✉️ টিকিটের অ্যালবাম
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
প্রধান চরিত্র
রাজাপ্পা ও নাগরাজন
মূল বিষয়
ডাকটিকিটের অ্যালবাম সংগ্রহ
বিদেশি অ্যালবাম
সিঙ্গাপুর থেকে আসা
পরিণতি
ঈর্ষায় অ্যালবাম পুড়িয়ে ফেলা
গল্পের সারাংশ
সুন্দর রামস্বামী রচিত 'টিকিটের অ্যালবাম' গল্পটি স্কুলপড়ুয়া ছেলেদের শখ, ঈর্ষা এবং আত্মগ্লানির এক সুন্দর মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। স্কুলের ছেলে রাজাপ্পা অনেক কষ্ট করে, রোদে পুড়ে বিভিন্ন দেশের ডাকটিকিট সংগ্রহ করে একটি বড়ো অ্যালবাম তৈরি করেছিল। স্কুলে তার অ্যালবামের খুব কদর ছিল। কিন্তু হঠাৎ তার সহপাঠী নাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে একটি সুন্দর অ্যালবামে প্রচুর বিদেশি টিকিট পাঠিয়ে দেন। নাগরাজনের এই নতুন অ্যালবামের আকর্ষণে স্কুলের সব ছেলেমেয়ে রাজাপ্পার পুরোনো অ্যালবামটি ভুলে যায়।
এই অবহেলা রাজাপ্পার মনে গভীর ঈর্ষার জন্ম দেয়। সে মনে মনে জ্বলতে থাকে এবং এক সন্ধ্যায় সুযোগ বুঝে নাগরাজনের বাড়িতে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে সেই নতুন অ্যালবামটি চুরি করে আনে। কিন্তু চুরির পর থেকে রাজাপ্পার মনে প্রবল ভয় ও অনুশোচনা শুরু হয়। নাগরাজন যখন কাঁদতে কাঁদতে জানায় যে তার অ্যালবাম হারিয়ে গেছে এবং তার বাবা পুলিশে খবর দেবেন, তখন পুলিশের ভয়ে রাজাপ্পা স্নানঘরের উনুনে সেই অমূল্য অ্যালবামটি পুড়িয়ে ফেলে। কিন্তু তার আত্মগ্লানি যায় না। অবশেষে সে নিজের তিল তিল করে জমানো সাধের অ্যালবামটি কাঁদতে কাঁদতে নাগরাজনকে দিয়ে দেয়। নিজের ভুল এবং ঈর্ষার প্রায়শ্চিত্ত সে এভাবেই করে।
১. হাতে কলমে (কবি পরিচিতি)
সুন্দর রামস্বামী তামিল ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক।
তিনি পাসুবিয়া ছদ্মনামে লিখতেন।
২. একটি বাক্যে উত্তর দাও
৭ টি'টিকিটের অ্যালবাম' গল্পের লেখক হলেন সুন্দর রামস্বামী।
মূল গল্পটি তামিল ভাষায় রচিত।
গল্পটিতে মূলত চারটি চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়— রাজাপ্পা, নাগরাজন, আপ্পু এবং কামাক্ষী (নাগরাজনের বোন)।
মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে ডানপিটে মেয়ে পার্বতী নাগরাজনের কাছ থেকে মেয়েদের দেখার জন্য অ্যালবামটি চেয়ে নিয়ে যেত।
মৌমাছিরা যেমন ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ করে, রাজাপ্পাও তেমনি শনি-রবিবার ভোরে বেরিয়ে, মাইলের পর মাইল হেঁটে, নিজের টিফিনের সময় নষ্ট করে, অন্য ছেলেদের সঙ্গে বিনিময় করে অনেক কষ্টে টিকিট সংগ্রহ করত।
নাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে অ্যালবামটি উপহার পাঠিয়েছিলেন।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল, "এই অ্যালবামটা চুরি করতে চেষ্টা করছ যে নির্লজ্জ হতভাগা, তাকে বলছি... যতদিন ঘাসের রং সবুজ আর পদ্মফুল লাল, সূর্য পূর্বে উঠবে আর পশ্চিমে অস্ত যাবে একমাত্র আমারই থাকবে।"
৩. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও
৩ টিনাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে যে অ্যালবামটি পাঠিয়েছিলেন, সেটি ছিল অপরূপ সুন্দর এবং অদ্বিতীয়। স্থানীয় কোনো দোকানে ওরকম সুন্দর অ্যালবাম পাওয়া যেত না। তাছাড়া অ্যালবামটির প্রথম পাতায় খুব সুন্দর একটি সতর্কবাণী লেখা ছিল যা ছেলেদের খুব আকর্ষণ করেছিল। এই নতুনত্ব এবং সৌন্দর্যের জন্যই স্কুলের সকলে এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল।
বক্তা: বক্তা হলো রাজাপ্পার সহপাঠী কৃষ্ণান।
কাকে বলেছে: সে এই কথাটি রাজাপ্পাকে বলেছে।
যুক্তি: হ্যাঁ, এই কথার মধ্যে যুক্তি আছে। রাজাপ্পার নিজের অ্যালবামটি আগে খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু নাগরাজনের নতুন অ্যালবাম আসায় সবাই যখন রাজাপ্পাকে পাত্তা দেওয়া বন্ধ করল, তখন রাজাপ্পা রাগে ছেলেদের 'নকল-নবীশ' বলে গালি দিয়েছিল। রাজাপ্পা আসলে নাগরাজনের অ্যালবামের প্রতি হিংসে থেকেই এসব বলছিল, তাই কৃষ্ণান তাকে 'হিংসুটে পোকা' বলে ঠিকই বলেছিল।
উপলব্ধি: এই উপলব্ধিটি হলো রাজাপ্পার।
তর্কের প্রসঙ্গ: রাজাপ্পার অ্যালবামের চেয়ে নাগরাজনের অ্যালবাম ভালো কি না, এবং রাজাপ্পার অ্যালবামের টিকিটগুলি বেশি দামি কি না, সেই বিষয়ে ছেলেদের সঙ্গে তর্কের প্রসঙ্গ এসেছে।
কারণ: রাজাপ্পা বুঝতে পেরেছিল যে, ছেলেরা এখন নাগরাজনের নতুন, চকচকে সিঙ্গাপুরের অ্যালবামের মোহে অন্ধ হয়ে আছে। টিকিট সংগ্রহের আসল কষ্ট বা টিকিটের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। তাই এই অজ্ঞ ছেলেদের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা।
৪. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো
১০ টিকার মনে হয়েছে: টিকিট সংগ্রাহক ছাত্র রাজাপ্পার এমন মনে হয়েছে।
কারণ: রাজাপ্পা অনেক কষ্ট করে টিকিট সংগ্রহ করে একটি দারুণ অ্যালবাম তৈরি করেছিল, যার জন্য স্কুলে সে খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু হঠাৎ তার সহপাঠী নাগরাজনের কাকা সিঙ্গাপুর থেকে একটি অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয় অ্যালবাম পাঠিয়ে দেন। নাগরাজনের সেই নতুন বিদেশি অ্যালবামের মোহে স্কুলের সব ছেলেমেয়ে মেতে ওঠে। তারা সারাক্ষণ নাগরাজনের চারপাশে ভিড় করতে থাকে এবং রাজাপ্পার পুরোনো অ্যালবামের কথা ভুলে যায়। এই কারণেই রাজাপ্পার মনে হয়েছিল যে তার জনপ্রিয়তা কমে গেছে।
স্কুলের ছেলেমেয়েরা সাধারণত নতুন ও আকর্ষণীয় জিনিসের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়। রাজাপ্পার অ্যালবামটি কষ্ট করে তৈরি হলেও সেটি ছিল পুরোনো। অন্যদিকে, নাগরাজনের অ্যালবামটি ছিল সিঙ্গাপুর থেকে আসা, দেখতে অপরূপ সুন্দর, এবং তার প্রথম পাতায় লেখা সতর্কবাণীটি ছিল খুব আকর্ষণীয়। এই নতুন ও বিদেশি জিনিসের চাকচিক্য ছেলেদের মন কেড়ে নিয়েছিল। তারা আসল টিকিটের মূল্যের চেয়ে অ্যালবামের বাইরের সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। তাই নতুন জিনিসের মোহে পড়েই তারা রাজাপ্পাকে এবং তার অ্যালবামকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করতে শুরু করেছিল।
নাগরাজন খুব ধৈর্যশীল ও শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। সে একটুও বিরক্ত না হয়ে সবাইকে অ্যালবামটি দেখতে দিত। তবে সে একটি শর্ত রেখেছিল— কেউ অ্যালবামটি হাতে ধরতে পারবে না। সে নিজের কোলে অ্যালবামটি রেখে নিজেই পাতা উল্টে উল্টে সবাইকে দেখাত, আর ছেলেরা প্রাণভরে দেখত। মেয়েদের দেখার জন্য সে অ্যালবামে একটি মলাট লাগিয়ে তাদের প্রতিনিধি পার্বতীর হাতে দিত এবং সন্ধ্যায় সেটি ফেরত নিত।
গল্পে রাজাপ্পাকে টিকিট সংগ্রহের নেশায় একজন একনিষ্ঠ সাধক হিসেবে দেখানো হয়েছে। লেখক বলেছেন, মৌমাছিরা যেমন বিন্দু বিন্দু করে মধু সংগ্রহ করে, রাজাপ্পাও তেমনি টিকিট জোগাড় করত। এটাই যেন ছিল তার জীবন। সে ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়ত অন্য সংগ্রাহকদের সঙ্গে টিকিট বিনিময় করতে। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে, বইখাতা এক কোণে ফেলে, হাফপ্যান্টের পকেটে কিছু জলখাবার গুঁজে, এক কাপ কফি গিলে চার মাইল দূরে ছুটে যেত শুধু একটা কানাডার টিকিট জোগাড় করার জন্য। তার এই অক্লান্ত পরিশ্রমই প্রমাণ করে যে ডাকটিকিট সংগ্রহের প্রতি তার আকর্ষণ কতটা তীব্র ছিল।
রাজাপ্পা অহংকার করে নাগরাজনের অ্যালবামটি সরাসরি দেখত না, কিন্তু চোরাদৃষ্টিতে তাকিয়ে সেও বুঝেছিল যে অ্যালবামটি অপরূপ সুন্দর। সেটির বিশেষত্ব হলো— এটি একেবারে অদ্বিতীয়, কোনো স্থানীয় দোকানে এমন অ্যালবাম পাওয়া যায় না। যদিও রাজাপ্পার অ্যালবামের মতো এতে খুব বেশি বা দুর্লভ টিকিট ছিল না, কিন্তু এর বাইরের আকার, গঠন এবং সিঙ্গাপুরের ছাপ এটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। এছাড়া এর প্রথম পাতায় লেখা সতর্কবাণীটিও ছিল এর এক অনন্য বিশেষত্ব।
রাজাপ্পা অনেক পরিশ্রমে তার অ্যালবামটি তৈরি করেছিল এবং সেটার জন্য সে অহংকার বোধ করত। কিন্তু নাগরাজন কোনো কষ্ট না করেই কাকার পাঠানো অ্যালবামের জোরে স্কুলে 'মহামান্য' ব্যক্তি হয়ে ওঠে। ছেলের দল রাজাপ্পাকে পাত্তাই দিত না, উল্টে তার অ্যালবামকে 'ডাস্টবিনে রাখার যোগ্য' বলে ঠাট্টা করত। নিজের পরিশ্রমের এই অবমূল্যায়ন এবং নাগরাজনের বিনা পরিশ্রমে পাওয়া এই অযাচিত খ্যাতি রাজাপ্পা মেনে নিতে পারেনি। নিজের অ্যালবামের প্রতি সকলের এই অবহেলা তাকে ভেতর ভেতর পুড়িয়ে মারছিল এবং সে ক্রমশ নাগরাজনের প্রতি তীব্র ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিল।
উদ্দেশ্য: রাজাপ্পা নাগরাজনের বাড়ি গিয়েছিল তাকে ঠকিয়ে কিছু ভালো টিকিট হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। সে ভেবেছিল নাগরাজন টিকিট সংগ্রহে অনভিজ্ঞ, তাই তাকে কিছু কম দামি টিকিট দিয়ে তার অ্যালবামের দামি টিকিটগুলো সহজেই সরিয়ে নেওয়া যাবে।
চরিত্রের দিক: এর মধ্য দিয়ে রাজাপ্পার চরিত্রের একটি ঈর্ষাপরায়ণ এবং কিছুটা প্রতারণামূলক দিক ধরা পড়ে। টিকিট সংগ্রহের জগতে এরকম চালাকি সে আগেও করেছে। কিন্তু আসলে এটি ছিল তার অবদমিত রাগ এবং নিজের হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারের একটি মরিয়া ও অস্বাস্থ্যকর চেষ্টা।
নাগরাজনের বাড়ি থেকে অ্যালবাম চুরি করার পর রাজাপ্পা প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিল। পরদিন সকালে আপ্পু যখন জানায় যে নাগরাজনের বাবা পুলিশ সুপারের অফিসে কাজ করেন এবং তিনি পুলিশ ডাকতে পারেন, তখন রাজাপ্পা প্রবল আতঙ্কে ভুগতে থাকে। এরপর দরজায় টোকা পড়ার শব্দ শুনে সে ভাবে যে পুলিশ এসেছে। ভয়ে দিশেহারা হয়ে সে স্নানঘরে ঢুকে জল গরম করার জ্বলন্ত উনুনের মধ্যে অমূল্য অ্যালবামটি ফেলে দেয়। চোখের সামনে সেই দুর্লভ ও অপরূপ টিকিটগুলোকে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে দেখে অনুশোচনা ও কষ্টে রাজাপ্পার চোখ জলে ভরে ওঠে।
নাগরাজন তার হারানো অ্যালবামের শোকে যখন রাজাপ্পার সামনে বসে কাঁদছিল, তখন রাজাপ্পা নিজের সাধের অ্যালবামটি এনে নাগরাজনের হাতে তুলে দেয় এবং বলে যে আজ থেকে এটি তার। নাগরাজন জানত যে রাজাপ্পা তার অ্যালবামটিকে কতটা ভালোবাসে এবং নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি যত্ন করে। সেই রাজাপ্পা স্বেচ্ছায় তার নিজের অমূল্য অ্যালবামটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাকে দিয়ে দিচ্ছে— এই অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য ঘটনাটি দেখেই নাগরাজন হতবুদ্ধি বা অবাক হয়ে গিয়েছিল।
উদ্ধৃতিটি সম্পূর্ণ যথার্থ। গল্পে রাজাপ্পা ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে নাগরাজনের অ্যালবাম চুরি করেছিল। কিন্তু চুরির পর থেকেই তার মনে শান্তি ছিল না। ভয়ে ও অপরাধবোধে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, রাতে ঘুম হয় না। পুলিশের ভয়ে যখন সে উনুনে অ্যালবামটি পুড়িয়ে ফেলে, তখন তার বিবেক দংশন চরমে পৌঁছায়।
এরপর যখন নাগরাজন তার সামনে বসে কাঁদতে থাকে, তখন রাজাপ্পা নিজের ভুল পুরোপুরি বুঝতে পারে। সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে সে তার নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, বহু কষ্টে তিল তিল করে জমানো টিকিটের অ্যালবামটি, নাগরাজনের হাতে তুলে দেয়। নিজের ভালোবাসার জিনিস বিসর্জন দিয়ে সে বন্ধুর চোখের জল মোছায়। পরে সে একা ঘরে দরজা বন্ধ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে। এই চোখের জল আসলে তার পাপের স্খালন। এভাবেই অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হয়ে তার ভেতরের গ্লানি দূর হয় এবং তার চরিত্রের আত্মশুদ্ধি ঘটে।