🌸 আজি দখিন দুয়ার খোলা
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • তৃতীয় পাঠ • গীতবিতান / স্বরবিতান
গান
আজি দখিন দুয়ার খোলা
রচয়িতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঋতু / বিষয়
বসন্ত আগমনী
পাঠ
তৃতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)
গানের সম্পূর্ণ কথা
বসন্তএসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।
দিব হৃদয়দোলায় দোলা,
এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো॥
এসো বাজায়ে ব্যাকুল বেণু
মেথে পিয়াল-ফুলের রেণু।
এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো॥
এসো বনমল্লিকাকুঞ্জে এসো হে, এসো হে, এসো হে।
মৃদু মধুর মদির হেসে এসো পাগল হাওয়ার দলে,
তোমার উত্তলা উত্তরীয় তুমি আকাশে উড়ায়ে দিয়ে—
এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো॥
গানের সারমর্ম ও মূলভাব
সারমর্ম: "আজি দখিন দুয়ার খোলা" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অপূর্ব বসন্ত-আগমনী গান। কবি অনুভব করছেন যে, আজ যেন দক্ষিণ দিকের দরজা খুলে গেছে—যে পথ দিয়ে বসন্ত আসে। তিনি ঋতুরাজ বসন্তকে বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন—"এসো হে, এসো হে, এসো হে" এই ধ্রুবপদের মাধ্যমে তাঁর অন্তরের ব্যাকুলতাই প্রকাশ পেয়েছে।
কবি বসন্তের জন্য পথ সাজাতে চান বকুল ফুলের পাপড়ি বিছিয়ে। চান, বসন্ত যেন বাঁশি বাজাতে বাজাতে পিয়াল ফুলের রেণু মেখে আসেন। ঘন নতুন কচি পাতায় ভরা ডালপালা, বনমল্লিকার বাগান—সবই বসন্তের জন্য প্রস্তুত। বসন্ত আসবে পাগল করা হাওয়ার দল নিয়ে, তাঁর দ্রুতগতির চাদর (উত্তরীয়) আকাশে উড়িয়ে দিয়ে—যেমন এক দিগ্বিজয়ী বীর বা প্রিয় অতিথি আসেন।
কেন্দ্রীয় চেতনা: বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেমন সেজে ওঠে, কচি পাতায়, ফুলে-ফলে ভরে যায়—তেমনই কবির মনও বসন্তকে স্বাগত জানাতে ব্যাকুল। এটি নিছক ঋতুবন্দনা নয়, বরং জীবনের নবচেতনা ও সৃষ্টির উল্লাসও।
পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ
গভীর ব্যাখ্যাপ্রথম স্তবক: আহ্বান
অর্থ: কবি বলছেন—আজ যেন দক্ষিণ দিকের দরজা খুলে গেছে। কেন? কারণ বসন্ত আসে দক্ষিণ দিক থেকেই। বসন্ত মানেই দখিনা বাতাস, ফুলের গন্ধ, কোকিলের ডাক। তাই দখিন-দুয়ার যেন বসন্তের আগমনের প্রতীকী দরজা। কবি ঋতুরাজ বসন্তকে ডেকে বলছেন—এসো, তোমায় আমি আমার হৃদয়ের দোলনায় দোল দেব। অর্থাৎ, শুধু প্রকৃতি নয়, আমার মনও তোমার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
দ্বিতীয় স্তবক: পথ সাজানো
অর্থ: হে বসন্ত, তুমি যেই পথ দিয়ে আসবে, আমি সেই পথ বকুল ফুল দিয়ে বিছিয়ে (বিছানা) রেখেছি। চারদিক এখন নতুন সবুজে (শ্যামল) শোভাময়। তুমি বাঁশি (বেণু) বাজাতে বাজাতে এসো, আর তোমার গায়ে মাখা থাকুক পিয়াল ফুলের রেণু (পরাগ)।
ভাব: বকুল ফুলের বিছানা মানে কোমলতা ও সৌন্দর্যের আদর। পিয়াল ফুলের রেণু বসন্তের আগমনে যে উচ্ছ্বাস, তা আরও তীব্র করে তুলেছে। বাঁশির সুর বাজতে থাকা মানে প্রকৃতিতে সঙ্গীতের জোয়ার আসা।
তৃতীয় স্তবক (প্রথম ভাগ): প্রস্তুতি
অর্থ: হে বসন্ত, তুমি এসো গাছের ঘন কচি পাতার (পুল্লব = পল্লব = পাতা) সমারোহে। এসো বনমল্লিকা (বেল-ফুলের মতো সুগন্ধি ফুল) ফোটা কুঞ্জবনে।
ভাব: সারা প্রকৃতি বসন্তের জন্য সেজে উঠেছে। ডালে ডালে কচি পাতার বাহার, বাগানে বাগানে ফুলের গন্ধ—সবই যেন বলছে, বসন্ত এসো! পল্লবপুঞ্জ বলতে শুধু পাতা না, নবজীবনের আভাসও বোঝায়।
তৃতীয় স্তবক (দ্বিতীয় ভাগ): বিজয়ীর বেশে আগমন
অর্থ: তুমি এসো মৃদু, মধুর, মাতাল (মদির) হাসি হেসে—আর পাগল করে দেওয়া বসন্তের হাওয়ার দল নিয়ে। তোমার দ্রুত-চঞ্চল (উত্তলা) চাদরখানা (উত্তরীয়) তুমি আকাশে উড়িয়ে দিয়ে এসো।
ভাব: এটি গানের সবচেয়ে গতিময় ও উদ্দাম অংশ। বসন্তকে এখানে কল্পনা করা হয়েছে এক দিগ্বিজয়ী রাজপুত্র বা বীরের মতো—যাঁর গায়ের চাদর বাতাসে সগর্বে উড়ছে। এই চিত্র বসন্তের প্রচণ্ড গতি ও উচ্ছ্বাসকে প্রকাশ করে। মৃদু হাসি আবার বসন্তের কোমল ও রোমান্টিক রূপ।