মোরা দুই সহোদর ভাই

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “মোরা দুই সহোদর ভাই” কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ ও ব্যাকরণ সমাধান | ষষ্ঠ শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 20 November 2025 Last Update: 03 June 2026

🤝 মোরা দুই সহোদর ভাই

কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (ষষ্ঠ শ্রেণি, WBBSE) • বিংশ পাঠ

হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এক বৃন্তে দুটি কুসুম সাম্যবাদ ভেদাভেদের প্রতিবাদ

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯ - ১৯৭৬)

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। ১৩২৬ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য নামক পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা “মুক্তি” প্রকাশিত হয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে “বিদ্রোহী” কবিতা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁর কবিতা কেবল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বরং সমাজের সমস্ত রকম অসাম্য, অন্যায় এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। হিন্দু ও মুসলমান—উভয়ের ঐতিহ্যের সার্থক মেলবন্ধন ঘটেছে তাঁর রচনায়। তাঁর রচিত বিখ্যাত বইগুলির মধ্যে রয়েছে— অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণীমনসা, প্রলয়শিখা প্রভৃতি।

📖

কবিতা

মোরা দুই সহোদর ভাই

✍️

কবি

কাজী নজরুল ইসলাম

🤝

মূলভাব

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

📚

পাঠ

বিংশ পাঠ

কবিতার সারাংশ

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “মোরা দুই সহোদর ভাই” কবিতাটিতে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের এক শাশ্বত ও মহান বার্তা দেওয়া হয়েছে। কবি বলেছেন, হিন্দু ও মুসলমান একই মায়ের দুই সন্তানের মতো (সহোদর)। ভারতমাতা হলো সেই বৃন্ত বা বোঁটা, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম নামক দুটি সুন্দর ফুল (কুসুম) ফুটেছে। যিনি মুসলিমদের সৃষ্টি করেছেন, তিনিই হিন্দুদের সৃষ্টিকর্তা। এই পরম সত্যটি ভুলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদ করা মানে খোদ সৃষ্টিকর্তার উপর খোদকারি বা অবিচার করা।

আমাদের দেশের আজকের এই হীন-দশা বা দুর্গতির মূল কারণই হলো এই ভেদাভেদ। প্রকৃতি বা ভগবান হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না। দেশে বন্যা বা মড়ক এলে দুই ভাইয়েরই সমান ক্ষতি হয়। একইভাবে মেঘের বৃষ্টি, সূর্যের আলো বা চাঁদের কিরণ উভয়েই সমানভাবে উপভোগ করে। মানুষের বাইরে শুধু রঙের বা পোশাকের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ভেতরের আত্মায় কোনো ভেদ বা পার্থক্য নেই। তাই সকলকেই এক মায়ের দুই সহোদর ভাইয়ের মতো মিলেমিশে থাকতে হবে।

শব্দার্থ (Word Meanings)

শব্দঅর্থশব্দঅর্থ
সহোদরএকই মায়ের সন্তান / আপন ভাইহীন-দশাদুরবস্থা / করুণ অবস্থা
বৃন্তবোঁটাখোদকারিঅসঙ্গত বা অনুচিত হস্তক্ষেপ
কুসুমফুলমড়কমহামারী / মৃত্যুমিছিল
ঠাঁইস্থান, আশ্রয়সুরুষেরসূর্যের
বিবাদঝগড়া / কলহতফাতপার্থক্য / প্রভেদ

হাতে কলমে (অনুশীলনীর সম্পূর্ণ উত্তর)

১. কবি পরিচিতি থেকে প্রশ্ন:

১.১ কবি কাজী নজরুল ইসলামের কোন কবিতা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল?
১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা “বিদ্রোহী” কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।
১.২ তাঁর লেখা দুটি কবিতার বইয়ের নাম লেখো।
তাঁর লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য কবিতার বইয়ের নাম হলো— “অগ্নিবীণা” এবং “বিষের বাঁশি”।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও :

২.১ “মোরা দুই সহোদর ভাই” কবিতায় “সহোদর” কারা?
এই কবিতায় ভারতের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়কে একই মায়ের দুই “সহোদর” ভাই বলা হয়েছে।
২.২ “আমাদের হীন-দশা এই তাই”— আমাদের এই “হীন-দশা”র কারণ কী?
হিন্দু ও মুসলমান একে অপরের আপন ভাই হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে বিবাদ বা ঝগড়া করে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির উপর খোদকারি করে, এটিই আমাদের হীন-দশা বা দুর্গতির প্রধান কারণ।
২.৩ “বাইরে শুধু রঙের তফাত ভিতরে ভেদ নাই”— “রঙের তফাত” বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
“রঙের তফাত” বলতে কবি মানুষের বাইরের শারীরিক গঠন, গায়ের রং, বাহ্যিক রূপ এবং ভিন্ন ধর্ম ও পোশাকের পার্থক্যকে বুঝিয়েছেন।

৩. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো

৩.১ “এক বৃন্তে দুটি কুসুম এক ভারতে ঠাঁই।”— পঙ্ক্তিটিতে প্রদত্ত উপমাটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: “বৃন্ত” কথার অর্থ হলো বোঁটা এবং “কুসুম” মানে ফুল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমগ্র ভারতবর্ষকে বা ভারতমাতাকে একটি বৃন্ত বা বোঁটার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়কে সেই একই বোঁটায় ফুটে থাকা দুটি আলাদা অথচ সুন্দর ফুলের (কুসুম) সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই অপূর্ব উপমার মাধ্যমে তিনি দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে থাকা অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের শাশ্বত বার্তা দিয়েছেন।
৩.২ “সব জাতিরই সকলকে তাঁর দান যে সমান করে”— কার, কোন দানের কথা এখানে বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে “তাঁর” বলতে পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা বা ভগবানের (খোদার) কথা বলা হয়েছে।
আর “দান” বলতে প্রকৃতির অকৃপণ উপহার— যেমন বৃষ্টির জল, চাঁদের আলো, সূর্যের কিরণ ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। ভগবান যখন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে (হিন্দু বা মুসলিম) কোনো ভেদাভেদ না করে সবাইকে সমানভাবে এই প্রাকৃতিক সম্পদ দান করেন, তখন মানুষের উচিত নিজেদের মধ্যে ধর্মের নামে হানাহানি না করা।
৩.৩ “চাঁদ সুরুষের আলো কেহ কম-বেশি কি পাই” — “চাঁদ সুরুষের আলো” কী? কবির এই প্রশ্নটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: “চাঁদ সুরুষের আলো” হলো সৃষ্টিকর্তার পাঠানো প্রাকৃতিক উপাদান, যা পৃথিবীর সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় (সুরুষ মানে সূর্য)।
অন্তর্নিহিত অর্থ: প্রকৃতি বা ভগবান কখনো মানুষের জাত বা ধর্মের বিচার করেন না। হিন্দু এবং মুসলমান—সবাই চাঁদের স্নিগ্ধ আলো বা সূর্যের তেজ সমানভাবে উপভোগ করে। সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং যখন তাঁর সন্তানদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করেন না, তখন আমাদের নিজেদের মধ্যে ধর্মের নামে ভেদাভেদ বা ঝগড়া করা চরম মূর্খতা ও অপরাধ। কবি এই সত্যটিকেই প্রশ্নাকারে তুলে ধরেছেন।

৪. সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া চিহ্নিত করো

প্রদত্ত বাক্যঅসমাপিকা ক্রিয়াসমাপিকা ক্রিয়া
৪.১ মোরা বিবাদ করে খোদার উপর করি যে খোদকারি।করেকরি
৪.২ দুই জাতি ভাই সমান মরে মড়ক এলে দেশে।এলেমরে
৪.৩ সব জাতিরই সকলকে তাঁর দান যে সমান করে।(নেই)করে

৫. সন্ধি বিচ্ছেদ করো

সহোদর = সহ + উদর
সৃষ্টি = সৃজ্ + তি
বৃষ্টি = বৃষ্ + তি
শাস্তি = শাস্ + তি

৬. “বি” উপসর্গ যোগে পাঁচটি শব্দ তৈরি করো

বিবাদ
বিজ্ঞান
বিদেশ
বিজয়
বিকাশ

৭. বিশেষ্য শব্দগুলিকে বিশেষণে রূপান্তরিত করো

মূল শব্দ (বিশেষ্য)রূপান্তরিত শব্দ (বিশেষণ)
কুসুমকুসুমিত
ভারতভারতীয়
সৃষ্টিসৃষ্ট
বিবাদবিবাদী
জাতিজাতীয়
রংরঙিন (বা রাঙা)

৮. উদ্দেশ্য ও বিধেয় অংশ ভাগ করে দেখাও

বাক্যউদ্দেশ্য অংশবিধেয় অংশ
৮.১ হিন্দু আর মুসলিম মোরা দুই সহোদর ভাই।হিন্দু আর মুসলিম মোরাদুই সহোদর ভাই।
৮.২ দুই জনারই মাঠেরে ভাই সমান বৃষ্টি ঝরে।সমান বৃষ্টিদুই জনারই মাঠেরে ভাই ঝরে।
৮.৩ বন্যাতে দুই ভাইয়ের কুটির সমানে যায় ভেসে।দুই ভাইয়ের কুটিরবন্যাতে সমানে যায় ভেসে।
৮.৪ চাঁদ সুরুষের আলো কেহ কম-বেশি কি পাই।কেহচাঁদ সুরুষের আলো কম-বেশি কি পাই।

কবিতার মূল শিক্ষা

“মোরা দুই সহোদর ভাই” কবিতাটি আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতা। কবি প্রমাণ করেছেন যে, আমাদের সৃষ্টিকর্তা এক এবং তাঁর সৃষ্টি করা প্রকৃতিও মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করে না। তাই ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করা মানুষের মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে শান্তি ও উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি হলো হিন্দু-মুসলিম সহ সকল সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সহাবস্থান।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

“মোরা দুই সহোদর ভাই” কবিতাটি সাম্যবাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত। এটি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা “সাহিত্য মেলা” বইয়ের বিংশ পাঠের অন্তর্ভুক্ত।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভারতবর্ষের হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়কে একই মায়ের দুই সন্তান বা “সহোদর ভাই” বলেছেন।

কবি ভারতবর্ষকে একটি বৃন্ত বা বোঁটার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে হিন্দু ও মুসলমান নামক দুটি সুন্দর ফুল (কুসুম) ফুটে রয়েছে। এটি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক।

কাজী নজরুল ইসলামের লেখা দুটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হলো “অগ্নিবীণা” এবং “বিষের বাঁশি”।