খোকনের প্রথম ছবি

বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) রচিত 'খোকনের প্রথম ছবি' গল্পের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

খোকনের প্রথম ছবি

বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) গল্প

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • তৃতীয় পাঠ

ছোট্ট শিল্পী কল্পনার জগৎ প্রথম ছবি সৃষ্টিশীলতা

বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) — ১৮৯৯-১৯৭৯

'বনফুল' সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম। জন্ম বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারীতে। সারাভগঞ্জ স্কুলের পত্রিকার 'মালঞ্চ' ১৯১৫ সালে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এরপর 'প্রবাসী' ও 'ভারতী' পত্রিকায় তিনি 'বনফুল' ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। পাটনা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসক হয়ে পাশ করে তিনি দীর্ঘদিন ঝাড়খণ্ডে চাকরি করেন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস 'তৃণখণ্ড' মানসিক জীবনের গভীর বিশ্লেষণ। বাংলা সাহিত্যে তিনি শক্তিশালী ছোটোগল্পকার হিসেবে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভগ্নহৃদয়' তাঁকে কাব্যরচনায় অনুপ্রাণিত করেছিল। উল্লেখযোগ্য রচনা: 'স্থাবর', 'জঙ্গম', 'নষ্টমুখ', 'হারানবাজার', 'শ্রীমধুসূদন', 'বিদ্যাসাগর' প্রভৃতি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'জগত্তারিণী পদক' ও 'ডিলিট' উপাধি লাভ করেন।

📝

গল্প

খোকনের প্রথম ছবি

👤

লেখক

বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়)

📚

পাঠ

তৃতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

ছোটোগল্প (শিশুসাহিত্য)

গল্পের সারাংশ ও মূলভাব

গল্পের সারসংক্ষেপ: "খোকনের প্রথম ছবি" গল্পে লেখক বনফুল এক শিশুশিল্পী খোকনের ছবি আঁকার যাত্রা বর্ণনা করেছেন। খোকন ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসে। তার বাবার এক বন্ধু, যিনি একজন বিখ্যাত চিত্রকর, একদিন খোকনের আঁকা অনেক ছবি দেখে বলেন—"এগুলো তো নকল করা ছবি, তোর নিজের আঁকা ছবি কই?"

খোকন অবাক হয়ে যায়। নিজের আঁকা ছবি? তা কী করে আঁকবে? চিত্রকর তখন তাকে পরামর্শ দেন—"চোখ বুজে বসে কল্পনা কর, কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেল।"

এই পরামর্শ পেয়ে খোকন একদিন নিজের ঘরে চোখ বুজে বসে রইল। কিন্তু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। শেষ পর্যন্ত সে ঠিক করল এই অশ্বকারের (অন্ধকারের)ই ছবি আঁকবে। কাগজের উপর কালো রং আর তুলি নিয়ে শুরু করল আঁকতে। ড্রইং খাতার একটা পাতা কালো রঙে ভরে গেল।

তখন তার বাবা এসে দেখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন—"এটা কী রকম ছবি হল?" খোকন উত্তর দিল, "প্রকৃতি থেকে আঁকা।" তারপর হঠাৎ বাবা দেখতে পেলেন ওই কালোর মধ্যেই একটা মুখ আছে, চোখও আছে, অতি সুন্দর সেই চোখ।

মূলভাব: গল্পটির মূল শিক্ষা হলো—কল্পনাশক্তি ও সৃষ্টিশীলতাই প্রকৃত শিল্পের উৎস। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলেও শিল্পীর চোখ খুলে যায়। অন্ধকারের মধ্যেও যে আলো ও সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে, তা কল্পনার চোখেই ধরা পড়ে।

৫. নীচের আলাদা আলাদা বাক্যগুলি জুড়ে একটি বাক্য তৈরি করো

৫.১ খোকন বড় হয়েছে। ক্লাস টেনে পড়ে।

উত্তর: খোকন বড় হয়ে এখন ক্লাস টেনে পড়ে।

৫.২ খোকনের বাবার একজন বন্ধু বিখ্যাত চিত্রকর। তিনি লেক্সী শহরে থাকেন।

উত্তর: খোকনের বাবার যে বন্ধু বিখ্যাত চিত্রকর, তিনি লেক্সী শহরে থাকেন।

৫.৩ নিজের আঁকা ছবি? তা কী করে আঁকব?

উত্তর: নিজের আঁকা ছবি কী করে আঁকতে হয়, তা আমি জানি না।

৫.৪ চোখ বুজে বসে কল্পনা কর। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেল।

উত্তর: চোখ বুজে বসে কল্পনা করে যা দেখবে, সেটাই এঁকে ফেল।

৫.৫ তারপর হঠাৎ দেখতে পেল ওই কালোটার মধ্যে একটা মুখ আছে। চোখও আছে। অতি সুন্দর সেই চোখ।

উত্তর: তারপর হঠাৎ দেখতে পেল ওই কালোটার মধ্যে একটা মুখ এবং অতি সুন্দর চোখও আছে।

৬. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো

৪ টি
৬.১ 'ভিজুয়াল আর্টে' আমার প্রথম বর্ণপরিচয়'— শিল্পী খোকনের ছবির সঙ্গে প্রথম পরিচয় কীসের মাধ্যমে?

উত্তর: গল্পে বর্ণিত খোকনের ছবির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল তার বাবার বন্ধু, একজন বিখ্যাত চিত্রকরের মাধ্যমে। একদিন সেই চিত্রকর খোকনের আঁকা অনেকগুলি ছবি দেখেন। সেগুলি নিখুঁত ও সুন্দর হলেও তিনি বুঝতে পারেন যে এগুলি আসলে নকল করা ছবি। তখনই তিনি খোকনকে জিজ্ঞেস করেন—"এগুলো তো নকল করা ছবি, নিজের আঁকা ছবি কই?" এই প্রশ্নটিই খোকনের কাছে 'ভিজুয়াল আর্টে'র প্রকৃত বর্ণপরিচয় হয়ে ওঠে।

৬.২ 'নিজের আঁকা ছবি? তা কী করে আঁকব?' — খোকনের এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে চিত্রকর কী বলেছিলেন?

উত্তর: খোকনের এই প্রশ্নের উত্তরে চিত্রকর বলেছিলেন— "চোখ বুজে বসে কল্পনা কর। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেল।" অর্থাৎ, শুধু বাইরের জিনিস দেখে নকল করাই ছবি আঁকা নয়; বরং নিজের ভিতরের চোখ দিয়ে যা দেখা যায়, নিজের কল্পনাশক্তির দ্বারা যা অনুভব করা যায়, সেটাই আসল ছবি। এটি যে-কোনো শিশুর সৃষ্টিশীল মানসিকতার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

৬.৩ 'ড্রইং খাতার একটা পাতা কালো রঙে ভরে গেল।' — খোকন কেন পুরো পাতাটি কালো করে ফেলেছিল?

উত্তর: চিত্রকরের পরামর্শ মতো খোকন চোখ বুজে বসেছিল। কিন্তু অন্ধকার ছাড়া সে আর কিছুই দেখতে পেল না। তখন সে ভাবল, "চোখ বুজলে তো শুধু অন্ধকারই দেখা যায়! তাহলে এই অন্ধকারেরই ছবি আঁকা হোক না!" এই ভেবেই সে ঠিক করল অশ্বকারের (অন্ধকারের) ছবি আঁকবে। তাই সে কালো রং নিয়ে পুরো খাতার পাতাটি কালো করে ফেলেছিল। এর মধ্য দিয়ে গল্পকার দেখিয়েছেন যে খোকনের মনে সৃষ্টিশীল চিন্তা জেগেছে—সে নিজের কল্পনা ও অনুভূতিকে ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করতে শিখেছে।

৬.৪ 'ওই কালোটার মধ্যে তো একটা মুখ আছে। চোখও আছে। অতি সুন্দর সেই চোখ।' — বাবার এই উপলব্ধি কী অর্থ বহন করে?

উত্তর: খোকনের বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন যে ছেলেটি শুধু একটা পাতা কালো করে নষ্ট করেছে। কিন্তু পরে যখন তিনি মনোযোগ দিয়ে তাকান, দেখেন সেই কালোর গভীরে একটি মুখ, তার চোখ—যা অতি সুন্দর। বাবার এই উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে গল্পকার বুঝিয়েছেন যে—

১) সত্যিকারের শিল্পে গভীরতা থাকে: উপর থেকে দেখলে কিছু বোঝা যায় না, গভীরভাবে দেখতে জানলেই শিল্পের সৌন্দর্য ধরা পড়ে।

২) অন্ধকারেও আলো আছে: কালো অন্ধকার কোনো শূন্যতা নয়, তার মধ্যেও একটি মুখ, একটি জীবন্ত উপস্থিতি লুকিয়ে আছে।

৩) সৃষ্টির প্রথম পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ: খোকনের আঁকা এই কালো পাতাটিই ছিল তার প্রথম মৌলিক ছবি—যা শিল্পী হিসেবে তার যাত্রার সূচনা।

৭. গল্প থেকে দশটি ইংরেজি শব্দ খুঁজে লেখো

ক্রমিকইংরেজি শব্দবাংলা অর্থ
১ভিজুয়াল আর্টদৃশ্যকলা/চিত্রকলা
২ড্রইংছবি আঁকা
৩মাস্টারমশাইশিক্ষক মহাশয়
৪পেন্টিংচিত্রাঙ্কন
৫ল্যান্ডস্কেপপ্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি
৬কপিনকল
৭স্কেচরেখাচিত্র
৮পেন্সিলঅঙ্কনী/সিসিকাঠি
৯আর্টিস্টশিল্পী
১০ইমাজিনেশনকল্পনা

৮. 'প্রকৃতি থেকে?' — প্রশ্ন পরিবর্তন করো

৮ "খোকন জিজ্ঞেস করল—প্রকৃতি থেকে?" — এই প্রশ্নটিকে পরিবর্তন করে কীভাবে লেখা যায়?

পরিবর্তিত প্রশ্ন: "প্রকৃতি থেকে এঁকেছিস?"

অথবা: "তুই কি প্রকৃতি থেকে এঁকেছিস?"

অথবা: "এটা কি প্রকৃতি থেকে আঁকা হয়েছে?"

ব্যাখ্যা: গল্পে বাবা যখন খোকনের পুরো কালো পাতা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন এটা কী রকম ছবি, তখন খোকন উত্তর দেয় "প্রকৃতি থেকে"। বাবা দ্বিতীয়বার সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করেন—"প্রকৃতি থেকে?" এখানে একটি অসম্পূর্ণ প্রশ্ন করা হয়েছে যা পুরো বাক্যে রূপান্তর করা যায়।

৯. লেক্সী শহরটি কোথায়? সেখানকার একটি বিখ্যাত স্মৃতিসৌধের নাম লেখো

৯ লেক্সী শহর ও তার বিখ্যাত স্মৃতিসৌধ

উত্তর: লেক্সী শহরটি মিশর দেশে অবস্থিত। সেখানকার একটি বিখ্যাত স্মৃতিসৌধ হল পিরামিড (Pyramid)।

অতিরিক্ত তথ্য: গল্পে উল্লেখ আছে যে খোকনের বাবার এক বন্ধু, যিনি বিখ্যাত চিত্রকর, তিনি লেক্সী শহরে থাকেন। এটি আসলে মিশরের লুক্সর (Luxor) শহরকে বোঝায়, যা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনস্থল। লুক্সর শহরের কাছেই 'ভ্যালি অফ দ্য কিংস' ও কার্নাক মন্দিরের মতো বিখ্যাত স্থাপনা রয়েছে।

১০. ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই খোকনকে কীভাবে প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছিলেন?

১০ খোকনের ড্রইংয়ের মাস্টারমশাইয়ের শিক্ষাপদ্ধতি

উত্তর: খোকনের ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই তাকে শুধু বাইরের জিনিস দেখে নকল করতে শেখাতেন। তিনি খোকনের সামনে একটি ফুলদানি বা একটি আপেল রেখে বলতেন—"এটা দেখে এরকম হুবহু আঁকো।" অর্থাৎ, তিনি নিখুঁত নকল করাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন।

কিন্তু পরে যখন বিখ্যাত চিত্রকর (বাবার বন্ধু) আসেন, তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি শেখান। তিনি বলেন—"চোখ বুজে বসে কল্পনা করো, নিজের মনের চোখ দিয়ে দেখো।"

এই দুই শিক্ষকের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে: মাস্টারমশাই শেখান বাইরের দৃশ্যের অনুকরণ, আর চিত্রকর শেখান ভেতরের দৃষ্টি দিয়ে সৃষ্টি।

১১. প্রকৃতির দূরত্বের যে বদল হয় তা খোকন কীভাবে বুঝল?

১১ প্রকৃতির দূরত্ব বদল

উত্তর: চিত্রকরের পরামর্শ অনুযায়ী খোকন চোখ বুজে বসলে প্রথমে সে কিছুই দেখতে পায়নি, কেবল অন্ধকার। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল যে চোখ বুজে বসে থাকলেও প্রকৃতি দূরে যায় না, বরং কাছে চলে আসে। প্রকৃতির দূরত্ব বদল হয় চোখ বন্ধ করলেই—কারণ তখন বাইরের দৃষ্টি নিষ্ক্রিয় হয়ে ভেতরের দৃষ্টি জেগে ওঠে।

খোকন বুঝতে পারল যে প্রকৃতিকে শুধু চোখ মেলে দেখা যায় না, চোখ বুজেও অনুভব করা যায়। সেই অন্ধকারের মধ্যে সে তার মুখ, তার চোখ দেখতে পেল—যা ছিল তার নিজস্ব সৃষ্টির প্রথম প্রকাশ। প্রকৃতি এখানে দূরের কোনো কিছু নয়, বরং শিল্পীর নিজের মনের ভেতরেই প্রকৃতি অবস্থান করে এবং কল্পনার মাধ্যমে তা ফুটে ওঠে।

১২. দুই ক্ষেত্রে খোকনের 'অবাক' হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ

১২ 'অবাক হয়ে গেল' ও 'অবাক হয়ে চেয়ে রইল' — পার্থক্য ও কারণ বিশ্লেষণ

প্রথম 'অবাক': "খোকন অবাক হয়ে গেল" — এই অবাক হওয়ার কারণ ছিল চিত্রকরের প্রশ্ন শুনে। চিত্রকর যখন তার সব নিখুঁত নকল ছবি দেখেও বললেন "নিজের আঁকা ছবি কই?", তখন খোকন হতবাক হয়ে যায়। কারণ সে এতদিন ভাবত নকল করাই ছবি আঁকা। তার মনে হয়েছিল—নিজের আঁকা ছবি আবার কী জিনিস?

দ্বিতীয় 'অবাক': "অবাক হয়ে চেয়ে রইল খোকন" — এটি ঘটে যখন খোকনের বাবা তার কালো পাতার মধ্যে একটি মুখ ও সুন্দর চোখ দেখতে পান এবং খোকনকে জিজ্ঞেস করেন "প্রকৃতি থেকে?" তখন খোকন অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। কারণ সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারেনি যে তার আঁকা ওই কালো পাতার মধ্যে সত্যিই কোনো অর্থ, কোনো মুখ লুকিয়ে আছে। বাবার চোখ দিয়ে যখন সে তার নিজের সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখতে পায়, তখন সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়।

পার্থক্য: প্রথম অবাক হওয়াটি জিজ্ঞাসা ও বিভ্রান্তির, দ্বিতীয়টি আনন্দ ও বিস্ময়ের।

১৩. চিত্রকরের পরিচয় দাও এবং তাঁর উপদেশ কী?

১৩ চিত্রকরের পরিচয় ও খোকনকে উপদেশ

চিত্রকরের পরিচয়: বর্ণিত চিত্রকর ছিলেন খোকনের বাবার এক বন্ধু, যিনি একজন বিখ্যাত চিত্রকর। তিনি লেক্সী (লুক্সর) শহরে থাকেন। তিনি ছবি দেখে বুঝতে পারেন আসল ও নকলের পার্থক্য। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আধুনিক ও সৃষ্টিশীল।

তিনি খোকনকে যে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছিলেন তা হল:

"চোখ বুজে বসে কল্পনা কর। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেল।"

এই উপদেশের তাৎপর্য:

  • শিল্প শুধু বাইরের জিনিসের অনুকরণ নয়, তা আত্মার প্রকাশ।
  • নিজের কল্পনাশক্তি ও মনের চোখ ব্যবহার করতে হবে।
  • মনের চোখ দিয়ে দেখা জিনিসই প্রকৃত সৃষ্টি।
  • তিনি খোকনকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, শিল্পীকে আগে ভেতরে তাকাতে হবে।

১৪. কখন খোকন অশ্বকারের ছবি আঁকার সিদ্ধান্ত নিল? কী দেখতে পেল?

১৪ "এই অশ্বকারেরই ছবি আঁকব"

কখন সিদ্ধান্ত নিল: চিত্রকরের পরামর্শে খোকন চোখ বুজে বসে রইল। কিন্তু অনেকক্ষণ চোখ বুজে বসে থেকেও অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। তখনই সে ঠিক করল—"আমি তো শুধু অন্ধকারই দেখতে পাচ্ছি, তাহলে এই অশ্বকারের (অন্ধকারের)ই ছবি আঁকা হোক!"

এরপর কী ঘটল: সে কাগজের উপর কালো রং আর তুলি নিয়ে আঁকতে শুরু করল। পুরো ড্রইং খাতার একটি পাতা কালো রঙে ভরে গেল।

খোকন কী দেখতে পেল: প্রথমে সে শুধু কালোই দেখল। কিন্তু যখন তার বাবা এসে ওই কালো পাতার দিকে গভীরভাবে তাকালেন, তখন দেখা গেল ওই কালোটার মধ্যে একটি মুখ আছে, তাতে চোখও আছে এবং সেই চোখ অতি সুন্দর।

গুরুত্ব: এটাই ছিল খোকনের প্রথম মৌলিক ছবি—অন্ধকারের মধ্যেও যে একটি মুখ, একটি সত্তা, একটি সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তা খোকন তার সহজাত শিল্পীসত্তা দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছিল।

১৫. খোকনের প্রথম ছবি হিসেবে তুমি কোন ছবিটিকে স্বীকৃতি দেবে এবং কেন?

১৫ খোকনের প্রথম ছবি কোনটি বলে বিবেচিত হবে?

উত্তর: আমি অন্ধকারের (অশ্বকারের) ছবিটিকেই খোকনের প্রথম ছবি হিসেবে স্বীকৃতি দেব।

কারণ:

  1. মৌলিকতা: আগের সব ছবি ছিল অন্য জিনিস দেখে নকল করা। এটিই তার প্রথম নিজস্ব কল্পনা থেকে আঁকা ছবি।
  2. নিজস্ব অনুভূতি: এই ছবিতে সে তার নিজের চোখ-বন্ধ করা অনুভূতিকে প্রকাশ করেছে।
  3. সৃষ্টিশীলতা: অন্ধকারকেও ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া একটি অভিনব ভাবনা।
  4. দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: এই ছবির মাধ্যমেই খোকনের শিল্পীসত্তার প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়।
  5. আত্মপ্রকাশ: চিত্রকরের উপদেশ অনুযায়ী—"চোখ বুজে কল্পনা করে" সে যা দেখেছে, তাই এঁকেছে।

তাই, নকল করা ছবি নয়, নিজের মনের চোখ দিয়ে দেখা অন্ধকারের ছবিটিই খোকনের প্রকৃত প্রথম ছবি।

১৬. পাঁচজন সাহিত্যিকের ছদ্মনাম

প্রকৃত নামছদ্মনামকারণ
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়বনফুলনিজের আসল নাম গোপন রেখে সাহিত্যসৃষ্টি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরভানুসিংহবৈষ্ণব পদাবলী রচনার জন্য
প্রমথ চৌধুরীবীরবলরম্যরচনা ও প্রবন্ধের জন্য
কালীপ্রসন্ন সিংহহুতোম প্যাঁচাসমাজের সমালোচনা করতে চেয়েছিলেন
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়সুনন্দশিশুসাহিত্য রচনার জন্য
সাহিত্যিকেরা কেন ছদ্মনাম ব্যবহার করেন?

সাহিত্যিকেরা নানা কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করেন:

  • নাম গোপন: অনেক সাহিত্যিক নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে নির্ভয়ে সমাজ বা শাসকের সমালোচনা করেছেন।
  • ধরন অনুযায়ী: লেখার ধরন (হাস্যরস, শিশুসাহিত্য, ভক্তিমূলক) অনুযায়ী আলাদা ছদ্মনাম নেওয়া হয়।
  • সাহিত্যিক স্বাধীনতা: ছদ্মনামের আড়ালে থেকে সাহিত্যিক নির্দ্বিধায় তাঁর সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ করতে পারেন।
  • রহস্য সৃষ্টি: কিছু ক্ষেত্রে ছদ্মনাম পাঠকদের মধ্যে কৌতূহল ও রহস্যের সৃষ্টি করে।

১৭. তুমি বড় হয়ে সাহিত্যিক হলে কোন ছদ্মনাম ব্যবহার করবে এবং কেন?

১৭ নিজের ছদ্মনাম পরিকল্পনা

উত্তর:

আমি যদি বড় হয়ে সাহিত্যিক হই, তাহলে আমার ছদ্মনাম রাখব "প্রান্তিক"।

কারণ:

  • প্রান্তিক শব্দের অর্থ—সীমান্তের মানুষ, যিনি সমাজের ধারে থাকেন।
  • আমার ইচ্ছা সমাজের প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে লেখার, যাদের কথা সাধারণত কেউ বলে না।
  • এই ছদ্মনাম আমার সাহিত্যিক দর্শনকে প্রতিফলিত করবে—সবার জন্য লেখা, বিশেষ করে যারা অবহেলিত।
  • ছদ্মনামটি সংক্ষিপ্ত, মনে রাখা সহজ এবং এর মধ্যে একটি রহস্যও আছে।

বিকল্প উত্তর: আমি ছদ্মনাম রাখতে চাই "অরণ্যদূত"। কারণ, আমার লেখার বিষয় হবে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা। এই নামটির মাধ্যমে প্রকাশ পাবে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর বন্ধনের কথা।

১৮. দুই শিক্ষকের ছবি আঁকা শেখানোর পদ্ধতি তুলনা

১৮ দুই শিক্ষকের ভূমিকা—ড্রইং মাস্টারমশাই ও চিত্রকর

দুই শিক্ষকের তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

বিষয়ড্রইং মাস্টারমশাইবাবার বন্ধু চিত্রকর
শিক্ষা পদ্ধতিসামনে বস্তু রেখে হুবহু দেখে আঁকানোচোখ বুজে কল্পনা করে আঁকার কথা বলা
লক্ষ্যনিখুঁত নকল (কপি) করানোনিজস্ব সৃষ্টিশীলতা জাগানো
দৃষ্টিভঙ্গিবাইরের জিনিসের অনুকরণই শিল্পমনের চোখে দেখা, ভিতর থেকে তৈরি হওয়াই শিল্প
ফলাফলখোকন দক্ষ নকলিয়েতে পরিণত হয়েছিলখোকন মৌলিক শিল্পী হয়ে উঠতে শুরু করল
সীমাবদ্ধতাসৃষ্টিশীলতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে নাবাইরের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকতে পারে

কোন পদ্ধতি পছন্দ এবং কেন:

আমার মতে, দুই শিক্ষকের পদ্ধতির সমন্বয়ই সর্বোত্তম। তবে চিত্রকরের পদ্ধতিটি আমার বেশি পছন্দ। কারণ:

  • শিল্প শুধু অনুকরণ নয়, শিল্প আত্মপ্রকাশ।
  • নকল করা ছবি দক্ষতা দেখাতে পারে, কিন্তু নিজের কল্পনার ছবি হৃদয় ছুঁতে পারে।
  • চিত্রকর খোকনকে একজন যান্ত্রিক ছবি-আঁকিয়ে না বানিয়ে, একজন ভাবুক শিল্পী করে তুলতে চেয়েছিলেন।
  • তবে মাস্টারমশাইয়ের হাতে-কলমে শিক্ষা ও কৌশল জ্ঞান থাকলে চিত্রকরের পদ্ধতি আরও ফলপ্রসূ হতো।

তাই কল্পনা + কৌশল = মহান শিল্প—এটাই আমার শিক্ষা।

গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

নিখুঁত
একদম নির্ভুল, ত্রুটিহীন
অশ্বকর
অন্ধকার
ভিজুয়াল আর্ট
দৃশ্যশিল্প বা চিত্রশিল্প
ড্রইং
ছবি আঁকার খাতা বা অঙ্কন
অবাক
বিস্মিত, আশ্চর্যম্বিত
কল্পনা
মনের সৃষ্টিশীল চিন্তাশক্তি
ছদ্মনাম
গোপন বা অলীক নাম (Pen Name)
পেন্টিং
রঙ দিয়ে ছবি আঁকা (Painting)
ল্যান্ডস্কেপ
প্রকৃতির দৃশ্যের ছবি
প্রকৃতি
নিসর্গ, চারপাশের জগৎ

গল্পের চরিত্র পরিচিতি

চরিত্রপরিচয়গল্পে ভূমিকা
খোকনএকটি শিশু যে ছবি আঁকতে ভালোবাসেগল্পের প্রধান চরিত্র, নকল থেকে মৌলিক শিল্পী হয়ে ওঠে
খোকনের বাবাশিক্ষিত ও সচেতন অভিভাবকছেলের ছবি প্রথমে বুঝতে পারেননি, পরে গভীরভাবে আবিষ্কার করেন
চিত্রকর (বাবার বন্ধু)বিখ্যাত চিত্রকর, লেক্সী শহরে থাকেনখোকনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন, প্রকৃত ছবি আঁকার উপদেশ দেন
ড্রইং মাস্টারমশাইস্কুলের শিক্ষকদক্ষতা শেখালেও সৃষ্টিশীলতার শিক্ষা দিতে পারেননি

গল্পের শিক্ষা

মনে রেখো: বনফুলের "খোকনের প্রথম ছবি" শুধু একটি শিশুর ছবি আঁকার গল্প নয়, এটি সৃষ্টিশীলতার গল্প। প্রতিটি শিশুর ভিতরেই একজন শিল্পী লুকিয়ে থাকে, দরকার শুধু তাকে জাগিয়ে তোলার। মাস্টারমশাইয়ের নকল-করা শিক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি চিত্রকরের দেওয়া কল্পনার চোখ খোলার শিক্ষা। অন্ধকারেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে সুন্দর আলো—এটা শুধু ছবি আঁকার ক্ষেত্রে নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই সত্য। নিজেকে জানতে হলে চোখ বুজে নিজের ভেতরে তাকাতে হবে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'খোকনের প্রথম ছবি' গল্পটি বিখ্যাত সাহিত্যিক বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়)-এর লেখা। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' তৃতীয় পাঠে অন্তর্ভুক্ত একটি ছোটোগল্প।

চিত্রকরের পরামর্শে চোখ বুজে বসে খোকন অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি। তখন সে ঠিক করে, 'আমি তো অন্ধকারই দেখছি, তাহলে এই অন্ধকারেরই ছবি আঁকি!' এই ভেবেই সে কালো রং দিয়ে খাতার পুরো পাতা ভরিয়ে তোলে।

গল্পটির মূল শিক্ষা হল—শিল্প শুধু বাইরের জিনিসের অনুকরণ নয়। প্রকৃত শিল্প আসে নিজের ভেতরের কল্পনাশক্তি ও সৃষ্টিশীলতা থেকে। অন্ধকারের মধ্যেও যে আলো ও সৌন্দর্য আছে, তা কেবল কল্পনার চোখ দিয়েই দেখা সম্ভব।