Chapter 3: ঊনবিংশ শতকের ইউরোপ (রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাত)

ফরাসি বিপ্লব ১৮৩০ ও ১৮৪৮, জুলাই রাজতন্ত্র, দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র, ইটালির ঐক্য আন্দোলন (ম্যাৎসিনি, গারিবাল্ডি, কাভুর), জার্মানির ঐক্য আন্দোলন (বিসমার্ক), ক্রিমিয়ার যুদ্ধ | সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ঘটনাপঞ্জি

Sahina Sabnam
Sahina Sabnam
Uploaded: 10 March 2026 Last Update: 31 May 2026
Chapter 3: ঊনবিংশ শতকের ইউরোপ - রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাত

Chapter 3: ঊনবিংশ শতকের ইউরোপ রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাত

সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর | 41 MCQ | 18 SAQ | 4 Broad Questions | 15 Timeline Events

জুলাই বিপ্লব ১৮৩০ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ১৮৪৮ ইটালির ঐক্য জার্মানির ঐক্য ক্রিমিয়ার যুদ্ধ বিসমার্ক
🇫🇷

ফরাসি বিপ্লব ১৮৩০-১৮৪৮

জুলাই রাজতন্ত্র থেকে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র

🇮🇹

ইটালির ঐক্য

রিসর্জিমেন্তো — ম্যাৎসিনি, কাভুর, গারিবাল্ডি

🇩🇪

জার্মানির ঐক্য

বিসমার্কের লৌহ ও রক্ত — তিনটি যুদ্ধ

⚔️

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ

রাশিয়ার পরাজয় — প্যারিস চুক্তি ১৮৫৬

📅 ঘটনাপঞ্জি (Timeline) — ১৮০৪-১৮৭১

15 টি
১৮০৪
সার্বিয়ার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন শুরু
১৮১৪
প্যারিসের প্রথম চুক্তি — নেপোলিয়নের প্রথম পতন
১৮১৫
ভিয়েনা সম্মেলন শুরু | ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পরাজয়
১৮১৯
অস্ট্রিয়া কর্তৃক কার্লসবাদ ডিক্রি প্রবর্তন | জোলভারেইন (জার্মান শুল্ক সংঘ) গঠন
১৮২০
ট্রপো কংগ্রেস — নেপলসের বিপ্লব দমনে অস্ট্রিয়াকে ম্যান্ডেট
১৮২৪
গ্রিসের স্বাধীনতা স্বীকৃত (আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮৩০)
১৮৩০
ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব | স্বাধীন বেলজিয়াম রাষ্ট্রের জন্ম
১৮৪৮
ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব — দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র | মেটারনিখের পতন
১৮৫৩-৫৬
ক্রিমিয়ার যুদ্ধ — রাশিয়ার পরাজয় | ১৮৫৬-র প্যারিস চুক্তি
১৮৬১
জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার কর্তৃক ভূমিদাস প্রথার অবসান | ইটালির রাজা ঘোষিত ভিক্টর ইমানুয়েল
১৮৬৪
ডেনমার্কের বিরুদ্ধে প্রাশিয়া-অস্ট্রিয়ার যুদ্ধ
১৮৬৬
অস্ট্রো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ (স্যাডোভা) — অস্ট্রিয়ার পরাজয় | ভেনিসিয়া ইটালির অন্তর্ভুক্ত
১৮৭০
ইটালি কর্তৃক রোম দখল — ইটালির ঐক্য সম্পূর্ণ
১৮৭০-৭১
ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ — ফ্রান্সের পরাজয়
১৮৭১
১৮ জানুয়ারি: ভার্সাই প্রাসাদে জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা | ফ্রাঙ্কফুর্ট চুক্তি

MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর

41 টি
1. ১৮৩০ সালে ফ্রান্সে কোন বিপ্লব সংঘটিত হয়?
ক) ক) ফেব্রুয়ারি বিপ্লব
খ) খ) জুলাই বিপ্লব
গ) গ) অক্টোবর বিপ্লব
ঘ) ঘ) জুন বিপ্লব
ব্যাখ্যা: ১৮৩০ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব (July Revolution) সংঘটিত হয়। এই বিপ্লবের মাধ্যমে বুরবোঁ রাজবংশের পতন ঘটে এবং লুই ফিলিপের নেতৃত্বে জুলাই রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
2. জুলাই বিপ্লবের পর ফ্রান্সের রাজা কে হন?
ক) ক) অষ্টাদশ লুই
খ) খ) দশম চার্লস
গ) গ) লুই ফিলিপ
ঘ) ঘ) তৃতীয় নেপোলিয়ন
ব্যাখ্যা: জুলাই বিপ্লবের (১৮৩০) পর ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন লুই ফিলিপ (Louis Philippe)। তিনি বুরবোঁ রাজবংশের পরিবর্তে অর্লিয়েন্স রাজবংশের সদস্য ছিলেন। তার শাসনকাল জুলাই রাজতন্ত্র (July Monarchy) নামে পরিচিত।
3. জুলাই রাজতন্ত্রের পতন ঘটে কোন বিপ্লবের মাধ্যমে?
ক) ক) ১৮৩০-এর জুলাই বিপ্লব
খ) খ) ১৮৪৮-এর ফেব্রুয়ারি বিপ্লব
গ) গ) ১৮৭১-এর প্যারি কমিউন
ঘ) ঘ) ১৮১৫-র ওয়াটারলু যুদ্ধ
ব্যাখ্যা: ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের (February Revolution) মাধ্যমে জুলাই রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। এই বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। লুই ফিলিপ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
4. জুলাই রাজতন্ত্র কত বছর স্থায়ী ছিল?
ক) ক) ১০ বছর
খ) খ) ১৫ বছর
গ) গ) ১৮ বছর
ঘ) ঘ) ২৫ বছর
ব্যাখ্যা: জুলাই রাজতন্ত্র ১৮৩০ থেকে ১৮৪৮ পর্যন্ত মোট ১৮ বছর স্থায়ী ছিল। লুই ফিলিপের শাসনকালে ফ্রান্সে শিল্পবিপ্লবের প্রভাব, অর্থনৈতিক সংকট এবং ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার কারণে এই রাজতন্ত্রের পতন ঘটে।
5. কে বলেছিলেন 'রাজতন্ত্রের সমর্থনে ফ্রান্স ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়েছিল'?
ক) ক) ম্যাৎসিনি
খ) খ) লা-মার্টিন
গ) গ) কাভুর
ঘ) ঘ) গারিবাল্ডি
ব্যাখ্যা: লা-মার্টিন (Lamartine) — ফরাসি কবি ও রাজনীতিবিদ — বলেছিলেন: 'রাজতন্ত্রের সমর্থনে ফ্রান্স ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়েছিল'। তিনি ১৮৪৮ সালের বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের অস্থায়ী সরকারের প্রধান ছিলেন।
6. ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মূল কারণ কী ছিল?
ক) ক) ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা
খ) খ) ভোটাধিকার সংস্কারের দাবি ও অর্থনৈতিক সংকট
গ) গ) বৈদেশিক আক্রমণ
ঘ) ঘ) কৃষি উন্নয়ন
ব্যাখ্যা: ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মূল কারণ ছিল: (i) ভোটাধিকার সংস্কার ও সম্প্রসারণের দাবি, (ii) অর্থনৈতিক সংকট ও বেকার সমস্যা, (iii) রাজা লুই ফিলিপের রক্ষণশীল নীতি, (iv) শিল্পবিপ্লবের ফলে শ্রমিকদের দুরবস্থা। প্রধানমন্ত্রী গিজো ভোটাধিকার সংস্কারের দাবি প্রত্যাখ্যান করলে বিপ্লব শুরু হয়।
7. ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮-এর ঘটনা কী ছিল?
ক) ক) রাজার অভিষেক
খ) খ) গিজোর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ ও গুলিবর্ষণ — ২৩ জন নিহত
গ) গ) শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর
ঘ) ঘ) নির্বাচন অনুষ্ঠান
ব্যাখ্যা: ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮: ফরাসি জনতা প্রধানমন্ত্রী গিজোর পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভ দেখায়। গিজোর বাড়ির সামনে সেনাবাহিনী নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে — ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হন। এই ঘটনা প্যারিসে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং বিপ্লব তীব্রতর হয়।
8. ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ফ্রান্সে কী প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ক) তৃতীয় প্রজাতন্ত্র
খ) খ) দ্বিতীয় সাম্রাজ্য
গ) গ) দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র
ঘ) ঘ) জুলাই রাজতন্ত্র
ব্যাখ্যা: ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ফ্রান্সে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র (Second Republic) প্রতিষ্ঠিত হয়। লুই নেপোলিয়ন (পরে তৃতীয় নেপোলিয়ন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৮৫২ সালে তিনি প্রজাতন্ত্রের বিলোপ ঘটিয়ে দ্বিতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
9. ইটালির ঐক্য আন্দোলন কী নামে পরিচিত?
ক) ক) রেনেসাঁ
খ) খ) রিসর্জিমেন্তো
গ) গ) এনলাইটেনমেন্ট
ঘ) ঘ) রিফর্মেশন
ব্যাখ্যা: ইটালির ঐক্য আন্দোলন 'রিসর্জিমেন্তো' (Risorgimento) নামে পরিচিত — যার অর্থ 'পুনর্জাগরণ' বা 'পুনরুত্থান'। ঊনবিংশ শতকে ইটালির বিভিন্ন রাজ্যগুলিকে একত্রিত করে একটি ঐক্যবদ্ধ ইটালি রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনই রিসর্জিমেন্তো। ম্যাৎসিনি, কাভুর, গারিবাল্ডি ছিলেন এই আন্দোলনের প্রধান নেতা।
10. মেটারনিখ ইটালিকে কী বলে বর্ণনা করেছিলেন?
ক) ক) একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র
খ) খ) একটি ভৌগোলিক সংজ্ঞামাত্র (A Geographical Expression)
গ) গ) ইউরোপের হৃদয়
ঘ) ঘ) সভ্যতার কেন্দ্র
ব্যাখ্যা: অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর মেটারনিখ (Metternich) ইটালিকে 'একটি ভৌগোলিক সংজ্ঞামাত্র' (A Geographical Expression) বলে বর্ণনা করেছিলেন। কারণ ঊনবিংশ শতকের গোড়ায় ইটালি ৮টি আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল — কোনো দেশ বা জাতি হিসেবে এর অস্তিত্ব ছিল না।
11. ইয়ং ইটালি (Young Italy) দলের প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক) ক) কাভুর
খ) খ) গারিবাল্ডি
গ) গ) জোসেফ ম্যাৎসিনি
ঘ) ঘ) ভিক্টর ইমানুয়েল
ব্যাখ্যা: জোসেফ ম্যাৎসিনি (Giuseppe Mazzini) ১৮৩১ সালে 'ইয়ং ইটালি' (Young Italy/নব্য ইটালি) নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী দল গঠন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন — শিক্ষাপ্রচার, আত্মত্যাগ ও কাজের মধ্য দিয়ে ইটালিবাসীর মনে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করতে হবে। তাঁর মতে — 'কেবল সমগ্র ইটালি, ঐক্যবদ্ধ ইটালির জন্যই বিশ্বাস করো।'
12. ইয়ং ইটালি দলের পতাকায় কী লেখা ছিল?
ক) ক) স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব
খ) খ) স্বাধীনতা ও ঐক্য / গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবতা
গ) গ) ঈশ্বর ও জাতি
ঘ) ঘ) একতা ও শক্তি
ব্যাখ্যা: ইয়ং ইটালি দলের পতাকার একদিকে লেখা ছিল 'স্বাধীনতা ও ঐক্য' এবং অপরদিকে লেখা ছিল 'গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবতা'। ম্যাৎসিনির আদর্শ ছিল — ঐক্যবদ্ধ ইটালি গঠন, যেখানে প্রাদেশিকতা বা আঞ্চলিকতার কোনো স্থান থাকবে না।
13. কার্বোর্নারি (Carbonari) কী?
ক) ক) ইটালির গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি
খ) খ) জার্মানির ছাত্র সংগঠন
গ) গ) ফ্রান্সের রাজনৈতিক দল
ঘ) ঘ) রাশিয়ার কৃষক সংগঠন
ব্যাখ্যা: কার্বোর্নারি (Carbonari) ছিল ইটালির একটি গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি — বিদেশি শাসন ও দমন নীতির প্রতিবাদে গঠিত। কিন্তু কয়েকটি কারণে তা ব্যর্থ হলে ম্যাৎসিনি ইয়ং ইটালি দল গঠন করেন। কার্বোর্নারির গঠন ও কার্যপদ্ধতি ছিল অত্যন্ত গোপনীয়।
14. সার্ডিনিয়া-পিডমন্টের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন যিনি ইটালির ঐক্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন?
ক) ক) ম্যাৎসিনি
খ) খ) গারিবাল্ডি
গ) গ) কাউন্ট কাভুর
ঘ) ঘ) ভিক্টর ইমানুয়েল
ব্যাখ্যা: কাউন্ট কামিল্লো দি কাভুর (Count Camillo di Cavour) ছিলেন সার্ডিনিয়া-পিডমন্টের প্রধানমন্ত্রী। তিনি কূটনীতি, সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাধ্যমে ইটালির ঐক্য আন্দোলনকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যান। ১৮৫৯ সালে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি ফ্রান্সের সাহায্য লাভ করেন।
15. 'লাল জামা' বাহিনীর নেতা কে ছিলেন?
ক) ক) কাভুর
খ) খ) ম্যাৎসিনি
গ) গ) গারিবাল্ডি
ঘ) ঘ) ভিক্টর ইমানুয়েল
ব্যাখ্যা: জুসেপ্পে গারিবাল্ডি (Giuseppe Garibaldi) — 'লাল জামা' (Red Shirts) নামে পরিচিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতা ছিলেন। ১৮৬০ সালে তিনি মাত্র ১০০০ সৈন্য নিয়ে সিসিলি ও নেপলস জয় করেন এবং দক্ষিণ ইটালি ভিক্টর ইমানুয়েলের হাতে তুলে দেন — ইটালির ঐক্যে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম।
16. ইটালির ঐক্য সম্পূর্ণ হয় কত সালে?
ক) ক) ১৮৪৮
খ) খ) ১৮৬১
গ) গ) ১৮৭০
ঘ) ঘ) ১৮৭১
ব্যাখ্যা: ইটালির ঐক্য সম্পূর্ণ হয় ১৮৭০ সালে। এই বছর ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধের সুযোগে ইটালি রোম দখল করে এবং রোমকে ইটালির রাজধানী ঘোষণা করে। ১৮৬১ সালে ভিক্টর ইমানুয়েল ইটালির রাজা ঘোষিত হলেও রোম ও ভেনিসিয়া তখনও ইটালির অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ১৮৬৬ সালে ভেনিসিয়া ও ১৮৭০ সালে রোম যুক্ত হলে ঐক্য সম্পূর্ণ হয়।
17. জার্মানির ঐক্য আন্দোলনের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক) ক) মেটারনিখ
খ) খ) প্রথম উইলিয়াম
গ) গ) অটো ফন বিসমার্ক
ঘ) ঘ) নেপোলিয়ন তৃতীয়
ব্যাখ্যা: অটো ফন বিসমার্ক (Otto von Bismarck) — প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী — 'লৌহ ও রক্ত' (Blood and Iron) নীতির মাধ্যমে জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন করেন। তিনি ১৮৬২ সালে প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং টানা ২৮ বছর এই পদে ক্ষমতাসীন ছিলেন। তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি জার্মানির ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন।
18. বিসমার্কের 'লৌহ ও রক্ত' নীতি কী?
ক) ক) শান্তিপূর্ণ কূটনীতি
খ) খ) সামরিক শক্তি ও যুদ্ধের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন
গ) গ) অর্থনৈতিক উন্নয়ন
ঘ) ঘ) সাংস্কৃতিক ঐক্য
ব্যাখ্যা: 'লৌহ ও রক্ত' (Blood and Iron) নীতি ছিল বিসমার্কের সামরিক শক্তি ও যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানির ঐক্য অর্জনের কৌশল। তিনি সংসদে বলেছিলেন: 'আজকের মহান সমস্যাগুলি বক্তৃতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্ত দ্বারা নয়, বরং লৌহ ও রক্ত দ্বারা সমাধান করা হবে।'
19. জার্মানির ঐক্যের পথে প্রথম যুদ্ধ কোনটি?
ক) ক) ক্রিমিয়ার যুদ্ধ
খ) খ) ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৪)
গ) গ) অস্ট্রো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ (১৮৬৬)
ঘ) ঘ) ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ (১৮৭০-৭১)
ব্যাখ্যা: জার্মানির ঐক্যের পথে প্রথম যুদ্ধ ছিল ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৪)। বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার সাহায্যে ডেনমার্ককে পরাজিত করে হলস্টেইন ও শ্লেসভিগ অঞ্চল দুটি দখল করেন। পরে অস্ট্রিয়ার সাথে হলস্টেইনকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি করে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাত তৈরি করেন।
20. স্যাডোভার যুদ্ধ (১৮৬৬) কাদের মধ্যে সংঘটিত হয়?
ক) ক) ফ্রান্স ও প্রাশিয়া
খ) খ) প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া
গ) গ) ইটালি ও অস্ট্রিয়া
ঘ) ঘ) রাশিয়া ও তুরস্ক
ব্যাখ্যা: স্যাডোভার যুদ্ধ (Battle of Sadowa/Königgrätz) ১৮৬৬ সালে প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে অস্ট্রিয়া পরাজিত হয় এবং জার্মান রাষ্ট্রজোট থেকে অস্ট্রিয়াকে বাদ দেওয়া হয়। প্রাগের চুক্তির মাধ্যমে উত্তর জার্মান কনফেডারেশন গঠিত হয় — যা ছিল জার্মানির ঐক্যের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
21. এমস টেলিগ্রাম ঘটনা কী?
ক) ক) শান্তি প্রস্তাব
খ) খ) ফ্রান্স ও প্রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধের অজুহাত সৃষ্টিকারী কূটনৈতিক ঘটনা
গ) গ) বাণিজ্য চুক্তি
ঘ) ঘ) গোপন সমঝোতা
ব্যাখ্যা: এমস টেলিগ্রাম (Ems Telegram) ছিল একটি কূটনৈতিক ঘটনা যা ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধের (১৮৭০-৭১) সূত্রপাত ঘটায়। স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে ফ্রান্স ও প্রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনার সময় বিসমার্ক রাজা প্রথম উইলিয়ামের পাঠানো টেলিগ্রাম বিকৃত করে প্রকাশ করেন — যা ফ্রান্সকে অপমানিত করে এবং ফ্রান্স যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
22. জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হয় কত সালে?
ক) ক) ১৮৪৮
খ) খ) ১৮৬৬
গ) গ) ১৮৭১
ঘ) ঘ) ১৯১৪
ব্যাখ্যা: জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হয় ১৮৭১ সালে। ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ের পর ১৮ জানুয়ারি ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে প্রথম উইলিয়ামকে জার্মান সম্রাট (Kaiser) ঘোষণা করা হয়। প্রাশিয়ার নেতৃত্বে সমগ্র জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স আলসাস ও লোরেন অঞ্চল জার্মানিকে দিতে বাধ্য হয়।
23. ক্রিমিয়ার যুদ্ধ কত সালে সংঘটিত হয়?
ক) ক) ১৮৪৮-১৮৫০
খ) খ) ১৮৫৩-১৮৫৬
গ) গ) ১৮৬৪-১৮৬৬
ঘ) ঘ) ১৮৭০-১৮৭১
ব্যাখ্যা: ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (Crimean War) ১৮৫৩-১৮৫৬ সালে সংঘটিত হয়। একদিকে ছিল রাশিয়া, অন্যদিকে ছিল তুরস্ক, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও সার্ডিনিয়ার সম্মিলিত বাহিনী। ১৮৫৬ সালে প্যারিসের চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং রাশিয়া পরাজিত হয়।
24. ক্রিমিয়ার যুদ্ধের মূল কারণ কী ছিল?
ক) ক) ধর্মীয় বিরোধ
খ) খ) তুরস্ক সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়ার আগ্রাসী নীতি
গ) গ) বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা
ঘ) ঘ) উপনিবেশ দখলের লড়াই
ব্যাখ্যা: ক্রিমিয়ার যুদ্ধের মূল কারণ ছিল তুরস্ক (অটোমান) সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর জন্য রাশিয়ার 'উষ্ণ জল নীতি' (Warm Water Policy)। জেরুজালেমের পবিত্র স্থানসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে বিরোধ এবং তুরস্কের ওপর রাশিয়ার চাপ যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
25. রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার কত সালে ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটান?
ক) ক) ১৮৪৮
খ) খ) ১৮৫৬
গ) গ) ১৮৬১
ঘ) ঘ) ১৮৭১
ব্যাখ্যা: জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৬১ সালে রাশিয়ার ভূমিদাস প্রথা (Serfdom) বিলোপ করেন। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয়ের পর দেশের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই সংস্কারের জন্য তিনি 'মুক্তিদাতা জার' (Tsar Liberator) নামে পরিচিত হন।
26. রাশিয়ার জনসংখ্যার কত অংশ ভূমিদাস ছিল?
ক) ক) এক-তৃতীয়াংশ
খ) খ) দুই-তৃতীয়াংশ
গ) গ) অর্ধেক
ঘ) ঘ) তিন-চতুর্থাংশ
ব্যাখ্যা: রাশিয়ার জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছিল ভূমিদাস বা সার্ফ (Serf)। পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশগুলিতে এই প্রথার অবসান হলেও রাশিয়ায় ১৮৬১ সাল পর্যন্ত এই নিষ্ঠুর ও অমানবিক প্রথা প্রচলিত ছিল।
27. ভিয়েনা সম্মেলন কত সালে শুরু হয়?
ক) ক) ১৮০৫
খ) খ) ১৮১০
গ) গ) ১৮১৫
ঘ) ঘ) ১৮২০
ব্যাখ্যা: ভিয়েনা সম্মেলন (Congress of Vienna) ১৮১৫ সালে শুরু হয়। নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপের মানচিত্র পুনর্বিন্যাস এবং পুরাতন রাজতন্ত্রগুলির পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই সম্মেলন আহ্বান করা হয়। অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর মেটারনিখ ছিলেন এই সম্মেলনের প্রধান রূপকার।
28. ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান রূপকার কে ছিলেন?
ক) ক) বিসমার্ক
খ) খ) মেটারনিখ
গ) গ) কাভুর
ঘ) ঘ) তৃতীয় নেপোলিয়ন
ব্যাখ্যা: অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ক্লেমেন্স ফন মেটারনিখ (Klemens von Metternich) ছিলেন ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান রূপকার। তিনি ছিলেন রক্ষণশীল রাজতন্ত্রের প্রবক্তা এবং জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থী আন্দোলনের কট্টর বিরোধী। তাঁর 'মেটারনিখ ব্যবস্থা' (Metternich System) ইউরোপে ১৮১৫-১৮৪৮ পর্যন্ত প্রভাবশালী ছিল।
29. কার্লসবাদ ডিক্রি (Carlsbad Decrees) কী?
ক) ক) বাণিজ্য আইন
খ) খ) জার্মানির উদারপন্থী ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনের আইন
গ) গ) কৃষি সংস্কার
ঘ) ঘ) ধর্মীয় আইন
ব্যাখ্যা: কার্লসবাদ ডিক্রি (Carlsbad Decrees) ১৮১৯ সালে অস্ট্রিয়ার নেতৃত্বে জারি করা হয় — জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও উদারপন্থী কার্যকলাপ দমনের জন্য। ছাত্র সংগঠনগুলিকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়, সংবাদপত্রের ওপর কড়া সেন্সরশিপ জারি করা হয়।
30. ১৮২৪ সালে কোন দেশ স্বাধীনতা লাভ করে?
ক) ক) বেলজিয়াম
খ) খ) গ্রিস
গ) গ) ইটালি
ঘ) ঘ) পোল্যান্ড
ব্যাখ্যা: গ্রিস ১৮২৪ সালে (প্রকৃতপক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮৩০ সালে) অটোমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৮২১ সালে গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইউরোপীয় শক্তিবর্গের (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া) হস্তক্ষেপে গ্রিস স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
31. 'জোলভারেইন' (Zollverein) কী?
ক) ক) সামরিক জোট
খ) খ) জার্মান শুল্ক সংঘ (Customs Union)
গ) গ) রাজনৈতিক দল
ঘ) ঘ) ধর্মীয় সংগঠন
ব্যাখ্যা: জোলভারেইন (Zollverein) ছিল ১৮১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত জার্মান শুল্ক সংঘ (German Customs Union) — যা জার্মান রাজ্যগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা দূর করে অর্থনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। এটি জার্মানির রাজনৈতিক ঐক্যের পথ প্রশস্ত করে। প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জোলভারেইন জার্মান অর্থনীতিকে সুসংহত করে।
32. লাতিন ভাষায় 'Nation' শব্দের অর্থ কী?
ক) ক) জাতি
খ) খ) ভূমি
গ) গ) জন্মস্থান/জন্মগত গোষ্ঠী
ঘ) ঘ) ধর্ম
ব্যাখ্যা: প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের যুগে ল্যাটিন ভাষায় 'Nation' শব্দের অর্থ ছিল — জন্মস্থান বা জন্মগত গোষ্ঠী (by birth)। এই শব্দটি ল্যাটিন 'natio' থেকে এসেছে যার অর্থ 'জন্ম' বা 'উৎপত্তি'। পরবর্তীকালে এই শব্দটি আধুনিক অর্থে 'জাতি' বা 'রাষ্ট্র' বোঝাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
33. ১৮৪৮ সালের বিপ্লব কোন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ব্যাপকতা লাভ করে?
ক) ক) পূর্ব ইউরোপ
খ) খ) পশ্চিম ইউরোপ
গ) গ) মধ্য ইউরোপ
ঘ) ঘ) উত্তর ইউরোপ
ব্যাখ্যা: ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের মূল কেন্দ্র ছিল মধ্য ইউরোপ। ফ্রান্স থেকে শুরু হয়ে অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ইটালি, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া, প্রাশিয়া — সমগ্র মধ্য ইউরোপ জুড়ে রাজতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এই বিপ্লব 'জনগণের বসন্তকাল' (Spring of Nations) নামে পরিচিত।
34. গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধে কত সালে অটোমান বাহিনী পরাজিত হয়?
ক) ক) ১৮২১
খ) খ) ১৮২৪
গ) গ) ১৮২৭ (নাভারিনোর যুদ্ধ)
ঘ) ঘ) ১৮৩০
ব্যাখ্যা: ১৮২৭ সালে নাভারিনোর যুদ্ধে (Battle of Navarino) ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার সম্মিলিত নৌবাহিনী অটোমান-মিশরীয় নৌবহরকে ধ্বংস করে দেয় — যা গ্রিক স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে। ১৮২৯ সালে এড্রিয়ানোপলের চুক্তির মাধ্যমে গ্রিসের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়।
35. ইটালির ঐক্য আন্দোলনে সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের অবদান কী নামে পরিচিত?
ক) ক) রেনেসাঁ
খ) খ) রিসর্জিমেন্তো
গ) গ) এনলাইটেনমেন্ট
ঘ) ঘ) রোমান্টিসিজম
ব্যাখ্যা: ইটালির ঐক্য আন্দোলনে সাহিত্যিক, কবি ও বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক জাগরণও 'রিসর্জিমেন্তো' নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক কান্টু, গুয়েরাৎসি, মানেৎসানি এবং কবি লিওপার্দি, সিলভিও পেল্লিকো প্রমুখ তাঁদের রচনার মাধ্যমে ইটালিবাসীকে জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।
36. ভিয়েনা সম্মেলনে কোন নীতি অনুসৃত হয়েছিল?
ক) ক) জাতীয়তাবাদ
খ) খ) বৈধতা নীতি (Legitimacy) ও ক্ষতিপূরণ নীতি
গ) গ) গণতন্ত্র
ঘ) ঘ) সমাজতন্ত্র
ব্যাখ্যা: ভিয়েনা সম্মেলনে প্রধানত 'বৈধতা নীতি' (Principle of Legitimacy) ও 'ক্ষতিপূরণ নীতি' (Principle of Compensation) অনুসৃত হয়। বৈধতা নীতি অনুযায়ী নেপোলিয়ন কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত রাজবংশগুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেওয়া হয় এবং ক্ষতিপূরণ নীতি অনুযায়ী নেপোলিয়ন-বিরোধী জোটের বিজয়ী শক্তিগুলিকে অঞ্চল প্রদান করা হয়।
37. 'হেতাইরিয়া ফিলিকে' (Hetairia Philike) কী?
ক) ক) ইটালির গুপ্ত সমিতি
খ) খ) গ্রিসের স্বাধীনতার গুপ্ত সমিতি (বন্ধু সমিতি)
গ) গ) জার্মানির ছাত্র সংগঠন
ঘ) ঘ) ফ্রান্সের রাজনৈতিক ক্লাব
ব্যাখ্যা: 'হেতাইরিয়া ফিলিকে' (Hetairia Philike) বা 'বন্ধু সমিতি' (Society of Friends) ছিল গ্রিক স্বাধীনতার জন্য গঠিত একটি গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি। ১৮১৪ সালে ওডেসা নগরীতে চারজন গ্রিক বণিকের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল গ্রিসকে তুরস্কের কবল থেকে মুক্ত করে প্রাচীন গ্রিক সাম্রাজ্যের পুনরুদ্ধার করা।
38. জার্মানির ঐক্য আন্দোলনে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে?
ক) ক) হাইডেলবার্গ
খ) খ) ইয়েনা
গ) গ) বার্লিন
ঘ) ঘ) লাইপজিগ
ব্যাখ্যা: ইয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Jena) জার্মানির জাতীয়তাবাদী ছাত্র আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলি ঐক্য, ন্যায় ও স্বাধীনতার আদর্শ প্রচার করে এবং সমগ্র জার্মানি জুড়ে দেশপ্রেমের আদর্শ প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
39. কোন চুক্তির মাধ্যমে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অবসান ঘটে?
ক) ক) ভিয়েনা চুক্তি
খ) খ) প্যারিস চুক্তি (১৮৫৬)
গ) গ) সান স্টিফানোর চুক্তি
ঘ) ঘ) ফ্রাঙ্কফুর্ট চুক্তি
ব্যাখ্যা: ১৮৫৬ সালের প্যারিস চুক্তির (Treaty of Paris) মাধ্যমে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই চুক্তিতে রাশিয়ার আগ্রাসী নীতি ব্যাহত হয়, কৃষ্ণসাগরকে নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল ঘোষণা করা হয় এবং তুরস্ক সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষিত হয়।
40. কে জার্মানির ঐক্যকে 'রক্ত ও লৌহ' নীতির মাধ্যমে সম্পন্ন করেছিলেন?
ক) ক) মেটারনিখ
খ) খ) প্রথম উইলিয়াম
গ) গ) অটো ফন বিসমার্ক
ঘ) ঘ) নেপোলিয়ন তৃতীয়
ব্যাখ্যা: অটো ফন বিসমার্ক — প্রাশিয়ার 'লৌহ চ্যান্সেলর' (Iron Chancellor) — ১৮৬২ থেকে ১৮৯০ পর্যন্ত প্রাশিয়া ও পরবর্তী জার্মানির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন করেন: (i) ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ১৮৬৪, (ii) অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ১৮৬৬, (iii) ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ১৮৭০-৭১।
41. সেন্ট সাইমন, ফুরিয়ার, লুই ব্লাঁ — কাদের নামের সাথে যুক্ত?
ক) ক) উদারপন্থী আন্দোলন
খ) খ) সমাজতন্ত্রী চিন্তাধারা
গ) গ) জাতীয়তাবাদী আন্দোলন
ঘ) ঘ) রক্ষণশীল রাজতন্ত্র
ব্যাখ্যা: সেন্ট সাইমন, চার্লস ফুরিয়ার, লুই ব্লাঁ — এঁরা ছিলেন প্রাথমিক সমাজতন্ত্রী (Utopian Socialists) চিন্তাবিদ। ফ্রান্সে শিল্পবিপ্লবের ফলে শ্রমিকদের দুরবস্থার প্রেক্ষিতে এঁরা সমাজতন্ত্রী চিন্তাধারার প্রচার করেন এবং রাজা লুই ফিলিপের অর্থনৈতিক নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।

SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

18 টি
1. 🇫🇷 জুলাই বিপ্লব (১৮৩০) কী? এর ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তর:

জুলাই বিপ্লব (July Revolution 1830): ১৮৩০ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সে সংঘটিত বিপ্লব — যা 'তিন গৌরবময় দিন' (Trois Glorieuses) নামেও পরিচিত। রাজা দশম চার্লসের স্বৈরাচারী ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরুদ্ধে প্যারিসের জনতা সশস্ত্র বিপ্লব ঘটায়।

ফলাফল:

  • বুরবোঁ রাজবংশের পতন — দশম চার্লস সিংহাসনচ্যুত।
  • লুই ফিলিপ ফ্রান্সের নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসেন।
  • জুলাই রাজতন্ত্র (July Monarchy) নামে নতুন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত — যা ১৮৪৮ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
  • সংবিধান সংশোধিত — রাজার ক্ষমতা সীমিত করা হয়।
2. 🇫🇷 জুলাই রাজতন্ত্রের (১৮৩০-১৮৪৮) বৈশিষ্ট্য ও দুর্বলতাগুলি কী কী ছিল?

উত্তর:

জুলাই রাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য: রাজা লুই ফিলিপ সংবিধান মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেন, সীমিত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি 'নাগরিক রাজা' (Citizen King) নামে পরিচিত ছিলেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থে শাসন পরিচালিত হতো।

দুর্বলতা ও বিরোধিতা:

  • রক্ষণশীলদের বিরোধিতা: লুই ফিলিপকে 'অবৈধ' ও 'বেআইনি' শাসক বলে মনে করা হতো।
  • বোনাপার্টিস্ট দলের বিরোধিতা: তাঁর দুর্বল শাসনের অবসান চাওয়া হয়।
  • সমাজতন্ত্রীদের সমালোচনা: অর্থনৈতিক নীতির প্রচণ্ড সমালোচনা।
  • ভোটাধিকার সীমাবদ্ধতা: সম্পত্তিকে ভোটাধিকারের মানদণ্ড করায় গরিব মানুষ ভোটাধিকার হারায়।
  • অর্থনৈতিক সংকট: শস্যহানি, বাণিজ্য-শিল্পে মন্দা, বেকার সমস্যা চরমে ওঠে।
3. 🇫🇷 ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।

উত্তর:

কারণ:

  • ভোটাধিকার সংস্কার ও সম্প্রসারণের দাবি — গিজো সরকার তা প্রত্যাখ্যান।
  • অর্থনৈতিক সংকট, শস্যহানি, বেকার সমস্যা চরমে পৌঁছায়।
  • শিল্পবিপ্লবের ফলে শ্রমিকদের শোচনীয় অবস্থা।
  • রাজা লুই ফিলিপের দুর্নীতি ও অজনপ্রিয় নীতি।

ফলাফল:

  • জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান ও দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
  • লা-মার্টিনের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার গঠন।
  • সর্বজনীন ভোটাধিকার ঘোষণা।
  • পরবর্তীতে লুই নেপোলিয়ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত — ১৮৫২ সালে দ্বিতীয় সাম্রাজ্য ঘোষণা।
4. 🇮🇹 ইটালির ঐক্যের পথে বাধাগুলি কী কী ছিল?

উত্তর:

  • রাজনৈতিক বিভক্তি: ইটালি ৮টি আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল — সার্ডিনিয়া-পিডমন্ট, লম্বার্ডি-ভেনিসিয়া, টাস্কানি, পার্মা, মোডেনা, পোপের রাজ্য, নেপলস-সিসিলি ইত্যাদি।
  • অস্ট্রিয়ার আধিপত্য: উত্তর ইটালির লম্বার্ডি ও ভেনিসিয়া সরাসরি অস্ট্রিয়ার অধীনে ছিল। অস্ট্রিয়া সমগ্র ইটালির ওপর প্রভাব বজায় রাখতে চাইত।
  • মেটারনিখের দমন নীতি: অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর মেটারনিখ পুরাতনতন্ত্র বজায় রাখতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করেন।
  • পোপের রাজ্য: পোপ ছিলেন ইটালির ঐক্যের বিরোধী — কারণ একীভূত ইটালিতে তাঁর পার্থিব রাজত্ব বিলুপ্ত হবে।
  • আঞ্চলিকতা ও প্রাদেশিকতা: বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ভিন্নতা ঐক্যের পথে অন্তরায় ছিল।
5. 🇮🇹 জোসেফ ম্যাৎসিনি (Giuseppe Mazzini) ও 'ইয়ং ইটালি'র অবদান আলোচনা করো।

উত্তর:

জোসেফ ম্যাৎসিনি (১৮০৫-১৮৭২): ইটালির ঐক্য আন্দোলনের 'আত্মা' (Soul) নামে পরিচিত। তিনি কার্বোর্নারি দলের ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে ১৮৩১ সালে 'ইয়ং ইটালি' (Young Italy/নব্য ইটালি) নামে বিপ্লবী দল গঠন করেন।

আদর্শ:

  • ইটালি জুড়ে জাতীয়তাবোধ ও ঐক্যের আদর্শ প্রচার।
  • শিক্ষাপ্রচার, আত্মত্যাগ ও কাজের মাধ্যমে ইটালিবাসীকে উদ্বুদ্ধ করা।
  • তাঁর বিখ্যাত উক্তি: 'কেবল সমগ্র ইটালি, ঐক্যবদ্ধ ইটালির জন্যই বিশ্বাস করো, অন্য কোনো খণ্ডিত আদর্শের জন্য নয়।'
  • ইয়ং ইটালি দলের পতাকার একদিকে 'স্বাধীনতা ও ঐক্য', অপরদিকে 'গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবতা' লেখা ছিল।

ঐতিহাসিকদের মতে — এই দলের আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি ইটালিবাসীর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল যা থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারেনি।

6. 🇮🇹 গারিবাল্ডি (Garibaldi) ও 'লাল জামা' বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর:

জুসেপ্পে গারিবাল্ডি (১৮০৭-১৮৮২): ইটালির ঐক্য আন্দোলনের 'তরবারি' (Sword) নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন দুঃসাহসী সেনানায়ক ও বিপ্লবী।

'লাল জামা' বাহিনী (Red Shirts): মাত্র ১০০০ (সহস্র) স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে গঠিত তাঁর বাহিনী — লাল জামা পরিধানের জন্য বিখ্যাত।

অভিযান (Expedition of the Thousand — ১৮৬০):

  • গারিবাল্ডি তাঁর বাহিনী নিয়ে সিসিলিতে অবতরণ করেন।
  • মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ ইটালি (সিসিলি ও নেপলস) জয় করেন।
  • স্বার্থপরতা দেখাননি — জয় করা অঞ্চল ভিক্টর ইমানুয়েলের হাতে তুলে দেন ইটালির ঐক্য সম্পন্ন করার জন্য।

গারিবাল্ডির এই ত্যাগ ও দেশপ্রেম ইটালির ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে আছে।

7. 🇮🇹 কাউন্ট কাভুরের (Count Cavour) কূটনৈতিক ভূমিকা ইটালির ঐক্যে কীভাবে সহায়ক হয়েছিল?

উত্তর:

কাউন্ট কামিল্লো দি কাভুর (১৮১০-১৮৬১): ইটালির ঐক্য আন্দোলনের 'মস্তিষ্ক' (Brain) নামে পরিচিত। সার্ডিনিয়া-পিডমন্টের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কূটনীতি ও বাস্তববাদী রাজনীতির মাধ্যমে ঐক্যের পথ প্রশস্ত করেন।

গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ:

  • ক্রিমিয়ার যুদ্ধে (১৮৫৩-৫৬) ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের পক্ষে যোগদান → আন্তর্জাতিক মঞ্চে সার্ডিনিয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধি।
  • ১৮৫৮ সালে ফ্রান্সের তৃতীয় নেপোলিয়নের সাথে গোপন 'প্লমবিয়ের চুক্তি' স্বাক্ষর → অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফ্রান্সের সাহায্য লাভের প্রতিশ্রুতি।
  • ১৮৫৯ সালে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ → মাজেন্টা ও সলফেরিনোর যুদ্ধে অস্ট্রিয়া পরাজিত → সার্ডিনিয়া লম্বার্ডি লাভ করে।
  • মধ্য ইটালির রাজ্যগুলির (টাস্কানি, পার্মা, মোডেনা, রোমাগ্না) গণভোটের মাধ্যমে সার্ডিনিয়ার সাথে যুক্তকরণ নিশ্চিত করেন।
8. 🇩🇪 জার্মানির ঐক্যের পথে বাধাগুলি কী কী ছিল?

উত্তর:

  • রাজনৈতিক বিভক্তি: জার্মানি ৩৯টি আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল — প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, বাভারিয়া, স্যাক্সনি, হ্যানোভার ইত্যাদি।
  • অস্ট্রিয়ার প্রভাব: অস্ট্রিয়া জার্মানির বৃহত্তম ও প্রভাবশালী শক্তি — কিন্তু অস্ট্রিয়া নিজে জার্মানিভাষী অঞ্চল ছাড়াও অ-জার্মান অঞ্চলের সমন্বয়ে বহুজাতিক সাম্রাজ্য ছিল — তাই জার্মানির ঐক্যে তার আগ্রহ সীমিত।
  • ধর্মীয় বিভাজন: উত্তর জার্মানি ছিল প্রোটেস্ট্যান্ট (প্রাশিয়ার নেতৃত্বে) এবং দক্ষিণ জার্মানি ছিল ক্যাথলিক (অস্ট্রিয়ার প্রভাবে)।
  • মেটারনিখ ও কর্তৃত্ববাদী শাসন: কার্লসবাদ ডিক্রির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন।
  • ডেনমার্কের দাবি: শ্লেসভিগ ও হলস্টেইন অঞ্চল নিয়ে ডেনমার্কের সাথে বিরোধ।
9. 🇩🇪 অটো ফন বিসমার্ক (Otto von Bismarck) — জার্মানির ঐক্যে তাঁর ভূমিকা বর্ণনা করো।

উত্তর:

অটো ফন বিসমার্ক (১৮১৫-১৮৯৮): প্রাশিয়ার 'লৌহ চ্যান্সেলর' (Iron Chancellor)। ১৮৬২ সালে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে টানা ২৮ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

নীতি — 'লৌহ ও রক্ত': 'বক্তৃতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্ত দ্বারা নয়, বরং লৌহ ও রক্ত দ্বারা সমস্যার সমাধান হবে।'

তিনটি যুদ্ধ:

  1. ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৪): অস্ট্রিয়ার সাহায্যে ডেনমার্ককে পরাজিত — হলস্টেইন ও শ্লেসভিগ প্রাশিয়া-অস্ট্রিয়ার দখলে।
  2. অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৬): স্যাডোভার যুদ্ধে অস্ট্রিয়া পরাজিত → জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়া বাদ → উত্তর জার্মান কনফেডারেশন গঠন।
  3. ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৭০-৭১): এমস টেলিগ্রামের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ → ফ্রান্সের পরাজয় → ১৮ জানুয়ারি ১৮৭১ ভার্সাই প্রাসাদে প্রথম উইলিয়ামকে জার্মান সম্রাট ঘোষণা → জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা → ফ্রাঙ্কফুর্ট চুক্তিতে আলসাস-লোরেন জার্মানির অধিকারে।
10. 🇩🇪 'এমস টেলিগ্রাম' (Ems Telegram) ঘটনাটি কী? এর গুরুত্ব কী?

উত্তর:

এমস টেলিগ্রাম: স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে ফ্রান্স ও প্রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনার সময়ে সংঘটিত একটি কূটনৈতিক ঘটনা।

ঘটনার পটভূমি:

  • স্পেনের রানি দ্বিতীয় ইসাবেলা ক্ষমতাচ্যুত হলে স্পেন প্রাশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়ামের আত্মীয় লিওপোল্ড ফন হোহেনজোলানকে স্পেনের রাজপদে আমন্ত্রণ জানায়।
  • ফ্রান্সের তৃতীয় নেপোলিয়ন হোহেনজোলান বংশের কাউকে স্পেনের সিংহাসনে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান।
  • প্রথম উইলিয়াম এমস শহরে ছুটি কাটাচ্ছিলেন — ফরাসি রাষ্ট্রদূত বেনেদিতি তাঁর কাছে গিয়ে ভবিষ্যতে হোহেনজোলান কেউ স্পেনের সিংহাসনে বসবে না এই প্রতিশ্রুতি চান।
  • উইলিয়াম বিনয়ের সাথে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিসমার্ককে টেলিগ্রামে ঘটনা জানান।
  • বিসমার্কের কৌশল: তিনি টেলিগ্রামটি এমনভাবে সম্পাদনা করে সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন যাতে ফ্রান্স অপমানিত বোধ করে।
  • ক্ষুব্ধ ফ্রান্স প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে → ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ (১৮৭০-৭১) শুরু।
11. ⚔️ ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ, ঘটনা ও ফলাফল আলোচনা করো।

উত্তর:

কারণ:

  • তুরস্ক সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়ার 'উষ্ণ জল নীতি' — ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা।
  • জেরুজালেমের পবিত্র স্থানসমূহ (প্যালেস্টাইন)-এর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে বিরোধ।
  • রাশিয়া তুরস্কের প্রটেক্টর (রক্ষক) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও অন্যান্য শক্তি বাধা দেয়।

যুদ্ধের ঘটনাবলী:

  • রাশিয়া তুরস্ক আক্রমণ করে → ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সার্ডিনিয়া তুরস্কের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে।
  • ক্রিমিয়া উপদ্বীপে যুদ্ধের মূল ঘটনা ঘটে।

ফলাফল — ১৮৫৬-র প্যারিস চুক্তি:

  • রাশিয়ার আগ্রাসী নীতি ব্যাহত।
  • কৃষ্ণসাগর নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল ঘোষিত।
  • মল্ডাভিয়া ও ওয়ালাকিয়া স্বায়ত্তশাসন পায়।
  • তুরস্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়।
  • ইটালি ও জার্মানির জাতীয় ঐক্যের পথ প্রস্তুত হয়।
12. 🇬🇷 গ্রিসের স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণ ও ফলাফল লেখো।

উত্তর:

কারণ:

  • অটোমান সুলতানদের অপশাসন ও ধর্মীয় অত্যাচার।
  • দুর্নীতি, বৈষম্য ও গ্রিকদের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ।
  • ফরাসি বিপ্লবের জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রভাব।
  • গ্রিক ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নবজাগরণ।
  • 'হেতাইরিয়া ফিলিকে' (বন্ধু সমিতি) — ১৮১৪ সালে ওডেসায় গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি গঠন।

ফলাফল:

  • ১৮২১: গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু।
  • ১৮২৭: নাভারিনোর যুদ্ধে ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-রাশিয়ার সম্মিলিত নৌবাহিনী অটোমান-মিশরীয় নৌবহর ধ্বংস।
  • ১৮২৯: এড্রিয়ানোপলের চুক্তি।
  • ১৮৩৩: প্রিন্স অটো (অটো ফন ভিটেলসবাখ) গ্রিসের প্রথম রাজা নিযুক্ত।
13. 🌍 বলকান জাতীয়তাবাদের উত্থান ও সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর:

বলকান জাতীয়তাবাদের পটভূমি: বলকান অঞ্চলে গ্রিক, বুলগেরীয়, সার্ব, রোমানীয়, আলবেনীয় প্রভৃতি প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ বসবাস করত — অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে।

উত্থানের কারণ:

  • অটোমান সুলতানদের অপশাসন ও দুর্নীতি।
  • ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রভাব।
  • রাশিয়ার 'উষ্ণ জল নীতি' — বলকান জাতীয়তাবাদকে সমর্থন।
  • গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধের সাফল্য (প্রথম স্বাধীন বলকান রাষ্ট্র)।

সমস্যা:

  • বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ।
  • রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড প্রভৃতি বৃহৎ শক্তির হস্তক্ষেপ।
  • 'বলকানকরণ' (Balkanization) — ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্তির প্রবণতা।
14. 🦅 মেটারনিখ ব্যবস্থা (Metternich System) কী? এর বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।

উত্তর:

মেটারনিখ ব্যবস্থা (১৮১৫-১৮৪৮): অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ক্লেমেন্স ফন মেটারনিখ কর্তৃক প্রবর্তিত একটি রক্ষণশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা — ইউরোপে পুরাতন রাজতন্ত্র ও বৈধতা নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থী আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে।

বৈশিষ্ট্য:

  • বৈধতা নীতি (Legitimacy) — নেপোলিয়ন কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
  • শক্তি ভারসাম্য (Balance of Power) — কোনো একক শক্তি যাতে ইউরোপে আধিপত্য স্থাপন করতে না পারে।
  • সামরিক হস্তক্ষেপের নীতি — জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থী আন্দোলন দমনে প্রয়োগ।
  • কার্লসবাদ ডিক্রি (১৮১৯) — জার্মানিতে ছাত্র ও সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
  • ট্রপো কংগ্রেস (১৮২০) — নেপলসে বিপ্লব দমনে অস্ট্রিয়াকে ম্যান্ডেট।
  • চতুঃশক্তি জোট ও পবিত্র জোট (Holy Alliance) — রাশিয়া, প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়ার সমন্বয়ে।
15. 📜 ভিয়েনা সম্মেলন (Congress of Vienna, ১৮১৫) কী? এর মূলনীতি ও ফলাফল লেখো।

উত্তর:

ভিয়েনা সম্মেলন: নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপের মানচিত্র পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্যে ১৮১৫ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা নগরীতে ইউরোপীয় শক্তিগুলির একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন।

মূলনীতি:

  • বৈধতা নীতি: নেপোলিয়ন কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
  • ক্ষতিপূরণ নীতি: নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী শক্তিসমূহকে ভূখণ্ড প্রদান।

ফলাফল:

  • ফ্রান্সের সীমানা ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া।
  • জার্মান কনফেডারেশন (৩৯টি রাজ্যের জোট) গঠন — অস্ট্রিয়ার নেতৃত্বে।
  • অস্ট্রিয়া উত্তর ইটালির লম্বার্ডি-ভেনিসিয়া লাভ।
  • বেলজিয়াম হল্যান্ডের সাথে যুক্ত করে ইউনাইটেড নেদারল্যান্ডস গঠন।
  • ইউরোপে প্রায় ৪০ বছর (১৮১৫-১৮৫৪) বড়ো কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।
16. 🇷🇺 জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদ (১৮৬১) সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর:

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার (রাজত্বকাল: ১৮৫৫-১৮৮১): ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয়ের পর দেশের পশ্চাদপদতা উপলব্ধি করে সংস্কার সাধনে উদ্যোগী হন।

ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদের কারণ:

  • ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয় → রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক দুর্বলতা স্পষ্ট।
  • ভূমিদাস প্রথা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা।
  • ঘন ঘন কৃষক বিদ্রোহ।
  • জনমত ও প্রগতিশীল ভূমি মালিকদের সচেতনতা।

মুক্তির নির্দেশনামা (Emancipation Edict, ১৮৬১): জার ১৮৬১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এই ঐতিহাসিক আইন স্বাক্ষর করেন। ভূমিদাসরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার লাভ করে।

সীমাবদ্ধতা: কৃষকদের পর্যাপ্ত জমি দেওয়া হয়নি, তাদের মুক্তির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। মুক্তির পরেও প্রকৃত অবস্থার খুব উন্নতি হয়নি — এটি ছিল আংশিক সংস্কার। তবু এটি ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ। এই সংস্কারের জন্য দ্বিতীয় আলেকজান্ডার 'মুক্তিদাতা জার' (Tsar Liberator) নামে খ্যাত।

17. 📊 ১৮৩০ ও ১৮৪৮ সালের ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো।

উত্তর:

বিষয়জুলাই বিপ্লব ১৮৩০ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ১৮৪৮
লক্ষ্যস্বৈরাচারী রাজাকে অপসারণবিস্তৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
ফলাফলবুরবোঁ রাজবংশের পতন, জুলাই রাজতন্ত্ররাজতন্ত্রের অবসান, দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র
স্থায়িত্ব১৮ বছর (১৮৩০-১৮৪৮)চার বছর (১৮৪৮-১৮৫২)
আন্তর্জাতিক প্রভাবসীমিতসমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে (Spring of Nations)
18. 🎵 জার্মানির জাতীয়তাবাদী জাগরণে সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর:

সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জার্মানি জুড়ে সাহিত্য, দর্শন, শিল্প ও সংগীতের ক্ষেত্রে এক নবজাগরণের সূচনা ঘটে।

  • উইঙ্কেলমান: প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের চর্চার মাধ্যমে জার্মান সাহিত্যে নতুন ধারার জন্ম দেন।
  • ফিশে, হেগেল, কান্ট, গ্যোটে: এঁদের লেখায় 'সর্ব-জার্মানবাদ' (Pan-Germanism) আদর্শ প্রকাশ পায়।
  • বেটোফেন: প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ — সংগীত রচনার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রকাশ করেন।

এই সাংস্কৃতিক জাগরণ জার্মান জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বহিঃপ্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য করে।

Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর

4 টি
1. উনিশ শতকের ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উত্থান ও বিকাশের ইতিহাস আলোচনা করো। ফরাসি বিপ্লব ১৮৩০ ও ১৮৪৮-এর প্রভাব এবং ইটালি ও জার্মানির ঐক্য আন্দোলনে জাতীয়তাবাদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

জাতীয়তাবাদের উত্থানের পটভূমি

উনিশ শতকের ইউরোপ ছিল রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাতের ক্ষেত্র। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) 'স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব' -এর বাণী প্রচার করে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে। নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধগুলি পরোক্ষভাবে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয়তাবোধের জাগরণ ঘটায়।

ভিয়েনা সম্মেলন ও মেটারনিখ ব্যবস্থা (১৮১৫)

নেপোলিয়নের পতনের পর ভিয়েনা সম্মেলনে বিজয়ী শক্তিগুলি পুরাতন রাজতন্ত্র ও বৈধতা নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। মেটারনিখের নেতৃত্বে ইউরোপে রক্ষণশীলতার জোয়ার আসে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থী ভাবধারা সম্পূর্ণ দমন করা সম্ভব হয়নি।

ফরাসি বিপ্লব ১৮৩০ (জুলাই বিপ্লব)

দশম চার্লসের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্যারিসের জনতা সশস্ত্র বিপ্লব ঘটায়। বুরবোঁ রাজবংশের পতন ঘটে এবং লুই ফিলিপ জুলাই রাজতন্ত্রের সূচনা করেন। এই বিপ্লব বেলজিয়ামের স্বাধীনতা আন্দোলন ও ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে প্রভাব ফেলে।

ফরাসি বিপ্লব ১৮৪৮ (ফেব্রুয়ারি বিপ্লব)

অর্থনৈতিক সংকট, বেকার সমস্যা, ভোটাধিকার সংস্কারের দাবি — এই সবের প্রেক্ষিতে ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সংঘটিত হয়। জুলাই রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিপ্লব 'জনগণের বসন্তকাল' (Spring of Nations) নামে পরিচিত — যা সমগ্র ইউরোপে রাজতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত করে।

ইটালির ঐক্যে জাতীয়তাবাদের ভূমিকা

ম্যাৎসিনির ইয়ং ইটালি দল জাতীয়তাবোধ জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক, কবি — সকলেই রিসর্জিমেন্তো (পুনর্জাগরণ) আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রচার করেন। কাভুরের কূটনীতি, গারিবাল্ডির বীরত্ব এবং সার্ডিনিয়া-পিডমনের নেতৃত্ব ১৮৭০ সালে ইটালির ঐক্য সম্পূর্ণ করে।

জার্মানির ঐক্যে জাতীয়তাবাদের ভূমিকা

ইয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন, জোলভারেইন (শুল্ক সংঘ)-এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ঐক্য, বিসমার্কের 'লৌহ ও রক্ত' নীতি এবং তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমে ১৮৭১ সালে জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা।

2. ইটালির ঐক্য আন্দোলন (রিসর্জিমেন্তো)-এর বিভিন্ন পর্যায়, নেতৃবৃন্দের অবদান ও সম্পূর্ণ ঐক্যের প্রক্রিয়া বিস্তারিত আলোচনা করো।

রিসর্জিমেন্তো (Risorgimento) — পুনর্জাগরণ

উনিশ শতকের গোড়ায় ইটালি ৮টি আলাদা রাজ্যে বিভক্ত ছিল এবং উত্তর ইটালির লম্বার্ডি-ভেনিসিয়া ছিল অস্ট্রিয়ার অধীনে। মেটারনিখ ইটালিকে 'একটি ভৌগোলিক সংজ্ঞামাত্র' বলে অভিহিত করেছিলেন।

প্রথম পর্যায় — বৌদ্ধিক ও নৈতিক প্রস্তুতি

  • ম্যাৎসিনি (আত্মা): ১৮৩১ সালে 'ইয়ং ইটালি' (নব্য ইটালি) দল গঠন — শিক্ষাপ্রচার, আত্মত্যাগ ও কাজের মাধ্যমে জাতীয়তাবোধ জাগরণ। পতাকায় 'স্বাধীনতা ও ঐক্য' / 'গণতন্ত্র, সাম্য ও মানবতা'।
  • সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিকগণ: কান্টু, গুয়েরাৎসি, মানেৎসানি — ইটালিবাসীকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। গিওবার্টি — 'ইটালির নৈতিক ও নাগরিক প্রাধান্য' গ্রন্থে পোপের নেতৃত্বে ইটালি ফেডারেশনের প্রস্তাব দেন (নব্য গেল্ফবাদ)।

দ্বিতীয় পর্যায় — কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও সামরিক অভিযান

  • কাভুর (মস্তিষ্ক): সার্ডিনিয়া-পিডমন্টের প্রধানমন্ত্রী। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগদান করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্ব বৃদ্ধি। ১৮৫৮-র প্লমবিয়ের চুক্তি — অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফ্রান্সের সাহায্য লাভ। ১৮৫৯-র যুদ্ধে লম্বার্ডি লাভ।
  • গারিবাল্ডি (তরবারি): মাত্র ১০০০ স্বেচ্ছাসেবক (লাল জামা) নিয়ে সিসিলি ও নেপলস জয় (১৮৬০) → দক্ষিণ ইটালি ভিক্টর ইমানুয়েলকে প্রদান।

চূড়ান্ত পর্যায় — সম্পূর্ণ ঐক্য

  • ১৮৬১: ভিক্টর ইমানুয়েল ইটালির রাজা ঘোষিত — কিন্তু রোম ও ভেনিসিয়া বাইরে।
  • ১৮৬৬: অস্ট্রো-প্রাশিয়ান যুদ্ধে ইটালি প্রাশিয়ার পক্ষে যোগ → ভেনিসিয়া লাভ।
  • ১৮৭০: ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধের সময় ফরাসি সেনা অপসারণ → ইটালি রোম দখল → সম্পূর্ণ ইটালির ঐক্য সম্পন্ন।
3. জার্মানির ঐক্য আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করো। বিসমার্কের 'লৌহ ও রক্ত' নীতি এবং তিনটি যুদ্ধের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

জার্মানির ঐক্যের পটভূমি

ভিয়েনা সম্মেলনের (১৮১৫) পর জার্মানি ৩৯টি রাজ্যের একটি শিথিল জোটে (জার্মান কনফেডারেশন) পরিণত হয় — অস্ট্রিয়ার নেতৃত্বে। জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থী ভাবধারা ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে।

অর্থনৈতিক ঐক্য — জোলভারেইন (১৮১৯)

প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মান শুল্ক সংঘ (Zollverein) গঠিত হয় — যা জার্মান রাজ্যগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা দূর করে অর্থনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। অস্ট্রিয়া এই সংঘের বাইরে থাকে। জোলভারেইন জার্মানির রাজনৈতিক ঐক্যের পথ প্রশস্ত করে।

সাংস্কৃতিক জাগরণ

সাহিত্য, দর্শন, সংগীতের মাধ্যমে 'সর্ব-জার্মানবাদ' (Pan-Germanism) আদর্শের প্রসার ঘটে। ফিশে, হেগেল, গ্যোটে, বেটোফেন প্রমুখ জার্মান জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিসমার্কের উত্থান ও 'লৌহ ও রক্ত' নীতি

১৮৬২ সালে প্রাশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়াম অটো ফন বিসমার্ককে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। বিসমার্ক সংসদে ঘোষণা করেন: 'আজকের মহান সমস্যাগুলি বক্তৃতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্ত দ্বারা নয়, বরং লৌহ ও রক্ত দ্বারা সমাধান করা হবে।' তিনি সামরিক শক্তি ও কূটনীতির সমন্বয়ে জার্মানির ঐক্যের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

তিনটি যুদ্ধ

  • ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৪): বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার সাহায্যে ডেনমার্ক আক্রমণ করে শ্লেসভিগ ও হলস্টেইন দখল করেন। অস্ট্রিয়া হলস্টেইনের দায়িত্ব পায়। এটি ভবিষ্যতে অস্ট্রিয়ার সাথে বিরোধের বীজ বপন করে।
  • অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ (সপ্তসপ্তাহব্যাপী যুদ্ধ, ১৮৬৬): স্যাডোভার যুদ্ধে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রাশিয়ান বাহিনী অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করে। প্রাগ চুক্তির মাধ্যমে অস্ট্রিয়া জার্মান কনফেডারেশন থেকে বাদ পড়ে। উত্তর জার্মান কনফেডারেশন গঠিত হয় — প্রাশিয়ার নেতৃত্বে।
  • ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ, ১৮৭০-৭১): এমস টেলিগ্রাম ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হয়। সেডানের যুদ্ধে তৃতীয় নেপোলিয়ন বন্দি হন এবং ফ্রান্স পরাজিত হয়। ১৮ জানুয়ারি ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে প্রথম উইলিয়ামকে জার্মান সম্রাট (Kaiser) ঘোষণা করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট চুক্তিতে ফ্রান্স আলসাস ও লোরেন জার্মানিকে দিতে বাধ্য হয় এবং ৫ বিলিয়ন ফ্রাঁ যুদ্ধক্ষতিপূরণ দেয়।

জার্মান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা

প্রাশিয়ার নেতৃত্বে সমগ্র জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ইউরোপের মানচিত্রে একটি শক্তিশালী জার্মান সাম্রাজ্যের আবির্ভাব ঘটে — যা পরবর্তী ইউরোপীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।

4. মেটারনিখ ব্যবস্থা ও ভিয়েনা সম্মেলনের মূলনীতি, কার্যপ্রণালী ও পতনের কারণ আলোচনা করো। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থার ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করো।

মেটারনিখ ব্যবস্থা (Metternich System)

অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ক্লেমেন্স ফন মেটারনিখ (১৭৭৩-১৮৫৯) নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপে পুরাতন রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জাতীয়তাবাদী ও উদারপন্থী আন্দোলন দমনের জন্য যে ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাই 'মেটারনিখ ব্যবস্থা' নামে পরিচিত।

ভিয়েনা সম্মেলনের মূলনীতি (১৮১৫)

  • বৈধতা নীতি (Legitimacy): নেপোলিয়ন কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত রাজপরিবারগুলির পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
  • ক্ষতিপূরণ নীতি (Compensation): নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী শক্তিসমূহকে ভূখণ্ড প্রদান।
  • শক্তি ভারসাম্য (Balance of Power): ইউরোপে কোনো একক শক্তি যাতে আধিপত্য স্থাপন করতে না পারে।

মেটারনিখ ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী

  • চতুঃশক্তি জোট (Quadruple Alliance): ইংল্যান্ড, রাশিয়া, প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া — ইউরোপের শান্তি বজায় রাখতে।
  • পবিত্র জোট (Holy Alliance): রাশিয়া, প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া — খ্রিস্টীয় নীতির ভিত্তিতে শাসন পরিচালনা।
  • কংগ্রেস ব্যবস্থা (Congress System): নিয়মিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান।
  • কার্লসবাদ ডিক্রি (১৮১৯): জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠন ও সংবাদপত্রের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।

পতনের কারণ

  • জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতা: ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ সম্পূর্ণ দমন করা সম্ভব হয়নি। গ্রিসের স্বাধীনতা (১৮২৪/৩০), বেলজিয়ামের স্বাধীনতা (১৮৩০) — বৈধতা নীতির পরাজয়।
  • ১৮৪৮ সালের বিপ্লব (Spring of Nations): ফ্রান্স থেকে শুরু হয়ে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে — মেটারনিখ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান।
  • শিল্প বিপ্লবের প্রভাব: মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণির উত্থান পুরাতনতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
  • আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা: ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৩-৫৬) ইউরোপীয় শক্তিসমূহের পারস্পরিক বিরোধ প্রকাশ করে।

মনে রেখো!

জুলাই বিপ্লব ১৮৩০: বুরবোঁ রাজবংশের পতন → জুলাই রাজতন্ত্র (লুই ফিলিপ) | ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ১৮৪৮: দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র | ইটালির ঐক্য: ম্যাৎসিনি (আত্মা), কাভুর (মস্তিষ্ক), গারিবাল্ডি (তরবারি) → ১৮৭০-এ রোম দখল | জার্মানির ঐক্য: বিসমার্কের লৌহ ও রক্ত নীতি → ১৮৭১-এ জার্মান সাম্রাজ্য | ক্রিমিয়ার যুদ্ধ: ১৮৫৩-৫৬ → প্যারিস চুক্তি | ভূমিদাস প্রথা: ১৮৬১-এ জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার কর্তৃক বিলোপ

Sponsored Links

Frequently Asked Questions

জুলাই বিপ্লব ১৮৩০-এর ফলে বুরবোঁ রাজবংশের পতন ঘটে এবং লুই ফিলিপের জুলাই রাজতন্ত্র (সীমিত রাজতন্ত্র) প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ১৮৪৮ ছিল সম্পূর্ণ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লব। ১৮৩০ তুলনামূলকভাবে সীমিত প্রভাব ফেললেও ১৮৪৮-এর বিপ্লব 'জনগণের বসন্তকাল' নামে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

ইটালির ঐক্য আন্দোলনের তিনজন প্রধান নেতা: (১) জোসেফ ম্যাৎসিনি — 'আত্মা' (Soul) — ইয়ং ইটালি দল গঠন করে জাতীয়তাবোধ জাগরণ। (২) কাউন্ট কাভুর — 'মস্তিষ্ক' (Brain) — সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাধ্যমে ঐক্যের পথ প্রশস্ত করেন। (৩) গারিবাল্ডি — 'তরবারি' (Sword) — 'লাল জামা' বাহিনী নিয়ে দক্ষিণ ইটালি জয় করে ভিক্টর ইমানুয়েলকে প্রদান করেন।

অটো ফন বিসমার্ক 'লৌহ ও রক্ত' (Blood and Iron) নীতির মাধ্যমে তিনটি যুদ্ধ করে জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন করেন: (১) ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৪) — শ্লেসভিগ ও হলস্টেইন দখল। (২) অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৬৬) — স্যাডোভার যুদ্ধে অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করে জার্মানি থেকে বাদ দেন। (৩) ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৮৭০-৭১) — সেডানের যুদ্ধে তৃতীয় নেপোলিয়ন বন্দি, ভার্সাই প্রাসাদে ১৮ জানুয়ারি ১৮৭১-এ জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধের (১৮৫৩-১৮৫৬) মূল কারণ ছিল তুরস্ক সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর জন্য রাশিয়ার 'উষ্ণ জল নীতি'। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও সার্ডিনিয়া তুরস্কের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলে রাশিয়া পরাজিত হয়। ১৮৫৬ সালের প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে: কৃষ্ণসাগর নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল ঘোষিত হয়, তুরস্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায় এবং ইটালি ও জার্মানির জাতীয় ঐক্যের পথ প্রস্তুত হয়।