কুতুব মিনারের কথা

সৈয়দ মুজতবা আলি রচিত 'কুতুব মিনারের কথা' প্রবন্ধের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

কুতুব মিনারের কথা

সৈয়দ মুজতবা আলি প্রবন্ধ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • তৃতীয় পাঠ

কুতুব মিনার স্থাপত্য হিন্দু-মুসলিম মিলন ইতিহাস ভারতবর্ষ

সৈয়দ মুজতবা আলি (১৯০৪ - ১৯৭৪)

জন্ম শ্রীহট্টের করিমগঞ্জে। বাবার নাম সৈয়দ সিকান্দার আলি। মহাত্মা গান্ধীর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে স্কুল ছাড়েন। শান্তিনিকেতনে পড়া শেষ করে কাবুলের শিক্ষাভবনে অধ্যাপক হন। আরবি, ফারসি, জার্মান সহ ১৫টি ভাষা জানতেন। প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস ও রম্য-রচনায় তাঁর দক্ষতা অসামান্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: \'দেশে বিদেশে\', \'পঞ্চতন্ত্র\', \'চাচাকাহিনী\', \'ময়ূরকণ্ঠী\', \'শবনম\', \'ধূপছায়া\', \'টুনিমেম\', \'লিটনের\' প্রভৃতি। \'নরসংহদাস পুরস্কার\'-এ সম্মানিত।

📝

প্রবন্ধ

কুতুব মিনারের কথা

👤

লেখক

সৈয়দ মুজতবা আলি

📚

পাঠ

তৃতীয় পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

স্থাপত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ

প্রবন্ধের সারাংশ ও মূলভাব

মূলভাব: "কুতুব মিনারের কথা" প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলি দিল্লির ঐতিহাসিক কুতুব মিনারের স্থাপত্যশৈলী, সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেছেন। কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার—এর কোনো পূর্বনির্দেশ ভারত, ইরান বা তুরানেও নেই। লেখক মিনারটির পাঁচতলা কাঠামো, প্রতিটি তলার নকশা, গায়ের কারুকার্য, হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যের মিলন এবং আলাউদ্দিন খিলজির ব্যর্থ প্রয়াসের কথা বলেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটি উঠে এসেছে তা হলো: কুতুব মিনারে হিন্দু ও মুসলিম শিল্পীদের যৌথ কাজের এক অসাধারণ নিদর্শন রয়ে গেছে। শিল্প আর সংস্কৃতির জগতে হিন্দু-মুসলমান প্রথম দিনেই যে মিলন ঘটিয়েছিল, আজও তা অটুট—এ যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক।

১. অনধিক দুইটি বাক্যে উত্তর দাও

5 টি
১.১ কোন স্মারক \'অশোক স্তম্ভ\' কে দিল্লি নিয়ে এসেছিলেন?
\'অশোক স্তম্ভ\' টি দিল্লি নিয়ে এসেছিলেন ফিরোজ শাহ তুঘলক। লেখক উল্লেখ করেছেন: \'যিনি অশোক স্তম্ভ দিল্লি আনেন; ইনি যেমন নিজে সংসার ইমারত বানাতেন ঠিক তেমনই আকারে অন্যের ইমারত ক্ষতিগ্রস্ত করে দিতেন—দিল্লির অতীত রাজাদেরই এই দ্বিতীয় গুণটি পাওয়া যায়।\'
১.২ কুতুব মিনার নামটি কার নামানুসারে রাখা হয়েছে এবং কেন?
কুতুব মিনার নামটি রাখা হয়েছে কুতুবউদ্দিন আইবক-এর নামানুসারে। তিনি ছিলেন দাস বংশের প্রথম সুলতান যিনি ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে এই মিনারটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর নামানুসারেই এই স্তম্ভের নাম \'কুতুব মিনার\' রাখা হয়।
১.৩ লেখক কাদের কুতুব মিনারের \'পূর্বসূরি\' বা \'পূর্ববর্তী নির্দেশক\' না পাওয়ার কথা বলেছেন?
লেখক বলেছেন যে কুতুব মিনারের মতো স্তম্ভের পূর্ববর্তী নির্দেশক এদেশে নেই, ইরান-তুরানেও নেই। অর্থাৎ ভারত, পারস্য বা মধ্য এশিয়ার কোথাও এর আগে এমন কোনো স্থাপত্যকলা গড়ে ওঠেনি। এই আকস্মিকতা ও মৌলিকতাই কুতুবের বিশেষত্ব।
১.৪ মিনারটি বা মিনারিকা কী? মিনারের সঙ্গে এর পার্থক্যটি কোথায়?
মিনার: আপন মহিমায় নিজস্ব ক্ষমতায় যে স্তম্ভ দাঁড়ায় তার নাম মিনার। এটি স্বতন্ত্র একটি কীর্তিস্তম্ভ।
মিনারিকা বা মিনারেট: মসজিদ, সমাধি কিংবা অন্য কোনো ইমারতের অঙ্গ হিসেবে যে স্তম্ভ কখনো থাকে, কখনো থাকে না, তার নাম মিনারেট বা মিনারিকা। অর্থাৎ, মিনার হলো স্বাধীন বিজয়স্তম্ভ, আর মিনারিকা হলো সহায়ক স্তম্ভ।
১.৫ আহমদাবাদ শহরটি কোন রাজার নামানুসারে হয়েছে? এই শহরটি কোন রাজ্যের রাজধানী?
আহমদাবাদ শহরটি রাজা আহমেদ-এর নামানুসারে হয়েছে। \'এইবই নামে আহমদাবাদ\'—লেখকের ভাষায়। এই শহরটি গুজরাট রাজ্যের (তৎকালীন) রাজধানী ছিল। বর্তমানে এটি গুজরাট রাজ্যের অন্যতম প্রধান শহর।

২. সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও

১ কানিংহাম

অ্যালেকজান্ডার কানিংহাম ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের প্রথম ডিরেক্টর জেনারেল। কুতুব মিনার সম্পকে তিনি গবেষণা করেছিলেন এবং এর ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তিনিসহ ফাগুর্সন, স্যার সৈয়দ আহমেদ প্রমুখ গবেষকরা কুতুব মিনারের ঐতিহাসিক রহস্য উদ্ঘাটনে নিরন্তর চেষ্টা করেও পুরোপুরি সফল হননি।

২ ফাগুর্সন

জেমস ফাগুর্সন ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত স্কটিশ স্থাপত্য-ঐতিহাসিক। ভারতীয় স্থাপত্যকলা নিয়ে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। কুতুব মিনারের স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য নিয়ে তিনিও বিস্তর গবেষণা করেন। কিন্তু কানিংহাম, কার স্টিফেন, ফাগুর্সন ও স্যার সৈয়দ আহমেদ—কেউই কুতুবের সমস্ত রহস্য ভেদ করতে পারেননি।

৩ সৈয়দ আহমেদ

স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) ছিলেন ভারতের মুসলিম নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। কুতুব মিনার নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন এবং দিল্লির ঐতিহাসিক ইমারতগুলির উপর গুরুত্বপূর্ণ লেখা রেখে গেছেন। কিন্তু তিনিও কুতুব মিনারের রহস্যের পুরো সমাধান দিতে পারেননি।

৩. কয়েকটি বাক্যে উত্তর দাও

4 টি
৩.১ 'কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার'— এই উদ্ধৃতির আলোকে মিনারটির পাঁচটি বিশেষত্ব উল্লেখ করো।
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার হিসেবে কুতুব মিনারের পাঁচটি বিশেষত্ব:

১) অভূতপূর্ব উচ্চতা ও গঠন: পাঁচতলা বিশিষ্ট এই মিনারটি পৃথিবীর উচ্চতম ইটনির্মিত মিনার। একে কোনো পূর্বসূরির অনুকরণে গড়া হয়নি।

২) অনন্য নকশা: প্রথম তলায় বাঁশ ও কাকের পর্যায়ক্রমিক নকশা, দ্বিতীয় তলায় শুধু বাঁশ, তৃতীয় তলায় শুধু কাকের নকশা—এক স্বতন্ত্র স্থাপত্যরীতি।

৩) কারুকার্যের অসামান্যতা: গায়ে খোদিত বাঁশ-কাকের উপর দিয়ে সারি সারি লতাপাতা, ফুলের মালা, চক্রের নকশা—যা হিন্দু ও মুসলিম শিল্পের অপূর্ব মিশ্রণ।

৪) প্রোপর্শনের চূড়ান্ত নিদর্শন: সোজা খাড়া স্তম্ভকে কয়েকটি তলায় বিভক্ত করে, প্রতি তলায় একটু ছোট করে, ব্যালকনি দিয়ে এমন চূড়ান্ত অনুপাত তৈরি হয়েছে যা পৃথিবীর আর কোনো মিনারে নেই।

৫) হিন্দু-মুসলিম মিলনের প্রতীক: গোটা মিনারটির পরিকল্পনা মুসলমানদের, অথচ যাবতীয় কারুকার্য হিন্দু শিল্পীদের—এ যেন সম্প্রীতির এক অক্ষয় স্তম্ভ।
৩.২ মিনারটির গঠনে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলনের চেহারাটি কীভাবে ধরা পড়েছে তা লেখো।
কুতুব মিনারের গঠনে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলন এক অপূর্ব নিদর্শন হয়ে আছে... (same content)
৩.৩ কুতুব মিনারের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে লেখক আর কোন কোন স্মারক/কীর্তির প্রসঙ্গ এনেছেন?
কুতুব মিনারের প্রসঙ্গে লেখক আরও যেসব স্মারক ও কীর্তির কথা এনেছেন... (same content)
৩.৪ আলাউদ্দিন খিলজি চেষ্টা করেও কুতুব মিনারের চেয়ে মহত্তর স্মারক গড়তে পারেননি কেন?
আলাউদ্দিন খিলজি কুতুবের দ্বিগুণ উচ্চতার মিনার গড়তে চেয়েছিলেন—কিন্তু ব্যর্থ হন... (same content)

শব্দার্থ

মিনার: মোচাকার বা শাখার মতো উপরমুখী উন্নত চূড়া
মুঘল কলা: মুঘল আমলের শিল্প-সংস্কৃতি
এপ্লিকেমেন্ট: পরীক্ষা-নিরীক্ষা
শিল্পী: এখানে কারিগর বা স্থাপত্য-শিল্পী
স্মৃতি: সৌধ, প্রাসাদ, ইমারত প্রভৃতি
গুলতাজ: মিনারেট জাতীয় ছোট চূড়া বা শীর্ষদেশ
থাম: স্তম্ভ, পিলার
আড়া: খিলান
ছত্র: চাল বা ছাদ
মিনারেট: মিনারের চেয়ে ছোট চূড়া
ছজ্জা: বৃষ্টির ছাট ঠেকানোর জন্য দরজা বা জানলার উপরস্থ ছাদের প্রসারিত অংশ
ব্র্যাকেট: প্রধানত দেওয়ালে আটকানো তাকের প্রসারিত অবলম্ব
প্রোপর্শন: সঙ্গতি, সামঞ্জস্য
অপটিমাম সাইজ: সামঞ্জস্যপূর্ণ আকার
ডোম: গোলাকার গম্বুজ
জিওমেট্রিক ডিজাইন: জ্যামিতিক বিন্যাস

প্রবন্ধের শিক্ষা

মনে রেখো: সৈয়দ মুজতবা আলির \'কুতুব মিনারের কথা\' শুধু একটি স্থাপত্যের বর্ণনা নয়—এটা সম্প্রীতি, শিল্প ও সংস্কৃতির মিলনের গল্প। আটশো বছর আগে হিন্দু-মুসলমান শিল্পীরা যখন একসঙ্গে কাজ করে এই স্তম্ভ গড়েছিলেন, তখন তাঁরা কেবল পাথর নয়, গড়েছিলেন একতার এক অক্ষয় কীর্তি। কুতুব মিনার শুধু ইতিহাস নয়—সম্প্রীতিরও সাক্ষী।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

\'কুতুব মিনারের কথা\' প্রবন্ধটি বিশিষ্ট সাহিত্যিক, পর্যটক ও অধ্যাপক সৈয়দ মুজতবা আলি (১৯০৪-১৯৭৪) রচিত। তিনি আরবি, ফারসি, জার্মানসহ ১৫টি ভাষা জানতেন। এই প্রবন্ধটি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির \'সাহিত্য মেলা\' পাঠ্যপুস্তকের তৃতীয় পাঠ।

কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার কারণ: (১) এটি পৃথিবীর উচ্চতম ইটনির্মিত মিনার, (২) এর কোনো পূর্বসূরি ভারত, ইরান বা তুরানে নেই—সম্পূর্ণ মৌলিক স্থাপত্য, (৩) পাঁচতলা বিশিষ্ট অনন্য নকশা, (৪) গায়ে হিন্দু-মুসলিম কারুকার্যের অপূর্ব মিশ্রণ, (৫) প্রোপর্শন বা অনুপাতের এক চূড়ান্ত নিদর্শন। কানিংহাম, ফাগুর্সনের মতো গবেষকরাও এর রহস্য পুরোপুরি ভেদ করতে পারেননি।

কুতুব মিনারের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ও নির্মাণ-তদারকি করেছেন মুসলমান শাসকেরা, কিন্তু যাবতীয় কারুকার্য—লতাপাতা, ফুলের মালা, চক্রের নকশা—এগুলো হিন্দু শিল্পীরা খোদাই করেছেন। আবার গায়ে আরবি লিপিতে কোরানের বাণীও আছে। সৈয়দ মুজতবা আলি লিখেছেন: \'গোটা মিনারটির পরিকল্পনা করেছেন মুসলমান, যাবতীয় কারুকার্য করেছে হিন্দু—কারুকার্যের জগতে প্রথম দিনেই তাদের যে মিলন হয়েছিল, আজও তা অটুট আছে।\'