💨 হাওয়ার গান
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • পঞ্চম পাঠ
১. কবি পরিচিতি বিষয়ক প্রশ্ন
বুদ্ধদেব বসু রচিত দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম হলো— 'বন্দীর বন্দনা' এবং 'কঙ্কাবতী' (বা 'দ্রৌপদীর শাড়ি')।
তিনি বিখ্যাত 'কবিতা' পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।
২. একটি/দুটি বাক্যে উত্তর দাও
৫ টিদুর্বার ইচ্ছায় হাওয়া পৃথিবীর সব জল এবং সব তীর ছুঁয়ে গেছে।
হাওয়া তার হারানো আশ্রয়ের কথা চিমনির নিস্বনে (শব্দে) এবং কাননের ক্রন্দনে শুধায় (জিজ্ঞাসা করে)।
আঁধারে বা রাতের অন্ধকারে দিক নির্ণয় করতে এবং অন্য জাহাজের সাথে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য জাহাজের মাস্তুলে দীপ বা আলো জ্বলে।
পার্কের বেঞ্চিতে ঝরা পাতার (শুকনো পাতার) এবং জানালার শার্সিতে কেঁপে-ওঠা দেয়ালের পঞ্জরের (ভিতরকার কাঠামোর) উপস্থিতির চিহ্ন রয়েছে।
হাওয়ার নিশ্বাস উত্তাল এবং অস্থির হয়ে বয়ে গেছে।
৩. সংক্ষেপে উত্তর লেখো
৩ টিহাওয়ার চোখে ঘরের যে নিশ্চিন্ত ও আরামদায়ক ছবি ধরা পড়ে, তা হলো— একটি মিষ্টি শান্ত ছেলে দোলনায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ঘরের মেঝেতে পাতা আবছায়া কার্পেটের ওপর একটি পোষা কুকুর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। আর ঘরের ভেতরে স্বপ্নের মৃদু মোমবাতি জ্বলছে। সব মিলিয়ে ঘরটি এক পরম শান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক।
রাতের অন্ধকারে অকূল সমুদ্রের ওপর দিয়ে যখন জাহাজ চলে, তখন তার মাস্তুলে দিক-নির্ণয়কারী দীপ জ্বলে। জাহাজের ভেতরে যাত্রীরা কেউ সিনেমা দেখে, কেউ নাচে, আবার কেউ গান গায়। হাওয়ারা সেই তরঙ্গের বুকে ক্রমাগত আছড়ে পড়ে তাদের আশ্রয়ের খোঁজ করে। অবশেষে একসময় জাহাজের ডেক নির্জন হয়ে যায় এবং সমুদ্রের গর্জন ফেটে পড়ে।
হাওয়া আশ্রয়ের খোঁজে পৃথিবীর সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। তারা পৃথিবীর সব জল, সব তীর, পাহাড়ের গম্ভীর বন্দর, নগরের ঘন ভিড়, গহীন অরণ্য এবং জনহীন শূন্য তেপান্তরের মাঠে ঘুরে বেড়ায়। পার্কের বেঞ্চিতে, বাড়ির জানালার শার্সিতে, চিমনির কাছে, সমুদ্রের তরঙ্গের বুকে—সর্বত্রই হাওয়া হাহাকার করে ফেরে।
৪. বিশদে উত্তর লেখো
৩ টিকী নেই: হাওয়াদের নিজস্ব কোনো বাড়ি বা স্থায়ী আশ্রয় নেই।
কীভাবে খোঁজ করে: হাওয়ারা তাদের সেই হারানো বাড়ির খোঁজে সারা পৃথিবী জুড়ে কেঁদে মরে। তারা পৃথিবীর সমস্ত জল-স্থল, পাহাড়, বন্দর, অরণ্য, নগর এবং তেপান্তরের মাঠে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। পার্কের বেঞ্চিতে পাতা উড়িয়ে, জানালার শার্সিতে ধাক্কা দিয়ে, চিমনির ফাঁক দিয়ে ঢুকে তারা শুধু একটিই প্রশ্ন করে— "সে কোথায়?" মানুষের শান্ত গৃহকোণ বা জাহাজের আলোকময় ডেক দেখে তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কিন্তু কোথাও নিজেদের জন্য এতটুকু বিশ্রাম বা আশ্রয় খুঁজে পায় না। তাদের এই সন্ধান অন্তহীন।
কে উত্তাল: এখানে হাওয়া বা বাতাস চিরকাল উত্তাল।
কেন উত্তাল: হাওয়ার নিজস্ব কোনো বাড়ি বা ঠিকানা নেই। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী এবং মানুষের একটি নির্দিষ্ট আশ্রয় আছে, যেখানে তারা দিনশেষে বিশ্রাম নিতে পারে। কিন্তু হাওয়ার কপালে সেই বিশ্রাম জোটেনি। সে তার নিজস্ব একটি বাড়ির খোঁজে সারা বিশ্বের পাহাড়, প্রান্তর, অরণ্য, নগর ও সমুদ্রে অবিরাম ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কোথাও সে তার ঠিকানা খুঁজে পায় না। অনন্তকাল ধরে এই না-পাওয়ার বেদনা এবং অফুরান সন্ধানের তাড়নাতেই হাওয়া চিরকাল অস্থির ও উত্তাল হয়ে বয়ে চলে।
কবিতাটির নাম 'হাওয়ার গান' রাখা অত্যন্ত সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ—
- হাওয়ার একাকীত্ব ও হাহাকার: সম্পূর্ণ কবিতাটি হাওয়ার নিজস্ব কোনো আশ্রয় না থাকার তীব্র বেদনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দিনরাত শোঁ শোঁ শব্দ করে হাওয়া যে বয়ে চলে, কবির মনে হয়েছে তা আসলে হাওয়ার বুক-ফাটা কান্না বা বিষাদের গান।
- অবিরাম চলা: হাওয়ার গতির কোনো শেষ নেই। সে অরণ্য, প্রান্তর, সমুদ্র, নগর সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। তার এই নিরন্তর ছুটে চলার ছন্দময় প্রকাশই হলো তার 'গান'।
- খোঁজার আকুতি: হাওয়ার এই শোঁ-শোঁ শব্দের মধ্যে দিয়ে সে যেন সমগ্র বিশ্বকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে তার হারানো বাড়ির কথা। তার এই সুর ও হাহাকার কবিতায় গানের মতোই মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাই বিষয়বস্তুর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে 'হাওয়ার গান' নামটি নিখুঁত।
৫. ক্রিয়া ও তার সম্পর্ক নির্ণয়
৫.১ ঘরে ঘরে জ্বলে যায় স্বপ্নের মৃদু মোম
ক্রিয়া: জ্বলে যায়।
সম্পর্ক: কী জ্বলে যায়? -> স্বপ্নের মৃদু মোম (কর্ম কারক)। কোথায় জ্বলে যায়? -> ঘরে ঘরে (অধিকরণ কারক)।
৫.২ আঁধারে জাহাজ চলে
ক্রিয়া: চলে।
সম্পর্ক: কে চলে? -> জাহাজ (কর্তৃকারক)। কখন/কোথায় চলে? -> আঁধারে (অধিকরণ কারক)।
৫.৩ শার্সিতে কেঁপে-ওঠা দেয়ালের পঞ্জর
ক্রিয়া: কেঁপে-ওঠা (অসমাপিকা ক্রিয়া)।
সম্পর্ক: কী কেঁপে ওঠে? -> দেয়ালের পঞ্জর (কর্ম)। কোথায়? -> শার্সিতে (অধিকরণ)।
৫.৪ অকূল অন্ধকারে ফেটে পড়ে গর্জন
ক্রিয়া: ফেটে পড়ে।
সম্পর্ক: কী ফেটে পড়ে? -> গর্জন (কর্তৃকারক)। কোথায়? -> অকূল অন্ধকারে (অধিকরণ কারক)।
৬. একই শব্দের দুবার ব্যবহার
চারটি পঙ্ক্তি:
- ১. "ঘরে ঘরে জ্বলে যায় স্বপ্নের মৃদু মোম"
- ২. "কেঁদে-কেঁদে মরি শুধু বাইরে"
- ৩. "বার-বার পারাপার যত করি"
- ৪. "খুঁজে-খুঁজে ঘুরে ফিরি বাইরে" (অথবা: সুরে-সুরে ব'লে যাই)
কৌশল অবলম্বনের কারণ: কবিতায় একই শব্দ পরপর দুবার ব্যবহার করাকে শব্দদ্বৈত বা পুনরুক্তি বলা হয়। এর প্রধান কারণ দুটি— প্রথমত, ঘটনার তীব্রতা বা নিরবচ্ছিন্নতা বোঝানো (যেমন 'কেঁদে-কেঁদে' মানে একটানা কান্না); দ্বিতীয়ত, কবিতার ছন্দে একটি অপূর্ব দোলচাল বা গীতিময়তা সৃষ্টি করা, যা পাঠকের কানে অনুরণিত হয়।
৭. ধ্বনি পরিবর্তন
- চন্দ্র > চন্ন > চাঁদ (সমীভবন ও নাসিক্যীভবন)
- রাত্রি > রাত্তির (সমীভবন / ব্যঞ্জনসংগতি)
- পঞ্জর > পাঁজর (নাসিক্যীভবন / ক্ষতিপূরক দীর্ঘীভবন)
৯. ইংরেজি শব্দের ব্যবহার
কবিতায় ব্যবহৃত পাঁচটি ইংরেজি শব্দ হলো: পার্ক, বেঞ্চ, কার্পেট, সিনেমা, ডেক।
পরিবর্তিত পঙ্ক্তি:
- উদ্যানের আসনেতে (পার্কের বেঞ্চিতে) ঝরা পাতা ঝর্ঝর।
- আবছায়া গালিচায় (কার্পেট) কুকুরের তন্দ্রায়।
- যাত্রীরা ছায়াছবিতে (সিনেমায়), কেউ নাচে, গান গায়।
- অবশেষে থামে সব, জাহাজের পাটাতন (ডেক) হয় নির্জন।