মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট প্রশ্ন উত্তর

WBBSE Class 7 History Chapter 8 - শিবাজি, শিখ, মারাঠা ও কৃষি সংকট | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 12 May 2026 Last Update: 31 May 2026
মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট - Class 7 History Chapter 8

মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ও মুঘলদের পতন | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 28 SAQ | 6 Broad Questions

শিবাজি ও মারাঠা শিখ শক্তি ও খালসা জাঠ ও সৎনামি জায়গিরদারি সংকট কৃষি সংকট মনসবদারি ব্যবস্থা
🗡️

শিবাজির মারাঠা শক্তি

স্বরাজ্য গঠন, পুরন্দরের সন্ধি
অষ্টপ্রধান ও পেশওয়া

🛡️

শিখদের প্রতিরোধ

গুরু গোবিন্দ সিংহ, খালসা
পঞ্চ-ক ও বান্দা বাহাদুর

🌾

কৃষক বিদ্রোহ

জাঠ ও সৎনামি বিদ্রোহ
অতিরিক্ত করের বিরুদ্ধে লড়াই

📉

প্রশাসনিক সংকট

জায়গিরদারি ও মনসবদারি সমস্যা
খালিসা জমি ও দলাদলি

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

40 টি
1মারাঠাদের আদি বাস কোথায় ছিল?
2শিবাজির জীবনকাল কত ছিল?
3শিবাজির বাবার নাম কী ছিল?
4শিবাজির শিক্ষকের নাম কী ছিল?
5শিবাজিকে দমন করতে বিজাপুরের সুলতান কাকে পাঠান?
6শিবাজি কোন অস্ত্র দিয়ে আফজল খানকে হত্যা করেন?
7শিবাজি কোন বন্দরনগরী দু-বার আক্রমণ করে লুঠপাট করেন?
8পুরন্দরের সন্ধি কবে স্বাক্ষরিত হয়?
9কাদের মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি হয়েছিল?
10পুরন্দরের সন্ধি অনুযায়ী শিবাজিকে কয়টি দুর্গ ছেড়ে দিতে হয়?
11শিবাজির অভিষেক কবে হয়?
12শিবাজির অভিষেক কোথায় হয়?
13শিবাজির আট জন মন্ত্রীকে কী বলা হতো?
14অষ্টপ্রধানের মধ্যে প্রধান কে ছিলেন?
15মারাঠারা নিজেদের রাজ্যকে কী বলত?
16মারাঠা রাজ্যে স্থায়ীভাবে চাকরি করা সৈনিকদের কী বলা হতো?
17শিবাজির পদাতিক সেনাদের কী বলা হতো?
18'হিন্দুপাদপাদশাহি' আদর্শ কে প্রচার করেন?
19কোন শিখ গুরুর সময় থেকে বংশানুক্রমিকভাবে গুরু নির্বাচন শুরু হয়?
20কোন শিখ গুরু একসঙ্গে দুটি তলোয়ার নিতেন?
21নবম শিখ গুরুর নাম কী?
22কাকে ঔরঙ্গজেব বন্দী করে হত্যা করেন?
23দশম শিখ গুরু কে ছিলেন?
24'খালসা' কে তৈরি করেন?
25খালসা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
26শিখদের 'পন্থ' বা পথ কে ঠিক করে দেন?
27শিখদের রাখতে বলা পাঁচটি জিনিসের নাম কোন অক্ষর দিয়ে শুরু?
28গুরু গোবিন্দ সিংহের মৃত্যুর পর কে লড়াই চালিয়ে যান?
29দিল্লি-আগ্রা অঞ্চলের জাঠরা প্রধানত কী ছিল?
30নারনৌল অঞ্চলে কাদের বিদ্রোহ হয়েছিল?
31সৎনামিরা মূলত কী ছিল?
32উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মুঘলদের বিরুদ্ধে কারা বিদ্রোহ করেছিল?
33ঔরঙ্গজেব ভালো জমিগুলিকে কী হিসেবে রেখেছিলেন?
34খালিসা বা খাস জমির রাজস্ব কোথায় জমা হতো?
35খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যে কীসের দাম বেড়ে যায়?
36মুঘল দরবারে কাদের মধ্যে দলাদলি শুরু হয়েছিল?
37শিবাজিকে কোন মুঘল সম্রাট আগ্রা দুর্গে বন্দী করেছিলেন?
38কোন ঐতিহাসিক মুঘল সাম্রাজ্যকে 'জোড়াতালি দেওয়া কম্বল'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন?
39জাঠ ও সৎনামি বিদ্রোহ আসলে কীসের উদাহরণ?
40শায়েস্তা খান কে ছিলেন?

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

28 টি
1মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট বলতে কী বোঝায়?
ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্য বিশাল আকার ধারণ করেছিল। এই সময়ে মনসব ও জায়গির নিয়ে অভিজাতদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, মারাঠাদের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির উত্থান, শিখ, জাঠ ও সৎনামি বিদ্রোহ এবং প্রবল কৃষি সংকট মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই বহুমুখী সমস্যাগুলোকেই একসঙ্গে 'মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট' বলা হয়।
2মারাঠাদের বাস কোথায় ছিল এবং তারা আগে কী করত?
যুদ্ধপটু মারাঠাদের বাস ছিল মূলত পুণে এবং কোঙ্কণ অঞ্চলে। শিবাজির উত্থানের আগে তাদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন রাজ্য ছিল না। তারা অনেকেই বিজাপুর এবং গোলকোন্ডার রাজদরবারে বা সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে চাকরি করত।
3শিবাজির উত্থানে কাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল?
শিবাজির (জীবনকাল ১৬৩০-৮০ খ্রিঃ) উত্থানে এবং তাঁর চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর মা জিজাবাঈ এবং তাঁর শিক্ষক দাদাজি কোন্ডদেব। এঁদের শিক্ষাতেই শিবাজি স্বাধীন রাজ্য গঠনের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
4বাঘনখ কী? শিবাজি কেন এটি ব্যবহার করেছিলেন?
বাঘনখ হলো বাঘের নখের মতো দেখতে এক ধরনের ধারালো গোপন অস্ত্র, যা হাতের আঙুলে লুকিয়ে রাখা যায়। বিজাপুরের সুলতানের সেনাপতি আফজল খান শিবাজিকে আলোচনার নাম করে হত্যা করার চেষ্টা করলে, সতর্ক শিবাজি এই বাঘনখ দিয়ে উল্টে আফজল খানকেই হত্যা করেছিলেন।
5পুরন্দরের সন্ধি কবে, কাদের মধ্যে হয়েছিল?
১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে পুরন্দরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই সন্ধি হয়েছিল মারাঠা নেতা শিবাজি এবং মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি মির্জা রাজা জয়সিংহের মধ্যে।
6পুরন্দরের সন্ধির ফল কী হয়েছিল?
পুরন্দরের সন্ধির (১৬৬৫) ফলে শিবাজি মুঘলদের কাছে হার মানতে বাধ্য হন। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শিবাজিকে তাঁর অধিকৃত ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ মুঘলদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সে যুগে দুর্গ ছিল নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ, তাই এটি শিবাজির জন্য বড়ো ক্ষতি ছিল।
7অষ্টপ্রধান কাদের বলা হতো?
শিবাজি এক সুপরিকল্পিত এবং স্বাধীন শাসনব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন। তাঁর শাসনকাজে সাহায্য করার জন্য আট জন উচ্চপদস্থ মন্ত্রীর একটি পরিষদ ছিল। শিবাজির এই আট জন মন্ত্রীকেই একত্রে 'অষ্টপ্রধান' বলা হতো।
8পেশওয়া কে ছিলেন?
মারাঠা নেতা শিবাজির আট জন মন্ত্রীর পরিষদ বা 'অষ্টপ্রধান'-এর মধ্যে যিনি সবার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাঁকে 'পেশওয়া' বলা হতো। শিবাজির মৃত্যুর চল্লিশ বছর পর এই পেশওয়ারাই মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রকৃত শাসকে পরিণত হয়েছিলেন।
9স্বরাজ্য বলতে কী বোঝো?
মারাঠারা নিজেদের স্বাধীন রাজ্যকে 'স্বরাজ্য' বলত। শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠাদের মধ্যে জাতীয় চেতনা জেগে ওঠে এবং তারা মুঘলদের অধীনতা অস্বীকার করে নিজেদের যে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করেছিল, তাকেই তারা স্বরাজ্য নাম দিয়েছিল।
10বর্গি কাদের বলা হতো?
মারাঠা সেনাবাহিনীতে দুই ধরনের সেনা ছিল। যেসব সৈনিক মারাঠা রাজ্যে স্থায়ীভাবে চাকরি করত এবং যাদের ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র রাষ্ট্র থেকে দেওয়া হতো, তাদের বলা হতো 'বর্গি'। এরা ছিল অত্যন্ত দক্ষ অশ্বারোহী বাহিনী।
11মাবলে বা মাওয়ালি কাদের বলা হতো?
শিবাজি একসময় পুণের আশপাশের মাওয়াল অঞ্চল থেকে এক দল অত্যন্ত সাহসী ও যুদ্ধপটু পদাতিক সেনা সংগ্রহ করে তাঁর সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করেছিলেন। এই মাওয়াল অঞ্চলের পদাতিক সেনাদেরই 'মাবলে' বা 'মাওয়ালি' বলা হতো।
12হিন্দুপাদপাদশাহি কী?
শিবাজির মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পর মারাঠা পেশওয়া প্রথম বাজীরাও হিন্দু রাজাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি অখণ্ড হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন। ধর্মের নামে মুঘলদের বিরুদ্ধে অন্যান্য হিন্দু রাজাদের জোটবদ্ধ করার এই আদর্শকেই 'হিন্দুপাদপাদশাহি' বলা হয়।
13কোন শিখ গুরুর সময় থেকে বংশানুক্রমিকভাবে গুরু নির্বাচন শুরু হয়?
খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের শেষের দিকে শিখদের চতুর্থ গুরু রামদাসের ছেলে অর্জুনদেব শিখদের পঞ্চম গুরু হন। এই গুরু অর্জুনদেবের সময় থেকেই শিখ সমাজে বংশানুক্রমিকভাবে (পিতার পর পুত্র) গুরু নির্বাচন করার প্রথা শুরু হয়।
14গুরু হরগোবিন্দ কেন দুটি তলোয়ার নিতেন?
শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ সবসময় একসঙ্গে দুটি তলোয়ার নিতেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চাইতেন যে তিনি শুধু শিখদের ধর্মীয় নেতাই নন, তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতাও আছে। এর ফলে শিখরা একটি স্বাধীন সামরিক শক্তির মতো হয়ে উঠেছিল।
15নবম শিখ গুরু তেগবাহাদুরকে কেন হত্যা করা হয়েছিল?
নবম শিখ গুরু তেগবাহাদুর মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এছাড়া এ কথাও প্রচলিত যে তিনি এক পাঠানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাঞ্জাবে মুঘল শাসনের বিরোধিতাও করেছিলেন। তাই ঔরঙ্গজেব তাঁকে বন্দী করে হত্যা করেন।
16খালসা কী? কবে, কে এটি তৈরি করেন?
১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিংহ 'খালসা' নামক একটি সামরিক ও ধর্মীয় সংগঠন তৈরি করেন। খালসার প্রধান কাজ ছিল শিখদের সংগঠিত করা এবং মুঘলদের আক্রমণ থেকে তাদের নিরাপদে রাখা।
17শিখদের 'পঞ্চ-ক' কী?
গুরু গোবিন্দ সিংহ খালসাপন্থী শিখদের সর্বদা পাঁচটি নির্দিষ্ট জিনিস নিজেদের কাছে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই পাঁচটি জিনিসের নামই 'ক' অক্ষর দিয়ে শুরু হয় বলে এদের 'পঞ্চ-ক' বলা হয়। এগুলি হলো—কেশ (চুল), কঙ্ঘা (চিরুনি), কচ্ছা (অন্তর্বাস), কৃপাণ (তলোয়ার) এবং কড়া (লোহার বালা)।
18জাঠ বিদ্রোহ কী?
দিল্লি-আগ্রা অঞ্চলের জাঠরা ছিল প্রধানত কৃষক ও ছোটো জমিদার। রাজস্ব দেওয়া নিয়ে জাহাঙ্গির ও শাহ জাহানের আমল থেকেই মুঘলদের সঙ্গে তাদের সংঘাত ছিল। ঔরঙ্গজেবের আমলে তারা স্থানীয় এক জমিদারের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহ করে এবং একটি পৃথক রাজ্য গঠন করতে চায়। এটিই জাঠ বিদ্রোহ।
19সৎনামি বিদ্রোহ কী?
মথুরার কাছে নারনৌল অঞ্চলে এক দল কৃষক মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। এরা ছিল 'সৎনামি' নামক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষ। মুঘলদের অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মূলত কৃষকদের এই লড়াই সৎনামি বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
20মুঘল যুগে কৃষক বিদ্রোহের অন্যতম কারণ কী ছিল?
মুঘল যুগের শেষদিকে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভিজাতরা জমি থেকে আয় বাড়াতে কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ দিতে থাকে। পাশাপাশি মুঘল প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্বৈরাচারও বৃদ্ধি পায়। এই অতিরিক্ত করের বোঝা এবং শোষণের ফলেই জাঠ বা সৎনামিদের মতো কৃষক বিদ্রোহগুলি হয়েছিল।
21মনসবদারি ব্যবস্থায় কী সমস্যা বা সংকট দেখা দিয়েছিল?
শাহ জাহানের সময় থেকেই মনসবদারদের তাদের পদ অনুযায়ী যে বিপুল বেতন পাওয়ার কথা, তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বেতন না পাওয়ায় মনসবদাররা নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘোড়সওয়ার বা সৈন্য ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারত না। ফলে মুঘল সেনাবাহিনীর ক্ষমতা খাতায়-কলমে যা ছিল, বাস্তবে তা অনেক কমে গিয়েছিল।
22খালিসা কী?
সম্রাট ঔরঙ্গজেব বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয়ের পর দাক্ষিণাত্যের সব থেকে ভালো ও উর্বর জমিগুলিকে 'খাস জমি' বা 'খালিসা' হিসেবে নিজের অধীনে রেখেছিলেন। এই জমিগুলি কাউকে জায়গির হিসেবে দেওয়া হতো না এবং এর রাজস্ব সরাসরি কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা হতো।
23জায়গিরদারি সংকট কেন দেখা দিয়েছিল?
ভালো জমিগুলো 'খালিসা' ভুক্ত হওয়ায় জায়গির হিসেবে দেওয়ার মতো উর্বর জমির অভাব দেখা দেয়। অন্যদিকে কৃষক বিদ্রোহের কারণে অনেক জমি থেকে রাজস্ব আদায় হতো না বা কৃষকরা গ্রাম ছেড়ে পালাত। ফলে মনসবদাররা তাদের জায়গির থেকে যথেষ্ট আয় করতে না পেরে চরম সংকটে পড়েছিল, যাকে জায়গিরদারি সংকট বলে।
24মুঘল দরবারে দলাদলির কারণ কী ছিল?
সপ্তদশ শতকের শেষে ভালো ও লাভজনক জায়গির পাওয়ার জন্য মুঘল মনসবদারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও লড়াই শুরু হয়। এই স্বার্থের সংঘাতেই দরবারি রাজনীতিতে ইরানি, তুরানি, মারাঠা এবং রাজপুত গোষ্ঠীগুলির মধ্যে দলাদলি ও ষড়যন্ত্র প্রবল রূপ নিয়েছিল।
25মুঘল সাম্রাজ্যের চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কী বিতর্ক আছে?
একদল ঐতিহাসিক মনে করেন মুঘল সাম্রাজ্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংহত ছিল, যা সমগ্র ভারতজুড়ে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু আরেক দল ঐতিহাসিক মনে করেন মুঘলদের ক্ষমতা সর্বত্র সমান ছিল না। উত্তর ভারতে তাদের আধিপত্য থাকলেও অন্য অঞ্চলে তা সীমিত ছিল, তাই একে নিশ্ছিদ্র গালিচার বদলে 'জোড়াতালি দেওয়া কম্বল'-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়।
26বান্দা বাহাদুর কে ছিলেন?
বান্দা বাহাদুর ছিলেন শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের একজন একনিষ্ঠ শিষ্য। গুরু গোবিন্দ সিংহের মৃত্যুর পর বান্দা বাহাদুরই শিখদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে শিখদের সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যান।
27শিবাজি মুঘলদের কোন বন্দরনগরী আক্রমণ করেছিলেন এবং কেন?
শিবাজি মুঘলদের অধীনে থাকা গুজরাটের সুরাট বন্দরনগরী দু-বার আক্রমণ করে লুঠপাট করেছিলেন। মারাঠা স্বরাজ্য গঠন ও বিশাল সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল, তাই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এই বন্দর নগরী আক্রমণ করে তিনি সম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন।
28শায়েস্তা খান কে ছিলেন? তাঁর কী পরিণতি হয়?
শায়েস্তা খান ছিলেন সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পাঠানো একজন মুঘল সেনাপতি। শিবাজিকে দমন করার জন্য তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে পুণেতে শায়েস্তা খানের শিবিরে শিবাজি অতর্কিতে রাত্রে হামলা চালান। জানলা দিয়ে পালানোর সময় শিবাজির তলোয়ারের কোপে শায়েস্তা খানের হাতের আঙুল কাটা যায় এবং তিনি চরম অপমানিত হন।

Broad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

6 টি
1শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থান ও মুঘলদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ইতিহাস আলোচনা করো।

ভূমিকা

খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থান। মারাঠারা মূলত পুণে ও কোঙ্কণ অঞ্চলে বসবাস করত এবং তারা বিজাপুর ও গোলকোন্ডার সেনাবাহিনীতে কাজ করত। কিন্তু তাদের কোনো নিজস্ব স্বাধীন রাজ্য ছিল না। শিবাজি এই বিচ্ছিন্ন মারাঠাদের ঐক্যবদ্ধ করে এক স্বাধীন ও শক্তিশালী হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

শিবাজির প্রথম জীবন ও অনুপ্রেরণা

শিবাজির (১৬৩০-১৬৮০ খ্রিঃ) বাবা শাহজি ভোঁসলে ছিলেন বিজাপুরের সুলতানের এক জায়গিরদার। শিবাজির চরিত্র ও স্বাধীন সত্তা গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর মা জিজাবাঈ এবং তাঁর শিক্ষক দাদাজি কোন্ডদেব। এঁদের আদর্শেই অনুপ্রাণিত হয়ে শিবাজি অল্প বয়স থেকেই মারাঠা যুবকদের (বিশেষ করে মাওয়াল অঞ্চলের পদাতিক বা 'মাবলে') নিয়ে সেনাবাহিনী গঠন করতে শুরু করেন।

বিজাপুর ও মুঘলদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

বিজাপুরের সুলতানের অসুস্থতার সুযোগে শিবাজি বেশ কিছু দুর্গ দখল করেন। তাঁকে দমন করতে বিজাপুরের সুলতান আফজল খানকে পাঠান। কিন্তু সতর্ক শিবাজি 'বাঘনখ' নামক গোপন অস্ত্র দিয়ে আফজল খানকেই হত্যা করেন।

এরপর শিবাজির ক্রমবর্ধমান শক্তি মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিবাজি মুঘলদের সমৃদ্ধ বন্দরনগরী সুরাট দু-বার লুঠ করেন। ঔরঙ্গজেব শিবাজিকে দমন করতে শায়েস্তা খান, মুয়াজ্জম এবং পরে মির্জা রাজা জয়সিংহকে পাঠান। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে জয়সিংহ শিবাজিকে 'পুরন্দরের সন্ধি' স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। এই সন্ধি অনুযায়ী শিবাজিকে তাঁর ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ মুঘলদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

আগ্রায় অপমান ও স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা

পুরন্দরের সন্ধির পর শিবাজি আগ্রায় মুঘল দরবারে গেলে ঔরঙ্গজেব তাঁকে অপমান করেন এবং বন্দী করেন। কিন্তু শিবাজি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে ফলের ঝুড়িতে লুকিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন এবং পুনরায় মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে রায়গড়ে শিবাজির জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক হয়। এর মাধ্যমে তিনি অন্যান্য মারাঠা সর্দারদের কাছে নিজেকে স্বাধীন সার্বভৌম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। মারাঠারা তাদের এই স্বাধীন রাজ্যকে 'স্বরাজ্য' বলত।

উপসংহার

শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠাদের এই উত্থান ছিল মুঘলদের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে এক বিরাট প্রতিরোধ। তিনি শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, 'অষ্টপ্রধান' (আট জন মন্ত্রীর পরিষদ) দ্বারা এক দক্ষ শাসনব্যবস্থাও তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মারাঠা শক্তি পরবর্তীকালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

2শিখ শক্তি কীভাবে মুঘল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের সংগঠিত করেছিল? খালসা সম্পর্কে কী জানো?

ভূমিকা

শিখ ধর্ম মূলত একটি শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, মুঘল সম্রাটদের নীতির কারণে তা ক্রমশ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধে পরিণত হয়। জাহাঙ্গির এবং শাহ জাহানের আমল থেকেই শিখদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে, যা ঔরঙ্গজেবের আমলে চরম আকার ধারণ করে।

শিখ শক্তির রাজনৈতিক রূপান্তর

খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের শেষদিকে গুরু অর্জুনদেবের সময় থেকে শিখ সমাজে বংশানুক্রমিকভাবে গুরু নির্বাচন শুরু হয়, যা গুরুর পদকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে। এরপর ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ একসঙ্গে দুটি তলোয়ার বহন করতে শুরু করেন—একটি ধর্মের এবং অন্যটি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে শিখরা এখন শুধু একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, একটি স্বাধীন সামরিক শক্তিও বটে। এটি মুঘল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছিল।

ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে সংঘাত ও গুরু তেগবাহাদুর

মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের গোঁড়া ধর্মীয় নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন নবম শিখ গুরু তেগবাহাদুর। এছাড়া তিনি পাঠানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাঞ্জাবে মুঘল শাসনের বিরোধিতাও করেছিলেন। এর পরিণতিতে ঔরঙ্গজেব গুরু তেগবাহাদুরকে বন্দী করে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এই ঘটনা শিখদের মুঘলদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। তারা পাঞ্জাবের পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে সশস্ত্র রূপ ধারণ করে।

খালসা প্রতিষ্ঠা ও পঞ্চ-ক

গুরু গোবিন্দ সিংহ ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে 'খালসা' নামক একটি সুশৃঙ্খল সামরিক ও ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। খালসার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিখদের সংগঠিত করা এবং মুঘল ও পাহাড়ি হিন্দু রাজাদের আক্রমণ থেকে তাদের নিরাপদে রাখা। সামরিক প্রশিক্ষণ শিখদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে।

গুরু গোবিন্দ সিংহ খালসাপন্থী শিখদের সর্বদা পাঁচটি নির্দিষ্ট জিনিস কাছে রাখতে বলেন, যেগুলির নাম 'ক' অক্ষর দিয়ে শুরু হয়: ১) কেশ (চুল), ২) কঙ্ঘা (চিরুনি), ৩) কচ্ছা (অন্তর্বাস), ৪) কৃপাণ (তলোয়ার), এবং ৫) কড়া (লোহার বালা)। এছাড়াও তাঁরা নামের শেষে 'সিংহ' পদবি ব্যবহার করতে শুরু করেন।

উপসংহার

গুরু গোবিন্দ সিংহ মুঘলদের সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করতে না পারলেও, তাঁর তৈরি খালসা বাহিনীর ধারাবাহিক প্রতিরোধের ফলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মুঘলদের নিয়ন্ত্রণ চরমভাবে শিথিল হয়ে যায়। গোবিন্দ সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্য বান্দা বাহাদুর এই সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যান।

3মুঘল যুগের শেষ দিকে জাঠ ও সৎনামি বিদ্রোহের কারণ ও প্রকৃতি আলোচনা করো।

ভূমিকা

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যে আঞ্চলিক প্রতিরোধগুলি গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে জাঠ এবং সৎনামি বিদ্রোহ ছিল অন্যতম। মারাঠা বা শিখদের মতো এদের লড়াই নিছক রাজনৈতিক ছিল না, বরং এই বিদ্রোহগুলি মুঘল আমলের গভীর কৃষিব্যবস্থার সংকট ও অর্থনৈতিক শোষণের দিকটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিল।

জাঠ বিদ্রোহের কারণ ও প্রকৃতি

দিল্লি ও আগ্রা অঞ্চলের কৃষকদের একটি বড়ো অংশ ছিল জাঠ উপজাতির। এদের মধ্যে অনেকেই ছোটোখাটো জমিদারও ছিল। মূলত অতিরিক্ত রাজস্বের বোঝা এবং মুঘল কর্মচারীদের শোষণের প্রতিবাদে জাহাঙ্গির ও শাহ জাহানের আমল থেকেই জাঠদের সঙ্গে মুঘলদের সংঘাত বেঁধেছিল।

ঔরঙ্গজেবের আমলে এই অসন্তোষ তীব্র রূপ নেয়। গোকলা নামক এক স্থানীয় জমিদারের নেতৃত্বে জাঠ কৃষকরা মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে জোটবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের প্রকৃতি ছিল দ্বিমুখী—একদিকে এটি ছিল অতিরিক্ত করের বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত 'কৃষক বিদ্রোহ', অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীপরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাঠরা মুঘলদের অধীনতা অস্বীকার করে একটি 'আলাদা রাজ্য' গঠন করতে চেয়েছিল।

সৎনামি বিদ্রোহ

জাঠ বিদ্রোহের সমসাময়িক আরেকটি কৃষক অভ্যুত্থান হলো সৎনামি বিদ্রোহ। মথুরার কাছে নারনৌল অঞ্চলে এক দল কৃষক মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল। এই কৃষকরা 'সৎনামি' নামক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুগামী ছিল। মুঘল রাজস্ব আধিকারিকদের অত্যাচার ও স্বৈরাচারের প্রতিবাদেই এই শান্তিকামী ধর্মীয় গোষ্ঠীর কৃষকরা অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। মুঘল সেনাবাহিনী কঠোর হাতে এই বিদ্রোহ দমন করলেও, এটি সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

কৃষি সংকট ও কেন্দ্রীয় স্বৈরাচার

জাঠ এবং সৎনামি বিদ্রোহ কোনো ধর্মীয় লড়াই ছিল না। সপ্তদশ শতকে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিজাতরা কৃষকদের ওপর রাজস্বের চাপ চূড়ান্তভাবে বাড়িয়ে দেয়। মুঘল রাষ্ট্র কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু, মুঘল প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্বৈরাচার এই কৃষকদের বিদ্রোহের পথে ঠেলে দিয়েছিল।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, জাঠ ও সৎনামি বিদ্রোহ প্রমাণ করেছিল যে মুঘল সাম্রাজ্য তার সাধারণ কৃষক শ্রেণির সমর্থন হারিয়েছে। অর্থনৈতিক শোষণ ও কৃষি সংকটের ফলে সৃষ্ট এই কৃষক বিদ্রোহগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও অবশ্যম্ভাবী পতনের ইঙ্গিত দিয়েছিল।

4মুঘল যুগে জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট কেন দেখা দিয়েছিল? এর প্রভাব কী হয়েছিল?

ভূমিকা

মুঘল প্রশাসনের দুটি মূল স্তম্ভ ছিল মনসবদারি ব্যবস্থা এবং জায়গিরদারি ব্যবস্থা। কিন্তু শাহ জাহানের সময় থেকেই এই দুটি ব্যবস্থায় ফাটল ধরতে শুরু করে এবং ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে তা এক তীব্র আকার ধারণ করে, যাকে ঐতিহাসিকরা 'জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট' বলে অভিহিত করেন।

সংকটের কারণসমূহ

  1. বেতন ও পদের অমিল: মনসবদারদের তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী যে বিপুল বেতন পাওয়ার কথা, মুঘল কোষাগারে তত অর্থ ছিল না। ফলে খাতায়-কলমে হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির তফাত বেড়েই চলেছিল।
  2. রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা: কৃষক বিদ্রোহ (যেমন জাঠ ও সৎনামি) এবং জমিদারদের অসহযোগিতার কারণে অনেক সময় জায়গির থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা যেত না।
  3. খালিসা জমির বৃদ্ধি: ঔরঙ্গজেব বিজাপুর এবং গোলকোন্ডা জয়ের পর দাক্ষিণাত্যের সব থেকে ভালো ও উর্বর জমিগুলিকে 'খালিসা' বা খাস জমি হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে রেখেছিলেন। ফলে মনসবদারদের জায়গির হিসেবে দেওয়ার মতো ভালো জমির তীব্র অভাব দেখা দেয়।
  4. কৃষি সংকট: জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষকদের উপর অতিরিক্ত করের চাপে কৃষকরা গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। জমি চাষ না হওয়ার ফলে রাজস্ব আদায়ও বন্ধ হয়ে যায়।
  5. দুর্নীতি: মনসবদাররা তাদের প্রাপ্য বেতন না পাওয়ায়, তাদের যতজন ঘোড়সওয়ার ও সৈন্য রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা ছিল, তা তারা করত না। মিথ্যা হিসাব দেখিয়ে তারা দুর্নীতি করতে শুরু করে।

সংকটের প্রভাব

এই সংকটের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের উপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল:

  • সামরিক দুর্বলতা: মনসবদাররা নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য না রাখায় মুঘল সেনাবাহিনীর প্রকৃত শক্তি মারাত্মকভাবে কমে যায়, যা মারাঠাদের মতো আঞ্চলিক শক্তি দমনে ব্যর্থ হয়।
  • দরবারি দলাদলি: সপ্তদশ শতকের শেষে ভালো ও লাভজনক জায়গির পাওয়ার জন্য মনসবদারদের মধ্যে তীব্র রেষারেষি শুরু হয়। এর ফলে দরবারে ইরানি, তুরানি, মারাঠা এবং রাজপুত গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ও ষড়যন্ত্র বৃদ্ধি পায়।
  • শাসনব্যবস্থার অবক্ষয়: দাক্ষিণাত্যে রাজস্ব আদায়ের জন্য মুঘল মনসবদাররা বাধ্য হয়ে মারাঠা সর্দারদের সাহায্য নিতে শুরু করে, যার অর্থ হলো ওই অঞ্চলে মুঘলদের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ আলগা হয়ে গিয়েছিল।

উপসংহার

মনসবদারি ও জায়গিরদারি সংকট কোনো একজন মুঘল শাসকের সৃষ্টি ছিল না। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক সমস্যা, দুর্নীতি ও কৃষি সংকটের ফলে এই জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল।

5মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পিছনে কৃষি সংকটের ভূমিকা কী ছিল?

ভূমিকা

মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে মুঘল ভারতের কৃষিব্যবস্থায় এক গভীর সংকট দেখা দেয়, যা 'কৃষি সংকট' নামে পরিচিত। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্রে এই কৃষি সংকট এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

কৃষি সংকটের কারণ

এই সংকটের পিছনে একাধিক আর্থ-সামাজিক কারণ দায়ী ছিল:

  1. জনসংখ্যা বৃদ্ধি বনাম উৎপাদন: এই সময়ে কৃষিজ ফসলের উৎপাদন বাড়লেও, তার তুলনায় কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। মুঘল শাসকরা নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করে জমির উর্বরতা বাড়াতে পারেননি।
  2. মূল্যবৃদ্ধি ও শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি: সপ্তদশ শতকে জিনিসপত্রের দাম প্রচণ্ড বেড়ে যায়। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে মুঘল অভিজাত ও মনসবদাররা তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য জমি থেকে আয় বাড়াতে সচেষ্ট হন। এর ফলে তারা জমিদার ও কৃষকদের ওপর রাজস্বের চাপ নির্মমভাবে বাড়াতে থাকে।
  3. জায়গিরদারদের স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ: জায়গিরদারদের ঘন ঘন বদলি করা হতো। তাই কোনো জায়গিরে স্থায়ীভাবে কৃষির উন্নতি করার বদলে তারা অল্প সময়ে কৃষকদের থেকে বেশি পরিমাণ অর্থ শুষে নেওয়ার চেষ্টা করত।

কৃষি সংকটের প্রভাব ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন

এই কৃষি সংকট মুঘল সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন দিক থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল:

  • কৃষক বিদ্রোহ: অতিরিক্ত রাজস্বের চাপে দিশেহারা হয়ে কৃষকরা বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। উত্তর ভারতের জাঠ এবং সৎনামি বিদ্রোহ ছিল মূলত এই কৃষি সংকটেরই ফল। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জমিদাররাও এই কৃষকদের মদত দিত।
  • কৃষিভূমির বিনাশ: শোষণের হাত থেকে বাঁচতে অনেক সময় কৃষকরা রাজস্ব না দিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেত। ফলে জমিগুলি পতিত পড়ে থাকত এবং চাষ হতো না।
  • জায়গিরদারি সংকট তীব্র হওয়া: চাষ না হওয়ার ফলে রাজস্ব আদায় বন্ধ হয়ে যায়। যে সব মনসবদার এই সব জমিতে জায়গির পেয়েছিল, তারা তাদের প্রাপ্য অর্থ পেত না। ফলে তারা ঘোড়সওয়ার ও সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারত না, যা মুঘল সামরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দেয়।

উপসংহার

সুতরাং, কৃষি সংকট শুধুমাত্র কৃষকদের দুর্দশাই বাড়ায়নি, এটি একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দিয়েছিল। কৃষকের দুর্দশা থেকে রাজস্বের ঘাটতি, সেখান থেকে সামরিক দুর্বলতা এবং পরিশেষে বিদ্রোহ—এই শৃঙ্খল মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে তার পতন ডেকে এনেছিল।

6সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের সামগ্রিক অবস্থা ও পতনের কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।

ভূমিকা

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিঃ) মুঘল সাম্রাজ্য ভৌগোলিক দিক থেকে তার চরম সীমায় পৌঁছেছিল। তিনি বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু বাহ্যিক এই বিশালত্বের আড়ালে মুঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি গভীরভাবে নড়ে গিয়েছিল। ঔরঙ্গজেবের আমলেই এমন কিছু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, যা সাম্রাজ্যের অবশ্যম্ভাবী পতন ডেকে আনে।

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ও প্রতিরোধ

ঔরঙ্গজেবের সময়ে মুঘলদের চরম সার্বভৌমত্বের ধারণায় বড়োসড়ো আঘাত আসে।

  • মারাঠা শক্তি: দাক্ষিণাত্যে শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠারা এক স্বাধীন ও শক্তিশালী স্বরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। ঔরঙ্গজেব জীবনের শেষ ২৫ বছর দাক্ষিণাত্যে কাটিয়েও মারাঠাদের সম্পূর্ণরূপে দমন করতে পারেননি।
  • শিখ প্রতিরোধ: ঔরঙ্গজেবের ধর্মান্ধ নীতির কারণে নবম শিখ গুরু তেগবাহাদুরের হত্যা শিখদের চরম মুঘল-বিরোধী করে তোলে। গুরু গোবিন্দ সিংহের 'খালসা' বাহিনীর সশস্ত্র লড়াই উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মুঘল নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেয়।

অর্থনৈতিক ও কৃষি সংকট

সাম্রাজ্যের পতনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক দুরবস্থা।

  • জায়গিরদারি সংকট: ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের উর্বর জমিগুলি 'খালিসা' (খাস জমি) হিসেবে নিজের কাছে রেখে দেন। ফলে মনসবদারদের দেওয়ার মতো ভালো জায়গিরের অভাব দেখা দেয়। ভালো জায়গির পাওয়ার জন্য দরবারে বিভিন্ন গোষ্ঠীর (ইরানি, তুরানি, রাজপুত) মধ্যে মারাত্মক দলাদলি ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়।
  • কৃষি সংকট ও বিদ্রোহ: জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভিজাতদের শোষণের ফলে কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে জাঠ ও সৎনামিদের মতো শক্তিশালী কৃষক বিদ্রোহ ঘটে, যা প্রমাণ করে যে মুঘল রাষ্ট্র তার সাধারণ প্রজার সমর্থন হারিয়েছে।

সামরিক অবক্ষয়

জায়গির থেকে সঠিক রাজস্ব আদায় না হওয়ায় মনসবদাররা তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘোড়সওয়ার বা সেনাবাহিনী পোষণ করত না। খাতায়-কলমে মুঘল সেনাবাহিনী বিশাল মনে হলেও বাস্তবে তা ছিল দুর্বল ও অকার্যকর। দীর্ঘ দাক্ষিণাত্য যুদ্ধ মুঘল কোষাগার ও সামরিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল।

উপসংহার

ঐতিহাসিকদের মতে, মুঘল সাম্রাজ্য কোনো নিশ্ছিদ্র গালিচা ছিল না, বরং তা ছিল একটি 'জোড়াতালি দেওয়া কম্বল'। উত্তর ভারতে মুঘলদের আধিপত্য থাকলেও অন্যান্য অঞ্চলে তাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত। ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে অতিরিক্ত সাম্রাজ্য বিস্তার, আঞ্চলিক শক্তির তীব্র প্রতিরোধ, মনসবদারি ও কৃষি সংকট—সব মিলিয়ে এই জোড়াতালি দেওয়া কম্বলের সেলাইগুলো খুলে যেতে শুরু করে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ঘণ্টা বেজে যায়।

মনে রেখো!

এই অধ্যায়ে আমরা দেখলাম কিভাবে বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। একদিকে শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠারা এবং গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে শিখরা মুঘলদের প্রবল প্রতিরোধ করেছিল। অন্যদিকে, কৃষি সংকট, জায়গিরদারি ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং জাঠ ও সৎনামিদের মতো সাধারণ কৃষকদের বিদ্রোহ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। ইতিহাসের এই উত্থান-পতনের কারণগুলো বুঝে পড়লে সহজেই মনে থাকবে!

Sponsored Links

Class 7 History Chapter 8 - সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর

Science Tips-এ স্বাগত! WBBSE Class 7 History-র অষ্টম অধ্যায় "মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট"-র A+++ মানের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা। এই অধ্যায় থেকে তুমি পাবে—শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থান, পুরন্দরের সন্ধি, শিখদের প্রতিরোধ ও খালসা বাহিনী, জাঠ ও সৎনামি কৃষক বিদ্রোহ, এবং মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণ হিসেবে জায়গিরদারি ও কৃষি সংকট। ৪০টি MCQ, ৩০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন এবং ৬টি বড়ো প্রশ্নের মাধ্যমে তোমার পরীক্ষার প্রস্তুতি হবে ১০০% সম্পূর্ণ!

Frequently Asked Questions

শিবাজি ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে রায়গড়ে জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেকের মাধ্যমে মারাঠা স্বরাজ্য বা স্বাধীন মারাঠা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে শিবাজি এবং মুঘল সেনাপতি মির্জা রাজা জয়সিংহের মধ্যে পুরন্দরের সন্ধি হয়। এই সন্ধির ফলে শিবাজিকে তাঁর ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ মুঘলদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিংহ শিখদের সুরক্ষিত ও সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে 'খালসা' নামক সশস্ত্র বাহিনী ও সংগঠন তৈরি করেছিলেন।

জাঠ এবং সৎনামি বিদ্রোহ মূলত ছিল কৃষক বিদ্রোহ। মুঘল যুগের শেষদিকে জিনিসপত্রের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অভিজাতদের অতিরিক্ত কর আদায়ের শোষণের বিরুদ্ধেই এই কৃষকরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।

ঔরঙ্গজেব ভালো জমিগুলো 'খালিসা' বা খাস জমি হিসেবে রাখায় মনসবদারদের জায়গির দেওয়ার মতো ভালো জমির অভাব দেখা দেয়। এর ফলে মনসবদাররা তাদের প্রাপ্য আয় থেকে বঞ্চিত হয় এবং মুঘল সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তাকেই জায়গিরদারি সংকট বলে।