গল্পের পরিচিতি ও সারমর্ম
লেখক: শিবশঙ্কর মিত্র
জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে ধনাই যখন বন্ধুদের থেকে একটু এগিয়ে একটি খাদের (শিষে) কাছে এসে পড়ে, তখন হঠাৎ তার সামনে এক বিশাল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এসে উপস্থিত হয়। বাঘটি ধনাইকে লক্ষ করে ঝাঁপ দেয়, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বাঘটি সোজা গিয়ে পড়ে একটি তবলা গাছের গায়ে এবং ধপাস করে উলটে শিষের ভিতর গিয়ে পড়ে। সেই প্রবল ধাক্কায় ধনাইয়ের মাথার মধুর কলসটি ভেঙে যায় এবং সমস্ত মধু বাঘের মুখে ও চোখে ছিটকে পড়ে। মধু চোখে পড়ায় বাঘটি সাময়িকভাবে কাবু হয়ে যায় এবং এভাবেই ধনাই মৃত্যুর মুখ থেকে এক অদ্ভুত উপায়ে রক্ষা পায়।
শব্দার্থ (Word Meanings)
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| এক পা | সবসময় তৈরি থাকা |
| নাস্তা | জলখাবার |
| চট | পাটের সুতো থেকে তৈরি মোটা কাপড় |
| ধামা | শস্য রাখা বা মাপার জন্য তৈরি বেতের ঝুড়ি |
| গোঁয়ার | জেদি বা একগুঁয়ে |
| স্ফুর্তি | আনন্দ |
| ডিঙি | ছোটো হালকা নৌকা |
| পন্থা | উপায় |
| একত্রে | একসঙ্গে |
| শুলো | শ্বাসমূল |
| তীক্ষ্ণ | খুব ধারালো |
| সাঁকো | সেতু |
| হতভম্ব | বুদ্ধি ঘুলিয়ে গেছে এমন / হতবাক |
| দুর্দান্ত | ভয়ংকর |
হাতে কলমে - প্রশ্ন ও উত্তর (Textbook Exercises)
১. জেনে নিয়ে করো :
উত্তর: সুন্দরবনের যে অংশ পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে, তা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় অবস্থিত।
১.২ সুন্দরবন অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে যে যে নদী বয়ে গেছে, তাদের নামগুলি লেখো।
উত্তর: সুন্দরবন অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলি হলো— মাতলা, বিদ্যাধরী, কালিন্দী, রায়মঙ্গল, গোসাবা, ইছামতী ইত্যাদি।
১.৩ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ অঞ্চলটি কোন সমুদ্র-উপকূলে অবস্থিত তা মানচিত্র থেকে খুঁজে বের করো।
উত্তর: পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ অঞ্চলটি (সুন্দরবন) বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত।
১.৪ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের বৈশিষ্ট্য শিক্ষকের থেকে জেনে নিয়ে লেখো।
উত্তর: ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগুলি হলো—
১) এই অঞ্চলের গাছপালা লবণাক্ত ও কর্দমাক্ত মাটিতে জন্মায়।
২) নরম মাটিতে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য গাছগুলির ঠেসমূল থাকে।
৩) কাদামাটিতে শ্বাস নেওয়ার জন্য মাটির ওপরের দিকে এই গাছগুলির শ্বাসমূল (শুলো) দেখা যায়।
২. গল্প থেকে তথ্য নিয়ে বাক্যগুলি পূর্ণ করো :
৩. এদের মধ্যে যে যে কাজটা করত :
আরজান : মশাল জ্বেলে ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়াত।
কফিল : বড়ো ধামা হাতে চাকের নীচে দাঁড়াত।
৪. অর্থ লেখো :
গোঁয়ার্তুমি: একগুঁয়েমি বা জেদ।
চট: পাটের তৈরি মোটা কাপড় বা বস্তা।
হাজির: উপস্থিত।
ঝিরঝিরে: মৃদু বা হালকা।
৫. বাক্য রচনা করো :
মৌচাক: আমাদের বাগানের আম গাছে একটা বড়ো মৌচাক হয়েছে।
রং: আকাশের রামধনুতে সাতটি রং থাকে।
স্ফুর্তি: ছুটির দিনে বন্ধুরা মিলে মাঠে খুব স্ফুর্তি হয়।
কলস: ধনাইয়ের মাথায় একটা মধুর কলস ছিল।
৬. কোনটি কোন ধরনের শব্দ তা শব্দঝুড়ি থেকে বেছে নিয়ে লেখো :
(শব্দঝুড়ি: এক, কাটে, আর, ভুল, পথ, বিশ্বাস, গোঁয়ার, বোঝাই, গভীর, সকল, ডাঙা, সরু, তাড়ায়, তার, চিৎকার, মারল, সে, ওদের, ছোটো, কিন্তু, ও, বেজায়, শক্তি, নিয়েছে।)
৭. নিম্নলিখিত শব্দগুলির বিপরীতার্থক শব্দ লেখো :
ভর্তি ➔ খালি
তীক্ষ্ণ ➔ ভোঁতা
দীর্ঘ ➔ হ্রস্ব বা ছোটো
বোঝাই ➔ খালি বা উন্মুক্ত
৮. সমার্থক শব্দ লেখো :
বাঘ: ব্যাঘ্র, শার্দূল।
ফুল: পুষ্প, কুসুম।
বন: অরণ্য, জঙ্গল, কানন।
মাটি: মৃত্তিকা, ভূমি।
৯. নীচের ঝুড়িতে বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর নাম দেওয়া রয়েছে। আমাদের সুন্দরবনে এদের মধ্যে কার কার দেখা মেলে :
(ঝুড়ির নাম: কুমির, গন্ডার, সিংহ, জিরাফ, ভল্লুক, হরিণ, জেব্রা, ক্যাঙারু, জলহস্তী, লালপান্ডা, হাতি, কচ্ছপ, বুনোমহিষ, শিয়াল, কাঁকড়া, বাঁদর, সাপ, শজারু, শূকর, হায়না, ওরাংওটাং, গোরিলা, রয়াল বেঙ্গল টাইগার।)
উত্তর (সুন্দরবনে যাদের দেখা মেলে):কুমির, হরিণ, কচ্ছপ, শিয়াল, কাঁকড়া, বাঁদর, সাপ, শজারু, বুনো শূকর, রয়াল বেঙ্গল টাইগার।
১০.১ পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল কোথায় রয়েছে?
১০.২ সুন্দরবনের খ্যাতি ও সমাদরের দুটি কারণ লেখো।
১) এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং বিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার-এর প্রাকৃতিক বাসভূমি।
২) এখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং নদী-খাঁড়ি ও মোহনার বিশাল জীববৈচিত্র্য।
১০.৩ কোন কোন গাছে সাধারণত মৌচাক দেখা যায়?
১১. 'ক' স্তম্ভের সঙ্গে 'খ' স্তম্ভ মিলিয়ে লেখো :
| ক | খ (উত্তর) |
|---|---|
| মধু | মৌচাক |
| নাস্তা | জলখাবার |
| কাস্তে | কাটারি |
| ডিঙি | ছোটো নৌকা |
| শিষে | ছোটো সরু খাদ |
| সাঁকো | সেতু |
১২. গল্পের ঘটনাগুলি ক্রমানুসারে সাজিয়ে লেখো :
(১২.১ মনের আনন্দে একটার পর একটা মধুর চাক কেটে চলেছে। ১২.২ আরজান এক থাবা কাদা তুলে গোল করে পাকিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মারল চাক লক্ষ করে। ১২.৩ পেটপুরে নাস্তা খেয়ে বনে মধু কাটার জন্য তৈরি হল। ১২.৪ কয়েকটা মৌমাছি ওদের দিকে তাড়া করল। ১২.৫ ডিঙি করে অনেক দূর বনের ভিতর গিয়ে তিনজনে ডাঙায় উঠেছে।)
সঠিক ক্রমানুসার:১. (১২.৩) পেটপুরে নাস্তা খেয়ে বনে মধু কাটার জন্য তৈরি হল।
২. (১২.৫) ডিঙি করে অনেক দূর বনের ভিতর গিয়ে তিনজনে ডাঙায় উঠেছে।
৩. (১২.১) মনের আনন্দে একটার পর একটা মধুর চাক কেটে চলেছে।
৪. (১২.২) আরজান এক থাবা কাদা তুলে গোল করে পাকিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মারল চাক লক্ষ করে।
৫. (১২.৪) কয়েকটা মৌমাছি ওদের দিকে তাড়া করল।
১৩. শিবশঙ্কর মিত্র (১৯০৯-১৯৯২) সম্পর্কিত প্রশ্ন:
উত্তর: শিবশঙ্কর মিত্রের লেখালেখির প্রিয় বিষয় হলো 'সুন্দরবন'।
১৩.২ কোন বইয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ শিশু সাহিত্যের পুরস্কার পান?
উত্তর: তিনি 'সুন্দরবন' বইটির জন্য ১৯৬২ সালে শ্রেষ্ঠ শিশুসাহিত্যের পুরস্কার পান।
১৩.৩ সুন্দরবনকে নিয়ে লেখা তাঁর দুটি বইয়ের নাম লেখো।
উত্তর: সুন্দরবনকে নিয়ে লেখা তাঁর দুটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হলো 'সুন্দরবনের আরজান সর্দার' এবং 'রয়াল বেঙ্গলের আত্মকথা'।
১৪. নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর নিজের ভাষায় লেখো :
উত্তর: ১) বসন্তকালে সুন্দরবনের নানা গাছে ছোটো ছোটো ফুল ফোটে, যেমন গরান গাছে হলুদ রঙের ফুল দেখা যায়।
২) সকাল থেকে জঙ্গলে ফুলের সুগন্ধে ভরে ওঠে।
৩) হলুদ রং আর ফুলের সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে মৌমাছিরা গুনগুন শব্দ করে চারদিকে উড়ে বেড়ায়।
৪) ঝিরঝিরে বসন্তের হাওয়া বইতে থাকে যা সকলের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
৫) সুন্দরবনের এই মায়াবী রূপ দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতি নতুন সাজে সেজে উঠেছে।
১৪.২ যদি তুমি কখনও সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে যাও, তবে কাকে কাকে সঙ্গে নেবে? জিনিসপত্রই বা কী কী নিয়ে যাবে?
উত্তর: আমি যদি সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে যাই, তবে আমি সঙ্গে অভিজ্ঞ স্থানীয় মৌলিদের এবং দুজন সাহসী বন্ধুকে সঙ্গে নেব।
জিনিসপত্র হিসেবে আমি নেব— বড়ো চটের বস্তা, কাস্তে, ধামা, মশাল জ্বালানোর জন্য শুকনো ডাল ও আগুন, মধু রাখার ক্যানিস্তার, শক্ত লাঠি এবং দরকারি ওষুধপত্র।
১৪.৩ 'বাংলার বাঘ' নামে কে পরিচিত?
উত্তর: স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় 'বাংলার বাঘ' নামে পরিচিত।
১৪.৪ 'বাঘাযতীন' নামে কে পরিচিত?
উত্তর: বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় 'বাঘাযতীন' নামে পরিচিত।
১৪.৫ 'সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ'। —এই বিষয়ে পাঁচটি বাক্য লেখো।
উত্তর: ১) সুন্দরবন হলো রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বাসভূমি, তাই যেকোনো মুহূর্তে বাঘের আক্রমণের ভয় থাকে।
২) জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় শ্বাসমূলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার বিপদ থাকে।
৩) মধু পাড়তে গিয়ে মৌমাছির কামড় খাওয়ার ভয় সবসময় থাকে।
৪) খাঁড়ি বা নদী পার হওয়ার সময় জলে কুমির বা হাঙরের আক্রমণের ঝুঁকি প্রবল।
৫) গভীর জঙ্গলে রাস্তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও মধু সংগ্রহকারীদের জন্য একটি বড়ো ঝুঁকি।
১৪.৬ ধনাই কীসের মন্ত্র জানে?
উত্তর: ধনাই মৌমাছিকে ভুল পথে চালিত করার মন্ত্র জানে।
১৪.৭ গরান গাছের ফুল দেখতে কেমন?
উত্তর: গরান গাছের ফুল ছোটো ছোটো এবং হলুদ রঙের হয়।
১৪.৮ ডিঙি করে মধু সংগ্রহ করতে কে কে গিয়েছিল?
উত্তর: ডিঙি করে মধু সংগ্রহ করতে গিয়েছিল ধনাই, আরজান এবং কফিল।
১৪.৯ টীকা লেখো — 'ট্যাক্', 'শিষে'।
উত্তর:
ট্যাক্: দুটো ছোটো নদী একসঙ্গে মিশবার ফলে যে একটি ত্রিভুজ খণ্ড তৈরি হয়, সেই ধরনের ত্রিভুজ আকারের জমির মাথাকে 'ট্যাক্' বলা হয়।
শিষে: সুন্দরবনের জঙ্গলে থাকা সরু ও গভীর জলের খাত বা ছোটো সরু খাদকে 'শিষে' বলে।
১৪.১০ মধুর চাক খুঁজে পাওয়ার পন্থাটি কী?
উত্তর: মধুর চাক খুঁজে পাওয়ার পন্থাটি হলো— মৌমাছি ফুল থেকে মধু নিয়ে কোন দিকে ছুটে চলেছে তা লক্ষ করা এবং তার পিছু পিছু সেদিকে যাওয়া।
১৪.১১ কফিল ও আরজানকে পিছনে ফিরে ডাকার সময় ধনাই কী দেখেছিল?
উত্তর: কফিল ও আরজানকে পিছনে ফিরে ডাকার জন্য ধনাই তাকানো মাত্রই দেখেছিল যে, বিকট হুঙ্কার দিয়ে একটি বিশাল বাঘ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য শূন্যে লাফ দিয়েছে।
১৪.১২ বাঘটা শিষের ভিতর পড়ে গেল কীভাবে?
উত্তর: বাঘটা ধনাইকে লক্ষ করে ঝাঁপ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ধনাই সেই মুহূর্তে একটি শিষে বা খাদ পার হতে যাচ্ছিল। ফলে বাঘটা ধনাইকে ডিঙিয়ে সোজা গিয়ে পড়ে শিষের ওপরের একটি তবলা গাছের গায়ে। সেই প্রবল ধাক্কা খেয়ে বাঘটা উলটে ধপাস করে শিষের ভিতর পড়ে যায়।
১৪.১৩ ধনাই কীভাবে বাঘের হাত থেকে বেঁচে গেল?
উত্তর: বাঘটা ধনাইকে লক্ষ করে ঝাঁপ দিলেও ধনাইয়ের বদলে সোজা গিয়ে ধাক্কা খায় একটি তবলা গাছে। সেই গাছটায় ধনাই ধরেছিল। ধাক্কার ফলে ধনাইয়ের মাথা থেকে মধুর কলসটি ভেঙে সোজা বাঘের মাথার উপর গিয়ে পড়ে। কলস ভেঙে সারা মুখে মধু ছিটকে পড়ায় বাঘটি চোখ-মুখ কুঁচকে বেজায় ফোঁৎ ফোঁৎ করতে থাকে। বাঘটি সাময়িকভাবে দৃষ্টিহীন ও কাবু হয়ে পড়ায় ধনাই প্রাণে বেঁচে যায়।