1ভারতের সামন্ত ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ স্থানে কে থাকতেন?
2পাল-সেন যুগে বাংলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি কী ছিল?
3সামন্তরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত?
4ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা বলতে কী বোঝায়?
5পাল-সেন যুগে বাংলায় কোন মুদ্রার ব্যবহার কমে গিয়েছিল?
6রামচরিত কাব্যটি কে রচনা করেন?
7অতীশ দীপঙ্কর কোথায় গিয়েছিলেন?
8পাল যুগে কোন ধর্মের প্রভাব বেশি ছিল?
9সেন রাজারা কোন ধর্মকে প্রাধান্য দিতেন?
10পাল যুগে শিল্পকলায় বিখ্যাত দুই ব্যক্তি কে ছিলেন?
11সামন্ত ব্যবস্থায় রাজা ও প্রজার মধ্যে যোগাযোগ কেমন ছিল?
12পাল-সেন যুগে জমি কেনা-বেচার সময় কার খবর দিতে হত?
13রাজারা কৃষকদের কাছ থেকে কত ভাগ কর নিতেন?
14সেন যুগে সমাজে বর্ণব্যবস্থা কেমন ছিল?
15নীচের কোনটি বৌদ্ধবিহার ছিল?
16পাল যুগে বাংলা ভাষার উৎপত্তি কোন ভাষা থেকে হয়?
17ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের কেন্দ্রীয় সময় কোনটি?
18দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সংস্কৃতি কীভাবে ছড়িয়েছিল?
19সেন রাজাদের মধ্যে কে বৈষ্ণব ছিলেন?
20'সামন্ত ব্যবস্থা'র ইংরেজি প্রতিশব্দ কী?
21পাল যুগের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য নিদর্শন কোনটি?
22নীচের কোনটি পালযুগের বিহার নয়?
23সেন আমলে রাজপরিবারের মহিলাদের কী বলা হত?
24পাল-সেন যুগে বাণিজ্যের অবনতির কারণ কী ছিল?
25দক্ষিণ ভারতে বাণিজ্যের উন্নতির একটি কারণ কী ছিল?
26রামচরিত কাব্যে রামপালের পিতৃভূমি উদ্ধারের সঙ্গে কীসের তুলনা করা হয়েছে?
27পাল যুগে বাংলার প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য কী ছিল?
28সেন যুগে অ-ব্রাহ্মণদের কী বলা হত?
29ইন্দোনেশিয়ার কোন স্থাপত্যটি বিশ্বের বৃহৎ বৌদ্ধকেন্দ্র ছিল?
30পাল যুগের কাঠশিল্পীরা সমাজে কীভাবে সংগঠিত ছিলেন?
31কম্বোডিয়ায় (কম্বোজ) রামায়ণের ঘটনা কীভাবে প্রচলিত ছিল?
32সামন্ত ব্যবস্থায় মহাসামন্ত কাদের বলা হত?
33পাল-সেন যুগে বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম কী হয়ে উঠেছিল?
34বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের লেখা বইয়ের নাম কী ছিল?
35সেন আমলে প্রশাসনিক একক কী কী ছিল?
36ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রে নাইটরা কী করত?
37পাল যুগে শিক্ষার প্রধান ভাষা কী ছিল?
38উত্তর ভারতে সোনা-রুপার মুদ্রার অভাবের কারণ কী ছিল?
39সেন যুগে বৌদ্ধরা কেমন সুযোগ-সুবিধা পেত?
40ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্পর্ক কেমন ছিল?
1ভারতের সামন্ত ব্যবস্থা কী?
সামন্ত ব্যবস্থা (Feudalism) হলো মধ্যযুগে ভারতের একটি বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে রাজা থেকে শুরু করে মহাসামন্ত, সামন্ত এবং তার নীচে সাধারণ প্রজা—এই স্তরভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। রাজা তাঁর অনুগত কর্মচারী বা যুদ্ধে সাহায্যকারীদের নগদ বেতনের পরিবর্তে জমি দান করতেন। সেই জমির রাজস্ব ছিল তাঁদের আয়ের উৎস। এরা নিজেরা পরিশ্রম করে উৎপাদন না করে অন্যদের শ্রম বা রাজস্ব থেকে জীবিকা নির্বাহ করত। একে পিরামিডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—যার একেবারে ওপরে রাজা এবং নীচে সাধারণ মানুষ।
2পাল-সেন যুগে বাংলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি কী কী ছিল?
পাল-সেন যুগে বাংলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল তিনটি স্তম্ভ: (১) কৃষি—ধান, আখ, তুলা, নীল প্রভৃতি ফসলের চাষ হতো এবং রাজারা উৎপন্ন ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ ভাগ) কর নিতেন। (২) শিল্প—বিশেষ করে সুক্ষ্ম সুতির বস্ত্রবয়ন শিল্প অত্যন্ত উন্নত ছিল, যার খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। কাঠ ও ধাতুর কাজও উন্নত ছিল। (৩) বাণিজ্য—দেশি ও বিদেশি বাণিজ্য চলত, যদিও ধীরে ধীরে বাণিজ্যের গুরুত্ব কমে কৃষিনির্ভরতা বেড়ে গিয়েছিল।
3ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা কাকে বলে?
ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা ছিল পাল-সেন যুগে প্রচলিত একটি ভূমিদান ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় রাজারা ব্রাহ্মণদের (বা কখনও বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরকে) জমি দান করতেন, যার উপর কোনো কর (ট্যাক্স) নেওয়া হতো না। করমুক্ত এই জমি দানের উদ্দেশ্য ছিল—(১) অনাবাদী জমি ও জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি তৈরি করা, (২) কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানো, (৩) ব্রাহ্মণদের জীবিকা ও ধর্মীয় কাজের সুবিধা প্রদান, এবং (৪) ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে নতুন এলাকায় সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এই জমিকে 'ব্রহ্মদেয়' বলা হতো।
4পাল ও সেন যুগের অর্থনীতির মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী ছিল?
পাল ও সেন যুগের অর্থনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল: পাল যুগে বাণিজ্যের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল এবং বাংলার বণিকেরা ভারতের পশ্চিম দিকের সমুদ্রপথে আরব বণিকদের সঙ্গে সক্রিয় বাণিজ্য চালাতেন। কিন্তু সেন যুগে ভারতের পশ্চিম দিকের সমুদ্রে আরব বণিকদের দাপট বেড়ে যাওয়ায় বাংলার বণিকেরা পিছু হটতে বাধ্য হন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্ব কমে যায়। এর ফলে বাংলার অর্থনীতি ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে সোনা-রুপার মুদ্রার ব্যবহারও কমে যায় এবং জিনিসপত্রের সরাসরি বিনিময় (Barter) প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।
5সামন্ত ব্যবস্থায় রাজা ও প্রজার মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?
সামন্ত ব্যবস্থায় রাজা ও সাধারণ প্রজার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল। এটি ছিল অনেকটা পিরামিডের মতো স্তরভিত্তিক কাঠামো। রাজার সঙ্গে প্রজার সরাসরি যোগাযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। মাঝে ছিল মহাসামন্ত ও সামন্তরা। রাজার আদেশ ও কর আদায়ের কাজ এই সামন্তরাই করতেন। এর ফলে: (১) রাজা তাঁর প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট জানতে পারতেন না, (২) সামন্তরা নিজেদের স্বাধীন রাজার মতো আচরণ করতে শুরু করতেন, (৩) অনেক সময় রাজার বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র করতেন, (৪) স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় স্বায়ত্তশাসন নষ্ট হতো। ফলে রাজশক্তির দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠত।
6রামচরিত কাব্যটির গুরুত্ব কী? এর রচয়িতা কে?
রামচরিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ, যার রচয়িতা হলেন সন্ধ্যাকর নন্দী। তিনি পাল রাজা রামপালের পুত্র মদনপালের (আনুমানিক ১১৪৩-৬১ খ্রি.) রাজত্বকালে এই কাব্য রচনা করেন। কাব্যটির বিশেষত্ব হলো এটি 'শ্লেষ কাব্য'—একই শব্দের দুটি আলাদা অর্থ হয়। কবি একই সঙ্গে (১) রামায়ণের রামের কাহিনি এবং (২) পালরাজা রামপালের জীবনকাহিনি বর্ণনা করেছেন। যেমন, রামায়ণে সীতাকে উদ্ধারের সঙ্গে রামপালের কৈবর্তদের থেকে পিতৃভূমি উদ্ধারের ঘটনার তুলনা করা হয়েছে। এই কাব্য থেকে আমরা দ্বাদশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস জানতে পারি, তাই এটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
7অতীশ দীপঙ্কর কে ছিলেন? কেন তিনি বিখ্যাত?
অতীশ দীপঙ্কর (দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান) ছিলেন পাল যুগের একজন বিখ্যাত বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত ও আচার্য। তিনি বিক্রমশীল মহাবিহারের প্রধান ছিলেন। ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতের রাজার অনুরোধে তিনি তিব্বতে যান এবং সেখানে মহাযান বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। বিখ্যাত হওয়ার কারণ: (১) তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণে তাঁর অসামান্য অবদান। (২) তিনি অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। (৩) তিব্বতিরা তাঁকে বুদ্ধের অবতার (উপাসক) হিসেবে পূজা করে। (৪) লাসার কাছে তাঁর সমাধিমন্দির আজও পবিত্র তীর্থস্থান। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর বিষয়ে লিখেছেন—'বাঙালি অতীশ ছিল গিরি তুষার ভয়ংকর, জ্বালিলেন জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালি দীপঙ্কর'। তাঁর কারণে বাংলা-বিহারের বৌদ্ধ আচার্যরা মনে করতেন তিনি তিব্বতে চলে গেলে ভারতবর্ষ অন্ধকার হয়ে যাবে।
8পাল যুগে বাংলায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির কী অবস্থা ছিল?
পাল যুগ ছিল বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির 'স্বর্ণযুগ'। এই যুগের বৈশিষ্ট্য: (১) বৌদ্ধবিহারগুলো (নালন্দা, ওদন্তপুরী, বিক্রমশীল, সোমপুরী, জগদ্দল, বিক্রমপুরী) ছিল জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র—যেন আজকের বিশ্ববিদ্যালয়। (২) এখানে সারা ভারতবর্ষ ও তিব্বত, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ছাত্ররা পড়তে আসতেন। (৩) আচার্য ও ছাত্রদের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালি। (৪) বিখ্যাত আচার্যদের মধ্যে ছিলেন শান্তরক্ষিত, শান্তিদেব, লুইপাদ, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (অতীশ), গোরক্ষনাথ, কাহ্নপাদ। (৫) বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন 'চর্যাপদ' রচনা করেন। (৬) শিক্ষিত সমাজে সংস্কৃত ভাষার প্রাধান্য ছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল প্রাচীন বাংলা। (৭) পাল রাজারা ছিলেন এই শিক্ষা বিপ্লবের পৃষ্ঠপোষক।
9সেন যুগে হিন্দু ধর্মের কী অবস্থা ছিল?
সেন যুগে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসার কমে গিয়ে ব্রাহ্মণ্য (হিন্দু) ধর্মের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকেই প্রধান্য দিতেন। এই সময়ের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল: (১) বৈদিক ধর্ম ও পৌরাণিক ধর্মের মিশ্রণ ঘটেছিল। (২) ইন্দ্র, অশ্বিনীদ্বয়, কুবের, সূর্য, বৃহস্পতি, গঙ্গা, যমুনা, মাতৃকা, শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবদেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। (৩) সেন রাজাদের মধ্যে লক্ষ্মণসেন ছিলেন বৈষ্ণব (বিষ্ণুর উপাসক), কিন্তু তাঁর পূর্বসূরিরা (যেমন বিজয়সেন, বল্লালসেন) ছিলেন শৈব (শিবের উপাসক)। (৪) ব্রাহ্মণরা সমাজপতি হিসেবে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করতেন। (৫) বর্ণব্যবস্থা কঠোর ও অনমনীয় হয়ে পড়েছিল। (৬) বৌদ্ধরা আগেকার যুগের মতো সুযোগ-সুবিধা পেত না।
10সামন্তরা কীভাবে নিজেদের ক্ষমতা বাড়াত?
সামন্তরা বিভিন্ন উপায়ে নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতেন: (১) নিজ অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি গ্রামের শাসন ও বিচার নিজের হাতে তুলে নিতেন। (২) যুদ্ধ-বিবাদ লেগেই থাকত—সবাই নিজের ক্ষমতা আরও খানিক বাড়িয়ে নিতে চাইত। (৩) কখনো কখনো তারা জোট বেঁধে রাজার বিরুদ্ধেও যুদ্ধে নামত এবং রাজার ক্ষমতাকে অস্বীকার করত। (৪) একসময় দখল করা গ্রামের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতেন। (৫) রাজা দুর্বল হলে তারা কার্যত স্বাধীন রাজার মতো আচরণ করতে শুরু করতেন। এর ফলে রাজশক্তির দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠত এবং কেন্দ্রীয় শাসন ভেঙে পড়ত, যা সামন্ততন্ত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ও দুর্বলতা।
11পাল-সেন যুগে জমি কেনা-বেচার সময় কী নিয়ম ছিল?
পাল-সেন যুগের তাম্রশাসন ও লিখিত দলিল থেকে জানা যায় যে, জমি কেনা-বেচার সময় কৃষককেও তার খবর দিতে হতো। অর্থাৎ: (১) জমির মালিক শুধু রাজা বা জমিদার নন, জমিতে চাষ করা কৃষকেরও কিছু অধিকার স্বীকৃত ছিল। (২) কৃষকের অজান্তে বা অমতে জমি বিক্রি করা যেত না। (৩) জমি হস্তান্তরের সময় কৃষকের সম্মতি ও উপস্থিতির প্রয়োজন হতো। এই নিয়ম থেকে বোঝা যায় যে, সমাজে কৃষকদের একেবারে অবহেলা করা হতো না—তাঁদের কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার স্বীকৃত ছিল। তবে মনে রাখতে হবে, জমির মূল ও চূড়ান্ত অধিকার রাষ্ট্র বা রাজার কাছেই ছিল।
12পাল যুগে বাংলার বস্ত্রশিল্পের খ্যাতি কেমন ছিল?
পাল যুগে বাংলার বস্ত্রশিল্প, বিশেষ করে সুক্ষ্ম সুতির কাপড়, অত্যন্ত উন্নত ছিল এবং দেশে-বিদেশে এর বিপুল খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। শিক্ষাদ্রব্যের মধ্যে কাপাস বস্ত্র ছিল প্রধান সামগ্রী। বাংলার কারিগররা এত সূক্ষ্ম সুতোয় কাপড় বুনতে পারতেন যে তা বিদেশিরা বিস্ময়ে দেখতেন। এই সুক্ষ্ম বস্ত্র ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ ধরে আরব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপ পর্যন্ত রপ্তানি হতো। বস্ত্রশিল্প ছাড়াও কাঠের কাজ (ঘর-বাড়ি, মন্দির, পালকি, নৌকা) এবং ধাতুর কাজ (গয়না, মূর্তি) অত্যন্ত উন্নত ছিল। শিল্পীরা 'নিগম' বা 'গোষ্ঠী' নামে সংগঠিত হয়ে কাজ করতেন, যা ছিল প্রাচীন ট্রেড ইউনিয়নের মতো।
13দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সংস্কৃতি কীভাবে ছড়িয়েছিল?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (বর্তমান মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া) ভারতীয় সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছিল প্রধানত দুটি মাধ্যমে: (১) বাণিজ্য—ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক সমুদ্রবাণিজ্যের মাধ্যমে ভারতীয় বণিকরা এই অঞ্চলে যাতায়াত করতেন এবং ধীরে ধীরে ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা, লিপি, ধর্ম ও শিল্পের প্রভাব বিস্তার লাভ করে। (২) ধর্মপ্রচার—বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মপ্রচারক ও পণ্ডিতরা (বিশেষ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা) এইসব দেশে গিয়ে ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রচার করেন। এর ফলাফল ছিল অসাধারণ: ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর মন্দির (পৃথিবীর বৃহৎ বৌদ্ধমন্দির), কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট মন্দির (হিন্দু-বৌদ্ধ স্থাপত্যের অপূর্ব মিশ্রণ)—যার গায়ে রামায়ণ-মহাভারতের গল্প খোদাই করা আছে। কম্বোডিয়ায় রামায়ণের ঘটনা নিয়ে নৃত্য-সংগীত আজও জনপ্রিয়। তবে এই সম্পর্ক সম্পূর্ণ একমুখী ছিল না—এই দেশগুলি তাদের নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির মৌলিকতা বজায় রেখেছিল এবং ভারতও তাদের থেকে নতুন ফসল ফলানোর কলা-কৌশল শিখেছিল। একে বলে 'সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান'।
14উত্তর ভারতে সোনা-রুপার মুদ্রার অভাব কেন হয়েছিল?
উত্তর ভারতে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে সোনা-রুপার ভালো মানের মুদ্রার অভাব দেখা দিয়েছিল, যার পিছনে একাধিক কারণ ছিল: (১) বৃহৎ সাম্রাজ্যের পতন ও আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থানের ফলে কেন্দ্রীয় মুদ্রা-ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। (২) দূরপাল্লার বাণিজ্যের পতন ও আরব বণিকদের দাপটে ভারত থেকে মূল্যবান ধাতু বাইরে চলে যাচ্ছিল। (৩) সোনা ও রুপার খনির অপ্রতুলতা। (৪) অর্থনীতি ক্রমশ কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ায় লেনদেন কমে জিনিসপত্রের সরাসরি বিনিময় (Barter) জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। (৫) রাজারা মুদ্রা তৈরির পরিবর্তে মন্দির-বিহার নির্মাণে বেশি মনোযোগী ছিলেন। তবে সমসাময়িক গ্রন্থে বহু ধরনের মুদ্রার নাম পাওয়া গেলেও, সেগুলি কতটা প্রচলিত ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
15সেন যুগে সমাজব্যবস্থা কেমন ছিল?
সেন যুগে সমাজব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে: (১) প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ—রাষ্ট্র অসংখ্য ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। (২) রাজপরিবারের মহিলাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়—তাঁদের 'রাজ্ঞী' বা 'রাজমহিষী' বলা হতো এবং লিখিত নথিতে তাঁদের উল্লেখ আছে। (৩) সাধারণ মানুষের জীবন মোটামুটি সচ্ছল ছিল, তবে ভূমিহীন ব্যক্তি ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। (৪) পাল আমলের তুলনায় সেন আমলে বর্ণব্যবস্থা অনেক কঠোর ও অনমনীয় হয়ে পড়েছিল। (৫) ব্রাহ্মণরা সমাজপতি হিসেবে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করতেন এবং তাঁদের মধ্যে একাধিক উপবিভাগ ছিল। (৬) অ-ব্রাহ্মণদের 'সংকর' বা 'শুদ্ধ' বলে গণ্য করা হতো। (৭) ব্রাহ্মণরা অ-ব্রাহ্মণদের কাজ করতে পারলেও, অ-ব্রাহ্মণরা ব্রাহ্মণদের কাজ করতে পারত না—এই বৈষম্য ছিল তীব্র। (৮) উপজাতি ও আদিবাসী মানুষদের নিয়েও নানা নিয়ম ছিল।
16পাল শাসনের তুলনায় সেন শাসন কম দিন স্থায়ী হয়েছিল কেন?
পাল শাসনের তুলনায় সেন শাসন বাংলায় কম দিন স্থায়ী হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ ছিল: (১) ধর্মীয় পরিবর্তন—পালরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণু ছিলেন, কিন্তু সেনরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে বৌদ্ধদের কোণঠাসা করে সমাজে বিভাজন তৈরি করেন। (২) প্রশাসনিক দুর্বলতা—সেন আমলে রাষ্ট্র ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায় এবং সামন্তদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা কেন্দ্রীয় শাসনকে দুর্বল করে। (৩) বর্ণব্যবস্থার কাঠিন্য—সমাজে কঠোর বর্ণবাদ ও বৈষম্য সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছিল। (৪) বহিঃশত্রুর আক্রমণ—১৩শ শতকের শুরুতে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বখতিয়ার খলজির আক্রমণে সেন শাসনের পতন হয়। সেই তুলনায় পালরা প্রায় ৪০০ বছর (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক) শাসন করেছিলেন, কারণ তাঁদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, কেন্দ্রীয় শাসনের শক্তি এবং বৌদ্ধবিহারকেন্দ্রিক শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা জনগণের সমর্থন ধরে রেখেছিল।
17পাল যুগের ভাস্কর্য ও শিল্পকলার পরিচয় দাও।
পাল যুগ ছিল বাংলার ভাস্কর্য ও শিল্পকলার এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এই যুগের শিল্পকলার বৈশিষ্ট্যগুলি: (১) ধাতব শিল্প, ভাস্কর্য এবং চিত্রশিল্প—এই তিন ক্ষেত্রেই অসাধারণ কৃতিত্ব দেখা গিয়েছিল। (২) অষ্টম-নবম শতকে বরেন্দ্রভূমির (উত্তরবঙ্গ) ধীমান এবং তাঁর পুত্র বীটপাল ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী। এঁরা 'পাল শিল্পরীতি'র প্রবর্তক। (৩) ধাতব মূর্তি (বিশেষ করে অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি) ছিল অপরূপ সুন্দর ও বিশ্ববিখ্যাত। (৪) পাথরের মূর্তি ও ভাস্কর্যে নিপুণ কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হতো। (৫) পুথিচিত্র (মিনিয়েচার পেন্টিং)—তালপাতার পুঁথিতে সূক্ষ্ণ চিত্রাঙ্কনের রীতি ছিল। (৬) সোমপুরী বিহার (পাহাড়পুর) ছিল পাল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন—এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধবিহার। পাল শিল্পরীতি নেপাল, তিব্বত, মায়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়ার শিল্পকলাকেও প্রভাবিত করেছিল।
18পাল-সেন যুগে কৃষকদের ওপর কী কী কর চাপানো হতো?
পাল-সেন যুগে কৃষকদের ওপর নানা ধরনের কর চাপানো হতো: (১) ফসলের কর—উৎপন্ন ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ ভাগ) রাজাকে দিতে হতো। এটাই ছিল প্রধান কর। (২) ফুল, ফল ও কাঠের কর—রাজা ও রাজপরিবারের ভোগের জন্য ফুল, ফল ও জ্বালানি কাঠ কর হিসেবে নেওয়া হতো। (৩) পশুপালন কর। (৪) জলের কর—সেচের পানির জন্যও কৃষককে কর দিতে হতো। (৫) অতিরিক্ত কর—প্রধান তিন ধরনের কর (ফসল, ভোগ্যপণ্য, বাণিজ্য) ছাড়াও নানা ধরনের অতিরিক্ত কর আদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বলাবাহুল্য যে, জমি কেনা-বেচার সময় কৃষককেও খবর দিতে হতো এবং জমির কিছু অধিকার কৃষকদেরও স্বীকৃত ছিল। এর অর্থ, সমাজে কৃষকদের সম্পূর্ণ অবহেলা করা হতো না। কিন্তু ভূমিহীন শ্রমিকদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ।
19পাল যুগে বাংলা ভাষার জন্ম কীভাবে হয়েছিল?
পাল যুগ (আনুমানিক ৮০০-১১০০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল বাংলা ভাষার উৎপত্তির সময়কাল। ভাষার বিবর্তনের ধারাটি ছিল এরকম: (১) প্রাচীন সংস্কৃত → (২) মাগধী প্রাকৃত → (৩) মাগধী অপভ্রংশ → (৪) গৌড়-বঙ্গীয় রূপ (অর্থাৎ প্রাচীন বাংলা)। মাগধী অপভ্রংশ ভাষার গৌড়-বঙ্গীয় রূপ ধীরে ধীরে প্রাচীন বাংলা ভাষার জন্ম দেয়। এই ভাষা ছিল সাধারণ, নিরক্ষর লোকের মুখের ভাষা। সাহিত্য, ব্যাকরণ, ধর্ম, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র তখনও প্রধানত সংস্কৃত ভাষাতেই লেখা হতো—যা ছিল শিক্ষিত ও সমাজের উঁচু তলার মানুষের ভাষা। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা (লুইপাদ, কাহ্নপাদ প্রমুখ) সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় (প্রাচীন বাংলায়) 'চর্যাপদ' রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন (আনুমানিক দশম-একাদশ শতক)।
20দক্ষিণ ভারতে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বাণিজ্যের উন্নতি কেন হয়েছিল?
দক্ষিণ ভারতে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি হয়েছিল এবং এর পিছনে একাধিক কারণ ছিল: (১) আরব বণিকদের যাতায়াত বৃদ্ধি—নবম শতাব্দী থেকে ভারত মহাসাগরে আরব বণিকদের আধিপত্য ও যাতায়াত অনেক বেড়ে যায়, যার ফলে দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলি (যেমন সোপারা, কালিকট, কোচিন) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। (২) নতুন বাণিজ্যপথ ও শহরের বিকাশ—পুরোনো বাণিজ্যপথগুলির গুরুত্ব কমলেও নতুন পথ ও নতুন শহর গড়ে উঠেছিল। (৩) প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কিছু শহরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। (৪) গ্রামীণ বাজারে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য শস্যের বেচা-কেনা অনেকগুণ বেড়েছিল। (৫) আখ, তুলা এবং নীলের হাট অনেক অঞ্চলেই শুরু হয়, যা অর্থকরী ফসল চাষ ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিল। এইসব কারণে দক্ষিণ ভারতের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
21সন্ধ্যাকর নন্দী কে ছিলেন? তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম কী?
সন্ধ্যাকর নন্দী ছিলেন পাল যুগের একজন বিখ্যাত কবি ও পণ্ডিত। তিনি ছিলেন বৈদিক ব্রাহ্মণ এবং পাল রাজা রামপালের পুত্র মদনপালের (আনুমানিক ১১৪৩-১১৬১ খ্রিস্টাব্দ) সভাকবি। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম 'রামচরিত' (কেউ বলেন 'রামচরিত কাব্য')। এই গ্রন্থটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটি 'শ্লেষ কাব্য'—অর্থাৎ এর প্রতিটি শ্লোকের দুটি আলাদা অর্থ হয়। এক অর্থে এটি রামায়ণের রামের কাহিনি, আরেক অর্থে এটি পাল রাজা রামপালের জীবন ও কীর্তিকাহিনি। রামায়ণের অযোধ্যার বদলে এখানে রামপালের রাজধানী রামাবতীর কথা বলা হয়েছে, সীতার পরিবর্তে পিতৃভূমিকে উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। কাব্যটি দ্বাদশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস জানার এক অমূল্য উৎস।
22পাল যুগের বৌদ্ধবিহারগুলির নাম লেখো ও তাদের গুরুত্ব কী ছিল?
পাল যুগের বৌদ্ধবিহারগুলি ছিল তৎকালীন বিশ্বের সেরা শিক্ষাকেন্দ্র। প্রধান বিহারগুলি ছিল: (১) নালন্দা—বিহারের প্রাচীন ও সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। (২) ওদন্তপুরী—নালন্দার কাছে অবস্থিত, তিব্বতি রেকর্ডে যার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। (৩) বিক্রমশীল—ভাগলপুরের কাছে, যার অধ্যক্ষ ছিলেন স্বয়ং অতীশ দীপঙ্কর। (৪) সোমপুরী—রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধবিহার। (৫) জগদ্দল—উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিহার। (৬) বিক্রমপুরী—ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে অবস্থিত। গুরুত্ব: এগুলি শুধু ধর্মীয় উপাসনাস্থল ছিল না, ছিল জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। সারা ভারত, তিব্বত, চীন, নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ছাত্ররা এখানে ধর্ম, দর্শন, ব্যাকরণ, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, শিল্পকলা ইত্যাদি নানা বিষয়ে শিক্ষা নিতে আসত। পাল রাজারা ছিলেন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পৃষ্ঠপোষক। আচার্য ও ছাত্রদের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালি।
23পাল ও সেন যুগের সমাজ ও ধর্মের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি কী কী?
পাল ও সেন যুগের সমাজ ও ধর্মের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল: (১) ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা: পাল যুগে বৌদ্ধ ধর্মের প্রাধান্য ও রাজপৃষ্ঠপোষকতা ছিল। সেন যুগে ব্রাহ্মণ্য (হিন্দু) ধর্ম প্রধান্য পায়, বৌদ্ধদের সুযোগ-সুবিধা কমে যায়। (২) বর্ণব্যবস্থা: পাল যুগে বর্ণব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত শিথিল ও নমনীয় ছিল। সেন যুগে বর্ণব্যবস্থা কঠোর ও অনমনীয় হয়ে পড়ে। (৩) ব্রাহ্মণদের মর্যাদা: সেন যুগে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা ও আধিপত্য অনেক বেড়ে যায়, তাঁরা সমাজপতি হিসেবে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করতেন। অ-ব্রাহ্মণদের 'সংকর' বা 'শুদ্ধ' বলে গণ্য করা হতো। (৪) ধর্মাচরণ: পাল যুগে বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার (সহজিয়া, বজ্রযান) প্রাধান্য ছিল। সেন যুগে বৈদিক ও পৌরাণিক হিন্দুধর্মের মিশ্রণ ঘটে এবং বিষ্ণু, শিব, সূর্য, গঙ্গা, যমুনা প্রভৃতি দেবদেবীর পূজা জনপ্রিয় হয়। (৫) শিক্ষার ভাষা: পাল যুগে বৌদ্ধবিহারগুলিতে সংস্কৃতের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষারও কিছু প্রভাব ছিল। সেন যুগে সংস্কৃতের একক আধিপত্য বজায় থাকে। (৬) নারীমর্যাদা: সেন আমলে রাজমহিষীদের গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সাধারণ নারীর অবস্থা কেমন ছিল তা পরিষ্কার নয়।
24ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের (Feudalism) সঙ্গে ভারতীয় সামন্ত ব্যবস্থার কী কী মিল আছে?
ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্র ও ভারতীয় সামন্ত ব্যবস্থার মধ্যে আশ্চর্য রকমের মিল ছিল, যদিও এগুলি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছিল। তুলনামূলক আলোচনা: (১) স্তরভিত্তিক সমাজ—উভয় ক্ষেত্রেই সমাজ ছিল পিরামিডের মতো স্তরে বিভক্ত। ইউরোপে রাজা → সামন্তপ্রভু (Duke, Count) → নাইট (Knight) → ভূমিদাস/কৃষক। ভারতে রাজা → মহাসামন্ত → সামন্ত → কৃষক। (২) ভূমিদান প্রথা—উভয় স্থানেই রাজা অনুগত সামন্তদের নগদ বেতনের পরিবর্তে জমি দান করতেন, যা থেকে সংগৃহীত রাজস্ব ছিল তাঁদের আয়ের উৎস। (৩) সামরিক পরিষেবা—ইউরোপের নাইটরা এবং ভারতের সামন্তরা প্রয়োজনে রাজার জন্য যুদ্ধ করতেন। (৪) দুর্গ নির্মাণ—উভয় স্থানেই সামন্তপ্রভুরা নিজ নিজ এলাকায় সুরক্ষিত দুর্গ তৈরি করতেন। (৫) স্বাধীনতার প্রবণতা—উভয় ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে সামন্তরা স্বাধীন রাজার মতো আচরণ শুরু করতেন। (৬) ভূমিদাস প্রথা—ইউরোপে 'সার্ফ' (Serf) এবং ভারতে ভূমিহীন কৃষকদের অবস্থা অনেকটা একই রকম ছিল। তবে পার্থক্যও ছিল—ইউরোপে সামন্ততন্ত্র দ্বাদশ শতকে চরমে পৌঁছায়, আর ভারতে তা প্রাচীনকাল থেকেই কমবেশি বিদ্যমান ছিল।
25পাল-সেন যুগে জিনিসপত্রের বিনিময় প্রথা কেন জনপ্রিয় হয়েছিল?
পাল-সেন যুগে জিনিসপত্রের সরাসরি বিনিময় (Barter System) জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পিছনে কয়েকটি প্রধান কারণ ছিল: (১) সোনা-রুপার মুদ্রার অভাব—উত্তর ভারতে ভালো মানের সোনা বা রুপার মুদ্রার অপ্রতুলতা দেখা দিয়েছিল। (২) বৈদেশিক বাণিজ্যের অবনতি—ভারতের পশ্চিম দিকের সমুদ্রে আরব বণিকদের দাপট বেড়ে যাওয়ায় বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্যে ভাটা পড়ে এবং ধাতব মুদ্রার ব্যবহার কমে যায়। (৩) কৃষিনির্ভর অর্থনীতি—অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ায় গ্রামীণ সমাজে ধাতব মুদ্রার ব্যবহারের তেমন প্রয়োজন পড়ত না। (৪) সহজ ও সুবিধাজনক—স্থানীয় হাটে-বাজারে ধানের বিনিময়ে কাপড়, মাছের বিনিময়ে তেল—এ ধরনের সরাসরি আদান-প্রদান সহজ ছিল। (৫) রাজস্ব আদায়—রাজারা ফসল, ফল, কাঠ ইত্যাদি কর হিসেবে নিতেন, যা ছিল জিনিসপত্রেই আদায় করা রাজস্ব। এই বিনিময় প্রথা এতটাই প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল যে কড়িই মুদ্রার বিকল্প মাধ্যম হিসেবে গণ্য হতে শুরু করে।
26ধীমান ও বীটপাল কারা ছিলেন?
ধীমান ও বীটপাল ছিলেন পাল যুগের অষ্টম-নবম শতকের দুই বিখ্যাত বাঙালি শিল্পী, যাঁরা ছিলেন পিতা ও পুত্র। তাঁরা বরেন্দ্রভূমির (বর্তমান উত্তরবঙ্গ বা রাজশাহী অঞ্চল) অধিবাসী ছিলেন। ধীমান ছিলেন একাধারে ধাতব শিল্পী, ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী—তিনি 'পাল শিল্পরীতি'র প্রবর্তক ও গুরু। তাঁর পুত্র বীটপালও ছিলেন সমান প্রতিভাধর এবং পিতার শিল্পকর্মকে আরও বিকশিত করেছিলেন। এঁরা দুজনেই প্রাচীন ভারতের চিত্রকলার একটি বিশেষ ধারার প্রবর্তক। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ: (১) এঁরা ছিলেন বাঙালি শিল্পী, যা প্রমাণ করে যে বাংলায় শিল্পকলার এক স্বতন্ত্র ও উন্নত ধারা ছিল। (২) এঁদের হাত ধরেই বাংলায় ধাতব মূর্তি শিল্প (বিশেষ করে অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি) এক অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। (৩) পাল শিল্পরীতি পরবর্তীকালে নেপাল, তিব্বত, ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পকলাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁদের সৃষ্ট মূর্তি ও শিল্পকর্মের নিদর্শন আজও বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
27সেন যুগের প্রশাসনিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
সেন যুগে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পাল যুগের তুলনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে: (১) বিকেন্দ্রীকরণ—কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্র অসংখ্য ছোট ছোট প্রশাসনিক খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। (২) স্থানীয় শাসকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি—ছোট খণ্ডগুলির স্থানীয় শাসকরা (সামন্তরা) কার্যত স্বাধীনভাবে শাসন চালাতেন। (৩) রাজপরিবারে নারীদের ভূমিকা—রাজ্ঞী বা রাজমহিষীদের গুরুত্ব আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছিল, সেন যুগের তাম্রশাসনগুলিতে তাঁদের উল্লেখ পাওয়া যায়। (৪) স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক—পাল যুগে রাজার সঙ্গে প্রজার সরাসরি সম্পর্ক থাকলেও সেন যুগে সেই সম্পর্ক শিথিল হয়ে গিয়েছিল, মাঝে সামন্ত নামক এক শক্তিশালী শ্রেণি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। (৫) রাজস্ব সংগ্রহ—রাজস্ব সংগ্রহও স্থানীয় সামন্তদের মাধ্যমেই হতো, তাঁরা সংগৃহীত রাজস্বের একাংশ নিজেদের জন্য রেখে বাকিটা রাজকোষে জমা দিতেন। এই বিকেন্দ্রীকরণই সেন শাসনের পতনের অন্যতম কারণ ছিল।
28লুইপাদ ও কাহ্নপাদ কারা ছিলেন?
লুইপাদ ও কাহ্নপাদ (কাহ্নুপাদ) ছিলেন পাল যুগের (আনুমানিক দশম-একাদশ শতক) বিখ্যাত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও কবি। ইঁরা 'চর্যাপদ'-এর পদকর্তাদের মধ্যে অন্যতম। পরিচয়: (১) লুইপাদ—তিনি ছিলেন আদি সিদ্ধাচার্য। 'লুই' শব্দের অর্থ মৎস্যজীবী বা জেলে। তিনি চর্যাপদের ১ নম্বর পদটি রচনা করেন। তিব্বতি সূত্র অনুযায়ী, তিনি বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের ৮৪ মহাসিদ্ধার অন্যতম। (২) কাহ্নপাদ (কাহ্নুপাদ)—তিনিও চর্যাপদের একজন প্রধান কবি। ছোটো ছোটো পদে তিনি জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার কথা বলেছেন। গুরুত্ব: এঁরা ছিলেন বাঙালি কবি ও দার্শনিক। এঁদের রচিত চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। তাঁরা সংস্কৃতের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় (প্রাচীন বাংলা/অপভ্রংশ) সাহিত্য রচনা করেছিলেন, যা ছিল এক বিপ্লবের মতো। এঁরা প্রমাণ করেন যে, বাংলা ভাষা এক হাজার বছর আগেও একটি শক্তিশালী সাহিত্যের ভাষা ছিল।
29পাল যুগের কাঠশিল্পের গুরুত্ব কী ছিল?
পাল যুগে কাঠশিল্প ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প ও জীবিকার মাধ্যম। কাঠের ব্যবহার ছিল বহুমুখী: (১) ঘর-বাড়ি নির্মাণ—সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি থেকে শুরু করে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত কাঠের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। (২) ধর্মীয় স্থাপত্য—মন্দির ও বিহারের নির্মাণে কাঠের কাঠামো ও কারুকার্য ব্যবহৃত হতো। (৩) পরিবহন—পালকি, গোরুর গাড়ি, নৌকা তৈরিতে কাঠ ছিল অপরিহার্য। বিশেষ করে নৌকা ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। (৪) আসবাবপত্র—দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা ধরনের জিনিসপত্র কাঠ দিয়ে তৈরি হতো। (৫) কাঠশিল্পীদের সংগঠন—শিল্পীরা 'নিগম' বা 'গোষ্ঠী' নামে সংগঠিত ছিলেন, যা থেকে বোঝা যায় এই পেশা ছিল সমাজে সুসংগঠিত ও মর্যাদাসম্পন্ন। কাঠশিল্পীরা সমাজে বিশেষ গুরুত্ব পেতেন, কারণ কাঠের কাজ ছাড়া তখনকার জীবনযাত্রা কার্যত অচল ছিল। বাংলার নদীমাতৃক ভূগোলে নৌকা নির্মাণের জন্য দক্ষ কাঠশিল্পীদের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি।
1ভারতের সামন্ত ব্যবস্থা কী? এই ব্যবস্থায় সামন্তরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত? ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে এর তুলনা করো।
ভূমিকা
সামন্ত ব্যবস্থা (Feudalism) ছিল মধ্যযুগে ভারতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো। খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে আঞ্চলিক রাজ্যগুলির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে এই স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার হয়। এই ব্যবস্থায় সমাজ ছিল অনেকটা পিরামিডের মতো—যার একেবারে ওপরে রাজা এবং নীচে পর্যায়ক্রমে মহাসামন্ত, সামন্ত ও সাধারণ প্রজা।
সামন্ত ব্যবস্থার কাঠামো
সামন্ত ব্যবস্থার স্তরভিত্তিক কাঠামোটি ছিল এরকম:
- রাজা (সর্বোচ্চ শাসক): পিরামিডের একেবারে শীর্ষে থাকতেন রাজা। তাত্ত্বিকভাবে সমগ্র রাজ্যের জমির মালিক তিনিই।
- মহাসামন্ত: রাজার নীচের স্তরে ছিলেন মহাসামন্তরা—বড় অঞ্চলের শাসক। রাজার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এঁরা প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন করতেন।
- সামন্ত: এঁরা ছিলেন ছোট অঞ্চলের শাসক। রাজা বা মহাসামন্তদের অধীনে থেকে প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন এবং প্রয়োজনে সৈন্য সরবরাহ করতেন।
- উপসামন্ত: কোনো কোনো স্থানে আরও ছোট মাপের সামন্তও থাকতেন।
- সাধারণ প্রজা (কৃষক, কারিগর, পশুপালক): পিরামিডের একেবারে নীচে, সবচেয়ে বড় স্তর। এরাই প্রকৃত উৎপাদন করতেন এবং কর দিতেন।
এই কাঠামোর ফলে রাজা ও সাধারণ প্রজার মধ্যে বিরাট দূরত্ব সৃষ্টি হয়। স্থানীয় শাসকরা (সামন্তরা) রাজার ক্ষমতাকে অস্বীকার করতেও দ্বিধা করতেন না।
সামন্তরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করত?
সামন্তদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—এরা কেউই পরিশ্রম করে উৎপাদন করত না। জীবিকা নির্বাহের পদ্ধতি ছিল:
জমি দানের মাধ্যমে আয়
রাজা উচ্চ রাজকর্মচারীদের (সামন্তদের) নগদ বেতন না দিয়ে জমি দান করতেন। সেই জমির রাজস্বই ছিল তাঁদের আয়ের উৎস। বিজিত অঞ্চলের রাজস্বও ভাগ করে দেওয়া হতো।
রাজস্ব সংগ্রহ
সামন্তরা কৃষক, পশুপালক ও কারিগরদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করতেন এবং সংগৃহীত রাজস্বের একাংশ নিজেদের জন্য রেখে বাকিটা রাজকোষে জমা দিতেন।
যুদ্ধ ও লুঠপাট
যুদ্ধের সময় বিজয়ী সৈন্যরা পরাজিত অঞ্চলে যথেষ্ট লুঠপাট চালাত। যুদ্ধে জিতে যাওয়া রাজাও সেই অঞ্চলের সম্পদ সামন্তদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন।
ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে তুলনা
| বৈশিষ্ট্য | ভারতীয় সামন্ত ব্যবস্থা | ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্র |
| সময়কাল | প্রাচীনকাল থেকেই উপস্থিত, সপ্তম-দ্বাদশ শতকে চরমে | নবম-দ্বাদশ শতক কেন্দ্রীয় সময় |
| কাঠামো | রাজা → মহাসামন্ত → সামন্ত → প্রজা | রাজা → Duke/Count → Knight → Serf |
| ভূমিদান | সামন্তদের জমি দান, রাজস্ব ভোগ | সামন্তপ্রভুদের জমি দান (Manor) |
| সামরিক দায়িত্ব | প্রয়োজনে রাজাকে সৈন্য সরবরাহ | Knight-রা বর্ম পরে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতেন |
| সাধারণ কৃষক | ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিক | Serf (ভূমিদাস), স্বাধীন চাষী |
| পতনের কারণ | কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা, বহিরাক্রমণ | শহর ও বাণিজ্যের বিকাশ, প্লেগ, কৃষক বিদ্রোহ |
গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: ভারত ও ইউরোপের মধ্যে প্রাচীনকাল থেকেই বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান চললেও, সামন্ত ব্যবস্থা উভয় স্থানে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই গড়ে উঠেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, একই ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সমাজ একই রকম কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
উপসংহার
সামন্ত ব্যবস্থা একদিকে যেমন রাজশক্তির দুর্বলতা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রতীক, অন্যদিকে তা ছিল মধ্যযুগের এক বাস্তব সামাজিক কাঠামো। রাজা-সামন্ত-প্রজার এই শৃঙ্খল ভারতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগেই ত্রয়োদশ শতকে তুর্কি আক্রমণকারীরা সহজেই ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অতিক্রম করে দিল্লির সিংহাসন দখল করতে সক্ষম হয়।
2পাল ও সেন যুগের বাংলার অর্থনীতির পরিচয় দাও। বাণিজ্য ও কৃষির মধ্যে কীভাবে পরিবর্তন এসেছিল?
ভূমিকা
পাল-সেন যুগ (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক) বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সময়ের অর্থনীতি ছিল ত্রিমুখী—কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই তিন স্তম্ভের আপেক্ষিক গুরুত্বের পরিবর্তন ঘটেছিল। পাল যুগে বাণিজ্যের গুরুত্ব বেশি থাকলেও, সেন যুগে এসে কৃষিই প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কৃষি: অর্থনীতির মেরুদণ্ড
পাল-সেন যুগে কৃষি ছিল অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি এবং উত্তরোত্তর এর গুরুত্ব বেড়েছিল। কৃষির বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল:
- প্রধান ফসল: ধান ছিল প্রধান খাদ্যশস্য। এছাড়া আখ (গুড় ও চিনির জন্য), তুলা (বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল), নীল (রঞ্জক পদার্থ), পান-সুপারি, নারকেল, ফলমূল ইত্যাদির চাষ হতো।
- ভূমিদান প্রথা: রাজারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্রাহ্মণদের জমি দান করতেন (ব্রহ্মদেয় ব্যবস্থা)। অনাবাদী জমি ও জঙ্গল সাফ করে নতুন চাষযোগ্য জমি তৈরি করা হতো।
- কর ব্যবস্থা: কৃষকদের উৎপন্ন ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ ভাগ) রাজাকে কর দিতে হতো। এছাড়া ফুল, ফল, কাঠ, জল ইত্যাদির জন্যও কর ছিল।
- কৃষকের অধিকার: জমি কেনা-বেচার সময় কৃষককেও খবর দিতে হতো—এতে বোঝা যায় কৃষক সম্পূর্ণ অবহেলিত ছিল না।
শিল্প: দক্ষতার স্বর্ণযুগ
পাল-সেন যুগে বাংলার শিল্প অত্যন্ত উন্নত ছিল। প্রধান শিল্পগুলি:
১. বস্ত্রশিল্প: বাংলার সুক্ষ্ম সুতির কাপড় (মসলিন) ছিল বিশ্ববিখ্যাত। এটি দেশ-বিদেশে রপ্তানি হতো এবং শিক্ষাদ্রব্যের মধ্যে কাপাস বস্ত্র ছিল প্রধান।
২. ধাতুশিল্প: অষ্টধাতুর বুদ্ধমূর্তি, গয়না ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি হতো। ধীমান ও বীটপাল ছিলেন এই শিল্পের বিখ্যাত কারিগর।
৩. কাঠশিল্প: ঘর-বাড়ি, মন্দির, পালকি, গোরুর গাড়ি, নৌকা নির্মাণে কাঠের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। কাঠশিল্পীরা সমাজে বিশেষ গুরুত্ব পেতেন।
৪. শিল্পী সংগঠন: শিল্পীরা নিগম বা গোষ্ঠী নামে সংগঠিত হয়ে কাজ করতেন, যা ছিল প্রাচীন ট্রেড ইউনিয়নের মতো।
বাণিজ্য: উত্থান ও পতন
পাল যুগে বাংলার বাণিজ্য, বিশেষ করে সমুদ্রবাণিজ্য, অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু সেন যুগে এসে এর অবনতি ঘটে।
| বৈশিষ্ট্য | পাল যুগ (আনু. ৭৫০-১১৫০ খ্রি.) | সেন যুগ (আনু. ১১৫০-১২০৪ খ্রি.) |
| বৈদেশিক বাণিজ্য | সমৃদ্ধ, আরব বণিকদের সঙ্গে সক্রিয় বাণিজ্য | আরব বণিকদের দাপটে বাংলার বণিকরা পিছু হটেন |
| মুদ্রা ব্যবস্থা | সোনা-রুপার মুদ্রা প্রচলিত ছিল | মুদ্রার ব্যবহার কমে, জিনিসপত্র বিনিময় প্রধান মাধ্যম |
| অর্থনীতির ভিত্তি | কৃষি + শিল্প + বাণিজ্যের平衡 | কৃষিনির্ভর, বাণিজ্যের গুরুত্ব কম |
| রপ্তানি পণ্য | সুক্ষ্ম বস্ত্র, চিনি, নীল, ধাতব মূর্তি | প্রধানত কৃষিজ পণ্য |
উপসংহার
পাল যুগে বাণিজ্যের যে জমজমাট অবস্থা ছিল, সেন যুগে তা স্তিমিত হয়ে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্ম দেয়। আরব বণিকদের দাপট, সোনা-রুপার মুদ্রার অভাব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে বাংলার বাণিজ্যে ভাটা পড়ে। তবে কৃষি ও শিল্পের উৎকর্ষ অব্যাহত ছিল, যা বাংলার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিল।
3পাল যুগের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পের বিবরণ দাও। এই যুগকে কেন \'স্বর্ণযুগ\' বলা হয়?
ভূমিকা
পাল যুগ (আনুমানিক ৭৫০-১১৫০ খ্রিস্টাব্দ) বাংলার ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত। এই সময় বাংলা এবং বিহার জুড়ে শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির যে অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল, তা কেবল ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সমগ্র এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। পাল রাজারা ছিলেন বিদ্যোৎসাহী, শিল্পানুরাগী ও ধর্মসহিষ্ণু—তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
শিক্ষা: বৌদ্ধবিহার—প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়
পাল যুগের গৌরবময় শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল বৌদ্ধবিহারগুলি। এগুলি ছিল প্রাচীন বিশ্বের সেরা শিক্ষাকেন্দ্র:
| বিহারের নাম | অবস্থান | বৈশিষ্ট্য |
| নালন্দা | বিহার | প্রাচীনতম ও সর্ববৃহৎ, ১০,০০০ ছাত্র |
| ওদন্তপুরী | নালন্দার কাছে | তিব্বতি রেকর্ডে গুরুত্বপূর্ণ |
| বিক্রমশীল | ভাগলপুরের কাছে | অতীশ দীপঙ্করের অধ্যক্ষতা |
| সোমপুরী | রাজশাহীর পাহাড়পুর | বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিহার |
| জগদ্দল | উত্তরবঙ্গ | গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র |
| বিক্রমপুরী | ঢাকার বিক্রমপুর | বাংলার প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র |
এই বিহারগুলিতে ধর্ম, দর্শন, ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, শিল্পকলা—সব বিষয়েই শিক্ষা দেওয়া হতো। এখানে ভারত, তিব্বত, চীন, নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে জ্ঞানপিপাসু ছাত্ররা আসতেন। আচার্য ও ছাত্রদের বেশিরভাগ ছিলেন বাঙালি।
সাহিত্য: সংস্কৃত ও বাংলার মেলবন্ধন
পাল যুগের সাহিত্যচর্চা ছিল দ্বিমুখী—একদিকে সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্যসৃষ্টি।
সংস্কৃত সাহিত্য
শিক্ষিত ও পণ্ডিত সমাজে সংস্কৃত ভাষার একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল। সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত' কাব্য (দ্বাদশ শতক) ছিল এক অসাধারণ শ্লেষ কাব্য, যা একই সঙ্গে রামায়ণের কাহিনি ও পালরাজা রামপালের জীবনী বর্ণনা করে। চক্রপাণিদত্তের লেখা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহু গ্রন্থও সংস্কৃতে রচিত হয়েছিল।
বাংলা ভাষার জন্ম ও চর্যাপদ
পাল যুগেই (আনুমানিক ৮০০-১১০০ খ্রি.) মাগধী অপভ্রংশ থেকে প্রাচীন বাংলা ভাষার জন্ম হয়। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা (লুইপাদ, কাহ্নপাদ, শবরীপাদ, ভুসুকুপাদ প্রমুখ) সংস্কৃতের বদলে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় 'চর্যাপদ' রচনা করেন—যা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। এটি ছিল এক সাহিত্যিক বিপ্লব।
শিল্পকলা: ধীমান-বীটপালের যুগ
পাল যুগের শিল্পকলা তিনটি প্রধান ধারায় বিকশিত হয়েছিল:
- ধাতব শিল্প: অষ্টধাতুর তৈরি বুদ্ধমূর্তি ছিল অপূর্ব সুন্দর ও বিশ্ববিখ্যাত।
- ভাস্কর্য: পাথর ও ধাতুর মূর্তিতে নিপুণ কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হতো। সোমপুরী বিহারের পোড়ামাটির ফলকগুলি (টেরাকোটা) ছিল এক অনন্য শিল্পকীর্তি।
- চিত্রকলা: তালপাতার পুঁথিতে সূক্ষ্ণ চিত্রাঙ্কনের (মিনিয়েচার পেন্টিং) রীতি ছিল।
এই যুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন ধীমান ও তাঁর পুত্র বীটপাল। এঁরা বরেন্দ্রভূমির (উত্তরবঙ্গ) অধিবাসী ছিলেন এবং 'পাল শিল্পরীতি'র প্রবর্তক। এঁদের সৃষ্ট শিল্পরীতি নেপাল, তিব্বত, মায়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার শিল্পকলাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
কেন 'স্বর্ণযুগ'?
পাল যুগকে 'স্বর্ণযুগ' বলার পিছনে যুক্তিগুলি হলো:
- শিক্ষার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র: নালন্দা, বিক্রমশীলের মতো বিশ্ববিদ্যালয় সারা এশিয়ার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল।
- ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: পালরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও হিন্দু, জৈন—সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
- সাহিত্যে বিপ্লব: একই সঙ্গে সংস্কৃত পাণ্ডিত্য ও বাংলা ভাষার জন্ম—এই দুই ধারাই বিকশিত হয়েছিল।
- শিল্পকলার উৎকর্ষ: ধীমান-বীটপালের শিল্পরীতি সমগ্র এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছিল।
- দীর্ঘস্থায়ী শাসন: প্রায় ৪০০ বছর ধরে পাল শাসন টিকে ছিল, যা বাংলার ইতিহাসে এক রেকর্ড।
উপসংহার
পাল যুগ বাংলার ইতিহাসে এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। এই যুগের শিক্ষা, সাহিত্য ও শিল্পের যে উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন বাঙালি মনীষীরা—তা আজও আমাদের গর্বিত করে। 'বাঙালি অতীশ ছিল গিরি তুষার ভয়ংকর, জ্বালিলেন জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালি দীপঙ্কর'—এই পঙ্ক্তি যেন পাল যুগের সমগ্র অর্জনেরই প্রতিধ্বনি।
4সেন যুগের সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির পরিচয় দাও। পাল যুগের তুলনায় কী কী পরিবর্তন এসেছিল?
ভূমিকা
পাল যুগের পতনের পর বাংলায় সেন রাজবংশের উত্থান ঘটে (দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতক)। সেন যুগ ছিল বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকাল। পাল যুগের যে উদার, বহুত্ববাদী ও বৌদ্ধপ্রধান সংস্কৃতি ছিল, সেন যুগে তা আমূল পরিবর্তিত হয়ে ব্রাহ্মণ্যপ্রধান, অনমনীয় ও বর্ণাশ্রমী সমাজব্যবস্থার জন্ম দেয়। এই পরিবর্তন বাংলার সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
সেন যুগের সমাজ
সেন যুগের সমাজব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়:
কঠোর বর্ণব্যবস্থা
পাল যুগের শিথিল বর্ণব্যবস্থার পরিবর্তে সেন যুগে বর্ণব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় হয়ে পড়ে। ব্রাহ্মণরা সমাজের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে একাধিক উপবিভাগ ছিল। অ-ব্রাহ্মণদের 'সংকর' বা 'শুদ্ধ' বলে গণ্য করা হতো এবং তাঁরা ব্রাহ্মণদের কাজ করতে পারতেন না।
নারীদের ভূমিকা
রাজপরিবারের মহিলাদের গুরুত্ব পাল যুগের তুলনায় বেড়েছিল—তাঁদের 'রাজ্ঞী' বা 'রাজমহিষী' বলা হতো এবং তাম্রশাসনে তাঁদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সাধারণ নারীর অবস্থা কেমন ছিল তা স্পষ্ট নয়; ধারণা করা হয় তাঁদের মর্যাদা ব্রাহ্মণ্য সমাজব্যবস্থায় সীমিত হয়েছিল।
সাধারণ মানুষের অবস্থা
সাধারণ মানুষের জীবন ছিল মোটামুটি সচ্ছল, কিন্তু ভূমিহীন ব্যক্তি ও শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। পাল যুগের তুলনায় সামাজিক বৈষম্য ও কাঠিন্য অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
আদিবাসী ও উপজাতি
সেন যুগের লেখমালায় আদিবাসী-উপজাতি মানুষের কথাও জানা যায়। সমাজের মূল স্রোত থেকে এঁরা কতটা বিচ্ছিন্ন ছিলেন তা স্পষ্ট নয়, তবে বর্ণাশ্রমী সমাজে এঁদের অবস্থান ছিল একেবারে প্রান্তিক স্তরে।
সেন যুগের ধর্ম
সেন যুগে ধর্মীয় ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। বৌদ্ধধর্মের পরিবর্তে ব্রাহ্মণ্য (হিন্দু) ধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়:
- ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাধান্য: সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকেই প্রধান্য দিতেন। বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্মের মিশ্রণ ঘটে—ইন্দ্র, অশ্বিনীদ্বয়, কুবের, সূর্য, বৃহস্পতি, গঙ্গা, যমুনা, মাতৃকা, শিব, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবদেবীর পূজা প্রচলিত ছিল।
- শৈব ও বৈষ্ণব ধারা: সেন রাজাদের মধ্যে লক্ষ্মণসেন ছিলেন বৈষ্ণব (বিষ্ণুভক্ত), কিন্তু তাঁর পূর্বসূরিরা (বিজয়সেন, বল্লালসেন) ছিলেন শৈব (শিবভক্ত)।
- বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয়: বৌদ্ধধর্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা উঠে যায়। বৌদ্ধরা আগের মতো সুযোগ-সুবিধা পেত না। বৌদ্ধবিহারগুলির গুরুত্ব কমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে অনেক বিহার পরিত্যক্ত হয়। তবে গ্রামগঞ্জে বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব কিছুকাল টিকে ছিল।
- ব্রাহ্মণদের আধিপত্য: ব্রাহ্মণরা সমাজপতি হিসেবে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করতেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থায় তাঁদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ছিল। রাজারা ব্রাহ্মণদের প্রচুর জমি দান (ব্রহ্মদেয়) করতেন।
পাল যুগের তুলনায় পরিবর্তনসমূহ
| ক্ষেত্র | পাল যুগ | সেন যুগ |
| রাষ্ট্রীয় ধর্ম | বৌদ্ধ ধর্ম (সহিষ্ণু) | ব্রাহ্মণ্য/হিন্দু ধর্ম |
| বর্ণব্যবস্থা | শিথিল, নমনীয় | কঠোর, অনমনীয় |
| ব্রাহ্মণদের মর্যাদা | সম্মানিত কিন্তু একচ্ছত্র নয় | সমাজপতি, সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী |
| শিক্ষার ভাষা | সংস্কৃত + বাংলার উদ্ভব | প্রধানত সংস্কৃত |
| শিক্ষাকেন্দ্র | বৌদ্ধবিহার—আন্তর্জাতিক খ্যাতি | বিহারগুলির গুরুত্ব হ্রাস |
| ধর্মীয় সহিষ্ণুতা | উচ্চ (বৌদ্ধ, হিন্দু, জৈন) | তুলনামূলকভাবে কম |
উপসংহার
সেন যুগ বাংলায় ব্রাহ্মণ্য সমাজব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয়, বর্ণব্যবস্থার কাঠিন্য এবং ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র আধিপত্য—এই ছিল সেন যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে এই অনমনীয়তা ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাই শেষ পর্যন্ত সেন শাসনের দুর্বলতার কারণ হয়েছিল। ১২০৪ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বখতিয়ার খলজির হাতে নদীয়া আক্রান্ত হলে, এই বিভক্ত ও অসহিষ্ণু সমাজ একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়—এবং বাংলায় সেন শাসনের অবসান ঘটে।
5অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জীবন ও কৃতিত্ব আলোচনা করো। বাংলার বাইরে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রসারে তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
ভূমিকা
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (আনু. ৯৮২-১০৫৪ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন পাল যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত, দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক। তিনি শুধু বাংলা বা ভারতের গণ্ডিতেই আবদ্ধ ছিলেন না—তিনি সমগ্র এশিয়ার বৌদ্ধ জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলেছিলেন। তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়—'বাঙালি অতীশ ছিল গিরি তুষার ভয়ংকর, জ্বালিলেন জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালি দীপঙ্কর'।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
অতীশ দীপঙ্কর আনুমানিক ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার বিক্রমপুরে (বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলা) এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল 'চন্দ্রগর্ভ'। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও জ্ঞানপিপাসু। যৌবনে তিনি সংসার ত্যাগ করে বৌদ্ধ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং 'দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান' নাম গ্রহণ করেন।
তিনি ভারতের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে (নালন্দা, ওদন্তপুরী, বিক্রমশীল) শিক্ষালাভ করেন। তিনি ধর্ম, দর্শন, তর্কশাস্ত্র, ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা—বহু বিষয়ে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তিনি বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ (আচার্য) নিযুক্ত হন—যা ছিল তৎকালীন বৌদ্ধ জগতের সবচেয়ে সম্মানজনক পদ।
তিব্বত যাত্রা
১০৪০ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতের রাজা ইয়েশে-ও (Ye-shes-'Od)-র অনুরোধে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে যান। তিব্বত তখন বৌদ্ধধর্মের এক সংকটকাল অতিক্রম করছিল—প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য ক্ষীণ হয়ে আসছিল এবং তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের নামে নানা অনাচার ছড়িয়ে পড়েছিল।
অতীশ দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে হিমালয় অতিক্রম করে তিব্বতে পৌঁছান। বাংলা-বিহারের বৌদ্ধ আচার্যরা মনে করেছিলেন, তিনি তিব্বতে গেলে ভারতবর্ষ অন্ধকার হয়ে যাবে—এই ছিল তাঁর জ্ঞানের প্রতি সম্মান। তিব্বতে তিনি মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিশুদ্ধ রূপ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং তান্ত্রিক অনাচারের অবসান ঘটান।
কৃতিত্ব ও অবদান
- তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণ: অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে 'কদম' (bKa'-gdams) নামে এক নতুন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সূচনা করেন, যা পরবর্তীকালে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের মূলধারায় পরিণত হয়।
- গ্রন্থ রচনা: তিনি 'বোধিপথপ্রদীপ' (Bodhipathapradīpa) নামে এক বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন, যা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি বৌদ্ধ সাধনার ধাপে ধাপে পথ নির্দেশ করেছেন।
- অনুবাদ কর্ম: তিনি অসংখ্য সংস্কৃত বৌদ্ধগ্রন্থ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মূল সংস্কৃত গ্রন্থগুলি হারিয়ে গেলেও, তিব্বতি অনুবাদগুলিতে সেগুলি আজও সংরক্ষিত আছে।
- তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সংস্কার: তিনি তন্ত্রের নামে প্রচলিত কুসংস্কার ও অনাচার দূর করে বৌদ্ধধর্মকে বিশুদ্ধ, নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তির ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
- সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন: তিনি ভারত ও তিব্বতের মধ্যে এক শক্ত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সেতু তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলিতেও অটুট ছিল।
বাংলার বাইরে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রসারে ভূমিকা
অতীশ দীপঙ্করের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটেছিল, তা ছিল ব্যাপক:
ভাষা ও জ্ঞানের প্রসার
তিনি সংস্কৃত থেকে তিব্বতি ভাষায় যেসব গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন, সেগুলি তিব্বতে ভারতীয় দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা ও শিল্পকলার জ্ঞান বিস্তার করেছিল। আজও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে সংস্কৃত মন্ত্র ও শ্লোক উচ্চারিত হয়—যা অতীশের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারেরই প্রমাণ।
শিল্প ও স্থাপত্য
পাল যুগের শিল্পরীতি (ধীমান-বীটপালের ধারা) অতীশ ও তাঁর সহযোগীদের মাধ্যমে তিব্বতে পৌঁছায়। বুদ্ধমূর্তি, থাংকা চিত্রকলা ও বিহার স্থাপত্যে পাল শিল্পরীতির গভীর প্রভাব আজও দৃশ্যমান।
মৃত্যু ও সম্মাননা
অতীশ দীপঙ্কর ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতের ন্যেথাং (sNyethang) নামক স্থানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর দেহাবশেষের ওপর একটি স্তূপ নির্মিত হয়, যা আজও তিব্বতি বৌদ্ধদের এক পবিত্র তীর্থস্থান। তিব্বতিরা তাঁকে 'জোবো জে' (Jo-bo-rJe, প্রভু গুরু) এবং বুদ্ধের অবতার হিসেবে পূজা করে। ভারতে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানে 'অতীশ স্মৃতি স্তূপ' ও সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয়েছে।
উপসংহার
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ছিলেন বাঙালির এক অহংকার—যিনি জন্মভূমি বাংলার জ্ঞানগৌরব সুদূর হিমালয়ের ওপারে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, জ্ঞানের কোনো দেশ-কাল-সীমানা নেই। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও ভারত-তিব্বত সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক জীবন্ত সেতু। বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্ব—'বাঙালি অতীশ ছিল গিরি তুষার ভয়ংকর, জ্বালিলেন জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালি দীপঙ্কর'।
মনে রেখো!
পাল যুগ ছিল বাংলার 'স্বর্ণযুগ'—শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার চরম উৎকর্ষ। সেন যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রাধান্য পায় ও বর্ণব্যবস্থা কঠোর হয়। সামন্ত ব্যবস্থা ছিল পিরামিডের মতো স্তরভিত্তিক সমাজ। বাঙালি অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করে অমর হয়েছেন!