স্মৃতিচিহ্ন
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • ষষ্ঠ পাঠ (প্রথম কবিতা)
কবিতা
স্মৃতিচিহ্ন
কবি
কামিনী রায়
পাঠ
ষষ্ঠ পাঠ (সাহিত্য মেলা)
ধরন
ভাবমূলক/দার্শনিক কবিতা
সম্পূর্ণ কবিতা
স্মৃতিচিহ্ন✍️ স্মৃতিচিহ্ন
পাঠ-পরিচিতি প্রশ্নোত্তর
কবিতার সারাংশ ও মূলভাব
মূলভাব: "স্মৃতিচিহ্ন" কবিতায় কবি কামিনী রায় ইট-পাথরের সৌধের মাধ্যমে অমরত্ব লাভের প্রয়াসকে অর্থহীন বলে দেখিয়েছেন। যারা বিশাল অক্ষরে নিজেদের নাম প্রস্তরে খোদাই করে চিরস্মরণীয় হতে চায়, তারা আসলে মূঢ়—কারণ সময়ের প্রবাহে সে সব ভেঙে পড়ে, নামগুলি বিস্মৃতির অতলে ডুবে যায়। প্রকৃত অমরত্ব লাভ করে তারাই, যারা নিজেদের নাম পাথরে নয়, মানুষের হৃদয়ে খোদাই করে যায়—সেবা, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। দীন-দরিদ্র হয়েও যাঁরা মানুষের মন জয় করেছেন, কালের আঘাতেও তাঁদের নাম চিরউজ্জ্বল থাকে।
কেন্দ্রীয় চেতনা: ইট-পাথরের স্মৃতিসৌধ নয়, জনসেবা ও মানবপ্রেমই মানুষকে সত্যিকারের অমরত্ব দান করে।
১. ঠিক বক্তব্যের পাশে ✓ এবং ভুল বক্তব্যের পাশে ✕ চিহ্ন দাও
| ক্রমিক | বিবৃতি | চিহ্ন |
|---|---|---|
| ১.১ | ইট-পাথরের গড়া সৌধ কাউকে চিরস্মরণীয় করে রাখে না। | ✓ (ঠিক) |
| ১.২ | যাঁরা নিজেদের সৌধ গড়ে কীর্তিকে অমর করে রাখতে চান তাঁরা বরণীয়। | ✕ (ভুল) |
| ১.৩ | সাধারণ মানুষের মনে যাঁরা স্থান পেয়েছেন, তাঁদের নাম ভেসে যায়। | ✕ (ভুল) |
| ১.৪ | এমন বহু সহায়-সম্বলহীন, দরিদ্র মানুষ আছেন, মহাকাল যাঁদের স্মৃতি মুছে দিতে পারেন। | ✕ (ভুল) |
| ১.৫ | 'মানব হৃদয়-ভূমি' অধিকার করতে হলে মানুষের জন্য কল্যাণকর কাজ করতে হবে। | ✓ (ঠিক) |
২. কবিতা থেকে শব্দ চয়ন করে শূন্যস্থান পূরণ
ওরা ভেবেছিল আপনার নাম
মনোহর হর্ম্যরূপে বিশাল অক্ষরে
ইষ্টক-প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে
রেখে যাবে!
৩. বিপরীতার্থক শব্দ লেখো
| শব্দ | বিপরীতার্থক শব্দ |
|---|---|
| মনোহর | কুৎসিত / বিরূপ |
| বিশাল | ক্ষুদ্র |
| মূঢ় | জ্ঞানী / পণ্ডিত |
| ব্যর্থ | সার্থক |
| ভগ্ন | অখণ্ড / সম্পূর্ণ |
| লুপ্ত | প্রকট / বিদ্যমান |
| শুদ্ধ | অশুদ্ধ / কলুষিত |
| অধিকার | অনধিকার / বঞ্চনা |
| দুর্গ | উন্মুক্ত / অনাবৃত |
| অক্ষুণ্ণ | ক্ষুণ্ণ / খর্ব |
| ধ্বংস | নির্মাণ / সৃষ্টি |
| নিত্য | অনিত্য / ক্ষণস্থায়ী |
| সমুজ্জ্বল | ম্লান / নিষ্প্রভ |
৪. বিশেষ্য ↔ বিশেষণ রূপান্তর
| মূল শব্দ | প্রকার | রূপান্তর | প্রকার |
|---|---|---|---|
| নাম | বিশেষ্য | নামী | বিশেষণ |
| মনোহর | বিশেষণ | মনোহরত্ব | বিশেষ্য |
| প্রস্তর | বিশেষ্য | প্রস্তরীভূত | বিশেষণ |
| মূঢ় | বিশেষণ | মূঢ়তা | বিশেষ্য |
| ব্যর্থ | বিশেষণ | ব্যর্থতা | বিশেষ্য |
| ভগ্ন | বিশেষণ | ভগ্নাবশেষ | বিশেষ্য |
| ভূমি | বিশেষ্য | ভৌম | বিশেষণ |
| স্মৃতি | বিশেষ্য | স্মরণীয় | বিশেষণ |
| রক্ষা | বিশেষ্য | রক্ষিত | বিশেষণ |
| মানব | বিশেষ্য | মানবিক | বিশেষণ |
| হৃদয় | বিশেষ্য | হৃদয়ী | বিশেষণ |
| প্রতিষ্ঠা | বিশেষ্য | প্রতিষ্ঠিত | বিশেষণ |
| দুর্গ | বিশেষ্য | দুর্গম | বিশেষণ |
| দরিদ্র | বিশেষণ | দরিদ্রতা | বিশেষ্য |
৫. শব্দগুলির বাক্য প্রয়োগ
| শব্দ | বাক্যে প্রয়োগ |
|---|---|
| অক্ষর | বিশাল অক্ষরে নিজের নাম পাথরে খোদাই করে রাখা যায়। |
| চিরদিন | জীবনে সত্য কথা বলার শিক্ষা চিরদিন মনে রাখবে। |
| স্মৃতি | আমার ছেলেবেলার স্মৃতি খুব সুখের। |
| মানব | মানব সেবাই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। |
| রক্ষা | দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। |
| অধিকার | সব মানুষের শিক্ষার অধিকার আছে। |
| সম্বল | তাঁর একমাত্র সম্বল পৈতৃক বাড়িটি। |
| প্রতিষ্ঠা | সততার মাধ্যমেই জীবনে প্রতিষ্ঠা আসে। |
৬. সন্ধি বিচ্ছেদ করো
| শব্দ | সন্ধি বিচ্ছেদ |
|---|---|
| মনোহর | মনঃ + হর (বিসর্গসন্ধি) |
| মনস্কাম | মনঃ + কাম (বিসর্গসন্ধি) |
| ব্যর্থ | বি + অর্থ (স্বরসন্ধি) |
| সিংহাসন | সিংহ + আসন (স্বরসন্ধি) |
| প্রতিষ্ঠা | প্রতি + স্থা (ব্যঞ্জনসন্ধি) |
| সমুজ্জ্বল | সম + উজ্জ্বল (ব্যঞ্জনসন্ধি) |
| প্রস্তর | প্র + স্তর (ব্যঞ্জনসন্ধি) |
৭. শব্দগুলির গদ্যরূপ লেখো
| কাব্যিক রূপ | গদ্যরূপ |
|---|---|
| আপনার | নিজের / আপন |
| রচি | রচনা করে |
| তরে | জন্য / নিমিত্ত |
| খসেছে | খসে পড়েছে |
| ভূমে | ভূমিতে / মাটিতে |
| আছিল | ছিল |
| হের | দেখো |
৮. মূল শব্দ নির্ণয় করো
| শব্দ | মূল শব্দ |
|---|---|
| মন | মনস্ (মন/হৃদয়) |
| হর্ম্য | হর্ম্যঃ (অট্টালিকা/প্রাসাদ) |
| মূঢ় | মুহ্ ধাতু (মোহপ্রাপ্ত/অজ্ঞান) |
| দরিদ্র | দ্রবিদ্র (গরিব/দীন) |
| নদী | নদ + ঈ (স্ত্রীলিঙ্গ) |
৯. সংক্ষিপ্ত ও যথাযথ উত্তর দাও
১০. তিন-চারটি বাক্যে উত্তর দাও
এখানে সেই সমস্ত সম্পদশালী, ক্ষমতাবান ও অহংকারী মানুষদের কথা বলা হয়েছে যাঁরা নিজেদের ক্ষমতা ও অর্থবলে ইট-পাথরের বিরাট সৌধ নির্মাণ করে তাতে নিজেদের নাম বড়ো অক্ষরে খোদাই করে রাখতেন। তাঁরা ভেবেছিলেন এই পাথরের স্মৃতিসৌধ চিরকাল অটুট থাকবে এবং তাঁদের নামও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও মূঢ়তাপূর্ণ ছিল।
কবি তাদের মূঢ় বলেছেন কারণ:
- তাঁরা ভেবেছিলেন পাথরের সৌধ চিরস্থায়ী—কিন্তু সময়ের আঘাতে পাথরও ক্ষয় হয়, ভেঙে পড়ে।
- তাঁরা বুঝতে পারেননি প্রকৃত অমরত্ব পাথরের সৌধে নয়, মানুষের হৃদয়ে স্থান পেতে পারলেই লাভ করা যায়।
- তাঁদের অর্থ-ক্ষমতার অহংকারকে কবি মোহ বা মূঢ়তা বলেই গণ্য করেছেন।
এখানে পাথরের গায়ে খোদাই করা নামগুলির রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কালের স্রোতে প্রস্তরখণ্ডগুলি খসে পড়ে, সব ভেঙে চুরমার হয়ে স্তূপাকার হয়ে পড়ে। তার ওপর জন্মায় ঘাস ও আগাছা। কাল-নদীর জলে নামগুলি ভেসে যায়। তাই কেউ আর সেই নামগুলি রক্ষা করতে পারে না।
যাঁরা আর্থিকভাবে গরিব ছিলেন, সহায়-সম্বলহীন ছিলেন কিন্তু হৃদয়ের গুণে মহীয়ান ছিলেন—তাঁদের কথা বলা হয়েছে। পাথরের সৌধ বানানোর মতো অর্থ-বিত্ত তাঁদের ছিল না, কিন্তু তাঁরা মানুষের জন্য মহৎ কাজ করেছেন। তাঁদের রাজত্ব অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে কারণ তাঁরা পাথরে নয়, মানুষের হৃদয়ে নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন। মানবহৃদয়-ভূমি তাঁদের চিরস্থায়ী সিংহাসন। তাই কালের আঘাতেও তাঁদের নাম ক্ষীণ হয় না—নিত্য সমুজ্জ্বল থাকে।
কালপ্রবাহে ধুয়ে যায় তাঁদের নাম, যাঁরা পাথরের স্মৃতিসৌধ বা বাহ্যিক কীর্তির মাধ্যমে অমরত্ব চেয়েছিলেন। কিন্তু যাঁরা মানবসেবা, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, সময়ের প্রবাহ কখনো তাঁদের স্মৃতি গ্রাস করতে পারে না। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধীর মতো মানুষেরা আজও সমুজ্জ্বল।
যাঁরা দীন-দুঃখীর সেবা করেছেন, দেশ ও সমাজের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, সবার জন্য ভালোবাসা রেখেছেন—তাঁরা মানুষের হৃদয়রূপ ভূমি অধিকার করে নিয়েছেন। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে কাজ করে, সম্পদ ও ক্ষমতার লোভ না করে, নীরবে মানুষের কল্যাণসাধনের মধ্য দিয়েই এই অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
কবিতায় কবি পাথরের সৌধ নির্মাণকারীদের \'মূঢ়\' বলেছেন। আর যাঁরা দরিদ্র থেকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়েছেন, তাঁদেরই \'নিত্য সমুজ্জ্বল\' বলেছেন। কারণ:
- পাথরের সৌধ সময়ের আঘাতে ধ্বংস হয়, কিন্তু হৃদয়ের বন্ধন চিরস্থায়ী।
- কাল-ঘাতে পাথরের নাম ক্ষীণ হয়, কিন্তু প্রেম-ভালোবাসার নাম চিরউজ্জ্বল থাকে।
- তাই অর্থবলে নয়, গুণবলে যাঁরা মানুষের মন জয় করেছেন তাঁরাই অবিনশ্বর।
আমার মতে, মানুষের স্মরণীয় হয়ে থাকার সেরা পন্থা হলো মানুষের জন্য কাজ করা। কোনো বড়ো পাথরের সৌধ বা বিরাট কীর্তিস্থাপনা নয়, বরং নিঃস্বার্থভাবে সমাজের মঙ্গল, দেশের উন্নতি ও জ্ঞান-সংস্কৃতির বিকাশে অবদান রাখাই শ্রেষ্ঠ পথ। যে মানুষ অহংকার না করে, অর্থ-ক্ষমতার লোভ না করে, অন্যের উপকারে নিজেকে বিলিয়ে দেন—তিনিই চিরকাল মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। যেমন বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ।
১১-১২. প্রকল্প ও পত্রলিখন
(এটি শিক্ষার্থীদের নিজের করতে হবে। নীচে নির্দেশিকা ও নমুনা দেওয়া হলো:)
করণীয়:
- একটি বড়ো সাদা কাগজে (চার্ট পেপার) কাজ করবে।
- উপরে বড়ো অক্ষরে শিরোনাম লেখো: বাঙালি মনীষীগণ
- পাঁচ থেকে ছ'জন মনীষীর ছবি আঁকো বা সংবাদপত্র থেকে কেটে লাগাও। যেমন— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কাজী নজরুল ইসলাম, ক্ষুদিরাম বসু প্রমুখ।
- প্রত্যেকের নীচে তাঁদের বিখ্যাত একটি করে বাণী বা উদ্ধৃতি লেখো। যেমন:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: 'আমি ভালোবাসি এই বাঙলা ভাষাকে।'
স্বামী বিবেকানন্দ: 'ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত থেমো না।' - রঙিন কলম বা রং দিয়ে সুন্দর করে সাজাও।
নমুনা চিঠি:
নিজ ঠিকানা
তারিখ: ___________
প্রিয় অনির্বাণ,
কেমন আছিস? অনেকদিন তোর সঙ্গে দেখা হয় না। আজ তোকে এমন একজনের গল্প বলবো, যাঁর জীবনী পড়ে আমি সত্যিই অনুপ্রাণিত হয়েছি।
জানিস, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা নিশ্চয়ই শুনেছিস। কিন্তু জানিস কি, তিনি যখন সংস্কৃত কলেজের ছাত্র, তখন কত কষ্ট করে পড়াশোনা করতেন? বাড়ি ছিল অতি দরিদ্র। রাতে রাস্তার গ্যাসলাইটের নীচে দাঁড়িয়ে পড়তেন। নিজের বাড়ির কাজও করতে হতো। তবু পরীক্ষায় সেরা ফল করতেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, এই মানুষটিই পরে বিধবা বিবাহ আইন প্রচলনের জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, নিজের টাকা খরচ করে বহু বিধবার পুনর্বিবাহ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মেয়েদের শিক্ষার জন্য কত স্কুল খুলেছেন!
ভাবতে পারিস, এত গরিব ঘরের ছেলে হয়েও কত বড়ো মনের মানুষ ছিলেন! পাথরের মূর্তি নয়, মানুষের সেবাই যে মানুষকে অমর করে, বিদ্যাসাগর তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
তুইও একবার তাঁর জীবনীটা পড়ে দেখিস। খুব ভালো লাগবে। চিঠি দিস।
ইতি,
তোর প্রিয় বন্ধু
[তোমার নাম]
"স্মৃতিচিহ্ন" কবিতা আমাকে এক গভীর শিক্ষা দিয়েছে—প্রকৃত অমরত্ব পাথরের সৌধে নয়, মানুষের হৃদয়ে। যুগে যুগে কত রাজা-মহারাজা, ধনী-মানী নিজেদের নাম পাথরে খোদাই করে রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু কালের প্রবাহে সে সব ধুয়ে-মুছে গেছে। অথচ যাঁরা নীরবে সমাজসেবা করে গেছেন, মানবকল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন—তাঁরা আজও সমুজ্জ্বল। বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ—কেউই ধনী ছিলেন না, কিন্তু হৃদয়ের ঐশ্বর্যে তাঁরা মানবহৃদয়-ভূমি অধিকার করে নিয়েছেন। এই কবিতা আমাদের শেখায়—টাকা-পয়সা বা বড়ো বাড়ির মালিক হওয়া নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।