জাতের বজ্জাতি

কাজী নজরুল ইসলাম রচিত 'জাতের বজ্জাতি' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ ও ব্যাখ্যা | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

✊ জাতের বজ্জাতি

কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • ষষ্ঠ পাঠ • সংক্ষিপ্ত

সাম্যবাদ জাতপাতের বিরোধ মানবপ্রেম বিদ্রোহ

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৮ - ১৯৭৬)

জন্ম বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামে। গত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় কবি। বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং বাংলা সাহিত্যের 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে চিরস্মরণীয়। বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী', 'সাম্যবাদী'। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ 'অগ্নিবীণা', 'বিষের বাঁশী', 'ভাঙার গান', 'ছায়ানট' প্রভৃতি। 'ধূমকেতু' নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি কিছু উপন্যাস, ছোটোগল্প ও নাটক লিখেছেন। তাঁর রচিত অজস্র গান বাঙালির অমূল্য সম্পদ। 'জাতের বজ্জাতি' কবিতায় তিনি জাতপাতের ভেদাভেদের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

📜

কবিতা

জাতের বজ্জাতি

👑

কবি

কাজী নজরুল ইসলাম

✊

ধরন

সাম্যবাদী / বিদ্রোহী কবিতা

📚

পাঠ

ষষ্ঠ পাঠ (সাহিত্য মেলা)

সম্পূর্ণ কবিতা

সংক্ষিপ্ত
জাতের নামে বজ্জাতি সব
জাত-জালিয়াং খেলছে জুয়া
ছুঁলেই তোর জাত যাবে?
জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া॥

হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি,
ভাবিল এতেই জাতির জন,
তাইত বেকুব, করিল তারা
এক জাতিকে এক শ' খান!

এখন দেখিস ভারত জোড়া
পেচে আছিস বাঁশ মোড়া,
মানুষ নাই আজ, আছে শুধু
জাত-মোয়ালের হুকনাহুকা॥

জানিস না কি ধর্ম সে যে
বরং সম সহনশীল,
তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে
ছোঁওয়া-ছুঁইয়ের ছোটু চিল!

যে জাত-ধর্ম হুঁকোয় এত,
আজ নয় কাল ভাঙবে সে তো,
যাক না সে জাত জাহান্নমে,
রইবে মানুষ, নাই পরোয়া॥

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

সারমর্ম: "জাতের বজ্জাতি" কাজী নজরুল ইসলামের এক তীব্র বিদ্রোহী কবিতা, যেখানে তিনি জাতপাত ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কবির বক্তব্য—\’জাতের নামে যা কিছু বজ্জাতি (অত্যাচার-অবিচার) হচ্ছে, তা একপ্রকার জুয়া খেলা।\’ সমাজ এক জাতিকে টুকরো টুকরো করে একশো খান করে ফেলেছে। \’হুঁকোর জল\’ আর \’ভাতের হাঁড়ি\’ নিয়ে যত মতভেদ, যেন মানুষের জাত এতেই নির্ধারিত হয়!

কবি বলেছেন, ধর্ম তো সহনশীলতার কথা বলে—তবে এই ছোঁওয়া-ছুঁইয়ের (ছোঁয়া-অছোঁয়ার) ছোটখাটো পর্দা তাকে কী করে ভাঙতে পারে? কিন্তু যে জাতধর্ম কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে (\’হুঁকোর জল\’) বিশ্বাসী, তা আজ না হয় কাল ভেঙে পড়বে। তা জাহান্নমেই (ধ্বংসই) যাক না! কিন্তু মানুষ থাকবে—এ নিয়ে কবির কোনো পরোয়া (চিন্তা) নেই।

কেন্দ্রীয় চেতনা: জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ ও ছুঁৎমার্গ মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু। এগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও মানবতা অটুট থাকবে।

অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর

গভীর ব্যাখ্যা
১ "জাতের নামে বজ্জাতি সব / জাত-জালিয়াং খেলছে জুয়া" — এখানে কবি কী বলতে চেয়েছেন?

কবি বলতে চেয়েছেন, সমাজে জাতির নামে যত অনাচার ও অত্যাচার (\’বজ্জাতি\’) চলে, তা আসলে ভণ্ডামি। যারা জাতপাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, তারা প্রকৃতপক্ষে জাতপাতের নামে এক ধোঁকাবাজির খেলা (\’জুয়া\’) খেলছে। \’জাত-জালিয়াং\’ বলতে বোঝাচ্ছেন জাতপাত নিয়ে যারা কারিকুরি বা জালিয়াতি করে।

২ "ছুঁলেই তোর জাত যাবে? / জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া" — এই উক্তির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

কবি তীব্র ব্যঙ্গ করে বলছেন—তোমার জাত বুঝি স্পর্শেই নষ্ট হয়ে যাবে? তোমার জাত বুঝি ছেলের হাতের \’মোয়া\’ (মুড়কি বা মিষ্টির টুকরো) নয়, যা স্পর্শ করলেই নষ্ট হবে! অর্থাৎ, জাত এতই ভঙ্গুর নয় যে কারও ছোঁয়া লাগলেই হারিয়ে যাবে। এটি অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়।

৩ "হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, / ভাবিল এতেই জাতির জন" — এই চরণের অর্থ ব্যাখ্যা করো।

কবির বক্তব্য—মানুষ \’হুঁকোর জল\’ (কার হুঁকোয় জল দেওয়া যায় আর কারটা ছোঁয়া যায় না) আর \’ভাতের হাঁড়ি\’ (কার হাতে রান্না করা ভাত খাওয়া যায় আর কারটা যায় না) নিয়েই জাতির পরিচয় ভেবে নিয়েছে! অর্থাৎ জাতির জীবন (জন) এতটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে যে, কেবল এই ছুঁৎমার্গই বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪ "তাইত বেকুব, করিল তারা / এক জাতিকে এক শ' খান!" — এর মর্মার্থ কী?

কবি অত্যন্ত খেদের সুরে বলছেন—মানুষ বেকুব (নির্বোধ) বলেই এক জাতিকে (মানবজাতি) অযথা টুকরো করে একশো খণ্ড বানিয়েছে! হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্মণ, শূদ্র, কায়েত, হাঁড়ি, ডোম—এভাবে একটাই মানবসমাজকে অসংখ্য ছোটো ছোটো গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে।

৫ "এখন দেখিস ভারত জোড়া / পেচে আছিস বাঁশ মোড়া" — এখানে ভারতের অবস্থা কীভাবে বর্ণিত হয়েছে?

কবি সেদিনের ভারতের করুণ অবস্থার কথা বলছেন। পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে জাতপাতের বাঁশ (বাঁশের মতো শক্ত করে বাঁধা কুসংস্কার) মানুষের গলায় পেঁচিয়ে মোড়া রয়েছে। অর্থাৎ, গোটা দেশ জাতপাতের অন্ধবিশ্বাসের জিঞ্জিরে আবদ্ধ।

৬ "মানুষ নাই আজ, আছে শুধু / জাত-মোয়ালের হুকনাহুকা" — এর অর্থ কী?

কবির এই উক্তি গভীর বেদনা ও ক্ষোভের। তিনি বলছেন—আজ পৃথিবীতে সত্যিকারের \’মানুষ\’ বলতে কেউ নেই। যা আছে, তা হল জাতপাতের গোঁড়ামি নিয়ে ব্যস্ত কিছু লোক—তাদের শুধু তর্ক (\’হুকনাহুকা\’ = তু তু মাই মাই) আর ঝগড়া। এরা মানুষ নামের যোগ্য নয়।

৭ "যে জাত-ধর্ম হুঁকোয় এত, / আজ নয় কাল ভাঙবে সে তো" — কবির এই ভবিষ্যদ্বাণীর তাৎপর্য কী?

কবি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করছেন—যে জাত-ধর্ম কেবল \’হুঁকোয়\’ (বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে) আটকে আছে, অর্থাৎ যার আসল ভিত্তিই পচা, তা আজ না হোক কাল ঠিক ভেঙে পড়বে। সময়ের চাকায় এসব গোঁড়ামি টিকতে পারবে না।

৮ "যাক না সে জাত জাহান্নমে, / রইবে মানুষ, নাই পরোয়া" — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

এটি কবিতার চরম উপলব্ধি। কবি নির্দ্বিধায় বলছেন—এসব ভেদাভেদ, গোঁড়ামি, জাতপাত—সব জাহান্নমে যাক! অর্থাৎ ধ্বংস হয়ে যাক। তাতে কী এসে যায়? মানুষ থাকবে। মানবতা চিরন্তন। মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা কখনও ধ্বংস হবে না। আর এ নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা বা পরোয়া কবির নেই।

নজরুলের অমর বাণী

কাজী নজরুল ইসলামের "জাতের বজ্জাতি" কবিতাটি আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে লেখা হলেও আজও সমান প্রাসঙ্গিক। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, ছুঁৎমার্গ—এসব একদিন ঠিক ভেঙে পড়বে, কিন্তু মানুষ রবে, মানবতা রবে। নজরুলের এই চিরন্তন বাণী আমাদের সকলের জন্য এক শক্তিশালী প্রেরণা।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'জাতের বজ্জাতি' কবিতাটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৮-১৯৭৬) রচিত। এটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির 'সাহিত্য মেলা' পাঠ্যপুস্তকের ষষ্ঠ পাঠে অন্তর্ভুক্ত। কবিতার মূল বক্তব্য—জাতপাত, ধর্মীয় ভেদাভেদ ও ছুঁৎমার্গ মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু। এগুলি একদিন ধ্বংস হবে, কিন্তু মানবতা চিরন্তন। কবি জাতির নামে বজ্জাতি করার তীব্র বিরোধিতা করে সাম্য ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন।

এই উক্তির মাধ্যমে কবি তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেছেন—তোমার জাত কি এতই ভঙ্গুর যে ছোঁয়া লাগলেই নষ্ট হবে? জাত তো আর ছেলের হাতের 'মোয়া' (মুড়কি বা মিষ্টির টুকরো) নয়, যা কেউ স্পর্শ করলেই অখাদ্য হয়ে যায়! কবি এখানে জাতপাত নিয়ে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের প্রতি কঠোর আঘাত হেনেছেন।

কবি গভীর বেদনা নিয়ে বলেছেন—আজ সত্যিকারের 'মানুষ' বলতে কেউ নেই। যা আছে, তা হল জাতপাতের গোঁড়ামি নিয়ে ব্যস্ত কিছু লোক—যারা কেবল তর্ক-ঝগড়া (হুকনাহুকা) করেই দিন কাটাচ্ছে। এরা মানুষ নামের যোগ্য নয়। কবির মতে, মানুষ তো সেই, যে মানুষকে মানুষ বলে জানে—জাত বা ধর্ম দিয়ে বিচার করে না।