👧 সুভা
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
প্রধান চরিত্র
সুভা (সুভাষিণী), বোবা মেয়ে
গ্রামের নাম
চণ্ডীপুর, ছোটো নদীর তীরে
পশু বন্ধু
সর্বশী ও পাঙ্গুলি (দুটি গাভী)
মানুষ বন্ধু
প্রতাপ (অকর্মণ্য যুবক)
গল্পের সারাংশ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' একটি মরমী ও হৃদয়স্পর্শী ছোটোগল্প। চণ্ডীপুর গ্রামের বাণীকণ্ঠের ছোটো মেয়ে সুভাষিণী (সংক্ষেপে সুভা) ছিল জন্ম থেকেই বোবা (বাক্প্রতিবন্ধী)। মেয়ে কথা বলতে পারে না বলে মা তাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক মনে করতেন এবং বিরক্ত থাকতেন, কিন্তু বাবা বাণীকণ্ঠ তাকে অন্য মেয়েদের চেয়ে একটু বেশি ভালোবাসতেন। সুভার কথা বলার ক্ষমতা না থাকলেও তার বড়ো বড়ো কালো দুটি চোখ ছিল অসীম ভাবের প্রকাশে ভরপুর। সাধারণ ছেলেমেয়েরা তাকে ভয় পেত, তাই সে ছিল সঙ্গীহীন।
ভাষাহীন সুভার প্রকৃত বন্ধু ছিল চণ্ডীপুর গ্রামের শান্ত প্রকৃতি— নদীর কলধ্বনি, পাখির ডাক আর তরুর মর্মর যেন তার হয়ে কথা বলত। এছাড়া গোয়ালের দুটি গাভী— সর্বশী ও পাঙ্গুলি, একটি ছাগলছানা এবং একটি বিড়ালশাবক ছিল তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। গ্রামের গোঁসাইদের ছোটো ছেলে প্রতাপ ছিল অত্যন্ত অকর্মণ্য এবং তার শখ ছিল ছিপ ফেলে মাছ ধরা। মাছ ধরার সময় বোবা সঙ্গী হিসেবে সুভা ছিল তার শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী। প্রতাপ ভালোবেসে তাকে 'সু' বলে ডাকত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুভার মনে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটতে থাকে। কিন্তু সমাজে বোবা মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে পিতা-মাতাকে চিন্তিত ও নিন্দিত হতে হয়। অবশেষে বাণীকণ্ঠ সুভাকে নিয়ে সপরিবারে কলকাতায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সুভা তার প্রিয় নদী, প্রকৃতি এবং মূক পশু বন্ধুদের ছেড়ে যেতে অত্যন্ত কষ্ট পায়। কলকাতায় গিয়ে পাত্রপক্ষ সুভার কান্নাভরা চোখের ভাষা বুঝতে পারে না, এবং একটি বোবা মেয়ের সঙ্গে প্রতারণামূলকভাবে এক অপরিচিত স্থানে বিয়ে হয়ে যায়। তার বোবা হওয়ার কথা জানাজানি হলে তার স্বামী তাকে অবহেলা করে অন্য এক ভাষাবিশিষ্ট মেয়েকে বিয়ে করে। সুভার ভাষাহীন হৃদয়ের অসীম অব্যক্ত ক্রন্দন কেবল অন্তর্যামীই শুনতে পান।
১. হাতে কলমে (কবি পরিচিতি)
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত 'ভারতী' ও 'বালক' পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত লিখতেন।
ভারতের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ-এ তাঁর লেখা গান ('আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি') জাতীয় সংগীত হিসাবে গাওয়া হয়।
২. একটি বাক্যে উত্তর দাও
৫ টিসুভার প্রকৃত নাম হলো সুভাষিণী।
সুভার বাবা হলেন বাণীকণ্ঠ।
সুভা চণ্ডীপুর গ্রামে বাস করত।
গল্পে সুভার বোবা প্রাণী বন্ধু— দুটি গাভী (সর্বশী ও পাঙ্গুলি), ছাগলছানা, বিড়ালশাবক এবং মানুষ বন্ধু প্রতাপ-এর কথা রয়েছে।
গোঁসাইদের অকর্মণ্য ছোটো ছেলে প্রতাপ সুভাকে আদর করে 'সু' বলে ডাকত।
৩. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও
৫ টিসুভা জন্ম থেকেই বাক্প্রতিবন্ধী বা বোবা ছিল। তাই সে মনের ভাব কথায় প্রকাশ করতে পারত না। সাধারণ ছেলেমেয়েরা তার এই নিস্তব্ধ মহত্ত্বকে ভয় পেত, তাই কেউ তার সঙ্গে খেলত না। নির্জন দুপুরে যেমন চারদিকে কোনো কোলাহল থাকে না এবং এক অদ্ভুত স্তব্ধতা বিরাজ করে, সুভার জীবনও ছিল ঠিক সেইরকম নিঃশব্দ ও একাকী। এই শূন্যতা ও নিঃসঙ্গতা বোঝাতেই লেখক এমন উপমা ব্যবহার করেছেন।
চণ্ডীপুর গ্রামটি বাংলাদেশের একটি ছোটো নদীর তীরে অবস্থিত। নদীটি গৃহস্থঘরের তন্বী মেয়ের মতো আলস্যহীনভাবে নিজের কূল রক্ষা করে কাজ করে যায়। নদীর দুই তীরে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন উঁচু তট রয়েছে। এই নদীটির সঙ্গে দুই ধারের গ্রামের প্রতিটি মানুষের যেন কোনো না কোনো নিবিড় সম্পর্ক আছে। বাণীকণ্ঠের সচ্ছল গার্হস্থ্য বাড়িটি (আটচালা, গোয়ালঘর, কলার বাগান ইত্যাদি) ঠিক এই নদীর ধারেই অবস্থিত।
বাণীকণ্ঠের গোয়ালের দুটি গাভী, সর্বশী ও পাঙ্গুলির সঙ্গে বোবা সুভার অত্যন্ত নিবিড় ও আত্মিক সম্পর্ক ছিল। গাভী দুটি সুভার পদশব্দ চিনত। সুভা তাদের আদর করছে, বকছে নাকি মিনতি করছে— তা তারা মানুষের চেয়েও ভালো বুঝতে পারত। সুভা মনের কষ্টে থাকলে গাভী দুটি তার গা ঘেঁষে, কানের কাছে মুখ ঘষে তাকে মূক ব্যাকুলতার সঙ্গে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত।
প্রতাপ ছিল গ্রামের অত্যন্ত অকর্মণ্য এক যুবক, যার প্রধান শখ ছিল ছিপ ফেলে মাছ ধরা। মাছ ধরার সময় কোনো বাক্যবাগীশ সঙ্গীর চেয়ে একটি নিস্তব্ধ, বাক্যহীন সঙ্গী অনেক বেশি সুবিধাজনক। বোবা সুভা নদীর ধারে চুপচাপ বসে থাকত, প্রতাপের জন্য নিজের হাতে পান সেজে আনত এবং মাছ ধরার কাজে কোনো ব্যাঘাত ঘটাত না। এই নিঃশব্দ সাহচর্যের কারণেই প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝত এবং তাকে ভালোবেসে 'সু' বলে ডাকত।
কথাটি সুভার বাবা-মা (বাণীকণ্ঠ ও তার স্ত্রী) সম্পর্কে বলা হয়েছে।
তৎকালীন হিন্দু সমাজে মেয়েদের নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ে দেওয়াটা বাবা-মায়ের প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করা হতো। সুভা বোবা হওয়ায় গ্রামে তার বিয়ে হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং লোকে তাদের একঘরে করার ভয় দেখাচ্ছিল। অবশেষে কলকাতায় গিয়ে, পাত্রপক্ষকে সুভার বোবা হওয়ার আসল সত্য লুকিয়ে, কেবল তার রূপ ও কান্নার ছলনায় ভুলিয়ে তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। পিতা-মাতা বোবা মেয়েকে অপরের হাতে গছিয়ে দিয়ে নিজেদের সামাজিক সম্মান (জাতি) ও ধর্মীয় পুণ্য (পরকাল) রক্ষা হয়েছে ভেবে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন, যদিও মেয়ের জীবন তাতে ধ্বংস হয়ে যায়। এটি তৎকালীন সমাজের প্রতি লেখকের একটি তীব্র ব্যঙ্গ।
৪. নিজের ভাষায় উত্তর দাও
৪ টিমানুষ মূলত ভাষার মাধ্যমেই নিজের মনের ভাব ও আবেগ প্রকাশ করে। কিন্তু সুভা বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে সে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারত না। তখন বিশাল প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল তার পরম বন্ধু ও মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। নদীর কলধ্বনি, পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ, তরুর মর্মর— প্রকৃতির এই বিচিত্র শব্দ ও গতি সুভার বোবা ভাষারই বিশ্বব্যাপী বিস্তার বলে মনে হতো। প্রকৃতি তার নীরব কান্না, আনন্দ এবং দীর্ঘশ্বাসকে নিজের বিশালতার মধ্যে ধারণ করে নিত, আর এভাবেই প্রকৃতির শব্দময়তা সুভার ভাষার অভাবকে পূরণ করে তাকে সান্ত্বনা দিত।
বোবা সুভার সঙ্গে সাধারণ মানুষের চেয়ে মনুষ্যেতর প্রাণীদের (পশুপাখিদের) বন্ধুত্ব ছিল অনেক বেশি গভীর ও আন্তরিক। বাণীকণ্ঠের গোয়ালের দুটি গাভী, সর্বশী ও পাঙ্গুলি, সুভার পদশব্দ চিনত। সুভার দুঃখ-কষ্ট তারা অন্ধ অনুমানে বুঝতে পেরে তাকে গা চেটে সান্ত্বনা দিত। এছাড়াও একটি ছাগল এবং একটি বিড়ালছানা সুভার খুব ন্যাওটা ছিল। বিড়ালছানাটি সুভার কোলে উঠে নিশ্চিন্তে ঘুমাতো এবং সুভা তার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করত। মানুষের সমাজ যখন সুভাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, তখন এই নিরীহ অবলা প্রাণীরাই ছিল তার নীরব আশ্রয় ও সহমর্মী বন্ধু।
কলকাতায় চিরতরে চলে যাওয়ার আগের দিন, শুক্লা দ্বাদশীর রাতে সুভার মন গভীর বেদনায় ও কান্নায় ভরে উঠেছিল। সে তার চিরপরিচিত নদীর তীরে গিয়ে ঘাসের বিছানায় লুটিয়ে পড়েছিল। সে যেন দু-হাত দিয়ে প্রকাণ্ড বোবা পৃথিবীমাতা (ধরণী)-কে জড়িয়ে ধরে বলতে চেয়েছিল, "তুমি আমাকে যেতে দিয়ো না মা!"
কারণ: চণ্ডীপুর গ্রাম, সেই নদী, প্রকৃতি, গোয়ালের গরুগুলো এবং প্রতাপ— এরা সবাই ছিল সুভার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও নীরব ভাষার সঙ্গী। শহর কলকাতা তার কাছে ছিল সম্পূর্ণ অজানা ও ভালোবাসাহীন এক বিদেশ। আপন পরিবেশ ও বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণাই তার মনে এমন চরম হাহাকার ও ভীতির সৃষ্টি করেছিল।
গল্পের শেষ বাক্যটি হলো: "এবার তাহার স্বামী চক্ষু এবং কর্ণেন্দ্রিয়ের দ্বারা পরীক্ষা করিয়া এক ভাষাবিশিষ্ট কন্যা বিবাহ করিয়া আনিল।"
এই বাক্যটি গল্পের একটি চরম ট্র্যাজিক ও অপরিহার্য সমাপ্তি। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজে সুভার মতো প্রতিবন্ধী মেয়েদের কোনো স্থান বা সম্মান নেই; তারা শুধুই প্রতারণা ও করুণার পাত্রী। পাত্রপক্ষ সুভার চোখের জলকে মর্যাদা দেয়নি, বরং বোবা জানার পর তাকে সম্পূর্ণ অবহেলা করে পুনরায় বিয়ে করেছে। বাক্যটি তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক ও সংবেদনহীন সমাজের নির্মম বাস্তবতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে এবং সুভার প্রতি পাঠকের মনে চরম সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে।
৫. কর্তা-খণ্ড ও ক্রিয়া-খণ্ডে ভাগ করো
| বাক্য | উদ্দেশ্য বা কর্তা-খণ্ড (Subject) | বিধেয় বা ক্রিয়া-খণ্ড (Predicate) |
|---|---|---|
| ৫.১ সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন ও সঙ্গীহীন। | সে | নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন ও সঙ্গীহীন। |
| ৫.২ সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে, বহু চেষ্টার পর বাপ-মা সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন। | বাপ-মা | বহু চেষ্টার পর, সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন। |
| ৫.৩ এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ব আছে। | একটা বিজন মহত্ত্ব | এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো আছে। |
৬. বাক্য পরিবর্তন করো
| নির্দেশ | পরিবর্তিত বাক্য |
|---|---|
| ৬.১ সুভা তেঁতুলতলার বসিয়া থাকিত এবং প্রতাপ অনতি দূরে মাটিতে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত। (জটিল বাক্যে) | যখন সুভা তেঁতুলতলায় বসিয়া থাকিত, তখন প্রতাপ অনতি দূরে মাটিতে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত। |
| ৬.২ বাণীকণ্ঠ নিদ্রা হইতে উঠিয়া শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিল। (জটিল বাক্যে) | বাণীকণ্ঠ যেই নিদ্রা হইতে উঠিল অমনি শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিল। (বা: বাণীকণ্ঠ যখন নিদ্রা হইতে উঠিল, তখন সে শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিল।) |
| ৬.৩ (দুটি বাক্য যুক্ত করে একটি জটিল বাক্যে পরিণত করো) | বাণীকণ্ঠের ঘর যেহেতু একেবারে নদীর উপরেই, সেহেতু তাহার বাখারির বেড়া... (ইত্যাদি)... কলার বাগান নৌকোবাহী মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। |
| ৬.৪ প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়, যেন তাহার হইয়া কথা কয়। (সরল বাক্যে) | প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া তাহার হইয়া কথা কয়। |
৭. শূন্যস্থান পূরণ করো (সন্ধি)
- ৭.১ অনু + ভব = অনুভব
- ৭.২ অনু + মান = অনুমান
- ৭.৩ দিক্ + বিদিক = দিগ্বিদিক
- ৭.৪ গৃহস্থ > গেরস্ত (এটি ধ্বনি পরিবর্তন/স্বরভক্তি ও সমীভবন)
- ৭.৫ পঞ্জিকা > পাঁজি (এটি ধ্বনি পরিবর্তন)