ভারততীর্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'ভারততীর্থ' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

ভারততীর্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • অষ্টম পাঠ

ভারতবর্ষ বিশ্ববোধ মৈত্রী মানবধর্ম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)

জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত 'ভারতী' ও 'বালক' পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। দীর্ঘ জীবনে অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। ১৯১৩ সালে 'Song Offerings'-এর জন্য প্রথম এশিয়াবাসী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা। 'ভারততীর্থ' কবিতাটি 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

📝

কবিতা

ভারততীর্থ

👤

কবি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

📚

পাঠ

অষ্টম পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

দেশাত্মবোধক ও মানবতাবাদী

সম্পূর্ণ কবিতা

ভারততীর্থ

🕉️ ভারততীর্থ

হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। হেথায় দাঁড়ায়ে দুই বাহু বাড়ায়ে নমি নরদেবতার, উদার ছন্দে পরমানে বন্দনা করি তাঁহার। ধ্যানগম্ভীর এই যে ভূধর, নদী-জপমালা-ধৃত প্রান্তর, হেথায় নিত্য হেরা পবিত্র ধরিত্রীরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে॥ কেহ নাহি জানে, কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্র হল হারা। আর্য, অনার্য—দেহ, দ্রাবিড়, শক-হুন-পাঠান মোঘল, এক দেহে হল লীন, সবার হল মিলনের স্থল। পশ্চিমে আজি খুলিয়া দিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে আনি উপহার, দিবে আর লবে, মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে— এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। এসো হে আর্য, এসো অনার্য, এসো হে দ্রাবিড়, সবে— এসো ইংরেজ, এসো খৃস্টান, এসো হে ব্রাক্ষ্মণ শুচি হবে। এস হে পতিত করো অপনয়, ভাঙো সব বাধা বিঘ্ন ভয়— সবারে করিয়া ধন্য, করো হে অভিষেক পুণ্যতীর্থনীরে। হেথা একদিন বিরাট শ্মশান জাগিল কোলাহল— শত শত রক্ত-কমলে পূত পাষাণ তব তল। হৃদয়তন্ত্রে উঠিল রণরিণি, তেজিল আসন তপোবনভবন বীর সন্ন্যাসী— রণ-অভিষেক তব হল নূতন জয়ডঙ্কা নবীন জাগরণ। এসো হে আর্য, এসো অনার্য—হিন্দু, মুসলমান, এসো এসো আজ ইংরেজ, এসো এসো আজ খৃস্টান, এসো হে ব্রাক্ষ্মণ, শুচি করি মন, ধরো হে সবার হাত। এস হে পতিত, করো অপনয়, করো হে সব লাজ ভয় দূর— দুর্গম পথেরে, দুঃসহ দুঃখেরে, করি যাত্রা আরম্ভণ। সবাইরে নিয়ে চলো হে মোদের পুণ্যতীর্থ-উদ্দেশে, হেথায় সবারে হবে মিলিবারে আনত শিরে। এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে॥

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

মূলভাব: "ভারততীর্থ" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনন্য দেশাত্মবোধক ও মানবতাবাদী কবিতা। কবি ভারতবর্ষকে কল্পনা করেছেন এক মহামানবের সাগরতীর হিসেবে—যেখানে যুগে যুগে নানা জাতি, ধর্ম, বর্ণের মানুষ এসে মিলিত হয়েছে। আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, শক, হুন, পাঠান, মোঘল—সবাই এক দেহে লীন হয়েছে। পশ্চিমের দ্বার খুলে এসেছে ইংরেজ, খৃস্টান। কবির আহ্বান—সব বাধা-বিঘ্ন ভেঙে, সব লাজ-ভয় দূর করে সকলে মিলিত হোক এই পুণ্যতীর্থে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়েও এদেশ জেগেছে নবীন জাগরণে। কবির স্বপ্ন—সবারে নিয়ে চলো পুণ্যতীর্থ-উদ্দেশে, যেখানে সবার হবে মিলিবারে আনত শিরে।

কেন্দ্রীয় চেতনা: ভারতবর্ষ কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়, এটি একটি মহামিলনক্ষেত্র বা তীর্থস্থান—যেখানে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষ এসে একাকার হয়ে গেছে। এই মিলন ও সম্প্রীতির বাণীই ভারততীর্থের প্রকৃত সুর।

পাঠ-পরিচিতি প্রশ্নোত্তর

Q কবিতায় কোন কোন জাতি ও সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে?
কবিতায় আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, শক, হুন, পাঠান, মোঘল, ইংরেজ, খৃস্টান, হিন্দু, মুসলমান, ব্রাক্ষ্মণ, পতিত প্রভৃতি জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের উল্লেখ আছে। কবি দেখিয়েছেন, সবাই ভারতে এসে একাকার হয়ে গেছে এবং ভারতবর্ষ তাদের সকলের মিলনস্থল।

১৩. প্রতিশব্দ লেখো

শব্দপ্রতিশব্দ (সমার্থক)
সাগরসমুদ্র, জলধি, অর্ণব, বারিধি, সিন্ধু
ধরিত্রীপৃথিবী, ধরা, ভূমি, মেদিনী, বসুন্ধরা
ভূধরপৃথিবী, ধরণী, ধরা, ক্ষিতি
হিয়াহৃদয়, মন, অন্তর, বুক, চিত্ত
রজনীরাত, নিশি, যামিনী, শর্বরী, বিভাবরী
নীরজল, বারি, সলিল, পানি, উদক

১৬. 'শালা' পদযুক্ত শব্দ

১৬ 'শালা' শব্দের একটি অর্থ গৃহ, আগার। 'যন্ত্রশালা'র অনুরূপ 'শালা' পদযুক্ত আরও পাঁচটি শব্দ লেখো।
  • পাঠশালা — পাঠ করার গৃহ (বিদ্যালয়)
  • চিত্রশালা — ছবি রাখার গৃহ
  • ভোজনশালা — খাবার খাওয়ার ঘর
  • শয়নশালা — শোয়ার ঘর
  • পূজাশালা — পূজা করার গৃহ
  • চিকিৎসাশালা — চিকিৎসার স্থান

১৭. পদ্যাংশগুলিকে গদ্য বাক্যে লেখো

ক্রমিকপদ্যাংশগদ্য বাক্য
১৭.১দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে, সমুদ্র হল হারা।কোথা থেকে অজস্র মানুষের স্রোত দুর্বার বেগে এসে সমুদ্রকেও যেন হার মানিয়ে দিল।
১৭.২উদার ছন্দে পরমানে বন্দনা করি তাঁরে।উদার ছন্দ ও পরম সম্মানের সঙ্গে তাঁর বন্দনা করি।
১৭.৩হৃদয়তন্ত্রে উঠিল রণরিণি।হৃদয়ের বীণাতন্ত্রীতে যুদ্ধের রিনি-ঝংকার ধ্বনি বেজে উঠল।
১৭.৪হেথায় নিত্য হেরা পবিত্র ধরিত্রীরে।এখানে সর্বদা পবিত্র পৃথিবীকে দেখো।
১৭.৫হেথায় সবারে হবে মিলিবারে আনত শিরে।এখানে সবাইকে মাথা নত করে মিলিত হতে হবে।

১৮. বিশেষ্য ↔ বিশেষণ পরিবর্তন

মূল শব্দপ্রকাররূপান্তরপ্রকার
চিত্তবিশেষ্যচিত্তাকর্ষকবিশেষণ
পুণ্যবিশেষণপুণ্যতাবিশেষ্য
পবিত্রবিশেষণপবিত্রতাবিশেষ্য
একবিশেষণএকতাবিশেষ্য
দ্বারবিশেষ্যদ্বারস্থবিশেষণ
বিচিত্রবিশেষণবিচিত্রতাবিশেষ্য
তপস্যাবিশেষ্যতপস্বীবিশেষণ
দুঃখবিশেষ্যদুঃখিতবিশেষণ
জয়বিশেষ্যজয়ীবিশেষণ
জন্মবিশেষ্যজন্মগতবিশেষণ
শুচিবিশেষণশুচিতাবিশেষ্য
লাজবিশেষ্যলজ্জিতবিশেষণ

১৯. সন্ধি বিচ্ছেদ করো

শব্দসন্ধি বিচ্ছেদসন্ধির নিয়ম
পরমানেপরম + মানেস্বরসন্ধি
দুর্বারদুঃ + বারবিসর্গসন্ধি (ঃ + ব = র্ব)
ওংকারওঁ + কারব্যঞ্জনসন্ধি
হোমানলহোম + অনলস্বরসন্ধি
দুঃসহদুঃ + সহবিসর্গসন্ধি (ঃ + স = স্স)

২০. বিপরীতার্থক শব্দ লেখো

শব্দবিপরীতার্থক শব্দ
পুণ্যপাপ
ধীরঅধীর / চঞ্চল
ধৃতমুক্ত / পরিত্যক্ত
আহ্বানপ্রত্যাখ্যান / বিদায়
দুর্বারপ্রতিহত / রুদ্ধ
বিচিত্রএকঘেয়ে / সাধারণ
ভয়সাহস / নির্ভীকতা
অপমানসম্মান / গৌরব
বিপুলঅল্প / সীমিত
ভরাশূন্য / খালি

কবিতা থেকে শিক্ষা

মনে রেখো: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "ভারততীর্থ" কবিতা আমাদের শেখায়—ভারতবর্ষ কোনো সাধারণ দেশ নয়, এটি এক মহামিলনের তীর্থস্থান। এখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এসেছে, মিশেছে এবং এক হয়েছে। এই সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা ও একতার বাণীই ভারতের প্রকৃত আত্মপরিচয়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'ভারততীর্থ' কবিতাটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) রচিত। এটি তাঁর 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে, যার জন্য তিনি ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের অষ্টম পাঠের অন্তর্ভুক্ত।

'ভারততীর্থ' কবিতার মূলভাব হলো—ভারতবর্ষ এক মহামিলনের পুণ্যতীর্থ। যুগে যুগে আর্য-অনার্য, হিন্দু-মুসলমান, ইংরেজ-খৃস্টান, ব্রাক্ষ্মণ-পতিত সবাই এখানে এসে একাকার হয়ে গেছে। কবির আহ্বান—সব ভেদাভেদ ভুলে সকলের মিলিত হওয়া, আর এই মিলনক্ষেত্রেই ভারতের প্রকৃত পরিচয়। এটি বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মানবধর্মের জয়গান।

কবিতায় আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, শক, হুন, পাঠান, মোঘল, ইংরেজ, খৃস্টান, হিন্দু, মুসলমান, ব্রাক্ষ্মণ ও পতিত—এই সব জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে। কবি দেখিয়েছেন এরা সকলেই ভারতের মহামিলনাঙ্গনে এসে এক হয়ে গেছে।