পথচলতি

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় রচিত 'পথচলতি' গদ্যাংশের সম্পূর্ণ সারাংশ, হাতে-কলমে প্রশ্নোত্তর ও ব্যাকরণ | অষ্টম শ্রেণি (WBBSE)

Shilpi Mondal
Shilpi Mondal
Uploaded: 27 May 2026 Last Update: 31 May 2026

🚂 পথচলতি

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভ্রমণ কাহিনি / স্মৃতিচারণ

পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE) • তৃতীয় পাঠ

দেহরা-দুন এক্সপ্রেস ফারসি ও পশতু ভাষা কাবুলিওয়ালা সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭)

ভাষাতাত্ত্বিক, বহুভাষাবিদ এই পণ্ডিত ও অধ্যাপকের জন্ম হাওড়ার শিবপুরে। তিনি 'The Origin and Development of the Bengali Language' (ODBL) গ্রন্থ রচনার জন্য বিশ্বব্যাপী স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর রচিত অন্যান্য বিখ্যাত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— 'দ্বীপময় ভারত ও শ্যামদেশ', 'ইউরোপ ভ্রমণ', 'সাংস্কৃতিকী' প্রভৃতি। তাঁর আত্মজীবনী 'জীবনকথা' একটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য গ্রন্থ।

১. কবি পরিচিতি থেকে প্রশ্নোত্তর

১.১ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীর নাম কী?

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আত্মজীবনীর নাম হলো 'জীবনকথা'।

১.২ ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে কোন গ্রন্থ রচনার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন?

ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে 'The Origin and Development of the Bengali Language' (ODBL) নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।

২. একটি বাক্যে উত্তর দাও

১০ টি
২.১ লেখকের কোন ট্রেন ধরার কথা ছিল?

লেখকের দেহরা-দুন এক্সপ্রেস ট্রেনটি ধরার কথা ছিল।

২.২ একটা তৃতীয় শ্রেণির বগির কাছে একেবারেই লোকের ভিড় নেই কেন?

কারণ, সেই বিরাট তৃতীয় শ্রেণির বগিটি গুটিকতক জবরদস্ত চেহারার কাবুলিওয়ালার দখলে ছিল, যারা হুংকার দিয়ে অন্য যাত্রীদের ঠেকিয়ে রাখছিল।

২.৩ পাঠানদের মাতৃভাষা কী?

কাবুলিওয়ালা বা পাঠানদের মাতৃভাষা হলো পশতু।

২.৪ বৃদ্ধ পাঠানের ডেরা বাংলাদেশের কোথায় ছিল?

বৃদ্ধ পাঠানের ব্যবসার ডেরা বাংলাদেশের (তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা) বরিশালের পটুয়াখালি বন্দরে ছিল।

২.৫ খুশ-হাল খাঁ খট্টক কে ছিলেন?

খুশ-হাল খাঁ খট্টক ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের সমসাময়িক এবং পাঠানদের পশতু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি।

২.৬ আদম খাঁ ও দুরখানির কিসসার কাহিনি কেমন?

আদম খাঁ ও দুরখানির কিসসা হলো একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বা দিল-ভাঙা প্রেমের বা মহব্বতের কাহিনি।

২.৭ এই পাঠ্যে কোন বাংলা মাসিকপত্রের উল্লেখ আছে?

এই পাঠ্যে 'প্রবর্তক' নামক বাংলা মাসিকপত্রের উল্লেখ আছে।

২.৮ রোজার উপোসের আগে কাবুলিওয়ালারা ভরপেট কী খেয়েছিলেন?

রোজার উপোসের আগে কাবুলিওয়ালারা খুব ভোরে উঠে ভরপেট বড়ো-বড়ো পাঠান 'রোটা' (রুটি) আর কাবাব খেয়েছিলেন।

২.৯ 'তসবিহ' শব্দের অর্থ কী?

'তসবিহ' শব্দের অর্থ হলো জপমালা বা মালা, যা গুনে ঈশ্বরের নাম জপ করা হয়।

২.১০ আরবি ভাষায় ঈশ্বরের নিরানব্বইটি পবিত্র ও সুন্দর নামকে কী বলা হয়?

আরবি ভাষায় ঈশ্বরের নিরানব্বইটি পবিত্র ও সুন্দর নামকে 'নব্বদ-ও-নও অসমা-ই-হাসানা' বলা হয়।

৩. সন্ধি বিচ্ছেদ করো

হুংকারহুম্ + কার
স্বস্তিসু + অস্তি
বিষয়ান্তরবিষয় + অন্তর

৪. প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় করো

ফিরতিফির্ (ধাতু) + তি (কৃৎ প্রত্যয়)
আভিজাত্যঅভিজাত (শব্দ) + য (তদ্ধিত প্রত্যয়)
জবরদস্তজবর (শব্দ) + দস্ত (ফারসি প্রত্যয়)
নিবিষ্টনি (উপসর্গ) + বিষ্ (ধাতু) + ত (কৃৎ প্রত্যয়)
উৎসাহিতউৎসাহ (শব্দ) + ইত (তদ্ধিত প্রত্যয়)

৫. ব্যাসবাক্য সহ সমাস নির্ণয়

সমস্ত পদব্যাসবাক্যসমাসের নাম
শীতবস্ত্রশীত নিবারণের নিমিত্ত বস্ত্রনিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস / মধ্যপদলোপী কর্মধারয়
মাতৃভাষামাতার মুখ থেকে শেখা ভাষা
(বা) মাতার ন্যায় ভাষা
মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
(বা) উপমিত কর্মধারয়
শিশুসুলভশিশুর ন্যায় সুলভউপমান কর্মধারয় সমাস
ত্রিসীমানাত্রি (তিন) সীমানার সমাহারদ্বিগু সমাস

৬. নির্দেশ অনুযায়ী বাক্য পরিবর্তন

প্রদত্ত বাক্যপরিবর্তিত বাক্য
৬.১ গাড়িতে সেদিন অসম্ভব ভিড় দেখা গেল। (না-সূচক বাক্যে)গাড়িতে সেদিন তিল ধারণের জায়গা ছিল না। (অথবা) গাড়িতে সেদিন ভিড়ের অভাব ছিল না।
৬.২ কাবুলিওয়ালা পাঠানদের মাতৃভাষা পশতুর সম্মান তখন ছিল না। (প্রশ্নবোধক বাক্যে)কাবুলিওয়ালা পাঠানদের মাতৃভাষা পশতুর সম্মান তখন কী আর ছিল?
৬.৩ কলকাতার ভাষা তাঁর আয়ত্ত হয়নি। (জটিল বাক্যে)যেটি কলকাতার ভাষা, সেটি তাঁর আয়ত্ত হয়নি।
৬.৪ দুই-একজন মাঝে-মাঝে এক-আধ লবজ ফারসি বললে বটে, কিন্তু এদের বিদ্যেও বেশিদূর এগোল না। (সরল বাক্যে)দুই-একজন মাঝে-মাঝে এক-আধ লবজ ফারসি বললেও এদের বিদ্যে বেশিদূর এগোল না।
৬.৫ বাংলাদেশে তোমার ডেরা কোথায়? (নির্দেশক বাক্যে)বাংলাদেশে তোমার ডেরা কোথায়, তা জানতে চাই।

৭. প্রসঙ্গ উল্লেখ করে টীকা লেখো

কাবুলিওয়ালাআফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের অধিবাসীদের বলা হয়। ভারতে এরা মূলত হিং, মেওয়া বিক্রি এবং সুদে টাকা ধার দেওয়ার ব্যবসা করত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গল্পের নামও 'কাবুলিওয়ালা'।
পশতুএটি আফগানিস্তানের পাঠান উপজাতিদের মাতৃভাষা। এর লোকসাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ।
ফারসিপ্রাচীন পারস্য বা বর্তমান ইরানের ভাষা। আফগানিস্তানের শিক্ষিত সমাজের, সরকারি কাজকর্মের এবং আভিজাত্যের ভাষাও হলো ফারসি।
আফগানিস্থানভারতের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি পার্বত্য দেশ। এখানকার অধিবাসীদের আফগান বা পাঠান বলা হয়।
বরিশালবর্তমান বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য জেলা ও বন্দর নগরী। এটি ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত।
গজলআরবি ও ফারসি সাহিত্যে উদ্ভূত এক প্রকারের প্রেমের বা ভক্তিমূলক গীতিকবিতা। পশতু ভাষাতেও এর প্রচলন আছে।
উর্দুমূলত আরবি, ফারসি ও হিন্দি শব্দের সংমিশ্রণে সৃষ্ট একটি ভারতীয় ভাষা। এটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
নমাজইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ঈশ্বরের (আল্লাহর) প্রতি প্রাত্যহিক উপাসনা বা প্রার্থনা। দিনে পাঁচবার এটি পালন করা হয়।

৮. কয়েকটি বাক্যে উত্তর লেখো

৮.১ স্টেশনে পৌঁছে লেখক কী দেখেছিলেন?

গয়া স্টেশন থেকে দেহরা-দুন এক্সপ্রেস ধরার জন্য স্টেশনে পৌঁছে লেখক দেখেন যে, ট্রেনটি যথাসময়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু তাতে অসম্ভব ভিড়। মধ্যম শ্রেণির কামরায় ঢোকা তো দূরের কথা, দ্বিতীয় শ্রেণির গাড়িতেও মানুষ মেঝেতে বিছানা করে বসে বা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

৮.২ দু-চারটি ফারসি কথা বলতে পারার ক্ষমতা লেখককে কী রকম সাহস দিয়েছিল?

লেখক দেখলেন তৃতীয় শ্রেণির একটি বড়ো বগি কয়েকজন জবরদস্ত কাবুলিওয়ালা দখল করে হুংকার দিয়ে লোক ঠেকাচ্ছে। কিন্তু লেখক জানতেন, ফারসি ভাষা আফগানিস্তানের শিক্ষিত ও অভিজাত সমাজের ভাষা। তিনি ভাবলেন, একজন সাধারণ বাঙালির মুখে ফারসি কথা শুনলে পাঠানরা চমকে যাবে এবং খুশি হয়ে তাঁকে অন্তত বসার জায়গাটা করে দেবে। এই ভাষাগত জ্ঞানই তাঁকে সেই কামরায় ওঠার সাহস জুগিয়েছিল।

৮.৩ 'আলেম' শব্দের মানে কী? লেখককে কারা, কেন 'এক মস্ত আলেম' ভেবেছিলেন?

'আলেম' শব্দের অর্থ হলো সর্বজ্ঞানী বা মহাপণ্ডিত।

জবরদস্ত ও অশিক্ষিত পাঠান যাত্রীরা লেখককে 'মস্ত আলেম' ভেবেছিল। কারণ, তাদের মাতৃভাষা পশতু হলেও তারা জানত যে ফারসি হলো উচ্চশিক্ষিতদের ভাষা। লেখক যখন অনর্গল ফারসি ভাষায় তাদের হুংকারের জবাব দিচ্ছিলেন, তখন তারা ভেবেছিল এই বাঙালি বাবু নিশ্চয়ই অনেক বড়ো পণ্ডিত মানুষ।

৮.৪ আগা-সাহেব সম্বন্ধে যা জানা গেল, সংক্ষেপে লেখো।

আগা-সাহেব ছিলেন একজন বৃদ্ধ পাঠান। তাঁর ব্যবসার মূল ডেরা বা কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের (তৎকালীন) বরিশালের পটুয়াখালি বন্দরে। তিনি শীতবস্ত্র ও হিং বিক্রি করতেন এবং চাষিদের সুদে টাকা ধার দিতেন। দীর্ঘদিন বরিশালে থাকার কারণে তিনি চমৎকার 'বরিশাইল্যা' উপভাষায় কথা বলতে পারতেন। তিনি নমাজ পড়তেন এবং অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও ভদ্র মানুষ ছিলেন।

৮.৫ লেখকের সামনের বেঞ্চির দুই পাঠান সহযাত্রী নিজেদের মধ্যে যে আলোচনা করছিলেন তা নিজের ভাষায় লেখো। লেখক কীভাবে সেই কথার অর্থ বুঝতে পারলেন?

আলোচনা: সামনের বেঞ্চের দুই পাঠান নিজেদের ভাষায় বলাবলি করছিল যে, এই বাঙালি বাবু ভারি বিদ্বান ও বুদ্ধিমান। সে ইংরেজদের লেখা বই পড়ে এবং ফারসি ভাষা শিখে পাঠানদের ব্যাপারে অনেক খবর রাখে, এমনকি তাদের খাঁটি গ্রামের কথাও সে জানে।

বোঝার উপায়: লেখক পশতু ভাষা না জানলেও, সেই ভাষায় প্রচুর ফারসি ও আরবি শব্দের মিশ্রণ ছিল। লেখকের যেহেতু ফারসি ও উর্দু ভাষা জানা ছিল, তাই সেই পরিচিত শব্দগুলির সাহায্যেই তিনি তাদের আলোচনার মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন।

৯. নিজের ভাষায় উত্তর লেখো (বিশ্লেষণধর্মী)

৯.১ পাঠ্য গদ্যটির ভাবের সঙ্গে 'পথচলতি' নামটি কতখানি সংগতিপূর্ণ হয়েছে, বিচার করো।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা গদ্যাংশটি একটি রেল ভ্রমণের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত। গয়া থেকে কলকাতা ফেরার পথে দেহরা-দুন এক্সপ্রেসে উঠে কথক কয়েকজন কাবুলিওয়ালার সঙ্গে যাত্রা করেন। এই পথ চলার সময়ই সম্পূর্ণ অচেনা, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষদের সঙ্গে লেখকের আলাপ, সাহিত্য চর্চা এবং হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। যেহেতু পুরো কাহিনিটি একটি পথের অভিজ্ঞতা এবং পথে চলতে চলতেই এর বিকাশ ও সমাপ্তি ঘটেছে, তাই গদ্যটির 'পথচলতি' নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক ও সংগতিপূর্ণ।

৯.২ পাঠ্য গদ্যাংশটি থেকে কথকের চরিত্রের কোন বৈশিষ্ট্যগুলি তোমার চোখে ধরা পড়েছে বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে লেখো।

'পথচলতি' গদ্যাংশে কথক (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়)-এর চরিত্রের বেশ কয়েকটি উজ্জ্বল দিক ফুটে উঠেছে:

  • বহুভাষাবিদ ও পণ্ডিত: তিনি ফারসি, উর্দু, হিন্দি তো জানতেনই, সেইসঙ্গে পশতু ভাষার সাহিত্য (খুশ-হাল খাঁ খট্টকের গজল) নিয়েও তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল।
  • সাহসী ও প্রত্যুৎপন্নমতি: ভিড় ট্রেনে জবরদস্ত কাবুলিওয়ালাদের হুংকার শুনেও তিনি ভয় পাননি। বরং ফারসি ভাষার বুলি ছুঁড়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছিলেন।
  • উদার ও সংস্কৃতিমনস্ক: তিনি ধর্ম, জাতপাত বা পেশার বিচার না করে সাধারণ কাবুলিওয়ালাদের সঙ্গে মিশেছেন, তাদের সাহিত্য ও গান শুনেছেন এবং আন্তরিক আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন। তাঁর এই মানবপ্রীতি প্রশংসনীয়।
৯.৩ কথকের সঙ্গে কাবুলিওয়ালাদের প্রারম্ভিক কথোপকথনটি সংক্ষেপে বিবৃত করো।

কথক যখন ভিড় ঠেলে কাবুলিওয়ালাদের দখলে থাকা আধখোলা থার্ড ক্লাস বগিতে ওঠার চেষ্টা করেন, তখন তারা হুংকার দিয়ে বলে যে এই গাড়ি বাবুদের জন্য নয়, শুধু পাঠানদের জন্য। কথক বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে বিশুদ্ধ ফারসি ভাষায় উত্তর দেন— "আমাকে একজন মানুষের বসার জায়গা দাও।" ফারসি শুনে কাবুলিওয়ালারা থতমত খেয়ে যায় এবং মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। একজন ভাঙা ভাঙা ভাষায় জানতে চায়, "কী চাও?" কথক তখন তাচ্ছিল্যের সুরে ফারসিতে বলেন, "তোমরা আফগানিস্তানের কোন জায়গা থেকে আসছ যে ফারসিতে কথা বলার ক্ষমতাটুকু নেই?" এই কথা শুনে দলের ফারসি-জানা একটি ছোকরা তাঁকে সম্মানের সঙ্গে ভিতরে ডেকে নেয় এবং বসার জায়গা করে দেয়।

৯.৪ কথক কেন বলেছেন— 'যেন এক পশতু-সাহিত্য-গোষ্ঠী বা সম্মেলন লাগিয়ে দিলুম।'- সেই সাহিত্য সম্মেলনের বর্ণনা দাও।

ট্রেনের কামরায় জায়গা পাওয়ার পর কথক পাঠানদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা পশতু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি খুশ-হাল খাঁ খট্টকের গজল জানে কি না। একজন বাঙালি বাবুর মুখে তাদের মাতৃভাষার কবির নাম শুনে পাঠানেরা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। উপরের বাংকে বসা এক পাঠান বুকে-কানে হাত দিয়ে গভীর আবেগের সঙ্গে গজল গেয়ে শোনায়। গান শেষ হলে কথক তাদের কাছে 'আদম খাঁ ও দুরখানির' মহব্বতের কিসসা শুনতে চান। তখন আরেক পাঠান তার গুরুগম্ভীর গলায় সেই হৃদয়বিদারক কাহিনি সুর করে পাঠ করতে থাকে। একটি থার্ড ক্লাস রেলের কামরায় এইভাবে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মুখে মুখে যে সাহিত্য ও গানের আসর বসেছিল, তাকেই লেখক রসিকতা করে 'পশতু-সাহিত্য-গোষ্ঠী বা সম্মেলন' বলেছেন।

৯.৫ 'পথচলতি' রচনায় ভাষা ও সংস্কৃতির বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও যে সহজ বন্ধুত্ব ও উদার সমানুভূতির ছবিটি পাওয়া যায় তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করো। বর্তমান সময়ে এই বন্ধুত্ব ও সমানুভূতির প্রাসঙ্গিকতা বুঝিয়ে দাও।

স্বরূপ বিশ্লেষণ: লেখক একজন বাঙালি হিন্দু, উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত। অন্যদিকে কাবুলিওয়ালারা ভিনদেশি, মুসলিম, পেশায় সুদখোর বা হিং বিক্রেতা এবং শিক্ষায় অনগ্রসর। ভাষা, ধর্ম, পোশাক ও সংস্কৃতি—সব দিক থেকেই তাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। কিন্তু ট্রেনের কামরায় ভাষার সেতুবন্ধন (ফারসি ও পশতু সাহিত্য) এই দুই ভিন্ন মেরুর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল। কাবুলিওয়ালারা লেখককে নিজেদের দলের কেরানি হিসেবে পরিচয় দিয়ে সম্মান বাঁচিয়েছিল, আবার লেখকও তাদের গান ও আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন। এখানে ধর্ম বা আভিজাত্যের অহংকার হার মেনেছে মানবিকতার কাছে।

বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা: বর্তমান যুগে যখন ধর্ম, ভাষা ও জাতপাতের নামে সমাজে হানাহানি ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন এই পাঠ্যাংশটি এক গভীর বার্তা দেয়। এটি শেখায় যে, মানুষের ভেতরের সত্তা এক। শিল্পের, সাহিত্যের এবং উদার মনের কোনো সীমানা হয় না। একটু সহানুভূতি ও সম্মান দিয়ে মিশতে পারলে যে কোনো মানুষের সঙ্গেই সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। আজকের বিচ্ছিন্নতার যুগে এই সম্প্রীতির বোধ বড়োই প্রাসঙ্গিক।

ভাষার জাদু ও মানবতার জয়

'পথচলতি' গদ্যাংশটি প্রমাণ করে যে ভাষা ও সাহিত্য কীভাবে মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়কে জুড়ে দিতে পারে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ভাষাজ্ঞান দিয়ে কেবল ট্রেনের কামরায় বসার জায়গাই পাননি, তিনি রুক্ষ পাঠানদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। ধর্ম, জাত বা বেশভূষা নয়, একটি মানুষের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার উদারতা ও মানবিকতার মধ্যে।

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

'পথচলতি' গদ্যাংশের রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ও বহুভাষাবিদ পণ্ডিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।

লেখক জানতেন যে কাবুলিওয়ালাদের মাতৃভাষা পশতু হলেও, ফারসি ভাষা তাদের কাছে আভিজাত্য ও শিক্ষার প্রতীক। লেখক অনর্গল ফারসি বলতে পারতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, একজন বাঙালির মুখে ফারসি শুনে পাঠানেরা অবাক হয়ে যাবে এবং তাঁকে সম্মান দিয়ে বসার জায়গা করে দেবে। এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল।

লেখকের অনর্গল ফারসি বলা শুনে কাবুলিওয়ালারা ভেবেছিল যে এই বাঙালি বাবু নিশ্চয়ই অনেক বড়ো জ্ঞানী মানুষ বা 'মস্ত আলেম'। পরে তারা লেখককে নিজেদের কাবুলি ব্যাংকের ম্যানেজার বা হিসাবনবিশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেছিল।

খুশ-হাল খাঁ খট্টক ছিলেন পাঠানদের মাতৃভাষা পশতু সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তিনি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সমসাময়িক ছিলেন।