ভয় কি মরণে

চারণকবি মুকুন্দদাস রচিত 'ভয় কি মরণে' গানের সম্পূর্ণ লিরিক্স, সারাংশ, শব্দার্থ ও সহজ আলোচনা | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 29 May 2026 Last Update: 31 May 2026

⚔️ ভয় কি মরণে

মুকুন্দদাস স্বদেশি গান / কবিতা

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)

দেশপ্রেম হিন্দু-মুসলমান ঐক্য স্বাধীনতা সংগ্রাম স্বদেশি আন্দোলন

চারণকবি মুকুন্দদাস (১৮৭৮-১৯৩৪)

চারণকবি মুকুন্দদাসের আসল নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর দে। বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলনের যুগে তাঁর গান ও যাত্রা সারা বাংলায় বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর জ্বালাময়ী গান মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করত। 'ভয় কি মরণে' তাঁর রচিত এমনই একটি বিখ্যাত উদ্দীপনামূলক স্বদেশি গান।

কবিতা / গান

ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে,
মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে।।
তাথৈ তাথৈ থৈ দ্রিমি দ্রিমি দং দং,
ভূত পিশাচ নাচে যোগিনী সঙ্গে।
দানব-দলনী হয়ে উন্মাদিনী,
আর কি দানব থাকিবে বঙ্গে।।
সাজ রে সন্তান হিন্দু মুসলমান,
থাকে থাকিবে প্রাণ না হয় যাইবে প্রাণ।
লইয়ে কৃপাণ হও রে আগুয়ান,
নিতে হয় মুকুন্দে-রে নিয়ো রে সঙ্গে।।

গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দ অর্থ
মরণে মৃত্যুতে।
সন্তানে সন্তানদের (এক্ষেত্রে দেশবাসীকে বোঝানো হয়েছে)।
মাতঙ্গী দেবী দুর্গা বা কালীর রণরঙ্গিনী রূপ।
সমর রঙ্গে যুদ্ধের আনন্দে বা যুদ্ধের সাজে।
দানব-দলনী যিনি দানব বা অসুরদের দমন বা বিনাশ করেন (এখানে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসককে দানব বলা হয়েছে)।
উন্মাদিনী পাগলিনী, ক্ষ্যাপা।
বঙ্গে বঙ্গদেশে বা বাংলায়।
কৃপাণ খড়্গ, তলোয়ার বা অস্ত্র।
আগুয়ান এগিয়ে যাওয়া, অগ্রসর হওয়া।

গানের সারাংশ ও বিষয়বস্তু

অষ্টম শ্রেণির পাঠ্য 'ভয় কি মরণে' গানটি চারণকবি মুকুন্দদাস রচিত একটি উদ্দীপনামূলক স্বদেশি গান। পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গানটি দেশবাসীকে মৃত্যুর ভয় তুচ্ছ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানায়।

কবির মতে, দেশমাতৃকা আজ রণরঙ্গিনী 'মাতঙ্গী' (দেবী কালী বা দুর্গা) রূপ ধারণ করেছেন। অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসক রূপী 'দানবদের' ধ্বংস করার জন্য তিনি উন্মাদিনী হয়ে উঠেছেন। তাঁর এই প্রলয় নাচের তালে তালে ভূত, পিশাচ ও যোগিনীরাও মেতে উঠেছে। মাতৃভূমির এই রুদ্র রূপ দেখে কবি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, বাংলায় আর কোনো দানব বা অত্যাচারী শাসক টিকতে পারবে না।

এই স্বাধীনতা সংগ্রামে কবি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সন্তানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধে প্রাণ থাকতেও পারে, আবার চলেও যেতে পারে—তাই প্রাণের মায়া করলে চলবে না। হাতে তলোয়ার (কৃপাণ) নিয়ে সবাইকে বীরদর্পে সামনের দিকে এগিয়ে (আগুয়ান) যেতে হবে। পরিশেষে কবি মুকুন্দদাস নিজেও দেশবাসীর এই মহামিছিলে সঙ্গী হওয়ার আকুল বাসনা প্রকাশ করেছেন।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ

"মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে" — কথাটির তাৎপর্য কী?

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী 'মাতঙ্গী' হলেন দশমহাবিদ্যার নবম বিদ্যা বা রণরঙ্গিনী দেবী। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের সীমাহীন অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেশমাতা যেন স্বয়ং এই প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করেছেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য দেশজুড়ে যে সশস্ত্র সংগ্রামের উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকেই কবি দেবীর 'সমর রঙ্গে' বা যুদ্ধের আনন্দে মেতে ওঠার রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

"দানব-দলনী হয়ে উন্মাদিনী / আর কি দানব থাকিবে বঙ্গে" — এখানে 'দানব' বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?

এখানে 'দানব' বলতে ভারতবর্ষকে শাসন ও শোষণ করা অত্যাচারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বোঝানো হয়েছে। দেবী যেমন অসুর বা দানবদের বিনাশ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন, তেমনি বাংলার বিপ্লবীরা দেশমাতার আশীর্বাদ নিয়ে ব্রিটিশ রূপী দানবদের বাংলা থেকে চিরতরে উৎখাত করবে, এই প্রবল বিশ্বাসই এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।

কবি কেন 'হিন্দু মুসলমান' উভয়কেই ডাক দিয়েছেন?

স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের একার লড়াই নয়। ব্রিটিশ সরকার 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule) নীতির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। কবি মুকুন্দদাস বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই দুই সম্প্রদায়ের ঐক্য ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভব। তাই তিনি হিন্দু ও মুসলমান উভয়কেই দেশমাতার সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

স্বদেশ প্রেমের অগ্নিশিখা

'ভয় কি মরণে' গানটি শুধু একটি সাধারণ কবিতা নয়, এটি ছিল পরাধীন ভারতের মুক্তি সংগ্রামীদের প্রাণের মন্ত্র। চারণকবি মুকুন্দদাস তাঁর গানে মৃত্যুর ভয়কে জয় করার যে অদম্য সাহসের বাণী শুনিয়েছিলেন, তা আজও প্রতিটি ভারতবাসীর মনে গভীর দেশপ্রেম ও ঐক্যের শিহরণ জাগায়।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'ভয় কি মরণে' গানটির রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত চারণকবি মুকুন্দদাস। তাঁর আসল নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর দে।

গানটিতে 'দানব' বলতে পরাধীন ভারতবর্ষের অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসক ও শোষকদের বোঝানো হয়েছে।

কবি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশমাতার সন্তান হিসেবে সশস্ত্র সংগ্রামে (যুদ্ধে) ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিয়েছেন।