🪘 আছেন কোথায় স্বর্গপুরে
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • পঞ্চম পাঠ • লালন সমগ্র
গান
আছেন কোথায় স্বর্গপুরে
রচয়িতা
লালন ফকির
ধরন
বাউল / আধ্যাত্মিক গান
পাঠ
পঞ্চম পাঠ (সাহিত্য মেলা)
গানের সম্পূর্ণ কথা
লালন সমগ্রকেউ নাই তার ভেদ জানে।
কেন জিজ্ঞাসিলে খোদার কথা
দেখায় আশমানে॥
পৃথিবী গোলার শুনি
অহনিশি ঘোরে আপনি।
তাইতে হয় দিন-রজনী
জ্ঞানীগুণী তাই মানে॥
তার একদিকেতে নিশি হল
অন্যদিকে দিবা হয়।
আকাশ তো দেখে সকল
খোদা দেখে কয়জনে॥
আপন ঘরে কে কথা কয়
না জেনে আশমানে তাকায়।
লালন বলে কে বা কোথায়
বুঝিবে দিব্যজ্ঞানে॥
গানের সারমর্ম ও মূলভাব
সারমর্ম: "আছেন কোথায় স্বর্গপুরে" লালন ফকিরের এক গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক বাউল গান। গানটিতে লালন প্রশ্ন তুলেছেন—ঈশ্বর বা খোদা কোথায় থাকেন? মানুষ স্বর্গের কথা বলে, কিন্তু স্বর্গপুরে কেউ নেই যার ভেদ (রহস্য) জানে। জিজ্ঞাসা করলে সবাই কেবল আকাশের (আশমানে) দিকে আঙুল তুলে দেখায়।
লালন এরপর প্রকৃতির উদাহরণ দেন—পৃথিবীটাই তো গোল, আর তা অহর্নিশি ঘুরছে নিজে থেকেই (আপনি ঘোরে)। সেই আবর্তনেই দিন-রজনী হয়। জ্ঞানী-গুণীরা বিজ্ঞানের এই সত্য মানেন। কিন্তু আকাশ তো সবাই দেখে; অথচ প্রকৃত খোদা বা পরমসত্তাকে দেখে কয়জন?
শেষ স্তবকে লালন মূল মন্ত্র দেন—মানুষ \'আপন ঘরে\'-র খোঁজ না নিয়েই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। অথচ সত্য লুকিয়ে আছে নিজের অন্তরেই। তাই লালন বলেন—\'আপন ঘর\'-ই আসল স্বর্গপুর। এই রহস্য কেবল \'দিব্যজ্ঞান\'-এর মাধ্যমেই বোঝা যায়।
কেন্দ্রীয় চেতনা: খোদা বা ঈশ্বর বাইরে কোথাও নেই—তিনি আছেন মানুষের অন্তরের মধ্যে। \'আপন ঘর\' অর্থাৎ নিজের শরীর ও মনের মধ্যেই তাঁর সন্ধান করতে হবে।
পঙ্ক্তি-ভিত্তিক বিশ্লেষণ
গভীর ব্যাখ্যাপ্রথম স্তবক: স্বর্গের রহস্য
অর্থ: লালন প্রশ্ন করছেন—স্বর্গ কি সত্যিই আকাশের ওপারে কোথাও আছে? সেই স্বর্গপুরের রহস্য (ভেদ) আসলে কেউই জানে না। অথচ কেউ যখন খোদা বা ঈশ্বরের কথা জিজ্ঞাসা করে, তখন সবাই আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখায়।
ভাব: এখানে লালন গভীর ব্যঙ্গ করেছেন। বেশিরভাগ মানুষই না বুঝে, না জেনে বিশ্বাস করে যে, ঈশ্বর দূর আকাশে বা স্বর্গে থাকেন। কিন্তু লালনের মতে, এটি প্রকৃত জ্ঞান নয়—এ হল অন্ধবিশ্বাস।
দ্বিতীয় স্তবক: প্রকৃতির বিজ্ঞান
অর্থ: লালন বলছেন—পৃথিবী যে গোল, এ কথা তিনি শুনেছেন। আর এই পৃথিবী নিজে থেকেই (আপনি) অহর্নিশি (দিন-রাত) ঘুরছে। এই ঘূর্ণনের ফলেই দিন ও রাত্রি হয়। জ্ঞানী ও গুণী (বিজ্ঞানী) ব্যক্তিরা এই সত্যই স্বীকার করেন।
ভাব: এখানে লালন আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও সচেতনতা প্রকাশ করেছেন। কোপার্নিকাস-গ্যালিলিওর আবিষ্কৃত সত্য (পৃথিবী গোল এবং নিজ কক্ষে ঘোরে) তিনি সহজ ভাষায় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাঁর মূল বক্তব্য হল—বিজ্ঞান যতই জ্ঞান দিক, প্রকৃত আধ্যাত্মিক সত্য (খোদাকে দেখা) তার থেকেও গভীর।
তৃতীয় স্তবক: কয়জন খোদা দেখে?
অর্থ: পৃথিবী যখন ঘুরতে থাকে, তখন তার একদিকে রাত (নিশি) হয়, আর অন্যদিকে দিন (দিবা) হয়। এই আকাশ সকলেই দেখতে পায়—আকাশের দিকে তাকিয়ে সবাই চাঁদ, তারা, সূর্য দেখে। কিন্তু সত্যিকারের খোদা বা পরমাত্মাকে দেখে কয়জন?
ভাব: এখানে লালনের মূল প্রশ্ন প্রকাশ পেয়েছে। আকাশ দেখা খুব সোজা—চোখ থাকলেই হয়। কিন্তু খোদাকে দেখা চোখের ব্যাপার নয়—তা অন্তর্চক্ষুর ব্যাপার। যে চোখ দিয়ে সবাই দেখে, তা দিয়ে খোদাকে দেখা যায় না বলেই এত মানুষ থাকলেও প্রকৃত ঈশ্বর-দর্শনের অধিকারী বিরল।
চতুর্থ স্তবক: আপন ঘরের সন্ধান
অর্থ: \'আপন ঘর\' অর্থাৎ নিজের দেহ ও মনের ভেতর কে কথা কয় (কে বাস করে, কে সত্তা জাগ্রত)—তা না জেনেই সবাই দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। লালন শেষ প্রশ্ন রেখেছেন—সেই পরম সত্তা কে, আর তিনি কোথায় আছেন—তা কেবল \'দিব্যজ্ঞান\'-এর মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব।
ভাব: এটিই লালন দর্শনের নির্যাস। \'আপন ঘর\' বলতে তিনি নিজের দেহ ও আত্মাকে বোঝাচ্ছেন—যেখানে পরমাত্মা বা খোদা বাস করেন। এই সত্য সাধারণ বুদ্ধিতে ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে \'দিব্যজ্ঞান\'-এ। দিব্যজ্ঞান কাকে বলে? তা হল—সাধনার মাধ্যমে লব্ধ সেই অলৌকিক উপলব্ধি, যাতে মানুষ বুঝতে পারে খোদা বাইরে নয়, অন্তরেই।