চিন্তাশীল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'চিন্তাশীল' নাট্যাংশের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

চিন্তাশীল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাট্যাংশ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • দশম পাঠ

চিন্তাশীলতা ভাষার ইতিহাস মাতৃস্নেহ নাটক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ - ১৯৪১)

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। অল্পবয়স থেকেই ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত 'ভারতী' ও 'বালক' পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। 'কথা ও কাহিনী', 'সহজপাঠ', 'রাজর্ষি', 'ছেলেবেলা', 'শিশু', 'শিশু ভোলানাথ', 'হাস্যকৌতুক', 'ডাকঘর', 'গল্পগুচ্ছ'-সহ তাঁর বহু রচনাই শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করে। দীর্ঘ জীবনে তিনি অজস্র কবিতা, গান, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন। ১৯১৩ সালে 'গীতাঞ্জলি' (Song Offerings)-র জন্য প্রথম এশীয়াবাসী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান।

🎭

নাট্যাংশ

চিন্তাশীল (প্রথম দৃশ্য)

👤

লেখক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

📚

পাঠ

দশম পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

হাস্যরসাত্মক নাট্যাংশ

নাট্যাংশ (প্রথম দৃশ্য)

চিন্তাশীল

🎭 প্রথম দৃশ্য

চিন্তাশীল নরহরি চিন্তায় নিমগ্ন। ভাত শুকাইতেছে। মা মাছি তাড়াইতেছেন। মা। অত ভেবো না, মাথার ব্যামো হবে বাছা! নরহরি। আচ্ছা মা, 'বাছা' শব্দের ধাতু কী বলতে পারো দেখি। মা। কী জানি বাপু! নরহরি। 'বৎস'। আজ তুমি বলছ 'বাছা'—দু হাজার বছর আগে বলত 'বৎস'— এই কথাটা একবার ভালো করে ভেবে দেখো দেখি মা। কথাটা বড়ো সামান্য নয়। এ কথা যতই ভাববে ততই ভাবনার শেষ হবে না। (পুনরায় চিন্তায় নিমগ্ন) মা। যে ভাবনা শেষ হয় না এমন ভাবনার দরকার কী বাপ। ভাবনা তো তোর চিরকাল থাকবে, ভাত যে শুকোয়। লক্ষ্মী আমার, একবার ওঠ। নরহরি। (চমকিয়া) কী বললে মা? লক্ষ্মী? কী আশ্চর্য! এক কালে লক্ষ্মী বলতে দেবী-বিশেষকে বোঝাত, পরে লক্ষ্মীর গুণ অনুসারে সুশীলা স্ত্রীলোককে লক্ষ্মী বলত, কালক্রমে দেখো পুরুষের প্রতিও লক্ষ্মী শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। একবার ভেবে দেখো মা, অতি অতি ভাষার কেমন পরিবর্তন হয় ভাবলে আশ্চর্য হতে হবে।

নাট্যাংশের সারাংশ ও মূলভাব

সারসংক্ষেপ: "চিন্তাশীল" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি হাস্যরসাত্মক নাট্যাংশ। এতে দেখানো হয়েছে এক চিন্তাশীল বালক নরহরি, যে সবসময় কোনো না কোনো গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে। নাটকের প্রথম দৃশ্যে নরহরি ভাত খেতে বসেছে, কিন্তু তার মন অন্যদিকে। মা বারবার তাকে ভাত খেতে বললেও সে নানা বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকে।

মা যখন তাকে 'বাছা' বলে ডাকেন, তখনই নরহরি সেই শব্দের উৎপত্তি বা ধাতু নিয়ে ভাবতে শুরু করে। সে বলে—''বাছা'' শব্দের প্রকৃত ধাতু হল ''বৎস''। আজ থেকে দু হাজার বছর আগেও একে 'বৎস' বলা হত। তারপর যখন মা তাকে 'লক্ষ্মী' বলেন, তখনও সে লক্ষ্মী শব্দের ইতিহাস নিয়ে ভাবতে শুরু করে—কীভাবে দেবী-বিশেষ থেকে নারী, তারপর পুরুষের প্রতিও এই শব্দের প্রয়োগ শুরু হল। অর্থাৎ, নরহরির কাছে প্রতিটি শব্দই যেন একটি ইতিহাস, একটি ভাবনার খোরাক।

মূলভাব: রবীন্দ্রনাথ এই ছোট্ট নাট্যাংশের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, একটি চিন্তাশীল মন কত সহজেই সাধারণ কথার মধ্যে গভীর তত্ত্ব খুঁজে পেতে পারে। ভাষার বিবর্তন, শব্দের ইতিহাস—এগুলো একজন কৌতূহলী শিক্ষার্থীর কাছে হতে পারে অনন্ত ভাবনার উৎস। পাশাপাশি, মায়ের স্নেহময় ব্যস্ততা ও সন্তানের ভাবুক মানসিকতার সুন্দর দ্বন্দ্বটি হাস্যরসের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

১. একই অর্থযুক্ত শব্দ (নাটক থেকে)

অর্থনাটক থেকে খুঁজে পাওয়া শব্দ
মিষ্টি/স্নেহের সম্বোধনবাছা / লক্ষ্মী
হাজিরউপস্থিত
অস্থির/ব্যস্তঅস্থির (মা ভাত নিয়ে)
ব্যবস্থাবন্দোবস্ত
ঢাকা বা আবৃতমগ্ন (চিন্তায় নিমগ্ন)

২. বিশেষ্য-বিশেষণ শূন্যস্থান পূরণ

বিশেষ্যবিশেষণ
আদরআদরণীয় / আদরের
প্রমাণপ্রামাণ্য
নিতিনিত্য / নৈতিক
আমোদআমোদিত / আমোদজনক

৩. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও

৭ টি
৩.১ 'কথাটা বড়ো সামান্য নয়'— কথাটি কার? কোন কথাটা সামান্য নয়?

উত্তর: কথাটি নরহরির। 'বাছা' শব্দের ধাতু 'বৎস'—এই কথাটাই বড়ো সামান্য নয় বলে নরহরি মনে করে। তার মতে, দু হাজার বছর আগে মানুষ 'বৎস' বলত, আজ বলে 'বাছা'—ভাষার এই পরিবর্তনের ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তা করার বিষয়।

৩.২ 'এই-সব বাজে ভাবনা নিয়ে থাকা ভালো?'— কে কাকে এই কথা বলেছেন? কোন ভাবনাকে 'বাজে' বলা হয়েছে? তা কি সত্যিই 'বাজে ভাবনা' তোমার কী মনে হয়?

উত্তর: এই কথা নরহরির মা নরহরিকে বলেছেন। নরহরি যখন 'বাছা' শব্দের ধাতু 'বৎস' নিয়ে ভাবছে এবং ভাত না খেয়ে চিন্তায় মগ্ন, তখন মা-ই তাকে এই কথা বলে বোঝাতে চান যে খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে শুধু শব্দের উৎপত্তি নিয়ে ভাবা ঠিক নয়।

আমার মতামত: আমি মনে করি না এটা 'বাজে ভাবনা'। ভাষা নিয়ে চিন্তা করা, শব্দের ইতিহাস জানার চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে খেতে বসে যদি খাবার নষ্ট হয়, তাহলে সময় ও স্থান বুঝে ভাবনা করা উচিত।

৩.৩ 'আমাদের কথা শুনলেই এর শোক উপস্থিত হয়।'— কথাটি কার? তার কোন কথায় নরহরির শোকপ্রাপ্তি হয়েছে?

উত্তর: কথাটি নরহরির মায়ের। নরহরি সারাক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে ভাবে, কিন্তু যখনই পরিবারের সাধারণ কোনো কথা বা প্রয়োজনের কথা শোনে, তখনই সে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। মা-ই তাই বলেছেন যে সাধারণ পারিবারিক কথাবার্তা শুনলেই তার ছেলের 'শোক' বা মন খারাপ হয়।

৩.৪ 'বোসো, আমি তোমাকে প্রমাণ করে দিচ্ছি'— নরহরি কার কাছে কী প্রমাণ করে দিতে চেয়েছিল?

উত্তর: নরহরি তার মায়ের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে, ভাষার ইতিহাস ও শব্দের পরিবর্তন কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সে 'বাছা' শব্দের ধাতু 'বৎস' এবং 'লক্ষ্মী' শব্দের ব্যবহারিক পরিবর্তনের উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিল—সাধারণ কথার মধ্যেও কত গভীর ইতিহাস ও চিন্তার খোরাক লুকিয়ে আছে।

৩.৫ 'আদর করিব, তাতেও ভাবিতে হইবে নাকি?'— এর প্রত্যুত্তরে নরহরি মাকে কী কী বলেছিল?

উত্তর: নরহরির মা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—ভালোবাসা বা আদর করতেও কি ভাবতে হবে? এর উত্তরে নরহরি তার চিন্তাশীল স্বভাব অনুযায়ীই বলেছিল: "মা, তুমি যাকে আদর করছ, তাকে 'বাছা' বলছ, আবার বলছ 'লক্ষ্মী'—এই শব্দগুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায় কত বড়ো ইতিহাস!" অর্থাৎ, সে একটি সাধারণ স্নেহময় শব্দের পেছনেও ইতিহাস খুঁজে পেয়েছিল।

৩.৬ 'তোমার ইচ্ছে হয়েছে, আমি বাধা দেব না'— কে কাকে বাধা দিতে চায়নি?

উত্তর: নরহরির মা নরহরিকে বাধা দিতে চাননি। মা বুঝতে পেরেছিলেন যে ভাবনা করাই ছেলের স্বভাব ও ভালোলাগা। তাই জোর করে তাকে আটকানো ঠিক হবে না ভেবে তিনি বলেছেন—যেহেতু নরহরির চিন্তা করতেই ইচ্ছে হয়েছে, তাই তিনি তাতে বাধা দেবেন না। এতে মায়ের উদারতা ও পুত্রের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে।

৩.৭ 'এটাতে বড়ো বেশি ভাবতে হল না'— কার স্বগতোক্তি? কাকে বেশি ভাবতে হল না? কেন?

উত্তর: এটি নরহরির স্বগতোক্তি। নরহরিকে এই কথাটি বলতে বেশি ভাবতে হয়নি কারণ—খুব সহজেই সে তার ধাতু বা ব্যুৎপত্তি বুঝতে পেরেছিল। সম্ভবত এটি 'বৎস' বা 'লক্ষ্মী'র মতো শব্দের উৎপত্তি, যা তার জানা ছিল। নরহরি এতটাই চিন্তাশীল ও ভাষা-সচেতন যে, সাধারণ মানুষের কাছে কঠিন বলে মনে হলেও তার কাছে তা সহজ ছিল।

৪. নরহরির চরিত্র সম্পর্কে ধারণা

৪ নরহরি সবার সব কথাতেই চিন্তাময় হয়ে পড়ে। অথচ মায়ের কাশীবাসী হওয়ার ইচ্ছা শুনেই সে রাজি হয়ে যায়, কিন্তু মা যে টাকার বন্দোবস্ত করবেন বললেন, সে আবার ভাবতে বসে। এর থেকে নরহরির চরিত্র সম্পর্কে তোমার কেমন ধারণা হলো?

উত্তর: নাট্যাংশ থেকে নরহরির চরিত্র সম্পর্কে নিম্নলিখিত ধারণা পাওয়া যায়:

  1. অত্যন্ত ভাবুক ও চিন্তাশীল: নরহরি পৃথিবীর সাধারণ জিনিস নিয়েও গভীরভাবে ভাবে। সাধারণ শব্দ, তার ধাতু, ইতিহাস—এসব তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
  2. ভাষাপ্রেমী: ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন নিয়ে তার অগাধ আগ্রহ। 'বাছা' থেকে 'বৎস', 'লক্ষ্মী'র প্রয়োগ পরিবর্তন—এসবই তার প্রিয় বিষয়।
  3. মাতৃভক্ত: মায়ের ইচ্ছার প্রতি তার আন্তরিক শ্রদ্ধা আছে। যখনই কোনো কাজে মা-কে সত্যিই প্রয়োজন হয়, তখন সে ভাবনা ছেড়ে মাকে রাজি হয়ে যায়।
  4. বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দ্বিধা: টাকার বন্দোবস্তের মতো বাস্তব ও আর্থিক ব্যাপার শুনলেই সে আবার চিন্তায় পড়ে যায়। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক বা তাত্ত্বিক বিষয়ে সে যতটা স্বচ্ছন্দ, ব্যবহারিক জীবনের হিসাব-নিকাশে ততটাই অস্বস্তি।
  5. সরল ও আন্তরিক: তার চিন্তায় কোনো কৃত্রিমতা নেই। সে যা ভাবে, সরলভাবে প্রকাশ করে।

শেষকথা: নরহরি একইসঙ্গে চিন্তাশীল দার্শনিক ও সরল মাতৃভক্ত পুত্র—এই দ্বৈত চরিত্রের মানুষ।

৫. বানান সংশোধন

ভুল বানানশুদ্ধ বানান
বামো / ব্যামোব্যামো (অসুখ)
পরবিতরণ / পরিবর্তনপরিবর্তন
ভ্যাত / ব্যাতব্যাত
লক্ষী / লক্ষ্মীলক্ষ্মী
পমাণ / প্রমাণপ্রমাণ
মূখম / মুখতমুখ্যত

৬. বাক্যগুলিকে চলিত রীতিতে লেখো

৬.১ ভাত শুকাইতেছে, মা মাছি তাড়াইতেছেন।
চলিত রীতি: ভাত শুকিয়ে যাচ্ছে, মা মাছি তাড়াচ্ছেন।
৬.২ নরহরি বাশ্য ভাগিনেয়কে কোনালে করিয়া মাতার পাশে বসিল।
চলিত রীতি: নরহরি বাধ্য ভাগ্নেকে কোলে করে মায়ের পাশে বসল।
৬.৩ নরহরি মাথায় হাত দিয়া পুনশ্চ চিন্তায় মগ্ন হইল।
চলিত রীতি: নরহরি মাথায় হাত দিয়ে আবার চিন্তায় মগ্ন হল।

৭. অর্থ লেখো

শব্দঅর্থ
বৎসসন্তান, বাছা (প্রাচীন সংস্কৃত রূপ)
রোষোরাগ, ক্রোধ
দণ্ডবৎপ্রণাম, সাষ্টাঙ্গ প্রণতি
ভাগিনেয়ভাগ্নে / ভাগ্নি (বোনের সন্তান)
বন্দোবস্তব্যবস্থা, আয়োজন

৮. সমার্থক শব্দ লেখো

শব্দসমার্থক শব্দ
পৃথিবীধরণী, বসুন্ধরা, ধরিত্রী, মেদিনী, ভুবন
সূর্যরবি, ভানু, দিবাকর, তপন, আদিত্য
স্ত্রীলোকনারী, মহিলা, রমণী, বনিতা, কামিনী
মাজননী, মাতা, অম্বা, প্রসূতি, গর্ভধারিণী

৯. নির্দেশক ও অনির্দেশক শব্দ

নির্দেশক শব্দঅনির্দেশক শব্দ
এই বাছাএকটা বাছা
ওই ভাতকিছু ভাত
এই মাএকজন মা
ওই লক্ষ্মীএকটি লক্ষ্মী
এই ভাষাকোনো ভাষা

১০. 'বাছা' শব্দের ধাতু ও প্রতিশব্দ

১০ 'বাছা' শব্দটি কোন ধাতুনিপন্ন? দুটি প্রতিশব্দ লেখো।

উত্তর: 'বাছা' শব্দটি 'বৎস' ধাতুনিপন্ন। এটি সংস্কৃত 'বৎস' থেকে প্রাকৃত 'বচ্ছ' হয়ে বাংলায় 'বাছা' রূপ লাভ করেছে।

দুটি প্রতিশব্দ: সন্তান, আদরের পুত্র / দুলাল।

১১. 'দাড়ি' শব্দের সাধু রূপ

১১ 'দাড়ি' শব্দের সাধু রূপ কী?

উত্তর: 'দাড়ি' শব্দের সাধু রূপ হল 'দাড়ি' বা 'দাড়ী' (বাংলায় অপরিবর্তিত)। অথবা 'শ্মশ্রু' (দাড়ির তৎসম প্রতিশব্দ)।

১২. 'হইল কুরুক্ষেত্র'— মূল ভাব

১২ 'হইল কুরুক্ষেত্র'— শব্দবন্ধটির মূল ভাব কী?

উত্তর: 'হইল কুরুক্ষেত্র' বলতে বোঝায়—ভীষণ ঝগড়া বা বিবাদ বেঁধে গেল। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মতোই প্রচণ্ড তর্ক-বিতর্ক বা ঝামেলা শুরু হয়ে গেছে, এই অর্থে এই বাগ্ধারাটি ব্যবহৃত হয়।

১৩. 'গুরু' শব্দের দুই অর্থে বাক্য

১৩ 'গুরু' শব্দটির দুটি ভিন্ন অর্থে বাক্য রচনা

অর্থ ১ (শিক্ষক): আমাদের বিদ্যালয়ের গুরু মহাশয় অত্যন্ত জ্ঞানী ও স্নেহশীল।

অর্থ ২ (ভারী/ওজনে বড়ো): এই বাক্সটি খুব গুরু, একা তোলা সম্ভব নয়।

১৪. 'সূর্য তো অস্ত যায় না'

১৪ 'সূর্য তো অস্ত যায় না'— এখানে কোন বিজ্ঞানসত্যের আভাস দেওয়া হয়েছে?

উত্তর: এখানে যে বিজ্ঞানসত্যের আভাস দেওয়া হয়েছে তা হল—সূর্য আসলে অস্ত যায় না, পৃথিবীই নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরছে। পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে আমাদের মনে হয় সূর্য উঠছে ও ডুবছে। প্রকৃতপক্ষে সূর্য স্থির এবং পৃথিবীই গতিশীল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য।

১৫. 'মাথা' শব্দের তৎসম রূপ

১৫ 'মাথা' শব্দটি কোন তৎসম শব্দ থেকে এসেছে?

উত্তর: 'মাথা' শব্দটি তৎসম 'মস্তক' থেকে এসেছে। 'মস্তক' > 'মাথা' (অপভ্রংশ) হয়ে বাংলায় প্রচলিত হয়েছে।

১৬. 'ভাত জুড়িয়ে গেল'— ভিন্নার্থে বাক্য

১৬ 'জুড়িয়ে গেল' শব্দবন্ধটি অন্য অর্থে প্রয়োগ করে একটি বাক্য লেখো

মূল অর্থ: নাটকে 'ভাত জুড়িয়ে গেল' বলতে বোঝানো হয়েছে—ভাত ঠান্ডা হয়ে গেছে বা শুকিয়ে গেছে।

অন্য অর্থে বাক্য: গরম চা-টা খেয়ে শরীরটা একদম জুড়িয়ে গেল। (এখানে জুড়িয়ে যাওয়া মানে শান্তি বা আরাম পাওয়া।)

১৭. পাঁচটি ধ্বন্যাত্মক/অনুকার শব্দ

১৭ 'ভন ভন'—এর মতো আরও পাঁচটি ধ্বন্যাত্মক শব্দ

উত্তর:

  • ঝম ঝম (বৃষ্টির শব্দ)
  • টুপ টাপ (জল টপকানোর শব্দ)
  • কিচির মিচির (পাখির ডাক)
  • গর গর (গর্জনের শব্দ)
  • হু হু (বাতাসের শব্দ)

১৮. 'কাশী'র পরিচয়

১৮ 'কাশী' কোন রাজ্যে অবস্থিত? 'কাশী'র প্রশস্তির কারণ কী?

উত্তর: কাশী (বর্তমান নাম: বারাণসী) উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত। গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহর হিন্দুদের অন্যতম পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।

কাশীর প্রশস্তির কারণ:

  • ভগবান শিবের শহর বলে পরিচিত (কাশী বিশ্বনাথ মন্দির)।
  • হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, কাশীতে মৃত্যু হলে মোক্ষ লাভ হয়।
  • প্রাচীনকাল থেকেই এটি বিদ্যা, সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র।
  • গঙ্গাস্নানের পুণ্যলাভের জন্য বহু তীর্থযাত্রী এখানে আসেন।

১৯. নাটকের দৃশ্য সংখ্যা ও চরিত্র

১৯ নাটকটিতে মোট কটি 'দৃশ্য' রয়েছে? কোন কোন দৃশ্যে কাদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়?

উত্তর: 'চিন্তাশীল' নাট্যটিতে আমরা প্রথম দৃশ্য দেখতে পাই।

এই দৃশ্যে উপস্থিত চরিত্র:

  • নরহরি (চিন্তাশীল বালক)
  • মা (নরহরির মা, যিনি ভাত ও মাছি নিয়ে ব্যস্ত)

সম্পূর্ণ নাটকে আরও দৃশ্য থাকতে পারে, কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে শুধুমাত্র এই প্রথম দৃশ্যটিই সংকলিত হয়েছে।

২০. 'তর' প্রত্যয় যোগে নতুন শব্দ

২০ 'গরুতর'— এরকম 'তর' যোগে পাঁচটি নতুন শব্দ

উত্তর: 'গরুতর' (গুরু + তর) = অধিক গুরু।

'তর' প্রত্যয় যোগে পাঁচটি শব্দ:

  • লঘুতর (লঘু + তর)
  • উচ্চতর (উচ্চ + তর)
  • নিম্নতর (নিম্ন + তর)
  • ক্ষুদ্রতর (ক্ষুদ্র + তর)
  • বৃহত্তর (বৃহৎ + তর)

২২. উচ্চারণ বিকৃতি সংশোধন

বিকৃত উচ্চারণমূল শব্দ
জিজ্ঞেসজিজ্ঞাসা
ব্যামোব্যাধি / অসুখ (ব্যামো = ব্যাধি থেকে)
কওবলো / কহ
হস্তাৎহস্ত (হাত)
দিকদিক্
সম্মুখেসম্মুখ

২৩. নরহরির ডাকনাম

২৩ নরহরির বাড়ির ডাকনামটি কী?

উত্তর: নরহরির বাড়ির ডাকনামটি হল "নরু"। নাট্যাংশে মা তাকে "নরু" বলেও ডেকেছেন—যেমন, "আদর করিব, তাতেও ভাবিতে হইবে নরু?"

২৪. শব্দগুলির অর্থপার্থক্য

শব্দ ১অর্থ ১শব্দ ২অর্থ ২
বাঁচাবেঁচে থাকা, জীবন ধারণ করাবাছাআদরের সন্তান (বৎস থেকে আগত)
পুরুষমানুষের পুরুষ জাতিপরুষকর্কশ, রুক্ষ (পরুষ ভাষা)
সকলসমস্ত, সবশকলফোঁটা, অংশ (এক শকল চাঁদের আলো)
পারাপাড়া, অঞ্চলপাড়ামহল্লা, এলাকা
ভাঝা(অর্থহীন/আঞ্চলিক)ভাসাজলে ভেসে চলা

২৫. 'মাথা' শব্দের পাঁচটি ভিন্ন অর্থে বাক্য

অর্থবাক্য
মস্তক (Head)খুব মাথা ধরেছে, ওষুধ খেতে হবে।
বুদ্ধি/বিবেচনাছেলেটার মাথা খুব ভালো, অঙ্কে সবাইকে টেক্কা দেয়।
নেতৃত্ব/প্রধানসে-ই এই দলের মাথা, তাকে ছাড়া সব অচল।
শীর্ষ/অগ্রভাগগাছটার মাথা ভেঙে পড়েছে ঝড়ে।
ভার/দায়িত্বএতগুলো মানুষের মাথা নিয়ে চলতে গেলে অনেক ভাবতে হয়।

২৬. নাটকটির নামকরণ নিয়ে মতামত

২৬ নাটকটির নামকরণ 'চিন্তাশীল' যথাযথ হয়েছে কি না—যৌক্তিক আলোচনা

আমার মতে নামকরণ যথাযথ হয়েছে।

পক্ষে যুক্তি:

  1. কেন্দ্রীয় চরিত্র: নাটকের প্রধান চরিত্র নরহরির প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল তার চিন্তাশীলতা। সাধারণ বিষয়েও সে গভীরভাবে ভাবতে থাকে।
  2. কাহিনির বিষয়বস্তু: সমগ্র নাট্যাংশ জুড়েই নরহরির চিন্তা—ভাষা, শব্দের ইতিহাস, ধাতু—এইসব নিয়েই সে মগ্ন।
  3. রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য: নামের মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, একজন 'চিন্তাশীল' মানুষ কেমন হয় এবং তার চিন্তার জগৎ কত বিচিত্র।
  4. হাস্যরস সৃষ্টি: অতি-চিন্তার ফলে যে হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তা নামটির মাধ্যমেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

উপসংহার: 'চিন্তাশীল' নামটি একইসঙ্গে নরহরির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও নাটকের মূল সুরকে তুলে ধরে। তাই এ-নামকরণ সার্থক ও যথাযথ।

২৭. মূল শব্দের আদি ও প্রচলিত অর্থ

মূল শব্দআদি অর্থপ্রচলিত অর্থ
লক্ষ্মীদেবী লক্ষ্মী (ধন-সম্পদের দেবী)সুশীলা, শান্ত, গুণবতী নারী; পরে পুরুষের প্রতিও ব্যবহৃত (আদরের সম্বোধন)
অম্বমাতা (প্রাচীন সংস্কৃত)দেবী দুর্গার এক রূপ; মা-কে সম্বোধন
বৎসবাছুর (প্রাচীন বৈদিক অর্থ); সন্তানবাংলায় 'বাছা' রূপে প্রচলিত—আদরের সন্তান অর্থে

গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

ব্যামো
অসুখ, ব্যাধি
নিমগ্ন
ডুবে থাকা, সম্পূর্ণ মগ্ন
ধাতু
ক্রিয়াবাচক প্রকৃতি বা শব্দমূল
কুরুক্ষেত্র
মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্র; প্রবল বিবাদ
মীমাংসিত
নিষ্পত্তি হয়েছে এমন
অভ্যুত্থান
উত্থান, জাগরণ
বাধ্য
বাঁধা, বাধ্যতামূলক
দণ্ডবৎ
প্রণাম, সাষ্টাঙ্গে প্রণতি
আমোদ
আনন্দ, ফুর্তি
নিতান্ত
খুব, একান্ত
বন্দোবস্ত
ব্যবস্থা, আয়োজন
বিরস
অপেক্ষা করা
চিন্তাশীল
ভাবুক, যে সবসময় চিন্তা করে
রোষ
রাগ, ক্রোধ

নাটকের চরিত্র পরিচিতি

চরিত্রপরিচয়নাটকে ভূমিকা
নরহরি (নরু)চিন্তাশীল বালক, প্রধান চরিত্রপ্রতিটি সাধারণ শব্দ ও বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়; ভাষার ইতিহাস নিয়ে বিশেষ আগ্রহী
মানরহরির মা, স্নেহময়ী গৃহিণীছেলের চিন্তা-ভাবনার বিপরীতে ব্যবহারিকতার প্রতিনিধিত্ব করেন; সংলাপে হাস্যরস ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটান

নাটকের শিক্ষা

মনে রেখো: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "চিন্তাশীল" নাট্যাংশ আমাদের শেখায় যে জগতের প্রতিটি জিনিস গভীরভাবে দেখতে জানলে তা অসাধারণ হয়ে ওঠে। নরহরির মতো যদি আমরা সাধারণ শব্দের পেছনের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হই, তাহলে আমাদের জ্ঞানের জগৎ প্রসারিত হবে। তবে নাটকটি এও শেখায় যে, চিন্তা আর বাস্তব জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। শুধু ভাবলেই চলবে না, মায়ের ভালোবাসা, খাওয়া-দাওয়ার মতো ছোটো ছোটো বাস্তবতাও জীবনের অপরিহার্য অংশ। ভাবুক হতে হবে, কিন্তু ভবঘুরে নয়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'চিন্তাশীল' নাট্যাংশটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের দশম পাঠে অন্তর্ভুক্ত একটি হাস্যরসাত্মক নাট্যাংশ।

নরহরি একজন অত্যন্ত চিন্তাশীল বালক। সে সাধারণ জিনিস নিয়েও গভীরভাবে ভাবে—যেমন 'বাছা' শব্দের ধাতু বা 'লক্ষ্মী' শব্দের ইতিহাস। প্রতিটি শব্দের পেছনে একটি ইতিহাস খোঁজে সে। তবে মায়ের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে।

'বাছা' শব্দের ধাতু হল 'বৎস'। প্রাচীন সংস্কৃতে 'বৎস' বলতে বাছুর বা সন্তান বোঝাত। কালক্রমে প্রাকৃত 'বচ্ছ' হয়ে বাংলায় 'বাছা' রূপ লাভ করেছে, যা আদরের সম্বোধনরূপে ব্যবহৃত হয়।