🔥 শিকল-পরার গান
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
কবিতার সারাংশ ও মূলভাব
'শিকল-পরার গান' কবিতাটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এক অসামান্য দেশপ্রেমমূলক সৃষ্টি। ব্রিটিশ সরকারের জেলে বন্দি অবস্থায় পরাধীনতার শৃঙ্খলকে উপহাস করে তিনি এই কবিতাটি রচনা করেন।
কবির মতে, ব্রিটিশদের পরিয়ে দেওয়া এই শিকল বা হাতকড়া প্রকৃতপক্ষে শৃঙ্খল নয়, এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি টলিয়ে দেওয়ার এক 'ছল' মাত্র। বিপ্লবীরা জেলে বন্দি হতে আসেননি, বরং অত্যাচারী শাসকের 'বাঁধন-ভয়'কে চিরতরে ক্ষয় করতে এসেছেন। তাঁরা প্রমাণ করতে চান যে, শিকল পরে হাসিমুখে কারাবরণ করার মাধ্যমেই তাঁরা শৃঙ্খলভাঙার শক্তি অর্জন করবেন।
ইংরেজ সরকার যে জেলখানা বা 'বন্ধ কারা' তৈরি করেছে, তা দিয়ে ভারতের মুক্তিকামী মানুষকে স্তব্ধ করা যাবে না। কবি মনে করেন, শাসকের ভয় দেখানো ভূতের এবার সর্বনাশ হবে। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও বিপ্লবীরা হাসিমুখে মৃত্যুকে জয় করবেন। পরাধীনতার এই শিকলের ঝনঝনানি আসলে কোনো ক্রন্দন নয়, এটি হলো মুক্তিপথের অগ্রদূতদের আগমনী বার্তা বা চরণ-বন্দনা। পরিশেষে কবি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, অত্যাচারিতের অস্থি বা হাড় দিয়েই দেশে আবার বজ্রানল জ্বলে উঠবে, যা অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসনকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
১. হাতে কলমে (লেখক পরিচিতি)
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি শ্যামাসংগীত, গজল, দেশাত্মবোধক, ইসলামি প্রভৃতি নানা ধরনের গানের রচয়িতা।
২. একটি বাক্যে উত্তর দাও
৪ টি'শিকল-পরা ছল' বলতে কবি বুঝিয়েছেন যে, বিপ্লবীরা ভয় পেয়ে শিকল পরেননি, বরং এই শিকল পরার অছিলায় বা ছলে তাঁরা ব্রিটিশ শাসকের দম্ভ ও শিকলকে বিকল বা ধ্বংস করতে এসেছেন।
'বাঁধন-ভয়' ক্ষয় করতে ভারতের মুক্তিকামী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীরা ইংরেজদের তৈরি জেলখানায় বা 'বন্ধ কারায়' এসেছেন।
মুক্তিকামী বিপ্লবীদের পরনে থাকা শিকলের ঝনঝনানি বা শব্দকেই কবি মুক্তি-পথের অগ্রদূতদের চরণ-বন্দনা হিসেবে কল্পনা করেছেন।
পৌরাণিক যুগে দধীচি মুনির অস্থি দিয়ে বজ্র তৈরি করে যেমন বৃত্রাসুরকে বিনাশ করা হয়েছিল, ঠিক তেমনি 'আবার' বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ ও অস্থি দিয়ে নতুন বজ্রানল জ্বলে উঠে ব্রিটিশ অসুরকে ধ্বংস করবে, এই অর্থে 'আবার' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
৩. নিজের ভাষায় উত্তর দাও
২ টি'শিকল-পরার গান' কবিতায় স্বাধীনতাকামী মানুষের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের বাসনা তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে। অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার ভেবেছিল শিকল পরিয়ে, জেলে বন্দি করে এবং ফাঁসির ভয় দেখিয়ে ভারতবাসীকে দমিয়ে রাখবে। কিন্তু মুক্তিকামী মানুষ সেই শিকলকে উপহাস করেছে। তাঁরা বলেছেন, এই শিকল পরা তাঁদের একটা 'ছল' মাত্র। তাঁরা স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছেন শাসকের 'বাঁধন-ভয়'কে জয় করার জন্য। ফাঁসির দড়িকেও তাঁরা হাসিমুখে বরণ করতে প্রস্তুত। তাঁদের শিকলের ঝনঝনানি আসলে কোনো ক্রন্দন নয়, তা হলো স্বাধীনতার আগমনী গান। নিজেদের অস্থি দিয়ে বজ্রানল জ্বালিয়ে দেশকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার যে প্রবল বাসনা, তা এই কবিতায় এক অসামান্য বিপ্লবী চেতনার জন্ম দিয়েছে।
কেন এই বাঁধন: ভারতের মুক্তিকামী বিপ্লবীদের দমিয়ে রাখার জন্য, তাঁদের ওপর অত্যাচার চালানোর জন্য এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদের হাত-পায়ে শিকল বা হাতকড়ার বাঁধন পরিয়েছিল।
কারা, কীভাবে জয় করবে: ভারতের নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীরা এই বাঁধন-ভয়কে জয় করবে। ব্রিটিশরা ভেবেছিল শিকল পরালে বিপ্লবীরা ভয় পাবে। কিন্তু বিপ্লবীরা স্বেচ্ছায় হাসিমুখে সেই শিকল পরেছেন এবং ফাঁসির মঞ্চকে বরণ করে নিয়েছেন। মৃত্যুভয় বা কারাবাসের ভয়কে তুচ্ছ প্রমাণ করে, নিজেদের অসীম সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমেই তাঁরা ব্রিটিশদের এই 'বাঁধন-ভয়'কে চিরতরে জয় করবেন।
ব্যাকরণ ও ভাষাচর্চা (৪ - ৮)
| শব্দ | দল বিভাজন | দলের প্রকৃতি |
|---|---|---|
| বন্ধনী | বন্ (রুদ্ধ) - ধ (মুক্ত) - নী (মুক্ত) | ১টি রুদ্ধদল, ২টি মুক্তদল |
| ঝঞ্ঝনা | ঝঞ্ (রুদ্ধ) - ঝ (মুক্ত) - না (মুক্ত) | ১টি রুদ্ধদল, ২টি মুক্তদল |
| বজ্রানল | বজ্ (রুদ্ধ) - রা (মুক্ত) - নল্ (রুদ্ধ) | ২টি রুদ্ধদল, ১টি মুক্তদল |
| সর্বনাশ | শর্ (রুদ্ধ) - বো (মুক্ত) - নাশ (রুদ্ধ) | ২টি রুদ্ধদল, ১টি মুক্তদল |
| অস্থি | অস্ (রুদ্ধ) - থি (মুক্ত) | ১টি রুদ্ধদল, ১টি মুক্তদল |
- বাঁধন: বন্ধন > বাঁধন। এখানে যুক্তব্যঞ্জন (ন্ধ) লুপ্ত হয়ে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি (অ) দীর্ঘ হয়েছে (আ) এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনুনাসিক বা চন্দ্রবিন্দু (ঁ) এসেছে। একে ক্ষতিপূরক দীর্ঘীভবন ও নাসিক্যীভবন বলে।
- পরে: পরিয়া > পইরা > পরে। এটি অভিশ্রুতি-র উদাহরণ। (প্রথমে অপিনিহিতি হয়ে 'পইরা', তারপর অভিশ্রুতির নিয়মে 'পরে' হয়েছে)।
৬.১ ভয়-দেখানো ভূতের মোরা করব সর্বনাশ। (জটিল বাক্যে)
উত্তর: যে ভূত ভয় দেখায়, মোরা তার সর্বনাশ করব।
৬.২ মোরা ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যুজয়ের ফল। (যৌগিক বাক্যে)
উত্তর: মোরা ফাঁসি পরব এবং মৃত্যুজয়ের ফল হিসেবে হাসি আনব।
৬.৩ তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়। (চলিত গদ্যে)
উত্তর: তোমাদের বন্ধ কারাদলে আসা আমাদের বন্দি হওয়ার জন্য নয়।
৭.১ তোমার বন্ধ ঘরের বন্ধনীতে করছ বিশ্বগ্রাস।
তোমার (সর্বনাম), বন্ধ (বিশেষণ), ঘরের (বিশেষ্য), বন্ধনীতে (বিশেষ্য), করছ (ক্রিয়া), বিশ্বগ্রাস (বিশেষ্য)।
৭.২ মোরা ফাঁসি প'রে আনব হাসি মৃত্যুজয়ের ফল।
মোরা (সর্বনাম), ফাঁসি (বিশেষ্য), প'রে (অসমাপিকা ক্রিয়া), আনব (সমাপিকা ক্রিয়া), হাসি (বিশেষ্য), মৃত্যুজয়ের (বিশেষ্য), ফল (বিশেষ্য)।
৭.৩ এবার আনব মাভৈঃ-বিজয়-মন্ত্র বলহীনের বল।।
এবার (অব্যয়/ক্রিয়াবিশেষণ), আনব (ক্রিয়া), মাভৈঃ-বিজয়-মন্ত্র (বিশেষ্য), বলহীনের (বিশেষণ), বল (বিশেষ্য)।
| সমাসবদ্ধ পদ | ব্যাসবাক্য | সমাসের নাম |
|---|---|---|
| শিকল-ঝঞ্ঝনা | শিকলের ঝঞ্ঝনা | সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস |
| চরণবন্দনা | চরণের বন্দনা | সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস |
| বজ্রানল | বজ্র রূপ অনল | রূপক কর্মধারয় সমাস |
| মৃত্যুজয় | মৃত্যুকে জয় | কর্ম তৎপুরুষ সমাস |