মুঘল সাম্রাজ্য প্রশ্ন উত্তর

WBBSE Class 7 History Chapter 5 - বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব, যুদ্ধ ও মৈত্রী, রাজপুত ও দক্ষিণাত্য নীতি | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 12 May 2026 Last Update: 31 May 2026
মুঘল সাম্রাজ্য - Class 7 History Chapter 5

মুঘল সাম্রাজ্য

সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা | 39 MCQ | 30 SAQ | 5 Broad Questions

পানিপথ রাজপুত নীতি মনসবদারি দক্ষিণাত্য চিত্রকলা
⚔️

পানিপথের যুদ্ধ

১৫২৬ খ্রিঃ বাবরের জয়
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা

🤝

রাজপুত নীতি

মনসবদারি ও ওয়াতন জায়গির
আকবরের সমন্বয় নীতি

💰

রাজস্ব ব্যবস্থা

জাবত ও দহসালা
টোডরমলের বন্দোবস্ত

🏰

দক্ষিণাত্য নীতি

ঔরঙ্গজেবের অভিযান
মারাঠা প্রতিরোধ

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

39 টি
1ভারতে প্রথম মুঘল বাদশাহ কে ছিলেন?
2পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কত সালে হয়েছিল?
3মুঘলরা নিজেদের কী বলে গর্ব করত?
4মুঘলরা কোন উপাধি ব্যবহার করত?
5খানুয়ার যুদ্ধ কত সালে হয়েছিল?
6খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুতদের নেতৃত্ব দেন কে?
7বাদশাহ শব্দটি কোন ভাষা থেকে এসেছে?
8হুমায়ুন কাদের কাছে পরাজিত হয়ে ভারত ছেড়েছিলেন?
9আকবরের রাজস্বমন্ত্রী কে ছিলেন?
10আকবরনামা কে রচনা করেন?
11সুলহ-ই কুল নীতির অর্থ কী?
12দহসালা ব্যবস্থা কে চালু করেন?
13জাবত ব্যবস্থা বলতে কী বোঝায়?
14জিজিয়া কর কী?
15আকবর জিজিয়া কর তুলে নেন কত সালে?
16ঔরঙ্গজেব পুনরায় জিজিয়া কর চাপান কত সালে?
17রাঠোরের যুদ্ধ কত সালে শুরু হয়?
18শাহজাহানের আমলে মুঘলরা কোন অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়?
19ওয়াতন কথাটির অর্থ কী?
20বাদশাহ উপাধি কে প্রথম গ্রহণ করেন?
21বাবর কত বছর বয়সে ফরগনা দেশের শাসনভার পান?
22মুঘল ছবি আঁকার কারখানাকে কী বলা হত?
23আকবরের আমলে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী কে ছিলেন?
24মুঘল উত্তরাধিকারের রীতি কী ছিল?
25বাবরের রণকৌশলের মূল ভিত্তি কী ছিল?
26ঘর্ঘরার যুদ্ধে বাবর কাদের পরাজিত করেন?
27মনসবদারি ব্যবস্থায় মনসব বলতে কী বোঝায়?
28শাহজাহানের আমলে সিংহাসন নিয়ে লড়াই কাদের মধ্যে হয়েছিল?
29মুঘলদের সীমান্ত নীতির মূল লক্ষ্য কী ছিল?
30মেওয়াড়ের রানা প্রতাপ সিংহ কী করেছিলেন?
31সর্বভৌম শাসক বলতে কী বোঝায়?
32মুঘলরা বাংলায় কাদের পরাজিত করে শাসন প্রতিষ্ঠা করে?
33ঔরঙ্গজেবের আমলে মারাঠা নেতা কে ছিলেন?
34আহমেদনগরের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?
35চেঙ্গিস খান কে ছিলেন?
36ঔরঙ্গজেব কত বছর বয়সে মারা যান?
37বাংলায় মুঘল শাসন পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে কেমন সময় লেগেছিল?
38মুঘলদের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নীতির একটি উপায় কী ছিল?
39মুঘল আমলে আবুল ফজল ও বদাউনির মধ্যে কী পার্থক্য ছিল?

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

30 টি
1মুঘল কারা? তাদের উদ্ভব কীভাবে হয়েছিল?
মুঘলরা ছিল মধ্য এশিয়া থেকে আগত এক শক্তিশালী রাজবংশ, যারা ষোড়শ শতক থেকে উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতবর্ষ শাসন করেছিল। তাদের উদ্ভবের দুটি ধারা ছিল: একদিকে মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের বংশধর এবং অন্যদিকে তুর্কি নেতা তৈমুর লঙ-এর বংশধর। তবে মুঘলরা তৈমুরের বংশধর হিসেবে গর্ব করত এবং নিজেদের তৈমুরীয় বলে ভাবত। চেঙ্গিস খানের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা কম ছিল। ভারতবর্ষের প্রথম মুঘল বাদশাহ ছিলেন জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর (১৫২৬-৩০ খ্রিঃ)। তৈমুর ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ভারত আক্রমণ করেছিলেন, তাই মুঘলরা মনে করত উত্তর ভারত শাসনের অধিকার তাদের আছে।
2মুঘলরা কেন নিজেদের বাদশাহ বলত?
মুঘলরা সর্বভৌম শাসকের ক্ষেত্রে বাদশাহ বা পাদশাহ শব্দটি ব্যবহার করত, যা ফারসি শব্দ। পাদ অর্থাৎ পতি বা প্রভু এবং শাহ অর্থাৎ শাসক বা রাজা—এই দুটি শব্দ মিলে বাদশাহ বা পাদশাহ হয়েছে। অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক বোঝাতে একসঙ্গে দুটি শব্দ ব্যবহার করা হত। এর আগে দিল্লির শাসকেরা নিজেদের সুলতান বলতেন। কিন্তু মুঘলরা সুলতান শব্দটি যুবরাজদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করত। যেমন জাহাঙ্গীরের নাম সেলিম ছিল, তাকে যুবরাজ অবস্থায় সুলতান সেলিম বলা হত। বাদশাহ উপাধি ব্যবহার করে মুঘলরা বোঝাতে চেয়েছিল যে, তাদের শাসন করার ক্ষমতা অন্য কারো অনুমতির উপর নির্ভরশীল নয়। বাবর ১৫০৭ খ্রিস্টাব্দে কাবুলে থাকার সময় পাদশাহ উপাধি নেন।
3সর্বভৌম শাসক বলতে কী বোঝো?
সর্বভৌম শাসক বলতে বোঝায় যাঁর আধিপত্য একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর এবং যিনি নিজের ক্ষমতায় শাসন করেন। অবশ্যই সমগ্র পৃথিবীর উপর তো কারো আধিপত্য থাকতে পারে না। বাস্তবে এর অর্থ হলো—যিনি একটি বিশাল এলাকার উপর কর্তৃত্ব করেন এবং সেই এলাকায় তার নিজের ক্ষমতায় শাসন চালান। এই কথা শুধু সেই শাসক নিজে জানলেই হবে না, সবাই যখন সেটা মেনে নেবে তখনই তার অধিকার টিকে থাকবে। মুঘল বাদশাহরা নিজেদের সর্বভৌম শাসক বলে দাবি করতেন এবং এই ধারণাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তারা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
4পানিপথের প্রথম যুদ্ধের গুরুত্ব কী?
পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ) ছিল ভারতের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লি সালতানাতের পতন ঘটিয়ে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। যুদ্ধটির গুরুত্ব: (১) মধ্যযুগের দিল্লি সালতানাতের চূড়ান্ত পতন এবং মুঘল যুগের সূচনা। (২) বাবরের রণকৌশল—কামান ও বন্দুকধারী সৈন্য এবং দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার তিরন্দাজ বাহিনীর যৌথ আক্রমণ—ভারতীয় যুদ্ধনীতিতে বিপ্লব আনে। (৩) এই যুদ্ধের মাধ্যমেই ভারতীয় উপমহাদেশে বারুদের কার্যকর ব্যবহার শুরু হয়। (৪) উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। যদি বাবর এই যুদ্ধে জিততে না পারতেন, তাহলে সম্ভবত আফগানরাই উত্তর ভারত শাসন করতেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের জন্মই হতো না।
5খানুয়ার যুদ্ধের বিবরণ দাও। এটি ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল কি?
খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭ খ্রিস্টাব্দ) বাবর ও মেওয়াড়ের রানা সংগ্রাম সিংহ (রানা সাঙ্গা)-র নেতৃত্বে রাজপুত শক্তির মধ্যে সংঘটিত হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বাবর মুঘল যোদ্ধাদের বলেছিলেন এটি তাদের ধর্মের লড়াই এবং তারা হলেন ধর্মযোদ্ধা বা গাজি। আসলে তিনি এভাবে সবাইকে জোটবদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এই যুদ্ধ আসলে ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল না, কারণ উত্তর ভারত থেকে বাবরকে হঠানোর জন্য কয়েকজন মুসলমান শাসকও রাজপুতদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধে বাবরের রণকৌশল—কামান ও দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনীর যৌথ আক্রমণ—রাজপুতদের পরাজিত করে। এই জয়ের মাধ্যমে উত্তর ভারতে মুঘল আধিপত্য সুদৃঢ় হয়।
6বাবরের রণকৌশল কী ছিল?
বাবরের রণকৌশল ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও কার্যকর। এর মূল ভিত্তি ছিল দুটি উপাদানের যুগপৎ ব্যবহার: (১) কামান ও বন্দুকধারী সৈন্যবাহিনী—যারা সম্মুখভাগ থেকে গোলাবর্ষণ করত, এবং (২) দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার তিরন্দাজ বাহিনী—যারা শত্রুপক্ষকে দুই পাশ ও পিছন দিক থেকে আক্রমণ করত। কৌশলটি ছিল এরকম: প্রথমে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর একটি অংশ শত্রুপক্ষকে দুই পাশ ও পিছন থেকে ঘিরে ফেলত এবং কামান ও বন্দুকধারীরা সমনে থেকে গোলা বর্ষণ করত। একসঙ্গে এই দুই রকম আক্রমণে শত্রুপক্ষ যখন দিশাহারা, তখন বাকি ঘোড়সওয়াররা সমনে থেকে আক্রমণ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিত। এই রণকৌশল বাবর পূর্বেই তুর্কদের আটামান সেনাবাহিনী ও সফাবিদের কাছ থেকে শিখেছিলেন। পানিপথ ও খানুয়া—দুই যুদ্ধেই এই কৌশল ব্যবহৃত হয়েছিল।
7হুমায়ুন কেন ভারত ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন?
হুমায়ুন (১৫৩০-৪০, ১৫৫৫-৫৬ খ্রিঃ) ছিলেন বাবরের পুত্র ও দ্বিতীয় মুঘল বাদশাহ। তিনি ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে ভারত ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন আফগান নেতা শের খান সুরির (শের শাহ)-র কাছে পরাজিত হয়ে। এর কারণগুলি: (১) হুমায়ুনের ভাইয়েরা (কামরান, আসকারি, হিন্দল) তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন এবং নিজেরাই ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন। (২) শের খান ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি ও কৌশলী শাসক, যিনি চৌসা (১৫৩৯ খ্রিঃ) ও কনৌজের যুদ্ধে (বিলগ্রাম, ১৫৪০ খ্রিঃ) হুমায়ুনকে পরাজিত করেন। (৩) হুমায়ুনের নিজের চারিত্রিক দুর্বলতা—দয়া, অমিতব্যয়িতা ও সিদ্ধান্তহীনতা। পরাজয়ের পর তিনি রাজপুতানা পেরিয়ে সিন্ধু প্রদেশ হয়ে পারস্যে (ইরান) চলে যান এবং প্রায় ১৫ বছর নির্বাসনে ছিলেন। ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাহের সাহায্যে তিনি ভারত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন।
8আবুল ফজল ও বদাউনির মধ্যে পার্থক্য কী?
আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২ খ্রিঃ) এবং আবুল কাদির বদাউনি (১৫৪০-১৬১৫ খ্রিঃ) দুজনেই ছিলেন আকবরের আমলের ঐতিহাসিক এবং ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে মুঘল দরবারে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিরাট পার্থক্য ছিল: (১) আবুল ফজল ছিলেন আকবরের একনিষ্ঠ প্রশংসাকারী। তাঁর লেখা আকবরনামায় তিনি আকবরের প্রশংসাই করেছেন এবং আকবরের নীতি ও আদর্শকে সমর্থন করেছেন। (২) বদাউনি ছিলেন আকবরের সমালোচক। তাঁর লেখা মুন্তাখাব-উৎ তওয়ারিখ গ্রন্থে তিনি আকবরের ধর্মীয় নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। এই দুই বিপরীতধর্মী বিবরণ থেকে ঐতিহাসিকেরা জানতে পারেন যে, একই ঘটনার দুই রকম ব্যাখ্যা থাকতে পারে। প্রকৃত ইতিহাস জানতে গেলে শুধু প্রশংসা নয়, সমালোচনাও জানা দরকার—এটাই ইতিহাসচর্চার মূল কথা।
9সুলহ-ই কুল নীতি কী?
সুলহ-ই কুল (Sulh-i Kul) হলো আকবরের বিখ্যাত ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নীতি, যার অর্থ হলো সর্বজনীন শান্তি বা সকলের সঙ্গে শান্তি। এই নীতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল: (১) সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন। (২) অমুসলমান প্রজাদের ওপর থেকে তীর্থকর ও জিজিয়া কর তুলে নেওয়া (১৫৬৪ খ্রিঃ)। (৩) যুদ্ধবন্দিদের জোর করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার প্রথা নিষিদ্ধ করা। (৪) হিন্দু, মুসলমান, জৈন, পারসি—সকল ধর্মের মানুষের জন্য দরবারের দরজা উন্মুক্ত রাখা। (৫) বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের সঙ্গে ইবাদতখানায় ধর্মালোচনার ব্যবস্থা (১৫৭৫ খ্রিঃ)। এই নীতির ফলে অমুসলমান প্রজারা সন্তুষ্ট হয়েছিল এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত হয়েছিল। রাজপুতরাও মুঘল দরবারে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন।
10দহসালা ও জাবত ব্যবস্থা কী?
দহসালা ও জাবত ছিল আকবরের রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। দহসালা (দহ মানে দশ): আকবর ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা টোডরমলের সাহায্যে দহসালা ব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থায় গত দশ বছরের ফসল উৎপাদনের গড় হিসাব করে জমির রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো এবং নগদ অর্থে রাজস্ব আদায় করা হতো। একে টোডরমলের বন্দোবস্ত-ও বলা হয়। তবে এই ব্যবস্থা মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বত্র চালু ছিল না। জাবত: জাবত বলতে বোঝায় জমি জরিপ করে রাজস্ব নির্ধারণ করা। এর অধীনে জমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা অনুযায়ী জমির শ্রেণিবিভাগ করে রাজস্ব নির্ধারিত হতো। এই ব্যবস্থায় রাজার স্বার্থ যেমন দেখা হয়েছে, তেমনি কৃষকদের সুবিধার কথাও মাথায় রাখা হয়েছে। দুঃসময়ে সরকার কৃষকদের ঋণ দিত এবং কখনো রাজস্ব মকুবও করা হতো।
11মনসবদারি ব্যবস্থা কী?
মনসবদারি ব্যবস্থা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের এক অনন্য প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামো, যা আকবর প্রবর্তন করেন। মনসব শব্দের অর্থ পদমর্যাদা। এই ব্যবস্থায়: (১) প্রত্যেক অভিজাত ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে একটি মনসব বা পদ দেওয়া হতো। (২) প্রত্যেক মনসবদারকে তাঁর পদের অনুপাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য (অশ্বারোহী) বাদশাহের জন্য প্রস্তুত রাখতে হতো। (৩) মনসবদারদের নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গির (জমি) দেওয়া হতো, সেই জমির রাজস্ব থেকে তাঁরা সৈন্যবাহিনীর খরচ ও নিজের জীবিকা চালাতেন। (৪) রাজপুতদেরও এই মনসবদারি ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছিল, যা মুঘল-রাজপুত সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল। (৫) মনসবের পরিমাপের একক ছিল জাত ও সওয়ার। এটি মুঘল প্রশাসনের মেরুদণ্ড ছিল, তবে পরবর্তীকালে (বিশেষত ঔরঙ্গজেবের আমলে) মনসবদারদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জায়গিরের অভাব দেখা দেয় এবং সমস্যার সৃষ্টি হয়।
12মুঘলদের রাজপুত নীতি কী ছিল?
মুঘলদের রাজপুত নীতি ছিল যুদ্ধ ও মৈত্রীর এক সুনিপুণ মিশ্রণ। বাদশাহ হুমায়ুন প্রথম বুঝেছিলেন যে, হিন্দুভানের ক্ষমতা দখল করতে গেলে রাজপুত রাজাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা দরকার, কারণ রাজপুতরাই ছিল উত্তর ভারতের বিশাল অঞ্চলের জমিদার। আকবর এই ধারণাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন: (১) যুদ্ধ ও মৈত্রী নীতির মাধ্যমে রাজপুতদের মনসবদারি ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসেন। (২) মুঘল বাদশাহ ও শাহজাদাদের সঙ্গে রাজপুত পরিবারের মেয়েদের বিবাহ হতো (যদিও এটি আকবর নতুন কিছু করেননি, পূর্বেও হতো)। (৩) রাজপুতরা তাঁদের ওয়াতন (নিজস্ব এলাকা) বজায় রাখতে পারতেন, তবে মুঘল বাদশাহের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে হতো। (৪) জিজিয়া ও তীর্থকর তুলে নিয়ে হিন্দু রাজপুতদের সন্তুষ্ট করা হয়েছিল। (৫) যুদ্ধবন্দিদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা নিষিদ্ধ হয়। তবে মেওয়াড়ের রানা প্রতাপ সিংহ আকবরের অধীনতা স্বীকার করেননি। জাহাঙ্গীর, শাহজাহানরাও আকবরের রাজপুত নীতিই অনুসরণ করেন। ঔরঙ্গজেবের আমলে জিজিয়া কর পুনরায় চাপানো (১৬৭৯ খ্রিঃ) ও রাঠোরের যুদ্ধের ফলে রাজপুত-মুঘল সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
13ঔরঙ্গজেবের দক্ষিণাত্য নীতি কী ছিল? এর ফল কী হয়েছিল?
ঔরঙ্গজেবের (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিঃ) দক্ষিণাত্য নীতি ছিল সম্প্রসারণমূলক। তিনি ভেবেছিলেন যে, দক্ষিণাত্যের সুলতানি রাজ্যগুলি (বিজাপুর, গোলকুণ্ডা) জয় করতে পারলে সেখান থেকে প্রচুর রাজস্ব আদায় করা যাবে এবং মারাঠাদের দমন করাও সহজ হবে। তাঁর আমলে বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা মুঘলদের দখলে আসে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু এর ফল মারাত্মক হয়েছিল: (১) বহু বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুঘলদের আর্থিক ক্ষতি হয়, যা আর সারানো যায়নি। (২) মারাঠা নেতা শিবাজীকে স্বাধীন রাজা বলে মেনে নিতে হয়। (৩) পঁচিশ বছর ধরে দক্ষিণাত্যে যুদ্ধ করে ঔরঙ্গজেব সেখানেই মারা যান (১৭০৭ খ্রিঃ)। (৪) এই যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। (৫) মারাঠা ও দক্ষিণী মুসলিম অভিজাতরা মুঘল শাসনে যোগ দিলেও, ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য তারা মুঘল সাম্রাজ্যকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, আনুগত্য দুর্বল হয়।
14মুঘল উত্তরাধিকারের রীতি কী ছিল?
মুঘলদের উত্তরাধিকারের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না—এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা। বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল: (১) জ্যেষ্ঠ পুত্রের স্বয়ংক্রিয় অধিকারের নীতি ছিল না। (২) কোনো লিখিত উত্তরাধিকার আইন ছিল না। (৩) বাদশাহের মৃত্যু বা দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গেই ভাইয়ে-ভাইয়ে সিংহাসনের লড়াই শুরু হতো। (৪) যিনি সামরিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সফল হতেন, তিনিই বাদশাহ হতেন—যাকে বলা হতো যোগ্যতমের উদবর্তন (Survival of the Fittest)। এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ: শাহজাহানের শেষ জীবনে দারা শিকোহ ও ঔরঙ্গজেবের মধ্যে গৃহযুদ্ধ (১৬৫৭-৫৮ খ্রিঃ), ঔরঙ্গজেবের পর পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার যুদ্ধ—এই ধারাবাহিক গৃহযুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলেছিল এবং পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল।
15মুঘল চিত্রকলার পরিচয় দাও।
মুঘল আমলে চিত্রকলা অভূতপূর্ব উৎকর্ষ লাভ করেছিল। মুঘল বাদশাহরা (বিশেষ করে আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান) চিত্রকলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বৈশিষ্ট্য: (১) তসবিরখানা নামে রাজকীয় চিত্রশালা ছিল, যেখানে বিখ্যাত শিল্পীরা কাজ করতেন। (২) ছবিতে শুধু বাদশাহের প্রতিকৃতি আঁকা হতো না, পশু-পাখি ও উদ্ভিদও আঁকা হতো। (৩) অনেক সময় কয়েকজন শিল্পী মিলে একসঙ্গে একটি ছবি তৈরি করতেন। (৪) ছবিগুলিতে রঙের ব্যবহার ও সূক্ষ্ম কারুকার্যের দক্ষতা দেখা যায়। (৫) বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন: বিচিত্র, আবুল হাসান, মনসুর। (৬) জাহাঙ্গীরের আমলে চিত্রকলা সর্বোচ্চ উন্নতি লাভ করে—পশু-পাখির নিখুঁত ছবি আঁকা হতো (যেমন চিনার গাছে কাঠবেড়ালি, নীলগাই ইত্যাদি)। মুঘল চিত্রকলা ছিল পারসিক, ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্পরীতির এক অপূর্ব মিশ্রণ।
16মুঘলদের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নীতি কী ছিল?
মুঘলদের জন্য উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত (কাবুল, কান্দাহার, কাশ্মীর, সিন্ধু, বেলুচিস্তান) ছিল অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। কারণ: (১) ঐতিহাসিকভাবে ভারতবর্ষে বৈদেশিক আক্রমণ এই পথেই বেশি হতো। (২) তাই সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষা করতে এই অঞ্চলে মুঘল প্রভাব তৈরি করা জরুরি ছিল। নীতির বৈশিষ্ট্য: কখনও যুদ্ধ, কখনও মৈত্রীর মাধ্যমে আফগান অধ্যুষিত অঞ্চলে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করা হতো। বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব—সকল বাদশাহই এই অঞ্চলের গুরুত্ব বুঝতেন। শাহজাহানের আমলে কান্দাহারের উপর মুঘল নিয়ন্ত্রণ হারানো ছিল বড়ো ধাক্কা। ঔরঙ্গজেব উত্তর-পূর্ব সীমান্তেও (অসম) সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করলেও সীমান্তে মুঘল সেনাবাহিনীর বড়ো অংশ দীর্ঘদিন আটকে ছিল, যা মারাঠাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়নি—এটাও সাম্রাজ্যের পতনের একটি কারণ।
17মুঘল সেনাবাহিনীর কৌশলগত সমস্যা কী ছিল?
মুঘলদের একাধিক কৌশলগত সমস্যা ছিল: (১) যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও উন্নত ছিল না, অথচ মুঘল সেনাকে অনেক দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হতো। (২) সাম্রাজ্যের আয়তন বিশাল হওয়ায় সেনাবাহিনী একাধিক ফ্রন্টে ব্যস্ত থাকত। (৩) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষায় সবসময় সেনার বড়ো অংশ মোতায়েন থাকত, যা অন্যত্র ব্যবহার করা যেত না। (৪) দূরবর্তী অভিযানে (যেমন দক্ষিণাত্য) সরবরাহ ও রসদের ব্যবস্থা করা কঠিন ছিল। (৫) সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশ (রাজপুত, আফগান, মুঘল, মারাঠা) বিভিন্ন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত থাকায় তাদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা কঠিন ছিল। ঔরঙ্গজেবের সময় এই সমস্যা চরমে পৌঁছায়। দক্ষিণাত্যে টানা ২৫ বছরের যুদ্ধে মুঘল সেনাবাহিনী ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যা সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
18রাঠোরের যুদ্ধ কী? এর ফলাফল কী হয়েছিল?
রাঠোরের যুদ্ধ (১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ছিল ঔরঙ্গজেবের আমলে মুঘল ও রাজপুতদের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ। পটভূমি: মারওয়াড়ের (যোধপুর) রাজা যশোবন্ত সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে যোধপুরের রাজধানীতে গোলমাল শুরু হয়। মুঘলরা ওই রাজ্যটি পুরোপুরি হাতে নিয়ে নেয়। এর ফলে শুরু হয় রাঠোরের যুদ্ধ। যুদ্ধের গোড়ার দিকে মেওয়াড় রাজা মারওয়াড়ের পক্ষ নিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যোগ দেন। ফলাফল: যুদ্ধটি মুঘলদের পক্ষে লাভজনক হয়নি। রাজপুতরা মুঘল শাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তাঁদের আনুগত্য নড়বড়ে হয়ে যায়। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ঔরঙ্গজেবের আমলে আকবরের সোনালি রাজপুত নীতির বিপর্যয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং মুঘল-রাজপুত সম্পর্কের চিরস্থায়ী ক্ষতি হয়।
19আকবর ও ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতির তুলনা করো।
আকবর ও ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছিল: আকবরের নীতি ছিল সমন্বয় ও সম্প্রীতির। তিনি: (১) রাজপুতদের মনসবদারি ব্যবস্থায় নিয়ে এসে উচ্চপদ দেন, (২) রাজপুত রাজকন্যাদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, (৩) জিজিয়া ও তীর্থকর তুলে নেন, (৪) সুলহ-ই কুল বা সর্বজনীন শান্তির নীতি অনুসরণ করেন, (৫) যুদ্ধবন্দিদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা বন্ধ করেন। ফলে রাজপুতরা মুঘলদের অনুগত ও বিশ্বস্ত মিত্র হয়েছিলেন। ঔরঙ্গজেবের নীতি ছিল ঠিক বিপরীত: (১) ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে জিজিয়া কর পুনরায় চাপান, (২) রাঠোরের যুদ্ধে (১৬৭৯ খ্রিঃ) রাজপুতদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, (৩) তাঁর কঠোর ধর্মীয় নীতি রাজপুতদের বিচ্ছিন্ন করে। যদিও আকবরের আমলের চেয়ে ঔরঙ্গজেবের আমলেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় রাজপুতরা মনসবদার ছিলেন, তবুও আস্থা ও আনুগত্যের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছিল—এটাই ছিল আকবর ও ঔরঙ্গজেবের নীতির মূল পার্থক্য।
20আহমেদনগরের মালিক অম্বর কে ছিলেন?
মালিক অম্বর ছিলেন আহমেদনগর রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও একজন অসামান্য কূটনীতিজ্ঞ। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে তিনি দক্ষিণাত্যে মুঘল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর কৃতিত্ব: (১) দক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলিকে (আহমেদনগর, বিজাপুর, গোলকুণ্ডা) মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেন। (২) গেরিলা যুদ্ধকৌশল (ছদ্মবেশে আক্রমণ ও পশ্চাদপসরণ) ব্যবহার করে মুঘল সেনাবাহিনীকে বিপর্যস্ত করেন, যা পরে মারাঠারা শিবাজীর নেতৃত্বে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে। (৩) মারাঠা সর্দার ও সৈনিকদের প্রশিক্ষিত ও সংগঠিত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। (৪) তাঁর দক্ষ প্রতিরোধের ফলেই আকবরের আমলে দক্ষিণাত্যে মুঘলদের অগ্রগতি সীমিত ছিল। মালিক অম্বর ছিলেন একাধারে দক্ষ প্রশাসক ও সেনাপতি।
21মুঘলরা কীভাবে বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল?
মুঘলরা বাংলায় সামরিক সাফল্য পেলেও, তার ভিত্তি ছিল নড়বড়ে। আফগানদের পুরোপুরি হারিয়ে মুঘল শাসন ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে বেশ কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। প্রক্রিয়া: (১) প্রথমে মুঘল সেনাপতিরা আফগান শাসকদের পরাজিত করেন। (২) কিন্তু স্থানীয় আফগান জমিদার ও ভূস্বামীরা প্রতিরোধ জারি রেখেছিলেন। (৩) ধীরে ধীরে মুঘলরা এই প্রতিরোধ দমন করে এবং স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সমঝোতা করে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। (৪) বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম ধনী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ (সুবা)। (৫) ঔরঙ্গজেবের আমলে চট্টগ্রাম বন্দর দখল করে পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে বাংলাকে রক্ষা করা হয়, যা সামুদ্রিক বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত করে। তবে বাংলায় মুঘল শাসনের পুরো সময়টাই আফগান ও স্থানীয় বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ কমবেশি লেগেই ছিল।
22মেহেশ দাসের নাম বীরবল হলো কেন?
মেহেশ দাস (মহেশ দাস) ছিলেন আকবরের সভার একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও প্রিয় পাত্র। তাঁর নাম বীরবল হওয়ার কারণ: বীরবল তাঁর গায়ে খুব জোর ছিল না বা তিনি মুঘলদের বিরুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন বলে নাম বীরবল হননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি খুব বুদ্ধিমান ছিলেন এবং তাঁর বুদ্ধি, রসবোধ ও সমস্যা সমাধানের অসামান্য দক্ষতার জন্যই আকবর তাঁকে বীরবল উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি আকবরের নবরত্ন সভার (নয়জন গুণী উপদেষ্টা) অন্যতম সদস্য ছিলেন। বীরবলকে নিয়ে রচিত গল্প-কাহিনি (আকবর-বীরবলের গল্প) ভারতীয় লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, যেখানে বীরবলের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও হাস্যরসের পরিচয় পাওয়া যায়। সংক্ষেপে, বীরবল ছিলেন বুদ্ধির জোরে বীর—একথাই নামটির মধ্যে নিহিত।
23সুবা ও সুবাদার কী?
মুঘল প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সুবা ছিল একটি প্রদেশ বা প্রশাসনিক বিভাগ। আকবর তাঁর সাম্রাজ্যকে মোট ১৫টি সুবায় বিভক্ত করেছিলেন, পরে সংখ্যা বাড়ে। প্রতিটি সুবার প্রধান শাসককে বলা হতো সুবাদার (বা সুবাহদার বা নাজিম)। সুবাদারের দায়িত্ব ছিল: (১) প্রদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, (২) রাজস্ব আদায়, (৩) বিদ্রোহ দমন, (৪) প্রাদেশিক সৈন্যবাহিনী পরিচালনা, (৫) বাদশাহের প্রতিনিধি হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা। সুবাদারগণ বাদশাহ কর্তৃক নিযুক্ত হতেন এবং বাদশাহের নির্দেশে স্থানান্তরিত হতেন। বাংলা, অযোধ্যা, গুজরাট, মালব, রাজপুতানা, বিহার, দিল্লি, আগ্রা, কাবুল, কান্দাহার, সিন্ধু, মুলতান, লাহোর, আহমেদনগর, বেরার ছিল আকবরের সময়কার উল্লেখযোগ্য সুবা। সুবা আবার কয়েকটি সরকার বা জেলায় বিভক্ত ছিল।
24মুঘল সেনাবাহিনীতে কোন কোন গোষ্ঠী ছিল?
মুঘল সেনাবাহিনী ছিল এক বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় বাহিনী, যা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের শক্তি ও দুর্বলতা—দুই-ই। গোষ্ঠীগুলি ছিল: (১) তুরানি—মধ্য এশিয়ার তুর্কিবংশীয় অভিজাত, (২) ইরানি—পারস্য (ইরান) থেকে আগত অভিজাত, (৩) আফগান—আফগানিস্তান ও ভারতীয় আফগান বংশীয়, (৪) রাজপুত—রাজপুতানা অঞ্চলের হিন্দু ক্ষত্রিয় যোদ্ধা, (৫) মারাঠা—দক্ষিণ ভারতের মারাঠা যোদ্ধা (পরে বিশেষত ঔরঙ্গজেবের আমলে), (৬) ভারতীয় মুসলমান—ভারতে জন্মানো মুসলিম অভিজাত। এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা ও রেষারেষি চলত, বিশেষ করে তুরানি ও ইরানিদের মধ্যে। ঔরঙ্গজেবের সময় রাজপুতদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সেনাবাহিনীর ঐক্য নষ্ট করে এবং সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
25শাহজাহানের আমলের প্রধান সমস্যাগুলি কী ছিল?
শাহজাহানের শাসনকাল (১৬২৭-১৬৫৮ খ্রিঃ) বাহ্যিকভাবে জমকালো মনে হলেও একাধিক গুরুতর সমস্যা বিদ্যমান ছিল: (১) শাসনের শুরুতেই দাক্ষিণাত্যে খান জাহান লোদী বিদ্রোহ করেন (যদিও তিনি পরাজিত হন)। (২) বুন্দেলখণ্ডের বিদ্রোহ দমন করতে হয়। (৩) শাহজাহান উজবেকদের থেকে বলখ জয় করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তা সফল হয়নি। (৪) তাঁর আমলেই মুঘলরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কান্দাহারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। (৫) জীবনশেষে পুত্রদের মধ্যে (দারা শিকোহ, শাহ সুজা, ঔরঙ্গজেব, মুরাদ বখশ) সিংহাসন নিয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ (১৬৫৭-৫৮ খ্রিঃ) শুরু হয়। (৬) এই গৃহযুদ্ধের ফলে ঔরঙ্গজেব জয়ী হলেও পরিবারের মধ্যে বিভাজন ও তিক্ততা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, যা পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
26মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি কী কী?
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পিছনে একাধিক কারণ দায়ী ছিল: (১) উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকা—প্রত্যেক বাদশাহের মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধ। (২) ঔরঙ্গজেবের কঠোর ধর্মীয় নীতি—জিজিয়া কর পুনরায় চাপানো, যা হিন্দু প্রজা ও রাজপুতদের বিচ্ছিন্ন করে। (৩) দীর্ঘস্থায়ী দক্ষিণাত্য যুদ্ধ (২৫ বছর)—মুঘল কোষাগার ও সেনাবাহিনীকে বিপর্যস্ত করে। (৪) মনসবদারি ও জায়গির ব্যবস্থার সংকট—মনসবদারদের সংখ্যা বেড়ে গেলেও জায়গিরের পরিমাণ না বাড়ায় অসন্তোষ। (৫) আঞ্চলিক শক্তির উত্থান—মারাঠা, শিখ, রাজপুত, জাঠ, সৎনামি ইত্যাদি গোষ্ঠীর বিদ্রোহ। (৬) অভিজাত গোষ্ঠীগুলির (তুরানি-ইরানি) মধ্যে রেষারেষি। (৭) যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা—বিশাল সাম্রাজ্য শাসনে অক্ষমতা। (৮) বহিরাক্রমণ—নাদির শাহ (১৭৩৯ খ্রিঃ) ও আহমদ শাহ আবদালির আক্রমণ। এই সব কারণ মিলে অষ্টাদশ শতকে একসময়ের বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য দিল্লির আশেপাশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
27মুঘল চিত্রশিল্পী মনসুর ও আবুল হাসান কিসের জন্য বিখ্যাত?
মনসুর ও আবুল হাসান ছিলেন জাহাঙ্গীরের আমলের দুই বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, যাঁরা মুঘল চিত্রকলাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। মনসুর: পশু-পাখির ছবি আঁকায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর আঁকা নীলগাই (এক ধরনের হরিণ) এবং বহুরূপীর ছবি ছিল নিখুঁত বাস্তবানুগ। জাহাঙ্গীর তাঁকে নাদির-উল-আসর (যুগের বিস্ময়) উপাধি দিয়েছিলেন। আবুল হাসান: তিনিও জাহাঙ্গীরের প্রিয় শিল্পী ছিলেন। তাঁর আঁকা একটি বিখ্যাত ছবি হলো চিনার গাছে কাঠবেড়ালি—যা এতই নিখুঁত যে গাছের পাতা ও কাঠবেড়ালির লোম পর্যন্ত স্পষ্ট। জাহাঙ্গীর-এর রাজত্বকাল ছিল মুঘল চিত্রকলার স্বর্ণযুগ এবং মনসুর ও আবুল হাসান ছিলেন সেই স্বর্ণযুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
28ওয়াতন জায়গির বলতে কী বোঝায়?
ওয়াতন কথাটির অর্থ নিজের ভিটে বা স্বদেশ। মুঘল আমলে রাজপুত রাজাদের ক্ষেত্রে ওয়াতন জায়গির বলতে বোঝাত তাঁদের পৈতৃক রাজ্য বা নিজস্ব এলাকা, যা মুঘল বাদশাহের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নিয়ে তারা শাসন করতে পারতেন। উদাহরণ: রাজা ভারমল, রাজা মানসিংহের বংশের ওয়াতন ছিল আধুনিক জয়পুর শহরের কাছে অম্বর বা আমের এলাকা। ওয়াতন জায়গিরের বৈশিষ্ট্য ছিল: (১) এটি বংশানুক্রমিক ছিল, অর্থাৎ পিতা থেকে পুত্র উত্তরাধিকারসূত্রে পেতেন। (২) ওয়াতন জায়গির থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের সম্পূর্ণটাই রাজপুত রাজা ভোগ করতেন। (৩) এর বিনিময়ে রাজপুত রাজারা মুঘল বাদশাহের আনুগত্য স্বীকার করতেন এবং প্রয়োজনে সৈন্য সরবরাহ করতেন। (৪) তবে কোনো রাজপুত রাজ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে গোলমাল হলে মুঘলরা সেই রাজ্য সাময়িকভাবে পুরোপুরি হাতে নিয়ে নিতেন এবং বাদশাহের ইচ্ছানুযায়ী নতুন শাসক বসাতেন।
29বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠায় পর্তুগিজ দমন কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠায় পর্তুগিজ দমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ: ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজ জলদস্যুরা বাংলার নদীপথ ও সমুদ্রতটে ব্যাপক লুঠপাট ও অত্যাচার চালাতো। তারা স্থানীয় বণিকদের জাহাজ আক্রমণ করত, মানুষ ধরে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ঔরঙ্গজেবের আমলে মুঘল সেনাপতি শায়েস্তা খান চট্টগ্রামের পর্তুগিজ জলদস্যুদের শক্ত ঘাঁটি দখল করেন এবং তাদের পরাজিত করেন। এর ফলে: (১) বাংলার নদী ও সমুদ্রপথ পর্তুগিজ আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়, (২) নিরাপদ সামুদ্রিক বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত হয়, (৩) চট্টগ্রাম বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়, (৪) বাংলার অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়। সুতরাং পর্তুগিজ দমন বাংলায় মুঘল শাসনের সাফল্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
30উত্তর ভারতে মুঘল শাসন না এলে কারা শাসন করত?
এটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঐতিহাসিক প্রশ্ন। উত্তর ভারতে মুঘল শাসন (বাবরের বিজয়, ১৫২৬ খ্রিঃ) না এলে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতো: (১) আফগানরা (লোদি বংশ) উত্তর ভারতে আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থাকত এবং দিল্লি সালতানাত হয়তো আরও কিছুকাল টিকে থাকত। (২) রাজপুত শক্তি—বিশেষ করে মেওয়াড়ের রানা সাঙ্গার নেতৃত্বে—উত্তর ভারতে এক শক্তিশালী হিন্দু রাজ্য গড়ে তুলতে পারত। (৩) শের শাহ সুরির মতো আফগান নেতারাও দিল্লি দখলের চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। (৪) তবে মনে রাখতে হবে, ভারত তখন ছোট ছোট আঞ্চলিক রাজ্যে বিভক্ত ছিল, কোনো একক শক্তির পূর্ণ আধিপত্য ছিল না। বাবরের কামান-বন্দুক সম্বলিত আধুনিক রণকৌশলই ভারতীয় যুদ্ধনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। তাই মুঘলরা না এলে ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে প্রবাহিত হতো—হয়তো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আগমনের প্রেক্ষাপটও ভিন্ন হতো।

Broad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

5 টি
1পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ ও ঘর্ঘরার যুদ্ধের তুলনা করো। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মুঘলরা জয়ী না হলে উত্তর ভারতে কারা শাসন করত বলে তুমি মনে করো?

ভূমিকা

বাবরের ভারত আক্রমণ ও মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পিছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ—পানিপথ (১৫২৬ খ্রিঃ), খানুয়া (১৫২৭ খ্রিঃ) ও ঘর্ঘরা (১৫২৯ খ্রিঃ)—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমেই বাবর উত্তর ভারতে মুঘল আধিপত্য সুদৃঢ় করেন।

তিনটি যুদ্ধের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বৈশিষ্ট্যপানিপথ (১৫২৬ খ্রিঃ)খানুয়া (১৫২৭ খ্রিঃ)ঘর্ঘরা (১৫২৯ খ্রিঃ)
প্রতিপক্ষইব্রাহিম লোদি (আফগান)রানা সংগ্রাম সিংহ (রাজপুত)আফগান জোট
রণকৌশলকামান-বন্দুক + ঘোড়সওয়ারএকই কৌশল, ধর্মযুদ্ধের ডাকনদীপথে নৌবহর ও স্থল অভিযান
ফলাফলদিল্লি সালতানাতের পতন, মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠারাজপুত শক্তির পরাজয়, উত্তর ভারতে মুঘল আধিপত্য সুদৃঢ়আফগানদের চূড়ান্ত পরাজয়, বাংলা-বিহারে মুঘল প্রভাব
ঐতিহাসিক গুরুত্বমধ্যযুগের সমাপ্তি ও মুঘল যুগের সূচনাধর্মীয় যুদ্ধ নয়—রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত

মুঘলরা জয়ী না হলে কারা শাসন করত?

যদি পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর জয়ী না হতেন, তাহলে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো: (১) ইব্রাহিম লোদি জিতলে লোদি বংশ আরও কিছুকাল টিকে থাকত, কিন্তু আফগানদের মধ্যে ঐক্যের অভাব ও দুর্বলতার কারণে হয়তো শীঘ্রই অন্য কোনো আফগান নেতা (যেমন শের খান সুরি) ক্ষমতা দখল করতেন। (২) রাজপুত শক্তি—বিশেষ করে রানা সাঙ্গার নেতৃত্বে—উত্তর ভারতের এক বড়ো অংশে এক শক্তিশালী হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুযোগ পেত। (৩) বাবরের পরাজয় ঘটলে মধ্য এশিয়ায় মুঘল শক্তি ভারত অভিমুখী হতো না, বরং উজবেক ও সফাবিদের সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকত। (৪) সবচেয়ে বড়ো কথা—মুঘল সাম্রাজ্যের যে সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক ও স্থাপত্যের অপূর্ব মিশ্রণ আমরা দেখতে পাই (আকবরের ধর্মনীতি, তাজমহল, মনসবদারি ব্যবস্থা), তা কখনোই ঘটত না। ভারতের ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্য পথে প্রবাহিত হতো।

উপসংহার

পানিপথ ছিল ভাগ্যনির্ধারক যুদ্ধ। বাবরের জয়ই ভারতীয় ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল এবং প্রায় ২০০ বছরব্যাপী মুঘল শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

2মুঘল শাসকদের রাজপুত নীতির পরিচয় দাও। আকবর থেকে ঔরঙ্গজেব পর্যন্ত রাজপুত নীতিতে কী কী মিল ও অমিল ছিল তা বিশ্লেষণ করো।

ভূমিকা

মুঘল সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ও সাফল্যের পিছনে রাজপুত নীতি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। হুমায়ুন প্রথম বুঝেছিলেন যে, হিন্দুভানের ক্ষমতা দখল করতে গেলে রাজপুত রাজাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা জরুরি, কারণ রাজপুতরাই ছিল উত্তর ভারতের বিশাল অঞ্চলের জমিদার ও যোদ্ধা। আকবর এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

আকবরের রাজপুত নীতি (সমন্বয় ও মৈত্রী)

  1. মনসবদারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: রাজপুত রাজাদের উচ্চ মনসব (পদ) দিয়ে মুঘল প্রশাসনের অংশ করা হয়। রাজা মানসিংহ ও রাজা টোডরমল ছিলেন এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
  2. বৈবাহিক সম্পর্ক: আকবর নিজে ও অন্যান্য শাহজাদারা রাজপুত রাজকন্যাদের বিয়ে করেন। আকবর তাঁর স্ত্রীদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার বজায় রেখেছিলেন।
  3. কর মকুব: ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে জিজিয়া ও তীর্থকর তুলে নেওয়া হয়, যা হিন্দু প্রজাদের (বিশেষ করে রাজপুতদের) সন্তুষ্ট করে।
  4. সুলহ-ই কুল (সর্বজনীন শান্তি): সকল ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা ও সম্মান প্রদর্শন।
  5. ধর্মান্তকরণ নিষিদ্ধ: যুদ্ধবন্দিদের জোর করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার প্রথা বন্ধ করা হয়।

জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের রাজপুত নীতি (ধারাবাহিকতা)

জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান মূলত আকবরের রাজপুত নীতিকেই অনুসরণ করেছিলেন। জাহাঙ্গীরের আমলে মেওয়াড় মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় (রানা প্রতাপের পুত্র অমর সিংহ উচ্চ মনসব পান)। শাহজাহানের আমলে রাজপুত সেনাপতিরা দূর মধ্যএশিয়াতেও লড়াই করতে গিয়েছিলেন। রাজপুতদের উচ্চপদ দেওয়া অব্যাহত ছিল।

ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি (বিচ্ছেদ ও সংঘাত)

ঔরঙ্গজেবের আমলে রাজপুত নীতিতে বড়ো পরিবর্তন আসে: (১) ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে জিজিয়া কর পুনরায় চাপানো হয়—আকবরের ১০০ বছর পর। (২) রাঠোরের যুদ্ধ (১৬৭৯ খ্রিঃ)-তে মুঘলরা রাজপুতদের (মেওয়াড় ও মারওয়াড়) সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। (৩) যুদ্ধে মুঘলদের সুবিধা হয়নি, বরং রাজপুতদের আনুগত্য হারাতে হয়।

মিল ও অমিল

বৈশিষ্ট্যমিল (সকলের মধ্যে)অমিল (পার্থক্য)
মনসবদারিসকলেই রাজপুতদের মনসব দিয়েছেনঔরঙ্গজেবের আমলে সংখ্যা বাড়লেও আস্থা কমে
জিজিয়া কর-আকবর তুলে নেন, ঔরঙ্গজেব পুনরায় চাপান
ধর্মীয় সহিষ্ণুতাজাহাঙ্গীর-শাহজাহানে কিছুটা বজায়আকবরে পূর্ণ, ঔরঙ্গজেবে অনুপস্থিত
ওয়াতন জায়গিরসকলেই বহাল রেখেছেনঔরঙ্গজেব রাঠোর যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেন

উপসংহার

আকবরের রাজপুত নীতি ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি। ঔরঙ্গজেবের কঠোর ধর্মীয় নীতি ও রাঠোরের যুদ্ধ সেই ভিত্তি নষ্ট করে, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

3দক্ষিণাত্য অভিযানের ফলে মুঘল শাসনের উপর কী প্রভাব পড়েছিল? ঔরঙ্গজেবের দক্ষিণাত্য নীতির সাফল্য ও ব্যর্থতা আলোচনা করো।

ভূমিকা

দক্ষিণাত্য (দাক্ষিণাত্য) ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য এক চিরন্তন চ্যালেঞ্জ। বাহমনি রাজ্যের পতনের পর দক্ষিণাত্যে কয়েকটি সুলতানি রাজ্যের (আহমেদনগর, বিজাপুর, গোলকুণ্ডা, বেরার, বিদর, খান্দেশ) উত্থান ঘটেছিল। আকবর থেকে ঔরঙ্গজেব—প্রত্যেক মুঘল বাদশাহই দক্ষিণাত্যে সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী ছিলেন। তবে ঔরঙ্গজেবের সময় এই অভিযান সবচেয়ে ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়।

প্রাথমিক সাফল্য

ঔরঙ্গজেবের আমলে (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিঃ) বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা মুঘলদের দখলে আসে (১৬৮৬ ও ১৬৮৭ খ্রিঃ)। মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন এত বড়ো আগে কখনো হয়নি—এটাই ছিল বাহ্যিক সাফল্য।

মারাত্মক ব্যর্থতা ও নেতিবাচক প্রভাব

  1. অর্থনৈতিক বিপর্যয়: বহু বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুঘল কোষাগার প্রায় শূন্য হয়ে যায়।
  2. সামরিক ক্লান্তি: মুঘল সেনাবাহিনী টানা ২৫ বছর দক্ষিণাত্যে যুদ্ধ করে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত হয়।
  3. মারাঠা শক্তির উত্থান: মারাঠা নেতা শিবাজীকে স্বাধীন রাজা বলে মেনে নিতে হয় এবং মারাঠারা এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।
  4. উত্তর ভারত অরক্ষিত: দীর্ঘদিন বাদশাহ দক্ষিণাত্যে থাকায় উত্তর ভারতে বিদ্রোহ (জাঠ, সৎনামি, শিখ, রাজপুত) দমন করা কঠিন হয়।
  5. ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু: পঁচিশ বছর যুদ্ধ করার পর ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেব দক্ষিণাত্যেই মারা যান—যা ছিল এক প্রতীকী পরাজয়।

উপসংহার

দক্ষিণাত্য নীতি ছিল ঔরঙ্গজেবের সবচেয়ে বড়ো ভুল। বাহ্যিকভাবে সাম্রাজ্যের আয়তন বাড়লেও, এই যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিল যে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। সমকালীন এক ইতিহাসবিদ বলেছিলেন—"ঔরঙ্গজেব মরুভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করতে গিয়ে ধ্বংস ডেকে এনেছিলেন"।

4মুঘলদের শাসনব্যবস্থা কেমন ছিল? মনসবদারি ও জায়গির ব্যবস্থা, জাবত ও দহসালা ব্যবস্থার পরিচয় দাও।

ভূমিকা

মুঘল শাসনব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সুসংহত ও কার্যকর, যা বিশাল সাম্রাজ্যকে প্রায় দুশো বছর ধরে শাসনের সক্ষমতা দিয়েছিল। এই ব্যবস্থার তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছিল: (ক) মনসবদারি ও জায়গির ব্যবস্থা (প্রশাসনিক ও সামরিক), (খ) জাবত ও দহসালা ব্যবস্থা (রাজস্ব), (গ) প্রাদেশিক শাসন (সুবা)।

মনসবদারি ও জায়গির ব্যবস্থা

মনসবদারি ব্যবস্থা ছিল মুঘল প্রশাসনের মেরুদণ্ড, যা আকবর প্রবর্তন করেন। মনসব অর্থ পদমর্যাদা। প্রত্যেক অভিজাত ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে একটি মনসব দেওয়া হতো। মনসবের দুটি পরিমাপক ছিল: (ক) জাত—পদমর্যাদা নির্ধারণ, (খ) সওয়ার—কতজন অশ্বারোহী সৈন্য রাখতে হবে তার সংখ্যা। প্রত্যেক মনসবদারকে তাঁর পদের অনুপাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য বাদশাহের জন্য প্রস্তুত রাখতে হতো।

জায়গির ব্যবস্থা: মনসবদারদের নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গির (জমি) দেওয়া হতো। সেই জমির রাজস্ব থেকে তাঁরা সৈন্যবাহিনীর খরচ ও নিজের জীবিকা চালাতেন। রাজপুত রাজাদের ক্ষেত্রে ওয়াতন জায়গির (পৈতৃক এলাকা) বজায় থাকত।

জাবত ও দহসালা ব্যবস্থা

জাবত: জাবত মানে জমির রাজস্ব নির্ধারণ। জমি জরিপ করে, জমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারিত হতো। একেই বলা হয় জাবত ব্যবস্থা।

দহসালা: দহ মানে দশ। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে আকবর রাজা টোডরমলের সাহায্যে দহসালা ব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থায় গত দশ বছরের ফসল উৎপাদনের গড় হিসাব করে নগদে রাজস্ব ধার্য করা হতো। একে টোডরমলের বন্দোবস্তও বলা হয়। তবে সারা সাম্রাজ্যে এটি চালু ছিল না।

গুরুত্বপূর্ণ: আকবরের রাজস্ব ব্যবস্থায় রাজার স্বার্থ যেমন দেখা হয়েছে, তেমনি কৃষকদের সুবিধার কথাও মাথায় রাখা হয়েছে। দুঃসময়ে সরকার কৃষকদের ঋণ দিত এবং কখনো রাজস্ব মকুবও করা হতো।

প্রাদেশিক শাসন (সুবা)

আকবর সাম্রাজ্যকে ১৫টি সুবা (প্রদেশ)-তে বিভক্ত করেছিলেন। প্রতিটি সুবার প্রধান ছিলেন সুবাদার (বা সুবাহদার/নাজিম)। সুবা আবার কয়েকটি সরকার (জেলা) ও পরগনায় বিভক্ত ছিল।

উপসংহার

মুঘল শাসনব্যবস্থা ছিল তার সময়ের জন্য অত্যন্ত আধুনিক ও কার্যকর। মনসবদারি ও জায়গির ব্যবস্থা প্রশাসন ও সামরিক শক্তির যোগান দিয়েছিল, আর জাবত-দহসালা ব্যবস্থা রাজস্বের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছিল। এই ব্যবস্থার দুর্বলতা (বিশেষ করে ঔরঙ্গজেবের আমলে মনসবদার বাড়লেও জায়গির না বাড়া) পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হয়েছিল।

5মুঘলদের উত্তরাধিকার নীতি কী ছিল? এই বিষয়টি কীভাবে তাদের শাসনকে প্রভাবিত করেছিল?

ভূমিকা

মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতাগুলির মধ্যে উত্তরাধিকারের সুনির্দিষ্ট নীতির অভাব ছিল অন্যতম। এ বিষয়ে কোনো লিখিত নিয়ম বা আইন ছিল না। যে নীতি প্রচলিত ছিল, ইতিহাসবিদেরা তাকে বলে থাকেন যোগ্যতমের উদবর্তন (Survival of the Fittest)।

উত্তরাধিকারের রীতি

  • জ্যেষ্ঠ পুত্রের স্বয়ংক্রিয় অধিকার ছিল না: ইউরোপের মতো বড়ো ছেলে সিংহাসন পাবে—এমন নিয়ম মুঘলদের ছিল না।
  • বাদশাহ যে কাউকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে পারতেন: কিন্তু মৃত্যুর পর সেই মনোনয়ন খুব কম ক্ষেত্রেই সম্মানিত হতো।
  • যিনি যুদ্ধে জিততেন, তিনিই হতেন বাদশাহ: ভাইয়ে-ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধই ছিল নিয়তি।

প্রভাব: কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা

বাদশাহের মৃত্যুগৃহযুদ্ধে জড়িত পক্ষফলাফল
বাবর (১৫৩০)হুমায়ুন বনাম ভাইয়েরাহুমায়ুন জয়ী, কিন্তু ভাইদের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে
শাহজাহান (১৬৫৭-৫৮)দারা শিকোহ বনাম ঔরঙ্গজেব, শাহ সুজা, মুরাদঔরঙ্গজেব জয়ী, দারা নিহত, পরিবারে তিক্ততা
ঔরঙ্গজেব (১৭০৭)পুত্রদের মধ্যে যুদ্ধসাম্রাজ্যের দ্রুত পতন শুরু

শাসনের উপর প্রভাব

  1. প্রতিটি মৃত্যুই গৃহযুদ্ধ ডেকে আনত: মূল্যবান সম্পদ, সময় ও সৈন্য গৃহযুদ্ধে ধ্বংস হতো।
  2. পরিবারে বিভাজন: পিতা-পুত্র, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে বিশ্বাস ও ভালোবাসার বদলে সন্দেহ ও শত্রুতা বিরাজ করত।
  3. অভিজাতদের সুবিধাবাদ: অভিজাতরা যুদ্ধের সময় পক্ষ বদল করতেন—যাঁকে জয়ী মনে হতো, তাঁর পক্ষে যোগ দিতেন।
  4. সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল: গৃহযুদ্ধ সাম্রাজ্যের ভিতকে ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলত।
  5. পতনের পথ প্রশস্ত: ঔরঙ্গজেবের পর পুত্রদের উত্তরাধিকার যুদ্ধের দুর্বলতার সুযোগে নাদির শাহ (১৭৩৯ খ্রিঃ) ও আহমদ শাহ আবদালি আক্রমণ করেন।

উপসংহার

উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট নিয়মের অভাব মুঘল সাম্রাজ্যের জন্মগত ত্রুটি ছিল। এই ত্রুটিই শেষ পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিয়েছিল। তিমুরীয় রীতি—"রাজ্য ভাইদের মধ্যে ভাগ করে দাও"—মুঘলদের ধ্বংসের বীজ বপন করেছিল।

মনে রেখো!

বাবর ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে জিতে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আকবরের রাজপুত নীতি (সুলহ-ই কুল) ও মনসবদারি ব্যবস্থা সাম্রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করে। ঔরঙ্গজেবের কঠোর ধর্মীয় নীতি, জিজিয়া কর পুনরায় চাপানো ও দীর্ঘ দক্ষিণাত্য যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণ!

Sponsored Links

মুঘল সাম্রাজ্য - সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর

Science Tips-এ স্বাগত! WBBSE Class 7 History-র পঞ্চম অধ্যায় "মুঘল সাম্রাজ্য"-র A+++ মানের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা। এই অধ্যায় থেকে তুমি পাবে—মুঘলদের উৎপত্তি (তৈমুর-চেঙ্গিস খান), বাবরের পানিপথ যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রিঃ) ও রণকৌশল, হুমায়ুনের পলায়ন, আকবরের রাজপুত নীতি ও সুলহ-ই কুল, জাবত-দহসালা রাজস্ব ব্যবস্থা, মনসবদারি ও জায়গির প্রথা, জাহাঙ্গীর-শাহজাহানের শাসন, ঔরঙ্গজেবের জিজিয়া কর ও রাঠোরের যুদ্ধ, দক্ষিণাত্য নীতি ও মারাঠা প্রতিরোধ, মুঘল চিত্রকলা, এবং সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। প্রতিটি SAQ ও Broad Question-এর সাথে দেওয়া আছে সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত উত্তর। সকল উত্তর দৃশ্যমান—কোনো বোতাম টিপতে হবে না! পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে আজই পড়া শুরু করো!

Frequently Asked Questions

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর। তিনি ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতে মুঘল শাসনের সূচনা করেন। বাবর ছিলেন পিতার দিক থেকে তৈমুরের ও মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর।

মনসবদারি ব্যবস্থা মুঘল সম্রাট আকবর চালু করেন। মনসব অর্থ পদমর্যাদা। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক অভিজাত ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীকে একটি মনসব (পদ) দেওয়া হতো এবং তাঁর পদের অনুপাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য বাদশাহের জন্য প্রস্তুত রাখতে হতো। বেতনের পরিবর্তে মনসবদারদের জায়গির (জমি) দেওয়া হতো।

সুলহ-ই কুল (Sulh-i Kul) হলো আকবরের বিখ্যাত ধর্মীয় নীতি, যার অর্থ সর্বজনীন শান্তি বা সকলের সঙ্গে শান্তি। এই নীতির আওতায় আকবর সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা প্রদর্শন, জিজিয়া ও তীর্থকর তুলে নেওয়া, যুদ্ধবন্দিদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা নিষিদ্ধকরণ এবং বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের সঙ্গে ইবাদতখানায় ধর্মালোচনার ব্যবস্থা করেছিলেন।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রিঃ) ছিল ভারতের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লি সালতানাতের পতন ঘটিয়ে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। বাবরের কামান-বন্দুক সম্বলিত রণকৌশল ভারতীয় যুদ্ধনীতিতে বিপ্লব আনে।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি হলো: (১) উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় গৃহযুদ্ধ, (২) ঔরঙ্গজেবের কঠোর ধর্মীয় নীতি ও জিজিয়া কর পুনরায় চাপানো, (৩) দীর্ঘস্থায়ী দক্ষিণাত্য যুদ্ধে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, (৪) আঞ্চলিক শক্তির (মারাঠা, শিখ, রাজপুত) উত্থান, (৫) অভিজাত গোষ্ঠীগুলির মধ্যে রেষারেষি।