ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা
খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা | 39 MCQ | 31 SAQ | 6 Broad Questions
প্রাচীন বাংলার অঞ্চল
পুণ্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্র, বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, সমতট
পাল সাম্রাজ্য
গোপাল, ধর্মপাল, দেবপাল
বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ
সেন শাসন
বল্লালসেনের সমাজ-সংস্কার
তুর্কি আক্রমণে পতন
চোল সাম্রাজ্য
প্রথম রাজরাজ ও রাজেন্দ্র
নৌশক্তি ও গঙ্গাইকোন্ডচোল
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
39 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
31 টিBroad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)
6 টিভূমিকা
প্রাচীন বাংলা বলতে আমরা প্রধানত বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ (ভারত) ও বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলকে বুঝি। তবে প্রাচীন বাংলার সীমানা আজকের চেয়ে অনেকটাই বড়ো ছিল এবং কখনো কখনো তা বিহার, আসাম ও ওড়িশার কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতো। প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক সীমানা প্রধানত তিনটি মহানদী দিয়ে নির্ধারিত হতো—পশ্চিমে ভাগীরথী, দক্ষিণে পদ্মা ও পূর্বে মেঘনা। কালক্রমে এই সীমানার পরিবর্তন ঘটেছে, রাজনৈতিক ও জনবসতির কারণে কোনো কোনো অঞ্চলের সীমানা বেড়েছে বা কমেছে।
নামকরণের রীতি
প্রাচীন বাংলার অঞ্চলগুলির নামকরণের একটি সাধারণ রীতি ছিল—সাধারণত কোনো অঞ্চলের অধিবাসী জনগোষ্ঠীর নাম অনুসারে জায়গার নাম হতো। বঙ্গ, গৌড়, পুণ্ড্র, সুহ্ম ইত্যাদি নামগুলি এক-একটি জনগোষ্ঠীর নাম ছিল। তারা যে অঞ্চলে থাকত, সেই অঞ্চলের নাম হতো তাদের নাম অনুযায়ী। যেমন বঙ্গ জনগোষ্ঠীর নাম থেকে 'বঙ্গ' অঞ্চলের নাম, পুণ্ড্র জনগোষ্ঠীর নাম থেকে 'পুণ্ড্রবর্ধন', গৌড় জনগোষ্ঠীর নাম থেকে 'গৌড়', সুহ্ম জনগোষ্ঠীর নাম থেকে 'সুহ্ম' ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্য শুধু বাংলায় নয়, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও লক্ষ করা যায়।
পুণ্ড্রবর্ধন
পুণ্ড্রবর্ধন ছিল প্রাচীন বাংলার অঞ্চলগুলির মধ্যে বৃহত্তম। এই অঞ্চলের বিস্তৃতি ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ এবং বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ জুড়ে। আধুনিক মানচিত্র অনুযায়ী বলতে গেলে, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলাগুলি পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত ছিল। একসময় এটি একটি ভুক্তি বা শাসন-এলাকা হিসেবে গণ্য হতো। গুপ্ত যুগে পুণ্ড্রবর্ধন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক একক। মহাস্থানগড় (বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া জেলা) ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের প্রাচীন রাজধানী, যা মৌর্য ও গুপ্ত যুগে এক গুরুত্বপূর্ণ নগরী ছিল। 'পুণ্ড্র' নামক জনগোষ্ঠীর নাম থেকে এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে।
বরেন্দ্র
ভাগীরথী (গঙ্গার একটি শাখা) ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ড বরেন্দ্র নামে পরিচিত ছিল। এটি ছিল একটি সুউচ্চ ও অপেক্ষাকৃত শুষ্ক ভূমি, যা পলিমাটি দ্বারা গঠিত হয়নি বলে অন্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। বরেন্দ্র ভূমি তার উর্বরতার জন্য বিখ্যাত ছিল এবং এখানে প্রচুর ধান, আখ ও অন্যান্য ফসলের চাষ হতো। পাল বংশের আমলে বরেন্দ্র অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে এবং এখানে বহু বৌদ্ধ বিহার (যেমন সোমপুর মহাবিহার, পাহাড়পুর) ও স্থাপত্য গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে এই অঞ্চল বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত। বরেন্দ্র অঞ্চলের নিজস্ব ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ছিল, যা একে বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে স্বতন্ত্র করেছিল।
বঙ্গ
প্রাচীনকালে পদ্মা ও ভাগীরথী নদীর মাঝে অবস্থিত ব-দ্বীপের মতো দেখতে এলাকাকে 'বঙ্গ' বলা হতো। সম্ভবত ভাগীরথীর পশ্চিম দিকের এলাকাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে ভাগীরথীর পশ্চিম দিকে রাঢ় এবং সুহ্ম নামে দুটি আলাদা অঞ্চলের উৎপত্তি ঘটলে বঙ্গের সীমানাও বদলে যায়। খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকে বঙ্গ বলতে সংকীর্ণ অর্থে এখনকার বাংলাদেশের ঢাকা-বিক্রমপুর, ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলকে বোঝানো হতো। বঙ্গ নামটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই নাম থেকেই 'বাংলা' ও 'বাংলাদেশ' নামের উৎপত্তি হয়েছে। বঙ্গ ছিল নদীমাতৃক এক সমৃদ্ধ অঞ্চল, যা কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত ছিল।
রাঢ় (উত্তর ও দক্ষিণ)
প্রাচীন রাঢ় বা লাঢ় অঞ্চল ছিল বাংলার পশ্চিম ভাগের এক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এর দুটি ভাগ ছিল—উত্তর রাঢ় এবং দক্ষিণ রাঢ়। এদের মধ্যবর্তী সীমানা ছিল অজয় নদ। উত্তর রাঢ় ছিল 'বজ্রভূমি' নামে পরিচিত এবং দক্ষিণ রাঢ় ছিল 'সুহ্মভূমি' নামে পরিচিত। আজকের মুর্শিদাবাদ জেলার পশ্চিম ভাগ, বীরভূম জেলা, সাঁওতাল পরগনার একাংশ এবং বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার উত্তর ভাগ ছিল উত্তর রাঢ় অঞ্চল। দক্ষিণ রাঢ় বলতে বোঝানো হতো আজকের হাওড়া, হুগলি এবং বর্ধমান জেলার বাকি অংশ এবং অজয় ও দামোদর নদের মধ্যবর্তী বিশাল এলাকাকে। দক্ষিণ রাঢ় ছিল বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী এলাকা। মহাভারতের গল্প এবং কালিদাসের কাব্যে উল্লেখ আছে যে ভাগীরথী এবং কাঁসাই (কংসাবতী) নদীর মাঝে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এলাকা এর অন্তর্গত ছিল। রাঢ় ছিল এক সমৃদ্ধ কৃষিভূমি এবং এখানে বহু প্রাচীন জনপদ গড়ে উঠেছিল।
উপসংহার
প্রাচীন বাংলার এই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যই বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, অর্থনৈতিক ভিত্তি ও সাংস্কৃতিক ধারা ছিল, যা মিলিতভাবে বাংলা নামক এই ভূখণ্ডের গৌরবময় ইতিহাস রচনা করেছে। কালক্রমে এই অঞ্চলগুলির সীমানা পরিবর্তিত হয়েছে, কিছু অঞ্চলের নাম বিলুপ্ত হয়েছে, আবার নতুন নামের উদ্ভব ঘটেছে। তবুও ইতিহাসের ধারায় এই প্রাচীন অঞ্চলগুলি বাংলার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় রেখে গেছে।
ভূমিকা: শশাঙ্কের পরিচয়
রাজা শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যাঁকে অনেক ঐতিহাসিক বাংলার প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম শাসক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আনুমানিক ৬০০-৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজত্ব করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, শশাঙ্ক তার মধ্যে এক স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ, যা চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণী থেকে জানা যায়। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে কর্ণসুবর্ণ ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি অঞ্চলে।
রাজনৈতিক জীবন ও হর্ষবর্ধনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব
শশাঙ্কের রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল স্থাণ্বীশ্বরের (অধুনা হরিয়ানার থানেশ্বর) পুষ্যভূতি বংশীয় শাসক হর্ষবর্ধনের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব। 'সকলোত্তরপথনাথ' উপাধিধারী হর্ষবর্ধন ছিলেন উত্তর ভারতের এক শক্তিশালী সম্রাট। শশাঙ্কের সঙ্গে তাঁর একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছিল। হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টের রচনা 'হর্ষচরিত'-এ শশাঙ্ককে চরমভাবে নিন্দা করা হয়েছে। বাণভট্ট শশাঙ্ককে বিশ্বাসঘাতক বলেও চিহ্নিত করেছেন। এই সাহিত্যিক সূত্র থেকে বোঝা যায় যে শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের কাছে এক বড়ো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এবং উত্তর ভারতের রাজনীতিতে বাংলার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিতর্ক
শশাঙ্কের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। উভয় পক্ষের তথ্য তুলে ধরা যাক:
শশাঙ্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ:
- 'আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প' নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে শশাঙ্ককে 'বৌদ্ধবিদ্বেষী' বলা হয়েছে।
- চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তাঁর ভ্রমণ বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন যে শশাঙ্ক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হত্যা করেছিলেন এবং বৌদ্ধদের পবিত্র ধর্মীয় স্মারক ধ্বংস করেছিলেন।
- হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট 'হর্ষচরিত'-এ শশাঙ্কের তীব্র নিন্দা করেছেন।
- শশাঙ্ক ছিলেন শৈব, অর্থাৎ শিবের উপাসক।
বিপক্ষের যুক্তি:
- শশাঙ্কের শাসনকালের কয়েক বছর পর হিউয়েন সাঙ যখন পূর্ব ভারতের উপকূলবর্তী রক্তমৃত্তিকা বৌদ্ধবিহার পরিদর্শন করেন, তখন তা সমৃদ্ধিশালী ছিল।
- শশাঙ্কের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পর চৈনিক পরিব্রাজক ই-ৎসিং-এরও নজরে পড়েছিল বাংলায় বৌদ্ধধর্মের উন্নতি।
- যদি শশাঙ্ক সত্যিই নির্বিচারে বৌদ্ধবিদ্বেষী হতেন, তাহলে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের এই সমৃদ্ধি হতো না।
উপসংহার: আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, শশাঙ্ক সম্পর্কে হর্ষবর্ধন ও হিউয়েন সাঙ-এর মতামত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিল না। হর্ষবর্ধন শশাঙ্কের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন, তাই তাঁর সভাকবির রচনা স্বাভাবিকভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট। আবার হিউয়েন সাঙ ছিলেন বৌদ্ধ পরিব্রাজক, হর্ষবর্ধনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সুতরাং শশাঙ্ক সম্পরকে তাঁদের মতামত কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিল বলে মনে করা যেতে পারে। সম্ভবত শশাঙ্ক ব্যক্তিগতভাবে শৈব হলেও তাঁর শাসনকালে বাংলায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বজায় ছিল।
শাসনব্যবস্থা: বৈদিকতন্ত্র
শশাঙ্কের আমলে 'বৈদিকতন্ত্র' বা 'সামন্ততন্ত্র' নামে এক ধরনের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল:
- কর্মচারীদের ভূমিকা বৃদ্ধি: রাজ্যের কর্মচারী বা আমলারা একটি নির্দিষ্ট শাসনপ্রণালী গড়ে তুলেছিলেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপ আগের তুলনায় বেড়ে যায়।
- কেন্দ্রীয় শাসন: আগে যা ছিল প্রায় স্থানীয় লোকায়ত কাজ, শশাঙ্কের সময় সেই কাজগুলোতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়। অর্থাৎ ঐ আমলা বা বৈদিক রাজ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সরকার পরিচালনা করতে থাকে।
- স্থানীয় প্রধানদের ক্ষমতাবৃদ্ধি: সমাজে মহন্ত বা স্থানীয় প্রধানরা এক নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন, যাঁরা স্থানীয়ভাবে রাজশক্তির প্রতিনিধিত্ব করতেন।
অর্থনৈতিক অবস্থা
শশাঙ্কের আমলে বাংলার অর্থনীতির অবস্থা ভালো ছিল না। নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ করা যায়:
- মুদ্রার মান হ্রাস: তাঁর আমলে সোনার মুদ্রা প্রচলিত ছিল, কিন্তু তার মান পড়ে গিয়েছিল। নকল সোনার মুদ্রাও দেখা যেত। রূপোর মুদ্রা ছিল না, যা অর্থনীতির একটি দুর্বল দিক ছিল।
- বাণিজ্যে মন্দা: ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই যুগে সত্যিই মন্দা দেখা দিয়েছিল। বৈদেশিক বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছিল।
- কৃষিনির্ভর অর্থনীতি: বাণিজ্যের গুরুত্ব কমে যাওয়ার ফলে কৃষির গুরুত্ব বেড়ে যায়। অর্থনীতি ক্রমশ কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ে।
- নগরকেন্দ্রিকতা হ্রাস: বাণিজ্যের গুরুত্ব কমে যাওয়ার ফলে নগরের গুরুত্ব কমতে শুরু করে।
- গ্রামকেন্দ্রিক সমাজ: কৃষির গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় সমাজ ক্রমশ গ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল।
- বণিকদের গুরুত্ব হ্রাস: সেস্থ বা বণিকদের গুরুত্ব ও ক্ষমতা আগেকার যুগের থেকে কমে এসেছিল। স্থানীয় প্রধানরা বণিকদের মতোই ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন।
উপসংহার
শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম এক স্বাধীন ও শক্তিশালী শাসক, যিনি উত্তর ভারতের রাজনীতিতে বাংলার প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে তাঁর শাসনকাল অর্থনৈতিক দিক থেকে তেমন সমৃদ্ধ ছিল না। ধর্মীয় দিক থেকে তাঁর সম্পর্কে চরম বিতর্ক থাকলেও, পরবর্তীকালে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের সমৃদ্ধির প্রমাণ থেকে বলা যায় যে তাঁর শাসনকাল সম্পূর্ণ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ছিল না। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় এক দীর্ঘ অরাজকতার যুগ (মাৎস্যন্যায়) নেমে আসে, যা থেকে বাংলাকে উদ্ধার করেন পাল রাজা গোপাল।
ভূমিকা
পাল বংশ ছিল প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী এক শাসক বংশ, যাঁরা প্রায় সাড়ে চারশো বছর (আনুমানিক ৭৫০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ) ধরে বাংলা ও বিহার শাসন করেছিলেন। পাল বংশের উত্থান ও বিকাশ বাংলার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এই বংশের রাজারা শুধু বাংলাকেই শাসন করেননি, উত্তর ভারতের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পাল বংশের প্রতিষ্ঠা: গোপাল
পাল বংশের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এক বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে (প্রায় ১০০ বছর) তীব্র অরাজকতা বিরাজ করছিল, যাকে 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়। এই অরাজকতার সময় বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে স্থির করেন যে একজন যোগ্য শাসকের প্রয়োজন, যিনি এই বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেন। তাঁরা সকলে মিলে গোপালকে (আনুমানিক ৭৫০-৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। গোপালের এই নির্বাচন বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য নজির—ভারতীয় ইতিহাসে এটিই প্রথম ও সম্ভবত শেষ ঘটনা যেখানে কোনো রাজাকে নির্বাচনের মাধ্যমে সিংহাসনে বসানো হয়েছিল। গোপাল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং তিনি বাংলায় বৌদ্ধ সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটান।
পাল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজাগণ
১. ধর্মপাল (আনুমানিক ৭৭০-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ)
ধর্মপাল ছিলেন গোপালের পুত্র এবং পাল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্রাট, যিনি উত্তর ভারতের রাজনীতিতে পাল সাম্রাজ্যের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সময়ে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে—'ত্রিশক্তি সংগ্রাম'। কনৌজের সিংহাসনের জন্য পাল (ধর্মপাল), গুর্জর-প্রতিহার (বৎসরাজ) ও রাষ্ট্রকূট (ধ্রুব)-এর মধ্যে ত্রিশক্তি যুদ্ধ হয়। ধর্মপাল কনৌজ দখল করতে সক্ষম হন এবং চক্রায়ুধ নামে এক ব্যক্তিকে কনৌজের সিংহাসনে বসান। ধর্মপাল বিক্রমশীলা মহাবিহার (ভাগলপুর, বিহার) প্রতিষ্ঠা করেন, যা নালন্দার মতোই এক বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
২. দেবপাল (আনুমানিক ৮১০-৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ)
দেবপাল ছিলেন ধর্মপালের পুত্র ও উত্তরাধিকারী। তিনি ছিলেন পাল বংশের আরেক শ্রেষ্ঠ সম্রাট। তাঁর সময় পাল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়। দেবপালের সাম্রাজ্য উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বত এবং পূর্বে আসাম থেকে পশ্চিমে কাম্বোজ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে দাবি করা হয়। তিনি প্রাগজ্যোতিষপুরের (আসাম) রাজা এবং উৎকলের (ওড়িশা) রাজাকে পরাজিত করেছিলেন। দেবপালের সময় পাল সাম্রাজ্য শুধু রাজনৈতিক দিক থেকেই নয়, সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ হয়েছিল।
৩. প্রথম মহীপাল (আনুমানিক ৯৯৫-১০৪৩ খ্রিষ্টাব্দ)
দেবপালের পর পাল বংশ ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। এক সময় পাল সাম্রাজ্য প্রায় ধ্বংসের মুখে পৌঁছায়। এই সংকটের সময় প্রথম মহীপাল পাল বংশের পুনরুত্থান ঘটান। তিনি বাংলার হারানো অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধার করেন এবং পাল শাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তবে চোল রাজা প্রথম রাজেন্দ্রের আক্রমণে তাঁর কিছু অঞ্চল হাতছাড়া হয়।
৪. রামপাল (আনুমানিক ১০৮২-১১২৪ খ্রিষ্টাব্দ)
রামপাল ছিলেন পাল বংশের শেষ উল্লেখযোগ্য শক্তিশালী রাজা। তাঁর সময়েও পাল সাম্রাজ্যে পুনরুত্থান ঘটে এবং তিনি অনেক অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেন। তিনি রামাবতী (অধুনা পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা) নামে একটি নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়।
পাল রাজাদের ধর্মীয় নীতি
পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ও সমর্থক। তাঁদের সময় বাংলায় বৌদ্ধধর্ম ও শিক্ষার এক স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। নালন্দা (রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা) ও বিক্রমশীলা (ধর্মপাল প্রতিষ্ঠিত) ছিল জগদ্বিখ্যাত বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। পাল আমলে বাংলায় বহু বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ও চৈত্য নির্মিত হয়। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার (ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান) পাল আমলের স্থাপত্যের এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন। পাল শাসনামলে বাংলা থেকে বৌদ্ধধর্ম তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পাল রাজারা ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ করতেন—বৌদ্ধ হলেও হিন্দুধর্মের প্রতিও তাঁরা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
পাল বংশের পতনের কারণ
পাল বংশের পতনের পিছনে একাধিক কারণ ছিল:
- দুর্বল উত্তরাধিকারী: দেবপালের পর পাল বংশের উত্তরাধিকারীরা তেমন যোগ্য ও শক্তিশালী ছিলেন না।
- সামন্তদের বিদ্রোহ: পাল শাসনের শেষ দিকে সামন্ত রাজারা প্রায় স্বাধীন হয়ে উঠেছিলেন। উত্তর বাংলার সামন্তরা (কৈবর্ত বিদ্রোহ) পাল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
- বাহ্যিক আক্রমণ: চোল রাজা প্রথম রাজেন্দ্রের বাংলা আক্রমণ পাল শক্তিকে দুর্বল করে। উত্তর ভারত থেকেও আক্রমণ আসে।
- সেনদের উত্থান: রাঢ় অঞ্চলে সেন বংশ ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেন রাজা বল্লালসেন পাল রাজা গোবিন্দপালকে পরাজিত করে বাংলার সিংহাসন দখল করেন।
- অর্থনৈতিক দুর্বলতা: শেষের দিকে পাল রাজ্যের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
উপসংহার
পাল বংশ বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। তাঁদের শাসনকালে বাংলা শুধু রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালীই ছিল না, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত দিক থেকেও সমৃদ্ধ হয়েছিল। পাল আমলে গড়ে ওঠা বৌদ্ধ বিহারগুলি সারা এশিয়া থেকে পণ্ডিত ও ছাত্রদের আকর্ষণ করত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে এই গৌরবময় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
ভূমিকা
পাল শাসনের শেষ দিকে বাংলায় আরেকটি শক্তিশালী রাজবংশের উত্থান ঘটে—সেন বংশ। সেনরা নিজেদের কর্ণাটকের (দক্ষিণ ভারত) ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলে দাবি করতেন। ধীরে ধীরে তাঁরা প্রথমে রাঢ় অঞ্চলে এবং পরে সমগ্র বাংলায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেন। সেন শাসনকাল (আনুমানিক ১০৯৫-১২০৪/৫ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অথচ বিতর্কিত অধ্যায়।
সেন বংশের ক্রমবিকাশ
সামন্তসেন ও হেমন্তসেন
সেন বংশের আদি প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্তসেন, তবে তাঁকে নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্য খুবই সীমিত। তাঁর পুত্র হেমন্তসেন রাঢ় অঞ্চলে সেন শক্তির ভিত্তি স্থাপন করেন। পাল শাসনের শেষ দিকে 'কৈবর্ত বিদ্রোহ' সেনদের রাজ্যস্থাপনে সহায়তা করেছিল।
বিজয়সেন (আনুমানিক ১০৯৫-১১৫৮ খ্রিষ্টাব্দ)
বিজয়সেন ছিলেন সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও শক্তিশালী শাসক। তিনি রাঢ় অঞ্চল জয় করে সেন রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং পরে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে রাজ্য সম্প্রসারিত করেন। বিজয়সেনের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর (বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলা)।
বল্লালসেন (আনুমানিক ১১৫৯-১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দ)
বল্লালসেন ছিলেন বিজয়সেনের পুত্র এবং সেন বংশের এক বিতর্কিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ রাজা। তিনি পাল রাজা গোবিন্দপালকে পরাজিত করে সেন সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত করেছিলেন এবং পাল সাম্রাজ্যের ওপর চূড়ান্ত আঘাত করেছিলেন। বল্লালসেনের প্রধান কীর্তি ছিল তাঁর সমাজ-সংস্কার। তিনি 'দানসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর' নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন।
বল্লালসেনের সমাজ-সংস্কার
বল্লালসেনের সমাজ-সংস্কার বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। তিনি যে সংস্কারগুলি করেছিলেন, তার মধ্যে প্রধান ছিল:
- কৌলীন্য প্রথার প্রবর্তন: বল্লালসেন বাঙালি ব্রাহ্মণ সমাজে কৌলীন্য প্রথার প্রবর্তন করেন। এই প্রথা অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের মধ্যে কৌলীন্য (অভিজাতত্ব) নির্ধারিত হতো নির্দিষ্ট কিছু গুণ ও আচরণের ভিত্তিতে। কুলীন ব্রাহ্মণরা বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান পেতেন। এই প্রথা পরবর্তীকালে বাংলার সমাজে নানা জটিলতা ও সমস্যার সৃষ্টি করেছিল।
- ব্রাহ্মণ্য আচার-অনুষ্ঠানের প্রাধান্য: বল্লালসেন রক্ষণশীল, গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য আচার-আচরণকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর সময়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব বাংলায় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
- বর্ণাশ্রম প্রথার ওপর জোর: তিনি বর্ণাশ্রম প্রথাকে কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চার বর্ণের মধ্যে বিভাজন ও নিয়মকানুনকে তিনি কঠোর করেন।
- হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান: পাল রাজারা যেখানে ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক, সেখানে সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বল্লালসেনের সময়ে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের পরিবর্তে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে বল্লালসেনের এই সংস্কারগুলি বাংলার সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবও ফেলেছিল। কৌলীন্য প্রথা পরবর্তীকালে বহুবিবাহ, যৌতুক প্রথা ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার জন্ম দিয়েছিল।
লক্ষ্মণসেন ও সেন শাসনের অবসান
লক্ষ্মণসেন (আনুমানিক ১১৭৯-১২০৪/৫ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন বল্লালসেনের পুত্র এবং সেন বংশের শেষ উল্লেখযোগ্য রাজা। তাঁর রাজধানী ছিল পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর। তিনি প্রয়াগ, বারাণসী এবং পুরীতে তাঁর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) ছিল সেই আমলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।
তুর্কি আক্রমণ ও পতন
১২০৪/৫ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলা আক্রমণ করেন। বখতিয়ার খলজি তাঁর সেন্যদের অনেকগুলি ছোটো ছোটো দলে ভাগ করে ঝাড়খণ্ডের দুর্গম জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন, যা ছিল এক অভাবিত সামরিক কৌশল। তখন দুপুরবেলা, বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণসেন নদীয়ায় খাবার খেতে বসেছিলেন। তুর্কিরা এসেছে শুনে তিনি কোনো প্রতিরোধ না করে পূর্ববঙ্গের দিকে চলে যান। তুর্কিরা বিনা যুদ্ধেই নদীয়া জয় করে। এরপর বখতিয়ার লক্ষ্মণাবতী অধিকার করে নিজের রাজধানী স্থাপন করেন। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজি মারা যান এবং একই সময়ে লক্ষ্মণসেনেরও মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলায় সেন শাসনের কার্যত অবসান ঘটে এবং মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।
উপসংহার
সেন শাসন বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে যেমন এই শাসন বাংলায় হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনই বল্লালসেনের কৌলীন্য প্রথা ও সামাজিক সংস্কার পরবর্তীকালে বাংলার সমাজে নানা জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। ১২০৪/৫ সালের তুর্কি আক্রমণের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীন হিন্দু রাজত্বের অবসান ঘটে এবং বাংলার ইতিহাস এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে—দিল্লি সুলতানির অধীনে বাংলার মুসলিম শাসনের যুগ।
ভূমিকা
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে এক অন্ধকারময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রায় একশো বছর ধরে (আনুমানিক ৬৫০-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলায় তীব্র অরাজকতা, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বিরাজ করছিল। এই অরাজক অবস্থাকে ঐতিহাসিকরা 'মাৎস্যন্যায়' নামে অভিহিত করেছেন। এটি ছিল বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা থেকে পরবর্তীকালে গোপালের নেতৃত্বে পাল সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল।
'মাৎস্যন্যায়' শব্দের অর্থ
'মাৎস্যন্যায়' শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত—'মৎস্য' (অর্থাৎ মাছ) এবং 'ন্যায়' (অর্থাৎ নীতি বা রীতি)। মাছেদের জগতে বড়ো মাছ ছোটো মাছকে খেয়ে ফেলে—এটাই মাৎস্যন্যায়। এই ধারণা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে বোঝানো হয় যে, যখন রাষ্ট্রে কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন থাকে না, তখন সমাজের শক্তিশালী ব্যক্তিরা দুর্বলদের শোষণ করে। বড়ো রাজারা ছোটো রাজাদের পরাজিত করে, জমিদাররা সাধারণ প্রজাদের উপর অত্যাচার চালায়—এমন অরাজক অবস্থাকেই মাৎস্যন্যায় বলে।
মাৎস্যন্যায়ের কারণ
- শশাঙ্কের মৃত্যু: শক্তিশালী শাসক শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় এমন কোনো যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন না, যিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে ধরে রাখতে পারতেন। এর ফলে কেন্দ্রীয় শাসনের অভাব দেখা দেয়।
- কেন্দ্রীয় শাসনের অভাব: গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসনের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
- সামন্ত রাজাদের উত্থান: শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের অভাবে স্থানীয় সামন্ত ও জমিদাররা প্রায় স্বাধীনভাবে নিজেদের এলাকা শাসন করতে থাকেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হতেন।
- বাহ্যিক আক্রমণ: এই অরাজকতার সময় বাংলায় নানা দিক থেকে আক্রমণ আসতে থাকে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
- অর্থনৈতিক অস্থিরতা: শশাঙ্কের আমল থেকেই অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। অরাজকতার সময় অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়।
- প্রজাদের দুর্দশা: ক্রমাগত যুদ্ধ, লুঠপাট ও শোষণের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
মাৎস্যন্যায়ের ফলাফল
- সাধারণ মানুষের দুর্দশা: অরাজকতার ফলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীবন ও সম্পদের কোনো নিরাপত্তা ছিল প্যাটার্ন ছিল না।
- অর্থনীতির ধ্বংস: যুদ্ধ, লুঠপাট ও বাণিজ্যে মন্দার কারণে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষতি: অরাজকতার কারণে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ব্যাহত হয়। বৌদ্ধ বিহার ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- নতুন রাজবংশের উত্থানের প্রেক্ষাপট: এই অরাজকতার সময় শেষ পর্যন্ত বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা একত্রিত হন এবং তাঁরা যোগ্য শাসক হিসেবে গোপালকে নির্বাচিত করেন। এর মাধ্যমেই পাল বংশের উত্থান ঘটে।
গোপালের নির্বাচন ও মাৎস্যন্যায়ের অবসান
মাৎস্যন্যায়ের অরাজকতার হাত থেকে বাংলাকে উদ্ধার করার জন্য বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা—যার মধ্যে ছিলেন সামন্ত রাজা, ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ ভিক্ষু, ও সাধারণ প্রজাদের প্রতিনিধিরা—একত্রিত হয়ে স্থির করেন যে একজন যোগ্য ও শক্তিশালী শাসক প্রয়োজন, যিনি এই বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেন। তাঁরা সকলে মিলে গোপালকে (আনুমানিক ৭৫০-৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন।
গোপালের নির্বাচন ভারতীয় ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। রাজতন্ত্রের যুগে কোনো রাজার নির্ধারণে প্রজাদের প্রতিনিধিদের ভূমিকা রাখার এমন নজির খুবই বিরল। গোপালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলা এক নতুন যুগে পদার্পণ করে।
গোপাল রাজা হওয়ার পর দ্রুত শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। তিনি:
- বিদ্রোহী সামন্তদের দমন করেন এবং কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
- বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং বৌদ্ধ বিহারগুলি পুনরুজ্জীবিত করেন।
- অর্থনীতির পুনর্গঠন শুরু করেন।
- একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেন।
উপসংহার
মাৎস্যন্যায় ছিল বাংলার ইতিহাসে এক নেতিবাচক অথচ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় ঘটনা। এটি শিক্ষা দেয় যে, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের অভাবে সমাজে কীভাবে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সেই সঙ্গেই এটি এও শিক্ষা দেয় যে, সংকটের সময় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও যোগ্য নেতৃত্ব কীভাবে অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে—যেমন ঘটেছিল গোপালের নেতৃত্বে পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
ভূমিকা
সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু উত্তর ভারত নয়, দক্ষিণ ভারতও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। দক্ষিণ ভারতে এই সময়ে যে সব শক্তিশালী রাজবংশের উত্থান ঘটেছিল, তাদের মধ্যে চোল বংশ ছিল অন্যতম। চোল সাম্রাজ্য কেবল দক্ষিণ ভারতেই নয়, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।
চোলদের উৎপত্তি ও প্রাথমিক ইতিহাস
চোলদের উৎপত্তিস্থল ছিল দাক্ষিণাত্যে, বর্তমান তামিলনাড়ু রাজ্যে। চোল রাজ্য ছিল তামিল দেশের তিনটি প্রাচীন রাজ্যের একটি—অন্য দুটি ছিল চের ও পাণ্ড্য। প্রাচীন তামিল সাহিত্য (সঙ্গম সাহিত্য) থেকেও চোল রাজাদের কথা জানা যায়। তবে প্রাচীন চোলরা তৃতীয় থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত তেমন শক্তিশালী ছিলেন না। নবম শতাব্দীতে এক নতুন চোল বংশের উত্থান ঘটে, যা 'মধ্যযুগীয় চোল' নামে পরিচিত।
বিজয়ালয় চোল (আনুমানিক ৮৫০-৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ)
মধ্যযুগীয় চোল বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিজয়ালয় চোল। তিনি প্রথমে ছিলেন পল্লব রাজাদের একজন সামন্ত রাজা। কিন্তু পল্লব ও পাণ্ড্যদের মধ্যে সংঘর্ষের সুযোগ নিয়ে তিনি চোল রাজ্যের পত্তন করেন। তাঞ্জাবুর (তাঞ্জোর) ছিল তাঁর রাজধানী।
প্রথম আদিত্য ও প্রথম পরান্তক
বিজয়ালয়ের পর প্রথম আদিত্য (আনুমানিক ৮৭০-৯০৭) পল্লবদের পরাজিত করে চোল সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন। প্রথম পরান্তক (আনুমানিক ৯০৭-৯৫৫) পাণ্ড্যদের পরাজিত করেন এবং 'মদুরাইকোন্ড' (মাদুরাই জয়ী) উপাধি নেন। তবে ৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণের কাছে পরান্তক পরাজিত হন, যার ফলে চোল শক্তি কিছুটা হ্রাস পায়।
প্রথম রাজরাজ (৯৮৫-১০১৪ খ্রিষ্টাব্দ)
প্রথম রাজরাজ ছিলেন চোল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজাদের অন্যতম, যাঁর সময় থেকে চোল সাম্রাজ্যের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের যুগ শুরু হয়। তাঁর কৃতিত্বগুলি ছিল:
- সাম্রাজ্য বিস্তার: রাজরাজ বর্তমান তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটকের বিশাল অঞ্চলে চোল প্রতিপত্তি বাড়ান। তিনি চের, পাণ্ড্য ও সিংহল (শ্রীলঙ্কা) রাজ্য জয় করেন। শ্রীলঙ্কার উত্তরাংশ চোল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং রাজরাজ সেখানে 'মুম্মুদিচোলমণ্ডলম' নামে একটি প্রদেশ গঠন করেন।
- নৌশক্তির বিকাশ: রাজরাজ প্রথম চোল রাজা যিনি এক শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে চোলরা সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।
- স্থাপত্যকীর্তি: রাজরাজের আমলে তাঞ্জাবুরে (তাঞ্জোর) বিরাট ও সুউচ্চ বৃহদীশ্বর মন্দির (রাজরাজেশ্বরম বা পেরিয়া কোয়িল) নির্মিত হয়, যা দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর কীর্তি এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবে স্বীকৃত।
- প্রশাসনিক দক্ষতা: রাজরাজ এক সুসংহত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। জমির রাজস্ব নির্ধারণের জন্য জরিপ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
- মালদ্বীপ জয়: রাজরাজ মালদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জও জয় করেছিলেন, যা চোল নৌশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।
প্রথম রাজেন্দ্র (১০১৬-১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দ)
প্রথম রাজেন্দ্র ছিলেন রাজরাজের পুত্র এবং চোল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। তাঁর সময় চোল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয় এবং তিনিই ছিলেন একমাত্র দক্ষিণ ভারতীয় সম্রাট যিনি উত্তর ভারত পর্যন্ত সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর কৃতিত্বগুলি ছিল:
- উত্তর ভারত অভিযান: রাজেন্দ্র বাংলার পাল বংশের বিরুদ্ধে এক অভিযানে গঙ্গা নদীর তীর পর্যন্ত এসেছিলেন এবং সেখানে পাল রাজাকে (প্রথম মহীপাল) পরাজিত করেছিলেন। এই বিজয়ের স্মৃতিতে তিনি 'গঙ্গাইকোন্ডচোল' (যিনি গঙ্গা জয় করেছেন) উপাধি গ্রহণ করেন এবং গঙ্গাইকোন্ডচোলপুরম নামে এক নতুন রাজধানী নির্মাণ করেন।
- নৌ অভিযান: রাজেন্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নৌ অভিযান প্রেরণ করেন। তাঁর নৌবাহিনী শ্রীবিজয় সাম্রাজ্য (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা) আক্রমণ করে এবং জয়লাভ করে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতীয় বাণিজ্যকে সুসংহতভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা চোলদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল।
- শ্রীলঙ্কা সম্পূর্ণ জয়: পিতা রাজরাজের সময় উত্তর শ্রীলঙ্কা জয় করা গেলেও, রাজেন্দ্র সম্পূর্ণ শ্রীলঙ্কা দখল করেন এবং সিংহলি রাজাকে বন্দি করেন।
- চালুক্যদের বিরুদ্ধে সাফল্য: রাজেন্দ্র কল্যাণীর পশ্চিম চালুক্যদের (রাজা জয়সিংহ) পরাজিত করেন এবং কৃষ্ণা নদী পর্যন্ত অঞ্চল অধিকার করেন।
- গঙ্গাইকোন্ডচোলপুরম: রাজেন্দ্র যে রাজধানী নির্মাণ করেছিলেন, তা ছিল এক মহানগরী। এখানে তিনি এক বিশাল মন্দিরও নির্মাণ করেন, যা তাঞ্জাবুরের মন্দিরের আদলে তৈরি।
চোল নৌশক্তি ও প্রশাসন
চোল সাম্রাজ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের শক্তিশালী নৌবাহিনী। ভারতীয় ইতিহাসে চোলরাই প্রথম সমুদ্রগামী এক শক্তিশালী নৌশক্তি গড়ে তোলেন। এর ফলে তারা বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে পেরেছিল। চোল প্রশাসন ছিল অত্যন্ত সুসংহত ও দক্ষ। 'উর' (গ্রামসভা) ও 'সভা' (ব্রাহ্মণ সভা) নামে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা চোল আমলের এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল। উত্তরমেরুর শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, তখন গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনে নির্বাচন প্রথা চালু ছিল।
উপসংহার
চোল সাম্রাজ্য ছিল দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। প্রথম রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্রের নেতৃত্বে চোল সাম্রাজ্য কেবল দক্ষিণ ভারতেই নয়, উত্তর ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। চোলদের নৌশক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্থাপত্যকৃতি ও সাংস্কৃতিক সাফল্য ভারতীয় ইতিহাসে তাদের এক বিশেষ মর্যাদা দান করেছে।
মনে রেখো!
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের এই অধ্যায়ে আছে—বাংলার মানচিত্রে একেকটি অঞ্চলের পরিচয়, শশাঙ্কের উত্থান ও বিতর্ক, মাৎস্যন্যায়ের অন্ধকার থেকে পাল সাম্রাজ্যের উত্থান, সেন রাজাদের সমাজ-সংস্কার, চোলদের গৌরবময় নৌঅভিযান, এবং ইসলামের আগমনের প্রথম পর্ব। প্রতিটি ঘটনার পিছনের কারণ ও ফলাফল বুঝে পড়লে ইতিহাস হয়ে উঠবে গল্পের মতো মজার!