Chapter 1: ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর | 61 MCQ | 32 SAQ | 9 Broad Questions
১৭৮৯
বাস্তিল পতন, সামন্তপ্রথা বিলোপ, মানবাধিকার ঘোষণা
১৭৯৩-৯৪
সন্ত্রাসের শাসন, রোবসপিয়ের, গিলোটিন
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
61 টিSAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
32 টিউত্তর:
অঁসিয়া রেজিম (Ancien Régime/Old Regime): ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) পূর্ববর্তী পুরাতন সমাজ ও শাসনব্যবস্থা। ১৫শ-১৮শ শতক পর্যন্ত ফ্রান্সে প্রচলিত ছিল।
প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- দৈবরাজতন্ত্র: রাজা ছিলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি — সমস্ত ক্ষমতার উৎস। 'লো রে রোয়া' — রাজাই আইন।
- তিন এস্টেটে সমাজ বিভাজন: প্রথম এস্টেট (যাজক), দ্বিতীয় এস্টেট (অভিজাত), তৃতীয় এস্টেট (সাধারণ নাগরিক — কৃষক, বুর্জোয়া, শ্রমিক) — চরম বৈষম্য।
- সামন্ততান্ত্রিক করব্যবস্থা: যাজক ও অভিজাতরা করমুক্ত — তৃতীয় এস্টেটের ওপর সব করের বোঝা। টাইথ, করভি, তাই (Taille — প্রত্যক্ষ কর)।
- ক্যাথলিক চার্চের আধিপত্য: চার্চ ছিল সবচেয়ে বড় ভূস্বামী ও শিক্ষা নিয়ন্ত্রক।
- লেত্রে দ্য ক্যাশে: বিনা বিচারে রাজার স্বাক্ষরিত কারারুদ্ধ করার পরোয়ানা।
উত্তর:
প্রথম এস্টেট (First Estate — Clergy/যাজক): জনসংখ্যার ০.৫-১% — কিন্তু মোট ভূসম্পত্তির ১০% ভোগ করতেন। করমুক্ত। আয়ের উৎস: টাইথ (ফসলের দশমাংশ) ও চার্চের ভূসম্পত্তি। উচ্চ যাজক (Archbishop, Bishop) — ধনী ও ক্ষমতাশালী; নিম্ন যাজক (Parish Priest) — সাধারণ, দরিদ্র — অনেকেই বিপ্লবকে সমর্থন করেন।
দ্বিতীয় এস্টেট (Second Estate — Nobility/অভিজাত): জনসংখ্যার ১-২% — ভূসম্পত্তির ২০-২৫% অধিকারী। দুই ধরনের: তরোয়ালের অভিজাত (Noblesse d'épée — বংশপরম্পরায়) ও জোব্বার অভিজাত (Noblesse de robe — প্রশাসনিক পদ ক্রয় করে)। করমুক্ত। জমিদারি স্বত্ব, শিকার, কবুতর রাখার অধিকার — সামন্তীয় সুবিধাভোগী।
তৃতীয় এস্টেট (Third Estate — Tiers État): জনসংখ্যার ৯৭% — প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ। বুর্জোয়া (আইনজীবী, ডাক্তার, ব্যবসায়ী), কৃষক (স্বাধীন, ভাগচাষী, ভূমিদাস/সার্ফ) ও শহরের শ্রমজীবী (কারিগর, দিনমজুর, সাঁকুলোত)। সমস্ত রাজস্ব (৯৫%) এদের থেকেই আদায় — কিন্তু রাজনৈতিক অধিকারহীন।
উত্তর:
বুর্জোয়া (Bourgeoisie): 'বুর্জ' (Bourg — শহর) শব্দ থেকে উৎপত্তি — অর্থ নগরবাসী। তৃতীয় এস্টেটের উচ্চ ও মধ্য স্তর — আইনজীবী, ডাক্তার, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, শিল্পপতি। শিক্ষিত, বিত্তশালী হলেও সমাজে কোনো মর্যাদা বা রাজনৈতিক অধিকার ছিল না।
বিপ্লবে ভূমিকা:
- তাঁরাই প্রথম প্রতিবাদ সংগঠিত করে — ১৭৮৯ সালের ১৭ জুন নিজেদের 'জাতীয় পরিষদ' (National Assembly) ঘোষণা।
- টেনিস কোর্টের শপথের নেতৃত্ব দেয়।
- সংবিধান সভায় (Constituent Assembly) সক্রিয় — মিরাবো, সিয়েস, বান্দর্ভ, বাইয়ি, রোবসপিয়ের প্রমুখ বুর্জোয়া নেতৃত্ব।
- মানুষ ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণার খসড়া প্রস্তুত।
- অর্থনৈতিক সংস্কার — দাসপ্রথা ও সামন্তপ্রথা বিলোপ।
উত্তর:
- ব্যয়বহুল যুদ্ধ: চারটি যুদ্ধে প্রায় ৪০০ কোটি লিভর ব্যয় — স্পেনের উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭০২-১৭১৩), অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭৪০-১৭৪৮), সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩), আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৮)।
- রাজা ও রানির বিলাসিতা: ভার্সাই প্রাসাদ — বিলাসব্যসনের ইমারত। রানি মেরি আঁতোয়ানেতের ৫০০ জন সহচরী। রাজদরবারে ৩ মাস কাজ করে সারা বছর বেতন — প্রশাসনিক খরচ বেড়ে যায়।
- বিষম করব্যবস্থা: প্রথম দুই এস্টেট করমুক্ত — তৃতীয় এস্টেটের ওপর সমস্ত করের বোঝা (শতকরা ৯৫ ভাগ রাজস্ব দিত সম্পদের ৫% মালিক হয়ে)। টাইথ, করভি, তাই (Taille), গাবেল (Gabelle — লবণ কর)।
- অর্থনৈতিক মন্দা: ১৭৮০-এর দশকে শস্যহানি, দুর্ভিক্ষ — রুটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। একজন দিনমজুর আয়ের ৭৫% রুটি কিনতেই ব্যয় হত।
- বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা: ইংল্যান্ডের সাথে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ভারত ও আমেরিকার উপনিবেশ হারানো — বাণিজ্যে মন্দা।
উত্তর:
মন্টেস্কু (Montesquieu, ১৬৮৯-১৭৫৫): 'দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ' (১৭৪৮) গ্রন্থে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ তত্ত্ব — আইন, শাসন ও বিচার একই ব্যক্তির হাতে থাকলে ব্যক্তিস্বাধীনতা নষ্ট। 'পারসিয়ান লেটারস' (১৭২১)-এ ফরাসি স্বৈরাচারের ব্যঙ্গ।
ভলতেয়ার (Voltaire, ১৬৯৪-১৭৭৮): 'কাঁদিদ' (১৭৫৯) ও 'ফিলোজফিক্যাল লেটারস' (১৭৩৪) — ফরাসি স্বৈরাচার, চার্চের ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতার সমালোচনা। ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রশংসা।
রুশো (Rousseau, ১৭১২-১৭৭৮): 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' (১৭৬২) — রাজা স্বৈরাচারী হলে প্রজার তাকে অপসারণের অধিকার। 'জনগণের সাধারণ ইচ্ছা' (General Will) ধারণা। বিপ্লবের মূলমন্ত্র — স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব — তারই দান।
দিদেরো ও বিশ্বকোষ (Diderot & Encyclopédie): ৩৫ খণ্ডের বিশ্বকোষ — স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র, চার্চ ও পুরাতন সমাজব্যবস্থার সমালোচনা। ১৫০+ আলোকচিন্তকের সম্মিলিত প্রয়াস।
ফিজিওক্র্যাটস: কোয়েসনের নেতৃত্বে — সরকারের শুল্কনীতির সমালোচনা, ব্যক্তিউদ্যোগের স্বাধীনতা (Laissez-faire) ও ভূমির ওপর একক করের পক্ষপাতী।
উত্তর:
টেনিস কোর্টের শপথ (২০ জুন, ১৭৮৯):
এস্টেট জেনারেলে মাথাপিছু ভোটের দাবি না মানায় তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা ১৭ জুন নিজেদের 'জাতীয় পরিষদ' (National Assembly) ঘোষণা করে। ক্ষুব্ধ রাজা ষোড়শ লুই সভাকক্ষ তালাবন্ধ করলে ২০ জুন সকালে জ্যাঁ বাইয়ির নেতৃত্বে নিকটবর্তী টেনিস কোর্টে (Jeu de Paume) সমবেত হয়ে শপথ নেয়:
'আমরা শপথ করছি — যেখানেই সমবেত হই না কেন, নতুন সংবিধান রচনা ও রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও পৃথক হব না।'
গুরুত্ব:
- এটি ছিল রাজার বিরুদ্ধে প্রথম প্রত্যক্ষ ও সংগঠিত বিদ্রোহের নির্দশন।
- বুর্জোয়াদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত — ১৩৯ জন যাজক ও ৪৭ জন অভিজাত এতে যোগ দিয়ে বুর্জোয়াদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেন।
- রাজা শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে নতুন সংবিধান রচনা মেনে নেন।
- ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে এটি এক যুগান্তকারী ঘটনা — অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম সফল উদাহরণ।
উত্তর:
ঘটনা (১৪ জুলাই, ১৭৮৯):
প্যারিসের উত্তেজিত জনতা — শ্রমিক, কারিগর, দোকানি, সাঁকুলোত — অস্ত্র সংগ্রহের জন্য বাস্তিল দুর্গ (Bastille) আক্রমণ করে। রাজার সুইস গার্ড গুলি চালালে প্রায় ৯৮ জন নিহত। কিন্তু জনতা দুর্ভেদ্য দুর্গের ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে গভর্নর দ্য লোনেকে হত্যা করে — তার মাথা বর্শার ডগায় নিয়ে প্যারিসের রাস্তায় মিছিল।
গুরুত্ব:
- বাস্তিল ছিল রাজার স্বৈরাচারী শাসনের প্রতীক (রাজনৈতিক কারাগার — লেত্রে দ্য ক্যাশে বলে বিনা বিচারে বন্দি)।
- এই পতনের মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের প্রকৃত সূচনা — পুরাতন শাসনের পতন।
- ১৪ জুলাই — 'বাস্তিল দিবস' (Bastille Day) — ১৭৯০ সাল থেকে ফ্রান্সের জাতীয় দিবস (Fête de la Fédération)।
- ফরাসি বিপ্লবের প্রথম বিজয় — সারা বিশ্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা।
উত্তর:
মানুষ ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা (২৬ আগস্ট, ১৭৮৯): ফরাসি জাতীয় পরিষদ কর্তৃক গৃহীত ঐতিহাসিক দলিল। লাফায়েতের খসড়ায় প্রস্তুত। মার্কিন স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র (১৭৭৬) ও আলোকচিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত।
- ধারা ১: মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন এবং সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে জন্মায়। সামাজিক বৈষম্য কেবল সাধারণ কল্যাণের প্রয়োজনে হতে পারে।
- ধারা ২: সার্বভৌমত্বের উৎস জাতি — কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জাতির অনুমতি ছাড়া কর্তৃত্ব খাটাতে পারে না।
- ধারা ৩: স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তা ও অত্যাচার প্রতিরোধের অধিকার — স্বাভাবিক ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার।
- ধারা ৬: আইন সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ — সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।
- ধারা ১১: চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা — 'প্রত্যেক নাগরিক নির্ভয়ে কথা বলতে, লিখতে ও ছাপাতে পারে'।
- ধারা ১৭: সম্পত্তি অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র অধিকার।
উত্তর:
৪ আগস্ট, ১৭৮৯ — 'সামন্তপ্রথা বিলোপ' (Abolition of Feudalism): কৃষক বিদ্রোহ ও 'গ্রেট ফিয়ার'-এর প্রেক্ষিতে জাতীয় পরিষদ এক রাতের অধিবেশনে (Night of 4th August) সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটায়:
- ভূমিদাস প্রথা (Serfdom) — সম্পূর্ণ বিলোপ।
- সামন্ত কর (Feudal Dues), জমিদারি স্বত্ব, করভি (বেগার খাটা), টাইথ (ধর্মকর) — বিনা ক্ষতিপূরণে বিলোপ।
- শিকার ও কবুতর রাখার একচেটিয়া সামন্তীয় অধিকার — বিলোপ।
- সকল নাগরিকের জন্য সরকারি পদ উন্মুক্ত।
- ১৫ মার্চ, ১৭৯০ — জমির ওপর অধিকার ক্রয়-বিক্রয়ের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। ১৭ জুলাই, ১৭৯৩ — নিঃশর্ত সামন্তবাদী অধিকার বিলোপ।
এই ডিক্রি ফ্রান্সে হাজার বছরের পুরানো সামন্ততন্ত্রের আনুষ্ঠানিক সমাধি ঘটায় — পুরাতন আমলের (Old Regime) সম্পূর্ণ বিপরীত এক নতুন সমাজের সূচনা।
উত্তর:
১৭৯১ সালের সংবিধান (৩ সেপ্টেম্বর, ১৭৯১): ফ্রান্সের প্রথম লিখিত সংবিধান। সংবিধান সভা (Constituent Assembly) দুই বছর ধরে (১৭৮৯-১৭৯১) এটি রচনা করে।
- রাজার ক্ষমতা খর্ব: রাজা আর আইনের উৎস নন — আইনসভার (Legislative Assembly) হাতে সার্বভৌমত্ব। রাজার স্থগিতকারী ভেটো (Suspensive Veto) — মাত্র ৪ বছরের জন্য আইন স্থগিত রাখতে পারতেন।
- আইনসভা: ৭৪৫ সদস্যের এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা। সক্রিয় নাগরিকরা (Active Citizens — নির্দিষ্ট করদাতা পুরুষ) ভোট দিতে পারতেন। নিষ্ক্রিয় নাগরিক, নারী — ভোটাধিকারহীন।
- ৮৩টি ডিপার্টমেন্ট: প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বিচারকরা নির্বাচিত — শাসন ও আইন বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত।
- চার্চের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: 'সিভিল কনস্টিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি' (১২ জুলাই, ১৭৯০) — গির্জার ভূসম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত, যাজকদের সরকারি বেতন, পোপের কর্তৃত্বের অবসান।
- সীমিত ভোটাধিকার: মাত্র ৪৩ লক্ষ সক্রিয় নাগরিক (মোট ২৬ লক্ষের মধ্যে)।
উত্তর:
জিরোঁদিন (Girondins): নরমপন্থী প্রজাতন্ত্রবাদী — জিরোঁদ প্রদেশ থেকে আগত। প্রাদেশিক বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি। নেতা: ভার্নিও, ব্রিসো, কন্দর্সে, রোলা। মনে করত বিপ্লব শেষ হয়েছে — এখন ফ্রান্সের বাইরে ইউরোপে বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে হবে।
জ্যাকোবিন (Jacobins/Mountain): উগ্রপন্থী প্রজাতন্ত্রবাদী — প্যারিসের সাঁকুলোত ও কমিউনের সমর্থক। নেতা: রোবসপিয়ের, সেন্ট জাস্ট, কুথন, দাঁতো, মারাত। মনে করত বিপ্লব শেষ হয়নি — অভ্যন্তরীণ শত্রু ধ্বংস করতে হবে।
দ্বন্দ্বের ফলাফল:
- ৩১ মে - ২ জুন, ১৭৯৩ — সাঁকুলোতদের সমর্থনে জ্যাকোবিনরা জিরোঁদিন নেতাদের গ্রেপ্তার।
- অক্টোবর ১৭৯৩ — ২১ জন জিরোঁদিন নেতা গিলোটিনে প্রাণদণ্ড (ভার্নিও, ব্রিসো সহ)।
- মাদাম রোলাও (জিরোঁদিন নেত্রী) নিহত।
- রাজতন্ত্রীদের পাশাপাশি জিরোঁদিনদের নির্মূল → জ্যাকোবিন একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা → ১৩ মাসের সন্ত্রাসের শাসন।
উত্তর:
সন্ত্রাসের শাসনকাল (La Terreur, ২ জুলাই, ১৭৯৩ - ২৭ জুলাই, ১৭৯৪): জ্যাকোবিন নেতা রোবসপিয়েরের নেতৃত্বে ১৩ মাসের রক্তাক্ত শাসন।
প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- গণনিরাপত্তা সমিতি (Committee of Public Safety): রোবসপিয়ের, সেন্ট জাস্ট, কুথন — ১২ সদস্যের সর্বময় ক্ষমতাধর সমিতি।
- সাধারণ নিরাপত্তা সমিতি (Committee of General Security): সন্দেহভাজন ব্যক্তির তালিকা তৈরি ও পুলিশি নজরদারি।
- 'সন্দেহের আইন' (Law of Suspects, ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৭৯৩): বিপ্লব-বিরোধী সন্দেহভাজন যে কেউ অভিযুক্ত হতে পারে।
- বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল: মাত্র দুই ধরনের রায় — নির্দোষ মুক্তি বা মৃত্যুদণ্ড। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল নেই।
- গিলোটিন: 'জাতীয় রেজর' — আনুমানিক ১৭,০০০-৫০,০০০ মানুষ প্রাণদণ্ড (শুধু প্যারিসে ~২৬৩৯)।
- অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: 'সর্বোচ্চ দর আইন' (Law of Maximum) — প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ। 'রিকুইজিশন' — সেনাবাহিনীকে সরবরাহের জন্য জোরপূর্বক ফসল ও দ্রব্য সংগ্রহ।
- বিপ্লবী সংস্কৃতি: খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ — 'যুক্তির পূজা' (Cult of Reason), বিপ্লবী ক্যালেন্ডার, 'নাগরিক' (Citoyen) সম্বোধন — 'মসিয়ে'র বদলে।
উত্তর:
মাক্সিমিলিয়া রোবসপিয়ের (Maximilien Robespierre, ১৭৫৮-১৭৯৪): আরাস শহরের আইনজীবী। 'অক্ষয়' (Incorruptible) নামে পরিচিত। জ্যাকোবিন ক্লাবের সর্বোচ্চ নেতা, গণনিরাপত্তা সমিতির প্রধান। রুশোর আদর্শে বিশ্বাসী — চরম সদাচারী কিন্তু নির্দয় বিপ্লবী। সম্পূর্ণ সন্ত্রাসকে 'পুণ্যের সন্ত্রাস' বলে ন্যায্যতা দেন।
পতন (27 July 1794 / 9 Thermidor Year II):
- ১৩ মাসের সন্ত্রাসে জ্যাকোবিনদের মধ্যেই বিদ্রোহ — দাঁতো (Danton) ও হেবারপন্থীদের (Hébertists) গিলোটিনে হত্যার পর একনায়ক হয়ে পড়েন।
- 'প্রেইরিয়াল আইন' (10 June 1794) — অভিযুক্তদের কোনো প্রতিরক্ষার অধিকার নাই → বিনা সাক্ষ্যে মৃত্যুদণ্ড।
- ২৭ জুলাই, ১৭৯৪ (9 Thermidor) — ন্যাশনাল কনভেনশনে অভিযুক্ত ও গ্রেপ্তার।
- পরের দিন (28 July / 10 Thermidor) — রোবসপিয়ের, সেন্ট জাস্ট, কুথন সহ ১০৮ জন সহগামী গিলোটিনে প্রাণদণ্ড।
- থার্মিডরীয় প্রতিক্রিয়া (Thermidorian Reaction): সন্ত্রাসের সমাপ্তি → নরমপন্থীদের প্রত্যাবর্তন → শ্বেত সন্ত্রাস (White Terror) — জ্যাকোবিনদের ওপর প্রতিশোধ।
উত্তর:
ফরাসি রাজারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করতেন। সিংহাসনে বসার সময় 'রাজা তোমাদের স্পর্শ করেছেন, ঈশ্বর তোমাদের নিরাময় করুক' — এই মন্ত্রে অভিষিক্ত হতেন। চতুর্থ হেনরির আমলে লোয়ার্সে রাজাকে 'ঈশ্বরের লেফটেন্যান্ট' বলা হত। রাজা ছিলেন সমস্ত আইনের উৎস (লো রে রোয়া — রাজাই আইন) ও সর্বোচ্চ বিচারক। লেত্রে দ্য ক্যাশে (Lettre de Cachet) — রাজার স্বাক্ষরিত বিনা বিচারে যে কাউকে কারারুদ্ধ করার পরোয়ানা। রাজার ইচ্ছাই ছিল আইন — 'কারণ রাজাই তা চান' (Car tel est notre plaisir)।
উত্তর:
কারণ: ফরাসি রাজারা স্বৈরাচারীভাবে দেশ শাসন করতেন। রাজা ষোড়শ লুইয়ের আমলে 'লেত্রে দ্য ক্যাশে' (Lettre de Cachet) নামক পরোয়ানার সাহায্যে বিনা বিচারে যে কোনো সাধারণ ফরাসি নাগরিককে কারারুদ্ধ করা যেত। আবার 'লেত্রে দ্য গ্রেস' (Lettre de Grâce) জারির মাধ্যমে যে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া যেত। বিচারব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ দুর্নীতিপূর্ণ — বিচারকের পদ অর্থের বিনিময়ে কেনা যেত। বিচারকরা বংশপরম্পরায় নিযুক্ত হতেন — ন্যায়বিচার অপেক্ষা নিজেদের স্বার্থই বেশি দেখতেন। এসব কারণে ফ্রান্সকে 'রাজনৈতিক কারাগার' বলা হত।
উত্তর:
গিলোটিন (Guillotine): একটি ভারী ধারালো তির্যক ব্লেড — ওপর থেকে দ্রুত নিচে নেমে অভিযুক্ত ব্যক্তির শিরশ্ছেদ করে। এটিকে 'মানবিক মৃত্যুদণ্ড যন্ত্র' বলা হত — কারণ তাৎক্ষণিক মৃত্যু, কম যন্ত্রণাদায়ক। পূর্বে স্কটল্যান্ডে (Scottish Maiden, ১৫৬৪) ও ইতালিতে (Mannaia) প্রচলিত ছিল।
আবিষ্কার: ডা. জোসেফ ইগ্নাস গিলোটিন (Dr. Joseph-Ignace Guillotin) ১০ অক্টোবর, ১৭৮৯-এ জাতীয় পরিষদে 'যন্ত্রণাহীন অভিন্ন শিরশ্ছেদ যন্ত্র' হিসেবে প্রস্তাব দেন। আসল নির্মাতা: ডা. অঁতোয়া লুই (Dr. Antoine Louis) — তাই প্রথমে 'লুইসন' (Louison) বলা হত। প্রথম ব্যবহার: ২৫ এপ্রিল, ১৭৯২ — নিকোলাস পেলেতিয়ের (Nicolas Pelletier) নামে এক ডাকাত। সন্ত্রাসের শাসনে 'ম্যাডাম গিলোটিন', 'জাতীয় রেজর' (National Razor) — কুখ্যাত। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত (হামিদা জান্দুবি — সর্বশেষ) ফ্রান্সে মৃত্যুদণ্ডে ব্যবহৃত।
উত্তর:
গ্রেট ফিয়ার (La Grande Peur — মহাভীতি, জুলাই-আগস্ট ১৭৮৯): বাস্তিল দুর্গের পতনের (১৪ জুলাই) পর ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে এক অদ্ভুত উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গুজব ছড়ায় — ভূস্বামীরা দস্যুদল নিয়োগ করে কৃষকদের ফসল ধ্বংস ও আক্রমণ করবে, বিদেশি সেনা গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে আসছে।
ফলাফল:
- আতঙ্কিত কৃষকরা সংঘবদ্ধ হয়ে সামন্তপ্রভুদের প্রাসাদ (Château) আক্রমণ করে।
- জমিদারি নথিপত্র (Manorial Rolls/Chartriers) — যেখানে কৃষকদের সামন্তকর ও দেনার হিসাব থাকত — জ্বালিয়ে ধ্বংস করে।
- সামন্তপ্রভুরা আতঙ্কিত — ৪ আগস্ট, ১৭৮৯-এ জাতীয় পরিষদে নিজেদের সামন্তীয় অধিকার স্বেচ্ছায় ত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়।
- জাতীয় পরিষদ ঐতিহাসিক ডিক্রির মাধ্যমে সামন্তপ্রথা, ভূমিদাস প্রথা, করভি ও টাইথ বিলোপ ঘোষণা করে।
উত্তর:
| বিষয় | প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট (যাজক ও অভিজাত) | তৃতীয় এস্টেট (সাধারণ নাগরিক) |
|---|---|---|
| জনসংখ্যা | ~২-৩% | ~৯৭% |
| ভূসম্পত্তির মালিকানা | ~৩০-৩৫% | ~৬৫-৭০% (কিন্তু মাথাপিছু অনেক কম) |
| মোট সম্পদের মালিকানা | ~৯৫% | ~৫% |
| রাজস্ব প্রদান | ~৫% (প্রায় করমুক্ত) | ~৯৫% (সমস্ত করভার) |
| রাজনৈতিক অধিকার | সমস্ত সুবিধাভোগী | অধিকারহীন |
| সামাজিক মর্যাদা | উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন | মর্যাদাহীন (অপমানকর কর ও বেগার) |
উত্তর:
ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ইউরোপের অন্যান্য দেশের স্বৈরাচারী রাজাদের জন্য হুমকি ছিল। ২১ জানুয়ারি, ১৭৯৩-এ রাজা ষোড়শ লুইয়ের প্রাণদণ্ডের পর ইউরোপীয় রাজশক্তিগুলি ভীত ও ক্ষুব্ধ হয়। ১৭৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, স্পেন, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, সার্ডিনিয়া, নেপলস — মিলিত হয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রথম কোয়ালিশন (First Coalition) গঠন করে। লক্ষ্য ছিল ফরাসি বিপ্লব ধ্বংস করে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ১৭৯৫-৯৭ সালের মধ্যে ফ্রান্স প্রথম কোয়ালিশনকে পরাজিত করে (ব্যাসেল চুক্তি — ১৭৯৫, কাম্পো ফর্মিও চুক্তি, ১৭৯৭)।
উত্তর:
উৎপত্তি: ১৭৮৯ সালে ভার্সাইয়ে 'Society of the Friends of the Constitution' নামে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত। প্যারিসে স্থানান্তরের পর সেন্ট জ্যাকোব (St. Jacques) মঠে সভা হত বলে 'জ্যাকোবিন ক্লাব' নামে পরিচিত।
বিকাশ: শুরুতে মিরাবো, সিয়েস, লাফায়েতের মতো নরমপন্থীদের ক্লাব ছিল। ১৭৯১ সালের ১৭ জুলাই চম্প দ্য মার্স (Champ de Mars) গণহত্যার পর নরমপন্থীরা ফইয়ো ক্লাব (Feuillants) গঠন করে বেরিয়ে যান। পরে রোবসপিয়ের, সেন্ট জাস্ট, কুথন, দাঁতো, মারাত, হেবার-এর নেতৃত্বে উগ্রপন্থী ও প্রজাতন্ত্রবাদী হয়ে ওঠে। ১৭৯৩-৯৪ সালে রোবসপিয়েরের পতনের পর ক্লাবটি ১২ নভেম্বর, ১৭৯৪-এ নিষিদ্ধ হয়।
উত্তর:
প্রথম আক্রমণ (১০ আগস্ট, ১৭৯২): ব্রান্সউইক ইশতেহারের (২৫ জুলাই) হুমকিতে ক্ষুব্ধ প্যারিসের সাঁকুলোত ও ফেদেরে সৈন্যরা টুইলেরি প্রাসাদ আক্রমণ করে। সুইস গার্ডের সাথে তুমুল যুদ্ধ — ৬০০ সুইস গার্ড নিহত। রাজা আইনসভায় আশ্রয় নেন। ফলাফল: রাজতন্ত্রের স্থগিতাদেশ, আইনসভার বিলোপ, জাতীয় কনভেনশনের নির্বাচন, প্রজাতন্ত্র ঘোষণা (২২ সেপ্টেম্বর, ১৭৯২)।
দ্বিতীয় আক্রমণ (৩১ মে - ২ জুন, ১৭৯৩): জ্যাকোবিন ও সাঁকুলোতরা জাতীয় কনভেনশন ঘেরাও করে জিরোঁদিন নেতাদের গ্রেপ্তার ও বরখাস্ত দাবি করে। কনভেনশন বাধ্য হয় — ২৯ জন জিরোঁদিন নেতা গৃহবন্দি। ফলাফল: জিরোঁদিনদের পতন, জ্যাকোবিন একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসের শাসনের সূচনা।
উত্তর:
সিভিল কনস্টিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি (১২ জুলাই, ১৭৯০): জাতীয় পরিষদের প্রণীত আইন — চার্চের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা:
- চার্চের ভূসম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত।
- যাজকদের সংখ্যা কমানো — ডায়োসিসের সংখ্যা ১৩৫ থেকে ৮৩।
- বিশপ ও যাজকরা আর পোপ কর্তৃক নিযুক্ত নয় — সাধারণ নাগরিকদের মতো নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্ত হবেন।
- যাজকরা সরকারি বেতন পাবেন।
- যাজকদের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে হবে।
ফলাফল: পোপ ষষ্ঠ পায়াস নিন্দা জানান। ফরাসি যাজকরা দুই ভাগে বিভক্ত: 'শপথকারী যাজক' (Juring Priests — সংবিধান মেনে নেওয়া) ও 'অ-শপথকারী যাজক' (Non-juring/Refractory Priests — পোপের অনুগত)। গভীর ধর্মীয় বিভাজন — অনেক ক্যাথলিক কৃষক বিপ্লবের বিরোধী হয়। ভাঁদে (Vendée) অঞ্চলে তীব্র প্রতিবিপ্লবী বিদ্রোহ। ১৮০১ সালে নেপোলিয়ন পোপের সাথে কনকর্ড্যাট (Concordat) করে সমাধান।
উত্তর:
চম্প দ্য মার্স হত্যাকাণ্ড (১৭ জুলাই, ১৭৯১): রাজা ভারেন (Varennes)-এ পালানোর চেষ্টার (২০-২১ জুন, ১৭৯১) পর কর্ডেলিয়ার্স ক্লাব ও জ্যাকোবিনরা রাজার পদত্যাগ ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে চম্প দ্য মার্সে শান্তিপূর্ণ পিটিশনে স্বাক্ষর করতে সমবেত হয়।
মেয়র বাইয়ি (Bailly)-অনুমোদিত লাফায়েতের (Lafayette) নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল গার্ড নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালায়। আনুমানিক ৫০ জন নিহত।
ফলাফল: জ্যাকোবিন ক্লাবে ভাঙন — নরমপন্থীরা (বান্দর্ভ, লাফায়েত) ফইয়ো ক্লাব গঠন করে বেরিয়ে যান। রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রপন্থীদের মধ্যে বিভাজন চূড়ান্ত হয়। রাজার প্রতি আস্থা নষ্ট — প্রজাতন্ত্রের দাবি জোরালো হয়।
উত্তর:
অস্ট্রিয়ার রাজকন্যা মেরি আঁতোয়ানেত (Marie Antoinette) — ষোড়শ লুইয়ের রানি। ফ্রান্সের জনগণের কাছে 'অস্ট্রিয়ান নারী' (L'Autrichienne) নামে অপছন্দের। বিলাসী জীবনযাপন — 'মাদাম ডেফিসিট' (Madame Déficit/খরুচে ম্যাডাম) নামে কুখ্যাত।
ভাই অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় লিওপোল্ডের সাথে গোপন চিঠিপত্র — ফ্রান্স আক্রমণের ষড়যন্ত্র। ১৭৯১ সালের জুনে রাজাকে ভারেন পালাতে প্ররোচিত।
পরিণতি: ১০ আগস্ট ১৭৯২-এর পর রাজপরিবারের সাথে কারারুদ্ধ। 'বিধবার ক্যাপেট' (Widow Capet) — রাজার মৃত্যুদণ্ডের পর। ১৪ অক্টোবর, ১৭৯৩ — ট্রাইব্যুনালে বিচার: রাষ্ট্রদ্রোহ, ষড়যন্ত্র, এমনকি নিজের পুত্রের সাথে অজাচারের (Incest) অভিযোগ। ১৬ অক্টোবর, ১৭৯৩ — গিলোটিনে প্রাণদণ্ড। ফরাসি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতনের প্রতীক।
উত্তর:
কর্ডেলিয়ার্স ক্লাব (Club des Cordeliers): ১৭৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত উগ্রপন্থী ক্লাব। প্যারিসের কর্ডেলিয়ার্স মঠে (Franciscan Friary) সভা হত বলে এই নাম। আনুষ্ঠানিক নাম: 'Society of the Friends of the Rights of Man and of the Citizen' (মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের বন্ধু সমিতি)।
বৈশিষ্ট্য:
- সদস্যফি মাত্র ৪ (সৌঁ) — সাধারণ শ্রমিক, কারিগর, সাঁকুলোতদের ক্লাব।
- বিখ্যাত সদস্য: দাঁতো (Danton), মারাত (Marat), কামিই দুমুলা (Camille Desmoulins), হেবার (Hébert), ল্যজঁদ্র (Legendre)।
- ১৭৯১ সালের চম্প দ্য মার্স পিটিশনের সূচনাকারী — প্রজাতন্ত্রের দাবি।
- 'কর্ডেলিয়ার্স' জ্যাকোবিনদের চেয়েও উগ্রপন্থী — দাঁতো ও হেবার-এর মৃত্যুদণ্ড (১৭৯৪)-এর পর ক্লাবটি নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। এপ্রিল ১৭৯৪-এ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
উত্তর:
- জনগণের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ: শহরের সাঁকুলোত, কৃষক, বুর্জোয়া — সমাজের নিচুতলার মানুষ একজোট হয়ে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
- দুর্বল রাজতন্ত্র: ষোড়শ লুই দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত রাজা — সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ।
- অর্থনৈতিক সংকট: ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কট, খাদ্যাভাব ও বেকারত্ব — জনগণকে বিপ্লবের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
- দার্শনিকদের চেতনা: মন্টেস্কু, ভলতেয়ার, রুশো, দিদেরো-র লেখনী পুরাতন সমাজ ও স্বৈরাচারের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল — জনগণের মধ্যে অধিকার সচেতনতা জাগিয়েছিল।
- সেনাবাহিনীর সমর্থন: ন্যাশনাল গার্ড ও ফেদেরে (Fédérés — প্রাদেশিক স্বেচ্ছাসেবক) সৈন্যরা বিপ্লবের পক্ষে যোগ দেয়। ভালমির যুদ্ধে (১৭৯২) বিপ্লবী বাহিনীর বিজয় বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখে।
উত্তর:
ইউরোপে প্রভাব:
- ফ্রান্সে পুরাতন আমল (Old Regime)-এর চিরবিদায় — দৈবরাজতন্ত্র, সামন্তপ্রথা, চার্চের আধিপত্যের অবসান।
- জাতীয়তাবাদের উন্মেষ — আগে রাজার প্রতি আনুগত্য ছিল জাতীয়তাবাদ, এখন দেশ ও জাতির প্রতি আনুগত্য।
- ইংল্যান্ডে টমাস পেইনের 'Rights of Man' (১৭৯১), আয়ারল্যান্ডে উলফ টোন-এর 'জাতীয়তাবাদী আন্দোলন'।
- বেলজিয়াম — ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে স্বাধীনতা আন্দোলন → ১৮৩০ সালে বেলজিয়াম যুক্তরাষ্ট্র গঠন।
- পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি — কৃষক বিদ্রোহ, সংস্কার আন্দোলন।
ভারতে প্রভাব:
- টিপু সুলতান — জ্যাকোবিন ক্লাবের সদস্যপদ, 'স্বাধীনতার বৃক্ষ' (Tree of Liberty) রোপণ, ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসি সাহায্য প্রার্থনা।
- ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা ও সাম্যের আদর্শ পরবর্তী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
উত্তর:
যারা ফরাসি বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তারাই 'বিপ্লবের সন্তান'। সাঁকুলোত, বুর্জোয়া, নারী — তৃতীয় এস্টেটের নানা অংশ। অ্যালবার্ট সোবুল (Albert Soboul) তাঁর 'The Sans-Culottes' গ্রন্থে দেখিয়েছেন — 'বিপ্লব অনেকাংশেই ছিল তাদেরই সৃষ্টি'। ১৪ জুলাই বাস্তিল আক্রমণ, ৫ অক্টোবর ভার্সাই যাত্রা, ১০ আগস্ট টুইলেরি আক্রমণ, ৩১ মে-২ জুন জিরোঁদিন উৎখাত — এই সব গণ-অভ্যুত্থানে তারাই প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। তাদের চাপে জাতীয় সভা সংস্কার করতে বাধ্য হয়েছিল।
উত্তর:
রাজতন্ত্র বিলোপের পর প্রজাতন্ত্রী ফ্রান্সে রাজাকে 'নাগরিক লুই কাপে' (Citizen Louis Capet) বলা হত। 'কাপে' (Capet) হল ফরাসি রাজাদের প্রাচীন রাজবংশীয় নাম — হিউ কাপে (Hugh Capet, ৯৮৭-৯৯৬) থেকে। এটি ব্যবহারের মাধ্যমে রাজাকে তাঁর 'রাজকীয়' মর্যাদা থেকে সাধারণ নাগরিকের স্তরে নামিয়ে আনা হয়। 'মসিয়ে' (Monsieur) বদলে 'সিটোয়াঁ' (Citoyen/Nাগরিক)। বিচারে (ডিসেম্বর ১৭৯২) 'নাগরিক লুই কাপে' নামেই অভিযুক্ত করা হয়। এটি ছিল প্রতীকীভাবে রাজতন্ত্রের অপমান।
উত্তর:
১০ মে, ১৭৯৩ সালে পলিনা লেওঁ (Pauline Léon) ও ক্লেয়ার লাকোম্ব (Claire Lacombe) 'সোসাইটি অফ রেভলুশনারি রিপাবলিকান উইমেন' (Société des Républicaines Révolutionnaires) প্রতিষ্ঠা করেন। সদস্য ছিল প্রায় ২০০ নারী — মূলত সাঁকুলোত শ্রেণির। তারা লাল স্বাধীনতার টুপি (Bonnet Rouge) পরতেন। দামি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি (Maximum) ও বিপ্লব-বিরোধীদের কঠোর শাস্তির দাবি করতেন।
কিন্তু জ্যাকোবিন পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব — ৩০ অক্টোবর, ১৭৯৩-এ জাতীয় কনভেনশন সমস্ত নারী ক্লাব ও রাজনৈতিক সমিতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ওলাঁপ দ্য গুজ (Olympe de Gouges) ১৭৯১-এ 'নারীর অধিকার ঘোষণা' লেখার জন্য ১৭৯৩-এ গিলোটিনে প্রাণদণ্ডিতা হন।
উত্তর:
সর্বোচ্চ দর আইন (Loi du Maximum): সন্ত্রাসের শাসনকালে (৪ মে, ১৭৯৩) প্রণীত অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আইন। যুদ্ধকালীন সংকটে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ ও সেনাবাহিনীকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে।
- রুটি, আটা, মাংস, তেল, লবণ, সাবানের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ।
- যে কেউ মজুতদারি করলে মৃত্যুদণ্ড।
- কৃষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক নির্দিষ্ট মূল্যে ফসল সংগ্রহ (Réquistion)।
ফলাফল: কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কালোবাজারী শুরু করে। দ্রব্যের সরবরাহ কমে যায়। থার্মিডরীয় প্রতিক্রিয়ার পর (ডিসেম্বর ১৭৯৪) আইনটি বাতিল করা হয় — পুনরায় মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি।
উত্তর:
মাক্সিমিলিয়া রোবসপিয়ের ছিলেন চরম বিরোধাভাসপূর্ণ চরিত্র। একদিকে 'অক্ষয়' (Incorruptible) — ব্যক্তিগত জীবনে সম্পূর্ণ সৎ, সরল ও নৈতিকতাবাদী। রুশোর শিষ্য — পুণ্য ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। অন্যদিকে নির্দয় — 'পুণ্য ছাড়া সন্ত্রাস ভয়ঙ্কর, সন্ত্রাস ছাড়া পুণ্য অসহায়'। তথাকথিত 'পুণ্যের সন্ত্রাস' (Reign of Virtue) কায়েম করতে গিয়ে ১৭,০০০-৫০,০০০ মানুষকে গিলোটিনে পাঠিয়েছেন। দাঁতো, মারাত, হেবার-এর মতো সহযোদ্ধাদেরও শেষ করেছেন। শেষে তিনিও যে গিলোটিনে প্রাণ দেন — তা ইতিহাসের এক চরম পরিহাস।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
9 টিফরাসি বিপ্লবের কারণসমূহ (১৭৮৯)
১. সামাজিক কারণ:
- তিন এস্টেটে সমাজ বিভাজন: প্রথম (যাজক), দ্বিতীয় (অভিজাত) — করমুক্ত, তৃতীয় (সাধারণ নাগরিক — ৯৭%) — সমস্ত করভার কিন্তু রাজনৈতিক অধিকারহীন। ৯৫% সম্পদ ছিল প্রথম দুই এস্টেটের হাতে, অথচ ৯৫% রাজস্ব আসত তৃতীয় এস্টেট থেকে।
- সামন্ততান্ত্রিক কর: টাইথ (ধর্মকর — ফসলের ১/১০মাংশ), করভি (বেগার খাটা), তাই (প্রত্যক্ষ কর), গাবেল (লবণ কর)।
- বুর্জোয়াদের অসন্তোষ: শিক্ষিত, বিত্তশালী হলেও অভিজাত মর্যাদা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। অ্যাবে সিয়েস: 'তৃতীয় এস্টেট কী? সবকিছু। রাজনীতিতে কী? কিছুই না। কী হতে চায়? কিছু হতে।'
২. অর্থনৈতিক কারণ:
- ব্যয়বহুল যুদ্ধ: স্পেনের উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭০২-১৭১৩), অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭৪০-১৭৪৮), সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩), আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৮) — চারটি যুদ্ধে প্রায় ৪০০ কোটি লিভর ব্যয়।
- রাজা ও রানির বিলাসিতা: ভার্সাই প্রাসাদ — রানি মেরি আঁতোয়ানেতের ৫০০ সহচরী, ৩ মাসের কাজের জন্য সারা বছরের বেতন।
- বিষম করব্যবস্থা: অ্যাডাম স্মিথ ফ্রান্সের অর্থনীতিকে 'বাত্ত অর্থনীতির জাদুঘর' বলেন।
- মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষ: ১৭৮৮-৮৯ সালে শস্যহানি — একজন দিনমজুরের আয়ের ৭৫% রুটি কিনতে ব্যয় হত।
৩. রাজনৈতিক কারণ:
- দৈবরাজতন্ত্র: রাজা নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করতেন। লেত্রে দ্য ক্যাশে — বিনা বিচারে কারারুদ্ধ। বিচারব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত।
- প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: ১৭৫ বছর এস্টেট জেনারেল না ডাকা।
৪. বৌদ্ধিক কারণ (দার্শনিকদের ভূমিকা):
- মন্টেস্কু: ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ (Separation of Powers) — 'দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ' (১৭৪৮)।
- ভলতেয়ার: স্বৈরাচার ও ধর্মান্ধতার সমালোচনা — 'কাঁদিদ' (১৭৫৯)।
- রুশো: সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব — 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' (১৭৬২)।
- দিদেরো ও দালামবেয়ার: বিশ্বকোষ (Encyclopédie, ১৭৫১-১৭৭২) — স্বৈরাচার ও পুরাতন সমাজের সমালোচনা।
টেনিস কোর্ট থেকে বাস্তিল পতন — ৪৬ দিনের বিপ্লব
এস্টেট জেনারেলের অধিবেশন (৫ মে, ১৭৮৯): প্রায় ১৭৫ বছর পর রাজা আর্থিক সংকট মেটাতে তিনটি এস্টেটের প্রতিনিধি সভা (Estates General) ডাকেন। প্রথা অনুযায়ী প্রতিটি এস্টেটের একট করে ভোট — প্রথম দুই এস্টেট একজোট হয়ে তৃতীয় এস্টেটকে সবসময় পরাজিত করত। তৃতীয় এস্টেট মাথাপিছু ভোট দাবি করলে রাজা মানলেন না।
জাতীয় পরিষদ ঘোষণা (১৭ জুন, ১৭৮৯): অ্যাবে সিয়েসের প্রস্তাবে তৃতীয় এস্টেট নিজেদের 'জাতীয় পরিষদ' (National Assembly) — ফ্রান্সের জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি সভা বলে ঘোষণা করে। কর ধার্যের অধিকার একমাত্র তাদেরই — ঘোষণা দেয়। ১৯ জুন যাজকদের একাংশ (১৪৯ জন) যোগ দেন।
টেনিস কোর্টের শপথ (২০ জুন, ১৭৮৯): রাজা সভাকক্ষ তালাবন্ধ করে দেন। প্রতিনিধিরা নিকটবর্তী টেনিস কোর্টে সমবেত হয়ে জ্যাঁ বাইয়ির নেতৃত্বে ঐতিহাসিক শপথ নেন।
রাজার ছাড় (২৩ জুন): 'রয়্যাল সেশন'-এ রাজা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও তিন-এস্টেট ভোটব্যবস্থা বহাল রাখেন। মিরাবোর বিখ্যাত উক্তি: 'আমরা জনগণের ইচ্ছায় এসেছি — কেবল বেয়নেটের জোরে এখান থেকে সরানো যাবে!'
বাস্তিল দুর্গের পতন (১৪ জুলাই, ১৭৮৯): নেকার-সহ জনপ্রিয় মন্ত্রীদের বরখাস্ত, প্যারিসের আশেপাশে রাজকীয় সেনা সমাবেশ — উত্তেজিত জনতা অস্ত্রের সন্ধানে বাস্তিল আক্রমণ করে।
গুরুত্ব: এই ৪৬ দিন ফ্রান্সের ইতিহাসে যুগান্তকারী — পুরাতন আমলের অবসানের সূচনা। টেনিস কোর্টের শপথ — রাজার বিরুদ্ধে প্রথম প্রত্যক্ষ সংগঠিত বিদ্রোহ, বাস্তিল পতন — বিপ্লবের প্রতীকী বিজয়। এই ঘটনাসূত্র 'গ্রেট ফিয়ার', সামন্তপ্রথা বিলোপ, মানবাধিকার ঘোষণা — বিপ্লবের গতিকে অপরিবর্তনীয় করে তোলে।
ফরাসি বিপ্লবের দশক (১৭৮৯-১৭৯৯) — পর্যায়ক্রমিক ঘটনাপঞ্জি
| বছর | ঘটনা | গুরুত্ব |
|---|---|---|
| ১৭৮৯ | এস্টেট জেনারেল → টেনিস কোর্টের শপথ → বাস্তিল পতন → সামন্তপ্রথা বিলোপ → মানবাধিকার ঘোষণা | পুরাতন আমলের (Old Regime) অবসান |
| ১৭৯০ | সিভিল কনস্টিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি | চার্চের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ |
| ১৭৯১ | রাজার ভারেন পলায়ন → চম্প দ্য মার্স হত্যাকাণ্ড → ১৭৯১ সালের সংবিধান | সাংবিধানিক রাজতন্ত্র |
| ১৭৯২ | ব্রান্সউইক ইশতেহার → ১০ আগস্ট টুইলেরি আক্রমণ → সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ড → ভালমির যুদ্ধ → প্রজাতন্ত্র ঘোষণা | রাজতন্ত্রের পতন, প্রথম প্রজাতন্ত্র |
| ১৭৯৩ | রাজার মৃত্যুদণ্ড (২১ জানুয়ারি) → জিরোঁদিনদের পতন → জ্যাকোবিন প্রজাতন্ত্র → সন্ত্রাসের শাসন শুরু | জ্যাকোবিন একনায়কত্ব |
| ১৭৯৪ | দাঁতো ও হেবার-এর মৃত্যুদণ্ড → থার্মিডরীয় প্রতিক্রিয়া (২৭ জুলাই) → রোবসপিয়েরের মৃত্যুদণ্ড | সন্ত্রাসের শাসনের অবসান |
| ১৭৯৫ | দিরেক্টরি শাসন প্রতিষ্ঠা | নরমপন্থী প্রজাতন্ত্র |
| ১৭৯৬-৯৭ | ইতালি অভিযান → নেপোলিয়নের উত্থান | সামরিক নায়কের আবির্ভাব |
| ১৭৯৯ | ব্রুমের ক্যু (নভেম্বর) — নেপোলিয়ন প্রথম কনসাল হন | দিরেক্টরির পতন, কনসুলেট শাসন, বিপ্লবের সমাপ্তি |
সন্ত্রাসের শাসনকাল (La Terreur): ২ জুলাই, ১৭৯৩ - ২৭ জুলাই, ১৭৯৪
উত্থানের কারণ:
- বিদেশি কোয়ালিশনের আক্রমণ (প্রথম কোয়ালিশন — ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, স্পেন, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া) — ফ্রান্সের অস্তিত্ব বিপন্ন।
- অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবী বিদ্রোহ — ভাঁদে (Vendée) ও দক্ষিণ ফ্রান্সে ব্যাপক বিদ্রোহ।
- জিরোঁদিনদের পতনের পর জ্যাকোবিনরা সর্বময় ক্ষমতায় — রোবসপিয়েরের 'পুণ্য ও সন্ত্রাস' তত্ত্ব।
প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- গণনিরাপত্তা সমিতি (Committee of Public Safety): ১২ সদস্য — রোবসপিয়ের, সেন্ট জাস্ট, কুথন, কার্নো (যুদ্ধমন্ত্রী) — নিরঙ্কুশ ক্ষমতা।
- 'সন্দেহের আইন' (17 September 1793): যে কেউ বিপ্লব-বিরোধী সন্দেহভাজন হতে পারে — অভিযুক্তের সংখ্যা ৫ লক্ষ ছাড়ায়।
- বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল: মাত্র দুই ধরনের রায় — নির্দোষ বা মৃত্যুদণ্ড। আপিল নেই। গিলোটিন 'জাতীয় রেজর' — প্রায় ১৭,০০০-৫০,০০০ সরকারি মৃত্যুদণ্ড।
- অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: 'সর্বোচ্চ দর আইন' (Law of Maximum) — দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ; রিকুইজিশন।
- খ্রিস্টধর্ম নির্মূল: 'যুক্তির পূজা' (Cult of Reason — ১০ নভেম্বর, ১৭৯৩), পরে রোবসপিয়েরের 'সর্বোচ্চ সত্তার পূজা' (Cult of the Supreme Being — ৮ জুন, ১৭৯৪)।
- নেতাদের হত্যা: মারাত (হত্যা ১৩ জুলাই, ১৭৯৩), মেরি আঁতোয়ানেত (১৬ অক্টোবর), জিরোঁদিন নেতৃবৃন্দ (২১ জন, অক্টোবর), দাঁতো ও হেবার (মার্চ-এপ্রিল, ১৭৯৪)।
থার্মিডরীয় প্রতিক্রিয়া (27 July 1794 / 9 Thermidor):
- রোবসপিয়েরের একনায়কত্বের বিরুদ্ধে কনভেনশনে ষড়যন্ত্র — গ্রেপ্তার → গিলোটিন।
- জ্যাকোবিন ক্লাব বন্ধ (১২ নভেম্বর, ১৭৯৪)।
- সন্ত্রাসের যন্ত্রপাতি (Tribunal, Maximum) বাতিল → নরমপন্থীদের পুনরুত্থান।
- 'শ্বেত সন্ত্রাস' (White Terror) — জ্যাকোবিন ও সন্ত্রাসের সাথে জড়িতদের ওপর প্রতিশোধ।
- অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্তি → মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষ প্রত্যাবর্তন।
- নতুন বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র — দিরেক্টরি শাসন (১৭৯৫-১৭৯৯)।
জাতীয়/সংবিধান সভা — কার্যাবলি (১৭৮৯-১৭৯১)
গঠন: ৭ জুলাই, ১৭৮৯। টেনিস কোর্টের শপথের পর তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা + একাংশ যাজক ও অভিজাত। ৩০ সদস্যের সংবিধান সমিতি — মুনিয়ের, বান্দর্ভ, লাফায়েত, মিরাবো, ট্যালির্যাঁ, আবে সিয়েস, রোবসপিয়ের প্রমুখ।
প্রধান সংস্কার (৪টি ভাগে):
১. সামন্তবাদী সংস্কার (৪ আগস্ট, ১৭৮৯):
- ভূমিদাস প্রথা সম্পূর্ণ বিলোপ।
- সামন্ত কর, করভি, টাইথ, জমিদারি অধিকার বিলোপ।
- সকল নাগরিকের জন্য সরকারি পদ উন্মুক্ত।
২. শাসনতান্ত্রিক সংস্কার:
- মানুষ ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা (২৬ আগস্ট, ১৭৮৯)।
- ১৭৯১ সালের সংবিধান — রাজার স্থগিতকারী ভেটো, এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, সীমিত ভোটাধিকার (সক্রিয় নাগরিক — ~৪৩ লক্ষ ভোটার)।
- প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ — ফ্রান্স ৮৩টি ডিপার্টমেন্টে বিভক্ত।
৩. চার্চ সংস্কার:
- 'সিভিল কনস্টিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি' (১২ জুলাই, ১৭৯০) — চার্চের ভূসম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত।
- যাজকদের নির্বাচন ও সরকারি বেতন — পোপের কর্তৃত্ব খর্ব।
৪. অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় সংস্কার:
- চার্চের ভূসম্পত্তি বিক্রি করে 'অ্যাসাইন্যা' (Assignat) নামে কাগজি মুদ্রা ছাপানো।
- অভ্যন্তরীণ শুল্কবিভাগ উচ্ছেদ — একক ফরাসি বাজার সৃষ্টি।
- পুরাতন পার্লেমঁ (Parlements) বিলোপ — নির্বাচিত বিচারক, জুরি প্রথা, নির্যাতনের অবসান।
গুরুত্ব:
এই দুই বছর ফ্রান্সকে এক নতুন যুগে নিয়ে যায় — পুরাতন আমলের (Ancien Régime) সমস্ত ভিত্তি (দৈবরাজতন্ত্র, সামন্তপ্রথা, চার্চের আধিপত্য, অসম আইন) ধ্বংস করে। ইউরোপের প্রথম লিখিত সংবিধান রচিত — যা অন্যান্য দেশের জন্য মডেল হয়ে ওঠে। আইনসভার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত — রাজা এখন 'জনগণের প্রতিনিধি' মাত্র।
ফরাসি বিপ্লবে নারীর ভূমিকা
১৭৮৯-১৭৯৫ সালের বিপ্লবে ফ্রান্সের নারীরা ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে সক্রিয় ছিলেন — কিন্তু পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত বিপ্লবী নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
প্রধান ভূমিকা:
- অক্টোবর দিবস (৫-৬ অক্টোবর, ১৭৮৯): প্রায় ৭০০০ প্যারিসীয় নারী (মৎস্যজীবিনী, বাজার-নারী) রুটির অভাবে ১২ মাইল হেঁটে ভার্সাই প্রাসাদে গিয়ে রাজাকে প্যারিসে ফিরিয়ে আনে — ইতিহাসে 'নারীদের মার্চ' (Women's March on Versailles) — ফরাসি বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
- বাস্তিল আক্রমণ (১৪ জুলাই, ১৭৮৯): বহু নারী অস্ত্র হাতে অংশ নেয়।
- টুইলেরি আক্রমণ (১০ আগস্ট, ১৭৯২): নারীরা বিপ্লবী মিলিশিয়া হিসেবে লড়াই করে।
- নারী ক্লাব: পলিনা লেওঁ ও ক্লেয়ার লাকোম্ব-এর 'Society of Revolutionary Republican Women' (মে ১৭৯৩) — প্রায় ২০০ সদস্য, লাল টুপি পরিধান।
- ওলাঁপ দ্য গুজ (Olympe de Gouges, ১৭৪৮-১৭৯৩): 'নারীর অধিকার ঘোষণাপত্র' (Declaration of the Rights of Woman, ১৭৯১) — ১৭টি ধারা (মানুষের অধিকার ঘোষণার প্রত্যুত্তরে)। 'নারী গিলোটিনে ওঠার অধিকার রাখে — তাহলে মঞ্চে ওঠার অধিকারও রাখা উচিত।' ১৭৯৩-এ গিলোটিনে প্রাণদণ্ড।
- মাদাম রোলা (Madame Roland, ১৭৫৪-১৭৯৩): জিরোঁদিন নেত্রী, বিখ্যাত স্যালন (Salon) পরিচালিকা। গিলোটিনের সামনে শেষ কথা: 'ওহ স্বাধীনতা! তোমার নামে কত অপরাধ!' (O Liberté, que de crimes on commet en ton nom!)।
হতাশা:
- ৩০ অক্টোবর, ১৭৯৩ — জাতীয় কনভেনশন সমস্ত নারী রাজনৈতিক ক্লাব ও সমিতি নিষিদ্ধ করে।
- নারীরা ১৭৯১ সালের সংবিধানে 'নিষ্ক্রিয় নাগরিক' (Passive Citizens) — ভোটাধিকারহীন।
- জ্যাকোবিনদের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি — নারীর স্থান গৃহে, রাজপথে নয়।
- বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল 'স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব' — কিন্তু নারীরা এই 'ভ্রাতৃত্বের' (Fraternité — Brotherhood) বহির্ভূত। ফ্রান্সে নারী ভোটাধিকার আসে শুধু ১৯৪৪ সালে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর) — বিপ্লবের ১৫৫ বছর পর!
'বিপ্লব তার সন্তানদেরই গ্রাস করে'
ফরাসি বিপ্লবের বিখ্যাত এই উক্তি প্রথম করেছিলেন ভার্নিও (Vergniaud) — জিরোঁদিন নেতা — নিজের মৃত্যুদণ্ডের আগে: 'বিপ্লব শনির মতো — সে তার নিজের সন্তানদেরই গ্রাস করে।' (La Révolution est comme Saturne, elle dévore ses propres enfants.)
উদাহরণ — বিপ্লবের নেতাদের পরিণতি:
- মিরাবো (Mirabeau, ১৭৪৯-১৭৯১): তৃতীয় এস্টেটের প্রথম বড় নেতা, রাজার সাথে গোপন আঁতাত — স্বাভাবিক মৃত্যু, কিন্তু পরে বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ হলে প্যান্থেওঁ থেকে দেহ সরিয়ে নেওয়া হয়।
- মারাত (Marat, ১৭৪৩-১৭৯৩): 'জনগণের বন্ধু' (L'Ami du Peuple) — ১৩ জুলাই, ১৭৯৩-এ শার্লট কর্ডের ছুরিকাঘাতে নিহত।
- জিরোঁদিন নেতৃবৃন্দ (২১ জন, অক্টোবর ১৭৯৩): ভার্নিও, ব্রিসো, মাদাম রোলা — সবাই গিলোটিনে।
- হেবার ও হেবারপন্থীরা (Hébertists, মার্চ ১৭৯৪): অতি-উগ্রপন্থী — রোবসপিয়ের এদের 'বিপ্লবের শত্রু' বলে গিলোটিনে পাঠান।
- দাঁতো ও দাঁতোপন্থীরা (Dantonists/Indulgents, ৫ এপ্রিল, ১৭৯৪): সন্ত্রাস বন্ধের দাবি জানানোয় দ্রুত বিচার, কোনো প্রতিরক্ষা ছাড়াই গিলোটিনে। গিলোটিনের মঞ্চে শেষ কথা: 'আমার মাথা জনগণকে দেখিও — এটা দেখার মতো!'।
- রোবসপিয়ের (২৭ জুলাই, ১৭৯৪): 'অক্ষয়' — একনায়কত্বের অভিযোগে গ্রেপ্তার। পরদিন গিলোটিনে। বড়ই পরিহাস — যে গিলোটিন তিনি এতদিন চালিয়েছেন, শেষে নিজেই সেখানে প্রাণ দেন।
এই নির্মম পরিণতি ফরাসি বিপ্লবের ভয়াবহতম বৈপরীত্য — যাঁরা বিপ্লব শুরু ও চালনা করেছিলেন, সময়ের প্রয়োজনে বিপ্লবের পরবর্তী ধাপে তাঁরাই 'প্রতিক্রিয়াশীল' গণ্য হয়ে ধ্বংস হন।
ফ্রান্স — 'বাত্ত অর্থনীতির জাদুঘর'
অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) তাঁর 'ওয়েলথ অফ নেশনস' (১৭৭৬) গ্রন্থে তৎকালীন ফরাসি অর্থনীতিকে 'বাত্ত অর্থনীতির জাদুঘর' (Museum of Economic Errors) বলে অভিহিত করেছিলেন।
কারণসমূহ:
- বিষম করব্যবস্থা: করভার সম্পূর্ণ বর্তাত তৃতীয় এস্টেটের ওপর। টাইথ (ফসলের দশমাংশ চার্চকে), করভি (বিনা পারিশ্রমিকে রাস্তা সারাই), তাই (Taille — প্রত্যক্ষ কর), গাবেল (Gabelle — লবণ কর — লবণ ৬০ গুণ বেশি দামে কিনতে হত)। অথচ যাজক ও অভিজাতরা করমুক্ত — 'রক্তের কর' (Impôt du sang) ছাড়া।
- ব্যয়বহুল যুদ্ধ: চারটি বড় যুদ্ধে ৪০০ কোটি লিভর ব্যয়, কিন্তু কর-রাজস্ব ছিল অপ্রতুল।
- সরকারি ঋণ ও সুদ: রাজস্ব আয়ের ৫০% যেত ঋণের সুদ পরিশোধে। ১৭৮৬ সালে একা সুদবাবদ ছিল ৩১ কোটি ৮০ লক্ষ লিভর।
- কর আদায়ের বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা: 'ফারম জেনেরাল' (Ferme Générale) — ঠিকাদাররা কর আদায় করত, জনগণের কাছ থেকে বেশি আদায় করে মুনাফা করত — ১৭৯১ সালে নিষিদ্ধ হয়।
- অভ্যন্তরীণ শুল্কবিভাগ (Internal Customs): এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে পণ্য নিতে শুল্ক দিতে হত — একক ফরাসি বাজার গঠনে বাধা।
- মুক্ত বাণিজ্যের অভাব: গিল্ড (Guilds) ও একচেটিয়া ব্যবসা — প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত।
- কৃষির উপর অতিনির্ভরতা: ১৭৮০-এর দশকের শস্যহানি — দুর্ভিক্ষ। রুটি ছিল প্রধান খাদ্য — রুটির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়।
এ কারণেই অ্যাডাম স্মিথ ফ্রান্সের অর্থনীতিকে সকল ভ্রান্ত অর্থনৈতিক নীতির এক যাদুঘর বলে বিদ্রুপ করেছিলেন।
আলোকচিন্তা ও ফরাসি বিপ্লব
অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সের আলোকচিন্তা (Enlightenment/Les Lumières) — যুক্তি, বিজ্ঞান, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ওপর জোর দিয়েছিল। এই চিন্তাধারাই ফরাসি বিপ্লবের বৌদ্ধিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
প্রধান দার্শনিক ও তাদের ভূমিকা:
১. মন্টেস্কু (Montesquieu, ১৬৮৯-১৭৫৫):
- 'পারসিয়ান লেটারস' (১৭২১) — ফরাসি সমাজ ও স্বৈরাচারের ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনা।
- 'দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ' (১৭৪৮) — আইন প্রণয়ন, শাসন ও বিচার ক্ষমতার পৃথকীকরণ (Separation of Powers) তত্ত্ব। ইংল্যান্ডের মডেলে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের পক্ষে।
২. ভলতেয়ার (Voltaire/ফ্রাসোয়া মারি আরোয়ে, ১৬৯৪-১৭৭৮):
- 'কাঁদিদ' (১৭৫৯) — আশাবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির ব্যঙ্গ।
- 'ফিলোজফিক্যাল লেটারস' (১৭৩৪) — ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রশংসা।
- চার্চের ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতার তীব্র বিরোধিতা — বিখ্যাত উক্তি 'Écrasez l'infâme!' (ক্রাশ দি ইনফেমাস!)।
৩. জাঁ জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau, ১৭১২-১৭৭৮):
- 'ডিসকোর্স অন দ্য আর্টস অ্যান্ড দ্য সায়েন্স' (১৭৫০), 'ডিসকোর্স অন ইনইকোয়ালিটি' (১৭৫৫) — সভ্যতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ ছিল সুখী ও মুক্ত।
- 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' (১৭৬২): জনগণের 'সাধারণ ইচ্ছা' (General Will)ই সার্বভৌম। রাজা ও প্রজার মধ্যে চুক্তি — রাজা স্বৈরাচারী হলে প্রজা তাকে অপসারণ করতে পারে। বিপ্লবের মূলমন্ত্র 'স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব' — রুশোর দান।
৪. দেনিস দিদেরো (Denis Diderot, ১৭১৩-১৭৮৪) ও বিশ্বকোষ:
- ২৮ খণ্ডের বিশ্বকোষ (Encyclopédie, ১৭৫১-১৭৭২) সম্পাদক (দালামবেয়ার সহ-সম্পাদক)।
- এতে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র, চার্চ ও সামন্তপ্রথার সমালোচনা করা হয়। 'সকল কিছু পরীক্ষা করো, সব কিছু বিতর্কে ছেড়ে দাও' (Dare to know!)।
৫. ফিজিওক্র্যাটস (Physiocrats): কোয়েসনে (Quesnay)-র নেতৃত্বে অর্থনীতিবিদরা — অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণমুক্তি (Laissez-faire) ও ভূমির ওপর একক করের পক্ষপাতী।
আলোকচিন্তার প্রভাব বিপ্লবে:
- দৈবরাজতন্ত্রের ঐশ্বরিক ভিত্তির পরিবর্তে 'জনগণের সার্বভৌমত্ব' প্রতিষ্ঠা।
- সামাজিক বৈষম্য চিরন্তন নয় — পরিবর্তনযোগ্য, পুরনো সমাজ কৃত্রিম ও অন্যায়।
- যুক্তি ও আইনের শাসন — পুরাতন প্রথা ও গোঁড়ামির উর্ধ্বে।
- চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা — একনায়কতন্ত্রের প্রতিষেধক।
- মানবাধিকার — জন্মগত, সার্বভৌম, অবিচ্ছেদ্য।
মনে রেখো!
অঁসিয়া রেজিম: পুরাতন সমাজব্যবস্থা | টেনিস কোর্টের শপথ: ২০ জুন, ১৭৮৯ | বাস্তিল পতন: ১৪ জুলাই, ১৭৮৯ | মানবাধিকার ঘোষণা: ২৬ আগস্ট, ১৭৮৯ | রাজার মৃত্যুদণ্ড: ২১ জানুয়ারি, ১৭৯৩ | সন্ত্রাসের শাসন: জুলাই ১৭৯৩-জুলাই ১৭৯৪ | রোবসপিয়েরের পতন: ২৭ জুলাই, ১৭৯৪ (9 Thermidor)