স্মৃতিচিহ্ন

কামিনী রায় রচিত 'স্মৃতিচিহ্ন' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

স্মৃতিচিহ্ন

কামিনী রায় কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • ষষ্ঠ পাঠ (প্রথম কবিতা)

স্মৃতিসৌধ মানবসেবা কালের বিচার অমরত্ব

কামিনী রায় (১৮৬৪ - ১৯৩৩)

বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুগের মহিলা কবি। বরিশাল জেলার বাসন্তা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম চণ্ডীচরণ সেন। অতি শৈশবকাল থেকেই কবিতা রচনায় প্রতিভার পরিচয় দেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'আলো ও ছায়া' মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়। বেথুন কলেজ থেকে সংস্কৃতে বি.এ. পাস করে ওই কলেজেই অধ্যাপিকার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: 'নির্মাল্য', 'দীপ ও ধূপ', 'জীবনপথে', 'মাল্য ও নির্মাল্য', 'অশোক সঙ্গীত' প্রভৃতি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' লাভ করেন।

📝

কবিতা

স্মৃতিচিহ্ন

👤

কবি

কামিনী রায়

📚

পাঠ

ষষ্ঠ পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

ভাবমূলক/দার্শনিক কবিতা

সম্পূর্ণ কবিতা

স্মৃতিচিহ্ন

✍️ স্মৃতিচিহ্ন

ওরা ভেবেছিল মনে আপনার নাম মনোহর হর্ম্যরূপে বিশাল অক্ষরে ইষ্টক-প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে রেখে যাবে! মূঢ় ওরা, ব্যর্থ মনস্কাম! প্রস্তর খসেছে ভূমে প্রস্তরের 'পরে, চারিদিকে ভগ্ন স্তূপ, তাহাদের তলে, লুপ্ত স্মৃতি; শুদ্ধ তৃণ কাল-নদী জলে ভেসে যায় নামগুলি, কেবা রক্ষা করে। মানব হৃদয়-ভূমি করি' অধিকার, করেছে প্রতিষ্ঠা যারা দুর্গ সিংহাসন, দরিদ্র আছিল তারা, ছিল না সফল প্রস্তরের এত বোঝা জড়ো করিবার; তাদের রাজত্ব হের অক্ষুণ্ন কেমন— কাল-ঘাতে ক্ষীণ নাম নিত্য সমুজ্জ্বল।।

পাঠ-পরিচিতি প্রশ্নোত্তর

ক মহৎ মানুষদের জীবন কথা আমরা পাঠ করে থাকি কেন?
মহৎ মানুষদের জীবন কথা আমরা পাঠ করে থাকি তাঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য। তাঁদের জীবন থেকে নিষ্ঠা, সেবা, ত্যাগ, দেশপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠার শিক্ষা পাই। তাই মহাপুরুষদের জীবনী আমাদের চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়।
খ অত্যাচারী কোন কোন সাম্রাজ্যলোভী জাতির কথা তুমি ইতিহাস পড়ে জেনেছ?
ইতিহাসে আমরা রোমান সাম্রাজ্য, মোঘল সাম্রাজ্যের কিছু নৃশংস শাসক, জার্মানির হিটলারের নাৎসি বাহিনী, জাপানের সামুরাই আক্রমণ প্রভৃতি সাম্রাজ্যলোভী অত্যাচারী জাতি ও শাসকের কথা জেনেছি।
গ অতীত ইতিহাসের ধূসর হয়ে আসা কোন মঠ/সৌধ/মিনার তুমি দেখেছ?
আমি নানাস্থানে বিভিন্ন পুরোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা ও স্তম্ভ দেখেছি—যেগুলি এককালে বিশাল সাম্রাজ্যের গৌরব বহন করলেও আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। যেমন পুরনো দিল্লির কুতুবমিনার, মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি প্রাসাদ, কিংবা গ্রামের পরিত্যক্ত জমিদারবাড়িগুলি।
ঘ তোমার দৃষ্টিতে কাদের কথা সমাজের সকলের চিরকাল মনে রাখা উচিত?
যাঁরা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, সমাজের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা করেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে অবদান রেখেছেন, শোষিত-বঞ্চিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন—তাঁদের কথা চিরকাল সমাজের মনে রাখা উচিত। যেমন মহাত্মা গান্ধী, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাদার টেরিজা প্রমুখ।
ঙ মানুষ নিজেকে স্মরণীয় করে রাখতে চায় কেন?
মানুষ নিজেকে স্মরণীয় করে রাখতে চায় কারণ মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকার বাসনা মানুষের সহজাত। কেউ অর্থবলে, কেউ ক্ষমতাবলে, কেউ শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে আবার কেউ জনসেবার মাধ্যমে এই স্মরণীয়তা অর্জন করতে চায়। তবে প্রকৃত স্মরণীয়তা আসে মানুষের হৃদয় জয় করলেই।

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

মূলভাব: "স্মৃতিচিহ্ন" কবিতায় কবি কামিনী রায় ইট-পাথরের সৌধের মাধ্যমে অমরত্ব লাভের প্রয়াসকে অর্থহীন বলে দেখিয়েছেন। যারা বিশাল অক্ষরে নিজেদের নাম প্রস্তরে খোদাই করে চিরস্মরণীয় হতে চায়, তারা আসলে মূঢ়—কারণ সময়ের প্রবাহে সে সব ভেঙে পড়ে, নামগুলি বিস্মৃতির অতলে ডুবে যায়। প্রকৃত অমরত্ব লাভ করে তারাই, যারা নিজেদের নাম পাথরে নয়, মানুষের হৃদয়ে খোদাই করে যায়—সেবা, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। দীন-দরিদ্র হয়েও যাঁরা মানুষের মন জয় করেছেন, কালের আঘাতেও তাঁদের নাম চিরউজ্জ্বল থাকে।

কেন্দ্রীয় চেতনা: ইট-পাথরের স্মৃতিসৌধ নয়, জনসেবা ও মানবপ্রেমই মানুষকে সত্যিকারের অমরত্ব দান করে।

১. ঠিক বক্তব্যের পাশে ✓ এবং ভুল বক্তব্যের পাশে ✕ চিহ্ন দাও

ক্রমিকবিবৃতিচিহ্ন
১.১ইট-পাথরের গড়া সৌধ কাউকে চিরস্মরণীয় করে রাখে না।✓ (ঠিক)
১.২যাঁরা নিজেদের সৌধ গড়ে কীর্তিকে অমর করে রাখতে চান তাঁরা বরণীয়।✕ (ভুল)
১.৩সাধারণ মানুষের মনে যাঁরা স্থান পেয়েছেন, তাঁদের নাম ভেসে যায়।✕ (ভুল)
১.৪এমন বহু সহায়-সম্বলহীন, দরিদ্র মানুষ আছেন, মহাকাল যাঁদের স্মৃতি মুছে দিতে পারেন।✕ (ভুল)
১.৫'মানব হৃদয়-ভূমি' অধিকার করতে হলে মানুষের জন্য কল্যাণকর কাজ করতে হবে।✓ (ঠিক)

২. কবিতা থেকে শব্দ চয়ন করে শূন্যস্থান পূরণ

২ কবিতা থেকে শব্দ চয়ন করে নীচের কবিতাংশের শূন্যস্থান পূরণ করো:

ওরা ভেবেছিল আপনার নাম

মনোহর হর্ম্যরূপে বিশাল অক্ষরে

ইষ্টক-প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে

রেখে যাবে!

৩. বিপরীতার্থক শব্দ লেখো

শব্দবিপরীতার্থক শব্দ
মনোহরকুৎসিত / বিরূপ
বিশালক্ষুদ্র
মূঢ়জ্ঞানী / পণ্ডিত
ব্যর্থসার্থক
ভগ্নঅখণ্ড / সম্পূর্ণ
লুপ্তপ্রকট / বিদ্যমান
শুদ্ধঅশুদ্ধ / কলুষিত
অধিকারঅনধিকার / বঞ্চনা
দুর্গউন্মুক্ত / অনাবৃত
অক্ষুণ্ণক্ষুণ্ণ / খর্ব
ধ্বংসনির্মাণ / সৃষ্টি
নিত্যঅনিত্য / ক্ষণস্থায়ী
সমুজ্জ্বলম্লান / নিষ্প্রভ

৪. বিশেষ্য ↔ বিশেষণ রূপান্তর

মূল শব্দপ্রকাররূপান্তরপ্রকার
নামবিশেষ্যনামীবিশেষণ
মনোহরবিশেষণমনোহরত্ববিশেষ্য
প্রস্তরবিশেষ্যপ্রস্তরীভূতবিশেষণ
মূঢ়বিশেষণমূঢ়তাবিশেষ্য
ব্যর্থবিশেষণব্যর্থতাবিশেষ্য
ভগ্নবিশেষণভগ্নাবশেষবিশেষ্য
ভূমিবিশেষ্যভৌমবিশেষণ
স্মৃতিবিশেষ্যস্মরণীয়বিশেষণ
রক্ষাবিশেষ্যরক্ষিতবিশেষণ
মানববিশেষ্যমানবিকবিশেষণ
হৃদয়বিশেষ্যহৃদয়ীবিশেষণ
প্রতিষ্ঠাবিশেষ্যপ্রতিষ্ঠিতবিশেষণ
দুর্গবিশেষ্যদুর্গমবিশেষণ
দরিদ্রবিশেষণদরিদ্রতাবিশেষ্য

৫. শব্দগুলির বাক্য প্রয়োগ

শব্দবাক্যে প্রয়োগ
অক্ষরবিশাল অক্ষরে নিজের নাম পাথরে খোদাই করে রাখা যায়।
চিরদিনজীবনে সত্য কথা বলার শিক্ষা চিরদিন মনে রাখবে।
স্মৃতিআমার ছেলেবেলার স্মৃতি খুব সুখের।
মানবমানব সেবাই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম।
রক্ষাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।
অধিকারসব মানুষের শিক্ষার অধিকার আছে।
সম্বলতাঁর একমাত্র সম্বল পৈতৃক বাড়িটি।
প্রতিষ্ঠাসততার মাধ্যমেই জীবনে প্রতিষ্ঠা আসে।

৬. সন্ধি বিচ্ছেদ করো

শব্দসন্ধি বিচ্ছেদ
মনোহরমনঃ + হর (বিসর্গসন্ধি)
মনস্কামমনঃ + কাম (বিসর্গসন্ধি)
ব্যর্থবি + অর্থ (স্বরসন্ধি)
সিংহাসনসিংহ + আসন (স্বরসন্ধি)
প্রতিষ্ঠাপ্রতি + স্থা (ব্যঞ্জনসন্ধি)
সমুজ্জ্বলসম + উজ্জ্বল (ব্যঞ্জনসন্ধি)
প্রস্তরপ্র + স্তর (ব্যঞ্জনসন্ধি)

৭. শব্দগুলির গদ্যরূপ লেখো

কাব্যিক রূপগদ্যরূপ
আপনারনিজের / আপন
রচিরচনা করে
তরেজন্য / নিমিত্ত
খসেছেখসে পড়েছে
ভূমেভূমিতে / মাটিতে
আছিলছিল
হেরদেখো

৮. মূল শব্দ নির্ণয় করো

শব্দমূল শব্দ
মনমনস্ (মন/হৃদয়)
হর্ম্যহর্ম্যঃ (অট্টালিকা/প্রাসাদ)
মূঢ়মুহ্ ধাতু (মোহপ্রাপ্ত/অজ্ঞান)
দরিদ্রদ্রবিদ্র (গরিব/দীন)
নদীনদ + ঈ (স্ত্রীলিঙ্গ)

৯. সংক্ষিপ্ত ও যথাযথ উত্তর দাও

৯.১ \'স্মৃতিচিহ্ন\' কবিতাটি কার রচনা?
\'স্মৃতিচিহ্ন\' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুগের বিশিষ্ট মহিলা কবি কামিনী রায়ের রচনা।
৯.২ কবিতাটি তাঁর কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত?
কবিতাটি কবির \'মাল্য ও নির্মাল্য\' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
৯.৩ কবিতাটি কী জাতীয় রচনা?
এটি একটি ভাবমূলক বা দার্শনিক কবিতা, যেখানে স্মৃতি, অমরত্ব ও প্রকৃত কীর্তির স্বরূপ নিয়ে চিন্তাভাবনা প্রকাশিত হয়েছে।
৯.৪ কবিতায় কবি কাদের \'মূঢ়\' ও \'ব্যর্থ মনস্কাম\' বলেছেন?
যারা মনে করে ইট-পাথরের সৌধ তৈরি করে, বড়ো বড়ো অক্ষরে নিজের নাম খোদাই করে তাঁরা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন—তাঁদেরই কবি \'মূঢ়\' এবং তাঁদের ইচ্ছাকে \'ব্যর্থ মনস্কাম\' বলেছেন।
৯.৫ তাদের স্মৃতি কীভাবে লুপ্ত হয়ে যায়?
কালের প্রবাহে পাথরের সৌধ ভেঙে পড়ে, ধ্বংসস্তূপের তলায় নামগুলি হারিয়ে যায়। তার ওপর ঘাস ও আগাছা জন্মে। সময়রূপী নদীর জলে সেই নামগুলি ভেসে যায়, কেউ আর তাদের রক্ষা করতে পারে না।
৯.৬ কারা মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করে?
যাঁরা দীন-দরিদ্র হয়েও মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা করেছেন, মানবহৃদয়-ভূমি অধিকার করতে পেরেছেন—তাঁরাই মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেন।
৯.৭ \'কাল\' কে কবিতায় কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
কবিতায় \'কাল\'-কে একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দুটোই অবিরাম গতিশীল। যেমন নদীর স্রোতে সবকিছু ভেসে যায়, তেমনি কালের স্রোতে ইট-পাথরের নাম-নিশানাও বিলীন হয়ে যায়।
৯.৮ কবিতায় \'শুদ্ধ তৃণ\' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
\'শুদ্ধ তৃণ\' অর্থ সাধারণ ঘাস। ধ্বংসস্তূপের ওপর সাধারণ আগাছা জন্মায়—কালের বিরাটত্বের কাছে তা অতি তুচ্ছ। কিন্তু এই তুচ্ছ ঘাসই যেন কালের জয়গান গায় এবং অহংকারী মানুষের স্মৃতিসৌধকে ঢেকে দেয়।

১০. তিন-চারটি বাক্যে উত্তর দাও

১০.১ \'ওরা ভেবেছিল মনে...\'— কাদের কথা বলা হয়েছে। তারা কী ভেবেছিল?

এখানে সেই সমস্ত সম্পদশালী, ক্ষমতাবান ও অহংকারী মানুষদের কথা বলা হয়েছে যাঁরা নিজেদের ক্ষমতা ও অর্থবলে ইট-পাথরের বিরাট সৌধ নির্মাণ করে তাতে নিজেদের নাম বড়ো অক্ষরে খোদাই করে রাখতেন। তাঁরা ভেবেছিলেন এই পাথরের স্মৃতিসৌধ চিরকাল অটুট থাকবে এবং তাঁদের নামও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও মূঢ়তাপূর্ণ ছিল।

১০.২ \'মূঢ় ওরা\'— কবিতায় তাদের মূঢ় বলার কারণ কী?

কবি তাদের মূঢ় বলেছেন কারণ:

  • তাঁরা ভেবেছিলেন পাথরের সৌধ চিরস্থায়ী—কিন্তু সময়ের আঘাতে পাথরও ক্ষয় হয়, ভেঙে পড়ে।
  • তাঁরা বুঝতে পারেননি প্রকৃত অমরত্ব পাথরের সৌধে নয়, মানুষের হৃদয়ে স্থান পেতে পারলেই লাভ করা যায়।
  • তাঁদের অর্থ-ক্ষমতার অহংকারকে কবি মোহ বা মূঢ়তা বলেই গণ্য করেছেন।
১০.৩ \'কেবা রক্ষা করে\'— কী রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে? তা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না কেন?

এখানে পাথরের গায়ে খোদাই করা নামগুলির রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কালের স্রোতে প্রস্তরখণ্ডগুলি খসে পড়ে, সব ভেঙে চুরমার হয়ে স্তূপাকার হয়ে পড়ে। তার ওপর জন্মায় ঘাস ও আগাছা। কাল-নদীর জলে নামগুলি ভেসে যায়। তাই কেউ আর সেই নামগুলি রক্ষা করতে পারে না।

১০.৪ \'দরিদ্র আছিল তারা\'— কাদের কথা বলা হয়েছে। তাদের রাজত্ব কীভাবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে বলে কবি মনে করেন?

যাঁরা আর্থিকভাবে গরিব ছিলেন, সহায়-সম্বলহীন ছিলেন কিন্তু হৃদয়ের গুণে মহীয়ান ছিলেন—তাঁদের কথা বলা হয়েছে। পাথরের সৌধ বানানোর মতো অর্থ-বিত্ত তাঁদের ছিল না, কিন্তু তাঁরা মানুষের জন্য মহৎ কাজ করেছেন। তাঁদের রাজত্ব অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে কারণ তাঁরা পাথরে নয়, মানুষের হৃদয়ে নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন। মানবহৃদয়-ভূমি তাঁদের চিরস্থায়ী সিংহাসন। তাই কালের আঘাতেও তাঁদের নাম ক্ষীণ হয় না—নিত্য সমুজ্জ্বল থাকে।

১০.৫ কালপ্রবাহে কাদের নাম ধুয়ে যায়। সেই প্রবাহ কাদের স্মৃতি গ্রাস করতে পারে না?

কালপ্রবাহে ধুয়ে যায় তাঁদের নাম, যাঁরা পাথরের স্মৃতিসৌধ বা বাহ্যিক কীর্তির মাধ্যমে অমরত্ব চেয়েছিলেন। কিন্তু যাঁরা মানবসেবা, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, সময়ের প্রবাহ কখনো তাঁদের স্মৃতি গ্রাস করতে পারে না। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধীর মতো মানুষেরা আজও সমুজ্জ্বল।

১০.৬ \'মানবহৃদয় ভূমি করি অধিকার\'— কারা, কীভাবে মানবহৃদয় ভূমি অধিকার করে?

যাঁরা দীন-দুঃখীর সেবা করেছেন, দেশ ও সমাজের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, সবার জন্য ভালোবাসা রেখেছেন—তাঁরা মানুষের হৃদয়রূপ ভূমি অধিকার করে নিয়েছেন। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে কাজ করে, সম্পদ ও ক্ষমতার লোভ না করে, নীরবে মানুষের কল্যাণসাধনের মধ্য দিয়েই এই অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

১০.৭ কবিতায় কবি কোন \'মূঢ়\'কে কেন অবিনশ্বর ও \'নিত্য সমুজ্জ্বল\' বলেছেন?

কবিতায় কবি পাথরের সৌধ নির্মাণকারীদের \'মূঢ়\' বলেছেন। আর যাঁরা দরিদ্র থেকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়েছেন, তাঁদেরই \'নিত্য সমুজ্জ্বল\' বলেছেন। কারণ:

  • পাথরের সৌধ সময়ের আঘাতে ধ্বংস হয়, কিন্তু হৃদয়ের বন্ধন চিরস্থায়ী।
  • কাল-ঘাতে পাথরের নাম ক্ষীণ হয়, কিন্তু প্রেম-ভালোবাসার নাম চিরউজ্জ্বল থাকে।
  • তাই অর্থবলে নয়, গুণবলে যাঁরা মানুষের মন জয় করেছেন তাঁরাই অবিনশ্বর।
১০.৮ তোমার দৃষ্টিতে মানুষের স্মরণীয় হয়ে থাকার সেরা পন্থাটা কী?

আমার মতে, মানুষের স্মরণীয় হয়ে থাকার সেরা পন্থা হলো মানুষের জন্য কাজ করা। কোনো বড়ো পাথরের সৌধ বা বিরাট কীর্তিস্থাপনা নয়, বরং নিঃস্বার্থভাবে সমাজের মঙ্গল, দেশের উন্নতি ও জ্ঞান-সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখাই শ্রেষ্ঠ পথ। যে মানুষ অহংকার না করে, অর্থ-ক্ষমতার লোভ না করে, অন্যের উপকারে নিজেকে বিলিয়ে দেন—তিনিই চিরকাল মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। যেমন বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ।

১১-১২. প্রকল্প ও পত্রলিখন

১১ স্মরণীয় কয়েকজন বাঙালি মনীষীর চিত্র ও বাণীসম্বলিত একটি চার্ট তৈরি করো।

(এটি শিক্ষার্থীদের নিজের করতে হবে। নীচে নির্দেশিকা ও নমুনা দেওয়া হলো:)

করণীয়:

  • একটি বড়ো সাদা কাগজে (চার্ট পেপার) কাজ করবে।
  • উপরে বড়ো অক্ষরে শিরোনাম লেখো: বাঙালি মনীষীগণ
  • পাঁচ থেকে ছ'জন মনীষীর ছবি আঁকো বা সংবাদপত্র থেকে কেটে লাগাও। যেমন— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কাজী নজরুল ইসলাম, ক্ষুদিরাম বসু প্রমুখ।
  • প্রত্যেকের নীচে তাঁদের বিখ্যাত একটি করে বাণী বা উদ্ধৃতি লেখো। যেমন:
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: 'আমি ভালোবাসি এই বাঙলা ভাষাকে।'
    স্বামী বিবেকানন্দ: 'ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থেমো না।'
  • রঙিন কলম বা রং দিয়ে সুন্দর করে সাজাও।
১২ তুমি যাঁর জীবনের কথা জেনে অনুপ্রাণিত, এমন একজন মনীষীর জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনার কথা বন্ধুকে লিখে জানাও।

নমুনা চিঠি:

নিজ ঠিকানা
তারিখ: ___________

প্রিয় অনির্বাণ,

কেমন আছিস? অনেকদিন তোর সঙ্গে দেখা হয় না। আজ তোকে এমন একজনের গল্প বলবো, যাঁর জীবনী পড়ে আমি সত্যিই অনুপ্রাণিত হয়েছি।

জানিস, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা নিশ্চয়ই শুনেছিস। কিন্তু জানিস কি, তিনি যখন সংস্কৃত কলেজের ছাত্র, তখন কত কষ্ট করে পড়াশোনা করতেন? বাড়ি ছিল অতি দরিদ্র। রাতে রাস্তার গ্যাসলাইটের নীচে দাঁড়িয়ে পড়তেন। নিজের বাড়ির কাজও করতে হতো। তবু পরীক্ষায় সেরা ফল করতেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, এই মানুষটিই পরে বিধবা বিবাহ আইন প্রচলনের জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, নিজের টাকা খরচ করে বহু বিধবার পুনর্বিবাহ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মেয়েদের শিক্ষার জন্য কত স্কুল খুলেছেন!

ভাবতে পারিস, এত গরিব ঘরের ছেলে হয়েও কত বড়ো মনের মানুষ ছিলেন! পাথরের মূর্তি নয়, মানুষের সেবাই যে মানুষকে অমর করে, বিদ্যাসাগর তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

তুইও একবার তাঁর জীবনীটা পড়ে দেখিস। খুব ভালো লাগবে। চিঠি দিস।

ইতি,
তোর প্রিয় বন্ধু
[তোমার নাম]

১৩ কবিতাটি থেকে যে শিক্ষা পেলে, সে বিষয়ে একটি অনুচ্ছেদ রচনা করো।

"স্মৃতিচিহ্ন" কবিতা আমাকে এক গভীর শিক্ষা দিয়েছে—প্রকৃত অমরত্ব পাথরের সৌধে নয়, মানুষের হৃদয়ে। যুগে যুগে কত রাজা-মহারাজা, ধনী-মানী নিজেদের নাম পাথরে খোদাই করে রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু কালের প্রবাহে সে সব ধুয়ে-মুছে গেছে। অথচ যাঁরা নীরবে সমাজসেবা করে গেছেন, মানবকল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন—তাঁরা আজও সমুজ্জ্বল। বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ—কেউই ধনী ছিলেন না, কিন্তু হৃদয়ের ঐশ্বর্যে তাঁরা মানবহৃদয়-ভূমি অধিকার করে নিয়েছেন। এই কবিতা আমাদের শেখায়—টাকা-পয়সা বা বড়ো বাড়ির মালিক হওয়া নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।

কবিতা থেকে শিক্ষা

মনে রেখো: কবি কামিনী রায় "স্মৃতিচিহ্ন" কবিতায় আমাদের গভীর এক সত্য শিখিয়েছেন—ইট-পাথরের সৌধ বা ধন-সম্পদ নয়, মানুষের জন্য ভালোবাসা ও সেবাই প্রকৃত অমরত্ব দান করে। যাঁরা মানবহৃদয়-ভূমিতে অধিকার করে নিতে পেরেছেন, সময়ের প্রবাহও তাঁদের স্মৃতি কেড়ে নিতে পারে না।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

\'স্মৃতিচিহ্ন\' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুগের মহিলা কবি কামিনী রায় (১৮৬৪-১৯৩৩) রচিত। তিনি বরিশাল জেলার বাসন্তা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ \'আলো ও ছায়া\' প্রকাশিত হয়। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির \'সাহিত্য মেলা\' পাঠ্যপুস্তকের ষষ্ঠ পাঠের অন্তর্ভুক্ত।

স্মৃতিচিহ্ন\' কবিতার মূলভাব হলো—ইট-পাথরের সৌধ বা ধন-সম্পত্তির মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করা সম্ভব নয়। যারা পাথরে নাম খোদাই করে চিরস্মরণীয় হতে চান, সময়ের প্রবাহে তাঁদের সমস্ত কীর্তি ধ্বংস হয়ে যায়। সত্যিকারের অমরত্ব লাভ করে তারাই, যারা দীন-দরিদ্র হয়েও মানুষের জন্য কাজ করেন এবং মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। জনসেবা ও মানবপ্রেমই চিরস্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন।

কবিতায় \'কাল\'-কে একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—\'কাল-নদী জলে ভেসে যায় নামগুলি\'। যেমন নদীর স্রোতে সবকিছু ভেসে যায়, তেমনি সময়ের স্রোতে ইট-পাথরের স্মৃতিসৌধ ও তাতে খোদাই করা নাম-নিশানা বিলীন হয়ে যায়।