🥭 ফাঁকি
রাজকিশোর পট্টনায়ক
গল্প (অনুবাদ)
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (ষষ্ঠ শ্রেণি, WBBSE) • ত্রয়োদশ পাঠ • অনুবাদ: জ্যোতিরিন্দ্রমোহন জোয়ারদার
আমগাছ
পরিবারের বন্ধু
প্রকৃতির ধ্বংসলীলা
বন্ধুবিচ্ছেদ
রাজকিশোর পট্টনায়ক (জন্ম: ১৯১৬)
তিনি ওড়িয়া সাহিত্যের একজন বলিষ্ঠ লেখক ও গল্পকার। ঔপন্যাসিক হিসেবেও তিনি সমান জনপ্রিয়। পেশাতে তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী এবং একজন নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যসাধক। আধুনিক জীবনের নর-নারীর মানসিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে তাঁর রচনায়। তাঁর লেখা বিশিষ্ট গল্পগ্রন্থগুলি হলো: পথুকি, তুঠ পাথর, ভড়াঘর, নিশান খুন্ট, পথর ঢিমা। আর উপন্যাসগুলির মধ্যে অসরন্তি, সিন্দুর গার, স্মৃতির মশাণি, চলাবাট প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। পাঠ্য ফাঁকি গল্পটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন জ্যোতিরিন্দ্রমোহন জোয়ারদার।
🌱
মূলভাব
গাছ ও মানুষের সম্পর্ক
"ফাঁকি" গল্পটি মানুষের সঙ্গে একটি গাছের গভীর আত্মিক সম্পর্কের কাহিনি। কটক শহরের কাঠজোড়ি নদীর ধারে বাড়ি তৈরি করার সময় গোপালের বাবা বাগানে একটি কলমি আমগাছ পুঁতেছিলেন। বেলে মাটি ও রুক্ষ পরিবেশ হওয়া সত্ত্বেও সবার অবহেলা পেরিয়ে গাছটি ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠে এবং গোপালদের বাড়ির নিশানায় পরিণত হয়। গাছটি নদীর দিক থেকে আসা গরম বাতাস ঠেকাত এবং গ্রীষ্মকালে মিষ্টি আম উপহার দিত। পরিবারের সকলের কাছে গাছটি যেন এক অকৃত্রিম বন্ধু ও পাহারাদার হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উড়োজাহাজের বোমার হাত থেকে বাঁচতে সরকারের লোকেরা গাছের গোড়া ঘেঁষে ট্রেঞ্চ খোঁড়ে, যার ফলে গাছটি দুর্বল হয়ে হেলে পড়ে। এরপর উইপোকার আক্রমণে গাছের অর্ধেকটা ফোঁপরা হয়ে যায়। অবশেষে আষাঢ় মাসের এক কালবৈশাখী ঝড়ে সেই নিরীহ আমগাছটি চিরতরে উপড়ে পড়ে। পরিবারের এক পরম বন্ধু গাছ এভাবেই হঠাৎ সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বিদায় নেয়, যা সকলের মনে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে।
| শব্দ | অর্থ | শব্দ | অর্থ |
| গুষ্ঠ | প্রায় ১৭৪০ বর্গফুট জমি বা এলাকা | সন্দিগ্ধ | সন্দেহযুক্ত |
| গন্ডা | চারটি | কোঁদল | ঝগড়া, বচসা |
| ফার্ম | খামার | ঠেকো | ঠেস, পড়ে যাওয়া আটকাতে অবলম্বন দেওয়া |
| সিধা | সোজা | ফি বছর | প্রতি বছর |
| কৃতজ্ঞ | উপকারীর উপকার যে মনে রাখে | পরাক্রম | বীরত্ব, বিক্রম, শক্তি |
হাতে কলমে (অনুশীলনীর সম্পূর্ণ উত্তর)
১. লেখক পরিচিতি থেকে প্রশ্ন:
১.১ রাজকিশোর পট্টনায়ক কোন ভাষার লেখক?
রাজকিশোর পট্টনায়ক ওড়িয়া (Odia) ভাষার একজন বলিষ্ঠ লেখক।
১.২ তাঁর লেখা দুটি গল্পের বইয়ের নাম লেখো।
তাঁর লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য গল্পের বইয়ের নাম হলো— 'পথুকি' এবং 'তুঠ পাথর'।
সন্দেহ = সম্ + দেহ
আষ্টেক = আট + এক
প্রত্যেক = প্রতি + এক
সম্পূর্ণ = সম্ + পূর্ণ
নিরপরাধ = নিঃ + অপরাধ
দুর্বল = দুঃ + বল
৩. প্রতিশব্দ লিখে তা দিয়ে বাক্য রচনা করো
| মূল শব্দ | প্রতিশব্দ | বাক্য রচনা |
| বাড়ি | গৃহ / ভবন | আমাদের গৃহ শান্তির নীড়। |
| ছেলে | পুত্র / বালক | মাঠে একটি বালক খেলা করছে। |
| রাস্তা | পথ / সড়ক | গ্রামের পথটি ভারী আঁকাবাঁকা। |
| পাথর | প্রস্তর / পাষাণ | পাহাড়ের গায়ে বড়ো বড়ো প্রস্তর খণ্ড পড়ে আছে। |
| গাছ | বৃক্ষ / তরু | বট বৃক্ষ বহু বছর বাঁচে এবং অনেক ছায়া দেয়। |
| বন্ধু | সখা / মিত্র | বিপদের দিনে প্রকৃত মিত্র চেনা যায়। |
| নদী | তটিনী / প্রবাহিনী | গঙ্গা ভারতের একটি পবিত্র ও দীর্ঘ নদী। |
৪. সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া বেছে নিয়ে লেখো
| প্রদত্ত বাক্য | সমাপিকা ক্রিয়া | অসমাপিকা ক্রিয়া |
| ৪.১ এটুকু জমি খালি রাখা যাক। | যাক | রাখা |
| ৪.২ আগে গাছ লাগাব। | লাগাব | (নেই) |
| ৪.৩ কোঁদল লাগবে, বাইরের কোঁদল এসে ঘরে ঢুকবে। | লাগবে, ঢুকবে | এসে |
| ৪.৪ মায়ে-পোয়ে ঘরের ভিতরে চলে গেল, বিশেষ আলোচনার জন্য। | গেল | চলে |
| ৪.৫ সকালে গোপাল আর গোপালের মা উঠে প্রথমেই গেল আমগাছ দেখতে, গাছ নেতিয়ে পড়েনি তো? | গেল, পড়েনি | উঠে, দেখতে, নেতিয়ে |
৫. সকর্মক ও অকর্মক ক্রিয়া চিহ্নিত করো
| প্রদত্ত বাক্য | ক্রিয়া ও তার শ্রেণিবিভাগ |
| ৫.১ বাবা আমগাছ নিয়ে পাঁচিলের কাছে লাগাচ্ছেন। | লাগাচ্ছেন (কী লাগাচ্ছেন? আমগাছ) — সকর্মক ক্রিয়া |
| ৫.২ খুব হয়েছে, মা আর ছেলের একই রকম বুদ্ধি। | হয়েছে (কর্ম নেই) — অকর্মক ক্রিয়া |
| ৫.৩ আপন চেষ্টাতেই গাছটি বেড়েছে। | বেড়েছে (কর্ম নেই) — অকর্মক ক্রিয়া |
| ৫.৪ জল দেওয়া হলো। | দেওয়া হলো (কী দেওয়া হলো? জল) — সকর্মক ক্রিয়া |
৬. গল্প থেকে পাঁচটি অনুসর্গ ও স্বাধীন বাক্য রচনা
- থেকে: গাছ থেকে টুপটাপ করে আম পড়ছে।
- দিয়ে: লাঠি দিয়ে কুকুরটিকে ভয় দেখিও না।
- জন্য: তোমার জন্য আমি এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম।
- কাছে: আমার কাছে সত্যজিৎ রায়ের একটা দারুণ গল্পের বই আছে।
- উপরে: টেবিলের উপরে চশমাটা রাখা আছে।
৭. পদ পরিবর্তন (বিশেষ্য ⇄ বিশেষণ)
| মূল শব্দ (পদ) | পরিবর্তিত রূপ (পদ) |
| জাহাজ (বিশেষ্য) | জাহাজি (বিশেষণ) |
| গাছ (বিশেষ্য) | গেছো (বিশেষণ) |
| পোষ (বিশেষ্য) | পোষা (বিশেষণ) |
| ঝড় (বিশেষ্য) | ঝোড়ো (বিশেষণ) |
| পশ্চিম (বিশেষ্য) | পশ্চিমা (বিশেষণ) |
৮. কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো
৮.১ কটক কোন নদীর তীরে অবস্থিত? ওড়িশার আরও একটি নদীর নাম লেখো。
গল্পের সূত্র অনুযায়ী কটক 'কাঠজোড়ি' নদীর তীরে (যা মহানদীর শাখা) অবস্থিত। ওড়িশার আরও একটি প্রধান নদীর নাম হলো মহানদী (বা বৈতরণী)।
৮.২ গোপালের বাবা প্রথমে কেন বাগানে ফুলগাছ লাগাতে চাননি?
কারণ গোপালদের বাড়ির সামনের ওই জায়গার মাটি ছিল অত্যন্ত রুক্ষ ও বেলে মাটি। তাছাড়া সেখানে বাইরে থেকে জল দেওয়ার কোনো সুবিধা ছিল না, তাই ফুলগাছ বাঁচিয়ে রাখা খুব কঠিন হতো বলে তিনি ফুলগাছ লাগাতে চাননি।
৮.৩ আমগাছে কেন ঠেকো দিতে হয়েছিল?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উড়োজাহাজ থেকে বোমা পড়ার আতঙ্কে সরকারের লোকেরা আমগাছের গোড়া ঘেঁষে একটি ট্রেঞ্চ বা পরিখা খুঁড়েছিল। এর ফলে গাছটির শিকড় আলগা হয়ে সেটি দুর্বল হয়ে পুবদিকে হেলে পড়েছিল। তাই গাছটিকে সোজা ও খাড়া রাখার জন্য পেয়ারা গাছের শক্ত ডাল দিয়ে ঠেকো দিতে হয়েছিল।
৮.৪ গাছটিকে উইয়ে খেয়ে ফেলল কীভাবে?
ট্রেঞ্চ খোঁড়ার ফলে গাছটি দুর্বল হয়ে হেলে পড়েছিল। গোপালরা পিঁপড়ে মারার জন্য গাছে ডিডিটি বা ওষুধ দিয়েছিল। ফলে পিঁপড়ে মরে যাওয়ায় গাছে উইপোকা নির্বিঘ্নে বাসা বাঁধার সুযোগ পায় এবং ধীরে ধীরে কাঁচা গাছটার অর্ধেকটা উইয়ে খেয়ে ফোঁপরা করে দেয়।
৮.৫ গল্প অনুসারে কটকের খবরের কাগজে আমগাছটিকে নিয়ে কী সংবাদ বেরিয়েছিল?
খবরের কাগজে সংবাদ বেরিয়েছিল যে— কটকে অর্ধরাত্রে ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে এবং শহরের ভিতরে পুরীঘাটে একটি আমগাছ উপড়ে পড়ে গেছে।
৯. নিজের ভাষায় বড়ো প্রশ্নের উত্তর লেখো
৯.১ 'একটু জমি খালি রাখা যাক' - প্রস্তাবটি কে দিয়েছিলেন? কেন তিনি এমন প্রস্তাব দিয়েছিলেন?
উত্তর: প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন গোপালের বাবা।
বাড়ির চারিদিকে ছিল মরুভূমির মতো শক্ত ও শুকনো পাথুরে মাটি। সেই রুক্ষ পরিবেশের মাঝে বাড়ি করার আগে পরিবেশটিকে কিছুটা স্নিগ্ধ, ছায়াময় এবং বাসযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি কিছুটা জমি খালি রেখে সেখানে গাছপালা লাগিয়ে বাগান করার জন্য এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
৯.২ 'গোপাল মুখ তুলে সন্দিগ্ধভাবে বাবার মুখের দিকে তাকাল।' তার এই সন্দেহের কারণ কী?
উত্তর: গোপালের বাবা জানিয়েছিলেন যে, তিনি নিজে বিরিবাটির বাগানে একটি কলমি আমগাছ তৈরি করেছেন এবং সেটিই এখানে পুঁতবেন। গোপাল জানত ভালো জাতের গাছ খামার বা ফার্ম থেকে কিনতে হয়। তাই তার বাবার নিজের হাতে তৈরি করা সেই কলমের গাছ থেকে আদৌ কোনো ভালো আম ফলবে কি না, সেই বিষয়ে গোপালের মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।
৯.৩ 'তুই করবি বাগান!' - বাবা কেন এমন মন্তব্য করেন?
উত্তর: গোপাল তখন একটি ছোটো ছেলে, সে নিজের হাতে এক বালতি জল তুলে স্নানটুকুও ঠিকমতো করতে পারে না। অথচ সেই রুক্ষ বেলে মাটিতে নিজে জল দিয়ে ফুলগাছ বাঁচিয়ে রাখার মতো কঠিন দায়িত্ব সে নিতে চাইছে! ছেলের এই অবাস্তব আবদার দেখেই বাবা ব্যঙ্গ করে এই মন্তব্য করেছিলেন।
৯.৪ 'গাছটাকে আর দু'হাত ভিতরে লাগালে কত ভালো হতো।' - কোন গাছ? কেন বক্তার এমন মনে হয়েছে?
উত্তর: এখানে গোপালদের বাড়ির কলমি 'আমগাছটির' কথা বলা হয়েছে।
কথাটি বলেছিলেন গোপালের মা। গাছটি পাঁচিলের একেবারে গা ঘেঁষে লাগানো হয়েছিল। তাঁর ভয় ছিল, গাছটি যখন বড়ো হবে, তখন তার ডালপালা পাঁচিল টপকে রাস্তার দিকে চলে যাবে। তখন রাস্তার দুষ্টু ছেলেরা ঢিল ছুড়ে আম পাড়তে আসবে এবং তার ফলে পাড়ার লোকেদের সঙ্গে অকারণে ঝগড়া-কোঁদল বাঁধবে। এই অশান্তির অভাবেই তাঁর এমন মনে হয়েছিল।
৯.৫ আমগাছটি কীভাবে গোপালবাবুর বাড়ির নিশানা হয়ে উঠেছিল?
উত্তর: গোপালবাবুদের বাড়িটি কাঠজোড়ি নদীর ধার বরাবর পুরীঘাট পুলিশের ফাঁড়ির পশ্চিম দিকে অবস্থিত ছিল। বাড়ির পাঁচিলের মধ্যে থাকা সেই বড়ো ও দৃশ্যমান আমগাছটি দূর থেকেই সকলের চোখে পড়ত। তাই কেউ গোপালবাবুর বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে, তিনি বলতেন পুলিশের ফাঁড়ির পশ্চিমে পাঁচিলের মধ্যে যেখানে আমগাছ দেখবেন, সেটাই তাঁদের বাড়ি। এভাবেই গাছটি তাঁদের বাড়ির চেনার সবচেয়ে সহজ নিশানা বা ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠেছিল।
৯.৬ গাছটি কীভাবে তাদের সাহায্য করেছিল বুঝিয়ে লেখো。
উত্তর: আমগাছটি নিঃস্বার্থভাবে পরিবারের অনেক উপকার করত। নদীর দিক থেকে ছুটে আসা গ্রীষ্মের লু বা গরম বাতাস এবং বালির ঝাপটা সে নিজের বুক দিয়ে আটকে বাড়িটিকে রক্ষা করত। ছন্নছাড়া গাছটি বাড়ির পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকত। এছাড়াও এটি স্নিগ্ধ ছায়া দিত, বন্ধুদের বসার সুন্দর পরিবেশ তৈরি করত, পূজা বা বিয়ের কাজে আমপাতা জোগাত এবং পরিবারের সকলকে মিষ্টি ও যত্ন করে তোলা আম উপহার দিত।
৯.৭ আমগাছটিকে ঘিরে বাড়ির সকলের অনুভূতির প্রকাশ গল্পে কীভাবে লক্ষ করা যায়?
উত্তর: গাছটি ধীরে ধীরে গোপালদের পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য সদস্যে পরিণত হয়েছিল। গাছে বোল এলে সবার মনে যেমন আনন্দ হতো, তেমনি কুয়াশা বা বাতাসে তা ঝরে যাওয়ার ভয়ে উদ্বেগও কাজ করত। খুব সাবধানে আম পাড়া হতো এবং কাক-বাদুড়ের হাত থেকে আম বাঁচানোর চেষ্টা চলত। গাছটি দুর্বল হয়ে হেলে পড়লে সবাই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। আর শেষে ঝড়ে গাছটি উপড়ে পড়লে বাড়ির সবাই একজন প্রিয় বন্ধুকে হারানোর শোকে গভীরভাবে ব্যথিত ও শূন্য অনুভব করেছিল।
৯.৮ 'সেই দিন থেকে গাছ হেলে পড়েছে পুবদিকে।' - কোন দিনের কথা বলা হয়েছে। গাছটি হেলে পড়ার কারণ কী?
উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উড়োজাহাজ থেকে বোমা পড়ার আতঙ্কে সরকারের লোকেরা যেদিন আমগাছের গোড়া ঘেঁষে একটি ট্রেঞ্চ বা পরিখা খুঁড়ে দিয়ে গিয়েছিল, এখানে সেই দিনের কথা বলা হয়েছে।
কারণ: গোড়ার কাছ থেকে গভীরভাবে মাটি খোঁড়ার ফলে গাছের শিকড়গুলো আলগা হয়ে যায় এবং সেটি তার মাটির জোর হারায়। এই দুর্বলতার কারণেই গাছটি পুবদিকে হেলে পড়েছিল।
৯.৯ 'ঠিক বন্ধুর মতই গাছ সব কথা লুকিয়ে রেখেছে।'- গাছটি কীভাবে গোপালের বন্ধু হয়ে উঠেছিল? কোন সব কথা সে লুকিয়ে রেখেছিল?
উত্তর: বন্ধু হওয়া: ছোটবেলা থেকে গাছটিকে বড়ো হতে দেখে গোপাল তার প্রতি এক আত্মিক টান অনুভব করত। সে তার বন্ধুদের এনে গাছের ছায়ায় বসাত এবং গর্ব করত। এভাবেই নির্বাক গাছটি তার প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল।
কথা লুকানো: গোপালের মা রাস্তার দিকে ঝুলে পড়া ডাল কাটতে বারণ করেছিলেন, কারণ তাতে গাছের ক্ষতি হতো। তা সত্ত্বেও গোপাল নিজের সুবিধার্থে চুপি চুপি কয়েকটা সরু ডাল কেটে ফেলেছিল। গাছটি তার সেই কাটা ডালের ক্ষতচিহ্নগুলো ধীরে ধীরে নতুন পাতায় ঢেকে ফেলেছিল। গোপালের এই অবাধ্যতার দোষটা গাছ যেন বন্ধুর মতোই সবার চোখের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল।
৯.১০ বিভিন্ন ঋতুতে আমগাছটির যে ছবি গল্পে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো。
উত্তর: গল্পে ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে আমগাছের অপূর্ব ছবি ফুটে উঠেছে। গ্রীষ্মকালে সে নদীর দিক থেকে আসা গরম বাতাস ও বালির ঝাপটা বুক দিয়ে ঠেকিয়ে বাড়িটিকে রক্ষা করত এবং সুস্বাদু আম দিত। বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব সে মুখ বুজে সহ্য করত, আর তার ডালে বেনেবৌ পাখি এসে বসত। শীত বা বসন্তের দিকে গাছে মুকুল বা বোল ধরলে তা কুয়াশায় বা বাতাসে ঝরে যাওয়ার এক আশঙ্কা তৈরি হতো। এভাবেই বিভিন্ন ঋতুতে গাছটি তার রূপ পালটাত।
৯.১১ গাছটি কীভাবে পরিবারের সকলকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল?
উত্তর: যুদ্ধের সময় ট্রেঞ্চ খোঁড়ার ফলে আমগাছটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং উইপোকার মারাত্মক আক্রমণে তার অর্ধেকটা ফোঁপরা হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সে লড়াই করে বেঁচে ছিল। কিন্তু অবশেষে আষাঢ় মাসের এক কালবৈশাখী ঝড়ের রাতে সেই নিরীহ, দুর্বল ও রুগ্ন আমগাছটি আর পেরে ওঠে না। সে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এভাবেই একটি সজীব গাছ, যে পরিবারের একজন বিশ্বস্ত সদস্য ও অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে উঠেছিল, সে রাতের অন্ধকারে চিরদিনের মতো সকলকে ফাঁকি দিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যায়।
গল্পের মূল সুর ও শিক্ষা
"ফাঁকি" গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গাছ শুধু কাঠ বা ফল দেওয়ার যন্ত্র নয়, তারা আমাদের পরিবারের একজন সদস্য এবং অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। একটি সাধারণ কলমি আমগাছ কীভাবে মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় এবং তার মৃত্যুতে কীভাবে একটি পরিবার স্বজন হারানোর ব্যথা অনুভব করে, লেখক রাজকিশোর পট্টনায়ক তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন। গল্পটি আমাদের প্রকৃতির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়।