চিরদিনের

সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত 'চিরদিনের' কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | সপ্তম শ্রেণি

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 19 December 2025 Last Update: 31 May 2026

চিরদিনের

সুকান্ত ভট্টাচার্য কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (সপ্তম শ্রেণি, WBBSE) • ষষ্ঠ পাঠ

গ্রামবাংলা কৃষিজীবন প্রকৃতি শ্রমজীবী স্বর্ণযুগ

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬ - ১৯৪৭)

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রতিবাদী কবি। মাত্র ২১ বছর বয়সে মারা গেলেও তাঁর রচনা বাংলা কবিতায় এক উজ্জ্বল অধ্যায়। 'ছাড়পত্র', 'ঘুম নেই', 'পূর্বাভাস', 'অভিযান', 'মিঠে-কড়া', 'হরতাল' প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। শোষণহীন, সাম্যধর্মী সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। 'চিরদিনের' কবিতায় গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবি এক আশাবাদী দৃষ্টিতে অঙ্কিত হয়েছে।

📝

কবিতা

চিরদিনের

👤

কবি

সুকান্ত ভট্টাচার্য

📚

পাঠ

ষষ্ঠ পাঠ (সাহিত্য মেলা)

🎯

ধরন

গ্রামজীবন ও প্রকৃতি বিষয়ক

সম্পূর্ণ কবিতা

চিরদিনের

✍️ চিরদিনের

এখানে বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে এসে থেমে গেছে ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা, সবুজ মাঠেরা পথ দেয় পায়ে পায়ে পথ নেই, তবু এখানে যে পথ হাঁটা। জোড়া দিঘি, তার পাড়েতে তালের সারি দূরে বাঁশখাড়ে আত্মদানের সাড়া, পচা জল আর মশায় অহংকারী নীরব এখানে অমর কিষাণপাড়া। এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস বর্ষায় আজ বিদ্রোহ বুদ্ধি করে, গোয়ালে পাঠায় ইশারা সবুজ ঘাস এ গ্রাম নতুন সবুজ ঘাগরা পরে। রাত্রি এখানে স্বাগত সাত্ত্ব শাঁখে কিষাণকে ঘরে পাঠায় যে আল-পথ; বুড়ো বটতলা পরস্পরকে ডাকে সন্ধ্যা সেখানে জটলা করে জনমত। দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে এ গ্রামের লোক আযোজা সব কাজ করে, কৃষক-বধূরা টেটকিকে নাচায় পায়ে প্রভাতি সময়ে দীপ জ্বেলে ঘরে ঘরে। রাত্রি হলেই দাওয়ার অক্ষকাকে ঠাকুমা গল্প শোনায় যে নাতনিকে, কেমন করে সে আকালেতে গতবারে, চলে গেল লোক দিশাহারা দিকে দিকে। এখানে সকালে ঘোষিত পাখির গানে কামার, কুমোর, তাঁতি তার কাজে জোটে, সারাটা দুপুর ক্ষেতের চাষির কোণে একটানা আর বিচিত্র ধ্বনি ওঠে। হঠাৎ সেদিন জল আনবার পথে কৃষক-বধূ সে থমকে তাকায় পাশে, ঘোমটা তুলে সে দেখে নেয় কোনো মতে, সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে॥

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

মূলভাব: "চিরদিনের" কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলার একটি গ্রামের চিরন্তন জীবনপ্রবাহকে এঁকেছেন। একদিকে আছে প্রকৃতির অকৃপণ দান—বৃষ্টি, সবুজ মাঠ, দিঘি, নদী, বাঁশবন; অন্যদিকে আছে গ্রামীণ মানুষের পরিশ্রম ও জীবনসংগ্রাম—কৃষক, কুমোর, কামার, তাঁতি। কবি দেখিয়েছেন যে, দুর্ভিক্ষ-আকালের ভয়াবহতা গ্রামকে বারবার আঘাত করলেও গ্রামীণ মানুষ তার শক্তি ও সংহতিতে আবার জেগে ওঠে। সবুজ ফসলের মধ্য দিয়ে আসে নতুন যুগের ইঙ্গিত—সুবর্ণ যুগ।

কেন্দ্রীয় চেতনা: গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও শ্রমজীবী মানুষের সহজাত জীবনীশক্তিই চিরদিনের। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর মানুষের লড়াই—দুটোই গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

৫. সম্বন্ধ পদ খুঁজে বের করা

প্রদত্ত 'ঘড়ির কাঁটা' — 'র' বিভক্তি দিয়ে সম্পর্ক তৈরি, তেমনি আরও সম্বন্ধ পদ

কবিতায় র-বিভক্তিযুক্ত সম্বন্ধ পদের উদাহরণ:

  • তালের সারি (তাল + এর — সম্বন্ধ পদ)
  • আত্মদানের সাড়া (আত্মদান + এর — সম্বন্ধ পদ)
  • মজা নদী (মজা + র — সম্বন্ধ পদ)
  • গোয়ালে পাঠায় — এখানে ভিন্ন প্রকার
  • গ্রামের পাশে (গ্রাম + এর — সম্বন্ধ পদ)
  • কিষাণকে ঘরে — কর্মকারক
  • বুড়ো বটতলা (বুড়ো বিশেষণ, বটতলা বিশেষ্য)
  • দুর্ভিক্ষের আঁচল (দুর্ভিক্ষ + এর — সম্বন্ধ পদ)
  • গ্রামের লোক (গ্রাম + এর — সম্বন্ধ পদ)
  • ক্ষেতের চাষির কোণে (ক্ষেত + এর, চাষি + র — সম্বন্ধ পদ)
  • পাখির গানে (পাখি + র — সম্বন্ধ পদ)

উল্লেখ্য, প্রদত্ত উদাহরণ: তালের সারি (তাল+এর সারি)

৭. সন্ধিবিচ্ছেদ করো

শব্দসন্ধিবিচ্ছেদসন্ধির নাম
বৃষ্টি√বৃষ্ + তি—
অহংকারঅহম্ + কারব্যঞ্জন সন্ধি (ম্ + ক = ং + ক = অহংকার)
স্বাগতসু + আগতস্বরসন্ধি (উ + আ = ব)
পরস্পরপরঃ + পর (পরস্ + পর)বিসর্গ সন্ধি
দুর্ভিক্ষদুঃ + ভিক্ষ (দুর্ + ভিক্ষ)বিসর্গ সন্ধি (দুঃ + ভ = দুর্ভ)

৮. নিম্নরেখ পদগুলির কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করো

বাক্যাংশপদকারকবিভক্তি
রাত্রি এখানে স্বাগত সাত্ত্ব শাঁখে।এখানেঅধিকরণ কারকএ বিভক্তি (সপ্তমী)
এখানে সকালে ঘোষিত পাখির গানে।পাখির গানেকরণ কারকএ বিভক্তি (সপ্তমী)
এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস।গ্রামের পাশেঅধিকরণ কারকএ বিভক্তি (সপ্তমী)
ঠাকুমা গল্প শোনায় যে নাতনিকে।নাতনিকেকর্মকারককে বিভক্তি (দ্বিতীয়া)
কৃষক-বধূরা টেটকিকে নাচায় পায়ে।টেটকিকেকর্মকারককে বিভক্তি (দ্বিতীয়া)

৯. বাক্য বাড়াও

৯.১ চলে গেল লোক। (কখন? কেন? কোথায়?)

সম্প্রসারিত বাক্য: গতবারের ভয়াবহ আকাল ও দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যের অভাবে, প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের লোক দিশাহারা হয়ে দিকে দিকে চলে গেল।

৯.২ আজ বিদ্রোহ করে। (কে? কখন?)

সম্প্রসারিত বাক্য: বর্ষার মরসুমে প্রচুর বৃষ্টিতে ফুলে-ফেঁপে গ্রামের পাশের মজা নদী আজ বিদ্রোহী রূপ ধারণ করে।

৯.৩ ঘোমটা তুলে দেখে নেয় কোনো মতে। (কে? কী? কোথায়?)

সম্প্রসারিত বাক্য: হঠাৎ একদিন জল আনবার পথে কৃষক-বধূ থমকে দাঁড়িয়ে কিছুটা ঘোমটা তুলে কোনো মতে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখে নেয়।

৯.৪ এ গ্রাম সবুজ ঘাগরা পরে। (কেমন? কীসের?)

সম্প্রসারিত বাক্য: গোয়ালা যখন সবুজ ঘাসের ইশারা পেয়ে যায়, বর্ষার জলে সিক্ত হয়ে এ গ্রাম যেন একেবারে নতুন ও সুন্দর সবুজ ঘাগরা পরে নেয়।

৯.৫ দীপ জ্বেলে। (কোথায়? কখন?)

সম্প্রসারিত বাক্য: প্রভাতি সময়ে কৃষক-বধূরা তাদের ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বেলে নতুন দিনের সূচনা করে।

১০. একটি বাক্যে উত্তর দাও

11 টি
১০.১ ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা কোথায় গিয়ে থেমে গেছে?
ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা গ্রামের (বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে) এসে থেমে গেছে—অর্থাৎ গ্রামের নিরিবিলি, ছন্দোবদ্ধ জীবনে সময় যেন স্তব্ধ হয়ে যায়।
১০.২ তালের সারি কোথায় রয়েছে?
তালের সারি রয়েছে জোড়া দিঘির পাড়ে। পাশাপাশি দুটি দিঘির ধার ঘেঁষে তালগাছের সারি দাঁড়িয়ে আছে।
১০.৩ কিষাণপাড়া নীরব কেন?
কিষাণপাড়া নীরব কারণ গ্রামের কৃষকেরা হয়তো মাঠে কাজে ব্যস্ত, অথবা দুর্ভিক্ষের কারণে গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে কবি \'নীরব\' বলতে হয়তো গ্রামের কোলাহলহীন, শান্ত, অথচ গভীরভাবে সক্রিয় জীবনকে বুঝিয়েছেন।
১০.৪ বর্ষায় কে বিদ্রোহ করে?
বর্ষায় গ্রামের পাশের মজা নদী বিদ্রোহী রূপ ধারণ করে। বর্ষার জলে ফুলে-ফেঁপে নদী তার কূল উপচায়, যেন প্রচলিত শৃঙ্খলা ভেঙে বিদ্রোহ করে।
১০.৫ কে গোয়ালে ইশারা পাঠায়?
নদী বা বর্ষার জল প্লাবনের মাধ্যমে গোয়ালে ইশারা পাঠায়। অথবা, বর্ষার ফলে মাঠে যে সবুজ ঘাস জন্মায়, সেই সবুজ ঘাসই গোয়ালের গরুদের প্রতি ইশারা করে—যেন খাবারের ডাক।
১০.৬ রাত্রিকে কীভাবে স্বাগত জানানো হয়?
রাত্রিকে স্বাগত জানানো হয় সাত্ত্ব শাঁখের ধ্বনির মাধ্যমে। সন্ধ্যাবেলায় গৃহস্থবধূদের শঙ্খধ্বনি রাত্রির আগমনকে সাদরে গ্রহণ করার প্রতীক।
১০.৭ কোথায় জনমত গড়ে ওঠে?
বুড়ো বটতলায় সন্ধ্যাবেলায় জটলা করে গ্রামের লোক—এই আড্ডাতেই গ্রামের নানা বিষয় নিয়ে জনমত গড়ে ওঠে। বটতলা যেন গ্রামের এক প্রাণকেন্দ্র।
১০.৮ ঠাকুমা কাকে, কখন গল্প শোনান?
ঠাকুমা রাত্রি হলে দাওয়ার অক্ষকাকে বসে তাঁর নাতনিকে গল্প শোনান। গল্পের বিষয় হলো কিভাবে গতবারের আকালে মানুষ দিশাহারা হয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
১০.৯ কোন গল্প তিনি বলেন?
ঠাকুমা নাতনিকে বলেন কিভাবে গতবারের ভয়ংকর আকালে (দুর্ভিক্ষে) গ্রামের লোকেরা খাদ্যের অভাবে প্রাণ বাঁচাতে দিশাহারা হয়ে দিকে দিকে চলে গিয়েছিল—এ এক করুণ ইতিহাস।
১০.১০ সকালের আগমন কীভাবে ঘোষিত হয়?
এখানে সকালের আগমন ঘোষিত হয় পাখির গানের মাধ্যমে। গ্রামের বিভিন্ন পাখির সুরেলা কূজন যেন নতুন দিনের ঘোষণা দেয়।
১০.১১ কবিতায় কোন কোন জীবিকার মানুষের কথা আছে?
কবিতায় উল্লেখিত জীবিকার মানুষ: কৃষক (কিষাণ), কামার (লোহার কাজ), কুমোর (মাটির কাজ), তাঁতি (তাঁত বোনার কাজ), কৃষক-বধূ (চাষাবাদে সহায়তাকারী)।

১১. আট-দশটি বাক্যে উত্তর দাও

4 টি
১১.১ এই কবিতায় বাংলার প্রাকৃতিক প্রকৃতির যে বর্ণনা আছে তা নিজের ভাষায় সংক্ষেপে লেখো।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের \'চিরদিনের\' কবিতায় বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির এক জীবন্ত ছবি আঁকা হয়েছে।

প্রথমেই কবি বলেছেন: গ্রামে সময় যেন থমকে যায়—ব্যস্ত শহরের ঘড়ির কাঁটা এ গ্রামে এসে থেমে যায়। চারপাশ জুড়ে আছে সবুজ মাঠ, যেখানে পথ না থাকলেও পা চলে।

গ্রামের পাশেই আছে জোড়া দিঘি, তার পাড় ঘেঁষে তালগাছের সারি। দূরে বাঁশবনে বাতাসে দোলা লাগলে সাড়া ওঠে যেন আত্মদানের ধ্বনি।

গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মজা নদী, যা বর্ষার সময় ফুলে-ফেঁপে বিদ্রোহী রূপ নেয়। বর্ষাজলে গ্রাম যেন নতুন সবুজ ঘাগরা পরে নেয়, এমনই তাজা ও সুন্দর হয়ে ওঠে চারদিক।

বুড়ো বটগাছের তলায় সন্ধ্যার জটলা গ্রামীণ জীবনের আরেক মাধুর্যময় ছবি। আর ভোরে পাখির গানে ঘোষিত হয় নতুন দিন। সবুজ ফসলের ক্ষেত যেন সুবর্ণ যুগের ইঙ্গিত দেয়।
১১.২ কবিতাটিতে প্রামীণ মানুষের জীবনযাপনের যে ছবিটি পাও তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।
কবিতায় গ্রামীণ জীবনযাপনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে উঠেছে।

গ্রামের মানুষজনের মধ্যে আছে কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি—বিভিন্ন পেশার মানুষ। সকালবেলা পাখির গানের সঙ্গে সঙ্গেই তারা যার যার কাজে জোটে। সারাটা দুপুর ধরে ক্ষেতের চাষির কোণ থেকে শোনা যায় নানা ধরনের কাজের ধ্বনি—একটানা ও বিচিত্র।

কৃষক-বধূরা ভোরবেলায় ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বেলে দিন শুরু করে। তারা টেটকি পায়ে নাচিয়ে গান গায়, যা তাদের প্রাণোচ্ছলতার পরিচয় দেয়।

রাত্রি হলে সাত্ত্ব শাঁখের ধ্বনি দিয়ে সন্ধ্যার স্বাগত জানানো হয়। বুড়ো বটগাছে জটলা বেঁধে গ্রামের লোক তাদের জনমত তৈরি করে। দাওয়ার অক্ষকাতে বসে ঠাকুমা নাতনিকে আকালের গল্প শোনান।

এই জীবনে আনন্দ আছে, পরিশ্রম আছে, আবার আকাল ও দুর্ভিক্ষের করুণ স্মৃতিও আছে। তবু সবুজ ফসলের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ মানুষ নতুন আশায় বাঁচে।
১১.৩ আকাল ও দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে মানুষের সম্মিলিত শ্রম আর জীবনীশক্তি কীভাবে বিজয়ী হয়েছে, কবিতাটি অবলম্বন করে বুঝিয়ে দাও।
সুকান্তের এই কবিতায় আকাল ও দুর্ভিক্ষ এক ভয়াল স্মৃতি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। ঠাকুমা যখন নাতনিকে গল্প শোনান—কেমন করে গতবারের আকালে গ্রামের মানুষ দিশাহারা হয়ে দিকে দিকে চলে গিয়েছিল—সেই করুণ ইতিহাস ফুটে ওঠে।

কিন্তু কবি দেখিয়েছেন, মানুষ চিরকালই প্রকৃতির নির্মমতার কাছে পরাজিত হয়নি। গ্রামের মানুষ \'দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে\' অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি বুকে নিয়েই আবার কাজে লেগেছে। \'আযোজা\' শব্দটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে তারা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

কৃষক-বধূরা ভোরবেলা দীপ জ্বালে—এ যেন অন্ধকার কাটিয়ে নতুন আলোর প্রতীক। কামার-কুমোর-তাঁতি সবাই যার যার কাজে নিয়োজিত থাকে। এই সম্মিলিত শ্রমই শেষতক জয়ী হয়।

শেষ স্তবকে কবি চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন: হঠাৎ একদিন জল আনতে যাওয়া কৃষক-বধূ ঘোমটা তুলে দেখে—সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ নেমে এসেছে। অর্থাৎ, জীবনীশক্তি ও সংহতির জোরে মানুষ আবার জেগে উঠেছে।
১১.৪ "কোনো বিশেষ সময়ের নয়, বরং আবহমান কালের বাংলাদেশ তার প্রকৃতি ও মানুষকে নিয়ে জীবনের যে জয়গান গেয়ে চলেছে, এই কবিতায় তারই প্রকাশ দেখতে পাই।" — উদ্ধৃতিটির সাপেক্ষে কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উদ্ধৃতিটি যথার্থই কবিতাটির অন্তর্নিহিত সুরকে ধরেছে। \'চিরদিনের\' নামকরণের সার্থকতা বিচার করলে দেখা যায়:

১) চিরন্তন প্রকৃতি: কবিতায় বর্ণিত গ্রামের প্রকৃতি—সবুজ মাঠ, দিঘি, নদী, বটগাছ, বাঁশবন—এসব কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নয়, এ যুগ যুগ ধরে বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতিকে চিহ্নিত করে আসছে।

২) শ্রমের চিরন্তনতা: কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি—তাদের কাজ সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা ধরে বয়ে চলে। এই পেশাভিত্তিক জীবনপ্রবাহ বাংলায় হাজার বছর ধরে প্রবাহিত, তাই তা \'চিরদিনের\'।

৩) সংগ্রামের ধারাবাহিকতা: আকাল ও দুর্ভিক্ষ এসেছে, মানুষ গ্রাম ছেড়েছে, কিন্তু আবার ফিরেছে। জীবন বারবার পরাজয়কে জয় করে এগিয়েছে—এও \'চিরদিনের\' গল্প।

৪) আশা ও জয়ের চিরন্তনতা: শেষে \'সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে\'—এ আশার গান চিরকালীন। এ কারণে নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক।

১২. ব্যাখ্যা করো

5 টি
১২.১ "এখানে বৃষ্টিমুখর...... ঘড়ির কাঁটা"
সরলার্থ: এ গ্রামে বৃষ্টি হয় প্রায়ই, তাই চারপাশ বৃষ্টি-মুখরিত। গ্রামটি যেন লাজুক প্রকৃতির—তার সরল সৌন্দর্য চোখে পড়ে। এখানে এসে শহুরে জীবনের ব্যস্ত সময় যেন থমকে যায়। সময় যেন তার গতি হারিয়ে ফেলে।

তাৎপর্য: গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল ছন্দ এতটাই ধীর ও স্বাভাবিক যে শহরের কৃত্রিম তাড়াহুড়োর ঘড়ি এখানে অর্থহীন হয়ে যায়। সময় যেন প্রকৃতির নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে—কবি এই বৈপরীত্যের মাধ্যমে গ্রাম-শহরের পার্থক্য দেখিয়েছেন।
১২.২ "এ গ্রামের পাশে...... বিদ্রোহ বুদ্ধি করে"
সরলার্থ: গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মজা নদী যা বারো মাসই জলপূর্ণ থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টির জলে ফুলে-ফেঁপে নদী প্রচণ্ড রূপ ধারণ করে—যেন সে বিদ্রোহ করে তার কূল-সীমার বিরুদ্ধে।

তাৎপর্য: কবি নদীকে ব্যক্তিত্ব দিয়েছেন (Personification)। বর্ষার মরসুমে নদীর ভয়ংকর রূপকে \'বিদ্রোহ\' বলা হয়েছে—যেন প্রকৃতিও মাঝে মাঝে তার বাঁধন ভাঙতে চায়। এটি প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির প্রতীক।
১২.৩ "দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো গায়ে...... কাজ করে"
সরলার্থ: গ্রামের মানুষের গায়ে দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো—অর্থাৎ দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ স্মৃতি তারা ভোলেনি। তবুও এই গ্রামের লোকেরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে (\'আযোজা\') তাদের সব কাজ করে চলে।

তাৎপর্য: এই পঙ্ক্তিতে গ্রামীণ মানুষের জীবনীশক্তির অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে। দুর্ভিক্ষ তাদের কেড়ে নিয়েছে প্রিয়জনদের, তবু যারা বেঁচে আছে তারা আবার কাজে ফিরেছে। \'আযোজা\' শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—এর অর্থ শুধু \'খাটা\' নয়, বরং আন্তরিকভাবে, প্রাণ দিয়ে কাজ করা।
১২.৪ "সারাটা দুপুর...... বিচিত্র ধ্বনি ওঠে"
সরলার্থ: সারাটা দুপুর জুড়ে ক্ষেতের চাষিদের কাজের কোণ থেকে একটানা ও বিচিত্র রকমের শব্দ ভেসে আসে। কামারশালার হাতুড়ির শব্দ, কুমোরের চাকার শব্দ, তাঁতিদের তাঁত বোনার শব্দ—সব মিলে এক বিচিত্র ধ্বনিময় পরিবেশ তৈরি হয়।

তাৎপর্য: এই পঙ্ক্তিতে শ্রমের গৌরব ধ্বনিত হয়েছে। বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজের সমবেত শব্দকে কবি যেন এক সুরেলা অর্কেস্ট্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গ্রামের জীবন একটানা নয়—তা বিচিত্র ও বর্ণময়। এখানে কাজই ধর্ম, কাজই জীবনের ছন্দ।
১২.৫ "সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে"
সরলার্থ: একদিন জল আনবার পথে কৃষক-বধূ ঘোমটা তুলে দেখল—ক্ষেতে সবুজ ফসল দোল খাচ্ছে। সেই সবুজ ফসলের মধ্য দিয়েই যেন নতুন এক সমৃদ্ধ যুগের আগমন ঘটছে।

তাৎপর্য: কবিতার শেষ পঙ্ক্তি অত্যন্ত আশাবাদী ও দার্শনিক। \'সবুজ ফসল\' এখানে শুধু খাদ্যশস্য নয়—এটা নতুন জীবনের প্রতীক, অন্ধকার কাটিয়ে আলোর, দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে প্রাচুর্যের প্রতীক। \'সুবর্ণ যুগ\' শব্দবন্ধে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের সম্মিলিত শ্রম ও জীবনীশক্তি শেষপর্যন্ত জয়ী হয়—এটাই জীবনের চিরন্তন সত্য।

১৩. তোমার দেখা একটি গ্রামের কথা ডায়েরিতে লেখো

তারিখ: ১৫ জুন ২০২৫

প্রিয় ডায়েরি,

আজ মনে পড়ছে আমার মামারবাড়ির গ্রামটির কথা—নাম পাঁচথুপি, মুর্শিদাবাদ জেলার একটি ছোট্ট সবুজ গ্রাম। গ্রামটির চারপাশে ধানক্ষেত, আমবাগান আর একটি ছোটো নদী—নাম ভৈরব।

গ্রামে প্রায় পাঁচশো পরিবারের বাস। বেশিরভাগ মানুষই কৃষক—ধান, পাট, সরষে চাষ করেন। কিছু পরিবার মাছ চাষ করে, কেউ কেউ গরু-ছাগল পালেন। গ্রামের প্রান্তে এক কুমোর পরিবার বাস করে যারা আজও মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে মেলায় বিক্রি করে।

এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব। ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে। বর্ষায় যখন ভৈরব নদী দুকূল ছাপিয়ে ওঠে, তখন গ্রামটা যেন জলে ভাসে—ঠিক যেন সুকান্তর কবিতার 'মজা নদী'র মতো।

মানুষজনের জীবন সহজ-সরল। বটগাছতলায় বসে বিকেলে গ্রামের বয়স্কদের আড্ডা জমে। সন্ধ্যার সময় মন্দির থেকে শাঁখ আর ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসে।

তবে কিছু অসুবিধাও আছে—ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, বর্ষায় রাস্তাঘাট কাদায় একাকার। মাধ্যমিকের পর ছেলেমেয়েদের পড়ার জন্য ভালো স্কুল পাওয়া মুশকিল।

আমার মনে হয়, গ্রামের উন্নতির জন্য একটি ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এবং ছোটোখাটো কুটিরশিল্পের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা উচিত। তাতে করে গ্রামের ছেলেমেয়েরা শহরে না গিয়েও কিছু কাজ পাবে।

গ্রামটি যেন সুকান্তর 'চিরদিনের' গ্রামটির মতোই—সবুজে মোড়া, মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত।

কবিতার শিক্ষা

মনে রেখো: সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'চিরদিনের' কবিতা বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক মহাকাব্য। এখানে প্রকৃতিও চিরন্তন, আবার মানুষের লড়াই, পরিশ্রম আর ভালোবাসাও চিরন্তন। দুর্ভিক্ষ আসে, আবার কেটেও যায়। সবুজ ফসলের মতোই জীবন চিরদিনের—থেমে থাকা তার ধর্ম নয়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

\'চিরদিনের\' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রতিবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) রচিত। এটি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির \'সাহিত্য মেলা\' পাঠ্যপুস্তকের ষষ্ঠ পাঠ।

\'চিরদিনের\' কবিতার মূলভাব হলো: বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতি ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনচিত্র। কবিতায় গ্রামের বৃষ্টি, সবুজ মাঠ, নদী, দিঘি, বটগাছের সৌন্দর্যের পাশাপাশি কৃষক-কামার-কুমোর-তাঁতিদের পরিশ্রমী জীবনের ছবি আঁকা হয়েছে। দুর্ভিক্ষের আঁচল জড়ানো সত্ত্বেও সম্মিলিত শ্রম ও জীবনীশক্তির মাধ্যমে সবুজ ফসলের মধ্য দিয়ে গ্রাম আবার জেগে ওঠে—এ যেন সুবর্ণ যুগের ইঙ্গিত।

কবিতায় উল্লেখিত জীবিকার মানুষ হলেন: কৃষক (কিষাণ) যারা ক্ষেতে চাষাবাদ করেন, কামার যারা লোহার কাজ করেন, কুমোর যারা মাটির জিনিস গড়েন, তাঁতি যারা তাঁত বোনেন, এবং কৃষক-বধূ যাঁরা কৃষিকাজে সহায়তা করে ও ঘরে দীপ জ্বেলেছেন। কবিতাটি তাঁদের সম্মিলিত শ্রমের জয়গান।