প্রাক্কথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ (Europe and the Modern Age)

সামন্ততন্ত্রের পতন, নবজাগরণ ও মানবতাবাদ, আবিষ্কারের যুগ (মুদ্রণযন্ত্র ও ভৌগোলিক আবিষ্কার), আধুনিক বিজ্ঞান এবং জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 10 March 2026 Last Update: 31 May 2026
প্রাক্কথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ | WBBSE Class 9 History

প্রাক্কথন: ইউরোপ ও আধুনিক যুগ

সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর | 15 MCQ | 10 SAQ | 4 Broad Questions

নবজাগরণ মানবতাবাদ মুদ্রণযন্ত্র ভৌগোলিক আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞান
🌍

আবিষ্কারের যুগ

পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক — মুদ্রণ ও জলপথ আবিষ্কার

🎨

রেনেসাঁস

মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ ও শিল্পের নবজাগরণ

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

15 টি
1. রোমান সাম্রাজ্যের পতন কবে ঘটেছিল?
ক) ক) ৪০০ খ্রিস্টাব্দে
খ) খ) ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে
গ) গ) ৮০০ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ঘ) ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে
ব্যাখ্যা: ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যের পতন হলেও এবং ইউরোপের প্রশাসনিক ঐক্য ভেঙে পড়লেও রোম সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য ও সুনাম অক্ষুণ্ণ ছিল।
2. খ্রিস্ট জগতের প্রধান পোপ তৃতীয় লিও কাকে ৮০০ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র রোমান সম্রাট পদে অভিষিক্ত করেন?
ক) ক) জুলিয়াস সিজার
খ) খ) শার্লামেন
গ) গ) প্রথম চার্লস
ঘ) ঘ) চতুর্দশ লুই
ব্যাখ্যা: মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ সম্রাট শার্লামেন ইউরোপের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে সাম্রাজ্যের পুনরুত্থান ঘটান। পোপ তৃতীয় লিও তাঁকে ৮০০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর মুকুট পরিয়ে পবিত্র রোমান সম্রাট পদে অভিষিক্ত করেন।
3. সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর একেবারে নীচের স্তরে কারা ছিল?
ক) ক) রাজা
খ) খ) ডিউক
গ) গ) নাইট
ঘ) ঘ) সার্ফ বা ভূমিদাস
ব্যাখ্যা: সামন্ততন্ত্রের গড়ন ছিল অনেকটা পিরামিডের মতো। এর সর্বোচ্চ স্তরে ছিলেন রাজা। তার নীচের বিভিন্ন স্তরে ছিলেন ডিউক, আর্ল, ব্যারন, নাইট। সবার নীচে ছিল সার্ফ বা জমিতে আবদ্ধ ভূমিদাস, যাদের স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না।
4. রেনেসাঁস বা নবজাগরণ কথাটির আক্ষরিক অর্থ কী?
ক) ক) পুনর্জন্ম
খ) খ) নতুন যুগ
গ) গ) যুক্তিবাদ
ঘ) ঘ) আবিষ্কার
ব্যাখ্যা: রেনেসাঁস (Renaissance) বা নবজাগরণ কথাটির অভিধানিক বা আক্ষরিক অর্থ হল পুনর্জন্ম। চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইতালীয় মানুষ অতীত ধ্রুপদি যুগের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনর্বাসন ঘটিয়েছিলেন।
5. “মোনালিসা” চিত্রটি কার আঁকা?
ক) ক) রাফায়েল
খ) খ) মাইকেল এঞ্জেলো
গ) গ) লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি
ঘ) ঘ) ব্রামোন্টো
ব্যাখ্যা: নবজাগরণ যুগের বিস্ময়কর শিল্পী ছিলেন লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি। তাঁর ভুবনজয়ী কয়েকটি চিত্রশিল্প কীর্তি হল “দ্য ভার্জিন অব দ্য রক্স”, “দ্য লাস্ট সাপার” এবং “মোনালিসা”।
6. “মোজেস” ও “ডেভিড” নামক শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য দুটি কার সৃষ্টি?
ক) ক) লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি
খ) খ) মাইকেল এঞ্জেলো
গ) গ) রাফায়েল
ঘ) ঘ) দান্তে
ব্যাখ্যা: মাইকেল এঞ্জেলো নবজাগরণ যুগের একজন বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন। তাঁর তৈরি দুটি শ্রেষ্ঠকীর্তি হল “মোজেস” ও “ডেভিড”। তিনি রোমে সেন্ট পিটার চার্চের চূড়ায় নকশাও তৈরি করেন।
7. আধুনিক বিজ্ঞানের জনক কাকে বলা হয়?
ক) ক) কোপারনিকাস
খ) খ) নিউটন
গ) গ) গ্যালিলিয়ো গ্যালিলি
ঘ) ঘ) কেপলার
ব্যাখ্যা: ইটালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতশাস্ত্রের অধ্যাপক গ্যালিলিয়ো গ্যালিলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি টেলিস্কোপ যন্ত্র, দোলকের সূত্র ও পতনশীল বস্তুর সূত্র আবিষ্কার করেন।
8. সর্বপ্রথম আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র কে আবিষ্কার করেন?
ক) ক) উইলিয়াম ক্যাক্সটন
খ) খ) জোহানেস গুটেনবার্গ
গ) গ) কলম্বাস
ঘ) ঘ) ফ্রান্সিস বেকন
ব্যাখ্যা: জার্মানির মেইন্জ শহরে ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে জোহানেস গুটেনবার্গ সর্বপ্রথম আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন। তাঁকে সাহায্য করেছিলেন জোহানেস ফাস্ট ও পিটার সোয়েফার।
9. ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কোন পোর্তুগিজ নাবিক ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন?
ক) ক) ক্রিস্টোফার কলম্বাস
খ) খ) আমেরিগো ভেসপুচি
গ) গ) ভাস্কো-দা-গামা
ঘ) ঘ) ম্যাগেলান
ব্যাখ্যা: সামুদ্রিক অভিযান ও নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিল পোর্তুগাল ও স্পেন। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পোর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা ভারতে আসার পথ আবিষ্কার করেন।
10. কে সর্বপ্রথম জলপথে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন?
ক) ক) ম্যাগেলান
খ) খ) কলম্বাস
গ) গ) ভাস্কো-দা-গামা
ঘ) ঘ) বালবোয়া
ব্যাখ্যা: নাবিক ফার্দিন্যান্দ ম্যাগেলান সর্বপ্রথম জলপথে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন এবং প্রমাণ করেন যে পৃথিবী গোলাকার।
11. আমেরিকা মহাদেশ কে আবিষ্কার করেন?
ক) ক) আমেরিগো ভেসপুচি
খ) খ) ক্রিস্টোফার কলম্বাস
গ) গ) ভাস্কো-দা-গামা
ঘ) ঘ) ম্যাগেলান
ব্যাখ্যা: ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারতে আসার বিকল্প পথ আবিষ্কার করতে গিয়ে আকস্মিকভাবে আমেরিকায় উপস্থিত হন। পরে আমেরিগো ভেসপুচির নামানুসারে এর নাম হয় আমেরিকা।
12. “রাষ্ট্র কী? আমিই রাষ্ট্র” — এই বিখ্যাত উক্তিটি কার?
ক) ক) অষ্টম চার্লস
খ) খ) প্রথম চার্লস
গ) গ) চতুর্দশ লুই
ঘ) ঘ) অষ্টম হেনরি
ব্যাখ্যা: ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ রাজা চতুর্দশ লুই সদর্পে বলতেন, “রাষ্ট্র কী? আমিই রাষ্ট্র” (I am the State)। তখনকার দিনে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রে জনগণের কার্যত কোনো ভূমিকা ছিল না, রাজাই ছিলেন সর্বময় কর্তা।
13. ইংল্যান্ডে গৌরবময় বিপ্লব কবে সংঘটিত হয়?
ক) ক) ১৬০০ খ্রি.
খ) খ) ১৬৪৮ খ্রি.
গ) গ) ১৬৮৮ খ্রি.
ঘ) ঘ) ১৭৮৯ খ্রি.
ব্যাখ্যা: স্টুয়ার্ট রাজ দ্বিতীয় জেমসের আমলে রাজতন্ত্র ও প্রজার মধ্যে সংঘাত শুরু হয় এবং ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে গৌরবময় বিপ্লবের মাধ্যমে ইংল্যান্ডে রাজক্ষমতা সংকুচিত হয়।
14. মেরিনার কম্পাস (দিক নির্ণায়ক যন্ত্র) প্রথম কোন দেশে আবিষ্কৃত হয়?
ক) ক) ইটালি
খ) খ) স্পেন
গ) গ) চিন
ঘ) ঘ) ভারত
ব্যাখ্যা: দিকনির্ণায়ক যন্ত্র বা মেরিনার কম্পাস প্রথম আবিষ্কার করা হয় চিন দেশের হান বংশের আমলে (২০৬ খ্রি. পূর্ব)। সামুদ্রিক অভিযানের ক্ষেত্রে এই যন্ত্র নাবিকদের সঠিক পথ নির্ণয়ে সাহায্য করেছিল।
15. কোন শতককে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বিপ্লবের শতক বলে অভিহিত করা হয়?
ক) ক) পঞ্চদশ শতক
খ) খ) ষষ্ঠদশ শতক
গ) গ) সপ্তদশ শতক
ঘ) ঘ) অষ্টাদশ শতক
ব্যাখ্যা: সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে চূড়ান্ত রাজতন্ত্রের সংকট দেখা দেয়। স্টুয়ার্ট রাজাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে রাজার সঙ্গে প্রজাদের বিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ ও ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লবের কারণে সপ্তদশ শতককে বিপ্লবের শতক বলা হয়।

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

10 টি
1. 👑 সামন্ততন্ত্র বলতে কী বোঝায়?

উত্তর:

সামন্ততন্ত্র ছিল একই সঙ্গে একটি কৃষিব্যবস্থা ও সামরিক সংগঠন। জমি ছিল এর ভিত্তি। পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে একটি অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ দুটি পক্ষের মধ্যে যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠত, তাকেই এককথায় সামন্ততন্ত্র বলে। এর গড়ন ছিল পিরামিডের মতো (উপরে রাজা এবং নীচে ভূমিদাস বা সার্ফ)।

2. 👑 নবজাগরণ বা রেনেসাঁস কথাটির অর্থ কী?

উত্তর:

রেনেসাঁস (Renaissance) বা নবজাগরণ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল 'পুনর্জন্ম'। চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইতালীয় মানুষেরা ধ্রুপদি গ্রিক ও রোমান যুগের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির যে পুনর্বাসন ঘটিয়েছিলেন, তাকেই নবজাগরণ বলা হয়। এর মূল ভিত্তি ছিল মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদ।

3. 👑 মানবতাবাদ (Humanism) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর:

মানবতাবাদ হল অসহায়ভাবে ঈশ্বর নির্ভরতার পরিবর্তে মানুষের নিজস্ব শক্তি ও সত্তার ওপর আস্থা। মানুষের মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সার্বিক মঙ্গল ও উন্নতির প্রতি বিশ্বাসই হল মানবতাবাদ। ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভার সদ্ব্যবহার করে যুক্তিবাদী মন নিয়ে জগতকে দেখাই ছিল মানবতাবাদীদের লক্ষ্য।

4. 👑 লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি কে ছিলেন? তাঁর দুটি বিখ্যাত চিত্রশিল্পের নাম লেখো।

উত্তর:

লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি ছিলেন ইতালির নবজাগরণ যুগের একজন বিস্ময়কর শিল্পী, ভাস্কর, স্থপতি এবং বিজ্ঞানী। তাঁর ভুবনজয়ী দুটি বিখ্যাত চিত্রশিল্প হল “মোনালিসা” (Mona Lisa) এবং “দ্য লাস্ট সাপার” (The Last Supper)।

5. 👑 আধুনিক বিজ্ঞানের জনক কাকে বলা হয় এবং কেন?

উত্তর:

ইটালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যালিলিয়ো গ্যালিলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি টেলিস্কোপ যন্ত্র আবিষ্কার করে প্রমাণ করেন যে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ সূর্যের চারিদিকে ঘোরে। এ ছাড়াও তিনি বস্তুর গতি, দোলকের সূত্র এবং চাঁদের উপরিভাগের গঠন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

6. 👑 মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার কবে এবং কে করেন? এর একটি সুফল লেখো।

উত্তর:

জার্মানির মেইন্জ শহরে ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে জোহানেস গুটেনবার্গ সর্বপ্রথম আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন।
সুফল: মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের ফলে বই সহজলভ্য হয় এবং শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। সাধারণ মানুষ সহজে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করার সুযোগ পায়।

7. 👑 পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতকে ভৌগোলিক অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?

উত্তর:

ভৌগোলিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্যগুলি ছিল: ১) প্রাচ্য দেশের (বিশেষত ভারতের) মশলার সন্ধান লাভ ও সরাসরি জলপথে বাণিজ্য স্থাপন, ২) খ্রিস্টধর্মের প্রচার, এবং ৩) অজানাকে জানার দুর্নিবার আগ্রহ ও নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার।

8. 👑 মেরিনার কম্পাস কী কাজে লাগত?

উত্তর:

মেরিনার কম্পাস হল একটি দিক নির্ণায়ক যন্ত্র (যাতে একটি চৌম্বক সূচক থাকে)। সামুদ্রিক অভিযানের সময় নাবিকদের দিকভ্রান্ত না হয়ে সঠিক পথ নির্ণয়ে এবং বিপদবহুল অঞ্চল থেকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছোতে এই যন্ত্র অপরিহার্য ভূমিকা পালন করত।

9. 👑 জাতি-রাষ্ট্র (Nation-State) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর:

জাতি-রাষ্ট্র বলতে বোঝায় এমন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র যা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী একই ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পন্ন একটি জাতির ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন প্রভৃতি দেশে জাতি-রাষ্ট্রের প্রাথমিক উত্তরণ ঘটেছিল।

10. 👑 ইংল্যান্ডের ইতিহাসে কোন শতককে “বিপ্লবের শতক” বলা হয় এবং কেন?

উত্তর:

সপ্তদশ শতককে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বিপ্লবের শতক বলা হয়। কারণ, এই শতকে স্টুয়ার্ট রাজাদের স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রজারা বিদ্রোহ করে। রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ হয় এবং ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে গৌরবময় বিপ্লবের (Glorious Revolution) মাধ্যমে রাজক্ষমতা সংকুচিত করে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর

4 টি
1. নবজাগরণ বা রেনেসাঁস বলতে কী বোঝো? ইউরোপে নবজাগরণ যুগের মানবতাবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

রেনেসাঁস বা নবজাগরণ

রেনেসাঁস (Renaissance) কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল পুনর্জন্ম। চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইউরোপে (বিশেষত ইতালিতে) জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পকলায় যে অভূতপূর্ব উন্নতি ও যুক্তিবাদী চেতনার বিকাশ ঘটেছিল, তাকেই নবজাগরণ বলা হয়। এটি ছিল মধ্যযুগের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে ধ্রুপদি গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্যের নবমূল্যায়ন।

মানবতাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য

নবজাগরণের প্রাণভোমরা ছিল মানবতাবাদ (Humanism)। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল:

  1. মানবকেন্দ্রিক বিশ্বধারণা: মধ্যযুগে ঈশ্বর ও ধর্মই ছিল সবকিছুর কেন্দ্র। কিন্তু মানবতাবাদীরা মানুষকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন। মানুষের ইহজাগতিক সুখ, দুঃখ ও মর্যাদাই হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচ্য।
  2. যুক্তিবাদ ও স্বাধীন চিন্তা: অন্ধভাবে চার্চের নির্দেশ মেনে নেওয়ার পরিবর্তে মানুষ নিজস্ব বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে সবকিছু বিচার করতে শুরু করে।
  3. অতীতের পুনরুদ্ধার: মানবতাবাদীরা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ধ্রুপদি সাহিত্য (যথা প্লেটো, অ্যারিস্টট্ল, সিসেরো-র রচনা) গভীরভাবে অধ্যয়ন করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীর সন্ধান করেন।
  4. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ: মানবতাবাদীদের মতে, ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে নিজস্ব কিছু প্রতিভা দিয়েছেন এবং সেই প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোই মানুষের প্রধান কর্তব্য।
  5. শিল্প ও সাহিত্যে প্রভাব: দান্তে, পেত্রার্ক প্রমুখের সাহিত্যে এবং লিওনার্দো, মাইকেল এঞ্জেলো-র শিল্পকর্মে ঐশ্বরিক মহিমার বদলে বাস্তব মানবজীবনের প্রতিফলন ঘটে।
2. পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতককে “আবিষ্কারের যুগ” বলা হয় কেন? মুদ্রণযন্ত্র ও যুদ্ধ প্রযুক্তির আবিষ্কার কীভাবে সমাজকে প্রভাবিত করেছিল?

আবিষ্কারের যুগ

পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতককে বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক বিপ্লবের কারণে “আবিষ্কারের যুগ” বলা হয়। এই সময়ে একদিকে মুদ্রণযন্ত্র, বারুদ, কম্পাস ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়, অন্যদিকে কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, ম্যাগেলান প্রমুখ নাবিকরা নতুন মহাদেশ ও বাণিজ্যপথ আবিষ্কার করেন।

মুদ্রণযন্ত্রের প্রভাব

১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে জোহানেস গুটেনবার্গ আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন। এর প্রভাব ছিল যুগান্তকারী:

  • শিক্ষার সম্প্রসারণ: আগে বই হাতে লেখা হত বলে তা দুষ্প্রাপ্য ও মহার্ঘ ছিল। মুদ্রণযন্ত্রের ফলে বই খুব সহজে ও কম খরচে ছাপা হতে থাকে, ফলে সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে যায়।
  • জ্ঞানের বিস্তার: জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও নতুন চিন্তাধারা দ্রুত ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
  • মতামত প্রকাশ: মানুষ নিজের মতামত স্বাধীনভাবে ছাপিয়ে প্রকাশ করার সুযোগ পায়।

যুদ্ধ প্রযুক্তির প্রভাব

এই যুগে বারুদ, আধুনিক কামান ও বন্দুক (মাস্কেট) আবিষ্কৃত হয়।

  • রণকৌশলে পরিবর্তন: সাবেকি মারণাস্ত্র (তির, বর্শা, তলোয়ার) অকেজো হয়ে পড়ে এবং কামানের গোলা থেকে বাঁচতে দুর্গের নির্মাণরীতিতে বদল আসে।
  • সামন্ততন্ত্রের পতন: আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর কাছে সামন্তপ্রভুদের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী পরাস্ত হয়, যা রাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
3. ইউরোপে সামুদ্রিক অভিযান ও ভৌগোলিক আবিষ্কারের প্রধান কারণগুলি কী ছিল? এর ফলাফল কী হয়েছিল?

ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ

পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতকে ইউরোপীয়দের বিশ্বপরিক্রমা বা সামুদ্রিক অভিযানের প্রধান কারণগুলি ছিল:

  1. বাণিজ্যিক স্বার্থ: প্রাচ্য দেশের (বিশেষত ভারতের) মশলা, সিল্ক ও অন্যান্য বিলাসবহুল পণ্যের ইউরোপে বিপুল চাহিদা ছিল। ইতালীয় ও আরব বণিকদের মধ্যস্থতা এড়িয়ে সরাসরি বাণিজ্যের জন্য নতুন জলপথের সন্ধান জরুরি হয়ে পড়ে।
  2. ধর্মীয় প্রেরণা: নতুন আবিষ্কৃত দেশগুলিতে খ্রিস্টধর্মের প্রচার করাও একটি বড়ো উদ্দেশ্য ছিল।
  3. অজানাকে জানার আগ্রহ: নবজাগরণের ফলে মানুষের মনে অজানাকে জানার ও নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের এক দুর্নিবার কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
  4. প্রযুক্তির উন্নতি: মেরিনার কম্পাস (দিক নির্ণায়ক যন্ত্র), শক্তিশালী সামুদ্রিক জাহাজ (ক্যারভেল) এবং উন্নত মানচিত্র সামুদ্রিক অভিযানকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছিল।

ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলাফল

ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর ইতিহাস এক নতুন যুগে প্রবেশ করে:

  • ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে কলম্বাস আমেরিকা এবং ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো-দা-গামা ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন।
  • ইউরোপের বাজারে অজস্র নতুন পণ্যের (যেমন- আলু, তামাক, ভুট্টা) আমদানি হয়। বিশ্ববাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
  • ইউরোপীয় দেশগুলি (বিশেষত স্পেন, পোর্তুগাল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স) এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে।
4. ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্রের (Nation-State) উদ্ভব এবং চূড়ান্ত রাজতন্ত্রের (Absolute Monarchy) বিকাশ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব

মধ্যযুগে ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্র বলতে কিছু ছিল না, পুরোটাই ছিল খণ্ডিত সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অধীন। কিন্তু পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতকে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসীরা যখন একই ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করে, তখন তাকে জাতি-রাষ্ট্র বলে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন ও পোর্তুগালে এর প্রাথমিক উত্তরণ ঘটেছিল।

চূড়ান্ত রাজতন্ত্রের বিকাশ

জাতি-রাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে চূড়ান্ত বা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন হয়:

  • ইংল্যান্ড: ষষ্ঠদশ শতকে টিউডর বংশের রাজারা (যেমন- অষ্টম হেনরি ও রানি এলিজাবেথ) রাজক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করেন। অষ্টম হেনরি পোপের অধীনতা ছিন্ন করে ইংল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্রে উন্নীত করেন।
  • ফ্রান্স: একাদশ লুই ও অষ্টম চার্লসের আমলে ফ্রান্সের ঐক্য সম্পূর্ণ হয় এবং একটি কেন্দ্রীভূত শক্তিশালী রাজতন্ত্র গড়ে ওঠে। ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই তো সদর্পে বলতেন, “রাষ্ট্র কী? আমিই রাষ্ট্র” (I am the State)।

রাজতন্ত্রের সংকট

সপ্তদশ শতকে এই চূড়ান্ত রাজতন্ত্র প্রবল সংকটের মুখে পড়ে, বিশেষত ইংল্যান্ডে। স্টুয়ার্ট বংশের রাজাদের (যেমন প্রথম চার্লস) স্বেচ্ছাচারিতার ফলে ইংল্যান্ডে প্রজাবিদ্রোহ ঘটে এবং শেষপর্যন্ত ১৬৮৮ সালের “গৌরবময় বিপ্লব”-এর মাধ্যমে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে সংসদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

মনে রেখো!

রোম সাম্রাজ্যের পতন: ৪৭৬ খ্রি. | মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার: ১৪৫০ খ্রি. (গুটেনবার্গ) | আমেরিকা আবিষ্কার: ১৪৯২ খ্রি. (কলম্বাস) | ভারতের জলপথ: ১৪৯৮ খ্রি. (ভাস্কো-দা-গামা) | গৌরবময় বিপ্লব (ইংল্যান্ড): ১৬৮৮ খ্রি.

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

রেনেসাঁস (Renaissance) কথাটির অর্থ হল পুনর্জন্ম। চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতকে ইউরোপে (বিশেষ করে ইতালিতে) প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতির যে পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল এবং মানুষের মধ্যে মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদের প্রসার ঘটেছিল, তাকেই নবজাগরণ বলা হয়।

ইটালির বিজ্ঞানী গ্যালিলিয়ো গ্যালিলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি টেলিস্কোপ যন্ত্র আবিষ্কার করে মহাকাশ সম্পর্কে নতুন ধারণা দেন এবং প্রমাণ করেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।

এই যুগে জোহানেস গুটেনবার্গ আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন, যা শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব আনে। পাশাপাশি মেরিনার কম্পাসের সাহায্যে কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, ম্যাগেলান প্রমুখ নাবিকরা সামুদ্রিক অভিযানের মাধ্যমে নতুন দেশ ও জলপথ আবিষ্কার করেন। তাই এই সময়কে আবিষ্কারের যুগ বলা হয়।