নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত সপ্তম শ্রেণির 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, সারাংশ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সপ্তম শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য মেলা বইয়ের অন্তর্ভুক্ত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতার সম্পূর্ণ সারসংক্ষেপ, লাইনভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও Broad Questions) নিচে দেওয়া হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি বর্ষাবন্দনার গান বা কবিতা, যা তাঁর 'গীতবিতান' গ্রন্থের 'প্রকৃতি' পর্যায়ের অন্তর্গত। এই কবিতায় গ্রীষ্মের দাবদাহে জর্জরিত পৃথিবীর বুকে বর্ষার স্নিগ্ধ ও সজীব রূপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

কবিতার শুরুতে দেখা যায়, বর্ষার গম্ভীর ও কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে। মেঘের সেই অঞ্জন বা কাজলের মতো নীল ও ঘন ছায়ায় বনলক্ষ্মী বা প্রকৃতির শরীর আনন্দে কাঁপছে এবং তার অন্তর চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক যেন প্রকৃতির নূপুরের ধ্বনির মতো বাজছে। বৃষ্টির শব্দ মেঘের গুরুগম্ভীর ছন্দের সাথে মিশে মুখরিত হয়ে উঠেছে এবং কদম্ববন বৃষ্টির আনন্দ ও গন্ধে গভীরভাবে মগ্ন হয়েছে। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ দেখে কবির মনে হচ্ছে যেন কোনো গম্ভীর উৎসব মন্দিরের সূচনা হয়েছে।

গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে দগ্ধ পৃথিবী পিপাসার্ত হয়ে পড়েছিল। সেই সময় বর্ষার মেঘ ইন্দ্রলোক থেকে অমৃতের মতো বৃষ্টির বার্তা নিয়ে এসেছে। বৃষ্টির জলে ভিজে মাটির কঠিন বাধা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং চারদিকে মাটি ভেদ করে নতুন ঘাস ও অঙ্কুর গজিয়ে উঠেছে। সেই নতুন অঙ্কুরগুলোকে কবি নবজীবনের জয়পতাকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গ্রীষ্মের তাপে বন্দি থাকা প্রাণশক্তি যেন বর্ষার আগমনে সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে মুক্ত হয়েছে।

২. কবি পরিচিতি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১): কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, গায়ক, সুরকার এবং চিত্রশিল্পী। ১৯১৩ সালে 'গীতাঞ্জলি' কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের (Song Offerings) জন্য তিনি এশিয়ার মধ্যে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে— সোনার তরী, মানসী, বলাকা, পুনশ্চ ইত্যাদি। তাঁর রচিত গানগুলি 'গীতবিতান' গ্রন্থে সংকলিত রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁরই রচনা।

৩. কবিতার লাইনভিত্তিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা

নীল-অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সমবৃত অম্বর হে গম্ভীর !
ব্যাখ্যা: 'নীল অঞ্জন' মানে নীল কাজল। 'পুঞ্জছায়া' মানে মেঘের ঘন ছায়া। 'সমবৃত' মানে আচ্ছাদিত বা ঢাকা। 'অম্বর' মানে আকাশ। বর্ষাকালে আকাশের মেঘ যেন নীল কাজলের মতো গাঢ় এবং ঘন ছায়ায় সমস্ত আকাশকে ঢেকে ফেলেছে। এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশ অত্যন্ত 'গম্ভীর' বা শান্ত ও ভারী রূপ ধারণ করেছে।
বনলক্ষ্মীর কম্পিত কায়, চঞ্চল অন্তর-
ব্যাখ্যা: বর্ষার আগমনে বনলক্ষ্মী অর্থাৎ বনপ্রকৃতির শরীর বা 'কায়' আনন্দে এবং বৃষ্টির পরশে কেঁপে উঠছে। আর বর্ষার এই নতুন রূপ দেখে তার অন্তর বা মন চঞ্চল ও উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছে।
ঝঙ্কৃত তার ঝিল্লির মঞ্জীর হে গম্ভীর ।।
ব্যাখ্যা: 'ঝিল্লি' মানে ঝিঁঝি পোকা। 'মঞ্জীর' মানে নূপুর। বর্ষায় ঝিঁঝি পোকারা একটানা ডাকতে শুরু করে। কবির মনে হচ্ছে, প্রকৃতির পায়ে পরা নূপুরের মতোই যেন ঝিঁঝি পোকার ডাক রিনিঝিনি শব্দে (ঝঙ্কৃত) বেজে উঠেছে।
বর্ষণগীত হলো মুখরিত মেঘমন্দ্রিত ছন্দে,
ব্যাখ্যা: 'বর্ষণগীত' মানে বৃষ্টির গান বা শব্দ। 'মেঘমন্দ্রিত' মানে মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন। অবিশ্রান্ত বৃষ্টির শব্দ যেন মেঘের গর্জনের সাথে মিশে একটি অপূর্ব ছন্দে চারদিকে ধ্বনিত বা মুখরিত হয়ে উঠেছে।
কদম্ববন গভীর মগন আনন্দঘন গন্ধে-
ব্যাখ্যা: বর্ষায় কদম ফুল ফোটে। বৃষ্টির পরশে কদম্ববন বা কদম ফুলের বন যেন আনন্দের সুগন্ধে গভীরভাবে মগ্ন বা বিভোর হয়ে আছে।
নন্দিত তব উৎসবমন্দির হে গম্ভীর ।।
ব্যাখ্যা: 'নন্দিত' মানে আনন্দিত। বর্ষার এই মেঘ, বৃষ্টি, ঝিঁঝির ডাক এবং ফুলের সুবাস সবকিছু মিলে প্রকৃতিকে যেন এক আনন্দময় উৎসবের মন্দিরে পরিণত করেছে।
দহনশয়নে তপ্ত ধরণী পড়েছিল পিপাসার্তা,
ব্যাখ্যা: 'দহনশয়ন' মানে আগুনের বা গরমের শয্যা। 'তপ্ত ধরণী' মানে গরম পৃথিবী। 'পিপাসার্তা' মানে যার খুব তৃষ্ণা বা তেষ্টা পেয়েছে। বর্ষার আগে গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে দগ্ধ পৃথিবী যেন আগুনের বিছানায় শুয়ে বৃষ্টির জলের জন্য চরম তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিল।
পাঠালে তাহারে ইন্দ্রলোকের অমৃতবারির বার্তা।
মাটির কঠিন বাধা হলো ক্ষীণ, দিকে দিকে হলো দীর্ণ-
ব্যাখ্যা: গ্রীষ্মের তাপে মাটি শুকিয়ে খুব শক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির জল পেয়ে সেই মাটির কঠিন বাধা এখন দুর্বল বা 'ক্ষীণ' হয়ে গেছে এবং তা ফেটে বা 'দীর্ণ' হয়ে চারদিকে নরম হয়ে গেছে।
নব-অঙ্কুর-জয়পতাকায় ধরাতল সমাকীর্ণ-
ব্যাখ্যা: মাটি নরম হওয়ার ফলে মাটির নিচ থেকে নতুন ঘাস বা চারাগাছ (নব-অঙ্কুর) বেরিয়ে এসেছে। এই নতুন চারাগাছগুলোকে কবি বর্ষার বিজয়ের পতাকার (জয়পতাকা) সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর উপরিভাগ (ধরাতল) ভরে গেছে বা 'সমাকীর্ণ' হয়েছে।
ছিন্ন হয়েছে বন্ধন বন্দীর হে গম্ভীর ।।
ব্যাখ্যা: গ্রীষ্মের তাপে মাটির নিচে যে প্রাণের স্পন্দন বা বীজগুলো বন্দি হয়ে ছিল, বর্ষার বৃষ্টির জলে তাদের সেই বন্দিদশার শিকল বা বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তারা মুক্ত হয়ে নতুন জীবন লাভ করেছে।

৪. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২৫+ টি প্রশ্ন

১. 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) কাজী নজরুল ইসলাম (খ) সুকুমার রায় (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঘ) জীবনানন্দ দাশ
উত্তর: (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. আকাশ কীসে আচ্ছাদিত বা সমবৃত হয়েছে?
(ক) সাদা মেঘে (খ) নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় (গ) কালো ধোঁয়ায় (ঘ) তারায়
উত্তর: (খ) নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়
৩. 'অঞ্জন' শব্দের অর্থ কী?
(ক) কাজল (খ) মেঘ (গ) জল (ঘ) ফুল
উত্তর: (ক) কাজল
৪. 'অম্বর' শব্দের অর্থ কী?
(ক) বাতাস (খ) আকাশ (গ) পৃথিবী (ঘ) পাতালা
উত্তর: (খ) আকাশ
৫. কার কায় কম্পিত হয়েছে?
(ক) নদীর (খ) পাখির (গ) বনলক্ষ্মীর (ঘ) মানুষের
উত্তর: (গ) বনলক্ষ্মীর
৬. 'মঞ্জীর' শব্দের অর্থ কী?
(ক) হার (খ) নূপুর (গ) মুকুট (ঘ) বালা
উত্তর: (খ) নূপুর
৭. বনলক্ষ্মীর মঞ্জীর বা নূপুর কীসের মতো বাজছে?
(ক) পাখির ডাকের মতো (খ) ঝিল্লির (ঝিঁঝি পোকার) মতো (গ) পাতার শব্দের মতো (ঘ) ব্যাঙের ডাকের মতো
উত্তর: (খ) ঝিল্লির (ঝিঁঝি পোকার) মতো
৮. বর্ষণগীত কীসের ছন্দে মুখরিত হয়েছে?
(ক) মেঘমন্দ্রিত ছন্দে (খ) বাতাসের ছন্দে (গ) নদীর ছন্দে (ঘ) নাচের ছন্দে
উত্তর: (ক) মেঘমন্দ্রিত ছন্দে
৯. কোন বন গভীর আনন্দঘন গন্ধে মগন বা বিভোর হয়ে আছে?
(ক) শালবন (খ) কদম্ববন (গ) বাঁশবন (ঘ) সেগুনবন
উত্তর: (খ) কদম্ববন
১০. তপ্ত ধরণী কোথায় শুয়ে ছিল?
(ক) ফুলের শয়নে (খ) দহনশয়নে (আগুনের বিছানায়) (গ) জলের তলায় (ঘ) মেঘের ওপর
উত্তর: (খ) দহনশয়নে (আগুনের বিছানায়)
১১. ধরণী কেমন অবস্থায় ছিল?
(ক) তৃপ্ত (খ) শান্ত (গ) পিপাসার্তা (তৃষ্ণার্ত) (ঘ) ঘুমন্ত
উত্তর: (গ) পিপাসার্তা (তৃষ্ণার্ত)
১২. ইন্দ্রলোক থেকে কীসের বার্তা পাঠানো হয়েছিল?
(ক) দুঃখের (খ) যুদ্ধের (গ) অমৃতবারির (অমৃতের মতো জলের) (ঘ) রোদের
উত্তর: (গ) অমৃতবারির (অমৃতের মতো জলের)
১৩. মাটির কঠিন বাধা কেমন হয়ে গেল?
(ক) শক্ত (খ) ক্ষীণ (দুর্বল) (গ) অদৃশ্য (ঘ) মজবুত
উত্তর: (খ) ক্ষীণ (দুর্বল)
১৪. মাটির বাধা দিকে দিকে কী হলো?
(ক) দীর্ণ (বিদীর্ণ বা ফাটা) (খ) পূর্ণ (গ) শক্ত (ঘ) সমান
উত্তর: (ক) দীর্ণ (বিদীর্ণ বা ফাটা)
১৫. ধরাতল কীসে সমাকীর্ণ বা ভরে গেল?
(ক) জলে (খ) নব-অঙ্কুর-জয়পতাকায় (গ) কাদায় (ঘ) ধুলোয়
উত্তর: (খ) নব-অঙ্কুর-জয়পতাকায়
১৬. বন্দীর কী ছিন্ন হয়েছে?
(ক) আশা (খ) বন্ধন (গ) ভয় (ঘ) দুঃখ
উত্তর: (খ) বন্ধন
১৭. 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন বইতে আছে?
(ক) গীতবিতান (খ) সঞ্চয়িতা (গ) সোনার তরী (ঘ) শিশু ভোলানাথ
উত্তর: (ক) গীতবিতান
১৮. 'সমবৃত' শব্দের অর্থ কী?
(ক) আচ্ছাদিত বা ঢাকা (খ) খোলা (গ) পরিষ্কার (ঘ) অন্ধকার
উত্তর: (ক) আচ্ছাদিত বা ঢাকা
১৯. 'দহনশয়ন' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
(ক) শান্তির বিছানা (খ) আগুনের বিছানা বা গ্রীষ্মের দাবদাহ (গ) জলের বিছানা (ঘ) ফুলের বিছানা
উত্তর: (খ) আগুনের বিছানা বা গ্রীষ্মের দাবদাহ
২০. কবিতাটিতে বারবার কোন সম্বোধনটি ফিরে এসেছে?
(ক) হে সুন্দর (খ) হে আকাশ (গ) হে গম্ভীর (ঘ) হে ধরণী
উত্তর: (গ) হে গম্ভীর

৫. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫+ টি প্রশ্ন

১. 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতাটি কার লেখা?
উত্তর: কবিতাটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা।
২. আকাশ বা অম্বর কীসে সমবৃত বা ঢাকা পড়েছে?
উত্তর: আকাশ নীল কাজলের মতো মেঘের ঘন ছায়ায় (নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়) ঢাকা পড়েছে।
৩. বনলক্ষ্মীর কায় বা শরীর কম্পিত হচ্ছে কেন?
উত্তর: বর্ষার আগমনে এবং বৃষ্টির আনন্দদায়ক পরশে বনলক্ষ্মীর বা বনপ্রকৃতির শরীর কম্পিত হচ্ছে।
৪. বনলক্ষ্মীর মঞ্জীর বা নূপুর কী দিয়ে তৈরি?
উত্তর: বনলক্ষ্মীর মঞ্জীর বা নূপুর ঝিল্লি অর্থাৎ ঝিঁঝি পোকার ডাক দিয়ে তৈরি।
৫. বর্ষণগীত বা বৃষ্টির গান কীসের ছন্দে মুখরিত হয়েছে?
উত্তর: বর্ষণগীত মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনের ছন্দে (মেঘমন্দ্রিত ছন্দে) মুখরিত হয়েছে।
৬. কদম্ববন কীসে মগন বা বিভোর হয়ে আছে?
উত্তর: কদম্ববন বৃষ্টির আনন্দঘন সুগন্ধে মগন বা বিভোর হয়ে আছে।
৭. তপ্ত ধরণী কোথায় পড়েছিল?
উত্তর: গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে তপ্ত ধরণী দহনশয়নে বা আগুনের বিছানায় পড়েছিল।
৮. পিপাসার্তা ধরণীকে কীসের বার্তা পাঠানো হয়েছিল?
উত্তর: পিপাসার্তা ধরণীকে ইন্দ্রলোক বা দেবতাদের দেশ থেকে অমৃতবারি অর্থাৎ বৃষ্টির জলের বার্তা পাঠানো হয়েছিল।
৯. বৃষ্টির ফলে মাটির কঠিন বাধা কেমন হয়ে গেল?
উত্তর: বৃষ্টির জল পেয়ে মাটির কঠিন বাধা ক্ষীণ বা দুর্বল হয়ে গেল এবং তা দিকে দিকে দীর্ণ বা ফেটে গেল।
১০. ধরাতল বা পৃথিবী কীসে সমাকীর্ণ বা ভরে গেল?
উত্তর: ধরাতল নব-অঙ্কুর-জয়পতাকায়, অর্থাৎ নতুন গজিয়ে ওঠা ঘাস ও চারারূপী বিজয়ের পতাকায় ভরে গেল।
১১. বন্দীর বন্ধন কীভাবে ছিন্ন হলো?
উত্তর: গ্রীষ্মের তাপে মাটির নিচে বন্দি থাকা বীজের বন্ধন বর্ষার বৃষ্টিতে ছিন্ন হলো এবং তারা নতুন চারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
১২. কবিতাটিতে কবি প্রকৃতিকে কী বলে সম্বোধন করেছেন?
উত্তর: কবিতাটিতে কবি বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন গম্ভীর প্রকৃতিকে 'হে গম্ভীর' বলে সম্বোধন করেছেন।

৬. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৩ টি প্রশ্ন

১. 'দহনশয়নে তপ্ত ধরণী পড়েছিল পিপাসার্তা' - ধরণী কেন পিপাসার্ত ছিল এবং তার তৃষ্ণা কীভাবে মিটল তা কবিতা অবলম্বনে লেখো।

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতায় বর্ষার আগে গ্রীষ্মের দাবদাহে প্রকৃতির যে করুণ অবস্থা হয়েছিল, তা বোঝাতেই এই পঙ্‌ক্তিটি ব্যবহার করা হয়েছে।

বর্ষা আসার আগে গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে পৃথিবী যেন আগুনের শয্যায় বা 'দহনশয়নে' শুয়ে দগ্ধ হচ্ছিল। প্রখর রোদে মাটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল এবং নদী-নালা, গাছপালা জলের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছিল। এই প্রচণ্ড তাপে দগ্ধ পৃথিবী বৃষ্টির জলের জন্য চরম তৃষ্ণার্ত বা 'পিপাসার্তা' হয়ে পড়েছিল।

অবশেষে বর্ষার কালো মেঘ আকাশ ঢেকে ফেলল। দেবতাদের বাসস্থান ইন্দ্রলোক থেকে যেন অমৃতের মতো বৃষ্টির জলের বার্তা নেমে এল। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামতেই পৃথিবীর সেই দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা মিটে গেল। বৃষ্টির জল পেয়ে শুকিয়ে যাওয়া তপ্ত ধরণী আবার শান্ত ও স্নিগ্ধ হয়ে উঠল।

২. 'নব-অঙ্কুর-জয়পতাকায় ধরাতল সমাকীর্ণ' - এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর: উক্তিটির তাৎপর্য: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতা থেকে গৃহীত এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে বর্ষার আগমনে পৃথিবীতে নতুন প্রাণের জাগরণের চিত্র ফুটে উঠেছে।

গ্রীষ্মের তাপে পৃথিবীর মাটি শুকিয়ে খুব শক্ত ও কঠিন হয়ে গিয়েছিল। বীজের ভেতরে যে প্রাণ সুপ্ত অবস্থায় ছিল, তা যেন সেই কঠিন মাটির নিচে বন্দি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যখন বর্ষার বৃষ্টি নামল, তখন সেই কঠিন মাটি ভিজে দুর্বল বা 'ক্ষীণ' হয়ে ফেটে গেল। আর সেই ফাটা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল নতুন ঘাস ও গাছের কচি চারা বা 'নব-অঙ্কুর'। এই নতুন চারাগুলোকে কবি সবুজ রঙের বিজয়ের পতাকার বা 'জয়পতাকা'-র সাথে তুলনা করেছেন। গ্রীষ্মের মৃত্যুতুল্য রুক্ষতাকে জয় করে প্রাণের যে এই নতুন উৎসব শুরু হলো, তার বিজয় নিশান বা নব-অঙ্কুরে সমগ্র পৃথিবী বা 'ধরাতল' ভরে উঠল বা 'সমাকীর্ণ' হলো।

৩. 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতায় বর্ষার প্রকৃতির যে রূপ ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' কবিতায় বর্ষার এক গম্ভীর, সজীব এবং আনন্দময় রূপ ফুটে উঠেছে।

গ্রীষ্মের দাবদাহের পর বর্ষা আসে আকাশে নীল কাজলের মতো গাঢ় ও ঘন মেঘের ছায়া বিস্তার করে। আকাশ এক গম্ভীর রূপ ধারণ করে। বৃষ্টির স্পর্শ পেয়ে বনলক্ষ্মী আনন্দে কেঁপে ওঠে, তার অন্তর চঞ্চল হয় এবং ঝিঁঝি পোকার ডাক যেন প্রকৃতির নূপুরের ধ্বনির মতো বাজতে থাকে। বৃষ্টির শব্দ মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনের সাথে মিশে অপূর্ব ছন্দে চারদিক মুখরিত করে তোলে। বৃষ্টির জলে কদম্ববন আনন্দের সুগন্ধে বিভোর হয়ে থাকে।
গ্রীষ্মের তাপে পিপাসার্ত পৃথিবীতে বর্ষা যেন ইন্দ্রলোক থেকে অমৃতের মতো জল নিয়ে আসে। এই জলের স্পর্শে মাটির কঠিন বাধা দূর হয় এবং মাটির নিচ থেকে নতুন চারা বা নব-অঙ্কুর বেরিয়ে এসে পৃথিবীর বুকে প্রাণের বিজয় পতাকা উড়িয়ে দেয়। এভাবেই বর্ষা পৃথিবীতে নবজীবনের সঞ্চার করে।

৭. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar) ১০ টি প্রশ্ন

বিপরীত শব্দ

  • গম্ভীর: চঞ্চল / লঘু
  • তপ্ত: শীতল
  • কঠিন: কোমল / নরম
  • ক্ষীণ: পুষ্ট / প্রবল
  • বন্দী: মুক্ত

সমার্থক শব্দ

  • অম্বর: আকাশ, গগন, নভঃ
  • ধরণী: পৃথিবী, ধরা, বসুন্ধরা
  • অঞ্জন: কাজল, সুরমা
  • মেঘ: বারিদ, জলদ, নীরদ
  • বন: অরণ্য, কানন, জঙ্গল
  • বারি: জল, সলিল, নীর

বাক্য রচনা করো

  • গম্ভীর: মেঘের গম্ভীর গর্জনে সকলে ভয় পেয়ে গেল।
  • পিপাসার্তা: প্রচন্ড রোদে হেঁটে এসে মেয়েটি খুব পিপাসার্তা হয়ে পড়েছে।
  • বন্ধন: পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করে আমাদের দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে।

নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

এই কবিতা বা বর্ষার গানটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা।

কবিতায় 'অম্বর' বলতে আকাশকে বোঝানো হয়েছে, যা মেঘের নীল ঘন ছায়ায় ঢেকে গেছে।

দেবতাদের দেশ ইন্দ্রলোক থেকে বৃষ্টির জল বা অমৃতবারি নেমে আসায় পিপাসার্ত ধরণীর তৃষ্ণা মিটল।