দুটি গানের জন্মকথা : কাজী নজরুলের গান

রামকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত 'কাজী নজরুলের গান' প্রবন্ধাংশের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ ও সমাধান | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

🎤 দুটি গানের জন্মকথা : কাজী নজরুলের গান

রামকুমার চট্টোপাধ্যায় আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • পঞ্চম পাঠ • মূল গ্রন্থ: পুরাতনী

নজরুলের গান স্বদেশি যুগ নেতাজি হারমোনিয়াম

রামকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২১ - ২০০৯)

বাংলা সংগীত জগতের প্রবাদ পুরুষ। দেশ-বিদেশে বিপুল খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পীর সংগীত সাধনার পীঠস্থান ছিল কলকাতা শহর। হারিয়ে যাওয়া বাংলা পুরাতনী গানকে তিনি নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন। এই পাঠ্যাংশটি তাঁর 'পুরাতনী' নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি পুরনো কলকাতা, তৎকালীন বাঙালি জীবন এবং নানা বিখ্যাত মানুষজনের স্মৃতিচারণ করেছেন।

📝

প্রবন্ধ

কাজী নজরুলের গান

👤

লেখক

রামকুমার চট্টোপাধ্যায়

📚

গ্রন্থ

পুরাতনী

🏫

পাঠ

পঞ্চম পাঠ (সাহিত্য মেলা)

প্রবন্ধাংশের সারাংশ ও মূলভাব

সারমর্ম: রামকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত এই স্মৃতিচারণমূলক রচনাটি স্বদেশি আন্দোলনের যুগের এক অমূল্য দলিল। লেখক তাঁর শৈশবের একটি দিনের কথা স্মরণ করছেন—যখন তিনি ইস্কুলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পথে শুনতে পেলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নাকি বিডন স্ট্রিটের কাছে সরকার বাগানে বক্তৃতা দিতে আসছেন! সেই সঙ্গে আরও খবর—কাজী নজরুল ইসলামও আসছেন!

উত্তেজনায় লেখকের ইস্কুলে যাওয়া হলো না। তিনি ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রথমে দেখলেন নেতাজিকে—"এক দেবদূত মঞ্চ আলো করে দাঁড়িয়ে আছেন।" তারপর এলেন নজরুল। নেতাজি স্বয়ং নজরুলকে দুই হাত তুলে প্রণাম করলেন—এ ছিল তখনকার স্বদেশি সভার রীতি। নজরুলের গান শেষে গোটা সভা তূর্য (স্তব্ধ) হয়ে গেল। লেখকের মনে হল, কাজীর গানে কী জাদু! হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে নজরুল গাইলেন—এ ছবি আজীবন লেখকের মনে গেঁথে গেল। গানের পর নেতাজির বক্তৃতা মনে না থাকলেও, নজরুলের সেই জাদুকরি গান ও দৃশ্য চোখ বুজলেই তিনি দেখতে পান।

কেন্দ্রীয় চেতনা: দেশপ্রেম, সঙ্গীতের অলৌকিক প্রভাব এবং দুই মহামানবের প্রতি এক কিশোরের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও বিস্ময়।

অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর

পাঠ্যাংশভিত্তিক
১ কাজী নজরুল ইসলাম ব্যতীত কোন মনীষীর নাম পাঠ্যাংশে খুঁজ পেলে?

পাঠ্যাংশে কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও আরও এক মহান মনীষীর নাম পাওয়া যায়। তিনি হলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তিনিও একই সভায় বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। লেখক বর্ণনা করেছেন—\'এক দেবদূত মঞ্চ আলো করে দাঁড়িয়ে আছেন\' বলতে নেতাজিকেই বোঝানো হয়েছে।

২ \'এই ছিল তখনকার কোনো স্বদেশি মিটিং-এর রীতি।\' — কোন রীতির কথা এখানে বলা হয়েছে?

এখানে যে রীতির কথা বলা হয়েছে তা হল—নেতাজির বক্তৃতার আগে কাজী নজরুল ইসলামের গান গাওয়া হত। লেখক বলেছেন, \'নেতাজির বক্তৃতার আগে নজরুলের গান হইতেই হইবে, এই ছিল তখনকার কোনো স্বদেশি মিটিং-এর রীতি।\' অর্থাৎ স্বদেশি সভায় প্রথমে নজরুলের দেশাত্মবোধক গান দিয়ে সভার আবহ সৃষ্টি হত, তারপর নেতাজি ভাষণ দিতেন।

৩ পাঠ্যাংশে কাকে, কেমন দেহসৌষ্ঠবের পরিচয় ধরা পড়েছে?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দেহসৌষ্ঠবের পরিচয় ধরা পড়েছে। লেখক লিখেছেন—\'গৌরবর্ণ, উন্নত ললাট, অতীব সুপুরুষ সেই ব্যক্তিটি\'—যিনি মঞ্চ আলো করে দাঁড়িয়েছিলেন। অর্থাৎ নেতাজি ছিলেন ফর্সা (গৌর), উঁচু কপালবিশিষ্ট ও অত্যন্ত সুন্দর চেহারার অধিকারী।

৪ টীকা লেখো: কাজী নজরুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বদেশি যুগ।

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬): বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি, ঔপন্যাসিক, গীতিকার, সুরকার। \'অগ্নিবীণা\', \'বিষের বাঁশি\', \'সাম্যবাদী\' তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। তিনিই বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫): ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অকুতোভয় নেতা। \'তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব\'—তাঁর অমর বাণী। আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক ও আজাদ হিন্দ সরকারের প্রতিষ্ঠাতা।

স্বদেশি যুগ: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের পর থেকে ভারতের স্বাধীনতা পর্যন্ত সময়কাল। এই সময় বিদেশি পণ্য বর্জন ও স্বদেশি জিনিসের ব্যবহার, মিছিল-সভা-সমিতি এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করা হত।

৫ কাজী নজরুল ইসলামের গান শুনে লেখকের মনে কোন অনুভূতির সৃষ্টি হলো? তখন তিনি কী করলেন?

কাজী নজরুলের গান শুনে লেখকের মনে গভীর আবেগ ও উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। তিনি লিখেছেন—\'গানের পর বক্তা কী বক্তৃতা দিলেন, তা আজ এত বছর পর মনে নেই। তবে মনে দেখলাম অত বড়ো বয়সেই আমার বুকের ভেতর টগবগ করে ফুটতে আরম্ভ করেছিল।\' অর্থাৎ সঙ্গীতের ঐন্দ্রজালিক প্রভাবে তিনি আপ্লুত হয়ে পড়েন।

তখন তিনি কী করলেন? \'ছুটতে ছুটতে বাড়িতে চলে এলাম।\'- উত্তেজনা-আবেগে আত্মহারা হয়ে তিনি রাস্তা দিয়ে ছুটে বাড়ি চলে যান এবং সেই মুহূর্তেই তাঁর প্রিয় সঙ্গী তবলাটি নিয়ে তবলার বোলে ডুবে যান। অর্থাৎ সঙ্গীতের প্রতি তাঁর প্রেম ও মুগ্ধতা আরও গভীর হয়।

৬ শিক্ষকের সাহায্য নিয়ে নীচের বিষয়গুলির মধ্যে কাজী নজরুলের লেখা কোন কোন গান খুঁজে লিখে লেখো: স্বদেশপ্রেম বিষয়ক; প্রকৃতি বিষয়ক; হাসির গান/ছড়ার গান; প্রেমের গান; ধর্মীয় অনুষঙ্গের গান।

নজরুলের গানের শ্রেণিবিভাগ:

  • স্বদেশপ্রেম বিষয়ক: \'কারার ঐ লৌহ কপাট\', \'চল চল চল\', \'দুর্গম গিরি কান্তার মরু\'।
  • প্রকৃতি বিষয়ক: \'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে\', \'আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে\'।
  • হাসির গান/ছড়ার গান: \'মাগো আমরা তোমার মাইকেল\', \'আমি চিনি গো চিনি তোমারে\'।
  • প্রেমের গান: \'মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী\', \'তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি\'।
  • ধর্মীয় অনুষঙ্গের গান: \'রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ\', \'মোহররমের মাতম জাগে\'।

শব্দার্থ ও টীকা

শব্দঅর্থ
স্বদেশি মিটিংস্বদেশি আন্দোলনের সময় যে সভা হত; দেশের স্বাধীনতা ও স্বদেশি জিনিস প্রচারের সভা।
বিডন স্ট্রিটভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা রাসবিহারী বসুর সঙ্গে সম্পর্কিত কলকাতার একটি ঐতিহাসিক রাস্তা।
সরকার বাগানকলকাতার একটি ঐতিহাসিক ময়দান/উদ্যান, যেখানে বহু রাজনৈতিক সভা ও সমাবেশ হত।
টগবগউত্তেজনায় দ্রুত হৃৎস্পন্দন; বুক ধুকপুক করা।
দেবদূতস্বর্গীয় দূত; অপূর্ব সুন্দর চেহারা বোঝাতে নেতাজির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত।
গৌরবর্ণফর্সা রঙ (Fair complexion); উজ্জ্বল ত্বক।
উন্নত ললাটউঁচু কপাল; বুদ্ধিমত্তা ও তেজের লক্ষণ।
অতীব সুপুরুষঅত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ।
তূর্যস্তব্ধ, নিস্তব্ধ, একেবারে চুপ।
হারমোনিয়ামএকটি বাদ্যযন্ত্র, যাতে হাত দিয়ে হাপ তৈরি করে কী-বোর্ড বাজানো হয়।
তবলাভারতীয় তালবাদ্য, যার দুটি অংশ—বাঁয়া ও ডাইনা।

স্মৃতির অমরতা

রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এই স্মৃতিচারণ আমাদের এক স্বর্ণালী অতীতে নিয়ে যায়—যখন দেশপ্রেম, সঙ্গীত ও বাগ্মিতা একাকার হয়ে যেত। একমঞ্চে দুই মহামানব—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলাম—এর দেখা মেলা সত্যিই জীবনস্মৃতি হয়ে থাকে। লেখকের বর্ণনায় আমরা বুঝি, কীভাবে নজরুলের গান কেবল বিনোদন নয়, বরং এক জাগরণী শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

\'কাজী নজরুলের গান\' (দুটি গানের জন্মকথা) প্রবন্ধাংশটি বাংলা সংগীত জগতের প্রখ্যাত শিল্পী রামকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২১-২০০৯) রচিত। এটি তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ \'পুরাতনী\' থেকে নেওয়া হয়েছে, যা WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের পঞ্চম পাঠে অন্তর্ভুক্ত। রচনাটিতে স্বদেশি যুগের এক স্মরণীয় দিনের বর্ণনা রয়েছে।

স্বদেশি আন্দোলনের সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলাম একসঙ্গে বহু সভায় অংশগ্রহণ করতেন। রীতি ছিল—সভার শুরুতে প্রথমে নজরুল তাঁর অগ্নিঝরা দেশাত্মবোধক গান গেয়ে জনতার মনে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিতেন, তারপর নেতাজি তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন। লেখকের বর্ণনায়, নজরুলের গান শুনে সভা একেবারে স্তব্ধ (তূর্য) হয়ে যেত—এতটাই তার প্রভাব ছিল।