দিল্লি সুলতানি : তুর্কো-আফগান শাসন প্রশ্ন উত্তর

WBBSE Class 7 History Chapter 4 - দিল্লি সুলতানি | মামলুক, খলজি, তুঘলক, সৈয়দ, লোদি | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 12 May 2026 Last Update: 31 May 2026
দিল্লি সুলতানি : তুর্কো-আফগান শাসন - Class 7 History Chapter 4

দিল্লি সুলতানি : তুর্কো-আফগান শাসন

সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা | 40 MCQ | 24 SAQ | 5 Broad Questions

মামলুক খলজি তুঘলক সৈয়দ লোদি ইলিয়াসশাহি বিজয়নগর
👑

পাঁচটি রাজবংশ

মামলুক, খলজি, তুঘলক, সৈয়দ, লোদি
১২০৬-১৫২৬ পর্যন্ত শাসন

⚔️

আলাউদ্দিন খলজি

দক্ষিণ ভারত অভিযান
বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

🏛️

মহম্মদ বিন তুঘলক

রাজধানী স্থানান্তর
তামার মুদ্রা পরীক্ষা

🕌

আঞ্চলিক রাজ্য

বাংলার ইলিয়াসশাহি
বিজয়নগর ও বাহমনি

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

40 টি
1দিল্লি সুলতানির প্রথম রাজবংশ কোনটি?
2দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠাতা কে?
3কুতুবউদ্দিন আইবক কার দাস ছিলেন?
4ইলতুৎমিশ কেন খলিফার অনুমোদন চেয়েছিলেন?
5ইলতুৎমিশ কত সালে খলিফার অনুমোদন পান?
6ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শাসক কে ছিলেন?
7রাজিয়া কত বছর শাসন করেছিলেন?
8সিজদা ও পাইবস প্রথা কে চালু করেন?
9বলবন কোন ধরনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন?
10খলজি বিপ্লব কত সালে ঘটে?
11খলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?
12দক্ষিণ ভারতে প্রথম সুলতানি সাম্রাজ্য বিস্তার করেন কে?
13আলাউদ্দিনের দক্ষিণ ভারত অভিযানের সেনাপতি কে ছিলেন?
14আলাউদ্দিন খলজি বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেন চালু করেন?
15বাজার তদারকির জন্য আলাউদ্দিন কোন কর্মচারী নিয়োগ করেন?
16মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরের পরিকল্পনা কী ছিল?
17মহম্মদ বিন তুঘলক কোন ধাতুর মুদ্রা চালু করেন?
18কোন পরিব্রাজক মহম্মদ বিন তুঘলকের সময় ভারতে আসেন?
19ইবন বতুতার ভ্রমণ বিবরণীর নাম কী?
20দাক্ষিণাত্যের বাহমনি রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?
21বিজয়নগর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা কত সালে হয়?
22বিজয়নগরের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?
23বাংলায় ইলিয়াসশাহি শাসন শুরু হয় কত সালে?
24হোসেনশাহি বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক কে ছিলেন?
25আলাউদ্দিন হোসেন শাহ কত বছর শাসন করেন?
26ইকতা ব্যবস্থায় কাদের নিয়োগ করা হতো?
27খিলাফত থেকে শেষবার অনুমোদন নেন কোন সুলতান?
28লোদি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?
29পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কত সালে হয়?
30পানিপথের যুদ্ধে বাবর কার বিরুদ্ধে জয়ী হন?
31বাবর কোন কৌশল ব্যবহার করে পানিপথের যুদ্ধ জয় করেন?
32ইলতুৎমিশের পর কত বছরে দশ জন সুলতান শাসন করেন?
33বিজয়নগরে মোট কটি রাজবংশ শাসন করে?
34তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?
35কৃত্রিম মূল্যের মুদ্রা জাল হওয়ায় কী হয়েছিল?
36সুলতানি শাসনে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের জন্য কোনো নিয়ম ছিল?
37রাজিয়া কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন?
38হোসেন শাহের আমলে বাংলা ভাষাচর্চার কী অবস্থা ছিল?
39দোয়াব অঞ্চল কোন নদীর মধ্যবর্তী?
40বিজয়নগরের প্রধান জীবিকা কী ছিল?

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

24 টি
1দিল্লি সুলতানির পাঁচটি রাজবংশের নাম কী কী?
দিল্লি সুলতানি আমলে মোট পাঁচটি রাজবংশ শাসন করেছিল: ১) মামলুক বা দাস বংশ (১২০৬-১২৯০ খ্রি.)—প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবক। ২) খলজি বংশ (১২৯০-১৩২০ খ্রি.)—প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজি। ৩) তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১২ খ্রি.)—প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসউদ্দিন তুঘলক। ৪) সৈয়দ বংশ (১৪১৪-১৪৫১ খ্রি.)—প্রতিষ্ঠাতা খিজির খান। ৫) লোদি বংশ (১৪৫১-১৫২৬ খ্রি.)—প্রতিষ্ঠাতা বহলোল লোদি। ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদি বাবরের কাছে পরাজিত হলে দিল্লি সুলতানির অবসান ঘটে।
2ইলতুৎমিশ কে ছিলেন এবং তাঁর প্রধান সমস্যা কী ছিল?
ইলতুৎমিশ ছিলেন দাস বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং দিল্লি সুলতানির একজন গুরুত্বপূর্ণ সুলতান (রাজত্বকাল: ১২১১-১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি কুতুবউদ্দিন আইবকের জামাই ছিলেন। সুলতান হওয়ার পর তাঁর প্রধান তিনটি সমস্যা ছিল: ১) তাজউদ্দিন ইয়ালদুজ গজনির শাসক হিসেবে দিল্লির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন। ২) নাসিরউদ্দিন কুবাচা মুলতান থেকে লাহোর ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ দখল করে ছিলেন। ৩) অন্যান্য আঞ্চলিক ক্ষমতাধর তুর্কি আমিররা ইলতুৎমিশের কর্তৃত্ব মানতে চাইছিলেন না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি ১২২৯ সালে বাগদাদের খলিফার অনুমোদন নেন।
3সুলতানরা কেন খলিফার অনুমোদন চাইতেন?
দিল্লির সুলতানরা যখনই শাসন ও অধিকারের নায্যতা নিয়ে সমস্যায় পড়তেন, তখনই তাঁরা বাগদাদের খলিফার আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর অনুমোদন চাইতেন। এর প্রধান তিনটি কারণ ছিল: ১) রাজনৈতিক নায্যতা প্রতিষ্ঠা—বিশেষত যখন প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিদ্রোহী আমিররা সুলতানের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলত। ২) ধর্মীয় বৈধতা অর্জন—ইসলামীয় বিশ্বে খলিফা ছিলেন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, তাঁর অনুমোদন সুলতানদের শাসনকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ করত। ৩) মুদ্রায় ও নামাজে খলিফার নাম ঘোষণা করে সুলতানরা নিজেদের খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেন। তবে বাস্তবে সুলতানরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই শাসন পরিচালনা করতেন। মুঘল বাদশাহরা পরবর্তীতে খলিফার অনুমোদন নেওয়ার প্রথা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।
4রাজিয়া সুলতানা কে ছিলেন? তাঁর শাসনকাল কেমন ছিল?
রাজিয়া সুলতানা ছিলেন ইলতুৎমিশের কন্যা এবং ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শাসক (রাজত্বকাল: ১২৩৬-১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ)। ইলতুৎমিশ তাঁকে যোগ্য উত্তরাধিকারী মনে করলেও তুর্কি অভিজাতদের বিরোধিতার জন্য তাঁর শাসন সহজ ছিল না। রাজিয়া চিরাচরিত পর্দাপ্রথা পরিত্যাগ করে পুরুষদের পোশাকে দরবার পরিচালনা করতেন। তিনি কিছু বিদ্রোহ দমন করলেও মাত্র সাড়ে তিন বছরের বেশি শাসন টিকতে পারেননি। নারী শাসক হিসেবে তুর্কি অভিজাতদের অনবরত বিরোধিতা ও বিদ্রোহের কারণে শেষ পর্যন্ত ১২৪০ সালে রাজিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর ইলতুৎমিশের বংশধরদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলতে থাকে। একজন যোগ্য শাসক হয়েও রাজিয়া প্রধানত তাঁর নারী পরিচয়ের কারণে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
5বলবনের শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
গিয়াসউদ্দিন বলবন (রাজত্বকাল: ১২৬৬-১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন দাস বংশের একজন শক্তিশালী সুলতান। তাঁর শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল: ১) শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত শাসন প্রতিষ্ঠা—তিনি কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন করেন। ২) সিজদা ও পাইবস প্রথা চালু—সিজদা অর্থ সুলতানকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করা, পাইবস অর্থ সুলতানের পা চুম্বন করা। এগুলি ছিল সুলতানের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক। ৩) রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি—তিনি নিজেকে পারস্যের কিংবদন্তি নায়কদের বংশধর বলে দাবি করেন এবং দরবারে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচলন করেন। ৪) অভিজাতদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা—যাতে কেউ সুলতানের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। বলবনের এই নীতিগুলি সুলতানি শাসনের ভিতকে শক্তিশালী করেছিল।
6খলজি বিপ্লব কী?
১২৯০ খ্রিষ্টাব্দে জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজি বলবনের বংশধরদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে সুলতান হন। এই ঘটনাকে খলজি বিপ্লব বলা হয়। এই বিপ্লবের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী: ১) দিল্লিতে ইলবারি তুর্কি অভিজাতদের ক্ষমতার অবসান ঘটে। ২) তুর্কিদের পরিবর্তে খলজি তুর্কি ও হিন্দুস্তানিদের ক্ষমতা বেড়ে যায়। ৩) প্রমাণিত হয় যে শুধু ইলবারি তুর্কিরাই ক্ষমতার মালিক নন। ৪) সুলতানি শাসনের ভিত আরও প্রশস্ত হয়। খলজি বিপ্লব ছিল দাস বংশের সমাপ্তি এবং খলজি বংশের সূচনার এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
7আলাউদ্দিন খলজির দক্ষিণ ভারত অভিযান সম্পর্কে কী জানো?
আলাউদ্দিন খলজি (রাজত্বকাল: ১২৯৬-১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন দিল্লির প্রথম সুলতান যিনি দক্ষিণ ভারতে সুলতানি সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুর। মালিক কাফুর প্রথমে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরি (যাদব) আক্রমণ করেন, পরে ওয়ারঙ্গল (কাকতীয়), হোয়সল (দ্বারসমুদ্র) ও পাণ্ড্য রাজ্য (মাদুরা) পর্যন্ত অভিযান চালান। এই অভিযানের ফলে প্রচুর ধনসম্পদ, হাতি ও ঘোড়া দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। দক্ষিণ ভারতের রাজারা আলাউদ্দিনের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়মিত কর দিতে সম্মত হন, যদিও পুরোপুরি দিল্লির অধীনে আসেননি। এই সামরিক সাফল্য আলাউদ্দিনের সাম্রাজ্যকে এক বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিল।
8আলাউদ্দিন খলজির বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করো।
আলাউদ্দিন খলজি সুলতানি আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এই ব্যবস্থার প্রধান কারণ ছিল—বিশাল সেনাবাহিনীকে কম খরচে প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করা এবং মোঙ্গল আক্রমণের মোকাবিলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি শাহানা-ই মাণ্ডি এবং দিওয়ান-ই রিয়াসং নামে রাজকর্মচারী নিয়োগ করেন। দ্রব্যের সরকারি মূল্য নির্ধারিত করে দেওয়া হতো, সেই দামের থেকে বেশি দাম নিলে বা ক্রেতাকে ওজনে ঠকালে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় প্রজাদের নির্দিষ্ট পরিমাণে খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করা হতো। এই ব্যবস্থার ফলে দিল্লিতে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় ছিল এবং বিশাল সেনাবাহিনীর ভরণপোষণ সহজ হয়েছিল।
9মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরের পরিকল্পনা কী ছিল? এর ফল কী হয়েছিল?
মহম্মদ বিন তুঘলক (রাজত্বকাল: ১৩২৪-১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন সুলতানি যুগের সবচেয়ে বিতর্কিত শাসক। দিল্লির অধিবাসীদের বিরোধিতা ও মোঙ্গল আক্রমণের ভয় থেকে রক্ষা পেতে এবং দক্ষিণাত্যকে আরও ভালোভাবে শাসন করতে তিনি দেবগিরিতে (যার নতুন নাম হয় দৌলতাবাদ) দ্বিতীয় রাজধানী তৈরি করেন। সুলতানের হুকুমে দিল্লি থেকে সমস্ত অধিবাসী ও সেনাবাহিনীকে দৌলতাবাদে যেতে বাধ্য করা হয়। পথে অনেক মানুষ প্রাণ হারান, চরম দুর্ভোগের শিকার হন। কিছু বছর পর বাস্তবতার চাপে সুলতান আবার রাজধানী দিল্লিতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। এই দ্বিতীয়বারের স্থানান্তরেও প্রচুর মানুষ কষ্ট পান। রাজধানী স্থানান্তরের এই পরিকল্পনাকে মহম্মদ বিন তুঘলকের অন্যতম ব্যর্থ পরীক্ষা হিসেবে গণ্য করা হয়।
10মহম্মদ বিন তুঘলকের তামার মুদ্রা পরীক্ষা সম্পর্কে কী জানো?
সুলতানি যুগে মহম্মদ বিন তুঘলকের সবচেয়ে সাহসী কিন্তু ব্যর্থ পরীক্ষা ছিল তামার মুদ্রা চালু করা। সোনা ও রূপোর ঘাটতি মেটাতে তিনি তামার তৈরি কৃত্রিম মূল্যের মুদ্রা (token currency) প্রচলন করেন। কিন্তু তিনি এই মুদ্রা যাতে জাল না করা যায় তার জন্য আগে থেকে কোনো ব্যবস্থা নেননি। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং এমনকি বিদেশ থেকেও অনেকে তামার মুদ্রা জাল করতে শুরু করে। বাজার থেকে জাল মুদ্রা তুলে নিতে রাজকোষ থেকে প্রচুর সোনা ও রূপোর মুদ্রা ব্যয় করতে বাধ্য হন সুলতান। শেষ পর্যন্ত এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় এবং রাজকোষের বিপুল ক্ষতি হয়। এই ঘটনাটি আধুনিক অর্থনীতির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—যে কোনো মুদ্রা চালু করার আগে তার নিরাপত্তা ও জাল-রোধী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
11তুঘলকি কাণ্ড বলতে কী বোঝো? মহম্মদ বিন তুঘলকের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কথা লেখো।
তুঘলকি কাণ্ড বলতে সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের এমন কিছু অদ্ভুত ও বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তকে বোঝানো হয়, যা তখনকার মানুষের কাছে পাগলামি বলে মনে হয়েছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য ভুলগুলি ছিল: ১) দোয়াব অঞ্চলে কৃষিজমির উপর অতিরিক্ত কর বসানো, যখন অনাবৃষ্টির ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। প্রজারা কর দিতে পারেনি, বিদ্রোহ করে। পরে সুলতান কর মকুব করেন এবং ক্ষতিপূরণ দেন, কিন্তু ততদিনে অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। ২) রাজধানী দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে স্থানান্তর এবং পরে আবার দিল্লিতে ফিরিয়ে আনা—এতে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। ৩) তামার মুদ্রা চালু করে কোনো জাল-রোধী ব্যবস্থা না নেওয়া, ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে। ৪) কিছু অযোগ্য সাধারণ মানুষকে প্রশাসনের উচ্চপদে বসানো—একজন মদ ব্যবসায়ী, একজন নাপিত, একজন পাচক ও দুজন মালীকে উচ্চপদ দেওয়া হয়, যা অভিজাতদের ক্ষোভ বাড়ায়।
12ইবন বতুতা কে ছিলেন? তাঁর রচনা থেকে কী জানা যায়?
ইবন বতুতা ছিলেন এক বিখ্যাত মরক্কোর মুসলিম পরিব্রাজক, যিনি ১৩৩৪ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের সময় ভারতে আসেন। তিনি প্রায় আট বছর ভারতে অবস্থান করেন এবং মহম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে কাজি হিসেবে নিয়োজিত হন। তাঁর ভ্রমণ বিবরণীর নাম আল-রিহলা (অর্থ: যাত্রা)। এই গ্রন্থ থেকে আমরা মহম্মদ বিন তুঘলকের সময়কার ভারতের সমাজ, অর্থনীতি, ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা (উলাক ও দাওয়া পদ্ধতি), প্রশাসন ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। ডাক ব্যবস্থা সম্পর্কে ইবন বতুতা লিখেছেন যে দুটি পদ্ধতি ছিল—উলাক (ঘোড়ায় ডাক) ও দাওয়া (পায়ে হাঁটা ডাক ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি মাইলের এক-তৃতীয়াংশে একটি করে কুঁড়েঘর থাকত)।
13ফিরোজ শাহ তুঘলকের সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক কাজগুলি কী কী?
ফিরোজ শাহ তুঘলক (রাজত্বকাল: ১৩৫১-১৩৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন মহম্মদ বিন তুঘলকের পরবর্তী সুলতান। তাঁর শাসনকাল একাধারে সংঘর্ষপূর্ণ ও সংস্কারমূলক ছিল। তাঁর উল্লেখযোগ্য জনকল্যাণমূলক কাজগুলি ছিল: ১) রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার—ইসলামীয় রীতি অনুযায়ী শুধু বৈধ কর আদায়ের নিয়ম চালু করা এবং অন্যান্য কর বাতিল করা। ২) নতুন নগর, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল ও বাগান নির্মাণ। ৩) দরিদ্রদের অর্থসাহায্যের ব্যবস্থা এবং বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য একটি পৃথক দপ্তর খোলা, যেখান থেকে চাকরি দেওয়া হতো। ৪) কৃষির উন্নতির জন্য সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাল খনন করা। ৫) অনাবাদী জমির সংস্কার করে চাষের উপযোগী করে তোলা। তবে তিনি একজন সামরিক নেতা হিসেবে ততটা দক্ষ ছিলেন না এবং সুলতানি শাসনের বাইরে চলে যাওয়া অঞ্চলগুলির ওপর পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
14ইকতা ব্যবস্থা কী? সুলতানরা কেন এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন?
ইকতা ব্যবস্থা ছিল দিল্লি সুলতানি শাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সুলতানরা যে সব নতুন রাজ্য জয় করতেন, সেই রাজ্যগুলিকে এক একটি প্রদেশ বা ইকতা হিসেবে ধরে নেওয়া হতো। এই ইকতার দায়িত্বে থাকতেন একজন সামরিক নেতা, যাকে বলা হতো ইকতাদার বা মুকতি বা ওয়ালি। ইকতাগুলিকে ছোটো ও বড়ো—এই দুই ভাগে ভাগ করা হতো। ছোটো ইকতার শাসক শুধু সামরিক দায়িত্ব পালন করতেন, আর বড়ো ইকতার শাসককে সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হতো (সেনাবাহিনীর দেখাশোনা করা, রাজস্ব সুলতানকে দেওয়া, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ইত্যাদি)। সুলতানরা এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন কারণ: ১) বিশাল সাম্রাজ্যকে সুচারুরূপে শাসন করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজন ছিল। ২) নতুন জয় করা অঞ্চল থেকে রাজস্ব আদায় ও শান্তি বজায় রাখা জরুরি ছিল। ৩) সামরিক বাহিনীর ভরণপোষণের জন্য ভূমি-রাজস্বের ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল। ইকতাদাররা সম্পূর্ণভাবে সুলতানের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
15বাংলায় ইলিয়াসশাহি শাসন সম্পর্কে কী জানো?
১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ লখনৌতির সিংহাসন দখল করে বাংলায় স্বাধীন ইলিয়াসশাহি শাসনের সূচনা করেন। তিনি বাংলার তিনটি প্রধান রাজ্য—লখনৌতি, সাতগাঁ ও সোনারগাঁ—যুদ্ধ করে এক করেন। ইলিয়াস শাহ পূর্ব বঙ্গ ও কামরূপকে নিজের শাসনের আওতায় নিয়ে আসেন। দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ইলিয়াসের রাজধানী পাণ্ডুয়া দখল করে নেন। ইলিয়াসশাহি শাসনকালে (১৩৪২-১৪১৪/১৫ এবং পরে পুনরায় ১৪৩৫-১৪৮৬) বাংলার সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটে। এই সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, স্থাপত্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতি হয়। সুলতানরা অন্য ধর্মের প্রতি উদার ছিলেন। মধ্যযুগের বাংলায় হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ঘটেছিল। এই বংশের একজন বিখ্যাত সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, যিনি চৈনিক সম্রাটের কাছে দূত প্রেরণ করেছিলেন এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন।
16আলাউদ্দিন হোসেন শাহ কে ছিলেন? তাঁর শাসনকেন উদার নীতি সম্পর্কে লেখো।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (রাজত্বকাল: ১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন মধ্যযুগের বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক এবং হোসেনশাহি বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর ছাব্বিশ বছরের শাসনকাল উদারনীতির জন্য বিখ্যাত। হোসেন শাহের উদার নীতির দৃষ্টান্তগুলি ছিল: ১) তাঁর রাজ্যে হিন্দুদের দেওয়া হতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ—তাঁর উজীর (প্রধানমন্ত্রী), প্রধান চিকিৎসক, প্রধান দেহরক্ষী ও টাকশালের অধ্যয়ক ছিলেন হিন্দু। ২) তিনি ধর্মীয় উদারতা ও সহিষ্ণুতার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। ৩) শ্রীচৈতন্যের ভক্ত বলে তাঁর নাম প্রচলিত ছিল—বিখ্যাত দুই বৈষ্ণব সাধক রূপ ও সনাতনের একজন হোসেনের দপ্তরে ব্যক্তিগত সচিব (দবির-ই খাস) পদ পান। ৪) সাধারণ মানুষ নাকি তাঁকে কৃষ্ণের অবতার বলে মনে করত। ৫) হোসেন শাহ বাংলা ভাষাচর্চায় ভীষণ উৎসাহী ছিলেন এবং তাঁর শাসনকালে বাংলা ভাষায় লেখালেখির চর্চা উন্নত হয়।
17বিজয়নগর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও চারটি রাজবংশের নাম লেখো।
১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সঙ্গম নামের এক ব্যক্তির ছেলেরা তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে বিজয়নগর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম হরিহর ও বুক্কা ছিলেন। ১৩৩৬ থেকে ১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিজয়নগরে মোট চারটি রাজবংশ শাসন করে: ১) সঙ্গম বংশ—প্রথম হরিহর ও বুক্কা প্রতিষ্ঠিত, প্রায় দেড়শো বছর টিকে ছিল। এই বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন দ্বিতীয় দেবরায়। ২) সালুব বংশ—সঙ্গম বংশের দুর্বল শাসক বীরূপাক্ষকে সরিয়ে নরসিংহ সালুব এই বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ৩) তুলুব বংশ—সালুব বংশের সেনাপতির ছেলে বীরসিংহ (কৃষ্ণদেব রায়) প্রতিষ্ঠা করেন। ৪) আরাবিড় বংশ—১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করে। বিজয়নগর সাম্রাজ্য ছিল দক্ষিণ ভারতের এক গৌরবময় হিন্দু সাম্রাজ্য।
18কৃষ্ণদেব রায়ের কৃতিত্ব কী ছিল?
কৃষ্ণদেব রায় (রাজত্বকাল: ১৫০৯-১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন তুলুব বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা এবং বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। তাঁর রাজত্বকালে বিজয়নগরের গৌরব সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল। তাঁর কৃতিত্বগুলি ছিল: ১) সাম্রাজ্যের বিস্তার—বিজয়নগরের সীমা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয় এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ২) শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা—তাঁর সময়ে শিল্প, সাহিত্য, সংগীত এবং দর্শনশাস্ত্রের উন্নতি হয়। ৩) সাহিত্যিক প্রতিভা—কৃষ্ণদেব রায় নিজেও একজন সাহিত্যিক ছিলেন এবং তেলুগু ভাষায় অমুক্তমাল্যদা নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে তিনি রাজার কর্তব্যের কথা লিখেছেন। ৪) স্থাপত্যকীর্তি—তাঁর আমলে বিজয়নগরের হাম্পিতে বিরূপাক্ষ মন্দির, বিট্ঠলস্বামী মন্দির প্রভৃতি অপূর্ব স্থাপত্য নির্মিত হয়। বিদেশি পর্যটকরা (পর্তুগিজ পেজ, নুনিজ, ইতালির নিকোলো কণ্টি) তাঁর সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।
19দাক্ষিণাত্যের বাহমনি রাজ্য সম্পর্কে কী জানো?
মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে হাসান গঙ্গু (যিনি আলাউদ্দিন হাসান বাহমন শাহ নাম নেন) দক্ষিণাত্যে বাহমনি রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গুলবর্গায় রাজধানী স্থাপন করে তার নাম দেন আহসনাবাদ। শাসনের সুবিধার জন্য বাহমন শাহ তাঁর রাজ্যকে চারটি প্রদেশে ভাগ করেন—গুলির্গা, দৌলতাবাদ, বেরার ও বিদর। প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়। বাহমনি বংশের সুলতান তাজউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩৯৭-১৪২২ খ্রি.) একজন বীর যোদ্ধা ও শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বাহমনি রাজ্যে দেনীয় অভিজাতদের বলা হতো দখনি এবং বাইরের থেকে আসা অভিজাতদের বলা হতো পরদেশী। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল বাহমনি রাজ্যের রাজনীতির এক বড়ো বৈশিষ্ট্য। পরবর্তীকালে বাহমনি রাজ্য ভেঙে পাঁচটি ছোটো সালতানাতে পরিণত হয়—বিজাপুর, আহমেদনগর, গোলকোণ্ডা, বিদর ও আহমদনগর।
20দিল্লি সুলতানদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেমন ছিল?
দিল্লি সুলতানদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল তাদের শাসনের অন্যতম ভিত্তি। প্রথম দিকে সুলতানি শাসন সম্পূর্ণরূপে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। সুলতানরা ধীরে ধীরে একটি সুসংহত, কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তোলেন। ইকতা ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন জয় করা রাজ্যগুলি সামরিক নেতাদের (ইকতাদার/মুকতি) হাতে অর্পণ করা হতো। ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে রুমি কৌশল ব্যবহার করেন, যা ছিল একটি বিশেষ ধরনের অশ্বারোহী যুদ্ধকৌশল। বাবরের সেনাবাহিনীতে ছিল গোলন্দাজ বাহিনী (কামানের ব্যবহার), যা ছিল ভারতে এক নতুন সামরিক প্রযুক্তি। সুলতানি সামরিক বাহিনীতে ঘোড়ার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। আলাউদ্দিন খলজি একটি বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং তার ভরণপোষণের জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।
21সুলতানি আমলে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের কী নিয়ম ছিল? এর পরিণতি কী হতো?
দিল্লি সুলতানি আমলে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের কোনো সাধারণ নিয়মনীতি ছিল না। কোনো সুলতান মারা গেলে তাঁর পরে কে সিংহাসনে বসবেন, তা নিয়ে প্রায়ই সমস্যা দেখা দিত। ইলতুৎমিশের মৃত্যুর (১২৩৬ খ্রি.) পর থেকে আলাউদ্দিন খলজির সিংহাসনে বসার সময়ের (১২৯৬ খ্রি.) মধ্যে ষাট বছরে দশ জন সুলতান দিল্লিতে শাসন করেছিলেন। এর পরিণতি মারাত্মক ছিল: ১) ঘন ঘন শাসক বদল হতো, যা প্রশাসনের স্থায়ীত্ব নষ্ট করত। ২) শাসনের ভিত নড়বড়ে হয়ে থাকত। ৩) অভিজাতরা বিদ্রোহ করে আগের সুলতানের বংশধরকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই শাসক হয়ে বসতেন—এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছিল (যেমন বলবন, জালালউদ্দিন খলজি)। ৪) সাধারণত ক্ষমতাশালী সেনাপতি বা অভিজাত যিনি, তিনিই শেষপর্যন্ত সুলতানের পদ লাভ করতেন। উত্তরাধিকারের এই অনিশ্চয়তা ছিল সুলতানি শাসনের একটি বড়ো দুর্বলতা।
22দিল্লি সুলতানের সঙ্গে অভিজাতদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
দিল্লি সুলতানের সঙ্গে অভিজাতদের (আমির/ওমরাহ) সম্পর্ক জটিল ও দ্বন্দ্বময় ছিল। একদিকে সুলতানের ক্ষমতা অটুট রাখতে ওমরাহ ও উলেমার সমর্থন দরকার হতো, অন্যদিকে অভিজাতরা প্রায়ই সুলতানের ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতেন। যে সুলতান যত ভালোভাবে সবদিক সামলাতে পারতেন, তাঁর শাসন তত বেশিদিন টিকত। বলবনের সময় থেকে সুলতানের ক্ষমতা ও মর্যাদা বাড়তে থাকে—সুলতানের বিরোধিতা করলে কঠোর শাস্তি পেতে হতো। আলাউদ্দিনের সময় অভিজাতদের কড়া হাতে দমন করা হয় এবং তাঁদের সামাজিক মেলামেশা বা বিনা অনুমতিতে বিবাহ বন্ধ করাও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সুলতানের শাসন আলগা হয়ে পড়লেই অভিজাতদের হাতে ক্ষমতা চলে যেত—যেমন সুলতানা রাজিয়ার ক্ষেত্রে হয়েছিল। সুলতানরা নানা উপহার ও সম্মান দিয়ে অভিজাতদের পাশে রাখার চেষ্টা করতেন।
23খামস, জিজিয়া ও খারাজ কী?
দিল্লি সুলতানি আমলে রাজস্ব ব্যবস্থায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য করের প্রচলন ছিল। ১) খারাজ—এটি ছিল কৃষিজমির উপর ধার্যকৃত কর, যা সাধারণত ফসলের উৎপাদনের উপর নির্ধারিত হতো। প্রজারা এই কর ফসল কাটার পর সরকারি কোষাগারে দিতেন। ২) জিজিয়া—এটি ছিল অমুসলিম প্রজাদের (বিশেষ করে হিন্দু) উপর ধার্যকৃত একটি ধর্মীয় কর। ইসলামি রীতি অনুযায়ী মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম প্রজাদের সুরক্ষার বিনিময়ে এই কর নেওয়া হতো। ফিরোজ শাহ তুঘলক কঠোরভাবে জিজিয়া কর আদায় করতেন। ৩) খামস—এটি ছিল যুদ্ধে লুণ্ঠিত ধনসম্পদের উপর ধার্যকৃত কর। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ (২০%) সুলতানের কোষাগারে জমা দিতে হতো। এছাড়াও জাকাত নামে মুসলমানদের উপর ধর্মীয় কর ছিল, যা দানের মতো ছিল।
24পানিপথের প্রথম যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল কী ছিল?
পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে বাবর (কাবুলের শাসক ও মুঘল বংশের প্রতিষ্ঠাতা) ও ইব্রাহিম লোদি (দিল্লির শেষ লোদি সুলতান) এর মধ্যে সংঘটিত হয়। যুদ্ধের কারণ: ১) ইব্রাহিম লোদির কঠোর নীতির কারণে পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খান লোদি বাবরকে ভারত আক্রমণে আমন্ত্রণ জানান। ২) বাবরের ভারত জয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। যুদ্ধের ফলাফল: ১) ইব্রাহিম লোদি যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। ২) দিল্লি ও আগ্রায় মুঘল শাসনের সূচনা হয়। ৩) দিল্লি সুলতানি আমলের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। বাবর রুমি কৌশল নামে এক বিশেষ ধরনের অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ বাহিনীর সমন্বিত যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করেছিলেন, যা ভারতীয় যুদ্ধনীতিতে যুগান্তর আনে। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

Broad Questions - বিশদ প্রশ্নোত্তর (উত্তর সহ)

5 টি
1দিল্লি সুলতানি শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করো। সুলতানের ক্ষমতা ও মর্যাদা কেমন ছিল? ইকতা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করত?

ভূমিকা

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে কুতুবউদ্দিন আইবকের মাধ্যমে দিল্লিতে সুলতানি শাসনের সূচনা হয় এবং ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির পরাজয়ের মাধ্যমে এর অবসান ঘটে। এই প্রায় ৩২০ বছরের শাসনকালে মোট পাঁচটি রাজবংশ (মামলুক, খলজি, তুঘলক, সৈয়দ ও লোদি) শাসন করে। দিল্লি সুলতানি একটি কেন্দ্রীভূত রাজতন্ত্র ছিল, যেখানে সুলতানই ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।

সুলতানের ক্ষমতা ও মর্যাদা

সুলতানি শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সুলতান। তিনি ছিলেন যুদ্ধ, আইন, বিচার ও দেশচালনার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর আদেশ ছিল শেষ কথা। যে সুলতান যত ভালোভাবে সবদিক সামলাতে পারতেন, তাঁর শাসন তত বেশিদিন টিকত। বলবনের সময় থেকে সুলতানের ক্ষমতা ও মর্যাদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি সিজদা (সাষ্টাঙ্গে প্রণাম) ও পাইবস (পা চুম্বন) প্রথা চালু করেন, যা ছিল সুলতানের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক। সুলতানের বিরোধিতা করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো।

তবে সুলতানকে শাসন চালাতে গিয়ে অভিজাত (আমির ও ওমরাহ) ও উলেমাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হতো। যে মুহূর্তে সুলতানের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ত, তখনই অভিজাতরা বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করতেন। উত্তরাধিকারী নির্বাচনের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় ঘন ঘন শাসক পরিবর্তন হতো—ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর মাত্র ষাট বছরে দশ জন সুলতান শাসন করেন।

ইকতা ব্যবস্থা

ইকতা ব্যবস্থা ছিল দিল্লি সুলতানির শাসনব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সুলতানরা যে সব নতুন রাজ্য জয় করতেন, সেই রাজ্যগুলিকে এক একটি প্রদেশ বা ইকতা হিসেবে গণ্য করা হতো। ইকতার দায়িত্বে থাকতেন একজন সামরিক নেতা, যাকে ইকতাদার বা মুকতি বা ওয়ালি বলা হতো।

ইকতাগুলিকে ছোটো ও বড়ো—এই দুই ভাগে ভাগ করা হতো:

  • ছোটো ইকতা: এর শাসক শুধুমাত্র সামরিক দায়িত্ব পালন করতেন।
  • বড়ো ইকতা: এর শাসককে সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হতো—সেনাবাহিনীর দেখাশোনা করা, বাড়তি রাজস্ব সুলতানকে দেওয়া, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ইত্যাদি।

ইকতাদাররা সম্পূর্ণভাবে সুলতানের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। সুলতান চাইলে তাঁদের বদলি করতে বা শাস্তি দিতে পারতেন।

খলিফার অনুমোদন প্রথা

দিল্লির সুলতানরা যখন শাসন ও অধিকারের নায্যতা নিয়ে সমস্যায় পড়তেন, তখন বাগদাদের খলিফার অনুমোদন চাইতেন। ইলতুৎমিশ ১২২৯ সালে প্রথম খলিফার অনুমোদন পান। সুলতানরা নিজেদের মুদ্রায় খলিফার প্রতিনিধি বলে ঘোষণা করতেন এবং প্রতি শুক্রবারের নামাজে খলিফার নাম বলতেন। তবে বাস্তবে সুলতানরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করতেন। ফিরোজ শাহ তুঘলক ছিলেন শেষ সুলতান যিনি খলিফার অনুমোদন নেন।

উপসংহার

দিল্লি সুলতানি শাসন ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই শাসনের মাধ্যমেই ভারতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত প্রশাসনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইকতা ব্যবস্থার মতো নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী মুঘল ও অন্যান্য শাসনব্যবস্থার জন্য মডেল হিসেবে কাজ করেছিল।

2আলাউদ্দিন খলজির শাসনকালের সংস্কার ও কৃতিত্ব বিস্তারিত আলোচনা করো। তাঁর দক্ষিণ ভারত অভিযান, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক নীতির মূল্যায়ন করো।

ভূমিকা

আলাউদ্দিন খলজি (রাজত্বকাল: ১২৯৬-১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন দিল্লি সুলতানি আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী সুলতান। ১২৯০ সালে খলজি বিপ্লবের মাধ্যমে তাঁর কাকা জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজি ক্ষমতা দখল করেন এবং পরে ১২৯৬ সালে আলাউদ্দিন নিজে সুলতান হন। তাঁর শাসনকাল দিল্লি সুলতানির ইতিহাসে এক অনন্য সমৃদ্ধির যুগ হিসেবে চিহ্নিত।

দক্ষিণ ভারত অভিযান

আলাউদ্দিন ছিলেন প্রথম দিল্লির সুলতান যিনি দক্ষিণ ভারতে সুলতানি সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। তাঁর বিখ্যাত সেনাপতি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারত অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানের ধাপগুলি ছিল:

  1. দেবগিরি (যাদব): প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য ছিল দাক্ষিণাত্যের দেবগিরি রাজ্য। প্রচুর ধনসম্পদ লুণ্ঠিত হয়।
  2. ওয়ারঙ্গল (কাকতীয়): সেখান থেকে বিখ্যাত কোহিনূর হীরা সহ অগণিত ধনরত্ন নিয়ে আসা হয়।
  3. দ্বারসমুদ্র (হোয়সল): দক্ষিণের হোয়সল রাজ্য আক্রমণ করা হয়।
  4. মাদুরা (পাণ্ড্য): সর্বদক্ষিণে পাণ্ড্য রাজ্য পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়।

এই অভিযানের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী—প্রচুর ধনসম্পদ (হাতি, ঘোড়া, সোনা, হীরা) দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়, দক্ষিণের রাজারা বশ্যতা স্বীকার করেন এবং নিয়মিত কর দিতে সম্মত হন।

বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

আলাউদ্দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বিশাল সেনাবাহিনীকে কম খরচে প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করা এবং মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবিলার জন্য সেনাবাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত রাখাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

বাজার নিয়ন্ত্রণের উপাদান:

  • শাহানা-ই মাণ্ডি: বাজার তদারকির জন্য নিযুক্ত রাজকর্মচারী।
  • দিওয়ান-ই রিয়াসং: বাণিজ্য ও বাজার সম্পর্কিত দপ্তর।
  • সরকারি মূল্য নির্ধারণ: প্রতিটি দ্রব্যের সরকারি মূল্য নির্ধারিত করে দেওয়া হতো।
  • কঠোর শাস্তি: নির্ধারিত দামের বেশি নিলে বা ওজনে ঠকালে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।
  • রেশন ব্যবস্থা: প্রয়োজনের সময় প্রজাদের নির্দিষ্ট পরিমাণে খাদ্যশস্য ও রোজগারের প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করা হতো।

মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধ ও সামরিক নীতি

আলাউদ্দিনের সময় বারবার মোঙ্গল আক্রমণ হয়েছিল। তিনি মোঙ্গলদের মোকাবিলার জন্য একাধিক যুদ্ধ করেন এবং তাদের পরাজিত করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তরক্ষা মজবুত করেন। এজন্য তিনি বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং অভিজাতদের কড়া হাতে দমন করে তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেননি। অভিজাতদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা ও বিনা অনুমতিতে বিবাহ বন্ধ করাও নিষিদ্ধ ছিল, যাতে কোনো জোট সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে না পারে।

উপসংহার

আলাউদ্দিন খলজি ছিলেন একাধারে এক সফল সমরনেতা, দক্ষ প্রশাসক ও দূরদর্শী সংস্কারক। তাঁর বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইতিহাসে এক অনন্য নজির। দক্ষিণ ভারত অভিযানের মাধ্যমে সুলতানি সাম্রাজ্যের বিশাল বিস্তৃতি ঘটেছিল এবং মোঙ্গলদের মোকাবিলা করে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা গিয়েছিল। তবে তাঁর কঠোর নীতি ও সন্দেহপ্রবণতা অভিজাতদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল।

3মহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকালের পরিকল্পনা ও সংস্কারসমূহ বিশদে আলোচনা করো। কেন তাঁকে বিতর্কিত শাসক বলা হয়? ফিরোজ শাহ তুঘলকের সংস্কারের সঙ্গে তুলনা করো।

ভূমিকা

মহম্মদ বিন তুঘলক (রাজত্বকাল: ১৩২৪-১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন দিল্লি সুলতানি ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষিত, জ্ঞানী অথচ সবচেয়ে বিতর্কিত শাসক। তিনি একাধারে দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ ও ভাষাবিদ ছিলেন। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে ইতিহাসে পাগলা রাজা বলা হয়েছে।

রাজধানী স্থানান্তর

সুলতানের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল রাজধানী স্থানান্তর। দিল্লির অধিবাসীদের বিরোধিতা ও মোঙ্গল আক্রমণের ভয় থেকে রক্ষা পেতে এবং দক্ষিণাত্যকে আরও ভালোভাবে শাসন করতে তিনি দেবগিরিতে (দৌলতাবাদ) রাজধানী স্থানান্তর করেন। দিল্লি থেকে সমস্ত অধিবাসী ও সেনাবাহিনীকে দৌলতাবাদে যেতে বাধ্য করা হয়, যেখানে পথে অনেক মানুষ প্রাণ হারান। পরে বাস্তবতার চাপে আবার রাজধানী দিল্লিতে ফিরিয়ে আনা হয়।

তামার মুদ্রা (Token Currency)

সোনা ও রূপোর ঘাটতি মেটাতে মহম্মদ বিন তুঘলক তামার তৈরি কৃত্রিম মূল্যের মুদ্রা চালু করেন। কিন্তু তিনি জাল-রোধী কোনো ব্যবস্থা নেননি। ফলে দেশ-বিদেশে ব্যাপক হারে তামার মুদ্রা জাল হতে থাকে। জাল মুদ্রা তোলার জন্য রাজকোষ থেকে প্রচুর সোনা ও রূপোর মুদ্রা ব্যয় হয়। শেষ পর্যন্ত এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

দোয়াবে কর বৃদ্ধি

বিশাল সেনাবাহিনীর ব্যয় নির্বাহের জন্য দোয়াব (গঙ্গা-যমুনা মধ্যবর্তী উর্বর অঞ্চল) অঞ্চলে কৃষিজমির উপর অতিরিক্ত কর বসানো হয়। কিন্তু সেই সময় অনাবৃষ্টির ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং প্রজারা কর দিতে পারেনি। তারা বিদ্রোহ করে। পরে সুলতান কর মকুব করেন এবং ক্ষতিপূরণ দেন, কিন্তু ততদিনে অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল।

সাধারণ মানুষকে উচ্চপদে নিয়োগ

অভিজাতদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মহম্মদ বিন তুঘলক কয়েকজন অযোগ্য সাধারণ মানুষকে প্রশাসনের উচ্চপদে বসান—একজন মদ ব্যবসায়ী, একজন নাপিত, একজন পাচক ও দুজন মালীকে রাজকর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। অভিজাতদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ বেড়ে যায়।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের সংস্কার

মহম্মদ বিন তুঘলকের উত্তরসূরি ফিরোজ শাহ তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮) ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত প্রকৃতির শাসক। তিনি ইসলামীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে শাসন পরিচালনা করতেন। তাঁর সংস্কারগুলি ছিল:

  • রাজস্ব সংস্কার—শুধু ইসলামসম্মত কর আদায়, অন্যান্য কর বাতিল।
  • নগর, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল নির্মাণ।
  • দরিদ্রদের সাহায্য ও বেকারদের চাকরির বন্দোবস্ত।
  • সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাল খনন।

তবে তিনি একজন সফল সামরিক নেতা ছিলেন না এবং সুলতানি শাসনের বাইরে চলে যাওয়া অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধার করতে পারেননি।

উপসংহার

মহম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন এক বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী শাসক। তাঁর পরিকল্পনাগুলি ছিল যুগান্তকারী ও দূরদর্শী, কিন্তু বাস্তবায়নে ত্রুটি ও সময়-অপেক্ষার অভাবে সেগুলি ব্যর্থ হয়। আজকের দিনেও কোনো বড়ো প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মহম্মদ বিন তুঘলকের ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।

4বাংলায় ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি শাসন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো। এই সময়ে বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মীয় সমন্বয় কীভাবে বিকশিত হয়েছিল?

ভূমিকা

১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসন ছিল, যা ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি বংশ নামে পরিচিত। এই সময়কাল ছিল বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় যখন সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য ও ধর্মীয় সমন্বয়ের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল।

ইলিয়াসশাহি শাসন (১৩৪২-১৪১৪/১৫ ও পুনরায় ১৪৩৫-১৪৮৬)

শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সালে লখনৌতির সিংহাসন দখল করে স্বাধীন ইলিয়াসশাহি শাসনের সূচনা করেন। তিনি বাংলার তিনটি প্রধান রাজ্য লখনৌতি, সাতগাঁ ও সোনারগাঁ জয় করে বাংলাকে একত্রিত করেন এবং পূর্ব বঙ্গ ও কামরূপ পর্যন্ত শাসনের বিস্তার ঘটান। এই বংশের বিখ্যাত সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ চৈনিক সম্রাটের কাছে দূত পাঠিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। রাজা গণেশের সময়ে কিছু বছর ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, পরে পুনরায় ইলিয়াসশাহি বংশ ফিরে আসে।

হোসেনশাহি শাসন (১৪৯৩-১৫৩৮)

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন মধ্য যুগের বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর ছাব্বিশ বছরের শাসনকাল (১৪৯৩-১৫১৯) উদার নীতির জন্য বিখ্যাত। তাঁর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল:

  • ধর্মীয় উদারতা: তাঁর রাজ্যে হিন্দুদের দেওয়া হতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ—তাঁর উজীর, প্রধান চিকিৎসক, প্রধান দেহরক্ষী ও টাকশালের অধ্যয়ক্ষ ছিলেন হিন্দু।
  • বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি সম্মান: শ্রীচৈতন্যের প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল বলে জানা যায়। বিখ্যাত দুই বৈষ্ণব সাধক রূপ ও সনাতনের একজন তাঁর দপ্তরে ব্যক্তিগত সচিব (দবির-ই খাস) পদ পান। সাধারণ মানুষ তাঁকে কৃষ্ণের অবতার মনে করত।
  • বাংলা ভাষাচর্চায় উৎসাহ: হোসেন শাহ বাংলা ভাষায় লেখালেখির চর্চায় ভীষণ উৎসাহী ছিলেন এবং তাঁর শাসনকালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ঘটেছিল।
  • ভদ্র ও বিনয়ী স্বভাব: সকল ধর্মের প্রতি তাঁর সমান শ্রদ্ধা ছিল।

সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মীয় সমন্বয়

ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি আমলে বাংলার সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি ঘটে। এই সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল:

  1. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ: সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষায় লেখালেখির চর্চা অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করে।
  2. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা: হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। সুলতানরা ধর্মীয় বিষয়ে উদার ছিলেন।
  3. শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন: এই সময়েই বাংলায় শ্রীচৈতন্যের নেতৃত্বে ভক্তিবাদের প্রচার শুরু হয়।
  4. স্থাপত্য ও শিল্প: মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য স্থাপত্য নির্মিত হয়।
  5. সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান: হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটেছিল, যা বাংলার নিজস্ব সমন্বয়ী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হয়।

উপসংহার

ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি আমল ছিল বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ। বিশেষ করে হোসেন শাহের উদার নীতি, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও বাংলা ভাষার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা পরবর্তীকালের বাংলার সংস্কৃতি গঠনে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছিল। এই সময়ের ধর্মীয় সমন্বয়ের চেতনাই বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।

5দাক্ষিণাত্যের বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের উত্থান ও পতনের ইতিহাস আলোচনা করো। এই দুই রাজ্যের মধ্যে সংঘর্ষ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পরিচয় দাও।

ভূমিকা

মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে দিল্লি সুলতানি শাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ ভারতে দুটি শক্তিশালী রাজ্যের উত্থান ঘটে—হিন্দু বিজয়নগর সাম্রাজ্য ও মুসলিম বাহমনি রাজ্য। এই দুই রাজ্যের মধ্যকার সম্পর্ক কখনো সংঘর্ষময় আবার কখনো সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নজির বহন করে।

বিজয়নগর রাজ্যের ইতিহাস

১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সঙ্গমের পুত্র প্রথম হরিহর ও বুক্কা তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে বিজয়নগর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩৩৬ থেকে ১৬৪৫ পর্যন্ত চারটি রাজবংশ—সঙ্গম, সালুব, তুলুব ও আরাবিড়—শাসন করে। তুলুব বংশের কৃষ্ণদেব রায় (১৫০৯-১৫২৯) ছিলেন বিজয়নগরের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট।

বৈশিষ্ট্য:

  • কৃষি ছিল প্রধান জীবিকা, উন্নত সেচ ব্যবস্থা ছিল।
  • ভূমি রাজস্ব ছিল রাজ্যের প্রধান আয়।
  • পর্তুগিজদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।
  • শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের উন্নতি ঘটেছিল।

বিদেশি পর্যটকরা (নিকোলো কণ্টি, আব্দুর রাজ্জাক, পেজ ও নুনিজ) বিজয়নগরের অপার সম্পদ ও সমৃদ্ধির বর্ণনা লিখেছেন। নগরটি সাতটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল।

বাহমনি রাজ্যের ইতিহাস

১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে হাসান গঙ্গু আলাউদ্দিন হাসান বাহমন শাহ নাম নিয়ে দাক্ষিণাত্যে বাহমনি রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। রাজধানী ছিল গুলবর্গা (আহসনাবাদ)। শাসনের সুবিধার জন্য রাজ্য চারটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল—গুলির্গা, দৌলতাবাদ, বেরার ও বিদর।

বৈশিষ্ট্য:

  • দখনি (স্থানীয়) ও পরদেশী (বহিরাগত) অভিজাতদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল রাজনীতির বড়ো বৈশিষ্ট্য।
  • তাজউদ্দিন ফিরোজ শাহ ছিলেন এক বীর যোদ্ধা ও শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক।
  • পরবর্তীকালে বাহমনি রাজ্য পাঁচটি ছোটো সালতানাতে বিভক্ত হয়—বিজাপুর, আহমেদনগর, গোলকোণ্ডা, বিদর ও আহমদনগর।

বাহমনি রাজ্যের দরবারেও ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। মাহমুদ গাওয়ান ছিলেন বাহমনি রাজ্যের বিখ্যাত উজির।

সংঘর্ষ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়

বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের মধ্যে ক্রমাগত সংঘর্ষ চলত, বিশেষ করে রায়চুর দোয়াব (কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর অঞ্চল) নিয়ে। তবে এটি কোনো ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল না, বরং ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের লড়াই।

সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রমাণ:

  1. বিজয়নগরের শাসকরা নিজেদের হিন্দু রাইদের মধ্যে সুলতান বলতেন।
  2. রাজা দ্বিতীয় দেবরায় নিজের বাহিনীর জন্য তুর্কি যুদ্ধপদ্ধতি আমদানি করেন।
  3. উভয় রাজ্যের শাসকরাই একে অপরের প্রশাসনিক রীতিনীতি গ্রহণ করেছিলেন।
  4. বাণিজ্যের মাধ্যমে দুটি রাজ্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান চলত।

উপসংহার

বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের ইতিহাস শিক্ষা দেয় যে, ধর্মীয় ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে দুই রাজ্যের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহযোগিতা—দুটোই চলেছিল। একে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা ইতিহাসের সরলীকরণ হবে। বরং এটি ছিল মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনিবার্য ফল।

মনে রেখো!

দিল্লি সুলতানি শাসনের এই অধ্যায় থেকে শেখার আছে অনেক কিছু—রাজিয়ার নারী নেতৃত্বের সাহস, আলাউদ্দিনের বাজার নিয়ন্ত্রণের দূরদর্শিতা, মহম্মদ বিন তুঘলকের পরিকল্পনার সফলতা ও ব্যর্থতার শিক্ষা, এবং হোসেন শাহের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিটি ঘটনার পিছনের কারণ ও ফলাফল বুঝে পড়লে ইতিহাস হয়ে উঠবে জীবন্ত এক শিক্ষণীয় গল্প!

Sponsored Links

Class 7 History Chapter 4 - সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর

Science Tips-এ স্বাগত! WBBSE Class 7 History-র চতুর্থ অধ্যায় "দিল্লি সুলতানি : তুর্কো-আফগান শাসন"-র A+++ মানের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা। এই অধ্যায় থেকে তুমি পাবে—পাঁচটি রাজবংশের (মামলুক, খলজি, তুঘলক, সৈয়দ, লোদি) ইতিহাস, ইলতুৎমিশ ও রাজিয়ার শাসন, বলবনের সংস্কার, আলাউদ্দিন খলজির দক্ষিণ ভারত অভিযান ও বাজার নিয়ন্ত্রণ, মহম্মদ বিন তুঘলকের বিতর্কিত পরিকল্পনা (রাজধানী স্থানান্তর, তামার মুদ্রা), ইবন বতুতার বর্ণনা, ইকতা ব্যবস্থা, বাংলার ইলিয়াসশাহি ও হোসেনশাহি শাসন, দাক্ষিণাত্যে বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের উত্থান, এবং পানিপথের যুদ্ধ। সকল উত্তর দৃশ্যমান—কোনো বোতাম টিপতে হবে না! পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে আজই পড়া শুরু করো!

Frequently Asked Questions

ক্লাস ৭ ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায়ের নাম 'দিল্লি সুলতানি : তুর্কো-আফগান শাসন'। এই অধ্যায়ে ১২০৬ থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত দিল্লির পাঁচটি রাজবংশের (মামলুক, খলজি, তুঘলক, সৈয়দ, লোদি) ইতিহাস এবং বাংলা ও দাক্ষিণাত্যের আঞ্চলিক রাজ্যগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

দিল্লি সুলতানি আমলে মোট পাঁচটি রাজবংশ শাসন করেছিল: ১) মামলুক বা দাস বংশ (১২০৬-১২৯০ খ্রি.)—কুতুবউদ্দিন আইবক, ইলতুৎমিশ, রাজিয়া, বলবন। ২) খলজি বংশ (১২৯০-১৩২০ খ্রি.)—জালালউদ্দিন খলজি, আলাউদ্দিন খলজি। ৩) তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১২ খ্রি.)—মহম্মদ বিন তুঘলক, ফিরোজ শাহ তুঘলক। ৪) সৈয়দ বংশ (১৪১৪-১৪৫১ খ্রি.)—খিজির খান। ৫) লোদি বংশ (১৪৫১-১৫২৬ খ্রি.)—বহলোল লোদি, সিকান্দর লোদি, ইব্রাহিম লোদি।

আলাউদ্দিন খলজি বিশাল সেনাবাহিনীকে কম খরচে প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহের জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেন। সরকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হতো এবং বেশি দাম নিলে বা ওজনে ঠকালে কঠোর শাস্তি হতো। শাহানা-ই মাণ্ডি ও দিওয়ান-ই রিয়াসং নামে রাজকর্মচারী নিয়োগ করে বাজার তদারকি করা হতো।

মহম্মদ বিন তুঘলকের পরিকল্পনাগুলি ছিল দূরদর্শী কিন্তু বাস্তবায়ন ত্রুটিপূর্ণ। রাজধানী দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে স্থানান্তর করতে গিয়ে পথে অনেক মানুষ প্রাণ হারান। তামার মুদ্রা চালু করে জাল-রোধী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিপর্যয় ঘটে। দোয়াবে অনাবৃষ্টির সময় অতিরিক্ত কর বসালে প্রজারা বিদ্রোহ করে। দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো ও জনমতের সমর্থন ছাড়া বড়ো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন—এটাই তাঁর শিক্ষা।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) মধ্যযুগের বাংলার শ্রেষ্ঠ শাসকদের একজন। তাঁর উজীর, প্রধান চিকিৎসক ও টাকশালের অধ্যয়ক্ষ ছিলেন হিন্দু। শ্রীচৈতন্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল এবং বৈষ্ণব সাধক রূপ-সনাতনকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ মানুষ তাঁকে কৃষ্ণের অবতার মনে করত। বাংলা ভাষাচর্চায় তিনি ভীষণ উৎসাহী ছিলেন।