ধরাতল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত "ধরাতল" কবিতার সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর, সারাংশ, শব্দার্থ ও ব্যাকরণ সমাধান | ষষ্ঠ শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 20 November 2025 Last Update: 03 June 2026

⛵ ধরাতল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (ষষ্ঠ শ্রেণি, WBBSE) • একবিংশ পাঠ • কবিতা

প্রকৃতি নৌকোযাত্রা সুখ-দুঃখ জীবনবোধ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)

জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, চিত্রশিল্পী এবং সুরকার। ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ভারতী ও বালক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ১৯১৩ সালে Song Offerings (গীতাঞ্জলি)-এর জন্য এশিয়ার মধ্যে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তাঁর রচনা। পাঠ্য "ধরাতল" কবিতাটি তাঁর "চৈতালি" নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।

📖

কবিতা

ধরাতল

✍️

কবি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

🌍

উৎস

চৈতালি কাব্যগ্রন্থ

📚

পাঠ

একবিংশ পাঠ

কবিতার সারাংশ ও মূলভাব

সারাংশ: "ধরাতল" কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক নৌকোযাত্রার রূপকের মাধ্যমে মানবজীবনের গভীর তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। কবি যেন নদীর বক্ষ চিরে নৌকো বেয়ে চলেছেন আর দু-পাশের শ্যামল পৃথিবী, ছায়াময় গ্রাম এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ দেখছেন। নদীর স্রোতের মতো সবকিছুই যেন "যাই যাই" বলে ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষণস্থায়ী বলেই কবি সবকিছুকে এত ভালোবেসে দেখেন। সুখ ও দুঃখকে তাঁর দুই ভাইবোনের মতো মনে হয়, যারা করুণ চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সবশেষে কবির মনে হয়, ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার আর সুখ-দুঃখ সবকিছু নিয়েই আমাদের এই ধরণী বা পৃথিবী বড়ো সুন্দর।

কেন্দ্রীয় চেতনা: মানবজীবন নদীর স্রোতের মতোই বহমান এবং ক্ষণস্থায়ী। এই পৃথিবীতে ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার এবং সুখ-দুঃখ একে অপরের পরিপূরক। এই সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব আছে বলেই পৃথিবীর রূপ এত সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময়।

১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও

২ টি
১.১ কবি রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি গীতিনাট্যের নাম লেখো।
কবি রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি বিখ্যাত গীতিনাট্যের নাম হলো "বাল্মীকিপ্রতিভা" (অথবা "মায়ার খেলা")।
১.২ তোমাদের পাঠ্যকবিতাটি তাঁর কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া?
আমাদের পাঠ্য "ধরাতল" কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "চৈতালি" নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।

২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর লেখো

৭ টি
২.১ কবির মনে আজ কী ভাবনা এসেছে?
কবির মনে আজ জীবনের ছোটো ছোটো কথা এবং ছোটো ছোটো গীত বা স্মৃতির ভাবনা ভেসে এসেছে।
২.২ যেতে যেতে নদীতীরে কবির চোখে কোন দৃশ্য ধরা পড়েছে?
যেতে যেতে নদীতীরে কবির চোখে কূলে কূলে বিস্তৃত শ্যামল ধরণী এবং ছায়াময় গ্রামগুলির অপরূপ দৃশ্য ধরা পড়েছে।
২.৩ সবাই প্রতি মুহূর্তে কী কথা বলছে?
নদীর স্রোতের সাথে পারিপার্শ্বিক দৃশ্যগুলি পিছিয়ে পড়ার ফলে মনে হচ্ছে সবাই প্রতি মুহূর্তে বা নিমেষে নিমেষে "যাই যাই" কথাটি বলছে বা বিদায় জানাচ্ছে।
২.৪ যা কিছু দেখেন তাকেই কবি ভালোবাসেন কেন?
জীবনের চলার পথে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী বা খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা যায় বলে কবি যা কিছু দেখেন তাকেই গভীর ভালোবেসে দেখেন।
২.৫ কবি কাদের ভাইবোনের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
কবি মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য দুই অংশ "সুখ" এবং "দুঃখ"-কে ভাইবোনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
২.৬ গ্রামগুলি দেখে কবির কী মনে হয়েছে?
তীরের ছায়াময় গ্রামগুলি দেখে কবির মনে হয়েছে যে ওই গ্রামগুলিকে ঘিরে গ্রামের মানুষের কত প্রেম ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে।
২.৭ পৃথিবীর দিকে তাকালে কবির কী মনে হয়?
পৃথিবীর দিকে তাকালে কবির মনে হয় যে ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখ এবং অন্ধকার-আলো—সবকিছু নিয়েই আমাদের এই পৃথিবী বা ধরণী খুব ভালো।

শব্দার্থ (Vocabulary)

ধরা পৃথিবী
হেরি দেখি বা অবলোকন করি
ধরণী পৃথিবী বা ধরাতল
তরণী নৌকো বা জলযান
শ্যামল সবুজ বা শ্যামবর্ণ
নিমেষ মুহূর্ত বা পলক
নয়ন/নয়ান চোখ বা নেত্র
উৎসুক ব্যগ্র বা প্রবল ইচ্ছাযুক্ত
পরান প্রাণ বা জীবন
বাহিয়া বেয়ে বা চালিয়ে

ব্যাকরণ ও ভাষা অনুশীলন

৩. নীচের বিশেষ্যগুলিকে বিশেষণ এবং বিশেষণগুলিকে বিশেষ্যে রূপান্তরিত করো:

প্রদত্ত শব্দ (শ্রেণি)রূপান্তরিত শব্দ (শ্রেণি)
শ্যামল (বিশেষণ)শ্যামলিমা (বিশেষ্য)
দুঃখ (বিশেষ্য)দুঃখিত (বিশেষণ)
সুখ (বিশেষ্য)সুখী (বিশেষণ)
করুণ (বিশেষণ)করুণা (বিশেষ্য)
ছায়াময় (বিশেষণ)ছায়া (বিশেষ্য)
গ্রাম (বিশেষ্য)গ্রাম্য (বিশেষণ)
উৎসুক (বিশেষণ)ঔৎসুক্য (বিশেষ্য)
আলো (বিশেষ্য)আলোকিত (বিশেষণ)

৪. শব্দঝুড়ি থেকে ঠিক শব্দ নিয়ে নীচের ছকটি সম্পূর্ণ করো:

(শব্দঝুড়ি: বেয়ে, প্রাণ, আমার, হেরি)

প্রদত্ত শব্দসঠিক সমার্থক শব্দ
বাহিয়াবেয়ে
দেখিহেরি
মোরআমার
পরানপ্রাণ

৫. দুটি বিপরীতার্থক শব্দ যুক্ত হয়ে একটি শব্দে পরিণত হওয়া শব্দগুলি কবিতা থেকে খুঁজে বের করো এবং বাক্য রচনা করো:

কবিতা থেকে প্রাপ্ত বিপরীতার্থক যুক্ত শব্দগুলি হলো:

• দুঃখসুখ: মানুষের জীবনে দুঃখসুখ চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে।
• ভালোমন্দ: ভালোমন্দ সব রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই জীবন পূর্ণতা পায়।
• অন্ধকার-আলো: অন্ধকার-আলোর লুকোচুরি খেলায় প্রকৃতির অপরূপ রূপ ফুটে ওঠে।

৬. নীচের বাক্যগুলির রেখাঙ্কিত অংশে কোন বচনের ব্যবহার হয়েছে লেখো:

বাক্যবচন নির্ণয়
৬.১ চোখে পড়ে যাহা কিছু হেরি চারি পাশে।বহুবচন ("যাহা কিছু" দ্বারা অনেক কিছু বোঝানো হয়েছে)
৬.২ কূলে কূলে দেখা যায় শ্যামল ধরণী।বহুবচন (একাধিক কূল বোঝাতে)
৬.৩ ক্ষণকাল দেখি বলে দেখি ভালোবেসে।একবচন (একটি নির্দিষ্ট অল্প সময়)
৬.৪ সবি বলে, "যাই যাই" নিমেষে নিমেষে।সবি = বহুবচন, নিমেষে নিমেষে = বহুবচন
৬.৫ যবে চেয়ে চেয়ে দেখি উৎসুক নয়ানে।একবচন (নয়ান বা চোখ অর্থে, বাংলায় দ্বিবচন নেই তাই একবচন)

৭. নীচের কবিতাংশটি ভেঙে পৃথক পৃথক বাক্যে লেখো:

যবে চেয়ে চেয়ে দেখি উৎসুক নয়নে / আমার পরান হতে ধরার পরানে-
ভালোমন্দ দুঃখসুখ অন্ধকার-আলো / মনে হয়, সব নিয়ে এ ধরণী ভালো।

পৃথক বাক্য:
১. আমি যখন উৎসুক চোখে আমার প্রাণ থেকে পৃথিবীর প্রাণের দিকে তাকাই।
২. তখন দেখি পৃথিবীতে ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখ এবং অন্ধকার-আলো সবই রয়েছে।
৩. আমার মনে হয়, এই সবকিছু মিলিয়েই আমাদের এই পৃথিবী বড়ো সুন্দর বা ভালো।

৮. নীচের প্রশ্নগুলির নিজের ভাষায় উত্তর লেখো (রচনাধর্মী)

৮.১ "আমি যেন চলিয়াছি বাহিয়া তরণী"- এখানে "যেন" শব্দটি কেন ব্যবহার হয়েছে লেখো।
উত্তর: কবি বাস্তবে কোনো নদীতে নৌকো বা তরণী বেয়ে যাচ্ছেন না। তিনি মানবজীবনকে একটি প্রবহমান নদীর সঙ্গে এবং জীবনের যাত্রাপথকে নৌকো যাত্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সময়ের স্রোতে জীবন এগিয়ে চলেছে। যেহেতু এটি একটি কাল্পনিক উপমা বা রূপক, তাই এই কল্পনাকে বোঝানোর জন্যই কবি বাক্যে "যেন" শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
৮.২ কবির কল্পনার নৌকাযাত্রায় কী কী দৃশ্য তিনি দেখছেন?
উত্তর: কবির কল্পনার নৌকাযাত্রায় তিনি দেখছেন নদীর কূলে কূলে সবুজে ঘেরা শ্যামল পৃথিবী। দেখছেন তীরের ছায়াময় গ্রামগুলি, যেখানে মানুষের কত প্রেম আর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। এছাড়া তিনি অনুভব করছেন যে সুখ এবং দুঃখ দুই ভাইবোনের মতো করুণ চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে এবং সবকিছুই যেন ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়ে "যাই যাই" বলে পিছিয়ে পড়ছে।
৮.৩ সুখদুঃখকে কবির ভাইবোন মনে হয়েছে কেন?
উত্তর: মানবজীবনে সুখ এবং দুঃখ হলো মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যার জীবনে কেবল সুখ আছে বা কেবল দুঃখ আছে। ভাই ও বোন যেমন একই সংসারে পাশাপাশি অবস্থান করে, তেমনি সুখ ও দুঃখ মানুষের জীবনে হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি চলে। এরা একে অপরের পরিপূরক বলেই কবি সুখ-দুঃখকে ভাইবোন মনে করেছেন।
৮.৪ "মনে হয় সব নিয়ে এ ধরণী ভালো"- কখন পৃথিবীকে ভালো মনে হয়? এরকম মনে হবার কারণ কী?
উত্তর: কখন মনে হয়: যখন কবি উৎসুক চোখে পৃথিবীর দিকে তাকান এবং উপলব্ধি করেন যে ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, আলো-অন্ধকার—সবকিছুই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তখনই তাঁর পৃথিবীকে ভালো মনে হয়।
কারণ: পৃথিবীতে যদি কেবল আলো বা সুখ থাকত, তবে তার কোনো মূল্য বা বৈচিত্র্য থাকত না। অন্ধকারের অস্তিত্ব আছে বলেই আলোর এত কদর, আবার দুঃখ আছে বলেই সুখের এত আনন্দ। এই বিপরীতমুখী উপাদানের মিশ্রণেই জীবন পূর্ণতা পায় এবং পৃথিবী এত সুন্দর হয়ে ওঠে।
৮.৫ ট্রেন, নৌকো বা দূরপাল্লার বাসে করে যেতে যেতে পথের দুধারে যা দেখেছ তার বর্ণনা দিয়ে একটি অনুচ্ছেদ লেখো।
উত্তর: (নমুনা অনুচ্ছেদ - ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা দৃশ্য)
গত গ্রীষ্মের ছুটিতে আমরা ট্রেনে করে দার্জিলিং যাচ্ছিলাম। ট্রেনের জানলার ধারে বসে বাইরের দৃশ্য দেখতে আমার খুব ভালো লাগছিল। ট্রেন শহর ছাড়াতেই দেখলাম দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানের মাঠ। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো নদী, পুকুর আর ইটের বা মাটির বাড়ি ঘেরা গ্রাম পার হয়ে যাচ্ছিলাম। রাখাল ছেলেরা মাঠে গোরু চরাচ্ছিল। ট্রেনের গতির সাথে সাথে মনে হচ্ছিল যেন গাছপালা, ঘরবাড়ি সব পিছনের দিকে ছুটে পালাচ্ছে। দূর থেকে নীল পাহাড়ের সারি যখন চোখে পড়ল, তখন মনটা এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠল। ট্রেনের এই যাত্রাপথের দৃশ্য আমার চিরকাল মনে থাকবে।

কবিতার শিক্ষা

"ধরাতল" কবিতাটি আমাদের শেখায় যে মানবজীবন খুব ছোটো এবং ক্ষণস্থায়ী। তাই আমাদের উচিত চারপাশের পৃথিবীকে এবং প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসা। জীবনে দুঃখ বা অন্ধকার আসবেই, কিন্তু তাকে ভয় না পেয়ে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ ভালো-মন্দ সব মিলিয়েই এই পৃথিবী এত সুন্দর।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

"ধরাতল" কবিতাটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন। এটি তাঁর 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানবজীবনের সুখ এবং দুঃখকে দুই ভাইবোনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যারা মানুষের জীবনে সব সময় পাশাপাশি অবস্থান করে।

পৃথিবীতে ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ এবং আলো-অন্ধকার সবকিছুরই অস্তিত্ব রয়েছে। এই বিপরীতমুখী জিনিসগুলির মিশ্রণেই জীবন পূর্ণতা পায় এবং বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে, তাই কবির কাছে এই ধরণী বা পৃথিবীকে বড়ো ভালো মনে হয়।

কবিতায় নৌকোযাত্রা বলতে মূলত মানবজীবনের যাত্রাপথকে বোঝানো হয়েছে। নদীর স্রোতের মতো সময় যেমন এগিয়ে চলে, তেমনি মানুষও জীবনের নৌকো বেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।