প্রাক্কথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর | 15 MCQ | 10 SAQ | 4 Broad Questions
আবিষ্কারের যুগ
পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক — মুদ্রণ ও জলপথ আবিষ্কার
রেনেসাঁস
মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ ও শিল্পের নবজাগরণ
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
15 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
10 টিউত্তর:
সামন্ততন্ত্র ছিল একই সঙ্গে একটি কৃষিব্যবস্থা ও সামরিক সংগঠন। জমি ছিল এর ভিত্তি। পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে একটি অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ দুটি পক্ষের মধ্যে যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠত, তাকেই এককথায় সামন্ততন্ত্র বলে। এর গড়ন ছিল পিরামিডের মতো (উপরে রাজা এবং নীচে ভূমিদাস বা সার্ফ)।
উত্তর:
রেনেসাঁস (Renaissance) বা নবজাগরণ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল 'পুনর্জন্ম'। চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইতালীয় মানুষেরা ধ্রুপদি গ্রিক ও রোমান যুগের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির যে পুনর্বাসন ঘটিয়েছিলেন, তাকেই নবজাগরণ বলা হয়। এর মূল ভিত্তি ছিল মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদ।
উত্তর:
মানবতাবাদ হল অসহায়ভাবে ঈশ্বর নির্ভরতার পরিবর্তে মানুষের নিজস্ব শক্তি ও সত্তার ওপর আস্থা। মানুষের মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সার্বিক মঙ্গল ও উন্নতির প্রতি বিশ্বাসই হল মানবতাবাদ। ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভার সদ্ব্যবহার করে যুক্তিবাদী মন নিয়ে জগতকে দেখাই ছিল মানবতাবাদীদের লক্ষ্য।
উত্তর:
লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি ছিলেন ইতালির নবজাগরণ যুগের একজন বিস্ময়কর শিল্পী, ভাস্কর, স্থপতি এবং বিজ্ঞানী। তাঁর ভুবনজয়ী দুটি বিখ্যাত চিত্রশিল্প হল “মোনালিসা” (Mona Lisa) এবং “দ্য লাস্ট সাপার” (The Last Supper)।
উত্তর:
ইটালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যালিলিয়ো গ্যালিলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি টেলিস্কোপ যন্ত্র আবিষ্কার করে প্রমাণ করেন যে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ সূর্যের চারিদিকে ঘোরে। এ ছাড়াও তিনি বস্তুর গতি, দোলকের সূত্র এবং চাঁদের উপরিভাগের গঠন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
উত্তর:
জার্মানির মেইন্জ শহরে ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে জোহানেস গুটেনবার্গ সর্বপ্রথম আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন।
সুফল: মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের ফলে বই সহজলভ্য হয় এবং শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। সাধারণ মানুষ সহজে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করার সুযোগ পায়।
উত্তর:
ভৌগোলিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্যগুলি ছিল: ১) প্রাচ্য দেশের (বিশেষত ভারতের) মশলার সন্ধান লাভ ও সরাসরি জলপথে বাণিজ্য স্থাপন, ২) খ্রিস্টধর্মের প্রচার, এবং ৩) অজানাকে জানার দুর্নিবার আগ্রহ ও নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার।
উত্তর:
মেরিনার কম্পাস হল একটি দিক নির্ণায়ক যন্ত্র (যাতে একটি চৌম্বক সূচক থাকে)। সামুদ্রিক অভিযানের সময় নাবিকদের দিকভ্রান্ত না হয়ে সঠিক পথ নির্ণয়ে এবং বিপদবহুল অঞ্চল থেকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছোতে এই যন্ত্র অপরিহার্য ভূমিকা পালন করত।
উত্তর:
জাতি-রাষ্ট্র বলতে বোঝায় এমন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র যা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী একই ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পন্ন একটি জাতির ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন প্রভৃতি দেশে জাতি-রাষ্ট্রের প্রাথমিক উত্তরণ ঘটেছিল।
উত্তর:
সপ্তদশ শতককে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বিপ্লবের শতক বলা হয়। কারণ, এই শতকে স্টুয়ার্ট রাজাদের স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রজারা বিদ্রোহ করে। রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ হয় এবং ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে গৌরবময় বিপ্লবের (Glorious Revolution) মাধ্যমে রাজক্ষমতা সংকুচিত করে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
4 টিরেনেসাঁস বা নবজাগরণ
রেনেসাঁস (Renaissance) কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল পুনর্জন্ম। চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইউরোপে (বিশেষত ইতালিতে) জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পকলায় যে অভূতপূর্ব উন্নতি ও যুক্তিবাদী চেতনার বিকাশ ঘটেছিল, তাকেই নবজাগরণ বলা হয়। এটি ছিল মধ্যযুগের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে ধ্রুপদি গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্যের নবমূল্যায়ন।
মানবতাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য
নবজাগরণের প্রাণভোমরা ছিল মানবতাবাদ (Humanism)। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল:
- মানবকেন্দ্রিক বিশ্বধারণা: মধ্যযুগে ঈশ্বর ও ধর্মই ছিল সবকিছুর কেন্দ্র। কিন্তু মানবতাবাদীরা মানুষকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন। মানুষের ইহজাগতিক সুখ, দুঃখ ও মর্যাদাই হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচ্য।
- যুক্তিবাদ ও স্বাধীন চিন্তা: অন্ধভাবে চার্চের নির্দেশ মেনে নেওয়ার পরিবর্তে মানুষ নিজস্ব বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতে শুরু করে।
- অতীতের পুনরুদ্ধার: মানবতাবাদীরা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ধ্রুপদি সাহিত্য (যথা প্লেটো, অ্যারিস্টট্ল, সিসেরো-র রচনা) গভীরভাবে অধ্যয়ন করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীর সন্ধান করেন।
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ: মানবতাবাদীদের মতে, ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে নিজস্ব কিছু প্রতিভা দিয়েছেন এবং সেই প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোই মানুষের প্রধান কর্তব্য।
- শিল্প ও সাহিত্যে প্রভাব: দান্তে, পেত্রার্ক প্রমুখের সাহিত্যে এবং লিওনার্দো, মাইকেল এঞ্জেলো-র শিল্পকর্মে ঐশ্বরিক মহিমার বদলে বাস্তব মানবজীবনের প্রতিফলন ঘটে।
আবিষ্কারের যুগ
পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতককে বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক বিপ্লবের কারণে “আবিষ্কারের যুগ” বলা হয়। এই সময়ে একদিকে মুদ্রণযন্ত্র, বারুদ, কম্পাস ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়, অন্যদিকে কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, ম্যাগেলান প্রমুখ নাবিকরা নতুন মহাদেশ ও বাণিজ্যপথ আবিষ্কার করেন।
মুদ্রণযন্ত্রের প্রভাব
১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে জোহানেস গুটেনবার্গ আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন। এর প্রভাব ছিল যুগান্তকারী:
- শিক্ষার সম্প্রসারণ: আগে বই হাতে লেখা হত বলে তা দুষ্প্রাপ্য ও মহার্ঘ ছিল। মুদ্রণযন্ত্রের ফলে বই খুব সহজে ও কম খরচে ছাপা হতে থাকে, ফলে সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে যায়।
- জ্ঞানের বিস্তার: জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও নতুন চিন্তাধারা দ্রুত ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
- মতামত প্রকাশ: মানুষ নিজের মতামত স্বাধীনভাবে ছাপিয়ে প্রকাশ করার সুযোগ পায়।
যুদ্ধ প্রযুক্তির প্রভাব
এই যুগে বারুদ, আধুনিক কামান ও বন্দুক (মাস্কেট) আবিষ্কৃত হয়।
- রণকৌশলে পরিবর্তন: সাবেকি মারণাস্ত্র (তির, বর্শা, তলোয়ার) অকেজো হয়ে পড়ে এবং কামানের গোলা থেকে বাঁচতে দুর্গের নির্মাণরীতিতে বদল আসে।
- সামন্ততন্ত্রের পতন: আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর কাছে সামন্তপ্রভুদের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী পরাস্ত হয়, যা রাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ
পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতকে ইউরোপীয়দের বিশ্বপরিক্রমা বা সামুদ্রিক অভিযানের প্রধান কারণগুলি ছিল:
- বাণিজ্যিক স্বার্থ: প্রাচ্য দেশের (বিশেষত ভারতের) মশলা, সিল্ক ও অন্যান্য বিলাসবহুল পণ্যের ইউরোপে বিপুল চাহিদা ছিল। ইতালীয় ও আরব বণিকদের মধ্যস্থতা এড়িয়ে সরাসরি বাণিজ্যের জন্য নতুন জলপথের সন্ধান জরুরি হয়ে পড়ে।
- ধর্মীয় প্রেরণা: নতুন আবিষ্কৃত দেশগুলিতে খ্রিস্টধর্মের প্রচার করাও একটি বড়ো উদ্দেশ্য ছিল।
- অজানাকে জানার আগ্রহ: নবজাগরণের ফলে মানুষের মনে অজানাকে জানার ও নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের এক দুর্নিবার কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
- প্রযুক্তির উন্নতি: মেরিনার কম্পাস (দিক নির্ণায়ক যন্ত্র), শক্তিশালী সামুদ্রিক জাহাজ (ক্যারভেল) এবং উন্নত মানচিত্র সামুদ্রিক অভিযানকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছিল।
ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলাফল
ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর ইতিহাস এক নতুন যুগে প্রবেশ করে:
- ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে কলম্বাস আমেরিকা এবং ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো-দা-গামা ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন।
- ইউরোপের বাজারে অজস্র নতুন পণ্যের (যেমন- আলু, তামাক, ভুট্টা) আমদানি হয়। বিশ্ববাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
- ইউরোপীয় দেশগুলি (বিশেষত স্পেন, পোর্তুগাল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স) এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে।
জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব
মধ্যযুগে ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্র বলতে কিছু ছিল না, পুরোটাই ছিল খণ্ডিত সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অধীন। কিন্তু পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতকে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসীরা যখন একই ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করে, তখন তাকে জাতি-রাষ্ট্র বলে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন ও পোর্তুগালে এর প্রাথমিক উত্তরণ ঘটেছিল।
চূড়ান্ত রাজতন্ত্রের বিকাশ
জাতি-রাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে চূড়ান্ত বা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন হয়:
- ইংল্যান্ড: ষষ্ঠদশ শতকে টিউডর বংশের রাজারা (যেমন- অষ্টম হেনরি ও রানি এলিজাবেথ) রাজক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করেন। অষ্টম হেনরি পোপের অধীনতা ছিন্ন করে ইংল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্রে উন্নীত করেন।
- ফ্রান্স: একাদশ লুই ও অষ্টম চার্লসের আমলে ফ্রান্সের ঐক্য সম্পূর্ণ হয় এবং একটি কেন্দ্রীভূত শক্তিশালী রাজতন্ত্র গড়ে ওঠে। ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই তো সদর্পে বলতেন, “রাষ্ট্র কী? আমিই রাষ্ট্র” (I am the State)।
রাজতন্ত্রের সংকট
সপ্তদশ শতকে এই চূড়ান্ত রাজতন্ত্র প্রবল সংকটের মুখে পড়ে, বিশেষত ইংল্যান্ডে। স্টুয়ার্ট বংশের রাজাদের (যেমন প্রথম চার্লস) স্বেচ্ছাচারিতার ফলে ইংল্যান্ডে প্রজাবিদ্রোহ ঘটে এবং শেষপর্যন্ত ১৬৮৮ সালের “গৌরবময় বিপ্লব”-এর মাধ্যমে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে সংসদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
মনে রেখো!
রোম সাম্রাজ্যের পতন: ৪৭৬ খ্রি. | মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার: ১৪৫০ খ্রি. (গুটেনবার্গ) | আমেরিকা আবিষ্কার: ১৪৯২ খ্রি. (কলম্বাস) | ভারতের জলপথ: ১৪৯৮ খ্রি. (ভাস্কো-দা-গামা) | গৌরবময় বিপ্লব (ইংল্যান্ড): ১৬৮৮ খ্রি.