🐯 বাঘ
নবনীতা দেবসেন
কবিতা
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (ষষ্ঠ শ্রেণি, WBBSE) • সপ্তদশ পাঠ • কবিতা
বাঘছানা
পাখিরালয়
কাঁকড়া ও মৎস্য
সজনেখালি
নবনীতা দেবসেন (জন্ম: ১৯৩৮)
কবি নরেন্দ্র দেব এবং সুলেখিকা শ্রীমতী রাধারাণী দেবীর সন্তান। কবিতা, গদ্য, ভ্রমণকাহিনি-সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপিকা ছিলেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই "প্রথম প্রত্যয়"। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে- "আমি অনুপম", "নটী নবনীতা", "খগেনবাবুর পৃথিবী", "গল্পগুজব", "মঁসিয়ে হুলোর হলিডে", "সমুদ্রের সন্ন্যাসিনী", "ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহনে" প্রভৃতি। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং শিশু সাহিত্যে বিদ্যাসাগর পুরস্কার পেয়েছেন।
সারাংশ: "বাঘ" কবিতায় একটি ছোট্ট হলুদ বাঘছানার মজার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। বাঘছানাটি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি পাখিরালয়ে (পাখিদের অভয়ারণ্যে) থাকত। সেখানে ছাগল, হরিণ বা ভেড়ার মতো বাঘের স্বাভাবিক খাবার না থাকায় সে খুব রেগে যেত। খিদে মেটাতে সে পাখি ধরতে গেলে পাখিরা উড়ে পালাত। এরপর নদীর পাড়ে গিয়ে লালঠেঙো কাঁকড়া ধরতে গেলে কাঁকড়া তার থাবা কামড়ে ধরে। বাবা বাঘ এসে তাকে বাঁচায়। শেষে খিদের জ্বালায় কাদায় নেমে ছোটো ছোটো মাছ ধরতে গেলে বাঘজননী খুব লজ্জা পান এবং বলেন বাঘেরা ভোঁদড়ের মতো মাছ ধরে না। সন্তানের খাদ্যাভাব ও কষ্টের কথা ভেবে বাঘ বাবা-মা শেষে পাখিরালয় ছেড়ে সজনেখোলায় (সুন্দরবনে) বাসা বদল করেন।
কেন্দ্রীয় চেতনা: এই মজার কবিতাটিতে প্রতিটি প্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান ও খাদ্যাভ্যাসের প্রয়োজনীয়তার কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বাঘের মতো শিকারি প্রাণীর জন্য যেমন পাখিদের বন উপযুক্ত নয়, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রত্যেক প্রাণীর নিজস্ব বাঁচার জায়গার গুরুত্ব অপরিসীম।
১. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও
২ টি
১.১ নবনীতা দেবসেনের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম কী?
নবনীতা দেবসেনের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম হলো "প্রথম প্রত্যয়"।
১.২ তাঁর লেখা একটি ভ্রমণকাহিনির নাম লেখো।
তাঁর লেখা একটি বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনির নাম হলো "ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহনে"।
২. নীচের প্রশ্নগুলির একটি বাক্যে উত্তর দাও
৪ টি
২.১ পাখিরালয়ের বাসায় কী পাওয়া যেত না?
পাখিরালয়ের বাসায় বাঘের শিকার করার মতো ছাগল, হরিণ বা ভেড়া পাওয়া যেত না।
২.২ ছোট্ট বাঘ তার খিদে মেটানোর জন্য প্রথমে কী ধরতে গিয়েছিল?
ছোট্ট বাঘ তার খিদে মেটানোর জন্য প্রথমে পাখির ছানা ধরতে গিয়েছিল।
২.৩ ছোট্ট বাঘের বাবা-মা বাসা বদলে কোথায় গিয়েছিল?
ছোট্ট বাঘের বাবা-মা বাসা বদলে পাখিরালয় ছেড়ে সজনেখোলায় (সজনেখালি) চলে গিয়েছিল।
২.৪ সুন্দরবনের বাঘ কী নামে পরিচিত?
সুন্দরবনের বাঘ "রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার" নামে পরিচিত।
৩. নীচের প্রশ্নগুলির সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও
৫ টি
৩.১ "ভদ্র বাঘে হেথায় বাঁধে ডেরা?" - বাঘছানার এমন মনে হয়েছিল কেন?
ছোট্ট বাঘছানা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে যে বনে থাকত সেটি ছিল পাখিদের বন বা পাখিরালয়। সেখানে বাঘের স্বাভাবিক খাদ্য যেমন ছাগল, হরিণ বা ভেড়া পাওয়া যেত না। তাই খাদ্যের অভাবে বিরক্ত হয়ে বাঘছানার এমন মনে হয়েছিল।
৩.২ ছোট্ট বাঘ পাখির ছানা ধরতে পারেনি কেন?
ছোট্ট বাঘ পাখির ছানা ধরার জন্য যতই লাফিয়ে উঠত, পাখিরা তত কিচমিচ করে ডানা ছড়িয়ে আকাশে উড়ে পালাত। তাই আকাশপথে উড়ে যাওয়া পাখিদের সে ধরতে পারেনি।
৩.৩ বাঘের ছানা গর্তে থাবা দিয়েই কেঁদে উঠেছিল কেন?
নদীর পাড়ে গর্তে থাবা দিতেই একটি লালঠেঙো কাঁকড়া তার ধারালো দাঁড়া দিয়ে বাঘের ছানার থাবা চিমটে ধরেছিল, তাই যন্ত্রণায় ও ভয়ে সে কেঁদে উঠেছিল।
৩.৪ বাঘছানাকে বাবা কীভাবে কাঁকড়ার হাত থেকে রক্ষা করল?
বাঘছানার কান্নার শব্দ শুনে তার বাবা ছুটে আসে এবং নিজের গোবদা নখের থাবা দিয়ে এক থাবড়ায় কাঁকড়ার দাঁড়া কেটে দিয়ে বাঘছানাকে রক্ষা করে।
৩.৫ বাঘজননী লজ্জা পেয়েছিল কেন?
খিদের জ্বালায় বাঘছানা যখন কাদায় নেমে ভোঁদড়ের মতো ছোটো ছোটো মাছ ধরতে গিয়েছিল, তখন বাঘজননী তার সন্তানের এই বাঘ-অযোগ্য আচরণ দেখে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল।
৪. উদাহরণ দেখে নীচের ছকটি সম্পূর্ণ করো:
| তৎসম শব্দ | তদ্ভব / প্রচলিত রূপ |
| ব্যাঘ্র | বাঘ |
| মৎস্য | মাছ |
| বৎস | বাছা (বা বাচ্চা) |
৫. সন্ধি করো:
পাখির + আলয় = পাখিরালয়
কাঁদ্ + না = কান্না
পাখিরালয় পাখিদের অভয়ারণ্য বা পাখিদের থাকার বন
ডেরা আস্তানা বা বসবাসের জায়গা
লালঠেঙো লাল রং-এর পা বিশিষ্ট
দাঁড়া কাঁকড়ার দাঁতযুক্ত লম্বা ধারালো ঠ্যাং
গোবদা মোটা ও ভারী
মেনিমৎস্য ছোটো বা তুচ্ছ মাছ
৬. সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দগুলির অর্থ লেখো:
| শব্দ | অর্থ | শব্দ | অর্থ |
| বন | অরণ্য / জঙ্গল | বোন | সহোদরা / ভগিনী |
| পাড়ে | নদীর তীরে / কূলে | পারে | সক্ষম হয় / পারে |
| বাড়ি | গৃহ / বাসগৃহ | বারি | জল |
৭. বিশেষ্য ও বিশেষণ আলাদা করে তাদের রূপ পরিবর্তন করো:
(শব্দ: মন, শরীর, সব্বোনেশে, ভদ্র, এক, পেট, রাগ)
| প্রদত্ত শব্দ | পদের শ্রেণি | রূপ পরিবর্তন |
| মন | বিশেষ্য | মানসিক (বিশেষণ) |
| শরীর | বিশেষ্য | শারীরিক (বিশেষণ) |
| পেট | বিশেষ্য | পেটুক (বিশেষণ) |
| রাগ | বিশেষ্য | রাগী (বিশেষণ) |
| সব্বোনেশে | বিশেষণ | সর্বনাশ (বিশেষ্য) |
| ভদ্র | বিশেষণ | ভদ্রতা (বিশেষ্য) |
| এক | বিশেষণ | একতা (বিশেষ্য) |
৮. নিম্নরেখ পদগুলির বিভক্তি অংশ আলাদা করে দেখাও:
| বাক্য | বিভক্তি নির্ণয় |
| ৮.১ ভদ্র বাঘে হেথায় বাঁধে ডেরা। | বাঘে = বাঘ + এ বিভক্তি |
| ৮.২ পাখির সঙ্গে পেরে উঠবে নাকি? | পাখির = পাখি + র বিভক্তি |
| ৮.৩ ছোট্ট বাঘের মস্ত হলুদ বাবা। | বাঘের = বাঘ + এর বিভক্তি |
৯. নীচের বাক্যগুলির উদ্দেশ্য ও বিধেয় অংশ ভাগ করে দেখাও:
| বাক্য | উদ্দেশ্য (Subject) | বিধেয় (Predicate) |
| ৯.১ তার মনে মনে জমছে কেবল রাগ। | রাগ (বা কেবল রাগ) | তার মনে মনে জমছে। |
| ৯.২ বাঘছানা কি ধরতে পারে পাখি? | বাঘছানা | কি ধরতে পারে পাখি? |
| ৯.৩ লালঠেঙো সব কাঁকড়া বেড়ায় হেঁটে। | লালঠেঙো সব কাঁকড়া | বেড়ায় হেঁটে। |
১০. নিজের ভাষায় উত্তর দাও (রচনাধর্মী)
১০.১ কবিতাটিতে দেখলাম কাঁকড়ার দাঁড়া থাকে, তোমার দেখা আর যে প্রাণীর দাঁড়া আছে তার সম্পর্কে দু-একটি বাক্য লেখো।
উত্তর: আমার দেখা দাঁড়া যুক্ত আর একটি প্রাণী হলো চিংড়ি (গলদা চিংড়ি) এবং কাঁকড়াবিছে। চিংড়ি হলো একপ্রকার জলের পোকা, এদের সামনের দিকে দুটি বড়ো দাঁড়া থাকে, যা দিয়ে এরা খাবার ধরে খায় এবং আত্মরক্ষা করে। অন্যদিকে কাঁকড়াবিছে হলো ডাঙার প্রাণী, এদেরও দুটি দাঁড়া এবং লেজের দিকে একটি বিষাক্ত হুল থাকে।
১০.২ ছোট্ট বাঘ ও তার বাবা মা পাখিরালয়ে খাবারের অভাব থাকায় সজনেখালি চলে গিয়েছিল। সারা পৃথিবীতেই আজ মানুষ বন কেটে ফেলায়, নির্বিচারে প্রাণীদের মেরে ফেলায় শুধু বাঘ নয় সমস্ত প্রাণীদেরই খাবারের অভাব তৈরি হচ্ছে। কীভাবে এগুলো বন্ধ করে সমস্ত প্রাণীদের ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, এ সম্পর্কে তোমার মতামত জানিয়ে একটি অনুচ্ছেদ লেখো।
উত্তর: বন্যপ্রাণী ও অরণ্য সংরক্ষণ:
বর্তমানে মানুষের অতিরিক্ত লোভ এবং বাসস্থানের অভাব মেটাতে প্রতিনিয়ত জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে। বনভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে বাঘ, সিংহ, হাতি থেকে শুরু করে সমস্ত বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক বাসস্থান ও খাদ্যের চরম অভাব দেখা দিচ্ছে। এই ধ্বংসলীলা বন্ধ করতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম অকারণে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে নতুন গাছ লাগাতে হবে। চোরাশিকারিদের হাত থেকে পশুদের বাঁচাতে সরকারকে আরও কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। বন্যপ্রাণীদের জন্য সংরক্ষিত অভয়ারণ্যগুলির আয়তন বাড়াতে হবে এবং সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সর্বোপরি, পশুদের প্রতি ভালোবাসার বার্তা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। বন এবং বন্যপ্রাণী বেঁচে থাকলেই আমাদের এই পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় থাকবে।
কবিতার শিক্ষা
"বাঘ" কবিতাটির মাধ্যমে কবি মজা করে বুঝিয়েছেন যে, প্রতিটি প্রাণীরই নির্দিষ্ট বাসস্থানের প্রয়োজন রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গেলে বাঘের যেমন শিকারের জঙ্গল প্রয়োজন, তেমনি পাখিদেরও নিরাপদ আশ্রয় দরকার। অরণ্য ধ্বংস হলে বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীরা কীভাবে অসহায় হয়ে পড়ে, পরোক্ষভাবে এই কবিতায় সেই গভীর সত্যটিও ফুটে উঠেছে।