একুশের তাৎপর্য

আবুল ফজল রচিত 'একুশের তাৎপর্য' প্রবন্ধটির সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, ব্যাখ্যা ও সমাধান | সপ্তম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

📖 একুশের তাৎপর্য

আবুল ফজল প্রবন্ধ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • দ্বিতীয় পাঠ • 'একুশ মানে মাথা নত না করা'

ভাষার দাবি জাতীয় চেতনা মাতৃভাষা ২১ ফেব্রুয়ারি

আবুল ফজল (১৯০৩ - ১৯৪৩)

বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, কথাশিল্পী ও সমাজ-সচেতন লেখক। জন্ম চট্টগ্রামে (অধুনা বাংলাদেশ)। উপন্যাস, ছোটোগল্প, নাটক—সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। 'রেখাচিত্র' গ্রন্থের জন্য 'আদমজি পুরস্কার' লাভ করেন। 'শিখা' পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। 'একুশের তাৎপর্য' প্রবন্ধটি তাঁর 'একুশ মানে মাথা নত না করা' রচনা থেকে গৃহীত, যেখানে ভাষা আন্দোলনের দার্শনিক ও সামাজিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

📝

প্রবন্ধ

একুশের তাৎপর্য

👤

লেখক

আবুল ফজল

📚

গ্রন্থ

একুশ মানে মাথা নত না করা

🏫

পাঠ

দ্বিতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)

প্রবন্ধের সারাংশ ও মূলভাব

সারমর্ম: আবুল ফজল রচিত "একুশের তাৎপর্য" একটি গভীর ও যুক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ, যেখানে মাতৃভাষার গুরুত্ব, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং একুশের চেতনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেখক প্রশ্ন তুলেছেন—"সে কী ও কেন, ভাষা দিয়ে কী হয় ব্যক্তি আর জাতির?" এর উত্তরে তিনি বলেছেন, ভাষা ছাড়া মানুষ ভাবতে পারে না, কল্পনা করতে পারে না, চিন্তা করতে পারে না। মানুষ তার নিজস্বতা ও সত্তা প্রকাশ করে ভাষার মাধ্যমেই।

ভাষা কেবল ব্যক্তির নয়, জাতিরও পরিচয় বহন করে। একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে কেন্দ্র করেই জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠে। তাই মাতৃভাষার দাবি প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে হলেও প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এই দাবি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদরা প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁরা শুধু বাংলা ভাষাকে বাঁচাননি, বাংলার মানুষকেও বেঁচে থাকার পথ দেখিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় বার্তা: একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হবে গোটা বছর ধরে—শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়, মাতৃভাষার প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ব সারা বছরই আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।

অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর

সংক্ষিপ্ত ও ব্যাখ্যামূলক
১ ভাষা মানুষের জন্য কেন অপরিহার্য?

আবুল ফজলের মতে, ভাষা ছাড়া মানুষ ভাবতে পারে না, কল্পনা করতে পারে না, চিন্তা করতে পারে না। মানুষ একই সঙ্গে প্রকাশ ও বিকাশধর্মী জীব। ভাষা ছাড়া মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে অক্ষম। এমনকি মানুষের সার্বিক (সর্বাঙ্গীণ) বিকাশও ভাষাকে অবলম্বন করেই ঘটে। তাই ব্যক্তি মানুষ হয়ে উঠতেও ভাষা প্রয়োজন।

২ ভাষা কীভাবে জাতিকে জাতীয় সত্তারূপে গড়ে তোলে?

লেখক বলেছেন, একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে কেন্দ্র করে গোটা জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়। ভাষাই জাতির প্রাণ। ভাষা ছাড়া জাতি জাতি হয়ে উঠতে পারে না। সেই ভাষাই জাতির সাহিত্য, শিল্প, সভ্যতা, সংস্কৃতির প্রাণ। তাই কোনো জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় মাতৃভাষা তথা মাতৃভাষার সাহিত্য অপরিহার্য।

৩ \'মাতৃভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হয় প্রাণ এবং রক্তের বিনিময়ে\'— কেন এই উক্তি করা হয়েছে?

কারণ মাতৃভাষা মানুষের অস্তিত্বেরই সমার্থক। এটি কোনো সাধারণ দাবি নয়, এটি \'প্রাণের দাবি\', \'মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার দাবি\'। যদি কোনো শক্তি এই মাতৃভাষাকে কেড়ে নিতে চায়, তবে তা আত্মার ওপর আঘাত। তাই প্রাণ দিয়েও মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর জীবন্ত প্রমাণ।

৪ একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের আত্মদান কেন চিরস্মরণীয়?

তাঁরা শুধু বাংলা ভাষাকে বাঁচাননি, বাঙালি জাতিকেও বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার এমন অনন্য দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও নেই। তাই তাঁরা ও তাঁদের স্মৃতি চিরস্মরণীয়। একুশের শহীদরা বাঙালির চির অমর গৌরব ও গর্বের প্রতীক।

৫ \'একুশে ফেব্রুয়ারিকে সার্ধক করতে হলে একুশের ফেব্রুয়ারির এ তাৎপর্য বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে বৎসরে শুধু এক দিন নয়; সারা বৎসর ধরেই\'— উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।

লেখক এখানে সতর্ক করেছেন যে, একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের দিন বা বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এই দিনের যে প্রকৃত তাৎপর্য—মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আত্মসম্মান—তা সারা বছর ধরে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ ও লালন করতে হবে। নইলে একুশের চেতনা ভুলে যাওয়া হবে একুশের শহীদদের প্রতি সবচেয়ে বড়ো অসম্মান।

৬ মাতৃভাষা রক্ষায় আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব কী কী?

লেখক-নির্দেশিত ও সার্বিকভাবে:

  • নিজের মাতৃভাষায় কথা বলা, পড়া ও লেখার চর্চা বাড়ানো।
  • মাতৃভাষার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।
  • যেখানে অন্য ভাষার অপ্রয়োজনীয় আধিপত্য, সেখানে নিজের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
  • শহীদদের আত্মত্যাগের মূল্য দিতে ভাষার মানোন্নয়নে কাজ করা।
৭ একুশের শহীদরা কীভাবে \'আমাদের বাঁচার পথ করে দিয়েছেন\'?

ভাষা না থাকলে জাতি হিসেবে বাঙালির কোনো পরিচয় থাকত না। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা বাংলা ভাষাকে দাবিয়ে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। শহীদরা প্রাণ দিয়ে সেই অপচেষ্টা রুখে দেন। ফলে বাঙালি জাতি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার পায়। সুতরাং তাঁরা বাঙালির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষা করেছেন।

শব্দার্থ, টীকা ও ব্যাকরণ চর্চা

শব্দ / শব্দবন্ধঅর্থ
তাৎপর্যমর্ম, অর্থ, গুরুত্ব, তাৎপর্য (Significance)।
বিকাশধর্মীযার ক্রমাগত বিকাশ ঘটে; উন্নয়নশীল।
সার্বিকসর্বাঙ্গীণ, সকল দিক দিয়ে সম্পূর্ণ।
অপরিহার্যযা ছাড়া চলে না; একান্ত প্রয়োজনীয়।
প্রতিষ্ঠাস্থাপন করা, দাবি আদায় করা; সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া।
আপসসমঝোতা, কোনো বিষয়ে আংশিক ছাড় দেওয়া।
বিনিময়পরিবর্তে কিছু দেওয়া বা নেওয়া; বিনিময়ে।
চিরস্মরণীয়যাকে চিরকাল স্মরণ করা হবে; অবিস্মরণীয়।
গৌরবমর্যাদা, সম্মান, গর্বের বিষয়।
কর্তব্যযা করা উচিত; দায়িত্ব, কাজ।

বড়ো প্রশ্নোত্তর (রচনাধর্মী)

র 'একুশের তাৎপর্য' প্রবন্ধে আবুল ফজল ভাষা ও জাতীয় জীবনের সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন? ব্যক্তি ও জাতির জীবনে ভাষার ভূমিকা সম্পর্কে লেখকের বক্তব্য নিজের ভাষায় লেখো।

'একুশের তাৎপর্য' প্রবন্ধে আবুল ফজল ভাষাকে শুধু প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি ভাষাকে দেখেছেন ব্যক্তি ও জাতির অস্তিত্বের মূল শর্ত হিসেবে।

ব্যক্তি-জীবনে ভাষা: লেখকের মতে, মানুষ একটি প্রকাশ ও বিকাশধর্মী জীব। ভাষা ছাড়া মানুষ ভাবতে, কল্পনা করতে, চিন্তা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। ব্যক্তির সমগ্র মনন ও বোধের জগৎ গড়ে ওঠে ভাষার ওপর ভর করেই। মানুষ তার ব্যক্তিসত্তাকে খুঁজে পায় এবং প্রকাশ করে ভাষার মাধ্যমেই। তাই ভাষা ব্যক্তির 'আমি'-কে বিকশিত করে তোলে।

জাতীয় জীবনে ভাষা: জাতির ক্ষেত্রে ভাষা আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে কেন্দ্র করে জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়, জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠে। সেই ভাষায় রচিত সাহিত্য, শিল্প, সভ্যতা ও সংস্কৃতিই জাতির প্রাণ। মাতৃভাষাই জাতিকে স্বকীয়তা ও সার্বভৌমত্ব দেয়। তাই মাতৃভাষার জন্য আপস করা যায় না।

একুশের প্রাসঙ্গিকতা: ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি এই সত্যই প্রতিষ্ঠা করেছে যে, মাতৃভাষার দাবি 'প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে হলেও' রক্ষা করতে হবে। ভাষা শহীদরা সেই সংগ্রামে প্রাণ দিয়ে বাঙালির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষা করেছেন। লেখক পরিশেষে সতর্ক করে দিয়েছেন—একুশের এই মর্মবাণী শুধু একটি দিনের জন্য নয়; সারা বছর, সারা জীবন ধারণ করতে হবে। এটাই হবে একুশের প্রকৃত চেতনার প্রতি আমাদের সার্থক শ্রদ্ধা।

একুশের শিক্ষা: শুধু একদিন নয়, সারা জীবন

আবুল ফজল আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একইসঙ্গে ব্যক্তির আত্মার প্রকাশ এবং জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি। ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদরা যে আত্মত্যাগ করেছেন, তার মূল্য দিতে হবে ভাষার মানোন্নয়ন, চর্চা ও সম্মান রক্ষার মাধ্যমে। একুশের তাৎপর্য শুধু অতীত নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও পাথেয়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

\'একুশের তাৎপর্য\' প্রবন্ধটি বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কথাশিল্পী আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৪৩) রচিত। এটি তাঁর \'একুশ মানে মাথা নত না করা\' রচনা থেকে গৃহীত হয়েছে। প্রবন্ধটি WBBSE সপ্তম শ্রেণির \'সাহিত্য মেলা\' পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় পাঠে অন্তর্ভুক্ত। আবুল ফজল \'রেখাচিত্র\' গ্রন্থের জন্য \'আদমজি পুরস্কার\' লাভ করেন।

এ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য: ভাষা ছাড়া মানুষ ভাবতে, কল্পনা করতে বা চিন্তা করতে পারে না; ভাষাই ব্যক্তির পরিচয় ও বিকাশের ভিত্তি। একইভাবে, একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে কেন্দ্র করেই জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠে। মাতৃভাষার দাবি প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে হলেও প্রতিষ্ঠা করতে হয়—এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন। শহীদরা শুধু বাংলা ভাষাকে নয়, বাঙালি জাতিকেও বাঁচিয়ে গেছেন। তাই একুশের চেতনা শুধু একদিনের নয়, সারা বছরের জন্য ধারণ করতে হবে।

কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে রক্ত দেওয়ার এমন অনন্য ঘটনা ঘটেনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলার ছাত্র-জনতা মাতৃভাষা বাংলার জন্য শান্তিপূর্ণ মিছিল করলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার এমন গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সারা পৃথিবীতে বিরল, তাই আবুল ফজল বলেছেন—\'ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার এমন অনন্য দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই\'।