📚 হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
মূল কীর্তি
'বঙ্গীয় শব্দকোষ' অভিধান রচনা
সময়কাল
রচনা ও মুদ্রণে ৪০ বছর (১৩১২-১৩৫২)
কর্মক্ষেত্র
শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম
উপাধি
দেশিকোত্তম (ডি. লিট.)
প্রবন্ধের সারাংশ
হীরেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত 'হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়' প্রবন্ধটি একজন একনিষ্ঠ সারস্বত সাধকের জীবন ও কীর্তির অসামান্য আলেখ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগে যাঁরা বিদ্যালয়ের কাজে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বিরাট ডিগ্রিধারী না হলেও, অসীম নিষ্ঠা ও সাধনার জোরে তাঁরা অসাধ্য সাধন করেছিলেন। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাঁদেরই একজন।
হরিচরণবাবু প্রথমে জমিদারি সেরেস্তায় কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর সংস্কৃত চর্চার প্রতি অনুরাগ দেখে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'উদ্বৃত্ত শক্তি'র (পেশার বাইরের সৃজনশীলতা) পরিচয় পান এবং তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বাংলা ভাষার এক পূর্ণাঙ্গ অভিধান রচনার দায়িত্ব দেন। ১৩১২ বঙ্গাব্দে তিনি এই 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' রচনার কাজ শুরু করেন। বহু আর্থিক অনটন, মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর মাসিক বৃত্তির সহায়তা এবং অপরিসীম পরিশ্রমের পর দীর্ঘ ১৮ বছর পর ১৩৩০ বঙ্গাব্দে এর পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ হয়। এরপর মুদ্রণের জন্য আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয় এবং অবশেষে ১৩৫২ বঙ্গাব্দে ১০৫ খণ্ডে এই বিশাল গ্রন্থটি সম্পূর্ণ মুদ্রিত হয়।
জীবনের চল্লিশটি বছর তিনি এই একটি কাজেই উৎসর্গ করেছিলেন, যা কোনো মহাযোগীর সাধনার চেয়ে কম নয়। বাঙালি চরিত্রের সাধারণ নিষ্ঠাহীনতার বিপরীতে তিনি ছিলেন এক অত্যুজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তাঁর এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'সরোজিনী স্বর্ণপদক' এবং বিশ্বভারতী থেকে 'দেশিকোত্তম' উপাধিতে ভূষিত হন। প্রবন্ধকার গভীর শ্রদ্ধায় এই নীরব সাধকের জীবনচর্যা ও রবীন্দ্র-সান্নিধ্যের কথা আলোচনা করেছেন।
১. হাতে কলমে (লেখক পরিচিতি)
হীরেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত দুটি বইয়ের নাম হলো— 'ইন্দ্রজিতের খাতা' এবং 'শান্তিনিকেতনে একযুগ'।
তিনি 'ইন্দ্রজিৎ' ছদ্মনামে সমধিক পরিচিত।
২. নিজের ভাষায় উত্তর দাও
১৩ টিশান্তিনিকেতনের প্রথম যুগে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে বিধুশেখর শাস্ত্রী এবং ক্ষিতিমোহন সেনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিধুশেখর শাস্ত্রী প্রথমদিকে ইংরেজি ভাষায় অনভিজ্ঞ টোলের পণ্ডিত ছিলেন, কিন্তু শান্তিনিকেতনের পরিবেশে তিনি কালক্রমে বহুভাষাবিদ ও ভারতীয় পণ্ডিতসমাজে সর্বাগ্রগণ্যদের অন্যতম হয়ে ওঠেন। ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত, যিনি রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় মধ্যযুগীয় সাধুসন্তদের বাণী সংগ্রহ করে ভারতীয় জীবন সাধনার এক বিস্তৃতপ্রায় অধ্যায়কে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। এছাড়াও জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের ডাকে এসে বাংলা ভাষার বৃহত্তম অভিধান সংকলনের মতো অসাধারণ কাজ সম্পন্ন করেন।
কৃতিত্ব: শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগের সাধারণ পণ্ডিত ও কর্মীরা রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় এবং নিজেদের অসীম নিষ্ঠায় যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন (যেমন- অভিধান রচনা, বিলুপ্তপ্রায় দর্শন উদ্ধার), এখানে সেই অসাধারণ কৃতিত্বের কথাই বলা হয়েছে।
শান্তিনিকেতনের প্রাপ্য কেন: লেখক মনে করেন, আমাদের দেশে স্থান-মাহাত্ম্য বলে একটি কথা আছে। শান্তিনিকেতন কেবল মাটি-জল-হাওয়ার গুণে নয়, নিজের দান-শক্তির জোরে মানুষের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ বস্তু দাবি করতে জানত। এই বিদ্যালয় কেবল বিদ্যাদানের স্থান ছিল না, এটি ছিল বিদ্যাচর্চা ও বিদ্যা-বিকিরণের আদর্শ স্থান। এই মহান পরিবেশই সাধারণ মানুষদের অসাধারণ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে লেখক এই কৃতিত্ব শান্তিনিকেতনকে দিয়েছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে শান্তিনিকেতনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো, এটি দেশকে প্রথম শিখিয়েছিল যে বিদ্যালয় শুধু পুঁথিগত বিদ্যাদানের স্থান নয়; এটি বিদ্যাচর্চা এবং বিদ্যা-বিকিরণের (ছড়িয়ে দেওয়ার) স্থান। বিদ্যার্জনের পথ সুগম করে দেওয়াই যে একটি বিদ্যাকেন্দ্রের প্রধান কর্তব্য, সেই সময়ে দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও তা ভাবেনি। কিন্তু শান্তিনিকেতন তার শৈশব থেকেই সেই দায়িত্ব পালনে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের সর্বশক্তি নিয়োগের ফলে এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল।
লেখক এ প্রসঙ্গে জগদানন্দ রায়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধুশেখর শাস্ত্রী এবং ক্ষিতিমোহন সেনের কথা স্মরণ করেছেন।
অবদান: আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এঁরা অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। যেমন, একজনকে (জগদানন্দ রায়) দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছেলেমেয়েদের উপযোগী করে বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞান-গ্রন্থমালা লিখিয়েছিলেন। জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে বাংলা ভাষার বৃহত্তম অভিধান ('বঙ্গীয় শব্দকোষ') রচনা করিয়েছিলেন। টোলের পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী কালক্রমে বহুভাষাবিদ ও শ্রেষ্ঠ ভারতীয় পণ্ডিতে পরিণত হন। ক্ষিতিমোহন সেন মধ্যযুগীয় সাধুসন্তদের বাণী সংগ্রহ করে ভারতীয় জীবন সাধনার এক বিস্তৃতপ্রায় অধ্যায়কে পুনরুজ্জীবিত করেন।
কাদের কথা: এখানে শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগের কর্মীদের (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধুশেখর শাস্ত্রী, ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখ) কথা বলা হয়েছে।
দাবি: রবীন্দ্রনাথ নিজে সর্বশক্তি নিয়োগ করে শান্তিনিকেতনের সেবা করতেন। সেই জোরে তিনি তাঁর সহকর্মীদের কাছেও তাঁদের সর্বশক্তি নিয়োগের দাবি নিঃসংকোচে করতে পারতেন। এটাই ছিল সেই দাবি।
কারণ: আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের বিশাল ব্যক্তিত্ব, গভীর অনুপ্রেরণা এবং শান্তিনিকেতনের তপোবন-সুলভ পরিবেশ তাঁদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে গুরুদেব তাঁদের নিজ হাতে গড়ে তুলছেন এবং তাঁদের সাধারণ বিদ্যাকে এক মহৎ কাজে লাগানোর সুযোগ দিচ্ছেন। এই অপরিসীম শ্রদ্ধা ও আত্মোপলব্ধির কারণেই তাঁরা প্রাণপণে সেই দাবি পূরণে নিয়োজিত হয়েছিলেন।
সম্পর্ক: রবীন্দ্রনাথ একবার জমিদারি মহলে গিয়ে আমিনের সেরেস্তায় নিযুক্ত কর্মচারী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করেন তিনি রাতে কী করেন। হরিচরণবাবু সসংকোচে জানান যে তিনি সংস্কৃত চর্চা করেন এবং একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সেই পাণ্ডুলিপি দেখে হরিচরণবাবুর ভেতরের 'উদ্বৃত্ত শক্তি'র পরিচয় পান এবং অবিলম্বে তাঁকে শান্তিনিকেতনে সংস্কৃতের শিক্ষক হিসেবে নিয়ে আসেন। ১৩০৯ বঙ্গাব্দে এইভাবে তাঁর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সারস্বত-সাধনা: শান্তিনিকেতনে এসে হরিচরণবাবু প্রথমে রবীন্দ্রনাথের অসমাপ্ত 'সংস্কৃতপ্রবেশ' গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করেন। এরপর ১৩১২ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে তিনি 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' নামক বিশাল অভিধান রচনার কাজ শুরু করেন। নানাবিধ আর্থিক অনটন ও বাধা সত্ত্বেও অসীম নিষ্ঠায় দীর্ঘ ১৮ বছর পর ১৩৩০ বঙ্গাব্দে তিনি পাণ্ডুলিপি সম্পূর্ণ করেন। এরপর আরও বহু বছর অপেক্ষা করে ১৩৫২ বঙ্গাব্দে তিনি এর মুদ্রণকার্য শেষ করেন। জীবনের চল্লিশটি বছর তিনি এক ধ্যান ও এক জ্ঞান নিয়ে এই মহাযোগীর ন্যায় সাধনা করে গেছেন।
প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ ও হরিচরণবাবুর সান্নিধ্য এক গভীর শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্কে উদ্ভাসিত হয়েছে। জমিদারি সেরেস্তার এক সাধারণ কর্মচারীর ভেতরের পণ্ডিত সত্তাকে কেবল রবীন্দ্রনাথই তাঁর জহুরি চোখ দিয়ে চিনতে পেরেছিলেন। শান্তিনিকেতনে নিয়ে এসে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শুধু আশ্রয় দেননি, 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' রচনার মতো এক বিশাল কাজের দায়িত্ব দিয়ে তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থার পরিচয় দিয়েছিলেন। মাঝে অর্থাভাবে হরিচরণবাবুকে শান্তিনিকেতন ছাড়তে হলে, রবীন্দ্রনাথ উপযাচক হয়ে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর কাছে তাঁর জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। হরিচরণবাবুও আজীবন এই ঋণ ও গুরুর আদেশের প্রতি নতমস্তকে অনুগত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর জীবনে রক্ষাকবচের মতো কাজ করেছিল।
কাজের কথা: এখানে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' নামক সুবিশাল বাংলা অভিধান রচনার কথা বলা হয়েছে।
কারণ: পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশে বা ভাষায় এই ধরনের বিশালাকার অভিধান সাধারণত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা পণ্ডিত গোষ্ঠীর (বিদ্বৎ পরিষৎ) সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়। কিন্তু হরিচরণবাবু সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায়, প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে, দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যের অসংখ্য শব্দের প্রয়োগ ও দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করে এই ১০৫ খণ্ডের অভিধান রচনা করেছেন। একজন মানুষের পক্ষে একা এত বড় জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি করা বাস্তবিকই বিরল ও বিস্ময়কর, তাই একে বিরাট কাজ বলা হয়েছে।
শ্লোকটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়োদাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর লেখা।
শ্লোকটি হলো:
"কোথা গো ডুব মেরে রয়েছ তলে
হরিচরণ! কোন গরতে?
বুঝেছি! শব্দ-অবধি-জলে
মুঠাচ্ছ খুব অরথে!"
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত অভিধানটির নাম 'বঙ্গীয় শব্দকোষ'।
প্রাবন্ধিক স্মরণ করেছেন যে ১৩১২ বঙ্গাব্দে এই বিশাল গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু হয়। মাঝে আর্থিক সংকটের কারণে হরিচরণবাবুকে শান্তিনিকেতন ছাড়তে হয়। তখন রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী মাসিক পঞ্চাশ টাকা বৃত্তি প্রদান করেন, যা তাঁর কাজে সহায়ক হয়। ১৩৩০ বঙ্গাব্দে পাণ্ডুলিপি সম্পূর্ণ হলেও অর্থাভাবে মুদ্রণ শুরু হতে আরও দশ বছর লেগে যায়। শেষপর্যন্ত প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসু এবং শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্রদের আনুকূল্যে ১৩৫২ বঙ্গাব্দে ১০৫ খণ্ডে অভিধানটির মুদ্রণ ও প্রকাশনা সমাপ্ত হয়। মুদ্রণ শেষ হওয়ার আগেই মহারাজা ও রবীন্দ্রনাথ পরলোকগমন করায়, তাঁদের হাতে গ্রন্থ তুলে দিতে না পারার দুঃখ হরিচরণবাবুর চিরকাল ছিল।
প্রবন্ধের শেষাংশে প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর নিজস্ব স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন, যা রচনাটিকে জীবন্ত ও হৃদয়স্পর্শী করেছে। প্রাবন্ধিক নিজে যখন শান্তিনিকেতনে আসেন, তখন অভিধানের মুদ্রণ শেষ হয়নি। তিনি হরিচরণবাবুকে লাইব্রেরির এক ছোটো ঘরে নিবিষ্ট মনে কাজ করতে দেখেছেন। প্রাতঃভ্রমণ ও সান্ধ্যভ্রমণে তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। ক্ষীণ দৃষ্টির কারণে তিনি চিনতে না পারলেও, চিনে উঠলে সস্নেহে কুশল জিজ্ঞাসা করতেন। প্রাবন্ধিক গিবনের 'রোমান সাম্রাজ্যের পতন' গ্রন্থ সমাপ্তির পর গিবনের অবসাদের সঙ্গে হরিচরণবাবুর মানসিক অবস্থার তুলনা করেছেন। কিন্তু তিনি লক্ষ করেছেন যে, ৪০ বছর কাজ করার পরও হরিচরণবাবুর মনে কোনো অবসাদ ছিল না; বরং এক প্রশান্তি বিরাজ করত। এই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ প্রবন্ধটিকে নিছক জীবনী থেকে এক অনন্য স্মৃতিকথায় উন্নীত করেছে।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' ছাড়াও আরও কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো 'সংস্কৃতপ্রবেশ'। এটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত এবং সংস্কৃত শিক্ষার সহজ প্রণালী উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে রচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে এই বইটি রচনা শুরু করেছিলেন, পরে তাঁর নির্দেশে হরিচরণবাবু এটি সমাপ্ত করেন।
(বি.দ্র: পাঠ্যাংশে মূলত 'সংস্কৃতপ্রবেশ'-এর নামই স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এছাড়া তিনি 'কবির কথা', 'ব্যাকরণ কৌমুদী'র মতো কিছু গ্রন্থও লিখেছিলেন)।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরিসীম নিষ্ঠা ও একাগ্রতার প্রতি প্রাবন্ধিক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ ব্যক্ত করেছেন। প্রাবন্ধিক তাঁকে 'মহাযোগী' বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ তিনি বাঙালি চরিত্রের সাধারণ নিষ্ঠাহীনতাকে ভুল প্রমাণ করে জীবনের ৪০টি বছর একটিমাত্র কাজে সমর্পণ করেছিলেন। প্রাবন্ধিক অকপটে স্বীকার করেছেন যে, একক চেষ্টায় এমন বিশাল অভিধান তৈরির দৃষ্টান্ত সারা বিশ্বেই বিরল। বিশেষজ্ঞ না হলেও একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে প্রাবন্ধিক অভিধানটির প্রয়োগ ও দৃষ্টান্ত থেকে বিপুলভাবে উপকৃত হয়েছেন এবং নিজেকে হরিচরণবাবুর কাছে 'অশেষ ঋণে ঋণী' বলে উল্লেখ করেছেন। শেষ জীবনে হরিচরণবাবুর প্রশান্ত রূপের বর্ণনা দিয়ে প্রাবন্ধিক বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এই নিঃস্বার্থ সাধককে কতটা ভক্তি করতেন।