পরবাসী

বিষ্ণু দে রচিত 'পরবাসী' কবিতার সম্পূর্ণ সারাংশ, হাতে-কলমে প্রশ্নোত্তর ও ব্যাকরণ | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 27 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🌿 পরবাসী

বিষ্ণু দে প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • তৃতীয় পাঠ

অরণ্য প্রকৃতি বন্যপ্রাণ নগরায়ন আত্মজিজ্ঞাসা

কবি পরিচিতি: বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২)

আধুনিক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কবি কলকাতার বিখ্যাত শ্যামাচরণ দে বিশ্বাসের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'উর্বশী ও আর্টেমিস' (১৯৩২)। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে— 'চোরাবালি', 'পূর্বলেখ', 'সন্দ্বীপের চর', 'স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ' প্রভৃতি। তিনি বহু বিদেশি কবিতার সার্থক অনুবাদও করেছেন। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান বিষয়।

১. সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (কবি পরিচিতি)

১.১ কবি বিষ্ণু দে-র প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম কী?

কবি বিষ্ণু দে-র প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম হলো 'উর্বশী ও আর্টেমিস'।

১.২ তাঁর লেখা দুটি প্রবন্ধের বইয়ের নাম লেখো।

তাঁর লেখা দুটি প্রবন্ধের বই হলো 'রুচি ও প্রগতি' এবং 'সাহিত্যের ভবিষ্যৎ'।

২. শব্দ পরিবর্তন করে বাক্য গঠন

নিম্নরেখ শব্দগুলির বদলে অন্য শব্দ বসিয়ে অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি করো:

প্রদত্ত বাক্য (নিম্নরেখ শব্দ)পরিবর্তিত বাক্য
২.১ দুই দিকে বন, মাঝে ঝিকিমিকি পথদুই দিকে জঙ্গল, মাঝে আলোছায়া পথ।
২.২ এঁকে বেঁকে চলে প্রকৃতির তালে তালে।এঁকে বেঁকে বয়ে যায় প্রকৃতির ছন্দে ছন্দে।
২.৩ তাঁবুর ছায়ায় নদীর সোনালি সেতারেশিবিরের ছায়ায় নদীর সুবর্ণ (বা স্বর্ণালি) সেতারে।
২.৪ হঠাৎ পুলকে বনময়ূরের কথক,হঠাৎ আনন্দে বনময়ূরের নৃত্য,
২.৫ বন্য প্রাণের কথাকলি বেগ জাগিয়ে।বুনো প্রাণের কথাকলি গতি জাগিয়ে।

৩. একটি বাক্যে উত্তর দাও

৫ টি
৩.১ পথ কীসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে?

পথ প্রকৃতির তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এঁকেবেঁকে চলে।

৩.২ চিতার চলে যাওয়ার ছন্দটি কেমন?

চিতার চলে যাওয়ার ছন্দটি হলো লুব্ধ এবং হিংস্র।

৩.৩ ময়ূর কীভাবে মারা গেছে?

মানুষের লোভের শিকার হয়ে সুন্দর বনময়ূর পণ্যে বা ব্যবসার সামগ্রীতে পরিণত হয়ে মারা গেছে।

৩.৪ প্রান্তরে কার হাহাকার শোনা যাচ্ছে?

বৃক্ষহীন শুষ্ক প্রান্তরে শুকনো হাওয়ার হাহাকার শোনা যাচ্ছে।

৩.৫ পলাশের ঝোপে কবি কী দেখেছেন?

নিটোল টিলার পলাশের ঝোপে কবি হঠাৎ আনন্দে বনময়ূরের কত্থক (নাচ) দেখেছেন।

৪. কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো

৪.১ জঙ্গলের কোন কোন প্রাণীর কথা কবি এই কবিতায় বলেছেন?

'পরবাসী' কবিতায় কবি বিষ্ণু দে জঙ্গল বা অরণ্য প্রকৃতির বর্ণনায় কচি কচি খরগোশ, পুলকিত বনময়ূর, তৃষ্ণার্ত হরিণ এবং লুব্ধ হিংস্র চিতা বাঘের কথা বলেছেন।

৪.২ সেতারের বিশেষণ হিসেবে কবি 'সোনালি' শব্দের ব্যবহার করেছেন কেন?

সূর্যের আলো নদীর জলের ওপর পড়লে তা চিকচিক করে এবং এক অপূর্ব সোনালি আভার সৃষ্টি করে। নদীর সেই প্রবহমান জলধারার অবিরাম শব্দ কবির কাছে বাদ্যযন্ত্র সেতারের সুরের মতো মনে হয়েছে। তাই নদীর জলের ওই উজ্জ্বল রূপ ও জাদুকরী সুরের সুষমা বোঝাতেই কবি সেতারের বিশেষণ হিসেবে 'সোনালি' শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

৪.৩ কত্থক ও কথাকলি-র কথা কবিতার মধ্যে কোন প্রসঙ্গে এসেছে?

কত্থক: এটি উত্তর ভারতের একটি ধ্রুপদি নৃত্য। নিটোল টিলার পলাশ ঝোপে বন্য ময়ূর যখন পেখম মেলে আনন্দে নেচে ওঠে, তখন সেই অপরূপ সৌন্দর্য ও ছন্দের বর্ণনা দিতে কবি 'কত্থক'-এর প্রসঙ্গ এনেছেন।

কথাকলি: এটি কেরলের এক বিখ্যাত নৃত্যশৈলী, যাতে অভিব্যক্তির প্রকাশ প্রবল থাকে। বন্য চিতা বাঘ যখন শিকারের খোঁজে লুব্ধ ও হিংস্র ছন্দে ক্ষিপ্র বেগে ছুটে যায়, তখন তার সেই উদ্দাম গতি ও হিংস্র সৌন্দর্যকে বোঝাতে কবি 'কথাকলি'-র প্রসঙ্গ টেনেছেন।

৪.৪ 'সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বান' কবি কীভাবে শুনেছেন?

রামায়ণে বর্ণিত আছে যে, অন্ধমুনির পুত্র সিন্ধুমুনি কলসিতে জল ভরার সময় রাজা দশরথ তাকে বন্য হাতি ভেবে ভুল করে শব্দভেদী বাণ ছুঁড়ে হত্যা করেছিলেন। কবিতায় কবি যখন দেখেন নদীর তীরে বন্য হরিণ চুপি চুপি জল খাচ্ছে, তখন সেই নৈসর্গিক ও শান্ত পরিবেশে তিনি যেন অতীত পুরাণের সেই ট্র্যাজিক সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বানের কল্পিত প্রতিধ্বনি শুনতে পান।

৪.৫ 'ময়ূর মরেছে পণ্যে' এই কথার অন্তর্নিহিত অর্থ কী?

অরণ্য হলো ময়ূরের স্বাভাবিক বাসস্থান। কিন্তু আধুনিক মানুষের সীমাহীন লোভ অরণ্য ধ্বংস করছে। সুন্দর বনময়ূর আজ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে নিছক ব্যবসার সামগ্রী বা পণ্যে পরিণত হয়েছে। মানুষ অর্থের লোভে তাদের হত্যা করে মাংস বা পালক বাজারে বিক্রি করছে। প্রকৃতির এই নির্মম ধ্বংসলীলা বোঝাতেই কবি কথাটি বলেছেন।

৫. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো (বিশ্লেষণধর্মী)

৫.১ বিরামচিহ্ন ব্যবহারের দিক থেকে কবিতাটির শেষ স্তবকের বিশিষ্টতা কোথায়? এর থেকে কবি-মানসিকতার কী পরিচয় পাওয়া যায়?

বিশিষ্টতা: 'পরবাসী' কবিতার শেষ স্তবকের চারটি লাইনের মধ্যে প্রথম তিনটি লাইনের শেষেই কবি বিরামচিহ্ন হিসেবে প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) ব্যবহার করেছেন।

কবি-মানসিকতার পরিচয়: এই প্রশ্নবোধক চিহ্নগুলির মাধ্যমে কবির গভীর বেদনা, অসহায়তা এবং আধুনিক সভ্যতার প্রতি চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতি আজ মানুষের লালসার শিকার। কবি বুঝতে পারছেন না কেন মানুষ আজ এত অসহায়, কেনই বা নদী-গাছ-পাহাড়ের মতো অকৃত্রিম সম্পদ আজ এত মূল্যহীন (গৌণ)। নিজের বাসভূমিতেই মানুসের এই যাযাবর বা পরবাসী দশার অবসান কবে হবে—সেই ব্যাকুল জিজ্ঞাসাই কবির মনকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

৫.২ কবি নিজেকে পরবাসী বলেছেন কেন?

মানুষের আদিম ও প্রকৃত বাসস্থান ছিল নিসর্গ প্রকৃতি। কিন্তু যন্ত্রসভ্যতার যুগে মানুষ জঙ্গল কেটে, গ্রাম ধ্বংস করে কংক্রিটের জঙ্গল বানাচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ আজ বিলুপ্তির পথে। কবি প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলা মেনে নিতে পারছেন না। যে প্রকৃতিকে তিনি ভালোবাসেন, তা আজ উজাড় হয়ে যাওয়ায় নিজের দেশেই তিনি আজ আশ্রয়হীন, শিকড়হীন এক যাযাবরে পরিণত হয়েছেন। তাই স্বদেশের এই রুক্ষ, অচেনা পরিবেশে কবি নিজেকে 'পরবাসী' বলে মনে করেছেন।

৫.৪ 'পরবাসী' কবিতার প্রথম তিনটি স্তবক ও শেষ দুটি স্তবকের মধ্যে বক্তব্য বিষয়ের কোনো পার্থক্য থাকলে তা নিজের ভাষায় লেখো।

কবিতাটির প্রথম তিনটি স্তবক এবং শেষ দুটি স্তবকের মধ্যে বক্তব্য বিষয়ের এক বিস্তর ও বিপরীতধর্মী পার্থক্য রয়েছে।

প্রথম তিন স্তবক: এখানে বন্য প্রকৃতির এক অপরূপ, প্রাণবন্ত ও ছন্দোময় চিত্র ফুটে উঠেছে। খরগোশের লাফানো, বনময়ূরের নাচ, নদীর জলখাওয়া হরিণ এবং চিতা বাঘের গতি—সব মিলিয়ে অরণ্যের এক নিখুঁত ও স্বাধীন বন্যপ্রাণের উৎসবের বর্ণনা রয়েছে।

শেষ দুই স্তবক: এখানে রয়েছে সেই সুন্দর প্রকৃতির চরম অবক্ষয় ও ধ্বংসের চিত্র। মানুষের লোভের কারণে জঙ্গল সাফ হয়ে গেছে, গ্রাম মরে গেছে, কিন্তু পরিকল্পিত শহরের পত্তনও হয়নি। চারিদিকে কেবল হাহাকার আর শূন্যতা। এই ধ্বংসলীলা দেখে কবির মনে জেগেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন ও গভীর হতাশা।

৬. টীকা লেখো

কত্থকএটি উত্তর ভারতের একটি সুপ্রাচীন ও বিখ্যাত ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী।
সেতারভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুমধুর তারযন্ত্র বিশেষ।
কথাকলিদক্ষিণ ভারতের কেরল রাজ্যের এক বিখ্যাত ধ্রুপদী নৃত্যকলা, যাতে মুখের অভিব্যক্তির প্রকাশ অত্যন্ত প্রবল থাকে।
সিন্ধুমুনিরামায়ণের এক অন্ধমুনির পুত্র। রাজা দশরথ ভুলবশত হাতির জল খাওয়ার শব্দ মনে করে শব্দভেদী বাণ দিয়ে সিন্ধুমুনিকে হত্যা করেছিলেন।
পণ্যযে দ্রব্য বাজারে কেনা-বেচা যায়, অর্থাৎ বাণিজ্যের সামগ্রী।

৭. ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার (দল বিশ্লেষণ)

শব্দদল বিশ্লেষণ (Syllable)দলের প্রকৃতি
জ্বলেজ্ব - লেদুটিই মুক্ত দল
পরবাসীপ - র - বা - সীসবকটি মুক্ত দল
চলেচ - লেদুটিই মুক্ত দল
তাঁবুতাঁ - বুদুটিই মুক্ত দল

৮. ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয়

সমস্ত পদব্যাসবাক্যসমাসের নাম
নিটোলনাই (নি) টোল যাতেনঞর্থক বহুব্রীহি সমাস
বনময়ূরবনে পালিত ময়ূর
(অথবা) বনের ময়ূর
মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
(অথবা) সম্বন্ধ তৎপুরুষ
সিন্ধুমুনিসিন্ধু নামক মুনিমধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
নিজবাসভূমিনিজের বাসভূমিসম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস
সেতারসে (তিন) তার যে যন্ত্রেরসংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস

৯. শব্দ গঠন প্রক্রিয়া (কীভাবে গঠিত হয়েছে)

সোনালিসোনা (বিশেষ্য) + আলি (প্রত্যয়)
আহ্বানআ (উপসর্গ) - হ্বে (ধাতু) + অন্ (কৃৎ প্রত্যয়)
বন্যবন (বিশেষ্য) + য (তদ্ধিত প্রত্যয়)
বসতিবস্ (ধাতু) + অতি (কৃৎ প্রত্যয়)
পরবাসীপরবাস (বিশেষ্য) + ঈ / ইন্ (তদ্ধিত প্রত্যয়)

১০. নির্দেশ অনুসারে বাক্য পরিবর্তন

প্রদত্ত বাক্যপরিবর্তিত বাক্য
১০.১ চুপি চুপি আসে নদীর কিনারে, জল খায়। (সরল বাক্যে)চুপি চুপি নদীর কিনারে এসে জল খায়।
১০.২ নিটোল টিলার পলাশের ঝোপে দেখেছি। (জটিল বাক্যে)যেটি নিটোল টিলার পলাশের ঝোপ, সেখানেই দেখেছি।
১০.৩ চিতা চলে গেল লুব্ধ হিংস্র ছন্দে বন্য প্রাণের কথাকলি বেগ জাগিয়ে। (যৌগিক বাক্যে)চিতা লুব্ধ হিংস্র ছন্দে চলে গেল এবং বন্য প্রাণের কথাকলি বেগ জাগিয়ে তুলল।
১০.৪ কেন এই দেশে মানুষ মৌন অসহায়? (না-সূচক বাক্যে)এই দেশে মানুষ মৌন অসহায় ছাড়া কিছু নয়। (অথবা) এই দেশে মানুষ কি মৌন অসহায় নয়?

প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন

'পরবাসী' কবিতায় কবি বিষ্ণু দে অত্যন্ত সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে নগর সভ্যতার প্রসারে অরণ্য ধ্বংস হচ্ছে। বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল কেড়ে নিয়ে মানুষ নিজেই আজ এক শিকড়হীন, পরবাসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই কবিতা আমাদের প্রকৃতি সংরক্ষণের এক গভীর বার্তা দিয়ে যায়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'পরবাসী' কবিতাটির রচয়িতা হলেন আধুনিক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বিষ্ণু দে।

কবি প্রকৃতিকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসনে আজ জঙ্গল সাফ হয়ে গেছে, গ্রাম ধ্বংস হয়েছে। এই বৃক্ষহীন, কংক্রিটের অচেনা পরিবেশে নিজেকে আশ্রয়হীন ও শিকড়হীন মনে হওয়ায় কবি নিজেকে পরবাসী বলেছেন।

এর অর্থ হলো, সুন্দর বনময়ূর আজ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে মানুষের লোভের শিকার হয়ে কেবল ব্যবসার সামগ্রী বা পণ্যে পরিণত হয়েছে।

রামায়ণের কাহিনি অনুযায়ী সিন্ধুমুনি ছিলেন এক অন্ধমুনির পুত্র, যাঁকে রাজা দশরথ হাতির জল খাওয়ার শব্দ ভেবে ভুল করে শব্দভেদী বাণ ছুঁড়ে হত্যা করেছিলেন।