মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট
আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ও মুঘলদের পতন | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 28 SAQ | 6 Broad Questions
শিবাজির মারাঠা শক্তি
স্বরাজ্য গঠন, পুরন্দরের সন্ধি
অষ্টপ্রধান ও পেশওয়া
শিখদের প্রতিরোধ
গুরু গোবিন্দ সিংহ, খালসা
পঞ্চ-ক ও বান্দা বাহাদুর
কৃষক বিদ্রোহ
জাঠ ও সৎনামি বিদ্রোহ
অতিরিক্ত করের বিরুদ্ধে লড়াই
প্রশাসনিক সংকট
জায়গিরদারি ও মনসবদারি সমস্যা
খালিসা জমি ও দলাদলি
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
40 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
28 টিBroad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
6 টিভূমিকা
খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থান। মারাঠারা মূলত পুণে ও কোঙ্কণ অঞ্চলে বসবাস করত এবং তারা বিজাপুর ও গোলকোন্ডার সেনাবাহিনীতে কাজ করত। কিন্তু তাদের কোনো নিজস্ব স্বাধীন রাজ্য ছিল না। শিবাজি এই বিচ্ছিন্ন মারাঠাদের ঐক্যবদ্ধ করে এক স্বাধীন ও শক্তিশালী হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
শিবাজির প্রথম জীবন ও অনুপ্রেরণা
শিবাজির (১৬৩০-১৬৮০ খ্রিঃ) বাবা শাহজি ভোঁসলে ছিলেন বিজাপুরের সুলতানের এক জায়গিরদার। শিবাজির চরিত্র ও স্বাধীন সত্তা গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর মা জিজাবাঈ এবং তাঁর শিক্ষক দাদাজি কোন্ডদেব। এঁদের আদর্শেই অনুপ্রাণিত হয়ে শিবাজি অল্প বয়স থেকেই মারাঠা যুবকদের (বিশেষ করে মাওয়াল অঞ্চলের পদাতিক বা 'মাবলে') নিয়ে সেনাবাহিনী গঠন করতে শুরু করেন।
বিজাপুর ও মুঘলদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব
বিজাপুরের সুলতানের অসুস্থতার সুযোগে শিবাজি বেশ কিছু দুর্গ দখল করেন। তাঁকে দমন করতে বিজাপুরের সুলতান আফজল খানকে পাঠান। কিন্তু সতর্ক শিবাজি 'বাঘনখ' নামক গোপন অস্ত্র দিয়ে আফজল খানকেই হত্যা করেন।
এরপর শিবাজির ক্রমবর্ধমান শক্তি মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিবাজি মুঘলদের সমৃদ্ধ বন্দরনগরী সুরাট দু-বার লুঠ করেন। ঔরঙ্গজেব শিবাজিকে দমন করতে শায়েস্তা খান, মুয়াজ্জম এবং পরে মির্জা রাজা জয়সিংহকে পাঠান। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে জয়সিংহ শিবাজিকে 'পুরন্দরের সন্ধি' স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। এই সন্ধি অনুযায়ী শিবাজিকে তাঁর ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ মুঘলদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
আগ্রায় অপমান ও স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা
পুরন্দরের সন্ধির পর শিবাজি আগ্রায় মুঘল দরবারে গেলে ঔরঙ্গজেব তাঁকে অপমান করেন এবং বন্দী করেন। কিন্তু শিবাজি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে ফলের ঝুড়িতে লুকিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন এবং পুনরায় মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে রায়গড়ে শিবাজির জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক হয়। এর মাধ্যমে তিনি অন্যান্য মারাঠা সর্দারদের কাছে নিজেকে স্বাধীন সার্বভৌম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। মারাঠারা তাদের এই স্বাধীন রাজ্যকে 'স্বরাজ্য' বলত।
উপসংহার
শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠাদের এই উত্থান ছিল মুঘলদের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে এক বিরাট প্রতিরোধ। তিনি শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, 'অষ্টপ্রধান' (আট জন মন্ত্রীর পরিষদ) দ্বারা এক দক্ষ শাসনব্যবস্থাও তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মারাঠা শক্তি পরবর্তীকালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভূমিকা
শিখ ধর্ম মূলত একটি শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, মুঘল সম্রাটদের নীতির কারণে তা ক্রমশ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধে পরিণত হয়। জাহাঙ্গির এবং শাহ জাহানের আমল থেকেই শিখদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে, যা ঔরঙ্গজেবের আমলে চরম আকার ধারণ করে।
শিখ শক্তির রাজনৈতিক রূপান্তর
খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের শেষদিকে গুরু অর্জুনদেবের সময় থেকে শিখ সমাজে বংশানুক্রমিকভাবে গুরু নির্বাচন শুরু হয়, যা গুরুর পদকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে। এরপর ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ একসঙ্গে দুটি তলোয়ার বহন করতে শুরু করেন—একটি ধর্মের এবং অন্যটি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে শিখরা এখন শুধু একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, একটি স্বাধীন সামরিক শক্তিও বটে। এটি মুঘল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছিল।
ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে সংঘাত ও গুরু তেগবাহাদুর
মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের গোঁড়া ধর্মীয় নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন নবম শিখ গুরু তেগবাহাদুর। এছাড়া তিনি পাঠানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাঞ্জাবে মুঘল শাসনের বিরোধিতাও করেছিলেন। এর পরিণতিতে ঔরঙ্গজেব গুরু তেগবাহাদুরকে বন্দী করে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এই ঘটনা শিখদের মুঘলদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। তারা পাঞ্জাবের পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে সশস্ত্র রূপ ধারণ করে।
খালসা প্রতিষ্ঠা ও পঞ্চ-ক
গুরু গোবিন্দ সিংহ ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে 'খালসা' নামক একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। খালসার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিখদের সংগঠিত করা এবং মুঘল ও পাহাড়ি হিন্দু রাজাদের আক্রমণ থেকে তাদের নিরাপদে রাখা। সামরিক প্রশিক্ষণ শিখদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে।
গুরু গোবিন্দ সিংহ খালসাপন্থী শিখদের সর্বদা পাঁচটি নির্দিষ্ট জিনিস কাছে রাখতে বলেন, যেগুলির নাম 'ক' অক্ষর দিয়ে শুরু হয়: ১) কেশ (চুল), ২) কঙ্ঘা (চিরুনি), ৩) কচ্ছা (অন্তর্বাস), ৪) কৃপাণ (তলোয়ার), এবং ৫) কড়া (লোহার বালা)। এছাড়াও তাঁরা নামের শেষে 'সিংহ' পদবি ব্যবহার করতে শুরু করেন।
উপসংহার
গুরু গোবিন্দ সিংহ মুঘলদের সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করতে না পারলেও, তাঁর তৈরি খালসা বাহিনীর ধারাবাহিক প্রতিরোধের ফলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মুঘলদের নিয়ন্ত্রণ চরমভাবে শিথিল হয়ে যায়। গোবিন্দ সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্য বান্দা বাহাদুর এই সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যান।
ভূমিকা
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যে আঞ্চলিক প্রতিরোধগুলি গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে জাঠ এবং সৎনামি বিদ্রোহ ছিল অন্যতম। মারাঠা বা শিখদের মতো এদের লড়াই নিছক রাজনৈতিক ছিল না, বরং এই বিদ্রোহগুলি মুঘল আমলের গভীর কৃষিব্যবস্থার সংকট ও অর্থনৈতিক শোষণের দিকটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিল।
জাঠ বিদ্রোহের কারণ ও প্রকৃতি
দিল্লি ও আগ্রা অঞ্চলের কৃষকদের একটি বড়ো অংশ ছিল জাঠ উপজাতির। এদের মধ্যে অনেকেই ছোটোখাটো জমিদারও ছিল। মূলত অতিরিক্ত রাজস্বের বোঝা এবং মুঘল কর্মচারীদের শোষণের প্রতিবাদে জাহাঙ্গির ও শাহ জাহানের আমল থেকেই জাঠদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাত বেঁধেছিল।
ঔরঙ্গজেবের আমলে এই অসন্তোষ তীব্র রূপ নেয়। গোকলা নামক এক স্থানীয় জমিদারের নেতৃত্বে জাঠ কৃষকরা মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে জোটবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের প্রকৃতি ছিল দ্বিমুখী—একদিকে এটি ছিল অতিরিক্ত করের বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত 'কৃষক বিদ্রোহ', অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীপরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাঠরা মুঘলদের অধীনতা অস্বীকার করে একটি 'আলাদা রাজ্য' গঠন করতে চেয়েছিল।
সৎনামি বিদ্রোহ
জাঠ বিদ্রোহের সমসাময়িক আরেকটি কৃষক অভ্যুত্থান হলো সৎনামি বিদ্রোহ। মথুরার কাছে নারনৌল অঞ্চলে এক দল কৃষক মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল। এই কৃষকরা 'সৎনামি' নামক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুগামী ছিল। মুঘল রাজস্ব আধিকারিকদের অত্যাচার ও স্বৈরাচারের প্রতিবাদেই এই শান্তিকামী ধর্মীয় গোষ্ঠীর কৃষকরা অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। মুঘল সেনাবাহিনী কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করলেও, এটি সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
কৃষি সংকট ও কেন্দ্রীয় স্বৈরাচার
জাঠ এবং সৎনামি বিদ্রোহ কোনো ধর্মীয় লড়াই ছিল না। সপ্তদশ শতকে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিজাতরা কৃষকদের ওপর রাজস্বের চাপ চূড়ান্তভাবে বাড়িয়ে দেয়। মুঘল রাষ্ট্র কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু, মুঘল প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্বৈরাচার এই কৃষকদের বিদ্রোহের পথে ঠেলে দিয়েছিল।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জাঠ ও সৎনামি বিদ্রোহ প্রমাণ করেছিল যে মুঘল সাম্রাজ্য তার সাধারণ কৃষক শ্রেণির সমর্থন হারিয়েছে। অর্থনৈতিক শোষণ ও কৃষি সংকটের ফলে সৃষ্ট এই কৃষক বিদ্রোহগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও অবশ্যম্ভাবী পতনের ইঙ্গিত দিয়েছিল।
ভূমিকা
মুঘল প্রশাসনের দুটি মূল স্তম্ভ ছিল মনসবদারি ব্যবস্থা এবং জায়গিরদারি ব্যবস্থা। কিন্তু শাহ জাহানের সময় থেকেই এই দুটি ব্যবস্থায় ফাটল ধরতে শুরু করে এবং ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে তা এক তীব্র আকার ধারণ করে, যাকে ঐতিহাসিকরা 'জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট' বলে অভিহিত করেন।
সংকটের কারণসমূহ
- বেতন ও পদের অমিল: মনসবদারদের তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী যে বিপুল বেতন পাওয়ার কথা, মুঘল কোষাগারে তত অর্থ ছিল না। ফলে খাতায়-কলমে হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির তফাত বেড়েই চলেছিল।
- রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা: কৃষক বিদ্রোহ (যেমন জাঠ ও সৎনামি) এবং জমিদারদের অসহযোগিতার কারণে অনেক সময় জায়গির থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা যেত না।
- খালিসা জমির বৃদ্ধি: ঔরঙ্গজেব বিজাপুর এবং গোলকোন্ডা জয়ের পর দাক্ষিণাত্যের সব থেকে ভালো ও উর্বর জমিগুলিকে 'খালিসা' বা খাস জমি হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে রেখেছিলেন। ফলে মনসবদারদের জায়গির হিসেবে দেওয়ার মতো ভালো জমির তীব্র অভাব দেখা দেয়।
- কৃষি সংকট: জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের চাপে কৃষকরা গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। জমি চাষ না হওয়ার ফলে রাজস্ব আদায়ও বন্ধ হয়ে যায়।
- দুর্নীতি: মনসবদাররা তাদের প্রাপ্য বেতন না পাওয়ায়, তাদের যতজন ঘোড়সওয়ার ও সৈন্য রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা ছিল, তা তারা করত না। মিথ্যা হিসাব দেখিয়ে তারা দুর্নীতি করতে শুরু করে।
সংকটের প্রভাব
এই সংকটের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের উপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল:
- সামরিক দুর্বলতা: মনসবদাররা নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য না রাখায় মুঘল সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি মারাত্মকভাবে কমে যায়, যা মারাঠাদের মতো আঞ্চলিক শক্তি দমনে ব্যর্থ হয়।
- দরবারি দলাদলি: সপ্তদশ শতকের শেষে ভালো ও লাভজনক জায়গির পাওয়ার জন্য মনসবদারদের মধ্যে তীব্র রেষারেষি শুরু হয়। এর ফলে দরবারে ইরানি, তুরানি, মারাঠা এবং রাজপুত গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ও ষড়যন্ত্র বৃদ্ধি পায়।
- শাসনব্যবস্থার অবক্ষয়: দাক্ষিণাত্যে রাজস্ব আদায়ের জন্য মুঘল মনসবদাররা বাধ্য হয়ে মারাঠা সর্দারদের সাহায্য নিতে শুরু করে, যার অর্থ হলো ওই অঞ্চলে মুঘলদের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ আলগা হয়ে গিয়েছিল।
উপসংহার
মনসবদারি ও জায়গিরদারি সংকট কোনো একজন মুঘল শাসকের সৃষ্টি ছিল না। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক সমস্যা, দুর্নীতি ও কৃষি সংকটের ফলে এই জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল।
ভূমিকা
মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে মুঘল ভারতের কৃষিব্যবস্থায় এক গভীর সংকট দেখা দেয়, যা 'কৃষি সংকট' নামে পরিচিত। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্রে এই কৃষি সংকট এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
কৃষি সংকটের কারণ
এই সংকটের পিছনে একাধিক আর্থ-সামাজিক কারণ দায়ী ছিল:
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি বনাম উৎপাদন: এই সময়ে কৃষিজ ফসলের উৎপাদন বাড়লেও, তার তুলনায় কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। মুঘল শাসকরা নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করে জমির উর্বরতা বাড়াতে পারেননি।
- মূল্যবৃদ্ধি ও শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি: সপ্তদশ শতকে জিনিসপত্রের দাম প্রচণ্ড বেড়ে যায়। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে মুঘল অভিজাত ও মনসবদাররা তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য জমি থেকে আয় বাড়াতে সচেষ্ট হন। এর ফলে তারা জমিদার ও কৃষকদের ওপর রাজস্বের চাপ নির্মমভাবে বাড়াতে থাকে।
- জায়গিরদারদের স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ: জায়গিরদারদের ঘন ঘন বদলি করা হতো। তাই কোনো জায়গিরে স্থায়ীভাবে কৃষির উন্নতি করার বদলে তারা অল্প সময়ে কৃষকদের থেকে বেশি পরিমাণ অর্থ শুষে নেওয়ার চেষ্টা করত।
কৃষি সংকটের প্রভাব ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন
এই কৃষি সংকট মুঘল সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন দিক থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল:
- কৃষক বিদ্রোহ: অতিরিক্ত রাজস্বের চাপে দিশেহারা হয়ে কৃষকরা বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। উত্তর ভারতের জাঠ এবং সৎনামি বিদ্রোহ ছিল মূলত এই কৃষি সংকটেরই ফল। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জমিদাররাও এই কৃষকদের মদত দিত।
- কৃষিভূমির বিনাশ: শোষণের হাত থেকে বাঁচতে অনেক সময় কৃষকরা রাজস্ব না দিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেত। ফলে জমিগুলি পতিত পড়ে থাকত এবং চাষ হতো না।
- জায়গিরদারি সংকট তীব্র হওয়া: চাষ না হওয়ার ফলে রাজস্ব আদায় বন্ধ হয়ে যায়। যে সব মনসবদার এই সব জমিতে জায়গির পেয়েছিল, তারা তাদের প্রাপ্য অর্থ পেত না। ফলে তারা ঘোড়সওয়ার ও সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারত না, যা মুঘল সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দেয়।
উপসংহার
সুতরাং, কৃষি সংকট শুধুমাত্র কৃষকদের দুর্দশাই বাড়ায়নি, এটি একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দিয়েছিল। কৃষকের দুর্দশা থেকে রাজস্বের ঘাটতি, সেখান থেকে সামরিক দুর্বলতা এবং পরিশেষে বিদ্রোহ—এই শৃঙ্খল মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে তার পতন ডেকে এনেছিল।
ভূমিকা
সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিঃ) মুঘল সাম্রাজ্য ভৌগোলিক দিক থেকে তার চরম সীমায় পৌঁছেছিল। তিনি বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু বাহ্যিক এই বিশালত্বের আড়ালে মুঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি গভীরভাবে নড়ে গিয়েছিল। ঔরঙ্গজেবের আমলেই এমন কিছু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, যা সাম্রাজ্যের অবশ্যম্ভাবী পতন ডেকে আনে।
আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ও প্রতিরোধ
ঔরঙ্গজেবের সময়ে মুঘলদের চরম সার্বভৌমত্বের ধারণায় বড়োসড়ো আঘাত আসে।
- মারাঠা শক্তি: দাক্ষিণাত্যে শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠারা এক স্বাধীন ও শক্তিশালী স্বরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ঔরঙ্গজেব জীবনের শেষ ২৫ বছর দাক্ষিণাত্যে কাটিয়েও মারাঠাদের সম্পূর্ণরূপে দমন করতে পারেননি।
- শিখ প্রতিরোধ: ঔরঙ্গজেবের ধর্মান্ধ নীতির কারণে নবম শিখ গুরু তেগবাহাদুরের হত্যা শিখদের চরম মুঘল-বিরোধী করে তোলে। গুরু গোবিন্দ সিংহের 'খালসা' বাহিনীর সশস্ত্র লড়াই উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মুঘল নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেয়।
অর্থনৈতিক ও কৃষি সংকট
সাম্রাজ্যের পতনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক দুরবস্থা।
- জায়গিরদারি সংকট: ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের উর্বর জমিগুলি 'খালিসা' (খাস জমি) হিসেবে নিজের কাছে রেখে দেন। ফলে মনসবদারদের দেওয়ার মতো ভালো জায়গিরের অভাব দেখা দেয়। ভালো জায়গির পাওয়ার জন্য দরবারে বিভিন্ন গোষ্ঠীর (ইরানি, তুরানি, রাজপুত) মধ্যে মারাত্মক দলাদলি ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
- কৃষি সংকট ও বিদ্রোহ: জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভিজাতদের শোষণের ফলে কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে জাঠ ও সৎনামিদের মতো শক্তিশালী কৃষক বিদ্রোহ ঘটে, যা প্রমাণ করে যে মুঘল রাষ্ট্র তার সাধারণ প্রজার সমর্থন হারিয়েছে।
সামরিক অবক্ষয়
জায়গির থেকে সঠিক রাজস্ব আদায় না হওয়ায় মনসবদাররা তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘোড়সওয়ার বা সেনাবাহিনী পোষণ করত না। খাতায়-কলমে মুঘল সেনাবাহিনী বিশাল মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল দুর্বল ও অকার্যকর। দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ মুঘল কোষাগার ও সামরিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।
উপসংহার
ঐতিহাসিকদের মতে, মুঘল সাম্রাজ্য কোনো নিশ্ছিদ্র গালিচা ছিল না, বরং তা ছিল একটি 'জোড়াতালি দেওয়া কম্বল'। উত্তর ভারতে মুঘলদের আধিপত্য থাকলেও অন্যান্য অঞ্চলে তাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত। ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে অতিরিক্ত সাম্রাজ্য বিস্তার, আঞ্চলিক শক্তির তীব্র প্রতিরোধ, মনসবদারি ও কৃষি সংকট—সব মিলিয়ে এই জোড়াতালি দেওয়া কম্বলের সেলাইগুলো খুলে যেতে শুরু করে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ঘণ্টা বেজে যায়।
মনে রেখো!
এই অধ্যায়ে আমরা দেখলাম কিভাবে বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। একদিকে শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠারা এবং গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে শিখরা মুঘলদের প্রবল প্রতিরোধ করেছিল। অন্যদিকে, কৃষি সংকট, জায়গিরদারি ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং জাঠ ও সৎনামিদের মতো সাধারণ কৃষকদের বিদ্রোহ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। ইতিহাসের এই উত্থান-পতনের কারণগুলো বুঝে পড়লে সহজেই মনে থাকবে!