) |
৯. নিম্নরেখ অংশগুলির কারক-বিভক্তি নির্ণয়
| বাক্য | রেখাঙ্কিত অংশ | কারক | বিভক্তি |
|---|---|---|---|
| পাখি সব করে রব। | পাখি | কর্তৃকারক | শূন্য |
| কাননে কুমুমকলি সকলি ফুটিল। | কাননে | অধিকরণ কারক | এ |
| তাই তোরা সহজ পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর। | দিগন্ত | কর্তৃকারক | শূন্য |
| তিনি বাংলাভাষায় কথা বলতে বড় ভালোবাসেন। | বাংলাভাষায় | অধিকরণ কারক | য় (এ) |
| রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে। | রাখাল | কর্তৃকারক | শূন্য |
১০. একটি-দুটি বাক্যে উত্তর দাও
৮ টিপাঁচটি নদী: ১. পদ্মা, ২. মেঘনা, ৩. যমুনা, ৪. গঙ্গা, ৫. তিস্তা।
১১. ব্যাখ্যা করো
৪ টিএই পঙ্ক্তিটি ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারির মর্মন্তুদ ঘটনার প্রতীকী রূপক। 'পাখি' দ্বারা ভাষাশহীদদের বোঝানো হয়েছে। পাখিরা যেমন অবাধে আকাশে উড়ে বেড়ায়, তেমনই বাংলার ছাত্র-যুবকেরা শান্তিপূর্ণ মিছিলে নিজেদের প্রাণের ভাষার জন্য আকাশ-বাতাস মুখর করছিল। কিন্তু নির্মম পুলিশের গুলিতে সেই সরল-সহজ পাখিগুলো একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
১৯৫২-র ভাষাশহীদদের মৃত্যু গোটা জাতিকে নিমেষে শোকের সাগরে ডুবিয়েছিল। এই শোককে কবি 'কালবৈশাখীর বড় উঠলা আকাশ'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কালবৈশাখী ঝড় যেমন হঠাৎ বিশাল আকাশ জুড়ে উত্তাল হয়ে ওঠে, তেমনই ভাষাশহীদদের মৃত্যুশোক ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে গোটা পূর্ববঙ্গের আকাশে-বাতাসে বিপ্লবের ঝড় তুলেছিল।
এই পঙ্ক্তিতে কবি বাংলার লোকজীবনের চিরন্তন রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে নানা গল্প, উপকথা ও ধর্মীয় কাহিনির ব্যাখ্যা (কথকতা)। ভাষাশহীদদের আত্মদানের পর বাংলার সেই চিরায়ত সংস্কৃতির অস্তিত্ব এক অর্থে সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছিল, আবার অন্যদিকে নতুন চেতনার জন্মও হয়েছিল। পঙ্ক্তিটি বেদনা ও আত্মপরিচয়ের দ্বৈত টানকে ধারণ করে আছে।
এটি কবিতার একটি মর্মস্পর্শী পঙ্ক্তি। 'মা' বলতে কেবল কবির নিজের জন্মদাত্রী নন, বরং বাঙালি জাতির জননী, বাংলা ভাষা এবং বঙ্গভূমি। শহীদদের আত্মত্যাগের পর গোটা জাতি যখন শোকে মুহ্যমান, তখন মা-ও নেমে এসেছেন এই মিছিলে। এর অর্থ, শহীদদের রক্ত শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, তা গোটা বাংলার মাতৃচেতনাকে জাগ্রত করেছে।
১২. আট-দশটি বাক্যে উত্তর দাও
২ টিআশরাফ সিদ্দিকীর 'একুশের কবিতা'য় 'পাখি' ব্যবহৃত হয়েছে একইসঙ্গে বাস্তব ও প্রতীকী—এই দুই অর্থেই, যা কবিতাটিকে দিয়েছে অসাধারণ শৈল্পিক উচ্চতা।
বাস্তব অর্থে: কবিতার শুরুতেই—"পাখি সব করে রব"—মদনমোহন তর্কালঙ্কারের পঙ্ক্তি উদ্ধৃতির মাধ্যমে প্রকৃতির অবাধ ও চিরন্তন সৌন্দর্যের ছবি আঁকা হয়েছে। এটি বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক স্বর্গীয় রূপ।
প্রতীকী অর্থে: কিন্তু ক্রমেই পাঠক বুঝতে পারেন, এই 'পাখি' নিছক প্রাণী নয়। "কয়েকটি পাখি... পড়ে গেল মাটিতে"—এই পঙ্ক্তিতে 'পাখি' হয়ে উঠেছে ভাষা শহীদদের রূপক। পাখির গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যাওয়া আসলে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া বোঝাচ্ছে।
সার্থকতা: পাখি একাধারে স্বাধীনতা ও সরলতার প্রতীক। ভাষাশহীদেরাও স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়াতে চেয়েছিলেন তাঁদের মাতৃভাষার আকাশে। সুতরাং, 'পাখি' শব্দটি কবিতার বক্তব্য ও নান্দনিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সার্থক ও যথার্থ।
'একুশের কবিতা' নামকরণ একাধিক কারণে বিশেষ সার্থক:
ঐতিহাসিক নির্দেশ: একুশে ফেব্রুয়ারি (২১ ফেব্রুয়ারি) বাংলা ভাষার ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনেই বাংলার দামাল ছেলেরা মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার জন্য রাজপথে শহীদ হন। সমগ্র কবিতাটি এই দিনটির শোক, গৌরব ও চেতনাকে কেন্দ্র করে রচিত।
অমরতার প্রকাশ: একুশ সংখ্যাটি আর দশটা সাধারণ সংখ্যা নয়—এটি এখন মায়ের ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের প্রতীক। নামকরণের মাধ্যমেই কবি গ্রন্থিত করে দিয়েছেন এক অমর অধ্যায়কে।
সর্বজনীনতা: ১৯৯৯ সালে UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে নামটি এখন গোটা বিশ্বের কাছে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতিচ্ছবি। সুতরাং, নামকরণটি শুধু কাব্যিক নয়, তা ঐতিহাসিকভাবেও সার্থক ও মহিমান্বিত।
১৩-১৫. রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
উক্তিটি সম্পূর্ণ সত্য। 'একুশের কবিতা' নিছক একটি ভাষা-আন্দোলনের কাহিনি নয়, এটি বাংলার চিরন্তন রূপ, আবহমান সংস্কৃতি ও অমরতার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করে।
আবহমানের প্রকাশ: কবিতায় আমরা দেখি পাখির রব, কোকিলের গান, জারি-সারি-ভাটিয়ালি, মায়ের গান, কৃষক-জেলের জীবন—যেমন ছিল হাজার বছর ধরে। এই সব কিছুই বাংলার চিরন্তন রূপ, যা সময়ের বাঁধন মানে না। ভাষাশহীদের মৃত্যুতেও এই আবহমানতা ক্ষুণ্ণ হয়নি, বরং আরও বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছে।
অমরতার বিশ্বাস: পাখিরা মরে গিয়ে মাটিতে পড়ে, কিন্তু তাদের গান থেমে যায় না। "তাই তোরা সহজ পাখির কলতানে আজ দিগন্ত মুখর"—শহীদেরাও দেহে মরলেও তাঁদের স্বর আজ বাংলার আকাশ-বাতাসে চির অমর। এই বিশ্বাস কবিতাটিকে নিছক শোকগাথা না করে অমরতার জয়গানে পরিণত করেছে।
উত্তর (নমুনা চিঠি):
১৫ আগস্ট, ২০২৫
রাঁচি, ঝাড়খণ্ড
প্রিয় সায়ন,
কেমন আছিস? অনেকদিন তোদের কোনো খবর পাই না। আজ তোর কাছে মনের একটা কষ্টের কথা জানাতে চাই।
বাবার বদলির চাকরির জন্য আমাদের থাকতে হচ্ছে উত্তর ভারতের এই শহরে, যেখানে প্রায় কেউ বাংলা বোঝে না। স্কুলে, খেলার মাঠে—সব জায়গায় হিন্দি বলতে হয়। প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম, শিখে নেব। কিন্তু মনটা যে কিছুতেই মানতে চায় না। মনের ভাব প্রকাশ করতে গেলে ইংরেজি বা হিন্দি আশ্রয় নিতে হয়, কিন্তু জানিস, মায়ের ভাষায় যে গভীর অনুভূতি মেশানো থাকে, তা অন্য ভাষায় কখনো প্রকাশ করা যায় না।
মনে পড়ে আমাদের বাংলা মিডিয়ামের স্কুলের সেই আড্ডা, মাস্টারমশাইয়ের বাংলা গল্প বলা, টিফিনে তোদের সঙ্গে গান গেয়ে ওঠা। এখানে সেসব কিছুই নেই। নিজেকে বড্ড শিকড়বিহীন গাছের মতো লাগে।
এখন খুব করে বুঝতে পারছি, যাঁরা ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের ত্যাগ কত বড়ো ছিল। তোরা জানিসই, আমাদের প্রাণের ভাষাই আমাদের আসল পরিচয়।
ইতি তোর শুভানুধ্যায়ী,
[তোমার নাম]
উত্তর (নমুনা চিঠি):
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
কৃষ্ণনগর, নদিয়া
প্রিয় অর্পিতা,
তোর চিঠি পেয়ে খুব ভালো লাগল। জানতে চেয়েছিস, আমাদের স্কুলে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' কীভাবে পালিত হয়। তাই ভাবলাম, বিস্তারিত জানাই।
প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি আমাদের স্কুলে খুব ধুমধাম করে পালিত হয়। সকালবেলাই শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমাদের নিয়ে স্কুলের অ্যাসেম্বলি হলের সামনে জড়ো হন। প্রথমে জাতীয় সংগীত, তারপর গোটা স্কুল একসঙ্গে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' গানটি গায়। সত্যি বলতে কী, গানটা গাওয়ার সময় গলা ধরে আসে।
এরপর শুরু হয় নানা অনুষ্ঠান। কেউ বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে, কেউ ভাষা শহীদদের নিয়ে ছোটো নাটক দেখায়, আবার কেউ পোস্টার এঁকে দেখায়। আমাদের বাংলা স্যার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে খুব সুন্দর বক্তৃতা দেন। শেষে সবার জন্য থাকে একুশের বিশেষ চিত্র প্রদর্শনী ও মিষ্টিমুখ।
সবচেয়ে ভালো লাগে যখন দেখি স্কুলের সব ছাত্রছাত্রী, তারা যে ভাষারই হোক না কেন, বাংলাভাষার সম্মানে সেদিন বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করে। জানিস, এই দিনটাতে নিজেকে বাঙালি বলে সত্যি গর্ব হয়।
আশা করি তোদের স্কুলেও দিবসটি সুন্দরভাবে পালিত হয়। চিঠি দিস।
ইতি তোর প্রিয় বান্ধবী,
[তোমার নাম]