বঙ্গভূমির প্রতি

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত 'বঙ্গভূমির প্রতি' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

বঙ্গভূমির প্রতি

মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবিতা (স্বদেশপ্রেম)

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • দ্বিতীয় পাঠ

স্বদেশপ্রেম জন্মভূমি সনেট বঙ্গভূমি

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪ — ১৮৭৩)

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি ও নাট্যকার। বাংলায় প্রথম সনেট (চতুর্দশপদী) রচনা, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন ও ইউরোপীয় ধাঁচের নাটক লেখার কৃতিত্ব তাঁকেই দেওয়া হয়। তাঁর বিখ্যাত কাব্য: 'মেঘনাদবধ কাব্য', 'বীরাঙ্গনা কাব্য', 'ব্রজাঙ্গনা কাব্য', 'চতুর্দশপদী কবিতাবলী'। নাটক: 'শর্মিষ্ঠা', 'পদ্মাবতী', 'কৃষ্ণকুমারী', 'একেই কি বলে সভ্যতা', 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ'। 'বঙ্গভূমির প্রতি' কবিতাটি তাঁর চতুর্দশপদী কবিতাবলীর অন্তর্গত একটি বিখ্যাত স্বদেশপ্রেমমূলক সনেট।

📝

কবিতা

বঙ্গভূমির প্রতি

👤

কবি

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

📚

পাঠ

দ্বিতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

সনেট (চতুর্দশপদী)

সম্পূর্ণ কবিতা

বঙ্গভূমির প্রতি

✍️ বঙ্গভূমির প্রতি

"রেখো, মা, দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে। সাধিতে মনের সাধ, ঘটে যদি পরমাদ, মধুহীন করো না গো তব মনঃকোকনদে। প্রবাসে, দৈবের বশে, জীব-তারা যদি খসে এ দেহ-আকাশ হতে,— নাহি খেদ তাহে। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির হবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে? কিন্তু যদি রাখ মনে, নাহি, মা, ডরি শমনে; মক্ষিকাও গল না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে! সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে, মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন;— কিন্তু কোন গুণ আছে, যাচিব যে তব কাছে, হেন অমরতা আমি, কহ, গো, শ্যামা জন্মদে! তবে যদি দয়া করো, ভুল দায়, গুণ ধরো, অমর করিয়া বর দেহ দাসে, সুবরদে!— ফুটি যেন স্মৃতি-জলে, মানসে, মা, যথা ফুলে মধুময় তামরস কি বসন্ত, কি শরদে!

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

সারসংক্ষেপ: মাইকেল মধুসূদন দত্তের "বঙ্গভূমির প্রতি" একটি অসাধারণ স্বদেশপ্রেমমূলক সনেট। কবিতাটির শীর্ষে ইংরেজ কবি বায়রনের উদ্ধৃতি—"My Native Land, Good night!"—থেকেই বোঝা যায় এটি জন্মভূমির প্রতি গভীর আবেগের কবিতা।

কবি মাতৃরূপিণী বঙ্গভূমির কাছে প্রার্থনা করছেন—হে মা, তুমি আমাকে, তোমার দাসকে (সন্তানকে) মনে রেখো। যদি কোনো ভুল বা ত্রুটির কারণে তোমার মনঃকোকনদ (মানস-পদ্ম) শুকিয়ে যায়, তবুও যেন আমি মধুহীন না হই। প্রবাসে (বিদেশে) যদি আমার জীবনের তারা (প্রাণ) খসে যায়, তাহলে আমার কোনো দুঃখ থাকবে না—কারণ জন্ম নিলে একদিন মরতেই হবে, এ জগতে কেউ অমর নয়।

কিন্তু হে মা, তুমি যদি আমাকে মনে রাখো, তাহলে আমি মৃত্যুকেও ভয় পাব না—যেমন মক্ষিকা (মাছি) অমৃতের হ্রদে পড়লে যেমন গলে না (মরে না), তেমনই তুমি মনেও রাখলে আমি অমরত্ব লাভ করব। কবি বলেন—যে মানুষকে লোকে ভুলতে পারে না, সকল মানুষ যাঁকে মনের মন্দিরে স্মরণ করে, সেই ধন্য। কিন্তু আমার তেমন কোনো গুণ নেই যা নিয়ে তোমার কাছে চাইতে পারি। তবু হে বরদায়িনী জন্মভূমি, তুমি যদি দয়া করো, আমার দোষ ভুলে গিয়ে গুণ ধরো, তাহলে আমাকে অমরতার বর দাও। তাহলে আমি স্মৃতির জলে ফুটে থাকা মধুময় পদ্মের মতো তোমার মানস সরোবরে ফুটে থাকব—বসন্ত হোক বা শরৎ।

মূলভাব: স্বদেশের প্রতি গভীর প্রেম, মায়ের কাছে সন্তানের মতো আত্মসমর্পণ এবং জন্মভূমির মাটিতে অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষাই এ কবিতার মূল সুর।

১. সঠিক উত্তরটি খুঁজে নিয়ে লেখো

১.১ 'বঙ্গভূমির প্রতি' কবিতায় যে শীর্ষ উদ্ধৃতিটি আছে, সেটি কবি বায়রন-এর রচনা। তাঁর রচিত একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হলো __________।
চাইল্ড হ্যারল্ড'স পিলগ্রিমেজ (Childe Harold's Pilgrimage) বা ডন জুয়ান (Don Juan)।
১.২ লালবর্ণের পদ্ম 'কোকনদ'। সেরকম নীল বর্ণের পদ্ম হলো ______ ও সাদা বর্ণের পদ্ম হলো ______।
নীল বর্ণের পদ্ম—ইন্দীবর। সাদা বর্ণের পদ্ম—পুণ্ডরীক।

২. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও

২.১ 'এ মিনতি করি পদে'— কবি কার কাছে কী প্রার্থনা জানিয়েছেন?
কবি মাতৃরূপিণী বঙ্গভূমির কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন—হে মা, তুমি তোমার দাসকে (এই সন্তানকে) মনে রেখো। যেন জন্মভূমির স্মৃতি কোনোদিনও ভুলে না যায়, এটাই কবির আর্তি।
২.২ 'সেই ধন্য নরকুলে'— কোন মানুষ নরকুলে ধন্য হন?
যাঁকে লোকে ভুলতে পারে না, যাঁকে সকলে মনের মন্দিরে স্মরণ করে, তিনিই প্রকৃত অর্থে ধন্য। অর্থাৎ, যে মানুষ নিজের কর্ম ও গুণের জন্য মানুষের মনে অমর হয়ে থাকেন, তাঁরাই প্রকৃত ধন্য।

৩. গদ্যরূপ লেখো

কাব্যিক রূপগদ্যরূপ
পরমাদপ্রমাদ (ভুল)
যাচিবযাচবো, চেয়ে নেবো
কহবলো
যথাযেমন
জন্মিলেজন্ম নিলে
দেহশরীর
হেনএমন
সাধিতেসাধন করতে

৪. শূন্যস্থানে উপযুক্ত বিশেষণ বসাও

শূন্যস্থানউপযুক্ত বিশেষণ
.................... মিনতিবিনীত মিনতি / সরল মিনতি
.................... হ্রদঅমৃত-হ্রদ / স্বচ্ছ হ্রদ
.................... তামরসমধুময় তামরস / রক্ত তামরস

৫. স্থলাক্ষর অংশগুলির কারক-বিভক্তি নির্ণয়

বাক্যস্থলাক্ষর অংশকারকবিভক্তি
৫.১ রেখো, মা, দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে।পদেঅধিকরণ কারক'এ' (সপ্তমী)
৫.২ এ দেহ-আকাশ হতে।দেহ-আকাশ হতেঅপাদান কারক'হতে' (পঞ্চমী)
৫.৩ মধুহীন করো না গো তব মনঃকোকনদে।মনঃকোকনদেকর্মকারক'এ' (সপ্তমী)
৫.৪ মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন।মনের মন্দিরেঅধিকরণ কারক'এ' (সপ্তমী)
৫.৫ মক্ষিকাও গল না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে!অমৃত-হ্রদেঅধিকরণ কারক'এ' (সপ্তমী)

গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ
মিনতিঅনুনয়, বিনীত অনুরোধ, আবেদন
পরমাদ'প্রমাদ'-এর পরিবর্তিত (কোমল) রূপ; ভুল, ত্রুটি
কোকনদলাল পদ্ম
প্রবাসবিদেশ, স্বদেশের বাইরে অবস্থান
দৈবঅদৃষ্ট, ভাগ্য
নীরজল
শমনমৃত্যুর দেবতা যম
মক্ষিকামাছি
অমৃতযা পান করলে মৃত্যু হয় না, সুধা
অমৃত-হ্রদসুধায় পূর্ণ হ্রদ
জন্মদে'জন্মদা'-র সম্বোধন রূপ, জন্ম দিয়েছে যিনি, জননী
সুবরদে'সুবরদা'-র সম্বোধন রূপ, সু (শুভ) বর দান করেন যিনি, বরদাত্রী
মধুময়মধুতে ভরা, মধুমাখা
তামরসপদ্ম
ভুলবিস্মৃতি, অনবধানতা
মানসেমনের ভেতর, মানস সরোবরে

কবিতা সম্পর্কিত অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

১ 'মধুহীন করো না গো তব মনঃকোকনদে'—এখানে 'মনঃকোকনদ' কী? কবি কেন 'মধুহীন' হতে চান না?
মনঃকোকনদ অর্থ—মনের লাল পদ্ম। কবি মাতৃরূপিণী বঙ্গভূমির কাছে প্রার্থনা করছেন—হে মা, তুমি যে মানসিক সরোবরে আমাকে স্থান দিয়েছ, সেখান থেকে যেন আমি কখনও বিচ্ছিন্ন না হই। 'মধু' এখানে মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা ও পদ্মের স্বাভাবিক মধুরতা—এই সবই বোঝাচ্ছে। কবি চান না এই মধু শূন্য হয়ে যাক।
২ 'মক্ষিকাও গল না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে!'—এই পঙক্তির তাৎপর্য কী?
কবি একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। যেমন অমৃতের হ্রদে পড়লে মাছিও গলে না বা মরে না, তেমনই জন্মভূমির স্মৃতির অমৃতে সিক্ত থাকলেও কেউ প্রকৃত অর্থে মরে না। জন্মভূমি যদি কবিকে মনে রাখে, তাহলে মৃত্যুর পরেও তিনি বেঁচে থাকবেন মানুষের মনে। এটি অমরত্বের এক চমৎকার কাব্যিক প্রকাশ।
৩ 'হেন অমরতা আমি, কহ, গো, শ্যামা জন্মদে!'—এখানে 'শ্যামা জন্মদা' কে? কেন?
শ্যামা জন্মদা বলতে মাতৃরূপিণী বঙ্গভূমিকে বোঝানো হয়েছে। 'শ্যামা' অর্থ শ্যামবর্ণা—বাংলার শ্যামল শোভাকে কবি মাতৃরূপে কল্পনা করেছেন। 'জন্মদা' অর্থ যিনি জন্ম দিয়েছেন। তাই বঙ্গভূমিই হলেন শ্যামলা জননী।
৪ 'ফুটি যেন স্মৃতি-জলে, মানসে, মা, যথা ফুলে / মধুময় তামরস'—এর অর্থ কী?
কবি বলছেন—হে মা, তুমি আমায় অমরতার বর দাও, যাতে আমি তোমার মানস সরোবরে স্মৃতির জলে ভেসে থাকা মধুমাখা পদ্মের মতো ফুটে থাকতে পারি। এখানে 'স্মৃতি-জল' মানে মানুষ যে স্মৃতির মাধ্যমে বেঁচে থাকে। কবি চান বসন্ত হোক বা শরৎ—সব ঋতুতেই যেন তিনি স্মৃতির পদ্ম হয়ে ফুটে থাকেন বঙ্গমায়ের মানস সরোবরে।
৫ কবিতাটির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য কী? এটি কী ধরনের কবিতা?
এটি একটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। সনেটের বৈশিষ্ট্য: মোট ১৪টি পঙ্ক্তি, নির্দিষ্ট মিল-কাঠামো (অষ্টক+ষট্ক বা অন্য গঠন), একটি নির্দিষ্ট ভাবের ধারাবাহিক প্রকাশ। মধুসূদন দত্তই বাংলায় প্রথম সনেট রচনা করেন। এই কবিতার শীর্ষে বায়রনের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সনেটের একটি কাব্যশাস্ত্রীয় প্রথা।

কবিতার শিক্ষা

মনে রেখো: মাইকেল মধুসূদন দত্তের "বঙ্গভূমির প্রতি" কবিতা আমাদের শেখায়—জন্মভূমির চেয়ে বড়ো কিছু নেই। কবি বিদেশে থাকলেও তাঁর প্রাণ পড়ে আছে বাংলার মাটিতে। মৃত্যু অনিবার্য জেনেও তিনি বিশ্বাস করেন—মাতৃভূমির স্মৃতিতে বেঁচে থাকাই প্রকৃত অমরত্ব। এই কবিতা শুধু স্বদেশপ্রেমের নয়, এটি এক চিরন্তন আকুতি—প্রত্যেক সন্তানের মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার মতো কবিও ফিরতে চান বঙ্গভূমির মানস সরোবরে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'বঙ্গভূমির প্রতি' কবিতাটি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত একটি সনেট (চতুর্দশপদী) কবিতা। এটি তাঁর 'চতুর্দশপদী কবিতাবলী'র অন্তর্গত একটি বিখ্যাত স্বদেশপ্রেমমূলক কবিতা। মধুসূদন দত্তই বাংলায় প্রথম সনেট রচনার প্রবর্তক। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির সাহিত্য মেলা বইয়ের দ্বিতীয় পাঠে অন্তর্ভুক্ত।

কবিতাটিতে কবি মাতৃরূপিণী বঙ্গভূমির কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন—তিনি যেন তাঁকে মনে রাখেন, ভুলে না যান। কবি বলেছেন, জন্ম নিলে মৃত্যু হবে, কিন্তু জন্মভূমি যদি মনে রাখে তাহলে অমরত্ব লাভ করা যায়—যেমন মাছি অমৃতের হ্রদে পড়লে গলে না। তিনি চান বঙ্গভূমির মানস সরোবরে স্মৃতির পদ্ম হয়ে ফুটে থাকতে। কবিতাটি স্বদেশপ্রেম ও জন্মভূমির প্রতি গভীর মমত্ববোধের এক অপূর্ব নিদর্শন।

'মনঃকোকনদ' অর্থ মনের লাল পদ্ম। কবি বঙ্গভূমির মানস সরোবরের কথা বলছেন। 'শ্যামা জন্মদা' বলতে মাতৃরূপিণী বঙ্গভূমিকে বোঝানো হয়েছে—'শ্যামা' অর্থ শ্যামবর্ণা (বাংলার শ্যামল প্রকৃতি) এবং 'জন্মদা' অর্থ যিনি জন্ম দিয়েছেন বা জন্মভূমি।