জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি : সুলতানি ও মুঘল যুগ প্রশ্ন উত্তর

WBBSE Class 7 History Chapter 7 - ভক্তি, সুফিবাদ, স্থাপত্য, শিল্পকলা, ভাষা ও সাহিত্য | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 12 May 2026 Last Update: 27 August 2026
জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি : সুলতানি ও মুঘল যুগ - Class 7 History Chapter 7

জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি : সুলতানি ও মুঘল যুগ

ভক্তি ও সুফিবাদ, স্থাপত্য, ভাষা ও সাহিত্য এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর | 40 MCQ | 30 SAQ | 6 Broad Questions

ভক্তি ও সুফিবাদ মুঘল স্থাপত্য ভাষা ও সাহিত্য মিনিয়েচার শিল্প বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জীবনযাত্রা
🙏

ভক্তি ও সুফিবাদ

কবীর, নানক, মীরাবাঈ, শ্রীচৈতন্য ও সুফি সাধকদের প্রেম ও সাম্যের বাণী।

🕌

স্থাপত্য শিল্প

কুতুব মিনার, তাজমহল, ফতেহপুর সিকরি, চাহার বাগ ও জোড়-বাংলা মন্দির।

📖

ভাষা ও শিল্প

ফারসি সাহিত্য, ক্যালিগ্রাফি, মিনিয়েচার, মঙ্গলকাব্য ও শিবায়ন।

⚙️

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

চরকা, পারসিক চক্র (সাকিয়া), কাগজ ও বারুদের ব্যবহার।

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

40 টি
1কী ব্যবহার করে বাংলায় সুলতানি এবং মুঘল আমলে সাধারণ লোকের বাড়ি বানানো হতো?
2কবীরের দুই পংক্তির কবিতাগুলিকে কী বলা হয়?
3সুফিরা গুরুকে কী মনে করত?
4চৈতন্য-আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র কোথায় ছিল?
5কে শ্রীকৃষ্ণ বা গিরিধারীর সাধিকা ছিলেন?
6দীন-ই ইলাহি-র বৈশিষ্ট্য ছিল মুঘল সম্রাট এবং তাঁর অভিজাতদের মধ্যে কীরূপ সম্পর্ক?
7শ্বেতপাথরে রত্ন বসিয়ে কারুকার্য করাকে কী বলে?
8মহাভারতের ফারসি অনুবাদের নাম কী?
9কে 'শিরিনকলম' নামে পরিচিত ছিলেন?
10জৌনপুরি রাগ কে তৈরি করেন?
11শ্রীকৃষ্ণবিজয় কাব্যের লেখকের নাম কী?
12'পারসিক চক্র' কী কাজে লাগানো হতো?
13নদীর ধারে শিল্পগুলি তৈরি হওয়ার প্রধান কারণ কী ছিল?
14চৈতন্য বাংলা ভাষাকেই ভক্তি প্রচারের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন কেন?
15চিশতি সুফিরা রাজনীতিতে যোগ দিতেন না কেন?
16আকবর দীন-ই ইলাহি প্রবর্তন করেন কেন?
17মুঘল সম্রাটরা দুর্গ বানাতে আগ্রহী ছিলেন কেন?
18জাহাঙ্গিরের আমলে ইউরোপীয় ছবির প্রভাব মুঘল চিত্রশিল্পে পড়েছিল, এর কারণ কী?
19মধ্যযুগের মণিপুরী নৃত্যে রাধা-কৃষ্ণ ছিলেন প্রধান চরিত্র, কেন?
20ভারতে প্রাচীনকালে তালপাতার উপরে লেখা হতো, এর কারণ কী?
21দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলনের সাধকদের কী বলা হতো?
22শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম কী?
23সুফিবাদের আবির্ভাব কোথায় হয়েছিল?
24দিল্লিতে কুতুব মিনার নির্মাণের কাজ কে শুরু করেছিলেন?
25ফতেহপুর সিকরির বিখ্যাত স্থপতি বা নির্মাতা কে ছিলেন?
26তাজমহল কোন নদীর তীরে অবস্থিত?
27চারমিনার কোন শহরে অবস্থিত?
28গোল গুম্বদ কোথায় অবস্থিত?
29বাংলায় মন্দির নির্মাণে 'জোড়-বাংলা' রীতির মূল বৈশিষ্ট্য কী?
30আদিনা মসজিদ কোথায় অবস্থিত?
31বইয়ের পাতায় সুন্দর হাতের লেখাকে কী বলা হয়?
32'মিনিয়েচার' কথাটির অর্থ কী?
33বাদশাহ আকবরের দরবারের বিখ্যাত সংগীতশিল্পীর নাম কী?
34'সবক-ই হিন্দ' কী?
35রামায়ণ বাংলায় কে অনুবাদ করেন?
36মঙ্গলকাব্য সাধারণত কাদের নিয়ে লেখা হতো?
37ইউরোপীয় চিকিৎসা-পদ্ধতি ভারতে প্রথম কবে আসে?
38তুলো বোনার যন্ত্র 'চরকা' ভারতে কোন শতকে আসে?
39ছাপাখানার প্রযুক্তি ভারতে কারা নিয়ে আসেন?
40মণিপুরী নৃত্যের রাসলীলার ধারা কার হাতে বিকশিত হয়?

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

30 টি
1সুলতানি ও মুঘল যুগে কারিগরী শিল্পের ভিত্তি কী ছিল?
সুলতানি ও মুঘল যুগে কৃষিপণ্যকে ভিত্তি করে গ্রামে কারিগরী শিল্প চলত। চিনি এবং নানান সুগন্ধি আতর তৈরির শিল্প ছিল বিখ্যাত। এই শিল্পগুলি বংশগত ছিল, তাই পুরোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও শিল্পদ্রব্যগুলির মান অসাধারণ হতো।
2বহলোলি মুদ্রা কী?
বহলোলি মুদ্রা হলো সুলতান বহলোল লোদির আমলে চালু হওয়া এক বিশেষ ধরনের মুদ্রা। সুলতান ইব্রাহিম লোদির রাজত্বকালে জিনিসের দাম খুব সস্তা থাকায়, মাত্র একটি বহলোলি মুদ্রা দিয়ে লোকেরা দশ মণ খাদ্যশস্য, পাঁচ সের তেল এবং দশ গজ মোটা কাপড় কিনতে পারত।
3ভক্তিবাদের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য কী কী?
ভক্তিবাদের দুটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল: ১) ভগবানের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করা, এবং ২) ঈশ্বরলাভের জন্য জ্ঞান বা যোগ ছেড়ে ভক্তের ভক্তি বা গভীর ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দেওয়া।
4অলভার ও নায়নার কাদের বলা হতো?
খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের গোড়ায় দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। সেখানকার বিষ্ণু ভক্তদের 'অলভার' এবং শিব ভক্তদের 'নায়নার' (বা নায়নমার) বলা হতো। তাঁরা সরল তামিল ভাষায় নিজেদের ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা জানাতেন।
5গুরু নানক কে ছিলেন?
গুরু নানক (১৪৬৯-১৫৩৮ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান ভক্তি সাধক। তিনি কোনো ভেদাভেদ না মেনে সব মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং লঙ্গরখানা চালু করেছিলেন। তাঁর দর্শন ও বাণীর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে শিখ ধর্ম গড়ে ওঠে।
6কবীর কে ছিলেন? দোহা কী?
কবীর ছিলেন পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের একজন বিখ্যাত ভক্তিসাধক, যিনি বারাণসীতে এক মুসলিম তাঁতি পরিবারে পালিত হন। তিনি সব ধর্ম ও ভগবানকে এক বলে প্রচার করতেন। হিন্দি ভাষায় রচিত তাঁর দুই পংক্তির কবিতাকে 'দোহা' বলা হয়, যেগুলির মাধ্যমে তিনি লোক-দেখানো আচারের বিরোধিতা করতেন।
7মীরাবাঈ কে ছিলেন?
মীরাবাঈ (১৪৯৮-১৫৪৪ খ্রি.) ছিলেন রাজস্থানের এক ক্ষত্রিয় বংশের কন্যা ও মেওয়ারের শাসককুলের বধূ। তিনি সমস্ত সাংসারিক বন্ধন ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণ বা গিরিধারীর প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তিতে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর রচিত পাঁচশোরও বেশি ভক্তিগীতি ভারতীয় সংগীত ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
8সুফি সাধকদের কটি সিলসিলা ভারতে প্রভাবশালী ছিল?
ভারতে সুফি সাধকদের মূলত দুটি গোষ্ঠী বা সিলসিলা খুব প্রভাবশালী ছিল: ১) দিল্লি ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে 'চিশতি' সম্প্রদায়, এবং ২) সিন্ধু, পাঞ্জাব ও মুলতানে 'সুহরাবর্দি' সম্প্রদায়।
9'বা-শরা' এবং 'বে-শরা' সুফি কাদের বলা হতো?
সুফিরা প্রধানত দুই প্রকারের ছিল। 'বা-শরা' বলতে তাদের বোঝাত যারা ইসলামীয় আইন (শরা) মেনে চলত (যেমন চিশতি ও সুহরাবর্দি)। অন্যদিকে 'বে-শরা' বলতে তাদের বোঝাত যারা এই আইন মানত না (যেমন কালানদার সম্প্রদায়)।
10পির ও মুরিদ বলতে কী বোঝায়?
সুফি সাধনায় 'পির' বলতে গুরুকে এবং 'মুরিদ' বলতে শিষ্যকে বোঝানো হয়। সুফি সিলসিলার প্রধান ব্যক্তি হতেন একজন পির, যিনি খানকা বা আশ্রমে থেকে তাঁর মুরিদ বা শিষ্যদের ধর্মভাবনা ও দর্শন শিক্ষা দিতেন।
11শ্রীচৈতন্য কে ছিলেন?
শ্রীচৈতন্য ছিলেন ষোড়শ শতকের বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ ও ধর্ম সংস্কারক। তিনি নবদ্বীপে জাত-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদের বিরুদ্ধে বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের প্রচার করেন। তাঁর প্রচারিত সহজ-সরল ভক্তিধর্ম ও নামকীর্তন সমগ্র বাংলায় এক বিপুল সামাজিক জাগরণ তৈরি করেছিল।
12নামকীর্তন ও নগরকীর্তনের পার্থক্য কী?
শ্রীচৈতন্য দু-রকমের কীর্তন সংগঠিত করেন। 'নামকীর্তন' হলো ঘরে বা একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসে ভগবানের নামগান করা। অন্যদিকে 'নগরকীর্তন' হলো নগরের পথে পথে শোভাযাত্রা করে ঘুরে ঘুরে নেচে-গেয়ে ভগবানের নাম প্রচার করা।
13শ্রীমন্ত শঙ্করদেব কে ছিলেন?
শ্রীমন্ত শঙ্করদেব ছিলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের অসমে ভক্তি আন্দোলনের প্রধান রূপকার। তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদী এবং কৃষ্ণের উপাসক। তাঁর প্রচারিত 'নাম ধর্ম' ব্রহ্মপুত্র নদের দু-পাড়ে কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
14দীন-ই ইলাহি কী?
দীন-ই ইলাহি কোনো আলাদা নতুন ধর্ম ছিল না। এটি ছিল মুঘল সম্রাট আকবরের প্রতি চূড়ান্ত অনুগত কয়েকজন অভিজাতদের মধ্যে প্রচারিত একটি মতাদর্শ। বিভিন্ন ধর্মের গুরুদের সাথে আলোচনা করে যুক্তিসঙ্গত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তিনি এই মতাদর্শ তৈরি করেছিলেন, যেখানে অনুগামীরা বাদশাহের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত থাকার শপথ নিত।
15সুলতানি আমলের স্থাপত্যের মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
সুলতানি আমলের স্থাপত্যে ভারতীয় ও ইসলামীয় শিল্প মিলেমিশে ইন্দো-ইসলামীয় শিল্পরীতি তৈরি হয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল খিলান ও গম্বুজের ব্যবহার। ইঁট ও পাথরের গায়ে চমৎকার সুন্দর কারুকার্য এবং জ্যামিতিক নকশা এই যুগের স্থাপত্যের অন্যতম দিক ছিল।
16কুতুব-চত্বর বলতে কী বোঝায়?
দিল্লিতে কুতুব মিনার, সুলতান ইলতুৎমিশের সমাধি এবং সুলতান আলাউদ্দিন খলজির তৈরি আলাই দরওয়াজা—এই সমস্ত বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলিকে একসঙ্গে 'কুতুব-চত্বর' বলা হয়। এটি সুলতানি স্থাপত্যের এক অনন্য নজির।
17'চাহার বাগ' কী?
মুঘল আমলে বাগান তৈরির একটি বিশেষ রীতি হলো 'চাহার বাগ' (চার বাগ)। এই পদ্ধতিতে একটি বাগানকে জল চলাচলের নালা দিয়ে সমান চার ভাগে ভাগ করা হতো। বাবর, জাহাঙ্গির ও শাহ জাহানের আমলে এই ধরণের বাগান খুব জনপ্রিয় ছিল (যেমন- তাজমহলের বাগান)।
18পিয়েত্রা দুরা কী? এর একটি উদাহরণ দাও?
মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমল থেকে স্থাপত্যের দেওয়ালে শ্বেতপাথরের উপর মূল্যবান রত্ন বসিয়ে যে বিশেষ ধরনের রঙিন কারুকার্য করার চল শুরু হয়, তাকে 'পিয়েত্রা দুরা' (Pietra Dura) বলে। আগ্রায় অবস্থিত ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধি সৌধ এবং তাজমহলে এই কারুকার্যের প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়।
19জোড়-বাংলা এবং চালা-ভিত্তিক মন্দির কী?
বাংলার বৃষ্টির জল যাতে ছাদ থেকে সহজে গড়িয়ে পড়ে, তার জন্য মন্দিরের ছাদ ঢালু করে বাঁকানো হতো, একে চালা বলা হতো। দুটি চালা-ভিত্তিক কাঠামো পাশাপাশি জুড়ে যে মন্দির তৈরি হতো, তাকে 'জোড়-বাংলা' মন্দির বলা হয়। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে এমন মন্দির দেখা যায়।
20ক্যালিগ্রাফি ও মিনিয়েচার বলতে কী বোঝায়?
'ক্যালিগ্রাফি' (Calligraphy) বা হস্তলিপিবিদ্যা হলো বইয়ের পাতায় অত্যন্ত সুন্দর ও শৈল্পিক অক্ষরে লেখার কলা। অন্যদিকে, 'মিনিয়েচার' (Miniature) হলো বইয়ের পাতাকে অলংকৃত করার জন্য আঁকা খুব ছোটো আকারের অণুচিত্র বা ক্ষুদ্র চিত্র।
21'সবক-ই হিন্দ' কী?
মধ্যযুগের বিখ্যাত ফারসি সাহিত্যিক ও দার্শনিক আমির খসরু ফারসি কাব্য রচনার ক্ষেত্রে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এক সম্পূর্ণ নতুন রচনাশৈলী বা স্টাইল আবিষ্কার করেন। এই নতুন ফারসি রচনাশৈলীকেই 'সবক-ই হিন্দ' বলা হয়।
22মঙ্গলকাব্য কী? কয়েকটি মঙ্গলকাব্যের নাম লেখো।
মধ্যযুগে বাংলায় চণ্ডী, মনসা, ধর্মঠাকুর প্রভৃতি লৌকিক দেব-দেবীদের মহিমা প্রচার করে যে কাহিনীমূলক কাব্য রচিত হতো, তাকে মঙ্গলকাব্য বলে। বিশ্বাস ছিল এই কাব্য শুনলে বা দেবতার পুজো করলে ভালো বা মঙ্গল হবে। উদাহরণ: চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল।
23শিবায়ন কী?
মধ্যযুগে বাংলায় দেবতা শিবকে নিয়ে যে সাহিত্য লেখা হয়েছিল, তাকে 'শিবায়ন' বলে। পুরাণের শিবের সাথে বাংলার গরিব কৃষক পরিবারকে মিলিয়ে এই কাব্যগুলি লেখা হয়, যেখানে শিব নিজে চাষবাস করে রোজগারের চেষ্টা করছেন এমন সাধারণ জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে।
24নাথ সাহিত্য কী?
নাথ-যোগী সম্প্রদায়ের ধর্ম-কর্ম, আচার-আচরণ এবং জীবন দর্শন নিয়ে বাংলায় যে সাহিত্য রচিত হয়েছিল, তাকে নাথ সাহিত্য বলে। এতে সন্ন্যাস-জীবন যাপনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। 'ময়নামতীর কথা' ও 'গোপীচন্দ্রর গান' এই সাহিত্যের বিখ্যাত অংশ।
25মধ্যযুগে ভারতে কাগজের ব্যবহার কীভাবে শুরু হয়?
খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে চিনে প্রথম কাগজ আবিষ্কৃত হয়। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে কাগজ তৈরি করার প্রযুক্তি চিন থেকে প্রথম নিয়ে আসে মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলরা। এরপর খুব দ্রুত ভারতে কাগজের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।
26সাকিয়া বা পারসিক চক্র কী?
খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতক নাগাদ পারস্যদেশ থেকে ভারতে আসা 'সাকিয়া' বা পারসিক চক্র (Persian Wheel) হলো ছোটো নাগরদোলার মতো দেখতে কাঠের তৈরি একটি যন্ত্র। এতে বেল্ট ও গিয়ার লাগানো থাকত, যার মাধ্যমে পশুশক্তি ব্যবহার করে কুয়ো বা খাল থেকে সহজে জল তোলা যেত।
27'সমা' কী?
খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে সুফি পিররা ঈশ্বর সাধনার অংশ হিসেবে যে বিশেষ ধরনের আধ্যাত্মিক সুফি কীর্তন বা গানে মেতে উঠতেন, তাকেই 'সমা' বলা হতো।
28'শিরিন কলম' কার উপাধি ছিল এবং কেন?
'শিরিন কলম' অর্থাৎ 'মিষ্টি কলম' উপাধি ছিল পারস্যের সিরাজ শহর থেকে আগত প্রখ্যাত মুঘল চিত্রশিল্পী খোয়াজা আবদুস সামাদের। তাঁর হাতের লেখা এবং আঁকার সূক্ষ্মতা ও সৌন্দর্য এতটাই মধুর ছিল যে তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
29আকবরনামা ও আইন-ই-আকবরি কে রচনা করেন?
মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের ইতিহাস, প্রশাসন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে লেখা 'আকবরনামা' এবং 'আইন-ই-আকবরি' গ্রন্থ দুটি রচনা করেছিলেন তাঁর রাজসভার অন্যতম রত্ন ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল।
30সুলতানি ও মুঘল আমলে সামরিক প্রযুক্তিতে কী পরিবর্তন আসে?
এই যুগে সামরিক প্রযুক্তিতে বড়ো পরিবর্তন আসে। মোঙ্গলদের হাত ধরে বারুদ-চালিত আগ্নেয়াস্ত্র আসে। এরপর বন্দুক ও কামানের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় মুঘলদের হাতে। ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের সুবিধার জন্য পাদানি বা রেকাবের ব্যবহার তুর্কি বাহিনীকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল।

Broad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

6 টি
1মধ্য যুগের ভারতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল তা লেখো।

ভূমিকা

সুলতানি ও মুঘল যুগে রাজা-বাদশাহদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত দেশের অগণিত সাধারণ মানুষের জীবন। অথচ এই গরিব জনগণ, চাষি ও কারিগরদের পরিশ্রমের আয়েই শাসনকার্য চলত। সে যুগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সরল, অভাবের এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রমে পূর্ণ।

বাসস্থান ও গৃহস্থালি

দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামেই বাস করতেন। সাধারণ জনগণের মাথা গোঁজার ঠাঁই করার জন্য সামান্য উপকরণ লাগত। কয়েকটি গাছের গুঁড়ি আর চাল ছাইবার খড় দিয়ে তারা ঘর তুলত। একটা পাতকুয়া, ডোবা বা পুকুর থাকলেই বসতি তৈরি হয়ে যেত। মুঘল যুগে ওলন্দাজ বণিকের বিবরণ থেকে জানা যায়, গরিবদের ঘরে একজোড়া খাটিয়া এবং রান্নার দু-একখানা সাধারণ বাসন ছাড়া আর বিশেষ কিছু থাকত না। বিছানার চাদর একটি বা দুটি থাকত যা দারুণ শীতে কষ্টদায়ক হতো।

পেশা ও কৃষিকাজ

গ্রামের মানুষদের প্রধান পেশা ছিল চাষবাস। স্থানীয় চাহিদা মেটানোই ছিল মূল লক্ষ্য। আম, আঙুর, খেজুর, কলা, কাঁঠাল, ধান, ডাল এবং লঙ্কা, আদার মতো মশলার চাষ হতো। এছাড়া বংশগত কারিগরী শিল্প, যেমন- আতর তৈরি, চিনি তৈরি, বস্ত্রশিল্প, ও ধাতুর কাজ রোজগারের উপায় ছিল। শাসকরা ফসলের একটা বড় অংশে ভাগ বসাত, বাকি সামান্য অংশ দিয়ে কৃষকদের জীবন চলত।

খাদ্য ও পোশাক

রোজকার খাবার ছিল অত্যন্ত সাধারণ। মাংসের স্বাদ গরিবরা প্রায় জানতই না। তাদের রোজের খাবার ছিল একঘেয়ে খিচুড়ি। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর বিকেলে একবার মাত্র পেট ভরে খেত তারা। পরবার পোশাকও ছিল খুব সামান্য, যা শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

সামাজিক জীবন ও বিনোদন

সমাজ ছিল যৌথ পরিবারভিত্তিক। সমাজে নারীদের স্থান ছিল পুরুষদের নীচে এবং পর্দা প্রথা চালু ছিল। তবে গরিব কৃষক পরিবারে নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে কাজ করত, সেখানে পর্দা বিশেষ মানা হতো না। বিনোদনের উপকরণ ছিল খুব সামান্য—কুস্তি, তির-ধনুক, বাঁটুল ছোঁড়া, সাঁতার এবং মাঝে মাঝে লোকগান, নাচ বা জাদুকরের খেলা।

উপসংহার

দিল্লিতে শাসকদের বদল ঘটলেও সুলতানি ও মুঘল যুগে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাড়ভাঙা পরিশ্রম, সামান্য আহার আর অভাবের সংসার—এটুকুই ছিল ভারতের গরিব কৃষক, কারিগর ও শ্রমিকদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা।

2সুলতানি ও মুঘল যুগে ভক্তি আন্দোলন ও সুফিবাদের মূল কথা কী ছিল? কবীর ও গুরু নানকের ভূমিকা আলোচনা করো।

ভূমিকা

মধ্যযুগের ভারতের জীবনযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল ধর্ম। পুরোনো ব্রাহ্মণ্যবাদ বা অন্যান্য প্রচলিত ধর্মের আচার-সর্বস্বতা যখন মানুষের মন থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন সমাজে ভক্তি ও সুফিবাদের উদ্ভব ঘটে। এই দুই মতবাদই ভগবানের সাথে ভক্তের আত্মিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছিল।

ভক্তি ও সুফিবাদের মূল কথা

ভক্তিবাদের মূল কথা: ভক্তিবাদের মূলে ছিল ভগবানের প্রতি ভক্তের অকপট ভালোবাসা বা ভক্তি। এর দুটি বৈশিষ্ট্য ছিল—প্রথমত, ভগবানের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করা। দ্বিতীয়ত, ঈশ্বরলাভের জন্য কোনো কঠিন জ্ঞান বা যোগ-সাধনা নয়, কেবল ভক্তিকেই একমাত্র উপায় হিসেবে মেনে নেওয়া। ভেদাভেদ ভুলে সব মানুষের কাছে ঈশ্বরের বাণী পৌঁছে দেওয়াই ছিল ভক্তি দর্শনের লক্ষ্য।

সুফিবাদের মূল কথা: সুফিবাদও ছিল প্রচলিত ধর্মীয় আইন-কানুনের বাইরে ঈশ্বরকে ডাকার এক সহজ পথ। খোলামেলা জীবনযাপন, ধর্মের আচারসর্বস্বতার বিরোধিতা এবং ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন—এটাই ছিল সুফি সাধনার (যেমন চিশতি বা সুহরাবর্দি সিলসিলা) মূল ভিত্তি। সুফিরা সব মানুষকে একসাথে শান্তিতে রাখার চেষ্টা করতেন।

সন্ত কবীরের ভূমিকা

পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের ভক্তিসাধক কবীর ছিলেন হিন্দু ও মুসলিম ঐক্যের এক প্রতীক। এক মুসলিম তাঁতি পরিবারে পালিত কবীর বিশ্বাস করতেন যে সব ভগবানই এক—রাম, হরি, আল্লাহ বা সাঁই, সবাই এক ঈশ্বরেরই নানা নাম। তিনি বলতেন, ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য মন্দিরে বা মসজিদে যাওয়ার দরকার নেই, মানুষ নিজের মনের ভক্তি দিয়েই ভগবানকে পাবে। তিনি দোহা বা দুই লাইনের কবিতার মাধ্যমে লোক-দেখানো আচারের তীব্র সমালোচনা করতেন।

গুরু নানকের ভূমিকা

গুরু নানক (১৪৬৯-১৫৩৮ খ্রি.) ছিলেন আরেকজন শ্রেষ্ঠ ভক্তি সাধক, যাঁর দর্শন থেকে পরে শিখ ধর্ম গড়ে ওঠে। তিনি ধর্ম, জাত ও বর্ণের কোনো ভেদাভেদ মানতেন না। সব মানুষকে আপন করে নিতে তিনি লঙ্গরখানা চালু করেন, যেখানে উঁচুজাত-নিচুজাত নির্বিশেষে সব মানুষ একসাথে বসে খেত। তাঁর বাণীগুলি সাধারণ মানুষের অত্যন্ত কাছের ছিল।

উপসংহার

ভক্তি ও সুফিবাদ মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজে একটি শান্তির বাতাবরণ তৈরি করেছিল। কবীর, নানক ও সুফিসন্তরা সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছিলেন যে, জাতপাত বা কঠোর ধর্মীয় নিয়ম নয়, বরং বিশুদ্ধ প্রেম ও ভক্তিই হলো ঈশ্বরকে পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পথ। এর প্রভাব ভারতের সংস্কৃতিতে আজও বর্তমান।

3বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রভাব ও শ্রীচৈতন্যের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

ভূমিকা

ষোড়শ শতকে বাংলায় ভক্তি আন্দোলনের এক নবজাগরণ ঘটে শ্রীচৈতন্যদেব এবং তাঁর সঙ্গীদের হাত ধরে। আগে থেকেই থাকা বৈষ্ণবীয় ঐতিহ্য এবং ভক্তিবাদের ভাবনাকে মিলিয়ে শ্রীচৈতন্য বাংলায় এমন এক ধর্ম-আন্দোলন তৈরি করেছিলেন, যা জাত-পাত ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদে পরিণত হয়েছিল।

শ্রীচৈতন্যের ভূমিকা ও প্রচারের কাঠামো

শ্রীচৈতন্য ভক্তি প্রচারের জন্য একটি পরিকল্পিত কাঠামো তৈরি করেছিলেন:

  • ভেদাভেদহীন গোষ্ঠী: নবদ্বীপে তিনি যে বৈষ্ণবগোষ্ঠী সংগঠিত করেন, তাতে উঁচুজাত বা নিচুজাত বলে কোনো বিভেদ ছিল না। তিনি নিজে ব্রাহ্মণ হয়েও সাধারণ মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
  • নামকীর্তন ও নগরকীর্তন: তিনি ঘরে বসে নামকীর্তন এবং নগরে শোভাযাত্রা করে নগরকীর্তনের প্রথা চালু করেন, যা জনসংযোগের এক বড়ো মাধ্যম হয়ে ওঠে।
  • শাসকের অন্যায়ের প্রতিবাদ: তিনি জগাই-মাধাইয়ের অত্যাচারের বিরোধিতা করেন এবং কীর্তন-বিরোধী নবদ্বীপের কাজিকে তর্কে হারিয়ে দেন। এর মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়।
  • মাতৃভাষায় প্রচার: ভক্তি সাধনার ভাষা হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকেই বেছে নিয়েছিলেন।

বাংলার সমাজে ও সংস্কৃতিতে বৈষ্ণব আন্দোলনের ফলাফল

শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের ফলে বাংলার সমাজে ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব পড়েছিল:

  1. সামাজিক ভেদাভেদ হ্রাস: সমাজ থেকে সব ভেদাভেদ পুরোপুরি দূর করা না গেলেও, শ্রীচৈতন্য শিখিয়েছিলেন যে ভক্তির কাছে জাত-পাতের কোনো মূল্য নেই। "কৃষ্ণভজনে নাহি জাতকুলাদি বিচার" - এই মন্ত্রে সাধারণ মানুষ আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল।
  2. সাংস্কৃতিক জাগরণ: বাংলার সাহিত্যে এক জোয়ার আসে। শ্রীচৈতন্যকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষায় জীবনী সাহিত্য (চৈতন্যচরিতামৃত, চৈতন্যভাগবত) লেখার ধারা শুরু হয়।
  3. কীর্তন ও পদাবলি: কীর্তন গান ও বৈষ্ণব পদাবলির অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। অনেক মুসলিম কবিও বৈষ্ণব গান ও কবিতা লিখতে শুরু করেন, যা হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলনের প্রমাণ।
  4. জ্ঞানের বদলে ভক্তি: সমাজে পাণ্ডিত্যের অহংকারের বদলে সহজ-সরল ভক্তির প্রতি সম্মান বাড়ে। সাধারণ গরিব মানুষ ঈশ্বরের আরাধনার এক সহজ অধিকার পায়।

উপসংহার

শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন কেবল একটি ধর্মীয় মতবাদ ছিল না, এটি ছিল বাংলার এক বিরাট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এই আন্দোলন মধ্যযুগের বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে আশা, সাম্য ও ভালোবাসার এক নতুন আলো নিয়ে এসেছিল।

4বাদশাহ আকবরের দীন-ই ইলাহি সম্বন্ধে একটি টীকা লেখো।

ভূমিকা

মুঘল সম্রাট আকবর ছিলেন ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত উদার। ১৫৭০-এর দশকে তিনি গোঁড়া ইসলামীয় রীতিনীতি থেকে ক্রমশ সরে আসেন। ফতেহপুর সিকরির ইবাদতখানায় বিভিন্ন ধর্মের (হিন্দু, জৈন, খ্রিষ্টান, পারসিক) গুরুদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর, তিনি সমস্ত ধর্মের ভালো দিকগুলি নিয়ে একটি নতুন মতাদর্শ গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে দীন-ই ইলাহি নামে পরিচিত।

দীন-ই ইলাহি কী? (আলাদা ধর্ম নয়)

এক সময়ে মনে করা হতো দীন-ই ইলাহি হয়তো আকবর প্রবর্তিত কোনো নতুন ধর্ম। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, এটি কোনো আলাদা ধর্ম ছিল না। আকবর ইসলাম ধর্মও ত্যাগ করেননি। দীন-ই ইলাহি আসলে ছিল আকবরের প্রতি চূড়ান্ত অনুগত মুষ্টিমেয় কয়েকজন অভিজাতদের মধ্যে প্রচারিত একটি মতাদর্শ বা সিলসিলা। আকবর নিজে তাঁদের বেছে নিতেন।

নিয়ম ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান

দীন-ই ইলাহি গ্রহণকারীদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হতো। এই ব্যবস্থায় গুরু-শিষ্যের মতো সম্পর্ক গড়ে উঠত, যেখানে আকবর ছিলেন গুরু (পির) এবং অভিজাতরা ছিলেন শিষ্য (মুরিদ)।

  • শপথ গ্রহণের সময় একজন সদস্যকে তার জীবন (জান), সম্পত্তি (মাল), ধর্ম (দীন) ও সম্মান (নামুস) বাদশাহের প্রতি বিসর্জন বা কুরবান দেওয়ার শপথ নিতে হতো।
  • শিষ্যকে বাদশাহের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম (সিজদা) করতে হতো।
  • অনুষ্ঠান শেষে বাদশাহ তাকে একটি নতুন পাগড়ি, সূর্যের একটি পদক এবং নিজের একটি ছোট ছবি উপহার দিতেন।
  • এঁরা দিনে চারবার সূর্যের দিকে মুখ করে সূর্যপ্রণাম করতেন।

উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব

আকবর বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতবর্ষের মতো বহু ধর্ম ও জাতির দেশে কেবল ইসলাম বা উলেমাদের কথামতো শাসন চালালে সাম্রাজ্য টিকবে না। হিন্দু, রাজপুত, পারসিক ও ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে একটি অনুগত ও বিশ্বস্ত গোষ্ঠী গড়ে তোলাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। গোঁড়া মৌলবিদের চোখে এটি ইসলামবিরোধী মনে হলেও, এর ফলে আকবর রাজপুত ও অমুসলিম প্রজাদের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন।

উপসংহার

দীন-ই ইলাহি ছিল সম্রাট আকবরের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধর্মীয় উদারতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কোনো নতুন ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং সব ধর্মের মেলবন্ধনের মাধ্যমে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অনুগত প্রশাসনিক ভিত্তি গড়ে তোলাই ছিল এর প্রধান সাফল্য। আকবরের পর সম্রাট জাহাঙ্গিরও কিছুকাল এটি চালু রেখেছিলেন।

5মুঘল সম্রাটদের আমলে স্থাপত্য শিল্পের (বাগান তৈরি এবং দুর্গনির্মাণ সহ) বিকাশ সম্বন্ধে আলোচনা করো।

ভূমিকা

মধ্যযুগে ভারতের স্থাপত্যশিল্পের এক বিরাট যুগান্তকারী বদল ঘটে মুঘল আমলে। মুঘল সম্রাটরা প্রায় সকলেই ছিলেন শিল্প ও সৌন্দর্যের সমঝদার। ভারতীয় ও পারসিক শিল্পরীতির চমৎকার মেলামেশায় মুঘল স্থাপত্য এক অপূর্ব রূপ লাভ করেছিল। প্রাসাদ, দুর্গ, মসজিদ, বাগান ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে তারা প্রচুর অর্থ ও মেধা ব্যয় করেছিলেন।

বাগান নির্মাণ (চাহার বাগ)

সম্রাট বাবরের বাগান তৈরির খুব শখ ছিল। মুঘলরা ভারতে এক বিশেষ ধরণের বাগান রীতির প্রচলন করে, যাকে চাহার বাগ (চার বাগ) বলা হয়। এই রীতিতে একটি বাগানকে জল চলাচলের নালা দিয়ে সমান চার ভাগে ভাগ করা হতো। বাবর, জাহাঙ্গির এবং শাহ জাহান বহু সুন্দর বাগান তৈরি করেছিলেন, যেমন কাশ্মীরের নিসাত বাগ, শালিমার বাগ। জাহাঙ্গির তাঁর আত্মজীবনীতে বাগান নিয়ে অনেক কথা লিখেছেন।

দুর্গ ও শহর নির্মাণ

দুর্গ বা শহর নির্মাণের ক্ষেত্রে সম্রাট আকবরের অবদান অনস্বীকার্য। সাম্রাজ্য সুরক্ষিত করার পাশাপাশি স্থাপত্যের বিকাশে তিনি মনোযোগী ছিলেন।

  • তিনি আগ্রা দুর্গ, আজমির, লাহোর ও এলাহাবাদে মজবুত দুর্গ তৈরি করেন।
  • আকবরের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ফতেহপুর সিকরি নির্মাণ। গুজরাট জয়ের স্মৃতিতে তিনি এখানে বিশাল বুলন্দ দরওয়াজা তৈরি করেন। ফতেহপুর সিকরিতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের স্থাপত্যরীতি মিশে গিয়েছিল।
  • শাহ জাহানের আমলে দিল্লিতে বিশাল লালকেল্লা নির্মিত হয়, যা মুঘল দুর্গ নির্মাণের আরেক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

স্মৃতিসৌধ ও কারুকার্য

মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল শাহ জাহানের রাজত্বকাল। তাঁর সময়ে শ্বেতপাথরের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

  • জাহাঙ্গিরের আমলে পিয়েত্রা দুরা (শ্বেতপাথরে রঙিন রত্ন বসিয়ে কারুকার্য) রীতির প্রচলন হয়, যার চমৎকার নমুনা হলো ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধি।
  • শাহ জাহানের অমর কীর্তি তাজমহল, যা মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এর পাশাপাশি আগ্রার মোতি মসজিদ ও দিল্লির জামি মসজিদ উল্লেখযোগ্য।

উপসংহার

মুঘল আমলে নির্মিত বিশাল দুর্গগুলি যেমন তাদের সামরিক শক্তির প্রতীক ছিল, তেমনই চাহার বাগ, তাজমহল বা ফতেহপুর সিকরির মতো স্থাপনাগুলি মুঘলদের অতুলনীয় সৌন্দর্যবোধের পরিচয় দেয়। ঔরঙ্গজেবের আমলে যুদ্ধের কারণে স্থাপত্য নির্মাণ কিছুটা কমে গেলেও, সামগ্রিকভাবে মুঘল স্থাপত্য ভারতের বুকে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।

6মধ্য যুগে বাংলার আঞ্চলিক স্থাপত্যরীতির পর্যায়গুলির মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল? জোড়-বাংলা ও টেরাকোটার মন্দির সম্পর্কে কী জানো?

ভূমিকা

সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতের অন্যান্য প্রান্তের মতো বাংলাতেও এক বিশেষ আঞ্চলিক স্থাপত্যরীতির বিকাশ ঘটেছিল। ইসলামি রীতির (খিলান ও গম্বুজ) সাথে বাংলার নিজস্ব লৌকিক রীতির (চাল বা চালা) মিশ্রণে এই স্থাপত্যগুলি গড়ে উঠেছিল। ইমারতে পোড়া ইটের ব্যবহার ছিল বাংলার স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাংলার স্থাপত্যের তিনটি পর্যায়

মধ্যযুগে বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়:

  1. প্রথম পর্যায় (১২০১-১৩৩৯ খ্রি.): এই সময় রাজধানী ছিল গৌড়। ত্রিবেণীর জাফর খানের সমাধির ভগ্নাবশেষ ছাড়া এ যুগের তেমন কোনো স্থাপত্য বর্তমানে টিকে নেই।
  2. দ্বিতীয় পর্যায় (১৩৩৯-১৪৪২ খ্রি.): মালদহের পাণ্ডুয়ায় সিকান্দর শাহের তৈরি আদিনা মসজিদ এই পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এছাড়া হুগলির ছোটো-পান্ডুয়ার মিনার ও শেখ আকি সিরাজের সমাধি উল্লেখযোগ্য।
  3. তৃতীয় পর্যায় (১৪৪২-১৫৩৯ খ্রি.): এই পর্যায়ে ইন্দো-ইসলামি রীতির চরম উন্নতি হয়। জালালউদ্দিন মহম্মদ শাহের একলাখি সমাধি, গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা, তাঁতিপাড়া মসজিদ, চকচকে টালি দিয়ে অলংকৃত ফিরোজ মিনার এবং বড়ো সোনা মসজিদ এই পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

জোড়-বাংলা ও চালা মন্দির

বাংলার আবহাওয়া বৃষ্টিবহুল হওয়ায়, জল যাতে সহজে গড়িয়ে পড়ে তার জন্য মন্দিরের ছাদ ঢালু করে বাঁকানো হতো। এই নির্মাণ পদ্ধতির নাম বাংলা বা চালা।

  • কটি চালা আছে তার ওপর ভিত্তি করে একচালা, দো-চালা, আট-চালা মন্দির হতো।
  • দুটি দো-চালা কাঠামো যখন পাশাপাশি জুড়ে দিয়ে মন্দির তৈরি করা হতো, তখন তাকে জোড়-বাংলা বলা হতো (যেমন বিষ্ণুপুরের জোড়-বাংলা মন্দির)।
  • এছাড়া চুড়াযুক্ত মন্দিরও হতো, যাকে রত্ন বলা হতো (যেমন একরত্ন বা পঞ্চরত্ন মন্দির)।

টেরাকোটার কাজ

বাংলার মন্দিরের আরেকটি বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কারুকার্য। বাংলার নরম মাটিতে খোদাই করে নানা দেব-দেবী, সমাজচিত্র বা পুরাণ কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হতো এবং তারপর তা আগুনে পুড়িয়ে মন্দিরের দেওয়ালে বসানো হতো। বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলিতে টেরাকোটার অপূর্ব কাজ দেখা যায়।

উপসংহার

মধ্যযুগে বাংলার স্থাপত্য ছিল ইসলামি গম্বুজ-খিলান এবং বাংলার মাটি ও চালা ঘরের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। পোড়ামাটির এই স্থাপত্যগুলি বাংলার কারিগরদের অসামান্য দক্ষতার পরিচয় বহন করে, যা আজও বাংলার গর্ব।

মনে রেখো!

এই অধ্যায়টি মধ্যযুগের ভারতবর্ষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক সুন্দর দলিল। সুলতানি ও মুঘল যুগে শুধু রাজাদের যুদ্ধ হয়নি, বরং শিল্প, সাহিত্য, ভক্তি ও সুফিবাদের প্রভাবে মানুষের মনে এক নতুন জাগরণ ঘটেছিল। শ্রীচৈতন্যের ভক্তি, আকবরের দীন-ই ইলাহি, তাজমহলের সৌন্দর্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা—সব মিলিয়ে এই অধ্যায়টি ইতিহাসের এক রঙিন অধ্যায়। প্রশ্নোত্তরগুলি মনোযোগ দিয়ে পড়লে পরীক্ষার প্রস্তুতি খুব সহজ হবে!

Sponsored Links

Class 7 History Chapter 7 - সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর

Science Tips-এ স্বাগত! WBBSE Class 7 History-র সপ্তম অধ্যায় "জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি : সুলতানি ও মুঘল যুগ"-এর A+++ মানের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে দেওয়া হয়েছে। এই পৃষ্ঠায় আপনি পাবেন— ভক্তি ও সুফিবাদের প্রসার, শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন, আকবরের দীন-ই ইলাহি, মুঘল ও সুলতানি স্থাপত্য (তাজমহল, কুতুব মিনার), আঞ্চলিক স্থাপত্য (জোড়-বাংলা মন্দির), সাহিত্য, চিত্রশিল্প (মিনিয়েচার) এবং সেকালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত সমস্ত খুঁটিনাটি প্রশ্নোত্তর। পাঠ্যবইয়ের অনুশীলনীসহ সব ধরণের MCQ, SAQ এবং বড় প্রশ্ন এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যাতে পরীক্ষায় আপনি সেরা প্রস্তুতি নিতে পারেন।

Frequently Asked Questions

সপ্তম অধ্যায়ের মূল বিষয় হলো সুলতানি ও মুঘল যুগের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ভক্তি ও সুফিবাদ, শ্রীচৈতন্যের আন্দোলন, আকবরের দীন-ই ইলাহি, মুঘল ও সুলতানি স্থাপত্য, চিত্রশিল্প, ভাষা, সাহিত্য এবং সেকালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ।

ভক্তি ও সুফিবাদের মূল কথা ছিল ভগবানের প্রতি অকপট ভালোবাসা এবং আত্মসমর্পণ। এরা ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতপাত ও লোক-দেখানো আচারের বিরোধিতা করে সকল মানুষের মধ্যে সাম্য ও ঐক্যের বার্তা প্রচার করেছিল। কবীর, নানক ও সুফিসন্তরা এর প্রধান কাণ্ডারী ছিলেন।

না, দীন-ই ইলাহি কোনো নতুন ধর্ম ছিল না। এটি ছিল মুঘল সম্রাট আকবরের প্রতি চূড়ান্ত অনুগত কয়েকজন অভিজাতদের মধ্যে প্রচারিত একটি মতাদর্শ বা সিলসিলা, যার মাধ্যমে আকবর সব ধর্মের মেলবন্ধনে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অনুগত প্রশাসনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

মুঘল আমলে (বিশেষ করে জাহাঙ্গির ও শাহ জাহানের সময়) শ্বেতপাথরের ওপর রঙিন ও মূল্যবান রত্ন বসিয়ে যে বিশেষ ধরণের সুন্দর কারুকার্য করা হতো, তাকে পিয়েত্রা দুরা (Pietra Dura) বলা হয়। তাজমহলে এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।

হ্যাঁ, এই পৃষ্ঠায় পাঠ্যবইয়ের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং অনুশীলনীর উপর ভিত্তি করে 40টি MCQ, 30টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন এবং 6টি বড় প্রশ্ন বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক উত্তরসহ দেওয়া হয়েছে, যা WBBSE সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সম্পূর্ণ যথেষ্ট।