পরাজয়

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পরাজয়' গল্পের সম্পূর্ণ সারাংশ ও প্রশ্নোত্তর | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 29 May 2026 Last Update: 31 May 2026

⚽ পরাজয়

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

ফুটবল অভিমান দলবদল ময়দানের লড়াই

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৪৫-)

বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখক। তিনি এরিয়ান্স ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন এবং 'দৈনিক বসুমতী' ও 'যুগান্তর' পত্রিকায় ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে 'দেরারি' (প্রথম উপন্যাস), 'ক্রিকেট খেলার আইনকানুন', 'ফুটবলের পাঁচ নক্ষত্র' উল্লেখযোগ্য। 'পরাজয়' গল্পে তিনি ময়দানের রাজনীতির শিকার এক প্রবীণ ফুটবলারের মানসিক দ্বন্দ্বের নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন।

🏃‍♂️

মূল চরিত্র

রঞ্জন সরকার (স্ট্রাইকার)

🏟️

ঘটনাস্থল

কলকাতা ময়দান ও সল্টলেক স্টেডিয়াম

⏱️

সম্পর্ক

ক্লাবের সঙ্গে ১৫ বছরের সম্পর্ক

🤝

নতুন দলের কর্মকর্তা

স্বপনদা ও ঘোষদা

গল্পের সারাংশ

'পরাজয়' গল্পটি কলকাতা ময়দানের এক নামী ফুটবলার রঞ্জন সরকারের তীব্র অভিমান, দলবদল এবং চূড়ান্ত মানসিক দ্বন্দ্বের করুণ কাহিনি। রঞ্জন গত পনেরো বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ক্লাবে খেলেছে। টাকার লোভ অগ্রাহ্য করে সে নিজের ক্লাবকে মাতৃজ্ঞানে ভালোবেসেছে এবং বাংলার ও ভারতের অধিনায়ক হওয়ার পাশাপাশি অর্জুন পুরস্কারও লাভ করেছে। কিন্তু খেলোয়াড় জীবনের সায়াহ্নে এসে সে উপলব্ধি করে যে, ক্লাবে তার কদর কমেছে। নববর্ষের 'বারপুজো'র অনুষ্ঠানে ক্লাবের কর্মকর্তারা তাকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেননি।

এই চূড়ান্ত অপমান ও অবহেলায় রঞ্জনের বুক ভেঙে যায়। রাগে ও অভিমানে সে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অন্য একটি বড়ো ক্লাবে (স্বপনদা ও ঘোষদাদের দলে) সই করে দেয়। এই দলবদলের খবরে ময়দানে তোলপাড় শুরু হয়। মরশুমের প্রথম ডার্বি ম্যাচে সল্টলেক স্টেডিয়ামে এক লক্ষ কুড়ি হাজার দর্শকের সামনে রঞ্জন তার পুরোনো দলের বিরুদ্ধে খেলতে নামে।

নিজের জেদ ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে রঞ্জন দুর্দান্ত খেলে এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে একটি দর্শনীয় গোল করে নতুন দলকে জিতিয়ে দেয়। কিন্তু গোল করার পর সাজঘরে ফিরে রঞ্জনের মনে কোনো আনন্দ বা জয়ের উল্লাস থাকে না। বরং, পনেরো বছর যে ক্লাবকে সে ভালোবেসেছে, আজ সেই নিজের ভালোবাসার ক্লাবকে হারিয়ে তার মনে হয় সে নিজেই নিজের কাছে হেরে গেছে। অপমানের বদলা নিতে গিয়ে সে অন্তরের কাছে চরম 'পরাজয়' বরণ করে এবং ড্রেসিংরুমে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকে।

১. হাতে কলমে (লেখক পরিচিতি)

১.১ শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম বইয়ের নাম লেখো।

শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম বইয়ের নাম 'দেরারি' (উপন্যাস)।

১.২ কলকাতার ফুটবল নিয়ে লেখা তাঁর দুটি বইয়ের নাম লেখো।

কলকাতার ফুটবল নিয়ে লেখা তাঁর দুটি বই হলো— 'ক্লাবের নাম মোহনবাগান' এবং 'ক্লাবের নাম ইস্টবেঙ্গল'।

২. একটি বাক্যে উত্তর দাও

৮ টি
২.১ 'এত দুঃখ এত ব্যথা সে কখনও পায়নি।'- এখানে কার দুঃখ-বেদনার কথা বলা হয়েছে?

এখানে কলকাতা ময়দানের প্রবীণ ও স্বনামধন্য ফুটবলার রঞ্জন সরকারের দুঃখ-বেদনার কথা বলা হয়েছে।

২.২ 'রঞ্জনদা তুমি কাল ক্লাবে যাওনি?' এই প্রশ্নের উত্তরে রঞ্জন কী বলেছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরে অভিমানী রঞ্জন মিথ্যে করে বলেছিল, "না রে! কাল সকালেই আমায় কলকাতার বাইরে যেতে হয়েছিল।"

২.৩ গঙ্গার পাড়ে গিয়ে কোন দৃশ্য রঞ্জনের চোখে ভেসে উঠল?

গঙ্গার পাড়ে গিয়ে রঞ্জন দেখল গাছের পাতায় ঝিরঝিরে হাওয়া, গঙ্গার জলে ছোটো ঢেউ, দূরে নোঙর করা ছোটো-বড়ো জাহাজ, যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা নৌকো এবং শুনতে পেল পাতার আড়ালে ঢাকা কোকিলের ডাক।

২.৪ 'সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর রঞ্জনের মন অনেকটা শান্ত হলো।' -এখানে রঞ্জনের কোন সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে?

রঞ্জন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, সে আর দুটি দিন অপেক্ষা করবে; এর মধ্যে ক্লাবের কেউ যোগাযোগ না করলে সে ক্লাব ছেড়ে দেবে, তবে খেলা ছাড়বে না— এই সিদ্ধান্তের কথাই এখানে বলা হয়েছে।

২.৫ 'ঘোষদা একটা বড়ো খবর আছে।'- কী সেই 'বড়ো খবর'?

বড়ো খবরটি হলো, বিপক্ষ দলের নির্ভরযোগ্য এবং ১৫ বছরের পুরোনো স্ট্রাইকার রঞ্জন সরকার তাদের ক্লাবে (ঘোষদাদের ক্লাবে) আসতে চাইছে।

২.৬ 'রঞ্জনের দলবদল করার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে টনক নড়েছিল ক্লাবকর্তাদের।' - কীভাবে ক্লাবকর্তাদের যে টনক নড়েছে, তা বোঝা গেল?

খবর পেয়ে ক্লাবকর্তারা রঞ্জনের বাড়িতে ছুটোছুটি শুরু করেন, ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং রঞ্জনের অনুগামী ছোটো খেলোয়াড়দের দিয়ে তার মত বদলানোর চেষ্টা করেন, যা থেকে তাঁদের টনক নড়ার বিষয়টি বোঝা যায়।

২.৭ 'ব্যাপারটা কী হলো বুঝতে একটু সময় লাগল সমর্থকদের।' এখানে কোন ব্যাপারটার কথা বলা হয়েছে?

খেলার শেষ মুহূর্তে রঞ্জন চকিতে ঘুরে গিয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাক-ভলিতে বুলেটের মতো শটে যে গোলটি করেছিল, সেই অভাবনীয় গোলের ব্যাপারটি বুঝতে সমর্থকদের একটু সময় লেগেছিল।

২.৮ 'দুহাতে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল একটা বেঞ্চিতে।' স্ট্রাইকার রঞ্জন সরকারের এমনভাবে শুয়ে পড়ার কারণ কী?

পনেরো বছরের প্রাণের ক্লাবকে নিজেরই করা গোলে হারিয়ে দেওয়ার পর রঞ্জনের মনে তীব্র কষ্ট ও যন্ত্রণা দলা পাকিয়ে ওঠে, তাই অপমানের বদলা নিয়েও নিজের বিবেকের কাছে হেরে গিয়ে সে ড্রেসিংরুমে কেঁদে ফেলেছিল।

৩. সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও

৯ টি
৩.১ একটু আগেও সবকটা কাগজে বারপুজোর রিপোর্ট পড়েছে। এখানে 'ও' বলতে কার কথা বোঝানো হয়েছে? সে সবকটা কাগজে একই বিষয়ের রিপোর্ট পড়ল কেন?

এখানে 'ও' বলতে ফুটবলার রঞ্জন সরকারের কথা বোঝানো হয়েছে।

রঞ্জন গত পনেরো বছর ধরে যে ক্লাবের হয়ে খেলছে, পয়লা বৈশাখ সেই ক্লাবের বারপুজোয় তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এই অপ্রত্যাশিত অপমানে সে মর্মাহত হয়েছিল। তাই খবরের কাগজে বারপুজোর রিপোর্ট ও ছবিগুলো খুঁটিয়ে পড়ে সে দেখতে চাইছিল যে, তাদের ক্লাবের ওই অনুষ্ঠানে ঠিক কে কে উপস্থিত ছিল।

৩.২ 'ওকে নিয়ে মাতামাতিটা ঠিক আগের মতো আর নেই।'- আগে 'ওকে' নিয়ে কী ধরনের মাতামাতি হতো?

রঞ্জন ছিল ক্লাবের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং তারকা খেলোয়াড়। আগে বারপুজোর দিনে প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি থেকে শুরু করে ফুটবল সেক্রেটারি— সবাই তাকে বারবার ফোন করত। কেউ কেউ বাড়িতেও আসত। পয়লা বৈশাখ সাতসকালে মাঠে যাওয়ার জন্য তার বাড়িতে ক্লাবের গাড়ি এসে হাজির হতো। রঞ্জনকে ঘিরে ক্লাবে এক চূড়ান্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাতামাতি চলত।

৩.৩ 'ঠিক এক বছর আগের ঘটনা।'- একবছর আগে কোন ঘটনা ঘটেছিল?

এক বছর আগে রঞ্জন অনুভব করেছিল যে, ক্লাবে তাকে নিয়ে মাতামাতি যেন কিছুটা কমে গেছে। তার মনে সন্দেহ জেগেছিল যে ক্লাবে তার কদর হয়তো কমছে। কিন্তু সেই সময় ফুটবল সেক্রেটারি ও কোচ রঞ্জনের বাড়িতে এসে দল গড়া নিয়ে এবং কাকে কাকে টিমে নেওয়া যায় তা নিয়ে রঞ্জনের সঙ্গে দীর্ঘ পরামর্শ করেছিলেন। ফলে রঞ্জনের মনের সমস্ত সন্দেহ ও অভিমানের মেঘ কেটে গিয়েছিল।

৩.৪ 'রঞ্জন সারাটা দিন আর বাড়ি থেকে বেরোয়নি।' - কোন দিনের কথা বলা হয়েছে?

এখানে পয়লা বৈশাখের কথা বলা হয়েছে। যেদিন রঞ্জনের নিজের ক্লাবে খুব ধুমধাম করে বারপুজো অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু রঞ্জনকে কেউ আমন্ত্রণ জানায়নি বা গাড়ি পাঠায়নি। চরম অপমানিত ও অভিমানী হয়ে রঞ্জন ওইদিন হালখাতার কোনো নেমন্তন্নেও যায়নি, সারাটা দিন বাড়িতেই গুমরে কাটিয়েছে।

৩.৫ 'রঞ্জন নামগুলো পড়ার চেষ্টা করে।'- রঞ্জন কোন নামগুলি পড়ার চেষ্টা করে?

ক্লাবে আমন্ত্রণ না পেয়ে রঞ্জন মানসিক অশান্তিতে গাড়ি নিয়ে গঙ্গার ঘাটে চলে যায়। সেখানে একটা বেঞ্চিতে বসে সে গঙ্গার জলে নোঙর করে থাকা ছোটো-বড়ো জাহাজগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করছিল। আসলে এটি ছিল তার ভেতরের কষ্ট ও অস্বস্তি কাটানোর একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

৩.৬ 'রঞ্জন টেলিফোনটা রেখে দিলো।' কোন কথা শুনে রঞ্জন টেলিফোনটা রেখে দিলো?

অপমানিত রঞ্জন তৃতীয় দিন রাতে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদাকে ফোন করেছিল। রঞ্জনের কাছে বারপুজোয় আমন্ত্রণ না পাওয়ার কথা শুনে স্বপনদা বিস্মিত হয়ে বলেন, "তুমি যে ওদের জন্যে তোমার জীবন দিয়ে দিয়েছ!" এবং জানান যে তিনি আধ ঘণ্টার মধ্যেই রঞ্জনের বাড়িতে আসছেন। স্বপনদার এই আসার কথা শুনেই রঞ্জন টেলিফোনটা রেখে দেয়।

৩.৭ 'সত্যি ওরা তোমার সঙ্গে উচিত কাজ করেনি!'- কোন অনুচিত কাজের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে?

রঞ্জন গত পনেরো বছর ধরে লক্ষ লক্ষ টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মাতৃজ্ঞানে তার বর্তমান ক্লাবে খেলেছে। কিন্তু খেলোয়াড় জীবনের শেষ লগ্নে এসে ক্লাবকর্তারা তাকে চরম অবহেলা করেছেন। বারপুজোর অনুষ্ঠানে তাকে একটি ফোন পর্যন্ত করেননি বা ডাকেননি। এই চূড়ান্ত অপমানজনক এবং অকৃতজ্ঞ আচরণের প্রতিই 'অনুচিত কাজ' হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে।

৩.৮ 'মন স্থির করে ফেলেছ তো?'- উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কোন বিষয়ে মনস্থির করে ফেলেছে?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অর্থাৎ রঞ্জন সরকার তার পনেরো বছরের পুরোনো প্রাণের ক্লাবকে ছেড়ে দিয়ে বিপক্ষ বড়ো ক্লাবে (স্বপনদাদের দলে) যোগ দেওয়ার বিষয়ে মনস্থির করে ফেলেছে। পুরোনো ক্লাবের চূড়ান্ত অপমানের বদলা নিতেই সে এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

৩.৯ 'আপনি সব ব্যবস্থা করুন।' কোন ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে?

রঞ্জন স্বপনদাকে তার দলবদলের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। রঞ্জন স্থির করেছে যে সে দলবদলের প্রথম দিনেই সই করে তার পুরোনো ক্লাবকে চরম শিক্ষা দেবে। তাই স্বপনদাকে সে অবিলম্বে সই করার এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

৪. নিজের ভাষায় উত্তর দাও

৮ টি
৪.১ 'রাগে ফুঁসছিল রঞ্জন।' তার এই রাগের কারণ কী?

রঞ্জন সরকারের রাগের প্রধান কারণ ছিল তার প্রাণের ক্লাবের তরফ থেকে পাওয়া চরম উপেক্ষা ও অপমান। রঞ্জন পনেরো বছর ধরে অন্য ক্লাবের লক্ষ লক্ষ টাকার লোভ ফিরিয়ে দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের ক্লাবে খেলেছে। কিন্তু খেলোয়াড় জীবনের শেষ লগ্নে এসে ক্লাবের নববর্ষের 'বারপুজো' অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, এমনকি একটা ফোন করেও সৌজন্য দেখানো হয়নি। এই চরম অবহেলা ও অকৃতজ্ঞতা রঞ্জন মেনে নিতে পারেনি। খবরের কাগজে বারপুজোর ছবি ও রিপোর্ট দেখে তার জমানো অভিমান তীব্র রাগে পরিণত হয়েছিল।

৪.২ 'এত দুঃখ, এত ব্যথা সে কখনও পায়নি।' এই দুঃখ-যন্ত্রণার দিনে কীভাবে অতীতের সুন্দর দিনগুলির কথা রঞ্জনের মনে এসেছে?

বারপুজোয় ডাক না পেয়ে রঞ্জন চরম মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। সেই তীব্র দুঃখের মুহূর্তে অতীতের স্মৃতিগুলো তার মনে ভিড় করে আসে। সে ভাবে, গত পনেরো বছর ধরে বারপুজোর আগে প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি নিজে তাকে ফোন করতেন, অনেকে বাড়িতে আসতেন। নববর্ষের সকালে ক্লাবের গাড়ি তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকত এবং সে স্নান সেরে তৈরি হয়ে সানন্দে সেই গাড়িতে মাঠে যেত। গত বছরও কোচ ও সেক্রেটারি দল গড়া নিয়ে তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। অতীতের সেই সম্মান ও মাতামাতির দিনগুলোর সঙ্গে বর্তমানের এই রিক্ততা ও অবহেলার বৈপরীত্যই রঞ্জনের মনে গভীর ব্যথার সৃষ্টি করেছিল।

৪.৩ রঞ্জনের ক্লাবের সঙ্গে তার পনেরো বছরের সম্পর্ক কীভাবে ছিন্ন হলো? এই বিচ্ছেদের জন্য কাকে তোমার দায়ী বলে মনে হয়?

ক্লাবের বারপুজোতে অপ্রত্যাশিতভাবে ব্রাত্য থাকার পর রঞ্জন বুঝতে পারে ক্লাবে তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। অপমানে জর্জরিত রঞ্জন দুই দিন অপেক্ষা করার পর যখন দেখে ক্লাব থেকে কেউ কোনো যোগাযোগ করল না, তখন সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদাকে ফোন করে। স্বপনদার সাহায্যে দলবদলের প্রথম দিনেই রঞ্জন তার পনেরো বছরের পুরোনো ক্লাব ছেড়ে নতুন ক্লাবে সই করে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

দায়ী কে: এই বিচ্ছেদের জন্য মূলত পুরোনো ক্লাবের বর্তমান কর্তারাই দায়ী। তাঁরা প্রবীণ ও একনিষ্ঠ খেলোয়াড়কে তাঁর প্রাপ্য নূন্যতম সম্মানটুকু দেননি। তবে, রঞ্জনের অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা ও জেদও এই দ্রুত বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছে।

৪.৪ 'কী করবে ও ঠিক করে ফেলেছে।'- এখানে কার কথা বলা হয়েছে? সে কী ঠিক করে ফেলেছে? তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সে পরবর্তী সময়ে চলতে পারল কি?

এখানে রঞ্জন সরকারের কথা বলা হয়েছে।

গঙ্গার ঘাটে বসে মানসিক দ্বন্দ্বের পর রঞ্জন ঠিক করেছিল যে, সে আরও দুটি দিন অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে ক্লাবের কেউ যোগাযোগ না করলে সে ক্লাব ছেড়ে দেবে। কিন্তু সে খেলা ছাড়বে না; মাঠে নেমেই সে প্রমাণ করে দেবে যে সে ফুরিয়ে যায়নি।

সিদ্ধান্ত পালন: হ্যাঁ, রঞ্জন তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে পেরেছিল। দু-দিন অপেক্ষার পর কেউ যোগাযোগ না করায় সে অন্য বড়ো ক্লাবে সই করে। এবং মরশুমের প্রথম ডার্বি ম্যাচেই দুর্দান্ত ব্যাক-ভলিতে গোল করে সে প্রমাণ করে দেয় যে খেলোয়াড় হিসেবে সে আজও ফুরিয়ে যায়নি।

৪.৫ 'তৃতীয় দিন রাত্তিরে টেলিফোন করল অন্য বড়ো ক্লাবের সেক্রেটারিকে।' কোন দিন থেকে 'তৃতীয় দিন'-এর কথা বলা হয়েছে? এই দিন তিনেক সময় তার কীভাবে কেটেছে? টেলিফোনটি করায় কোন পরিস্থিতি তৈরি হলো?

পয়লা বৈশাখে ক্লাবের বারপুজোর দিন থেকে হিসাব করে 'তৃতীয় দিন'-এর কথা বলা হয়েছে।

দিন কাটানোর বিবরণ: এই তিন দিন রঞ্জনের নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় কেটেছে। সে অফিস ছাড়া আর কোথাও যায়নি, কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলেনি। সে প্রচণ্ড টেনশন নিয়ে বাড়িতে টেলিফোনের কাছে অপেক্ষা করেছিল, যদি পুরোনো ক্লাবের কেউ ফোন করে। কিন্তু কেউ করেনি।

পরিস্থিতি: টেলিফোনটি করায় বিপক্ষ ক্লাবের সেক্রেটারি স্বপনদা অবিলম্বে রঞ্জনের বাড়িতে ছুটে আসেন। স্বপনদা ও ঘোষদা মিলে রঞ্জনের রাগকে উসকে দিয়ে দলবদলের সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেন। ফলস্বরূপ, বাংলার ফুটবল মহলকে চমকে দিয়ে দলবদলের প্রথম দিনেই রঞ্জন তার পুরোনো ক্লাব ছেড়ে দেয়।

৪.৬ 'দুই প্রধানের লড়াইকে কেন্দ্র করে অনেক বছর পরে কলকাতা আবার মেতে উঠেছে।' গল্প অনুসরণে সেই লড়াইয়ের উত্তেজনাপূর্ণ ফুটবল ম্যাচের বিবরণ দাও।

সল্টলেক স্টেডিয়ামে এক লক্ষ কুড়ি হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে দুই প্রধানের লড়াই শুরু হয়। ম্যাচের প্রধান আকর্ষণ ছিল নিজের পুরোনো ক্লাবের বিরুদ্ধে রঞ্জনের খেলা। প্রথমার্ধে রঞ্জনের পুরোনো ক্লাব রক্ষণাত্মক কৌশল নেয়, প্রায় দশজন খেলোয়াড় নীচে নেমে রঞ্জনকে কড়া পাহারায় রাখে। রঞ্জন একা লড়লেও সতীর্থদের সাহায্য পাচ্ছিল না।

দ্বিতীয়ার্ধে খেলা জমে ওঠে। পুরোনো দল আক্রমণ শুরু করলে রঞ্জন ফাঁকা জায়গা পেয়ে যায়। খেলার শেষ লগ্নে রঞ্জন নিজেদের হাফলাইনের নীচে নেমে আসে। গোলরক্ষকের বাড়ানো বল ধরে সে দুলকি চালে এগিয়ে বলটা সমরকে দেয়। সমর কোনাকুনি বল বাড়ালে, রঞ্জন তা ধরে পেনাল্টি বক্সের কাছে গিয়ে আবার সমরের মাথায় লব করে। সমর হেড দিয়ে বল ভাসিয়ে দিলে, রঞ্জন চকিতে ঘুরে গিয়ে এক অবিশ্বাস্য ব্যাক-ভলিতে বুলেটের গতিতে বল জালে জড়িয়ে দেয়। স্টেডিয়াম জুড়ে তখন বাজির শব্দ আর উল্লাস।

৪.৭ 'বলটা বুলেটের মতো ছুটে গিয়ে ঢুকে গেল গোলে।'- এরপর সমর্থক আর সহ-খেলোয়াড়দের উল্লাসের বিপ্রতীপে রঞ্জনের বিষণ্ণতার কোন রূপ গল্পে ফুটে উঠেছে?

অসাধারণ গোল করে দলকে জিতিয়ে দেওয়ার পর যখন সারা গ্যালারি এবং সহ-খেলোয়াড়রা চরম উল্লাসে ফেটে পড়েছিল, তখন রঞ্জনের মনে নেমে এসেছিল এক গভীর বিষণ্ণতা। সাজঘরে ফিরে সে এক কোণে মাথা নিচু করে বসে পড়ে। কেউ কোল্ড ড্রিঙ্কস দিলে সে যন্ত্রের মতো হাত বাড়িয়ে নেয় কিন্তু মুখ তোলে না। সাংবাদিকদের অভিনন্দন বা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস কোনো কিছুই তার ভালো লাগছিল না। সে বুঝতে পারে, পনেরো বছর যে ক্লাবকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছে, আজ তাকে হারিয়ে সে এক পরম শূন্যতায় পৌঁছেছে। অপমানের বদলা নিতে গিয়ে সে নিজের বিবেকের কাছে, নিজের ভালোবাসার কাছে হেরে গেছে। তাই সে মুখ ঢেকে ড্রেসিংরুমে অঝোরে কাঁদতে থাকে।

৪.৮ গল্পের ঘটনা বিশ্লেষণ করে 'পরাজয়' গল্পের নামকরণের সার্থকতা প্রতিপন্ন করো।

সাহিত্যে নামকরণ সাধারণত বিষয়বস্তু, চরিত্র বা অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনাকে কেন্দ্র করে হয়। শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোচ্য গল্পের নাম 'পরাজয়' সম্পূর্ণ ব্যঞ্জনাধর্মী এবং সার্থক।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রঞ্জন সরকার তার ক্লাবের দ্বারা চরম অপমানিত হয়ে দলবদল করে। নতুন দলের হয়ে ডার্বি ম্যাচে সে তার পুরোনো ক্লাবের বিরুদ্ধে অসাধারণ গোল করে দলকে জেতায়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি রঞ্জনের চরম 'জয়' এবং তার অবজ্ঞাকারী পুরোনো ক্লাবের 'পরাজয়'। কিন্তু গল্পের শেষে দেখা যায়, জয়ের উল্লাসের বদলে রঞ্জন সাজঘরে বসে অঝোরে কাঁদছে। কারণ, সে পনেরো বছর ধরে যে ক্লাবকে মায়ের মতো ভালোবেসেছে, আজ জেদের বশে সেই ক্লাবেরই বুকে সে ছুরি চালিয়েছে। অপমানের বদলা নিতে গিয়ে তার ভেতরের খাঁটি খেলোয়াড় ও আবেগপ্রবণ মানুষটি নিজের ভালোবাসার কাছেই শোচনীয়ভাবে হেরে গেছে। এই আত্মিক পরাজয় এবং বিবেকের দংশনই গল্পের মূল সুর। তাই বাহ্যিক জয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অন্তর্নিহিত পরাজয়ের নিরিখে 'পরাজয়' নামকরণটি সর্বাঙ্গসুন্দর ও সার্থক।

৫. ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচার করো

শব্দবিশ্লেষণ / পরিবর্তন
চরকিচক্র > চক্কর > চরক্কর > চরকি (স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ)
সক্কালসকাল > সক্কাল (ব্যঞ্জনদ্বিত্ব বা সমীভবন)
নেমন্তন্ননিমন্ত্রণ > নেমন্তন্ন (সমীভবন ও স্বরসংগতি)
নম্বরনাম্বার > নম্বর (স্বরসংগতি)
ছুটোছুটিছোটাছুটি > ছুটোছুটি (স্বরসংগতি)

৬. সন্ধিবিচ্ছেদ করো

  • ৬.১ রূপান্তরিত = রূপ + অন্তর + ইত
  • ৬.২ পরিষ্কার = পরিঃ + কার
  • ৬.৩ পর্যন্ত = পরি + অন্ত
  • ৬.৪ পুরস্কার = পুরঃ + কার
  • ৬.৫ সন্তুষ্ট = সম্ + তুষ্ট

৭. কারক-বিভক্তি নির্ণয় করো

বাক্য ও রেখাঙ্কিত পদকারক ও বিভক্তি
৭.১ রঞ্জন ঘরের মধ্যে চরকির মতো ঘুরছে।অধিকরণ কারকে 'এর' বিভক্তি + 'মধ্যে' অনুসর্গ
৭.২ গাড়ি পাঠানো তো দূরের কথা।কর্ম কারকে 'শূন্য' (০) বিভক্তি
৭.৩ সারাটা সকাল ও ছটফট করে বেড়িয়েছিল।অধিকরণ (কালাধিকরণ) কারকে 'শূন্য' (০) বিভক্তি
৭.৪ কানে ভেসে আসে পাখির ডাক।কর্ম কারকে 'শূন্য' (০) বিভক্তি
৭.5 রঞ্জন টেলিফোনটা রেখে দিল।কর্ম কারকে 'টা' নির্দেশক

৮. ক্রিয়ার কাল নির্দেশ করো

  • ৮.১ গুরুত্ব দেয়নি। = সাধারণ অতীত কাল
  • ৮.২ তুই চলে আয়। = বর্তমান অনুজ্ঞা
  • ৮.৩ কাল সকালে আমায় কলকাতার বাইরে যেতে হয়েছিল। = ঘটমান অতীত / পুরাঘটিত অতীত
  • ৮.৪ আমি রঞ্জন সরকার বলছি। = ঘটমান বর্তমান কাল
  • ৮.৫ রঞ্জনের মুখে খেলে গেল ম্লান হাসি। = সাধারণ অতীত কাল

৯. বাক্য পরিবর্তন করো

প্রদত্ত বাক্য ও নির্দেশপরিবর্তিত বাক্য
৯.১ এত দুঃখ, এত ব্যথা সে কখনও পায়নি। (হ্যাঁ-সূচক) এমন দুঃখ ও ব্যথাহীন অবস্থাতেই সে চিরকাল কাটিয়েছে।
৯.২ সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর রঞ্জনের মন অনেকটা শান্ত হলো। (জটিল) যখন রঞ্জন সিদ্ধান্তটা নিল, তখন তার মন অনেকটা শান্ত হলো।
৯.৩ সেই মুহূর্তে কলিংবেলটা বেজে উঠল। (যৌগিক) সেই মুহূর্তটি এল এবং কলিংবেলটা বেজে উঠল।
৯.৪ রঞ্জনের গলাটা একটু কেঁপে উঠল। (না-সূচক) রঞ্জনের গলাটা একটুও না-কেঁপে থাকল না।
৯.৫ যারা এতক্ষণ দেয়াল পিঠ দিয়ে লড়ছিল তারাই এখন রুখে দাঁড়াল। (সরল) এতক্ষণ দেয়ালে পিঠ দিয়ে লড়াকুরাই এখন রুখে দাঁড়াল।

আত্মিক দ্বন্দ্ব ও হার না মানা মানসিকতা

'পরাজয়' গল্পটি আমাদের শেখায় যে, খেলার মাঠে জয়-পরাজয় শুধুমাত্র গোলের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা ও আবেগ অনেক সময় পেশাদারিত্বের জয়কেও ম্লান করে দেয়। রঞ্জন সরকারের এই আত্মিক পরাজয় আসলে তার খাঁটি ক্রীড়াসত্ত্বা ও ক্লাবের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসারই এক করুণ প্রমাণ।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'পরাজয়' গল্পের মূল চরিত্র হলো কলকাতা ময়দানের প্রবীণ স্ট্রাইকার রঞ্জন সরকার।

ক্লাবের বারপুজোয় আমন্ত্রণ না পেয়ে চূড়ান্ত অপমানিত ও অবহেলিত বোধ করায় রঞ্জন সরকার জেদের বশে ১৫ বছরের পুরোনো ক্লাব ছেড়ে নতুন দলে যোগ দিয়েছিল।

নতুন দলের হয়ে দুর্দান্ত গোল করে ম্যাচ জিতলেও, নিজের প্রাণের পুরোনো ক্লাবকে হারিয়ে রঞ্জন বিবেকের কাছে হেরে যায় এবং ড্রেসিংরুমে কেঁদে ফেলে। এই আত্মিক পরাজয়কেই গল্পের নাম হিসেবে সার্থকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।