🏛️ নাটোরের কথা
পাঠ্যবই: সাহিত্য মেলা (অষ্টম শ্রেণি, WBBSE)
১. কবি পরিচিতি
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দুটি বইয়ের নাম হলো— 'ক্ষীরের পুতুল' এবং 'রাজকাহিনী'।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো (দাদার ছেলে) ছিলেন।
২. নিজের ভাষায় উত্তর দাও
১৪ টিলেখকের মনে পড়া গল্পটি হলো স্বদেশি যুগের প্রথম দিকের একটি ঘটনা। সে বছর ছিল প্রবল ভূমিকম্পের বছর। সেবার নাটোরে প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্স (প্রাদেশিক সম্মেলন) বা জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ ছিলেন রিসেপশন কমিটির প্রেসিডেন্ট। তিনি ঠাকুরবাড়ির সবাইকে এবং কংগ্রেসের বড়ো বড়ো নেতাদের বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। স্পেশাল ট্রেন, স্টিমার ও রাজকীয় সমাদরের মধ্য দিয়ে লেখকের নাটোরে যাওয়ার এবং সেখানে বাংলা ভাষার সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য ছোকরাদের (যুবকদের) লড়াই করার স্মৃতিই হলো এই গল্পের মূল বিষয়।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, তখনকার নাটোরের মহারাজার নাম ছিল জগদিন্দ্রনাথ। লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে শুধু 'নাটোর' বলেই সম্বোধন করতেন।
তিনি নাটোরে অনুষ্ঠিত হওয়া 'প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্স' (Provincial Conference) বা প্রাদেশিক সম্মেলনের রিসেপশন কমিটির (অভ্যর্থনা সমিতির) প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
নেমন্তন্নের তালিকায় ঠাকুরবাড়ির সদস্য হিসেবে লেখকের দীপুদা, রবিকাকা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) এবং বাড়ির অন্যান্য ছেলেদের নাম ছিল। এছাড়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের চাঁইদের (নেতাদের) মধ্যে ন-পিসেমশাই জানকীনাথ ঘোষাল, ডব্লিউ. সি. বোনার্জি, মেজোজ্যাঠামশায়, লালমোহন ঘোষ এবং সুরেন্দ্র বাঁড়ুজ্জে প্রমুখের নাম লেখক স্মরণ করতে পেরেছেন।
কোথায়: লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য নাটোরে রওনা হলেন।
কীভাবে: তাঁরা মহা ফুর্তিতে চোগাচাপকান পরে একটি স্পেশাল ট্রেনে চড়ে হৈ-হৈ করতে করতে রওনা হলেন। রাস্তায় খাওয়া-দাওয়া, মালপত্র তোলা বা তদারকির কোনো চিন্তাই তাঁদের করতে হয়নি; সব ব্যবস্থা নাটোরের মহারাজার লোকেরাই করেছিল।
সরাঘাট থেকে লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা পদ্মা নদীতে স্টিমার চড়েছিলেন।
স্টিমারে খাওয়ার টেবিলে একদিকে বসেছিলেন বড়ো বড়ো নেতারা (চাঁইরা) আর অন্যদিকে লেখক, দীপুদাসহ ছোকরারা। 'বয়'রা খাবার নিয়ে আগে নেতাদের দিকে যেত। একটি চাঁই একাই ছ-সাতখানা কাটলেট বা অর্ধেকের বেশি পুডিং তুলে নিতেন, ফলে ছোকরাদের দিকে এলে খাবার আর বিশেষ থাকত না। এই দেখে দীপুদা বয়কে লুকিয়ে নির্দেশ দেন খাবার আগে তাঁদের দিকে আনতে। এই অতিকায় খাওয়ার বর্ণনা ('জাইগ্যানটিক' খাওয়া) এবং ছোকরাদের খাবার পাওয়ার চালাকির মধ্য দিয়ে লেখকের হাস্যরস ও সরস মনের চমৎকার পরিচয় ফুটে উঠেছে।
নাটোরের মহারাজার বাড়ির বৈঠকখানা ও তার সাজসজ্জার সঙ্গে 'ইন্দ্রপুরী'র তুলনা করা হয়েছে।
কারণ, বাড়িটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছিল। সেখানে দামি ঝাড়লণ্ঠন, তাকিয়া, ফুলদানি ও কার্পেট পাতা ছিল। চারপাশের এলাহি ব্যবস্থা, চাকর-বাকরদের তৎপরতা এবং সামগ্রিক ঐশ্বর্য দেখে মুগ্ধ হয়েই লেখক এমন তুলনা করেছেন।
নাটোরের মহারাজা অতিথিদের জন্য রাজকীয় ব্যবস্থা করেছিলেন। স্পেশাল ট্রেন থেকে শুরু করে স্টিমার, মালপত্র বহন—সব দায়িত্ব তাঁর লোকেরাই নিয়েছিল। অতিথিদের না চাইতেই সব জিনিস হাতের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। সকালে বিছানায় শুয়ে থাকতেই গড়গড়ার নল মুখে গুঁজে দেওয়া হতো। কে কখন তামাক খায়, সোডা খায় বা ডাবের জল পান করে, তার নিখুঁত হিসাব ছিল। রাণিমা নিজের হাতে পিঠে-পায়েস তৈরি করে পাঠাতেন। অতিথিদের সামান্যতম ত্রুটি বা অসুবিধা হতে দেওয়া হয়নি। মহারাজার এই নিখুঁত ও আন্তরিক আতিথেয়তাকেই লেখক 'রাজ সমাদর' বলেছেন।
লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘুরে ঘুরে নাটোরের পুরানো ঘরবাড়ি ও মন্দিরের ছবি (স্কেচ) আঁকছিলেন। এমনকি বড়ো নেতাদেরও স্কেচ করছিলেন। এই ছবি আঁকার বা স্কেচ করার প্রসঙ্গেই নাটোরের মহারাজার খুব আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। তিনি খুশি হয়ে লেখককে রানি ভবানীর ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং নানারকম স্কেচ করে দেওয়ার ফরমায়েশ করছিলেন।
কী ঠিক ছিল: রবিকাকা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ও অন্যান্য যুবকদের মধ্যে আগে থেকেই ঠিক ছিল যে, প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্সের (প্রাদেশিক সম্মেলনের) যাবতীয় কাজকর্ম ও বক্তৃতা বাংলা ভাষায় হতে হবে।
পরিস্থিতি: কংগ্রেসের পুরোনো ও বড়ো নেতারা (চাঁইরা) এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। তাঁরা চাইতেন, অন্যান্য কংগ্রেস অধিবেশনের মতো এখানেও সব কিছু ইংরেজিতে হোক। এই নিয়ে যুবকদের সঙ্গে বয়স্ক নেতাদের প্রবল তর্কাতর্কি ও মতবিরোধ বাধে এবং দুটি পৃথক দল তৈরি হয়ে যায়।
নাটোরে প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচিত বিখ্যাত 'আমার সোনার বাংলা' (সোনার বাংলা) গানটি পরিবেশন করেছিলেন বলে লেখকের স্মৃতিতে রয়েছে।
লেখক ও যুবকদের প্রবল দাবির মুখে পড়ে, ঘোরতর ইংরেজিদুরস্ত পার্লামেন্টারি বক্তা লালমোহন ঘোষ শেষ পর্যন্ত কনফারেন্সে বাংলায় সুন্দর বক্তৃতা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সম্মেলনের কার্যক্রম বাংলা ভাষায় সম্পন্ন করার যে জেদ যুবকেরা ধরেছিল, তাতে তারা সফল হয়েছিল। মাতৃভাষার এই স্বীকৃতি ও বিজয়ের কারণেই লেখক ও তাঁর সঙ্গীদের জয়জয়কার হয়েছিল।
নাটোরে প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্স শুরু হলে প্রেসিডেন্ট যখন ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে ওঠেন, তখন লেখক ও যুবকদের দলটি সমস্বরে "বাংলা, বাংলা" বলে চিৎকার করতে শুরু করে। কেউ ইংরেজিতে মুখ খুললেই তারা চিৎকার করে বাধা দিতে থাকে। তাদের এই প্রবল বাধাদানের ফলে পরিস্থিতি এমন হয় যে, কেউ আর ইংরেজিতে কথা বলতে পারছিলেন না। অবশেষে প্রখ্যাত ইংরেজি বক্তা লালমোহন ঘোষ বাধ্য হয়ে বাংলায় চমৎকার বক্তৃতা প্রদান করেন। এইভাবে প্রকাশ্য মঞ্চে (পাবলিকলি) মাতৃভাষার সম্মান আদায়ের জন্য যুবকদের এই ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতাই ছিল বাংলা ভাষার প্রথম লড়াই।
ব্যাকরণ ও ভাষাচর্চা
- ৩.১ আজ সকালে মনে পড়ল একটি গল্প - সেই প্রথম স্বদেশি যুগের সময়কার, কী করে আমরা বাংলা ভাষার প্রচলন করলুম। (জটিল বাক্যে)
আজ সকালে যে গল্পটি মনে পড়ল তা হলো সেই প্রথম স্বদেশি যুগের সময়কার গল্প, যখন আমরা বাংলা ভাষার প্রচলন করলুম। - ৩.২ ভূমিকম্পের বছর সেটা। প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্স হবে নাটোরে। (বাক্যদুটিকে জুড়ে লেখো)
সেটা ছিল ভূমিকম্পের বছর, যখন নাটোরে প্রোভিন্সিয়াল কনফারেন্স হবে। - ৩.৩ নাটোর নেমন্তন্ন করলেন আমাদের বাড়ির সবাইকে। (যৌগিক বাক্যে)
নাটোর নেমন্তন্ন করলেন এবং সেই নেমন্তন্ন ছিল আমাদের বাড়ির সবাইকে। - ৩.৪ আরো অনেকে ছিলেন- সবার নাম কি মনে আসছে এখন। (না-সূচক বাক্যে)
আরো অনেকে ছিলেন, যাদের সবার নাম এখন মনে আসছে না। - ৩.৫ নাটোর বললেন, কিছু ভেবো না। সব ঠিক আছে। (পরোক্ষ উক্তিতে)
সব ঠিক আছে জানিয়ে নাটোর কিছু না ভাবতে বললেন। - ৩.৬ অমন 'জাইগ্যানটিক' খাওয়া আমরা কেউ কখনো দেখিনি। (নিম্নরেখ শব্দটির পরিবর্তে বাংলা শব্দ ব্যবহার করে বাক্যটি আবার লেখো।)
অমন দৈত্যাকৃতি (বা বিশাল) খাওয়া আমরা কেউ কখনো দেখিনি। - ৩.৭ ছোকরার দলের কথায় আমলই দেন না। (হ্যাঁ-সূচক বাক্যে)
ছোকরার দলের কথায় তারা সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন। - ৩.৮ ন-পিসেমশাই জানকীনাথ ঘোষাল রিপোর্ট লিখছেন আর কলম ঝাড়ছেন। (বাক্যটিকে দু'টি বাক্যে ভেঙ্গে লেখো)
ন-পিসেমশাই জানকীনাথ ঘোষাল রিপোর্ট লিখছেন। তিনি কলম ঝাড়ছেন। - ৩.৯ গরম গরম সন্দেশ আজ চায়ের সঙ্গে খাবার কথা আছে যে অবনদা। (নিম্নরেখ শব্দের প্রকার নির্দেশ করো এবং অর্থ এক রেখে অন্য শব্দ ব্যবহার করে বাক্যটি আবার লেখো)
প্রকার: শব্দদ্বৈত (বা ধন্যাত্মক শব্দ)।
পরিবর্তিত বাক্য: সদ্য-তৈরি (বা তপ্ত) সন্দেশ আজ চায়ের সঙ্গে খাবার কথা আছে যে অবনদা। - ৩.১০ হাতের কাছে খাবার এলেই তলিয়ে দিতেম। (জটিল বাক্যে)
যখনই হাতের কাছে খাবার আসত, তখনই তলিয়ে দিতেম।
- ৪.১ স্টিমারে নির্ভাবনায় উঠে গেলুম।
নির্ভাবনায় = নিঃ + ভাবনায় (বিসর্গ সন্ধি)। - ৪.২ তিনি অর্ধেকের বেশি নিজের প্লেটে তুলে নিলেন।
অর্ধেকের = অর্ধ + একের (স্বরসন্ধি)।
- হাঙ্গাম: হাঙ্গামা > হাঙ্গাম (অন্ত্যস্বরলোপ)।
- আপসোস: আফসোস > আপসোস (ধ্বনি পরিবর্তন বা ব্যঞ্জন সংগতি)।
- চান: স্নান > সিনান > ছনান > চান (সমীভবন ও ব্যঞ্জনচ্যুতি)।
- তক্কাতর্কি: তর্কাতর্কি > তক্কাতর্কি (সমীভবন / ব্যঞ্জন সংগতি)।
- জিজ্ঞেস: জিজ্ঞাসা > জিজ্ঞাস > জিজ্ঞেস (স্বরসংগতি)।
- স্বদেশি: স্ব-দেশ + ই (তদ্ধিত প্রত্যয়)
- জিজ্ঞাসা: জ্ঞা (ধাতু) + সন্ + অ + আ (স্ত্রীলিঙ্গে)
- ঢাকাই: ঢাকা + আই (তদ্ধিত প্রত্যয়)
- চোগাচাপকান: চোগা ও চাপকান = দ্বন্দ্ব সমাস।
- বিছানাবাক্স: বিছানা ও বাক্স (বা বিছানা রাখার বাক্স) = দ্বন্দ্ব সমাস (বা মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)।
- ইন্দ্রপুরী: ইন্দ্রের পুরী = সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস।
- রাজসমাদর: রাজার সমাদর (বা রাজার উপযুক্ত সমাদর) = সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস (বা মধ্যপদলোপী কর্মধারয়)।
- গল্প-গুজব: গল্প ও গুজব = সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস।
- অন্দরমহল: অন্দরের মহল = সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস।
- আমরা: ব্যক্তিবাচক সর্বনাম (উত্তম পুরুষ, বহুবচন)।
- সেটা: নির্দেশক সর্বনাম।
- তাঁকে: ব্যক্তিবাচক সর্বনাম (প্রথম পুরুষ, সম্মানসূচক)।
- সবাই: সাকল্যবাচক বা সমষ্টিবাচক সর্বনাম।
- তিনি: ব্যক্তিবাচক সর্বনাম (প্রথম পুরুষ, সম্মানসূচক)।
- আমি: ব্যক্তিবাচক সর্বনাম (উত্তম পুরুষ, একবচন)।
- এটা: নির্দেশক (বা সামীপ্যবাচক) সর্বনাম।