নগর, বণিক ও বাণিজ্য
শহর, বাণিজ্য, দিল্লি ও বিদেশী বণিক | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 30 SAQ | 6 Broad Questions
দিল্লির সাতটি শহর
কিলা রাই পিথোরা, সিরি, তুঘলকাবাদ, জাহানপনাহ, ফিরোজাবাদ, দীন পনাহ, শাহজাহানাবাদ
শাহজাহানাবাদ
লালকেল্লা ও জামা মসজিদ
মিশ্র নাগরিক বসতি ও চাঁদনি চক
ব্যবসা-বাণিজ্য
তঙ্কা, জিতল, হুন্ডি, দাদন
গ্রাম-শহর ও বৈদেশিক বাণিজ্য
ইউরোপীয় বণিক
ভাস্কো দা গামা (১৪৯৮)
ইংরেজ, ডাচ, ফরাসি, দিনেমার
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
40 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
30 টিBroad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
6 টিভূমিকা
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতক থেকে ভারতের রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে দিল্লি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে। এর পিছনে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক—নানা কারণ জড়িত ছিল, যা দিল্লিকে হিন্দুস্তানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।
ভৌগোলিক সুবিধা
দিল্লির অবস্থান ছিল কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সুবিধাজনক। এটি আরাবল্লি শৈলশিরার একটি প্রান্ত ও যমুনা নদীবিধৌত সমতলের সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল। আরাবল্লির পাথর ব্যবহার করে জমির ঢাল অনুযায়ী সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করা সহজ ছিল। অন্যদিকে, পূর্ব দিকের যমুনা নদী প্রধান জলপথ হিসেবে কাজ করত এবং শহরের প্রাকৃতিক সীমানা তৈরি করেছিল। নদীপথে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণ সহজ হওয়ায় বণিকরা এই অঞ্চলের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল।
রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু
খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে রাজপুতরা এবং পরে দ্বাদশ শতকে চৌহান রাজপুতরা দিল্লিতে শাসন করত। এরপর খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মহম্মদ ঘুরির সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিতে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই দিল্লি সুলতানদের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পরপর অনেক রাজবংশ (দাস, খলজি, তুঘলক) দিল্লিকেই তাদের রাজধানী হিসেবে বেছে নেয়, ফলে শহরের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
মোঙ্গল আক্রমণের প্রভাব
ত্রয়োদশ শতকে মধ্য এশিয়ায় মোঙ্গলরা এক দুর্ধর্ষ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তারা ইরাকের বাগদাদ শহর ধ্বংস করে। বাগদাদ ছিল তৎকালীন ইসলামি সভ্যতার প্রধান কেন্দ্র। বাগদাদের পতনের ফলে দিল্লির গুরুত্ব হঠাৎ করে বেড়ে যায়। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে বহু পণ্ডিত, শিল্পী, কারিগর এবং অভিজাত মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে দিল্লিতে এসে বসবাস শুরু করেন। ইলতুৎমিশের আমলে দিল্লি একটি আন্তর্জাতিক শহরের রূপ নেয়।
সুফি সাধকদের পীঠস্থান
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে ছাড়াও, দিল্লি হয়ে উঠেছিল সুফি সাধকদের অন্যতম পীঠস্থান। শেখ নিজামউদ্দিন আউলিয়া, বখতিয়ার কাকি, শেখ নাসিরউদ্দিন (চিরাগ-ই দিল্লি)-এর মতো বিখ্যাত সুফি সাধকদের উপস্থিতির কারণে দিল্লি ধর্মীয় দিক থেকেও মর্যাদা লাভ করে। একে সম্মান করে 'হজরত-ই দিল্লি' বলেও ডাকা হতো।
উপসংহার
সুতরাং, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা, সুলতানদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, বহিরাগত গুণীজনদের আগমন এবং সুফি সন্তদের আশীর্বাদ—এই সবকিছুর মিলিত ফলেই খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি ভারতের এক অবিসংবাদিত ও গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে উঠেছিল।
ভূমিকা
খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাট শাহ জাহান যমুনা নদীর পাড় ভেঙে আগ্রা শহর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দিল্লিতে এক নতুন শহর তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় 'শাহজাহানাবাদ' (১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ)। সুলতানদের পুরোনো দিল্লির ধ্বংসাবশেষ থেকে খানিকটা দূরে যমুনা নদীর পশ্চিমে এই শহরটি গড়ে ওঠে। এই শহরের নাগরিক বসতি ও জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও মিশ্র প্রকৃতির।
মিশ্র নাগরিক বসতি ও বাসগৃহ
শাহজাহানাবাদে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে বসতি গড়ে ওঠেনি। এখানে উচ্চপদস্থ আমির ও গরিব কারিগর একই মহল্লায় পাশাপাশি থাকত। বসতি এলাকার মধ্যে কঠোর বিভাজন ছিল না। বাসগৃহগুলিকে মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- হাভেলি: রাজপুত্র ও উচ্চপদস্থ আমিররা সুন্দর বাগানবাড়িতে থাকতেন। সবচেয়ে বড়ো ও সুন্দর বাড়িগুলোকে হাভেলি বলা হতো।
- মকান ও কোঠি: হাভেলির থেকে নীচুস্তরের এবং কিছুটা ছোটো বাড়িগুলোকে মকান বা কোঠি বলা হতো। ধনী বণিকরা টালি, ইট ও পাথরের বাড়িতে থাকতেন।
- কোঠরি: সাধারণ ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোকানের ওপরে বা পেছন দিকের ছোটো ঘরে থাকতেন, যেগুলিকে কোঠরি বলা হতো।
- কুঁড়েঘর: বড়ো বাড়িগুলির আশেপাশে মাটি ও খড় দিয়ে তৈরি বহু ছোটো কুঁড়েঘর ছিল, যেখানে সাধারণ সৈনিক, দাসদাসী এবং কারিগররা বসবাস করত। এগুলিতে মাঝে মাঝেই আগুন লাগার ঘটনা ঘটত।
বাজার ও রাজপথ
শাহজাহানাবাদের প্রধান রাজপথ ছিল দুটি। এই রাজপথগুলিকে 'বাজার' বলা হতো, কারণ রাস্তাগুলির দু-পাশে সারিবদ্ধ দোকান থাকত। বিখ্যাত 'চাঁদনি চক' এই শহরেই অবস্থিত ছিল। লালকেল্লা থেকে জাহান আরা বেগমের চক পর্যন্ত বিস্তৃত বাজারের উত্তর দিকে সরাইখানা, বাগান এবং দক্ষিণে স্নানাগার ছিল। চাঁদনি রাতে জলে চাঁদের আলো চিকচিক করত বলে বা টাকার ঝিলিকের কারণে এই নামকরণ হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
সম্প্রীতি ও উৎসব
শাহজাহানাবাদের নাগরিকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় ছিল। কোনো কোনো উৎসবে সম্প্রদায়-নির্বিশেষে মানুষ এক হয়ে আনন্দ করত। যেমন, দেওয়ালির সময় হিন্দু-মুসলমান উভয়েই বিখ্যাত সুফি সাধক শেখ নাসিরউদ্দিন বা 'চিরাগ-ই দিল্লি'-র দরগায় আলোর উৎসব পালন করত। একইভাবে মহরমে শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায় যৌথভাবে অংশ নিত।
উপসংহার
শাহজাহানাবাদ ছিল মুঘল জাঁকজমক ও সংস্কৃতির এক নিখুঁত উদাহরণ। লালকেল্লা ও জামা মসজিদের মতো স্থাপত্য, প্রাণবন্ত বাজার এবং মিশ্র নাগরিক বসতি এই শহরকে এক দীর্ঘস্থায়ী রাজধানী শহরে পরিণত করেছিল, যার কিছু অবশেষ আজও বর্তমান পুরোনো দিল্লিতে দেখতে পাওয়া যায়।
ভূমিকা
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে দিল্লির সুলতানদের শাসনকালে ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্যের অভাবনীয় বিস্তার ঘটেছিল। এর পিছনে কেবল বণিকদের উদ্যোগই ছিল না, বরং সুলতানদের প্রশাসনিক নীতি, নতুন শহর পত্তন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।
নতুন শহরের পত্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি
সুলতানি আমলে শাসকরা দিল্লিতে কিলা রাই পিথোরা, সিরি, তুঘলকাবাদ, জাহানপনাহ, ফিরোজাবাদ প্রভৃতি নতুন শহর তৈরি করেন বা পুরোনো শহর সংস্কার করেন। এই সব শহরে সুলতান, অভিজাত, সৈনিক এবং সাধারণ মানুষ বসবাস শুরু করলে শহরগুলি জনবহুল হয়ে ওঠে। এত বিশাল জনসংখ্যার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস (খাদ্যশস্য, তেল, ঘি, আনাজ) মেটানোর জন্য গ্রাম থেকে শহরে বিপুল পরিমাণে পণ্য আমদানি শুরু হয়, যা বাণিজ্যের বিস্তার ঘটায়।
নির্মাণকাজ ও কাঁচামালের চাহিদা
শহরের প্রাসাদ, মসজিদ, বাজার, রাস্তাঘাট, সরাইখানা, স্নানাগার ইত্যাদি তৈরি করতে প্রচুর কাঁচামাল (পাথর, কাঠ, লোহা) এবং শ্রমিকের দরকার হতো। দেশের নানা প্রান্ত থেকে এমনকি বিদেশ থেকেও শ্রমিক ও দাসরা আসত। এই নির্মাণকাজের কাঁচামাল জোগান দেওয়ার জন্য এক শক্তিশালী আমদানি-রপ্তানির বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল।
নগদে কর আদায় প্রথা
সুলতান আলাউদ্দিন খলজির আমল থেকে বিশাল সেনাবাহিনীর ভরণ-পোষণের জন্য রাষ্ট্র কৃষকদের কাছ থেকে শস্যের বদলে নগদে কর আদায় শুরু করে। নগদ টাকা জোগাড় করার জন্য কৃষকরা বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে তাদের উৎপন্ন শস্য বিক্রি করে দিত। ব্যবসায়ীরা সেই শস্য কিনে শহরের বাজারে বিক্রি করত। এই ব্যবস্থা শস্য-বাণিজ্যে এক বিরাট গতি এনেছিল।
বিলাসদ্রব্যের চাহিদা
সুলতান এবং অভিজাতদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য অনেক মূল্যবান জিনিসের প্রয়োজন হতো। সূক্ষ্ম মসলিন, রেশম বস্ত্র, দামি মদ, কারুকার্য করা অস্ত্র, ঘোড়া, গালিচা ইত্যাদি ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো, যা দূরপাল্লার বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছিল।
যোগাযোগ ও মুদ্রাব্যবস্থা
সুলতানরা বাণিজ্য সহজ করার জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন এবং পথের ধারে সরাইখানা তৈরি করেন। ইলতুৎমিশ রুপোর 'তঙ্কা' ও তামার 'জিতল' চালু করেন, যার মান খুব ভালো ছিল। এছাড়া সরাফদের দ্বারা 'হুন্ডি' ব্যবস্থার প্রচলন বণিকদের টাকা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমিয়েছিল।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শহরের বিস্তার, রাজকীয় চাহিদা, উন্নত মুদ্রাব্যবস্থা এবং নগদে কর আদায়ের নীতি—এই সবকিছুর মিলিত ফলেই সুলতানি আমলে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য অভাবনীয় উন্নতি লাভ করেছিল।
ভূমিকা
মধ্য যুগে ভারতের অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক হলেও দেশের ভেতরে এবং বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ রমরমা ছিল। দেশের ভিতরের বাণিজ্য বা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—গ্রাম ও শহরের মধ্যেকার বাণিজ্য এবং এক শহর থেকে আরেক শহরের মধ্যেকার বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে ছিল বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
গ্রাম ও শহরের বাণিজ্য (নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য)
গ্রাম ও শহরের বাণিজ্যে প্রধানত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচা হতো। জনবহুল শহরগুলোর অধিবাসীদের প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য গ্রাম থেকে বিপুল পরিমাণে কৃষিজ পণ্য শহরে আসত। এই জিনিসগুলি তুলনামূলকভাবে কমদামি হলেও ওজনে ও পরিমাণে অনেক বেশি হতো। এর মধ্যে ছিল—নানা রকমের খাদ্যশস্য (চাল, গম), খাবার তেল, ঘি, আনাজপাতি, ফল, লবণ ইত্যাদি। গ্রামীণ কৃষকরা নগদে কর মেটানোর জন্য এই পণ্যগুলি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করত এবং তা শহরের বাজারে আসত।
দুই শহরের মধ্যেকার বাণিজ্য (বিলাসদ্রব্য)
এক শহর থেকে আরেক শহরে বাণিজ্যের ধরন ছিল ভিন্ন। এখানে প্রধানত বেশি দামের শৌখিন ও বিলাসবহুল জিনিসপত্র রপ্তানি হতো, যেগুলো ধনী ও অভিজাতদের জন্য কারিগররা তৈরি করত। যেমন—দিল্লি শহরে সাম্রাজ্যের নানা এলাকা থেকে দামি মদ ও সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র আসত। বাংলা, করমণ্ডল ও গুজরাটের সুতি ও রেশমের কাপড়ের চাহিদা সারা দেশেই ছিল। এছাড়া চামড়া, কাঠ, ধাতু দিয়ে তৈরি জিনিস, গালিচা এবং কাগজের (যেমন দিল্লির মিঠাইওয়ালাদের কাগজের মোড়ক) ব্যবসাও চলত।
বাণিজ্যের মানুষজন
এই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সাথে নানা শ্রেণির মানুষ যুক্ত ছিল:
- পরিবহনকারী বণিক: করওয়ানি, নায়ক এবং বনজারা-রা পশু ও গরুর গাড়ির পিঠে করে দূরপাল্লায় শস্য ও মালপত্র পরিবহন করত।
- বড়ো বণিক: শাহ বা মুলতানিরা ছিল দূরপাল্লার বাণিজ্যে দক্ষ। তারা সুদের কারবারও করত।
- সরাফ: এরা আধুনিক ব্যাঙ্কের মতো কাজ করত, মুদ্রার বিশুদ্ধতা বিচার করত এবং 'হুন্ডি' প্রথার মাধ্যমে এক শহর থেকে অন্য শহরে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করত।
- দালাল: এরা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে জিনিসের দাম ঠিক করে দিত।
উপসংহার
মধ্যযুগে ভারতের অভ্যন্তরে নদীপথ (গঙ্গা-যমুনা) ও সড়কপথের মাধ্যমে এই বাণিজ্য সুচারুভাবে চলত। পথের ধারে সরাইখানা নির্মাণ এবং হুন্ডি ব্যবস্থার মতো উদ্ভাবন দেশের ভেতরের বাণিজ্যকে আরও সহজ ও গতিশীল করে তুলেছিল।
ভূমিকা
মধ্যযুগের ভারতে দেশের অভ্যন্তরে বাণিজ্যের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যও অত্যন্ত লাভজনক ছিল। ভারতের তৈরি জিনিসের চাহিদা বিদেশের বাজারে প্রচুর ছিল। এই বাণিজ্য মূলত জলপথ এবং সড়কপথ—উভয় মাধ্যমেই চলত এবং ভারতের উপকূলবর্তী বন্দরগুলি এই বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
পশ্চিমমুখী জলপথে বাণিজ্য (আরব ও পারস্য)
ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলি, বিশেষ করে গুজরাটের সুরাট, ব্রোচ, ক্যাম্বে এবং মালাবার (কেরালা) থেকে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য হতো।
- রপ্তানি: এই বন্দরগুলি থেকে আরব সাগর, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের তীরবর্তী দেশগুলিতে প্রধানত সুতি বস্ত্র, মশলা, নীল, খাদ্যশস্য এবং সিন্ধু প্রদেশ থেকে মাছ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য রপ্তানি হতো। সুলতানি আমলে যুদ্ধবন্দী দাসদেরও পশ্চিম এশিয়ায় রপ্তানি করা হতো।
- আমদানি: ওই দেশগুলি থেকে ভারতে আমদানি করা হতো উন্নত মানের ঘোড়া (বিশেষ করে পারস্য, এডেন ও ইয়েমেন থেকে, কারণ ভারতে ভালো ঘোড়া জন্মাত না), কাচের তৈরি সামগ্রী এবং সাটিন কাপড়।
পূর্বমুখী জলপথে বাণিজ্য (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া)
ভারতের পূর্ব উপকূল অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বন্দরগুলি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বাণিজ্য চলত।
- রপ্তানি: গুজরাট থেকে রঙিন কাপড়, এবং বাংলা থেকে সুতির কাপড়, রেশমবস্ত্র ও চিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য স্থানে রপ্তানি হতো।
- আমদানি: এর বিনিময়ে ওই সব দেশ থেকে মশলা ভারতে আসত। এছাড়া মালদ্বীপ থেকে কড়ি আমদানি করা হতো, যা বাংলায় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সড়কপথে বাণিজ্য (মধ্য এশিয়া)
সড়কপথে ভারতীয় সামগ্রীর ব্যবসা প্রধানত মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে হতো। মুলতান শহর ছিল এই বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
- আমদানি: সড়কপথে মধ্য এশিয়া থেকে সোনা, রুপো ও রত্নের মতো মূল্যবান ধাতু আমদানি হতো, যা মুদ্রা তৈরি ও অলংকারের জন্য প্রয়োজন ছিল। এছাড়া আলেকজান্দ্রিয়া, ইরাক ও চিন থেকে ব্রোকেড ও মূল্যবান রেশম আসত, যার চাহিদা ছিল সমাজের উঁচু তলার মানুষের কাছে।
উপসংহার
এই বৈদেশিক বাণিজ্যে গুজরাটি, মালাবারি, তামিল, ওড়িয়া, তেলুগু ও বাঙালি বণিকরা অংশগ্রহণ করত। বড়ো বড়ো বণিকদের নিজস্ব জাহাজ থাকত। এই আমদানি-রপ্তানির ফলেই ভারতের অর্থনীতিতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ও মূল্যবান ধাতু প্রবেশ করত, যা দেশকে সমৃদ্ধ করেছিল।
ভূমিকা
খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে ইউরোপীয় বণিকরা জলপথে ভারতে আসতে শুরু করে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাভজনক মশলার (বিশেষত গোলমরিচ) বাণিজ্যে সরাসরি অংশগ্রহণ করা এবং প্রচুর ধনসম্পদ আয় করা।
পোর্তুগিজদের আগমন
ইউরোপীয়দের মধ্যে পোর্তুগিজরাই প্রথম ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করে। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পোর্তুগালের নাবিক ভাস্কো দা গামা আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভারতের পশ্চিম উপকূলে মালাবারের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছান। এরপর পোর্তুগিজ নৌ-সেনাপতি ডিউক অফ আলবুকার্ক আরব সাগরে আরব বণিকদের হঠিয়ে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেন এবং গোয়ায় পোর্তুগিজ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন। উন্নত জাহাজ ও আগ্নেয়াস্ত্রের জোরে তারা সমুদ্রে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বাংলায় তারা হুগলির ব্যান্ডেলে কুঠি স্থাপন করেছিল, তবে ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে দাস ব্যবসার অপরাধে শাহ জাহান তাদের হুগলি থেকে তাড়িয়ে দেন।
অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানি
খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে আরও অনেক ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানির পত্তন ঘটে, যারা মুঘল আমলে ভারতে বাণিজ্য করতে আসে:
- ডাচ বা ওলন্দাজ: ১৬০২ সালে নেদারল্যান্ডসে 'ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' তৈরি হয়। তারা পশ্চিম ভারতের সুরাট, দাক্ষিণাত্যের মসুলিপটনম এবং বাংলায় চুঁচুড়ায় তাদের ঘাঁটি তৈরি করে।
- ইংরেজ: ১৬০০ সালে লন্ডনে তৈরি হয় 'ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি'। রাজা প্রথম জেমসের দূত টমাস রো মুঘল দরবারে আসেন। ইংরেজরা সুরাট, মসুলিপটনম এবং পরে কলকাতায় বাণিজ্য কুঠি বানায়।
- ফরাসি ও দিনেমার: ফরাসিরা ১৬৬৪ সালে কোম্পানি তৈরি করে চন্দননগরে এবং দিনেমাররা (ডেনমার্ক) শ্রীরামপুরে কুঠি স্থাপন করে।
বাণিজ্যের ধরন ও কুঠি নির্মাণ
ইউরোপীয় বণিক কোম্পানিগুলি ভারতের বিভিন্ন জায়গায় (সুরাট, মসুলিপটনম, পুলিকট, হুগলি) নিজেদের ঘাঁটি বা কুঠি বানিয়েছিল। এই কুঠিগুলি ছিল অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সুরক্ষিত দুর্গের মতো, যেখানে তাদের বাসগৃহ ও গুদাম থাকত। তারা ভারতীয় দালালদের মাধ্যমে কাজ করত। কারিগরদের আগে থেকে অগ্রিম অর্থ বা কাঁচামাল দিত, যাকে বলা হতো 'দাদন'। এছাড়া বাণিজ্যের সুবিধার জন্য কৃষকদের ধান ছেড়ে আফিম বা রেশমের মতো বাণিজ্যিক চাষ করতে উৎসাহিত করত।
উপসংহার
মুঘল সম্রাটরা মালের ওপর শুল্ক ছাড় দিয়ে ও কুঠি বানানোর অনুমতি দিয়ে এই বণিকদের উৎসাহিত করতেন। কালক্রমে এই ইউরোপীয় বণিকরাই কেবল বাণিজ্য নয়, ভারতের রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে, যা পরবর্তীকালে ভারতের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল।
মনে রেখো!
ইতিহাসের এই অধ্যায়ে আছে মধ্যযুগের ভারতের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র দিল্লির উত্থানের কাহিনী, সুলতান ও মুঘলদের আমলে বাণিজ্যের প্রসার এবং শেষমেশ ইউরোপীয় বণিকদের আগমনের কথা। হুন্ডি, দাদন বা সরাফদের কাজ ভালোভাবে বুঝে নিলে তখনকার অর্থনীতি কেমন চলত, তা সহজে মনে থাকবে!