মম চিত্তে নিতি নৃত্যে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'মম চিত্তে নিতি নৃত্যে' গানটির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা, পঙ্ক্তি-বিশ্লেষণ ও মর্মার্থ | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

🎭 মম চিত্তে নিতি নৃত্যে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান (বিচিত্র পর্যায়)

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • প্রথম পাঠ • গীতবিতান / স্বরবিতান

নৃত্য ও সৃষ্টি জীবন-মৃত্যুর খেলা আনন্দ মুক্তি ও বন্ধ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ - ১৯৪১)

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব; কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী এবং দার্শনিক। এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী (সাহিত্যে, ১৯১৩)। তাঁর রচিত দুই হাজারেরও অধিক গান 'গীতবিতান' নামের গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে এবং গানগুলির স্বরলিপি 'স্বরবিতান' নামের বইয়ে বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশিত। 'মম চিত্তে নিতি নৃত্যে' গানটি গীতবিতানের 'বিচিত্র' পর্যায়ভুক্ত।

🎵

গান

মম চিত্তে নিতি নৃত্যে

👑

রচয়িতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

📚

গ্রন্থ

গীতবিতান (বিচিত্র পর্যায়)

🏫

পাঠক্রম

প্রথম পাঠ (সাহিত্য মেলা)

গানের সম্পূর্ণ কথা

বিচিত্র পর্যায়
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে কে নাচে
তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।
তারি সঙ্গে কী মধুরে সদা বাজে
তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।
হাসি কান্না হীরাপান্না দোলে ভালে,
কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে।
নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে
তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।
কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ,
চিদানন্দ-নাচে মুক্তি, নাচে বন্ধ—
সে ভরঙ্গ ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে
তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।
— গীতবিতান, বিচিত্র পর্যায় | স্বরলিপি: স্বরবিতান

গানের সারমর্ম ও মূলভাব

সারমর্ম: "মম চিত্তে নিতি নৃত্যে" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গান। কবি এখানে সমগ্র বিশ্বজগৎকে এক মহা-নাট্যমঞ্চ হিসেবে কল্পনা করেছেন। তিনি অনুভব করেন, তাঁর অন্তরে (চিত্তে) প্রতিনিয়ত কে যেন এক মহাজাগতিক নৃত্য পরিবেশন করছে। সেই নৃত্য এতই সংক্রামক যে হাসি-কান্না, ভালো-মন্দ, জন্ম-মৃত্যু, এমনকি মুক্তি ও বন্ধন—সবকিছুই সেই একই তালে, ছন্দে নেচে চলেছে। "তা তা থৈ থৈ" ধ্বনিটি নৃত্যের তাল ও বাদ্যের বোল, যা গোটা অস্তিত্বের ছন্দময়তাকে প্রকাশ করে।

কেন্দ্রীয় চেতনা: সমগ্র বিশ্ব এক মহানটের (পরম সত্তা) লীলাভূমি। জীবনের সব দ্বন্দ্ব—সুখ-দুঃখ, জন্ম-মৃত্যু, মুক্তি-বন্ধন—আসলে সেই একই ঐশ্বরিক নৃত্যের বিভিন্ন ভঙ্গিমা মাত্র। এই সত্য উপলব্ধি করলে অন্তরে পরম আনন্দ জাগে যা "চিদানন্দ" বা বিশুদ্ধ চৈতন্যময় আনন্দ।

পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ

গভীর ব্যাখ্যা

প্রথম স্তবক: নৃত্য আরম্ভ

"মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে কে নাচে / তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।"

অর্থ: কবি বলছেন—আমার চিত্তে (হৃদয়ে বা অন্তরে) প্রতিনিয়ত (নিতি) নৃত্যের তালে কে যেন নাচছে! "তা তা থৈ থৈ" নৃত্যের বোল (তবলা বা পাখোয়াজের বোল) ধ্বনিত হচ্ছে। এটি নিছক শব্দ নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টির ছন্দময়তাকে প্রকাশ করছে।

ভাব: কবি নিজেকে নিছক দেহ বা মন হিসেবে না দেখে, সমগ্র সৃষ্টির এক অংশ হিসেবে উপলব্ধি করছেন। তাঁর অন্তরাত্মার গভীরে যে নৃত্য চলছে, তা আসলে বিশ্বচরাচরের ছন্দ ও স্পন্দনেরই প্রতিধ্বনি।

দ্বিতীয় চরণ: সঙ্গীতের আবাহন

"তারি সঙ্গে কী মধুরে সদা বাজে / তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।"

অর্থ: সেই নৃত্যের সঙ্গেই কী মধুর সুরে বাজনা বাজছে! বাদ্যযন্ত্রের মাধুর্যময় ধ্বনি অনবরত ধ্বনিত হচ্ছে।

ভাব: নৃত্য ও সঙ্গীত একে অপরের পরিপূরক। কবির অন্তরের সেই মহাজাগতিক নৃত্য কখনো নিঃশব্দ নয়; তার সাথে রয়েছে এক মধুর সঙ্গীতের সম্মিলন। এই সঙ্গীত ও নৃত্য মিলেই সৃষ্টি হচ্ছে বিশ্বের সমস্ত গতি-প্রকৃতি।

দ্বন্দ্বের সম্মিলন

"হাসি কান্না হীরাপান্না দোলে ভালে, / কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে।"

অর্থ: হাসি-কান্না, হীরা-পান্না (মূল্যবান রত্ন)—জীবনের সব বৈপরীত্য ও মূল্যবান অভিজ্ঞতা ভালোভাবে কপালে (ভালে) দোল খাচ্ছে। অর্থাৎ, এগুলি সবই নৃত্যের ছন্দে কাঁপছে বা আন্দোলিত হচ্ছে।

ভাব: জীবনে যত ধরনের দ্বন্দ্ব আছে—আনন্দ-বেদনা, লাভ-ক্ষতি, সৌন্দর্য-কদর্য—সবই একই মহা নৃত্যের অংশ। কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়, সবই তালবদ্ধ। জীবন সুখ-দুঃখের এক ছন্দময় সমাহার।

জন্ম-মৃত্যুর নৃত্য

"নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে / তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।"

অর্থ: জন্ম নাচছে, আবার পাছে পাছে (পিছু পিছু) মৃত্যুও নাচছে। অর্থাৎ জন্ম ও মৃত্যু একে অপরের অনুগামী হয়ে একই ছন্দে আন্দোলিত হচ্ছে। একটি আসে, অন্যটি যায় এই একই তালে।

ভাব: জন্ম-মৃত্যুকে আমরা সাধারণত চরম বিপরীত মনে করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখাচ্ছেন যে, এই দুটিও মহাজাগতিক নৃত্যেরই অঙ্গ। জন্ম যেমন নৃত্যের মতো স্বাভাবিক ও সুন্দর, মৃত্যুও তেমনই ছন্দোময়। জীবন ও মৃত্যু মিলেই অস্তিত্বের পূর্ণতা।

দ্বিতীয় স্তবক: পরম আনন্দ

"কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ, / চিদানন্দ-নাচে মুক্তি, নাচে বন্ধ—"

অর্থ: কী অপার আনন্দ! "চিদানন্দ" (চিৎ + আনন্দ = শুদ্ধ চৈতন্যের আনন্দ) রূপে সেই পরমসত্তা নাচছেন—একই সঙ্গে মুক্তিও নাচছে, বন্ধনও নাচছে। অর্থাৎ, মোক্ষ ও বন্ধন দুটোই এক অখণ্ড সত্তার প্রকাশ।

ভাব: এটিই গানের আধ্যাত্মিক চরম শিখর। "চিদানন্দ" হল ব্রহ্ম বা পরমাত্মা। সেই সত্তাই মুক্তির রূপেও নাচেন, আবার মায়ার বন্ধনের রূপেও নাচেন। আসলে এই দুইয়ের ভেদ শুধু দৃষ্টিভঙ্গির। একবার এই তত্ত্ব বুঝতে পারলে অন্তরে শুদ্ধ আনন্দের সঞ্চার হয়।

চরম উপলব্ধি

"সে ভরঙ্গ ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে / তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ।"

অর্থ: তিনি (সেই পরমসত্তা) নানা ভঙ্গিমায় (ভরঙ্গ) রঙ্গ করে (ক্রীড়া করে) ছুটে বেড়াচ্ছেন, আর আমি পিছু পিছু ছুটছি সেই একই তালে। "ভরঙ্গ ছুটি" মানে নৃত্যরত অবস্থায় দ্রুতগতিতে নানা ভঙ্গিতে বিচরণ।

ভাব: কবি নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন সেই মহাজাগতিক নর্তকের কাছে। তিনি আর স্বতন্ত্র "আমি" নন, বরং সেই অসীমেরই অংশ। তিনি পিছু পিছু ছুটছেন, কারণ তাঁর জীবন এখন সেই ঐশ্বরিক ছন্দেরই প্রতিধ্বনি। এটাই ভক্তি ও আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত প্রকাশ।

কেন এই গানটি গুরুত্বপূর্ণ?

"মম চিত্তে নিতি নৃত্যে" গানটি শুধু একটি সাধারণ গান নয়, এটি রবীন্দ্রনাথের গভীর অদ্বৈত দর্শন ও জীবনবাদের এক অপূর্ব সঙ্গীত-রূপ। এখানে "তা তা থৈ থৈ" ধ্বনিটি নৃত্যের বোল হলেও এর গূঢ়ার্থ অনেক গভীর—এটি সমগ্র সৃষ্টির আদি ছন্দ ও তালের প্রতীক। গানটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জীবন মানেই বিভাজন নয়, জীবন মানে সমস্ত বিপরীতের এক মহা-মিলন। যদি আমরা এই সত্য উপলব্ধি করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবনও এক পরম পদ্যময় নৃত্যে পরিণত হবে, যেখানে দুঃখও সুন্দর, মৃত্যুও মহিমান্বিত।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'মম চিত্তে নিতি নৃত্যে' গানটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) রচিত। এটি তাঁর 'গীতবিতান' গ্রন্থের 'বিচিত্র' পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকে (WBBSE) সংকলিত হয়েছে। গানটির স্বরলিপি 'স্বরবিতান' গ্রন্থে রয়েছে।

এই গানে কবি সমগ্র বিশ্বজগৎকে এক মহা-নাট্যমঞ্চ হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর অন্তরে প্রতিনিয়ত এক মহাজাগতিক নৃত্য চলছে। হাসি-কান্না, ভালো-মন্দ, জন্ম-মৃত্যু, এমনকি মুক্তি ও বন্ধন—সবই সেই একই তালে নেচে চলেছে। 'চিদানন্দ' বা বিশুদ্ধ চৈতন্যময় আনন্দই এই নৃত্যের মূল চালিকা শক্তি।

'তা তা থৈ থৈ' নৃত্যের বোল বা তালের ধ্বনি (তবলা/পাখোয়াজের বোল) যা সমগ্র গানে ধ্রুবপদের (Refrain) মতো বারবার ফিরে এসেছে। এটি শুধু বাদ্যের বোল নয়, বরং সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদি ছন্দ ও ছন্দোময়তাকে প্রকাশ করে। এর মাধ্যমেই কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু এই একই তালে আন্দোলিত।