আজকের ভারত : সরকার, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্বশাসন
ভারতের সংবিধান, নির্বাচন ও স্থানীয় প্রশাসন | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 30 SAQ | 6 Broad Questions
গণতন্ত্র ও নির্বাচন
জনগণের নিজের শাসক বেছে নেওয়ার ব্যবস্থা
ভারতের সংবিধান
পৃথিবীর বৃহত্তম লিখিত সংবিধান ও ড. বি.আর. আম্বেদকর
সরকারের বিভাগ
আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ
ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ
স্বায়ত্বশাসন
শহরের পৌরসভা ও গ্রামের পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
40 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
30 টিBroad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
6 টিসরকার কী?
'সরকার' শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। মধ্যযুগে ভারতে এই শব্দটির দুটি অর্থ ছিল—শাসনকর্তা অথবা শাসনব্যবস্থা। বর্তমানে কোনো দেশ বা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদের সম্মিলিত রূপকেই সরকার বলা হয়। ইংরেজিতে একে 'Government' (গভর্নমেন্ট) বলা হয়, যার উৎপত্তি 'Govern' বা শাসন করা থেকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের সরকার নির্বাচন করেন।
সরকারের প্রধান কাজগুলি
খুব সাধারণভাবে বললে, সরকারের মূল কাজ হলো দেশের শাসন ব্যবস্থা সঠিকভাবে ও সংবিধান মেনে পরিচালনা করা। এর কাজগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- শাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা: দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব। পুলিশ ও প্রশাসনের মাধ্যমে সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে।
- আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ: সময়ের সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজন বদলায়, তাই সরকার দেশের জন্য নতুন আইন তৈরি করে এবং পুরনো আইন সংশোধন করে। এরপর সেই আইনগুলি দেশে কার্যকর করে।
- জনকল্যাণ ও উন্নয়ন: জনগণের যাতে ভালো হয়, তার জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নেয়। রাস্তাঘাট নির্মাণ, সেতু, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ, পানীয় জলের ব্যবস্থা ইত্যাদি পরিকাঠামোগত উন্নয়ন সরকারের কাজ।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: সরকারি বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করে দেশের মানুষের শিক্ষা ও সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।
- রাজস্ব বা কর সংগ্রহ: এই বিপুল উন্নয়নমূলক কাজগুলি করার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সরকার দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী কর বা ট্যাক্স সংগ্রহ করে এবং সেই অর্থ জনকল্যাণেই ব্যয় করে।
- দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি: বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য সেনাবাহিনী পরিচালনা করা এবং বিদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাও কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ।
উপসংহার
সংক্ষেপে, সরকার হলো রাষ্ট্রের মস্তিষ্ক। দেশের উন্নতি, শান্তি ও জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই সংবিধানে নির্দেশিত পথে সরকার নিরলস কাজ করে যায়।
ভূমিকা
দেশ শাসন করার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে সারা পৃথিবীতে রাজতন্ত্রের প্রচলন বেশি থাকলেও, আধুনিক যুগে বেশিরভাগ দেশেই গণতন্ত্র প্রচলিত। এই দুই শাসন ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের পার্থক্য
- সংজ্ঞা: যে শাসনব্যবস্থায় দেশের জনগণ বা লোকেরা নিজেরাই নিজেদের শাসক নির্বাচন করে, তাকে 'গণতন্ত্র' বলে। অন্যদিকে, যে ব্যবস্থায় রাজা বা রানি বংশানুক্রমিকভাবে বা ক্ষমতার জোরে দেশ শাসন করেন, তাকে 'রাজতন্ত্র' বলে।
- জনগণের ক্ষমতা: গণতন্ত্রে দেশের প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হলেন জনগণ। তারা চাইলে ভোটের মাধ্যমে শাসক বদলাতে পারেন। কিন্তু রাজতন্ত্রে সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষমতা থাকে না, সমস্ত ক্ষমতা রাজা বা সুলতানের হাতে কুক্ষিগত থাকে।
- সমতা: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকে এবং আইনের চোখে সবাই সমান। রাজতন্ত্রে বৈষম্য বেশি দেখা যায় এবং রাজার নির্দেশই শেষ কথা।
- উদাহরণ: ভারত, আমেরিকা হলো গণতান্ত্রিক দেশ। অন্যদিকে অতীতের মুঘল বা সুলতানি আমল ছিল রাজতন্ত্রের উদাহরণ। বর্তমানকালেও জাপান বা ইংল্যান্ডে রাজা-রানি আছেন, তবে সেখানে পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সরকারও রয়েছে।
ভারতকে গণতান্ত্রিক বলা হয় কেন?
ভারতকে গণতান্ত্রিক দেশ বলা হয় কারণ এদেশের শাসনভার কোনো রাজা বা স্বৈরশাসকের হাতে নেই। প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট সময়ের (সাধারণত ৫ বছর) জন্য নিজেদের শাসক বা সরকার নিজেরাই বেছে নেন। অর্থাৎ, এ দেশের জনগণই হলেন ক্ষমতার প্রধান উৎস।
ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রীয় বলা হয় কেন?
ভারত একটি বিশাল দেশ। এই বিশাল দেশটিকে সুচারুভাবে শাসন করার জন্য সংবিধান অনুযায়ী দু-ধরনের সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সমগ্র দেশের দায়িত্বভার পালনের জন্য রয়েছে 'কেন্দ্রীয় সরকার', এবং প্রত্যেকটি অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় বিষয়গুলি পরিচালনার জন্য রয়েছে আলাদা 'রাজ্য সরকার'। যে ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্য দু-রকম সরকারের ক্ষমতাই সংবিধানে স্বীকার করা হয়, তাকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বলে। তাই ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশ।
সংবিধান কী?
'বিধান' শব্দটির অর্থ হলো নিয়ম। প্রত্যেক দেশ কীভাবে চলবে, সরকারের কী কী ক্ষমতা থাকবে এবং নাগরিকদের কী কী অধিকার ও কর্তব্য থাকবে—সেই সম্পর্কিত নিয়মকানুনগুলির সমষ্টিকেই 'সংবিধান' বলা হয়। বেশিরভাগ দেশেরই সংবিধান লিখিত আকারে থাকে, আবার কোনো কোনো দেশে (যেমন ইংল্যান্ড) অলিখিত প্রথা বা নিয়মই সংবিধানের কাজ করে।
ভারতের সংবিধান
ভারতের একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত লিখিত সংবিধান রয়েছে। ড. বি. আর. আম্বেদকর ছিলেন এই ভারতীয় সংবিধানের প্রধান রূপকার বা স্থপতি। প্রায় তিন বছর ধরে বহু আলোচনা ও বিতর্কের পর গণপরিষদে এই সংবিধান তৈরি হয়। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর ভারতের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এরপর, ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি এই সংবিধান সমগ্র দেশে কার্যকর হয়। এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি ভারতে 'প্রজাতন্ত্র দিবস' পালন করা হয়। এই সংবিধান মেনেই ভারতের গণতান্ত্রিক সরকার দেশ শাসন করে।
পৃথিবীর বৃহত্তম সংবিধান
ভারতীয় সংবিধানকে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ও বিস্তারিত লিখিত সংবিধান বলা হয়। এর কারণগুলি হলো:
- বিশালত্ব: ভারত একটি বিশাল দেশ, যার ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্য প্রচুর। এত বড় দেশের সমস্ত শ্রেণির মানুষের অধিকার রক্ষা করার জন্য সংবিধানে অনেক ধারা-উপধারা যুক্ত করতে হয়েছে।
- কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্ক: ভারতের সংবিধানে শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের নয়, প্রতিটি রাজ্য সরকারের গঠন, ক্ষমতা এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে লেখা আছে।
- মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য: নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যগুলি অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংবিধানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
- সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা: তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য সংবিধানে বিশেষ ও বিস্তারিত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এত বিপুল সংখ্যক ধারা (Articles), উপধারা ও তফশিল (Schedules) পৃথিবীর আর কোনো দেশের সংবিধানে নেই, তাই এটি বৃহত্তম।
ভূমিকা
একটি দেশের সরকার কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি মাত্র সংস্থার দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না। শাসনব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং দুর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের কাজকর্মকে প্রধানত তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে।
সরকারের তিনটি বিভাগ ও তাদের কাজ
সরকারের তিনটি মূল বিভাগ হলো—আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ। এদের কাজগুলি নিম্নরূপ:
- আইন বিভাগ (Legislature): এই বিভাগের প্রধান কাজ হলো দেশের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন আইন তৈরি করা। এছাড়া পুরনো আইনের যদি কোনো বদল বা সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তবে তাও আইন বিভাগ করে থাকে। দেশের বাজেট পাশ করাও এদের কাজ। (যেমন: ভারতের সংসদ বা পার্লামেন্ট)।
- শাসন বিভাগ (Executive): আইন বিভাগ দ্বারা তৈরি হওয়া আইন অনুসারে দেশকে বাস্তবে পরিচালনা করাই হলো শাসন বিভাগের কাজ। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, সরকারি নীতি নির্ধারণ ও তা কার্যকর করা এবং প্রশাসন চালানো শাসন বিভাগের প্রধান দায়িত্ব। (যেমন: প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য আমলারা)।
- বিচার বিভাগ (Judiciary): এই বিভাগের কাজ হলো সংবিধান অনুসারে দেশ সঠিকভাবে শাসন হচ্ছে কিনা এবং জনগণের স্বার্থ ও মৌলিক অধিকার রক্ষা হচ্ছে কিনা—সেসবের প্রতি নজর রাখা। কেউ আইন বা নিয়ম ভাঙলে, তার বিচার করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া বিচার বিভাগের কাজ। (যেমন: সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট)।
ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি (Separation of Powers)
সরকারের এই তিনটি বিভাগের মধ্যে বিচার বিভাগকে সব দেশেই বাকি দুটি বিভাগের (আইন ও শাসন) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বাধীন রাখা হয়। সরকারের এক বিভাগ যেন অন্য বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ না করতে পারে, সেই ব্যবস্থাকেই এককথায় 'ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি' বলে।
এর প্রয়োজনীয়তা:
ফ্রান্সের বিখ্যাত দার্শনিক মন্তেস্কু প্রথম এই নীতির কথা বলেছিলেন। যদি আইন তৈরি করা, শাসন করা এবং বিচার করা—এই তিন ক্ষমতা একই ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তবে তারা স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে এবং সুবিচারের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গণতন্ত্র যাতে সফল হয় এবং নাগরিকদের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তার জন্যই বিচার বিভাগকে শাসন ও আইন বিভাগের প্রভাব মুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
স্বায়ত্তশাসন কী?
'স্ব' কথাটির অর্থ হলো নিজের, আর 'আয়ত্ত' মানে অধীন। অর্থাৎ, যে শাসনব্যবস্থায় জনগণ নিজেই নিজের অধীন, তাকেই 'স্বায়ত্তশাসন' (Local Self-Government) বলে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের জনগণ শুধু সাংসদ বা বিধায়ক নির্বাচন করেই থেমে থাকেন না, তারা নিজেদের স্থানীয় অঞ্চলের দৈনন্দিন শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে সরাসরি বা নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন। এই স্থানীয় শাসন ব্যবস্থাই হলো স্বায়ত্তশাসন। পশ্চিমবঙ্গে শহর ও গ্রাম—এই দুই ক্ষেত্রেই স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা চালু আছে।
পৌরসভা কী?
ছোটো ছোটো শহর বা নগরের স্থানীয় শাসন পরিচালনার জন্য যে স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠান থাকে, তাকে 'পৌরসভা' (Municipality) বলা হয়। 'পৌর' কথাটা এসেছে সংস্কৃত শব্দ 'পুর' থেকে, যার অর্থ হলো নগর বা শহর।
পৌরসভার গঠন
একটি নির্দিষ্ট শহর বা পৌর এলাকার ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের ভোটাররা (নাগরিকরা) প্রতি ৫ বছর অন্তর নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পৌরসভার সদস্যদের বেছে নেন। এই নির্বাচিত সদস্যদের বলা হয় 'পৌরপ্রতিনিধি' বা কাউন্সিলর। এরপর, এই নির্বাচিত পৌরপ্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে নেতা বা প্রধান হিসেবে নির্বাচন করেন। তাকে বলা হয় 'পৌরপ্রধান' বা চেয়ারম্যান। পৌরপ্রধানের নেতৃত্বেই পৌরসভার সমস্ত কাজকর্ম পরিচালিত হয়।
পৌরসভার কাজসমূহ
শহর বা নগরের সার্বিক উন্নতি, জনসেবা, জনস্বাস্থ্য ও প্রশাসনের দেখভাল করাই পৌরসভার মূল কাজ। এর উল্লেখযোগ্য কাজগুলি হলো:
- জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা: শহরের রাস্তাঘাট নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, জঞ্জাল বা আবর্জনা অপসারণ করা এবং দূষণ রোধ করে শহরকে নির্মল রাখা। মশা ও রোগজীবাণু দমনের ব্যবস্থা করা।
- জল সরবরাহ: শহরের সমস্ত অধিবাসীর জন্য পরিশ্রুত ও নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা পৌরসভার অন্যতম প্রধান কাজ।
- পরিকাঠামো উন্নয়ন: শহরের নতুন রাস্তাঘাট, নিকাশি নালা (ড্রেন), কালভার্ট ইত্যাদি তৈরি করা এবং পুরোনোগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করা। রাস্তায় আলোর (Street light) ব্যবস্থা করা।
- শিক্ষা ও চিকিৎসা: স্থানীয় স্তরে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনা করে শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং হাসপাতাল, মাতৃসদন ও দাতব্য চিকিৎসালয় বানিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন করা।
- অন্যান্য কাজ: পার্ক বা খেলার মাঠ তৈরি করা, জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র (Certificate) প্রদান করা এবং শ্মশান বা গোরস্থান রক্ষণাবেক্ষণ করা।
ভূমিকা
পশ্চিমবঙ্গে শহরের স্বায়ত্তশাসনের জন্য যেমন পৌরসভা রয়েছে, তেমনি গ্রামের স্থানীয় মানুষের সুবিধা-অসুবিধা দূর করা এবং গ্রামের সার্বিক উন্নতির জন্য রয়েছে গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা, যার নাম 'পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা'। গ্রামের মানুষ যাতে নিজেদের এলাকার উন্নয়ন নিজেরা করতে পারে, তার জন্যই এই ব্যবস্থার সৃষ্টি।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থার স্তর
পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাটি তিনটি স্তরে বিভক্ত:
- গ্রাম পঞ্চায়েত (নিম্ন স্তর): প্রতিটি গ্রামের বা কয়েকটি ছোট গ্রাম নিয়ে সর্বনিম্ন স্তরে থাকে গ্রাম পঞ্চায়েত।
- পঞ্চায়েত সমিতি (মধ্য স্তর): অনেকগুলি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা বা গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় একটি 'ব্লক'। এই ব্লকের শাসনভার থাকে পঞ্চায়েত সমিতির হাতে।
- জেলাপরিষদ (উচ্চ স্তর): কয়েকটি ব্লক নিয়ে গঠিত হয় একটি 'জেলা'। সমগ্র জেলার গ্রামীণ উন্নয়নের সর্বোচ্চ স্তরে থাকে জেলাপরিষদ।
গ্রাম পঞ্চায়েতের গঠন
গ্রামের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রাপ্তবয়স্ক বাসিন্দারা প্রতি ৫ বছর অন্তর নিজেদের ভোট দিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের নির্বাচন করেন। এরপর, এই নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যরা নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে নেতা হিসেবে বেছে নেন, যাঁকে বলা হয় 'পঞ্চায়েত প্রধান'। পঞ্চায়েত প্রধানের নেতৃত্বেই গ্রাম পঞ্চায়েতের সমস্ত কাজকর্ম পরিচালিত হয়। প্রধানকে সাহায্য করার জন্য একজন উপপ্রধানও নির্বাচিত হন।
গ্রাম পঞ্চায়েতের কাজ
গ্রামের সবরকম উন্নতি সাধন করাই গ্রাম পঞ্চায়েতের মূল লক্ষ্য। এর প্রধান কাজগুলি হলো:
- পানীয় জলের ব্যবস্থা: গ্রামের মানুষের জন্য পরিশ্রুত পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করা, নলকূপ (Tubewell) বসানো বা সংস্কার করা।
- রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ: গ্রামের ভেতরের কাঁচা রাস্তা পাকা করা, নতুন পথ-ঘাট নির্মাণ করা এবং সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করা।
- জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা: গ্রামের নিকাশি ব্যবস্থা উন্নত করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং মহামারী রোধে ব্যবস্থা নেওয়া। চিকিৎসা কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করে প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া।
- শিক্ষা: শিক্ষাদানের জন্য গ্রামে বিদ্যালয়, শিশুশিক্ষাকেন্দ্র বা পাঠাগার তৈরি করা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের ব্যবস্থা নেওয়া।
- কৃষি ও পরিবেশ: কৃষিকাজে সেচের জলের ব্যবস্থা করা, বৃক্ষরোপণ বা বনসৃজন করা এবং গ্রামীণ কুটিরশিল্পে উৎসাহ দেওয়া।
উপসংহার
গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষ সরাসরি শাসন ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এভাবেই একদম নিচুতলা থেকে গণতন্ত্র জোরদার হয়ে ওঠে।
মনে রেখো!
ইতিহাস বইয়ের এই শেষ অধ্যায়টি আসলে আমাদের চারপাশের বাস্তব জীবনের কথা। রাজা-বাদশাহদের যুগ পেরিয়ে আজ আমরা গণতান্ত্রিক যুগে বাস করছি। কিভাবে দেশ চলে, সরকার কী কাজ করে, ভারতের বৃহত্তম সংবিধান কে বানিয়েছেন, আর আমাদের এলাকার উন্নতির জন্য পৌরসভা বা পঞ্চায়েত কীভাবে কাজ করে—এগুলো জানা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, একজন সচেতন নাগরিক হওয়ার জন্যও খুব জরুরি!