দিন ফুরোলে
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • নবম পাঠ
কবিতা
দিন ফুরোলে
কবি
শঙ্খ ঘোষ
পাঠ
নবম পাঠ (সাহিত্য মেলা)
ধরন
শৈশব ও প্রকৃতি বিষয়ক
সম্পূর্ণ কবিতা
দিন ফুরোলে✍️ দিন ফুরোলে
কবিতার সারাংশ ও মূলভাব
মূলভাব: "দিন ফুরোলে" কবিতাটি একদল কিশোর-কিশোরীর গোধূলিবেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত। সারাদিন খেলাধুলা করে সন্ধ্যার সময় যখন সূর্য ডুবে যায়, তখন আকাশ জুড়ে রঙের যে বিপুল সমারোহ ঘটে—লক্ষ-অযুত রঙের বান ডাকে—সেই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয় না তাদের। কারণ তখনই তাদের তাড়া লাগে বাড়ি ফেরার—বাবা-মা বকবেন, তাই তাড়াতাড়ি পা ধুয়ে, গা মুছে ঘরে ঢুকতে হবে। খেলার আনন্দ শেষে ঘরে ফেরার এই অনিচ্ছা, বকুনির ভয় আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে না পারার আক্ষেপ—এই নিয়েই কবিতাটি রচিত।
কেন্দ্রীয় চেতনা: শৈশবের সরল আনন্দ আর দায়িত্বের টানাপোড়েনের মধ্যে এক অপূর্ব মাধুর্য আছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপেক্ষা করে ফিরে আসতে হয় বাস্তবে।
১. কবিতাটির 'ছ' টি শব্দার্থ ও বাক্য রচনা
বাক্য: খেলা ফুরোলে সবাই বাড়ি চলে গেল।
বাক্য: আকাশে অযুত তারা মিটমিট করে জ্বলছে।
বাক্য: রামধনুতে নিরেট সাতটি রঙ দেখা যায়।
বাক্য: রঙের বান্নি দেখে মনটা আনন্দে ভরে গেল।
বাক্য: সারাদিন হাঁটতে হাঁটতে আমার ঠ্যাং ধরে এসেছে।
বাক্য: দেরি করলেই মা মুচ্ছা যাবেন।
২. ছকটি সম্পূর্ণ করো
| শব্দ | বিশেষণ | বিশেষ্য |
|---|---|---|
| লক্ষ | লক্ষ (সংখ্যাবাচক বিশেষণ) | রঙ |
| নিরেট | নিরেট (গুণবাচক বিশেষণ) | রঙ |
| অযুত | অযুত (সংখ্যাবাচক বিশেষণ) | রঙ |
| এক গঙ্গা | এক গঙ্গা (পরিমাণবাচক বিশেষণ) | জল |
| এক আকাশ | এক আকাশ (পরিমাণবাচক বিশেষণ) | ধুলো |
| মনখারাপের | মনখারাপের (সম্বন্ধবাচক বিশেষণ) | গর্ত |
৩. 'লক্ষ' শব্দটির দুই পৃথক অর্থে বাক্য
অর্থ ১: 'লক্ষ' (লাখ) — সংখ্যা, ১,০০,০০০
বাক্য: গ্রামের মেলায় লক্ষ লক্ষ লোক সমাগম হয়েছিল।
অর্থ ২: 'লক্ষ' (লক্ষ্য) — উদ্দেশ্য, নজর, মনোযোগ
বাক্য: পড়াশোনায় লক্ষ রেখে চলতে হবে।
পার্থক্য সহ নতুন বাক্য: তার জীবনের লক্ষ (লক্ষ্য) ছিল এমন কিছু করা যাতে লক্ষ (লাখ) মানুষ উপকৃত হয়।
৪. বাম ও ডান দিক মিলিয়ে শব্দবন্ধ তৈরি করো
| বাম দিক | ডান দিক | শব্দবন্ধ | অর্থ |
|---|---|---|---|
| এক মাথা | চিনি | এক মাথা চিনি | প্রচুর চিন্তার বোঝা |
| এক ক্লাস | তারা | এক ক্লাস তারা | শ্রেষ্ঠ ছাত্রছাত্রী |
| আম | পায়েস | এক কাঁড়া পায়েস | বিপুল আয়োজন |
| এক আকাশ | ধুলো | এক আকাশ ধুলো | সারা গায়ে প্রচুর ধুলো |
| এক ঘর | ধান | এক ঘর ধান | প্রচুর ধান, প্রাচুর্য |
| এক কাঁড়া | হাসি | এক কাঁড়া হাসি | প্রচুর হাসি |
| এক ঝুড়ি | ছাত | এক ঝুড়ি ছাত | প্রচুর ছাত (ছত্রাক) |
| এক হাঁড়ি | জল | এক হাঁড়ি জল | একটি হাঁড়ি ভর্তি জল |
| এক মুঠো | টাকা | এক মুঠো টাকা | হাত ভর্তি টাকা |
| এক মুখ | লোক | এক মুখ লোক | প্রচুর লোক |
| এক কাহন | গল্প | এক কাহন গল্প | বহু গল্প, গল্পের ঝুলি |
৫. বিশেষ্যের আগে উপযুক্ত বিশেষণ বসিয়ে বাক্য রচনা
- লাল সূর্য: লাল সূর্য ধীরে ধীরে পাটে নামছে।
- অপরূপ দৃশ্য: সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল।
- রঙিন বান্নি: আকাশ জুড়ে রঙিন বান্নি নেমেছে।
- ব্যস্ত বাপ-মা: ব্যস্ত বাপ-মা সন্তানের জন্য সময় পান না।
- অন্ধকার গর্ত: সাপটা অন্ধকার গর্তে ঢুকে গেল।
- ক্লান্ত ঠ্যাং: ক্লান্ত ঠ্যাং নিয়ে আর হাঁটা যায় না।
- লাল গাদা: বাগানে লাল গাদা ফুল ফুটেছে।
- ছোট্ট ঘর: আমাদের ছোট্ট ঘরটি খুব সুন্দর।
- সোনালি ধান: ক্ষেতে সোনালি ধান দুলছে।
- স্বচ্ছ জল: নদীর স্বচ্ছ জলে মাছ দেখা যায়।
৬. সমার্থক শব্দ কবিতা থেকে খুঁজে বের করো
| প্রদত্ত শব্দ | সমার্থক শব্দ (কবিতা থেকে) |
|---|---|
| বারি | জল |
| অরুণ | সূর্য |
| অম্বর | আকাশ |
| পেটিকা | বাসা (পেটিকা = পেটি, বাক্স → বাসস্থান অর্থে বাসা) |
| অজ্ঞান | মুচ্ছা (মূর্ছা → জ্ঞান হারানো অর্থে) |
| গোছা | কাঁড়া (গোছা = আঁটি, কাঁড়া = গুচ্ছ) |
| বিবাদ | বকুনি (বিবাদ = ঝগড়া, বাবা-মায়ের বকা অর্থে) |
| কন্দর | গর্ত |
| পা | ঠ্যাং |
| বিশ্রী | মনখারাপ (কিম্তিৎ → কুৎসিত, বিরাগ) |
৭. বিপরীতার্থক শব্দ কবিতা থেকে খুঁজে নাও
| প্রদত্ত শব্দ | বিপরীতার্থক শব্দ (কবিতা থেকে) |
|---|---|
| ভালো | মনখারাপ |
| মিথ্যা | নিরেট (নিরেট = খাঁটি, সত্য, অবিমিশ্র) |
| বাইরের | নিজের (নিজের নিজের = অন্তরের, ব্যক্তিগত) |
| বুড়ো | ছোট্ট/কিশোর (কবিতায় কথকরা কিশোর — 'বুড়ো'-র বিপরীত) |
| সুখী | মনখারাপ (মনখারাপ = দুঃখী) |
৮. কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করো
| বাক্যাংশ | পদ | কারক | বিভক্তি |
|---|---|---|---|
| চমকে দেবেন লক্ষ রঙের দৃশ্য। | লক্ষ রঙের দৃশ্য | কর্মকারক | শূন্য |
| বাপ মায়েরা যাবেই তবে মুচ্ছা। | বাপ মায়েরা | কর্তৃকারক | রা (বহুবচন) |
| কে-ই বা খুলে দেখেছে রঙের বান্নি। | রঙের বান্নি | কর্মকারক | শূন্য |
| নিজের নিজের মন খারাপের গর্ত্তে। | গর্ত্তে | অধিকরণ কারক | এ (সপ্তমী) |
| এক গঙ্গা জল দিয়ে তাই ধুয়ে পা। | জল দিয়ে | করণ কারক | দিয়ে (তৃতীয়া) |
৯. এক কথায় উত্তর দাও
10 টি১০. ব্যাখ্যা করো
4 টিতাৎপর্য: প্রকৃতির এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য এতই বিপুল যে কবি তাকে সংখ্যা দিয়ে মাপতে চেয়েও পারেননি—লক্ষ, অযুত, কত যে রঙ! এটি প্রকৃতির প্রাচুর্য ও সৌন্দর্যের অপরিমেয়তার প্রকাশ।
তাৎপর্য: \'চমকে দেওয়া\' ক্রিয়াটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—কারণ ছেলেমেয়েরা খেলা নিয়ে এতটাই মগ্ন যে আকাশের দিকে তাকানোর সময় তাদের নেই। কিন্তু প্রকৃতি চমকে দিয়ে, সজোরে ডেকে তাদের জানান দেয় তার উপস্থিতি—তবু তারা তা উপেক্ষা করে।
তাৎপর্য: কবি ভাষার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছেন—প্রকৃতির এই সৌন্দর্য সংখ্যাতীত, নিরেট, অপরিমেয়। বান্নি অর্থাৎ বান বা প্লাবন—রঙ যেন প্লাবনের মতো ভেসে আসছে। এতে প্রকৃতির অপার মহিমার প্রতি বিস্ময় প্রকাশ পেয়েছে।
তাৎপর্য: এই পঙ্ক্তিগুলো শৈশবের এক করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখার সময় নেই, কারণ দায়িত্ব ও বাস্তবতা টানে। \'মুচ্ছা\' অর্থে মূর্ছা যাওয়া—বাবা-মায়ের রাগ এতটাই প্রকট হবে যে তারা যেন জ্ঞান হারাবেন। অথচ শিশুমন জানতে চায়—সত্যিই কি কেউ কখনো খেলা ছেড়ে আকাশ দেখেছে? নেই। দায়িত্বই শেষ কথা।
১১. আট-দশটি বাক্যে উত্তর দাও
2 টিসূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশের দিকে নামছে—ঠিক যেন একটা লাল টকটকে বল ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে। আকাশের রং বদলাতে শুরু করল—প্রথমে হালকা হলুদ, তারপর কমলা, তারপর গাঢ় লাল, শেষে বেগুনি।
মনে হচ্ছিল যেন কেউ আকাশটাকে রঙিন ক্যানভাস বানিয়ে ছবি আঁকছে। শালিখ পাখির দল উড়ে যাচ্ছে নিজেদের বাসার দিকে—ঠিক যেন কবিতায় বলা হয়েছে, \'কাক-শালিখ সবই গেছে উড়ে বাসায়-বাসায় ফিরছে ডানা মেলে\'।
ধীরে ধীরে রঙ মিলিয়ে গেল, চারপাশে নেমে এল গাঢ় অন্ধকার। আকাশে একে একে তারা ফুটতে শুরু করল। তখনই মনে পড়ল শঙ্খ ঘোষের কবিতার কথা—কী অপরূপ দৃশ্য! আর কিশোর-কিশোরীরা সত্যিই হয়তো খেলার মাঠ ছেড়ে এই দৃশ্য দেখার সময় পায় না।
সন্ধ্যায় ঘরে ফেরাকে \'মনখারাপের গর্তে ফেরা\' বলা হয়েছে কারণ:
১) খেলার স্বাধীনতা শেষ হয়
২) বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দের সময় ফুরোয়
৩) দায়িত্ব আর বাস্তবতার জগতে ফিরে আসতে হয়
৪) বকুনি খাওয়ার ভয় থাকে
৫) আকাশের সুন্দর দৃশ্যটা উপভোগ করা হয় না
আমার নিজের অনুভূতি: ছোটবেলায় বিকেলে পাড়ার মাঠে যখন ক্রিকেট খেলতাম, সন্ধ্যা নামলেই বুকটা ধড়ফড় করত। বাড়ি ফিরতেই হবে—মা অপেক্ষা করছেন, বাবা বকবেন। খেলা ছেড়ে ওঠার সেই মুহূর্তটা ভারী কষ্টের হতো। রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় দেখতাম আকাশের রং বদলাচ্ছে, কিন্তু উপভোগ করার মতো মানসিক অবস্থা থাকত না। আবার পরের দিনের খেলার আশায় মনকে সান্ত্বনা দিতাম—ঠিক যেন চক্রাকারে ঘুরতাম \'মনখারাপের গর্ত\' থেকে বেরিয়ে আবার সেই গর্তেই ফিরতে হতো।