চিরদিনের
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • ষষ্ঠ পাঠ
কবিতা
চিরদিনের
কবি
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পাঠ
ষষ্ঠ পাঠ (সাহিত্য মেলা)
ধরন
গ্রামজীবন ও প্রকৃতি বিষয়ক
সম্পূর্ণ কবিতা
চিরদিনের✍️ চিরদিনের
কবিতার সারাংশ ও মূলভাব
মূলভাব: "চিরদিনের" কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলার একটি গ্রামের চিরন্তন জীবনপ্রবাহকে এঁকেছেন। একদিকে আছে প্রকৃতির অকৃপণ দান—বৃষ্টি, সবুজ মাঠ, দিঘি, নদী, বাঁশবন; অন্যদিকে আছে গ্রামীণ মানুষের পরিশ্রম ও জীবনসংগ্রাম—কৃষক, কুমোর, কামার, তাঁতি। কবি দেখিয়েছেন যে, দুর্ভিক্ষ-আকালের ভয়াবহতা গ্রামকে বারবার আঘাত করলেও গ্রামীণ মানুষ তার শক্তি ও সংহতিতে আবার জেগে ওঠে। সবুজ ফসলের মধ্য দিয়ে আসে নতুন যুগের ইঙ্গিত—সুবর্ণ যুগ।
কেন্দ্রীয় চেতনা: গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও শ্রমজীবী মানুষের সহজাত জীবনীশক্তিই চিরদিনের। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর মানুষের লড়াই—দুটোই গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৫. সম্বন্ধ পদ খুঁজে বের করা
কবিতায় র-বিভক্তিযুক্ত সম্বন্ধ পদের উদাহরণ:
- তালের সারি (তাল + এর — সম্বন্ধ পদ)
- আত্মদানের সাড়া (আত্মদান + এর — সম্বন্ধ পদ)
- মজা নদী (মজা + র — সম্বন্ধ পদ)
- গোয়ালে পাঠায় — এখানে ভিন্ন প্রকার
- গ্রামের পাশে (গ্রাম + এর — সম্বন্ধ পদ)
- কিষাণকে ঘরে — কর্মকারক
- বুড়ো বটতলা (বুড়ো বিশেষণ, বটতলা বিশেষ্য)
- দুর্ভিক্ষের আঁচল (দুর্ভিক্ষ + এর — সম্বন্ধ পদ)
- গ্রামের লোক (গ্রাম + এর — সম্বন্ধ পদ)
- ক্ষেতের চাষির কোণে (ক্ষেত + এর, চাষি + র — সম্বন্ধ পদ)
- পাখির গানে (পাখি + র — সম্বন্ধ পদ)
উল্লেখ্য, প্রদত্ত উদাহরণ: তালের সারি (তাল+এর সারি)
৭. সন্ধিবিচ্ছেদ করো
| শব্দ | সন্ধিবিচ্ছেদ | সন্ধির নাম |
|---|---|---|
| বৃষ্টি | √বৃষ্ + তি | — |
| অহংকার | অহম্ + কার | ব্যঞ্জন সন্ধি (ম্ + ক = ং + ক = অহংকার) |
| স্বাগত | সু + আগত | স্বরসন্ধি (উ + আ = ব) |
| পরস্পর | পরঃ + পর (পরস্ + পর) | বিসর্গ সন্ধি |
| দুর্ভিক্ষ | দুঃ + ভিক্ষ (দুর্ + ভিক্ষ) | বিসর্গ সন্ধি (দুঃ + ভ = দুর্ভ) |
৮. নিম্নরেখ পদগুলির কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করো
| বাক্যাংশ | পদ | কারক | বিভক্তি |
|---|---|---|---|
| রাত্রি এখানে স্বাগত সাত্ত্ব শাঁখে। | এখানে | অধিকরণ কারক | এ বিভক্তি (সপ্তমী) |
| এখানে সকালে ঘোষিত পাখির গানে। | পাখির গানে | করণ কারক | এ বিভক্তি (সপ্তমী) |
| এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস। | গ্রামের পাশে | অধিকরণ কারক | এ বিভক্তি (সপ্তমী) |
| ঠাকুমা গল্প শোনায় যে নাতনিকে। | নাতনিকে | কর্মকারক | কে বিভক্তি (দ্বিতীয়া) |
| কৃষক-বধূরা টেটকিকে নাচায় পায়ে। | টেটকিকে | কর্মকারক | কে বিভক্তি (দ্বিতীয়া) |
৯. বাক্য বাড়াও
সম্প্রসারিত বাক্য: গতবারের ভয়াবহ আকাল ও দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যের অভাবে, প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের লোক দিশাহারা হয়ে দিকে দিকে চলে গেল।
সম্প্রসারিত বাক্য: বর্ষার মরসুমে প্রচুর বৃষ্টিতে ফুলে-ফেঁপে গ্রামের পাশের মজা নদী আজ বিদ্রোহী রূপ ধারণ করে।
সম্প্রসারিত বাক্য: হঠাৎ একদিন জল আনবার পথে কৃষক-বধূ থমকে দাঁড়িয়ে কিছুটা ঘোমটা তুলে কোনো মতে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখে নেয়।
সম্প্রসারিত বাক্য: গোয়ালা যখন সবুজ ঘাসের ইশারা পেয়ে যায়, বর্ষার জলে সিক্ত হয়ে এ গ্রাম যেন একেবারে নতুন ও সুন্দর সবুজ ঘাগরা পরে নেয়।
সম্প্রসারিত বাক্য: প্রভাতি সময়ে কৃষক-বধূরা তাদের ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বেলে নতুন দিনের সূচনা করে।
১০. একটি বাক্যে উত্তর দাও
11 টি১১. আট-দশটি বাক্যে উত্তর দাও
4 টিপ্রথমেই কবি বলেছেন: গ্রামে সময় যেন থমকে যায়—ব্যস্ত শহরের ঘড়ির কাঁটা এ গ্রামে এসে থেমে যায়। চারপাশ জুড়ে আছে সবুজ মাঠ, যেখানে পথ না থাকলেও পা চলে।
গ্রামের পাশেই আছে জোড়া দিঘি, তার পাড় ঘেঁষে তালগাছের সারি। দূরে বাঁশবনে বাতাসে দোলা লাগলে সাড়া ওঠে যেন আত্মদানের ধ্বনি।
গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মজা নদী, যা বর্ষার সময় ফুলে-ফেঁপে বিদ্রোহী রূপ নেয়। বর্ষাজলে গ্রাম যেন নতুন সবুজ ঘাগরা পরে নেয়, এমনই তাজা ও সুন্দর হয়ে ওঠে চারদিক।
বুড়ো বটগাছের তলায় সন্ধ্যার জটলা গ্রামীণ জীবনের আরেক মাধুর্যময় ছবি। আর ভোরে পাখির গানে ঘোষিত হয় নতুন দিন। সবুজ ফসলের ক্ষেত যেন সুবর্ণ যুগের ইঙ্গিত দেয়।
গ্রামের মানুষজনের মধ্যে আছে কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি—বিভিন্ন পেশার মানুষ। সকালবেলা পাখির গানের সঙ্গে সঙ্গেই তারা যার যার কাজে জোটে। সারাটা দুপুর ধরে ক্ষেতের চাষির কোণ থেকে শোনা যায় নানা ধরনের কাজের ধ্বনি—একটানা ও বিচিত্র।
কৃষক-বধূরা ভোরবেলায় ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বেলে দিন শুরু করে। তারা টেটকি পায়ে নাচিয়ে গান গায়, যা তাদের প্রাণোচ্ছলতার পরিচয় দেয়।
রাত্রি হলে সাত্ত্ব শাঁখের ধ্বনি দিয়ে সন্ধ্যার স্বাগত জানানো হয়। বুড়ো বটগাছে জটলা বেঁধে গ্রামের লোক তাদের জনমত তৈরি করে। দাওয়ার অক্ষকাতে বসে ঠাকুমা নাতনিকে আকালের গল্প শোনান।
এই জীবনে আনন্দ আছে, পরিশ্রম আছে, আবার আকাল ও দুর্ভিক্ষের করুণ স্মৃতিও আছে। তবু সবুজ ফসলের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ মানুষ নতুন আশায় বাঁচে।
কিন্তু কবি দেখিয়েছেন, মানুষ চিরকালই প্রকৃতির নির্মমতার কাছে পরাজিত হয়নি। গ্রামের মানুষ \'দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে\' অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি বুকে নিয়েই আবার কাজে লেগেছে। \'আযোজা\' শব্দটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে তারা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
কৃষক-বধূরা ভোরবেলা দীপ জ্বালে—এ যেন অন্ধকার কাটিয়ে নতুন আলোর প্রতীক। কামার-কুমোর-তাঁতি সবাই যার যার কাজে নিয়োজিত থাকে। এই সম্মিলিত শ্রমই শেষতক জয়ী হয়।
শেষ স্তবকে কবি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন: হঠাৎ একদিন জল আনতে যাওয়া কৃষক-বধূ ঘোমটা তুলে দেখে—সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ নেমে এসেছে। অর্থাৎ, জীবনীশক্তি ও সংহতির জোরে মানুষ আবার জেগে উঠেছে।
১) চিরন্তন প্রকৃতি: কবিতায় বর্ণিত গ্রামের প্রকৃতি—সবুজ মাঠ, দিঘি, নদী, বটগাছ, বাঁশবন—এসব কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নয়, এ যুগ যুগ ধরে বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতিকে চিহ্নিত করে আসছে।
২) শ্রমের চিরন্তনতা: কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি—তাদের কাজ সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা ধরে বয়ে চলে। এই পেশাভিত্তিক জীবনপ্রবাহ বাংলায় হাজার বছর ধরে প্রবাহিত, তাই তা \'চিরদিনের\'।
৩) সংগ্রামের ধারাবাহিকতা: আকাল ও দুর্ভিক্ষ এসেছে, মানুষ গ্রাম ছেড়েছে, কিন্তু আবার ফিরেছে। জীবন বারবার পরাজয়কে জয় করে এগিয়েছে—এও \'চিরদিনের\' গল্প।
৪) আশা ও জয়ের চিরন্তনতা: শেষে \'সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে\'—এ আশার গান চিরকালীন। এ কারণে নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক।
১২. ব্যাখ্যা করো
5 টিতাৎপর্য: গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল ছন্দ এতটাই ধীর ও স্বাভাবিক যে শহরের কৃত্রিম তাড়াহুড়োর ঘড়ি এখানে অর্থহীন হয়ে যায়। সময় যেন প্রকৃতির নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে—কবি এই বৈপরীত্যের মাধ্যমে গ্রাম-শহরের পার্থক্য দেখিয়েছেন।
তাৎপর্য: কবি নদীকে ব্যক্তিত্ব দিয়েছেন (Personification)। বর্ষার মরসুমে নদীর ভয়ংকর রূপকে \'বিদ্রোহ\' বলা হয়েছে—যেন প্রকৃতিও মাঝে মাঝে তার বাঁধন ভাঙতে চায়। এটি প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির প্রতীক।
তাৎপর্য: এই পঙ্ক্তিতে গ্রামীণ মানুষের জীবনীশক্তির অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে। দুর্ভিক্ষ তাদের কেড়ে নিয়েছে প্রিয়জনদের, তবু যারা বেঁচে আছে তারা আবার কাজে ফিরেছে। \'আযোজা\' শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—এর অর্থ শুধু \'খাটা\' নয়, বরং আন্তরিকভাবে, প্রাণ দিয়ে কাজ করা।
তাৎপর্য: এই পঙ্ক্তিতে শ্রমের গৌরব ধ্বনিত হয়েছে। বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজের সমবেত শব্দকে কবি যেন এক সুরেলা অর্কেস্ট্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গ্রামের জীবন একটানা নয়—তা বিচিত্র ও বর্ণময়। এখানে কাজই ধর্ম, কাজই জীবনের ছন্দ।
তাৎপর্য: কবিতার শেষ পঙ্ক্তি অত্যন্ত আশাবাদী ও দার্শনিক। \'সবুজ ফসল\' এখানে শুধু খাদ্যশস্য নয়—এটা নতুন জীবনের প্রতীক, অন্ধকার কাটিয়ে আলোর, দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে প্রাচুর্যের প্রতীক। \'সুবর্ণ যুগ\' শব্দবন্ধে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের সম্মিলিত শ্রম ও জীবনীশক্তি শেষপর্যন্ত জয়ী হয়—এটাই জীবনের চিরন্তন সত্য।
১৩. তোমার দেখা একটি গ্রামের কথা ডায়েরিতে লেখো
তারিখ: ১৫ জুন ২০২৫
প্রিয় ডায়েরি,
আজ মনে পড়ছে আমার মামারবাড়ির গ্রামটির কথা—নাম পাঁচথুপি, মুর্শিদাবাদ জেলার একটি ছোট্ট সবুজ গ্রাম। গ্রামটির চারপাশে ধানক্ষেত, আমবাগান আর একটি ছোটো নদী—নাম ভৈরব।
গ্রামে প্রায় পাঁচশো পরিবারের বাস। বেশিরভাগ মানুষই কৃষক—ধান, পাট, সরষে চাষ করেন। কিছু পরিবার মাছ চাষ করে, কেউ কেউ গরু-ছাগল পালেন। গ্রামের প্রান্তে এক কুমোর পরিবার বাস করে যারা আজও মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে মেলায় বিক্রি করে।
এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব। ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে। বর্ষায় যখন ভৈরব নদী দুকূল ছাপিয়ে ওঠে, তখন গ্রামটা যেন জলে ভাসে—ঠিক যেন সুকান্তর কবিতার 'মজা নদী'র মতো।
মানুষজনের জীবন সহজ-সরল। বটগাছতলায় বসে বিকেলে গ্রামের বয়স্কদের আড্ডা জমে। সন্ধ্যার সময় মন্দির থেকে শাঁখ আর ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসে।
তবে কিছু অসুবিধাও আছে—ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, বর্ষায় রাস্তাঘাট কাদায় একাকার। মাধ্যমিকের পর ছেলেমেয়েদের পড়ার জন্য ভালো স্কুল পাওয়া মুশকিল।
আমার মনে হয়, গ্রামের উন্নতির জন্য একটি ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এবং ছোটোখাটো কুটিরশিল্পের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা উচিত। তাতে করে গ্রামের ছেলেমেয়েরা শহরে না গিয়েও কিছু কাজ পাবে।
গ্রামটি যেন সুকান্তর 'চিরদিনের' গ্রামটির মতোই—সবুজে মোড়া, মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত।