Chapter 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন (Ideals & Evolution of National Movement)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 30 MCQ | 20 SAQ | 8 Broad Questions
অহিংসা
অসহযোগ
ভারত ছাড়ো
আজাদ হিন্দ
🕊️
গান্ধি যুগ
সত্যাগ্রহ | অসহযোগ | আইন অমান্য | ভারত ছাড়ো
⚔️
বিপ্লবী সংগ্রাম
সূর্য সেন | ভগৎ সিং | বিনয়-বাদল-দীনেশ
🎖️
আজাদ হিন্দ ফৌজ
নেতাজি | INA | রানি ঝাঁসি বাহিনী
⚓
নৌ-বিদ্রোহ
RIN Revolt 1946
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
30 টি
1. মহাত্মা গান্ধি কোন্ আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতে প্রথম সত্যাগ্রহ প্রয়োগ করেন?
ক) ক) অসহযোগ আন্দোলন
খ) খ) চম্পারণ সত্যাগ্রহ
গ) গ) ভারত ছাড়ো আন্দোলন
ঘ) ঘ) আইন অমান্য আন্দোলন
ব্যাখ্যা: মহাত্মা গান্ধি ১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারণে নীলচাষীদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রথম সত্যাগ্রহ (Champaran Satyagraha) প্রয়োগ করেন। ইউরোপীয় নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ ছিলেন। গান্ধির নেতৃত্বে এই আন্দোলন সফল হয় এবং তদন্ত কমিটি বসে।
2. 'স্বরাজ' সম্পর্কে গান্ধির চিন্তাভাবনা কী ছিল?
ক) ক) কেবল ব্রিটিশ শাসনের অবসান
খ) খ) শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, পাশ্চাত্য যন্ত্র-নির্ভর সভ্যতা ও শোষণের অবসান
গ) গ) দেশীয় রাজাদের শাসন
ঘ) ঘ) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব
ব্যাখ্যা: গান্ধি ১৯০৯ সালে 'হিন্দ স্বরাজ' গ্রন্থে বলেন, শুধু ঔপনিবেশিক শাসক বদলালেই প্রকৃত স্বাধীনতা আসবে না; পাশ্চাত্য আধুনিক যন্ত্র-সভ্যতার আগ্রাসী ভাবনা, শোষণমূলক অর্থনীতি ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্তিকেই তিনি প্রকৃত 'স্বরাজ' বলেছেন। চরকা ও গ্রামীণ স্বাবলম্বন ছিল তাঁর স্বরাজের প্রতীক।
3. জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড কবে ঘটেছিল?
ক) ক) ১৯১৮
খ) খ) ১৯১৯
গ) গ) ১৯২০
ঘ) ঘ) ১৯২১
ব্যাখ্যা: জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড (Jallianwala Bagh Massacre) ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরে ঘটে। জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানো হলে বহু মানুষ নিহত হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'স্যার' (নাইটহুড) উপাধি ত্যাগ করেন।
4. খিলাফৎ আন্দোলনের সাথে কংগ্রেস কেন যুক্ত হয়েছিল?
ক) ক) তুরস্ক দখলের জন্য
খ) খ) ভারতীয় মুসলমানদের সমর্থন পেয়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ভিত্তিতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন গড়তে
গ) গ) খলিফা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য
ঘ) ঘ) যুদ্ধে যোগ দিতে
ব্যাখ্যা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের সুলতান (খলিফা)-এর পতন ও মিত্রশক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গান্ধি এই সুযোগে ভারতীয় মুসলমানদের সাথে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি যৌথ ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলার কৌশল হিসেবে খিলাফৎ আন্দোলনকে (Khilafat Movement) সমর্থন করেন।
5. অসহযোগ আন্দোলনের ডাক কবে দেওয়া হয়?
ক) ক) ১৯১৯
খ) খ) ১৯২১
গ) গ) ১৯২২
ঘ) ঘ) ১৯৩০
ব্যাখ্যা: রাওলাট সত্যাগ্রহ, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও খিলাফৎ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাসে মহাত্মা গান্ধি অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের (Non-Cooperation Movement) ডাক দেন। ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবী, সরকারি কর্মচারীরা ব্যাপকভাবে অংশ নেন।
6. অসহযোগ আন্দোলন কেন স্থগিত করা হয়েছিল?
ক) ক) ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধে
খ) খ) চৌরিচৌরার হিংসাত্মক ঘটনার জন্য
গ) গ) কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে
ঘ) ঘ) বৃষ্টির অভাবে
ব্যাখ্যা: ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের চৌরিচৌরা (Chauri Chaura) গ্রামে উত্তেজিত জনতা একটি থানায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশকে হত্যা করে। হিংসা দেখে মর্মাহত গান্ধি অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করে দেন। কংগ্রেসের অনেক নেতা (যেমন সুভাষচন্দ্র, মতিলাল নেহরু) এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।
7. স্বরাজ্য দল কারা, কেন গঠন করেছিলেন?
ক) ক) গান্ধি ও নেহরু, স্বাধীনতার জন্য
খ) খ) চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু, কাউন্সিলে প্রবেশ করে আইনসভার ভেতর থেকে বাধা দিতে
গ) গ) জিন্না ও ইকবাল, পাকিস্তানের জন্য
ঘ) ঘ) ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদ, সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য
ব্যাখ্যা: অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পর ১৯২২ সালের শেষের দিকে চিত্তরঞ্জন দাশ (C.R. Das) ও মতিলাল নেহরু (Motilal Nehru) কংগ্রেস-খিলাফৎ স্বরাজ্য দল (Swarajya Party) গঠন করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল— আইনসভা বর্জন না করে তার ভেতর থেকে সরকারের কাজে বাধা দেওয়া উচিত। কংগ্রেসের মধ্যেই এটি একটি গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করত।
8. সাইমন কমিশন কবে আসে এবং ভারতীয়রা কেন তা বর্জন করে?
ক) ক) ১৯১৯; ভারতীয় সদস্য না থাকায়
খ) খ) ১৯২৭; কোনো ভারতীয় সদস্য ছিল না বলে, 'সাইমন ফিরে যাও' স্লোগান ওঠে
গ) গ) ১৯৩০; আইন মান্য না করায়
ঘ) ঘ) ১৯৩৫; বঙ্গভঙ্গের জন্য
ব্যাখ্যা: সাইমন কমিশন (Simon Commission) ১৯২৭ সালের নভেম্বরে ভারতীয়দের সাংবিধানিক অধিকার খতিয়ে দেখতে আসে। স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে এই কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় ভারতের সব রাজনৈতিক দল একে বর্জন করে। দেশজুড়ে হরতাল হয় এবং 'সাইমন ফিরে যাও' (Simon Go Back) স্লোগান ওঠে।
9. আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা কীভাবে হয়েছিল?
ক) ক) বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে
খ) খ) গান্ধির ডান্ডি লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে
গ) গ) সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে
ঘ) ঘ) রেললাইন উপড়ে ফেলার মাধ্যমে
ব্যাখ্যা: ১৯৩০ সালের ৬ এপ্রিল গুজরাটের ডান্ডি (Dandi) উপকূলে গান্ধি সমুদ্রতট থেকে একমুষ্টি লবণ তুলে লবণ আইন ভঙ্গ করেন। এই প্রতীকী সত্যাগ্রহের মাধ্যমেই আইন অমান্য আন্দোলন (Civil Disobedience Movement) শুরু হয়। অচিরেই দেশজুড়ে হরতাল, বিদেশি দ্রব্য বর্জন ও কর অমান্য ছড়িয়ে পড়ে।
10. 'সীমান্ত গান্ধি' (Frontier Gandhi) কাকে বলা হয়?
ক) ক) মৌলানা আবুল কালাম আজাদ
খ) খ) খান আবদুল গফফর খান
গ) গ) মহাত্মা গান্ধি
ঘ) ঘ) জওহরলাল নেহরু
ব্যাখ্যা: খান আবদুল গফফর খান (Khan Abdul Ghaffar Khan) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অহিংস গান্ধিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলেন। লাল রঙের কুর্তা পরিধান করায় তাঁর অনুগামীদের 'লালকুর্তা বাহিনী' (খুদা-ই-খিদমদগার) বলা হতো। গান্ধির প্রতি আনুগত্যের জন্য তাঁকে 'সীমান্ত গান্ধি' (Frontier Gandhi) বলা হয়।
11. চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নেতৃত্ব কে দেন?
ক) ক) ভগৎ সিং
খ) খ) সূর্য সেন (মাস্টারদা)
গ) গ) বিনয়-বাদল-দীনেশ
ঘ) ঘ) চন্দ্রশেখর আজাদ
ব্যাখ্যা: মাস্টারদা সূর্য সেন (Surya Sen) ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের (Chittagong Armoury Raid) নেতৃত্ব দেন। ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ সেনার সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ১১ জন শহীদ হন। ১৯৩৩ সালে সূর্য সেন গ্রেফতার হয়ে ১৯৩৪ সালে ফাঁসিতে শহীদ হন।
12. ভগৎ সিং (Bhagat Singh) কোন্ হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে অংশ নিয়েছিলেন?
ক) ক) জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড
খ) খ) লালা লাজপত রায়ের ওপর পুলিশি অত্যাচারে মৃত্যুর প্রতিশোধ
গ) গ) ক্ষুদিরামের ফাঁসির প্রতিশোধ
ঘ) ঘ) বাঘা যতীনের মৃত্যুর প্রতিশোধ
ব্যাখ্যা: সাইমন কমিশন বিরোধী মিছিলে পুলিশি লাঠিচার্জে গুরুতর আহত হয়ে পাঞ্জাব কেশরী লালা লাজপত রায় মারা যান। তার প্রতিশোধ নিতে ভগৎ সিং, রাজগুরু, সুখদেব ও চন্দ্রশেখর আজাদ লাহোরের পুলিশ সুপার স্যান্ডার্সকে হত্যা করেন (১৯২৮)। পরে সংসদে বোমা ছুঁড়ে ধরা দেন।
13. স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার (Azad Hind Government) কবে, কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ক) ১৯৪২, দিল্লি
খ) খ) ১৯৪৩, সিঙ্গাপুর
গ) গ) ১৯৪৫, কলকাতা
ঘ) ঘ) ১৯৪৭, করাচি
ব্যাখ্যা: সুভাষচন্দ্র বসু (Subhas Chandra Bose) ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে 'আজাদ হিন্দ সরকার' (স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার) প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজে তার প্রধানমন্ত্রী ও সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সাথে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)-এর পুনর্গঠন করেন।
14. রানি ঝাঁসি বাহিনী কী?
ক) ক) ঝাঁসির সেনাবাহিনী
খ) খ) আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী সৈন্যদলের নাম
গ) গ) বাঘা যতীনের দল
ঘ) ঘ) ভগৎ সিংয়ের সেনাদল
ব্যাখ্যা: সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজে (INA) নারীদের জন্য 'রানি ঝাঁসি বাহিনী' (Rani of Jhansi Regiment) নামে একটি আলাদা সেনাদল গড়ে তোলেন। ১৮৫৭-র বিদ্রোহের নেত্রী রানি লক্ষ্মীবাইয়ের নামে এর নামকরণ করা হয়। এতে প্রায় ১৩০০ নারী যোগ দেন। ১৯৪৫ সালে এই বাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।
15. রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ (RIN Revolt) কবে হয়?
ক) ক) ১৯৪২
খ) খ) ১৯৪৫
গ) গ) ১৯৪৬
ঘ) ঘ) ১৯৪৭
ব্যাখ্যা: রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ (RIN Mutiny) ১৯৪৬ সালের ১৮-২৩ ফেব্রুয়ারি বোম্বাই বন্দরে নোঙর করা 'তলোয়ার' জাহাজের নাবিকদের মাধ্যমে শুরু হয়। খাবারের বাজে মান, বর্ণবৈষম্য, বেতন বৈষম্যের প্রতিবাদ এবং আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দিদের মুক্তির দাবিতে এই বিদ্রোহ হয়। কংগ্রেস বা মুসলিম লিগ এটিকে প্রাথমিক সমর্থন না দিলেও, গোটা দেশে ছাত্র-যুব ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে।
16. গান্ধির 'অহিংস সত্যাগ্রহ' আদর্শের মূল ভাবনা কী?
ক) ক) সশস্ত্র বিপ্লব করে ক্ষমতা দখল
খ) খ) সত্যের প্রতি অটল থাকা ও অহিংসার মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা
গ) গ) ব্রিটিশদের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি করা
ঘ) ঘ) আইনসভার নির্বাচনে জেতা
ব্যাখ্যা: গান্ধির 'অহিংস সত্যাগ্রহ' (Non-violent Satyagraha) ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক ও আত্মিক সংগ্রামের পদ্ধতি। এর মূল ভাবনা: (১) সত্যের প্রতি অটল আনুগত্য, (২) অহিংসার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের মন পরিবর্তন ও অন্যায় স্বীকার করানো, (৩) গণমুখী আন্দোলন— সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে, (৪) কঠোর নৈতিক শৃঙ্খলা মেনে চলা।
17. রাওলাট আইন (Rowlatt Act) কী? কেন এর বিরোধিতা করা হয়েছিল?
ক) ক) শিক্ষা সংস্কার আইন
খ) খ) বিনা বিচারে বন্দি রাখার কালো আইন— যা ভারতীয়দের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়
গ) গ) ভূমি রাজস্ব আইন
ঘ) ঘ) বিবাহ সংক্রান্ত আইন
ব্যাখ্যা: ১৯১৯ সালে পাস হওয়া রাওলাট আইন (Rowlatt Act) ব্রিটিশ সরকারকে বিনা পরোয়ানায় কাউকে গ্রেফতার ও বিনা বিচারে বন্দি রাখার ক্ষমতা দেয়। ভারতীয়দের মৌলিক স্বাধীনতা হরণকারী এই আইনের বিরুদ্ধে গান্ধি সারা দেশে সত্যাগ্রহ ও হরতালের ডাক দেন। একে 'কালো আইন' (Black Act) বলে অভিহিত করা হয়।
18. মাতঙ্গিনী হাজরা কে ছিলেন?
ক) ক) কংগ্রেস সভানেত্রী
খ) খ) মেদিনীপুর জেলার তমলুকের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের শহীদ নেত্রী
গ) গ) আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী সৈনিক
ঘ) ঘ) ব্রিটিশ প্রশাসক
ব্যাখ্যা: মাতঙ্গিনী হাজরা (Matangini Hazra) ছিলেন মেদিনীপুর জেলার তমলুকের এক বৃদ্ধা স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ২৯ সেপ্টেম্বর তমলুক থানা অভিমুখে মিছিলের সামনে জাতীয় পতাকা হাতে এগিয়ে গেলে পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদ হন।
19. হলওয়েল মনুমেন্ট আন্দোলন (Holwell Monument Movement) কী?
ক) ক) একটি শিক্ষা আন্দোলন
খ) খ) কলকাতার 'অন্ধকূপ' স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণের দাবিতে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গণআন্দোলন
গ) গ) কৃষক আন্দোলন
ঘ) ঘ) ধর্মীয় আন্দোলন
ব্যাখ্যা: কলকাতায় অন্ধকূপ হত্যার (Black Hole) স্মৃতিতে ব্রিটিশেরা যে 'হলওয়েল মনুমেন্ট' তৈরি করেছিল, তা ভারতীয়দের কাছে অপমানজনক ছিল। ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে ওই স্মৃতিস্তম্ভ অপসারণের দাবিতে এক জোরালো গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। পরে স্তম্ভটি সরিয়ে ফেলা হয়।
20. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় গান্ধির ডাক কী ছিল?
ক) ক) 'বন্দেমাতরম'
খ) খ) 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে' (Do or Die)
গ) গ) 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'
ঘ) ঘ) 'ভারত ছাড়ো'
ব্যাখ্যা: ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট বোম্বাইতে গান্ধি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের (Quit India Movement) ঘোষণা দেন এবং তাঁর বিখ্যাত 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে' (Do or Die) স্লোগান দেন। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন— 'ভারত ছেড়ে চলে যাও, তারপর যে পরিস্থিতিই হোক, তার দায়িত্ব আমি নিজে নেব'।
21. কেন সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন?
ক) ক) ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য
খ) খ) কংগ্রেসের ডানপন্থী রক্ষণশীল নেতৃত্বের সাথে মতবিরোধ ও গান্ধিবাদী কৌশলের বিরোধিতায়
গ) গ) ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে
ঘ) ঘ) জাপানে যাওয়ার জন্য
ব্যাখ্যা: সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হলেও গান্ধি ও গান্ধি-অনুগামী রক্ষণশীলদের সাথে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। গান্ধির অহিংসার নীতি ও ফেবীয় কৌশলের সমালোচক সুভাষ চেয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য জোরালো আন্দোলন। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে তাঁকে কোণঠাসা করা হলে ১৯৩৯ সালে তিনি পদত্যাগ করে 'ফরওয়ার্ড ব্লক' (Forward Bloc) নামে দল গঠন করেন।
22. বিনয়-বাদল-দীনেশ কাদের নাম?
ক) ক) কংগ্রেসের তিন সভাপতি
খ) খ) রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণকারী তিন বিপ্লবী
গ) গ) আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতি
ঘ) ঘ) আইন অমান্যের নেতা
ব্যাখ্যা: বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত— ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ করে ইন্সপেক্টর জেনারেল সিম্পসনকে হত্যা করেন। ঘটনাস্থলেই বাদল নিহত, বিনয় আহতাবস্থায় মারা যান এবং দীনেশের ফাঁসি হয়। ইতিহাসে তাঁরা 'বিনয়-বাদল-দীনেশ' ত্রয়ী নামে অমর।
23. ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম ১৮৫৭ এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্যে মিল কোথায়?
ক) ক) দুটিই শুধু সিপাহি বিদ্রোহ ছিল
খ) খ) দুটিতেই ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়ে ব্যাপক গণঅংশগ্রহণ হয়েছিল
গ) গ) দুটিই একদিনে শেষ হয়েছিল
ঘ) ঘ) দুটিই ইংরেজ নেতৃত্বে হয়েছিল
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন— দুটিই ছিল ব্রিটিশ শাসনের চূড়ান্ত অবসান চেয়ে সংঘটিত ব্যাপক গণবিদ্রোহ। ব্রিটিশ প্রশাসকরাও স্বীকার করেছিলেন, '১৮৫৭-র বিদ্রোহের পর এত বড়ো বিদ্রোহ ভারতে আর হয়নি'। উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্রোহ ছিল বহুকেন্দ্রিক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং দমন-পীড়ন সত্ত্বেও টিকে ছিল।
24. আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার (INA Trials) দিল্লির কোথায় হয়েছিল?
ক) ক) সংসদ ভবন
খ) খ) লালকেল্লা
গ) গ) রাষ্ট্রপতি ভবন
ঘ) ঘ) ইন্ডিয়া গেট
ব্যাখ্যা: আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) আত্মসমর্পণকারী তিন অফিসার— প্রেমকুমার সেহগল, গুরুবক্স সিং ধিলোঁ ও শাহনওয়াজ খানকে দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় (Red Fort) জনসমক্ষে বিচার শুরু করা হয় (নভেম্বর ১৯৪৫)। এই বিচারকে কেন্দ্র করে সারা দেশে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। কংগ্রেসের নেতা (জওহরলাল নেহরু, ভুলাভাই দেশাই প্রমুখ) আইনজীবী হিসেবে আদালতে দাঁড়ান।
25. গান্ধি-আরউইন চুক্তি (Gandhi-Irwin Pact) কবে স্বাক্ষরিত হয়?
ক) ক) ১৯২১
খ) খ) ১৯৩১
গ) গ) ১৯৪২
ঘ) ঘ) ১৯৪৭
ব্যাখ্যা: গান্ধি-আরউইন চুক্তি (Gandhi-Irwin Pact) ১৯৩১ সালের ৫ মার্চ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি বলে কংগ্রেস আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত করে এবং লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে সম্মত হয়। সরকার বিনিময়ে রাজবন্দিদের মুক্তি দেয় এবং লবণ আইন শিথিল করে। গান্ধি একাই দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন।
26. সুভাষচন্দ্র বসু কবে ও কীভাবে কংগ্রেস সভাপতি হন?
ক) ক) ১৯২১, গান্ধির ইচ্ছায়
খ) খ) ১৯৩৮, হরিপুরা কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে
গ) গ) ১৯৩৯, ত্রিপুরী কংগ্রেসে গান্ধিকে হারিয়ে
ঘ) ঘ) ১৯৪২, ভারত ছাড়োর সময়
ব্যাখ্যা: সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এবং ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে গান্ধি-সমর্থিত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের জন্য কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে গান্ধি ও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বিরোধিতার মুখে ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে তিনি সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন।
27. মহাত্মা গান্ধি কেন চরকাকে স্বরাজের প্রতীক হিসেবে দেখতেন?
ক) ক) এটি ব্রিটিশ আবিষ্কার ছিল
খ) খ) চরকা ভারতের গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন, অহিংসা ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক
গ) গ) এটি সবচেয়ে দ্রুতগামী যন্ত্র
ঘ) ঘ) চরকা শুধু কাপড় বোনার যন্ত্র
ব্যাখ্যা: গান্ধির স্বরাজ ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-অর্থনৈতিক এক বিপ্লব। চরকা ছিল গ্রামীণ ভারতের আত্মনির্ভরতা ও ব্রিটিশ মেশিনারি-বিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক। চরকার মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন— কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মানুষ নিজের হাতে নিজের কাপড় বুনে ব্রিটিশ দ্রব্যের বয়কট ও স্বনির্ভরতা গড়ে তুলতে পারে।
28. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তামলুক জাতীয় সরকার কী?
ক) ক) ব্রিটিশদের তৈরি সরকার
খ) খ) মেদিনীপুরের তামলুকে গঠিত সমান্তরাল জাতীয় সরকার
গ) গ) সুভাষচন্দ্রের সরকার
ঘ) ঘ) মিত্র সরকার
ব্যাখ্যা: ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় মেদিনীপুর জেলার তামলুক মহকুমায় সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর 'তামলুক জাতীয় সরকার' (Tamluk National Government) গঠিত হয়। এই সরকার ঘূর্ণিঝড়-বিধ্বস্ত অঞ্চলে ত্রাণকার্য পরিচালনা, খাদ্য বিতরণ, পুলিশি প্রশাসন— সব নিজের হাতে নিয়েছিল এবং ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টিকেছিল।
29. কেন সুভাষচন্দ্র বসুকে 'নেতাজি' বলা হয়?
ক) ক) তিনি কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন বলে
খ) খ) জার্মানিতে ভারতীয় বন্দিদের দ্বারা প্রদত্ত সম্মানসূচক উপাধি
গ) গ) ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত
ঘ) ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নাম
ব্যাখ্যা: সুভাষচন্দ্র বসু ভারতে 'দেশপ্রিয়', 'জাতীয় নেতা' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে জার্মানিতে ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে তিনি 'স্বাধীন ভারত কেন্দ্র' গড়ার পর সেখানকার ভারতীয় সেনারা তাঁকে 'নেতাজি' (Netaji) উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষে 'নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু' নামে পরিচিত ও পূজিত।
30. কংগ্রেসে গান্ধি যুগের (১৯১৯-১৯৪৭) আন্দোলনের মূল কৌশল কী ছিল?
ক) ক) সশস্ত্র বিপ্লব
খ) খ) অহিংস সত্যাগ্রহ, অসহযোগ, আইন অমান্য ও গণআন্দোলন
গ) গ) বিলাত গিয়ে দরবার
ঘ) ঘ) শুধু সংসদীয় রাজনীতি
ব্যাখ্যা: মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে (১৯১৯-১৯৪৭) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মূল কৌশল ছিল ত্রিস্তরীয়: (১) অহিংস সত্যাগ্রহের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক ভিত নাড়িয়ে দেওয়া, (২) অসহযোগ— সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, আদালত, প্রশাসন বর্জন করে শাসন অচল করা, (৩) আইন অমান্য— গণহারে অন্যায় আইন ভেঙে জেল ভরতি করে সরকারকে নতি স্বীকার করানো।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
20 টি
1. মহাত্মা গান্ধির 'অহিংস সত্যাগ্রহ'-এর মূল ভাবনা কী ছিল?
মহাত্মা গান্ধির 'অহিংস সত্যাগ্রহ' (Non-violent Satyagraha) ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধের এক অনন্য পদ্ধতি। এর মূল ভাবনা: (১) সত্যের প্রতি দৃঢ় আনুগত্য— গান্ধির মতে সত্যের সন্ধানই মানবজীবনের বড়ো লক্ষ্য, (২) অহিংসা— প্রতিপক্ষকে আঘাত না করে, আত্মকষ্ট স্বীকার করে প্রতিপক্ষের মনে পরিবর্তন আনা, (৩) গণমুখীতা— অহিংস সত্যাগ্রহে বৃহত্তর জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য এবং চলতে হবে কঠোর নৈতিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। গান্ধির মতে, 'আইন অমান্য' বা 'বেসামরিক অবাধ্যতা'র চেয়েও অহিংস সত্যাগ্রহ ছিল আধ্যাত্মিক দিক থেকে উন্নত ও ব্যাপকতর। তবে বাস্তবে গান্ধির সমস্ত আন্দোলনই পুরোপুরি অহিংস থাকতে পারেনি।
2. রাওলাট আইন কী? এর বিরুদ্ধে ভারতীয়রা কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?
রাওলাট আইন (Rowlatt Act, ১৯১৯): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার দেশরক্ষার অজুহাতে ভারতীয়দের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে একটি কমিটি (রাওলাট কমিটি) গঠন করে। এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পাস হওয়া আইনটি সরকারকে বিনা পরোয়ানায় কাউকে গ্রেপ্তার, বিনা বিচারে আটক এবং উপযুক্ত আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত করার ব্যাপক ক্ষমতা দেয়। প্রতিক্রিয়া: গান্ধি একে 'কালো আইন' (Black Act) বলে আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে অহিংস সত্যাগ্রহ ও সারা দেশে হরতালের ডাক দেন। ১৯১৯ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ তীব্রতর হয়। পাঞ্জাবে এই আন্দোলন দমন করতে ব্রিটিশ প্রশাসন জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
3. জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল কী হয়েছিল?
প্রেক্ষাপট: রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে সারা ভারতে বিক্ষোভ চলছিল। পাঞ্জাবে এই আন্দোলন ছিল তীব্র। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল (বৈশাখী) অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে রাওলাট আইনের প্রতিবাদে এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারি করে জেনারেল ডায়ারকে দায়িত্ব দেয়। ডায়ার একমাত্র সরু রাস্তা বন্ধ করে নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। ফলাফল: সহস্রাধিক নিরপরাধ মানুষ নিহত ও আহত হন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘটনার প্রতিবাদে নাইটহুড (স্যার) উপাধি ত্যাগ করেন। এটি ছিল অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম বড়ো অনুঘটক।
4. অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি কী কী ছিল এবং কেন তা স্থগিত করা হয়?
মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের (Non-Cooperation Movement) প্রধান কর্মসূচি: (১) স্কুল-কলেজ ও আদালত বর্জন করে পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রামে শামিল হওয়া, (২) বিদেশি দ্রব্য, বিশেষ করে বিলিতি কাপড় বর্জন ও প্রকাশ্যে পোড়ানো, (৩) সরকারি চাকরি ও উপাধি ত্যাগ, (৪) জাতীয় বিদ্যালয় ও স্বদেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। স্থগিত হওয়ার কারণ: ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের চৌরিচৌরা গ্রামে আন্দোলনকারীরা হিংসাত্মক হয়ে পড়ে এবং একটি থানায় আগুন দিয়ে ২২ জন পুলিশকে হত্যা করে। অহিংসা ভঙ্গের ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত গান্ধি আন্দোলন স্থগিত করে দেন। কংগ্রেসের অনেক নেতা (সুভাষচন্দ্র, মতিলাল নেহরু) এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন।
5. স্বরাজ্য দল কেন গঠিত হয়েছিল? এর মূল দাবি কী ছিল?
অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পর ১৯২২ সালের শেষের দিকে চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু কংগ্রেস-খিলাফৎ স্বরাজ্য দল (Swarajya Party) গঠন করেন। গঠনের কারণ: গান্ধির আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্তের পর নেতৃত্বের একাংশ মনে করেছিলেন যে সরকারি আইন পরিষদ বর্জনের নীতি পরিত্যাগ করে কাউন্সিলে প্রবেশ করে ভিতর থেকে সরকারি নীতিতে বাধা সৃষ্টি করতে হবে। মূল দাবি: আইনসভায় প্রবেশ করে আইন প্রণয়নের নামে ঔপনিবেশিক সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করা এবং ভারতীয় স্বার্থে সংস্কার আদায়। কংগ্রেসের মধ্যেই এটি একটি ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করত। চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর (১৯২৫) এই গোষ্ঠীর কাজ ক্ষীণ হয়ে আসে।
6. সাইমন কমিশন কেন বর্জন করা হয়? এর ফল কী হয়েছিল?
সাইমন কমিশন (Simon Commission): ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের সংস্কার পর্যালোচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯২৭ সালে স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে একটি কমিশন ভারতে পাঠায়। বর্জনের কারণ: সাত সদস্যের এই কমিশনে একজনও ভারতীয় সদস্য ছিলেন না। ফলে ভারতীয়দের মনে হয়েছিল— 'আমাদের ভাগ্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তে আমাদের কোনো স্থান নেই'। ভারতের সব রাজনৈতিক দল এটিকে সর্বসম্মতিক্রমে বর্জন করে। ফল: কমিশন যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই প্রতিবাদ, হরতাল ও 'সাইমন ফিরে যাও' (Simon Go Back) স্লোগান উঠেছে। লাহোরে পুলিশি লাঠিচার্জে লালা লাজপত রায় গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনই ১৯২৯ সালে কংগ্রেসকে 'পূর্ণ স্বরাজ' (Poorna Swaraj) ঘোষণার পথ দেখায়।
7. আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) কীভাবে শুরু হয়? এর চরিত্র কী ছিল?
সাইমন কমিশন বর্জন এবং পূর্ণ স্বরাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩০ সালের ৬ এপ্রিল গুজরাটের ডান্ডি উপকূলে গান্ধি ঐতিহাসিক লবণ সত্যাগ্রহ (Salt March) করেন। ২৪ দিন পায়ে হেঁটে ৩৮৫ কিমি পথ অতিক্রম করে তিনি সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরি করে ব্রিটিশ সরকারের লবণ আইন (একচেটিয়া) ভঙ্গ করেন। এই প্রতীকী আইন অমান্যের মাধ্যমেই সারা দেশে আইন অমান্য আন্দোলন (Civil Disobedience Movement) ছড়িয়ে পড়ে। চরিত্র: (১) হরতাল, বিদেশি দ্রব্য বর্জন, সরকারি কর বন্ধ করা, (২) নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ (এটি ছিল নতুনতর), (৩) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে খান আবদুল গফফর খানের নেতৃত্বে 'লালকুর্তা' আন্দোলন ও পূর্তগালি গোয়ার রানি গিদালুর বিদ্রোহ।
8. সূর্য সেন (মাস্টারদা) ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সম্পর্কে কী জানো?
সূর্য সেন (Surya Sen), যিনি মাস্টারদা নামে সুপরিচিত, ছিলেন চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল (গুড ফ্রাইডে) তাঁর নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী (গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিং, লোকনাথ বল, নির্মল সেন প্রমুখ) চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার (Armoury) দখল করে। এটি ছিল ব্রিটিশ শক্তির প্রতীকী চ্যালেঞ্জ। ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ১১ জন বিপ্লবী শহীদ হন। পরবর্তীতে সূর্য সেন গা ঢাকা দিয়ে বিপ্লবী কার্যকলাপ চালিয়ে যান। ১৯৩৩ সালে গ্রেফতার হয়ে ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ফাঁসিতে শহীদ হন। ফাঁসির আগে তাঁকে নির্মম নির্যাতন করা হয়।
9. ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোগীদের সংগ্রামের চরিত্র কী ছিল?
ভগৎ সিং (Bhagat Singh) ছিলেন ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HRA) এবং পরে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA)-এর সদস্য। কর্মকাণ্ড: (১) ১৯২৫ সালের কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত (রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লাহ সহ), (২) সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধে ১৯২৮ সালে লাহোরের পুলিশ সুপার স্যান্ডার্সকে হত্যা (ভগৎ, রাজগুরু, সুখদেব, আজাদ), (৩) ১৯২৯ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করে 'বধির কানে জাগরণের আহ্বান' জানানো এবং ধরা দেওয়া। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেবের ফাঁসি হয়। 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক) স্লোগান তাঁদের অমর সৃষ্টি।
10. মহাত্মা গান্ধির 'হিন্দ স্বরাজ' গ্রন্থের মূল বক্তব্য কী?
মহাত্মা গান্ধি ১৯০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরার পথে জাহাজে 'হিন্দ স্বরাজ' (Hind Swaraj) বা 'ইন্ডিয়ান হোম রুল' রচনা করেন। মূল বক্তব্য: (১) প্রকৃত স্বরাজ কেবল ব্রিটিশ শাসনের অবসান নয়— বরং পাশ্চাত্যের যন্ত্র-নির্ভর আধুনিক শিল্প-সভ্যতার নৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় থেকে ভারতের মুক্তি, (২) রেল, টেলিগ্রাফ, আইন-আদালত, ডাক্তারি— এসব আসলে ভারতীয় সমাজকে দুর্বল ও পরনির্ভরশীল করেছে, (৩) স্বরাজ হলো সহজ ও সরল জীবন, চরকা, গ্রাম-স্বায়ত্তশাসন এবং অহিংস সমাজব্যবস্থা, (৪) রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন ভারতীয় সমাজ আত্মনির্ভর ও নৈতিক হবে। গান্ধির এই ভাবনা পরে তাঁর সমস্ত আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
11. রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি (RIN) বিদ্রোহ কী? এর গুরুত্ব কী?
রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ (RIN Mutiny): ১৯৪৬ সালের ১৮-২৩ ফেব্রুয়ারি বোম্বাইয়ের 'তলোয়ার' জাহাজের নাবিকদের (Rating) খাবারের খারাপ মান, বর্ণবৈষম্য ও বেতন বৈষম্যের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ধর্মঘট দ্রুত অন্যান্য জাহাজ ও নৌঘাঁটিতে ছড়িয়ে পড়ে। নাবিকেরা আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দিদের মুক্তি ও ভারতীয় রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিও তোলেন। গুরুত্ব: (১) কংগ্রেস বা মুসলিম লিগ প্রাথমিকভাবে সমর্থন না জানালেও সাধারণ জনতা রাস্তায় নেমে আসে— ছাত্র, যুব, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নাবিকদের সমর্থন জানান, (২) ব্রিটিশ প্রশাসন দমননীতির মাধ্যমে বিদ্রোহ থামাতে বাধ্য হলেও উপলব্ধি করে— 'ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর আর নির্ভর করা যাবে না', (৩) এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের কফিনে শেষ পেরেক— নৌ-বিদ্রোহের ছয় মাসের মধ্যেই ভারতের স্বাধীনতার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।
12. কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশন (১৯৩৯) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেস অধিবেশন (Tripuri Congress Session) ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। গুরুত্ব: (১) এই অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসু ও মহাত্মা গান্ধির মধ্যে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নেয়, (২) সুভাষচন্দ্র গান্ধি-মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের জন্য কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন, (৩) কিন্তু পরে গান্ধি ও কার্যনির্বাহী সমিতির (Working Committee) অনমনীয় বিরোধিতার মুখে সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করে 'ফরওয়ার্ড ব্লক' (Forward Bloc) গঠন করেন, (৪) এটি ছিল কংগ্রেসের ভিতরে গান্ধি-যুগের (Right) এবং সমাজতন্ত্রী/চরমপন্থী (Left) ধারার মধ্যে বড়ো আদর্শগত বিভাজন— যা পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
13. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কারণ, প্রকৃতি ও গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করো।
কারণ: (১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতকে সম্মতি না নিয়ে যুক্ত করা, (২) ক্রিপস মিশনের (১৯৪২) ব্যর্থতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী স্বায়ত্তশাসনের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি, (৩) জাপানি আক্রমণের হুমকিতে ভারতের নিরাপত্তাহীনতা, (৪) দেশব্যাপী খাদ্যাভাব ও মুদ্রাস্ফীতি। প্রকৃতি: ৮ আগস্ট ১৯৪২-এ বোম্বাইতে গান্ধি 'ভারত ছাড়ো' প্রস্তাব পাস করেন ও 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে' (Do or Die) স্লোগান দেন। ৯ আগস্ট ভোরেই ব্রিটিশ সরকার সমস্ত শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করে। এরপরই নেতৃত্বহীন জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামে— টেলিফোন-টেলিগ্রাফ লাইন কাটা, রেললাইন উপড়ে ফেলা, থানা-পোস্ট অফিস আক্রমণ করে। গুরুত্ব: একেই ব্রিটিশেরা '১৮৫৭-র পর সবচেয়ে বড়ো বিদ্রোহ' বলে স্বীকার করে। তামলুকে 'জাতীয় সরকার' গঠিত হয়। যদিও আন্দোলন দমন করা হয়, তবুও এটি ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দেয়— 'ভারতকে আর জোর করে রাখা যাবে না'।
14. 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে' (Do or Die) স্লোগানের প্রেক্ষাপট কী?
'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে' (Do or Die) স্লোগানটি মহাত্মা গান্ধি ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট বোম্বাইতে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির (AICC) অধিবেশনে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব পাসের সময় দেন। প্রেক্ষাপট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। ব্রিটিশ সরকার ক্রিপস মিশনের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। দেশজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যাভাব ও ব্রিটিশ-বিরোধী ক্ষোভ তীব্রতর হচ্ছিল। এই অবস্থায় গান্ধি ব্রিটিশ শাসনের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত অবসান চেয়ে নির্দেশ দেন— 'আমরা হয় স্বাধীনতা অর্জন করবো, না হয় মরবো— কিন্তু ব্রিটিশদের অধীনে বাঁচব না'। এই আহ্বান রাতারাতি গোটা দেশকে আলোড়িত করে।
15. সুভাষচন্দ্র বসুর 'ফরওয়ার্ড ব্লক' কেন গঠন করেছিলেন?
সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেসে দ্বিতীয়বার সভাপতি নির্বাচিত হলেও গান্ধি ও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির প্রবল বিরোধিতার মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্ব গান্ধির রক্ষণশীল অনুগামীদের হাতে— যাঁরা ইংরেজদের সঙ্গে আপস ও ধীরে ধীরে সংস্কারের পথে বিশ্বাসী। পুরো ঔপনিবেশিক যন্ত্রের বিরুদ্ধে জোরালো, চূড়ান্ত ও সরাসরি গণআন্দোলনের জন্য একটি আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। তাই ১৯৩৯ সালের ৩ মে তিনি কংগ্রেসের মধ্যেই 'ফরওয়ার্ড ব্লক' (Forward Bloc) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল: (১) পূর্ণ স্বরাজ ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কংগ্রেসের বামপন্থী ও বিপ্লবী উপাদানগুলিকে একজোট করা, (২) হিন্দু-মুসলমান ঐক্য ও বৃহত্তর ভারতীয় রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে কাজ করা।
16. আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান ও বিচারের গুরুত্ব কী?
আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army - INA): সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে জাপানের সহায়তায় ভারতীয় যুদ্ধবন্দি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে গঠিত মুক্তি বাহিনী। ১৯৪৪ সালে ইম্ফল ও কোহিমা অভিযানে তারা ভারতের মাটিতে জাতীয় পতাকা তোলে। যদিও সামরিকভাবে পুরোপুরি সফল না হতে পারলেও, এর রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল অসীম। ১৯৪৫ সালে আত্মসমর্পণের পর পি.কে. সেহগল, জি.এস. ধিলোঁ ও শাহনওয়াজ খান— এই তিন অফিসারকে দিল্লির লালকেল্লায় জনসমক্ষে বিচার শুরু করা হলে সারা দেশে তুমুল গণ-আন্দোলন শুরু হয়। কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ (জওহরলাল নেহরু, ভুলাভাই দেশাই) আদালতে দাঁড়ান এবং নৌ-বিদ্রোহও (RIN Revolt) INA বন্দিদের মুক্তির দাবিকে সমর্থন জানায়। ব্রিটিশ সরকার জনমতের চাপে তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এই বিচার ও গণআন্দোলনই চূড়ান্ত প্রমাণ করে— ভারতীয় সেনাবাহিনীও আর ব্রিটিশের পক্ষে নেই এবং ব্রিটিশ শাসন ভারত ছাড়তে বাধ্য।
17. মহাত্মা গান্ধি কেন খিলাফৎ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন?
খিলাফৎ আন্দোলন (Khilafat Movement, ১৯১৯-১৯২৪) ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর তুরস্কের সুলতান (খলিফা)-কে রক্ষার দাবিতে ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন। গান্ধি এর সমর্থন দেওয়ার পিছনে একাধিক কারণ ছিল: (১) হিন্দু-মুসলমান ঐক্য গড়ে তোলা— গান্ধির মতে, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রকৃত জাতীয় আন্দোলন করতে গেলে হিন্দু ও মুসলমানকে একত্রিত হতে হবে; খিলাফৎ আন্দোলন ছিল মুসলমানদের বৃহত্তম গণ-আন্দোলন, (২) আন্তর্জাতিক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সাথে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের যোগসূত্র গড়া, (৩) ব্রিটিশ সরকারকে চাপে ফেলা— গান্ধি চেয়েছিলেন, ধর্মীয় আন্দোলনের মাধ্যমেও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ পাক। তিনি মনে করতেন, 'যে আন্দোলন মুসলিমদের কাছে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা সমর্থন করলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার বার্তা যাবে'। পরবর্তীতে খিলাফৎ আন্দোলন তুরস্কেই শেষ হয়ে গেলেও, ভারতের রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের যে ভিত তৈরি হয়েছিল— ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
18. গান্ধি-আরউইন চুক্তি কী? এর শর্ত কী ছিল?
গান্ধি-আরউইন চুক্তি (Gandhi-Irwin Pact): ১৯৩১ সালের ৫ মার্চ লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে ভাইসরয় লর্ড আরউইন ও মহাত্মা গান্ধির মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা চুক্তি। প্রধান শর্তসমূহ: (১) কংগ্রেস আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত করবে, (২) কংগ্রেস দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে (লন্ডন) অংশগ্রহণ করবে, (৩) সরকার বিনিময়ে সহিংসতার অভিযোগ ব্যতীত সমস্ত রাজবন্দিকে মুক্তি দেবে, (৪) লবণ আইন শিথিল করবে— উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য লবণ তৈরির অনুমতি দেওয়া হবে, (৫) সরকার বাজেয়াপ্তকৃত জমি ও সম্পত্তি ফেরত দেবে। সমালোচনা: চরমপন্থী ও বিপ্লবী মহলে এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা হয়— কারণ এতে ভগৎ সিংয়ের ফাঁসির রায় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ভগৎ সিংয়ের প্রাণভিক্ষার আবেদন গান্ধি যথেষ্ট জোরে তোলেননি বলে তাঁর ভূমিকা বিতর্কিত।
19. কেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু গান্ধির অহিংসার পথ পুরোপুরি মানেননি?
সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে আপসহীন নেতা। তিনি গান্ধির অহিংস আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে অস্বীকার না করলেও তাঁর সমালোচনা করতেন বেশ কিছু কারণে: (১) আপসবিরোধিতা: সুভাষ মনে করতেন, ঔপনিবেশিক শাসককে 'নৈতিক আবেদন' বা অহিংসায় টলা সম্ভব নয়— তাদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ ও প্রয়োজনে বলপ্রয়োগই একমাত্র পথ, (২) গান্ধির কংগ্রেস নেতৃত্ব যে ধীরস্থির ও পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন চালাচ্ছিলেন, তার তীব্র বিরোধী ছিলেন সুভাষ— তিনি একটানা চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানের পক্ষপাতী ছিলেন, (৩) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ও জাপানের সাথে মিত্রতা করে তিনি মনে করেছিলেন 'শত্রুর শত্রু আমার মিত্র'— গান্ধির পক্ষে যা ছিল অনৈতিক ও আপত্তিকর, (৪) সমাজতান্ত্রিক ভাবনা— সুভাষ অর্থনৈতিক সাম্যের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও বলিষ্ঠ কেন্দ্রীয় শাসনের পক্ষপাতী ছিলেন, যেখানে গান্ধির গ্রাম-স্বরাজ ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও বিকেন্দ্রিত। এই আদর্শগত ফারাক সত্ত্বেও সুভাষ গান্ধিকে সম্মান করতেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের একটি ব্রিগেডের নাম রেখেছিলেন 'গান্ধি ব্রিগেড'।
20. তামলুক জাতীয় সরকারের কাজকর্ম কী ছিল?
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর মেদিনীপুর জেলার তামলুক মহকুমায় সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে 'তামলুক জাতীয় সরকার' (Tamluk National Government) গঠিত হয়। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে গঠিত একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো। কাজকর্ম: (১) ১৯৪২ সালের অক্টোবরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে তামলুক অঞ্চল বিধ্বস্ত হয়— সরকারি ত্রাণ না পেয়ে জাতীয় সরকার নিজস্ব উদ্যোগে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ চালায়, (২) ধনী জমিদারদের বাড়ি থেকে ধান বাজেয়াপ্ত করে গরিবদের মধ্যে বিলি করা হয়, (৩) আদালত, পুলিশ, রাজস্ব আদায়— সব কিছুর বিকল্প ব্যবস্থা করে স্থানীয় শাসন চালানো হয়, (৪) যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ ও প্রশাসনের গতিবিধি বাধাগ্রস্ত করা হয়। মাতঙ্গিনী হাজরা এই অঞ্চলেরই আন্দোলনের প্রতীক। প্রায় দেড় বছর (১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) এই সরকার সক্রিয় ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, ভারতীয়রা নিজেদের শাসন নিজেরা চালাতে সম্পূর্ণ সক্ষম।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
8 টি
1. মহাত্মা গান্ধির অহিংস সত্যাগ্রহের আদর্শ ব্যাখ্যা করো। তাঁর নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের তিনটি বড়ো পর্যায় (অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো) সম্পর্কে আলোচনা করো।
গান্ধির অহিংস সত্যাগ্রহ (Satyagraha)
মহাত্মা গান্ধির অহিংস সত্যাগ্রহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিরোধ পদ্ধতি। এর তিনটি মূল উপাদান: সত্য (Truth)— সত্যের প্রতি অটল আনুগত্য ও তার সন্ধান, অহিংসা (Non-violence)— প্রতিপক্ষকে শারীরিক আঘাত না করে আত্মকষ্ট স্বীকার করে তার মনে পরিবর্তন আনা, এবং গণমুখীতা (Mass Movement)— বৃহত্তর সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে টেনে আনা ও কঠোর নৈতিক শৃঙ্খলা মেনে চলা।
তিনটি বড়ো আন্দোলন
- অহিংস অসহযোগ আন্দোলন (১৯২১-২২): জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও খিলাফৎ আন্দোলনের পটভূমিতে শুরু। স্কুল-কলেজ, আদালত, সরকারি চাকরি ও বিদেশি দ্রব্য বর্জন ছিল মূল কর্মসূচি। চৌরিচৌরার হিংসার ঘটনায় গান্ধি আন্দোলন স্থগিত করেন।
- আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-৩৪): ডান্ডি লবণ সত্যাগ্রহ (১৯৩০) দিয়ে শুরু। গণহারে ব্রিটিশ আইন ভঙ্গ, বিদেশি দ্রব্য বর্জন, কর অমান্য। নারী ও কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য।
- ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২): 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে' (Do or Die) স্লোগান নিয়ে ব্রিটিশ শাসনের চূড়ান্ত অবসানের ডাক। নেতৃত্বহীন জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল এই আন্দোলনের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
2. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি, প্রকৃতি ও গুরুত্ব আলোচনা করো। তামলুক জাতীয় সরকার কীভাবে সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তুলেছিল?
পটভূমি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতকে সম্মতি না নিয়ে যুক্ত করা, ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা (১৯৪২), জাপানি আক্রমণের ভয়, দেশব্যাপী খাদ্যাভাব ও মুদ্রাস্ফীতি ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভ চরমে পৌঁছে দিয়েছিল।
প্রকৃতি
৮ আগস্ট ১৯৪২ সালে বোম্বাইতে গান্ধি 'ভারত ছাড়ো' প্রস্তাব পাস করেন এবং 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে' স্লোগান দেন। ৯ আগস্ট ভোরেই ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের সমস্ত শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করে। এরপরই নেতৃত্বহীন সাধারণ জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামেন— টেলিফোন লাইন কাটা, রেললাইন ও স্টেশন ভাঙচুর, থানা আক্রমণ ও কিছু জায়গায় সমান্তরাল সরকার গঠন।
গুরুত্ব ও তামলুক জাতীয় সরকার
ব্রিটিশেরা স্বয়ং স্বীকার করে— '১৮৫৭-র পর এমন বড়ো বিদ্রোহ হয়নি'। মেদিনীপুরের তামলুকে সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে 'তামলুক জাতীয় সরকার' গঠিত হয় (১৭ ডিসেম্বর ১৯৪২)। এই সরকার ঘূর্ণিঝড়-বিধ্বস্ত মানুষের ত্রাণ, ধান বিলি, পুলিশি ব্যবস্থা ও প্রশাসন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং প্রায় দেড় বছর টিকে থাকে। মাতঙ্গিনী হাজরা এই আন্দোলনে শহীদ হন। এই আন্দোলন প্রমাণ করে— ভারতীয়রা নিজেদের শাসন নিজেরাই চালাতে সক্ষম।
3. সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক জীবন, আদর্শ এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা আলোচনা করো। তাঁর কৌশল গান্ধির থেকে কীভাবে আলাদা ছিল?
সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক জীবন
সুভাষচন্দ্র বসু (Subhas Chandra Bose) ১৯২০ সালে সিভিল সার্ভিস ত্যাগ করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন। বাংলা কংগ্রেসের প্রচার বিভাগের দায়িত্ব থেকে শুরু করে কলকাতার মেয়র, কংগ্রেস সভাপতি (১৯৩৮, ১৯৩৯)— সর্বত্র তিনি তাঁর দক্ষতার পরিচয় দেন।
আদর্শ ও গান্ধির সাথে মতপার্থক্য
গান্ধির অহিংস নীতি ও পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের কৌশলে সুভাষ আস্থা রাখতে পারেননি। তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে আপসহীন, জোরালো ও চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানে বিশ্বাসী ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ও জাপানের সাথে মিত্রতা করে 'শত্রুর শত্রু আমার মিত্র' নীতি গ্রহণ করেন।
আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)
সিঙ্গাপুরে রাসবিহারী বসুর হাত থেকে নেতৃত্ব নিয়ে ১৯৪৩ সালে সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ ফৌজ ও 'আজাদ হিন্দ সরকার' প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৪ সালের ইম্ফল ও কোহিমা অভিযানে INA ভারতের মাটিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। নারীদের জন্য 'রানি ঝাঁসি বাহিনী' গড়েন। যদিও সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়, তবুও ১৯৪৫-এ লালকেল্লায় INA-র বিচারকে কেন্দ্র করে তীব্র গণজাগরণ ও ১৯৪৬-এর নৌ-বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে। এটি ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্তে চরম প্রভাব ফেলে।
4. মহাত্মা গান্ধি ও সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বের মধ্যে আদর্শগত পার্থক্যগুলি কী কী ছিল? কংগ্রেসের ত্রিপুরী অধিবেশনে (১৯৩৯) কীভাবে এই পার্থক্য প্রকট হয়?
গান্ধি বনাম সুভাষ— আদর্শগত পার্থক্য
| বিষয় | মহাত্মা গান্ধি | সুভাষচন্দ্র বসু |
| পদ্ধতি | অহিংস সত্যাগ্রহ | জোরালো গণপ্রতিরোধ, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ |
| লক্ষ্য | আত্মনির্ভর গ্রাম-স্বরাজ | আধুনিক শিল্পোন্নত স্বাধীন রাষ্ট্র |
| যুদ্ধ নীতি | ব্রিটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহায়তা নয় | শত্রুর শত্রু মিত্র (জার্মানি-জাপান-ইতালি) |
| আন্দোলনের গতি | পর্যায়ক্রমিক (স্থগিত করে, ফের শুরু) | নিরবচ্ছিন্ন চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থান |
| অর্থনৈতিক দৃষ্টি | গ্রামীণ কুটিরশিল্প, চরকা | রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও ভারী শিল্প |
ত্রিপুরী অধিবেশন (১৯৩৯)
ত্রিপুরী কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র গান্ধি-মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ওয়ার্কিং কমিটি ও গান্ধির অনমনীয় বিরোধিতায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ক্ষুব্ধ সুভাষ কংগ্রেসের মধ্যেই 'ফরওয়ার্ড ব্লক' গঠন করে বামপন্থী ও বিপ্লবী শক্তিকে একত্রিত করার চেষ্টা করেন। এই বিভাজনই ছিল গান্ধি-যুগের (রাইট) ও সুভাষ-নেহরুর বামপন্থী ধারার মধ্যে বড়ো ফাটল— যা পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
5. আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান ও বিচার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কী প্রভাব ফেলেছিল? রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহের (RIN Mutiny, ১৯৪৬) সাথে এর যোগসূত্র কী?
আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA) ও তার প্রভাব
সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ (সৈন্য প্রায় ৪০ হাজার) ১৯৪৪ সালে ইম্ফল-কোহিমা অভিযান চালিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। যদিও বর্ষা, রোগ ও সরবরাহের অভাবে অভিযান সামরিকভাবে সফল হয়নি, তবু এর রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল যুগান্তকারী। INA প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে— ভারতীয় সেনারাই সংগঠিত হয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়তে পারে।
INA বিচার ও গণজাগরণ
যুদ্ধ শেষে আত্মসমর্পণকারী সেহগল, ধিলোঁ, শাহনওয়াজের বিচার দিল্লির লালকেল্লায় শুরু হলে সারা দেশে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কংগ্রেস নেতারাই (নেহরু, ভুলাভাই দেশাই) তাঁদের পক্ষে উকিল হয়ে দাঁড়ান। ব্রিটিশ সরকার জনমতের চাপে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করে ও শেষপর্যন্ত মুক্তি দেয়।
RIN বিদ্রোহ (১৯৪৬) ও যোগসূত্র
INA বিচারের জেরে দেশব্যাপী যে গণজাগরণ তৈরি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বোম্বাইয়ে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির নাবিকেরা (Rating) INA বন্দিদের মুক্তির দাবি সহ খাবারের বাজে মান ও বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদে বিদ্রোহ করেন। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে রাস্তায় নেমে নাবিকদের সমর্থন জানায়। এই নৌ-বিদ্রোহের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
6. বিংশ শতকের গোড়ায় বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ধারা কীভাবে বিকশিত হয়েছিল? সূর্য সেন, ভগৎ সিং এবং বিনয়-বাদল-দীনেশের সংগ্রামের তাৎপর্য আলোচনা করো।
বিংশ শতকের গোড়ায় বিপ্লবী ধারা
বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে বাংলা, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ জোরালো হয়। স্বদেশি আন্দোলনের পতন ও কংগ্রেসের নরমপন্থী রাজনীতির ব্যর্থতায় হতাশ তরুণেরা গুপ্ত সমিতি গড়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ নেয়।
তিনটি ধারার সংগ্রাম
- সূর্য সেন (মাস্টারদা): ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। জালালাবাদ পাহাড়ে সম্মুখ যুদ্ধ। ১৯৩৪ সালে ফাঁসি। চট্টগ্রামের এই ঘটনা ভারতীয় বিপ্লবী ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা।
- ভগৎ সিং: লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯), কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ, 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' ধ্বনি। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ রাজগুরু ও সুখদেবসহ ফাঁসি। ভগৎ সিং বিপ্লবী আন্দোলনের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক চরিত্রের প্রতীক ছিলেন।
- বিনয়-বাদল-দীনেশ: ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ করে ইন্সপেক্টর জেনারেল সিম্পসনকে হত্যা। ঘটনাস্থলেই বাদল আত্মহত্যা, বিনয় মৃত্যুবরণ এবং দীনেশের ফাঁসি।
তাৎপর্য: এই আত্মবলিদান ও সাহসিকতা পরবর্তী প্রজন্মকে তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, ব্রিটিশ শাসকদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছিল এবং এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল— ভারতীয় তরুণরা আর শুধু 'আবেদন-নিবেদন'-এর রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়, তারা স্বাধীনতা চায় এবং তার জন্য প্রাণ দিতে দ্বিধা করে না।
7. ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা আলোচনা করো। বিশেষ করে রানি ঝাঁসি বাহিনী ও মাতঙ্গিনী হাজরার অবদান উল্লেখ করো।
জাতীয় আন্দোলনে নারী
বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল এক বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষণ। আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) থেকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)— সকল ক্ষেত্রেই নারীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আজাদ হিন্দ ফৌজ ও রানি ঝাঁসি বাহিনী
সুভাষচন্দ্র বসু নারীদের সামরিক কাজে অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৪৩ সালে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) অধীনে 'রানি ঝাঁসি বাহিনী' (Rani of Jhansi Regiment) নামে একটি স্বতন্ত্র নারী সেনাদল গঠন করেন। ১৮৫৭-র বিদ্রোহের বীরাঙ্গনা রানি লক্ষ্মীবাইয়ের নামে এই বাহিনীর নামকরণ ছিল নারী শক্তির প্রতি এক অনন্য সম্মান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ১৩০০ জন নারী এই বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৪৫ সালে বার্মা (মায়ানমার) অভিযানে রানি ঝাঁসি বাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।
মাতঙ্গিনী হাজরা
মেদিনীপুর জেলার তমলুকের এক বৃদ্ধা স্বাধীনতা সংগ্রামী মাতঙ্গিনী হাজরা (৭৩ বছর বয়স) ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে জাতীয় পতাকা হাতে মিছিলের সামনে এগিয়ে যান। ২৯ সেপ্টেম্বর তমলুক থানার সামনে পুলিশের গুলিতে জাতীয় পতাকা বুকে চেপে তিনি শহীদ হন। তাঁর আত্মত্যাগ নারী শক্তির চরম বহিঃপ্রকাশ।
এছাড়া সরোজিনী নাইডু, অ্যানি বেসান্ত, সরলা দেবী চৌধুরানী, অরুণা আসফ আলী প্রমুখ নেত্রী স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নারীদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে দিয়েছিল— স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু পুরুষদের বিষয় নয়, এটি সমগ্র জাতির অভ্যুত্থান।
8. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের বিবর্তন কীভাবে হয়েছিল? বিভিন্ন পর্বের আন্দোলনের চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) পরবর্তী পর্ব
যুদ্ধের পর ভারতীয়রা ব্রিটিশের কাছে কিছু রাজনৈতিক ছাড় আশা করলেও রাওলাট আইন (১৯১৯) ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯) সমস্ত ভ্রান্তি দূর করে দেয়। ফলে গান্ধির নেতৃত্বে খিলাফৎ-অসহযোগ আন্দোলন (১৯২১-২২) গড়ে ওঠে— যা প্রথম বড়ো গণআন্দোলন।
মধ্যবর্তী পর্ব (১৯২২-১৯২৯)
চৌরিচৌরার ঘটনায় অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত হলে কংগ্রেসে স্বরাজ্য দলের (চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহরু) উত্থান। ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। ১৯২৯ সালে লাহোর কংগ্রেসে 'পূর্ণ স্বরাজ' (Poorna Swaraj) ঘোষণা।
আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-১৯৩৪)
ডান্ডি লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে সূচনা। কৃষক, নারী ও ব্যবসায়ীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে খান আবদুল গফফর খানের 'লালকুর্তা' আন্দোলন এবং সূর্য সেন-ভগৎ সিং-এর সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রাম এই পর্বকে অন্য মাত্রা দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারত ছাড়ো (১৯৩৯-১৯৪২)
যুদ্ধে ভারতকে জড়ানোয় কংগ্রেস মন্ত্রিসভা পদত্যাগ। ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা। ১৯৪২-এ ভারত ছাড়ো আন্দোলন— 'করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে'। সুভাষচন্দ্র বসু জার্মানি হয়ে জাপানে গিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ ও আজাদ হিন্দ সরকার গঠন।
শেষ পর্ব (১৯৪৫-১৯৪৭)
INA বিচার (১৯৪৫) ও RIN বিদ্রোহ (১৯৪৬) ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। ব্রিটেন উপলব্ধি করে সামরিক শাসন অসম্ভব। ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন, অন্তর্বর্তী সরকার ও শেষে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগ।
বিবর্তনের সারমর্ম: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্দোলন গণমুখী, অহিংস ও ধীরে থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে চরমপন্থী, সশস্ত্র, গণবিদ্রোহের দিকে মোড় নেয়। কংগ্রেসের 'আবেদন-নিবেদন' থেকে গান্ধির 'অসহযোগ', গান্ধির অহিংসা থেকে সুভাষের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ— এই বিবর্তনই শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল।
মনে রেখো!
গান্ধি: চম্পারণ (১৯১৭) → রাওলাট সত্যাগ্রহ (১৯১৯) → অসহযোগ (১৯২১-২২) → আইন অমান্য (ডান্ডি, ১৯৩০) → ভারত ছাড়ো (১৯৪২)। সূর্য সেন: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার (১৯৩০)। ভগৎ সিং: ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ফাঁসি (১৯৩১)। সুভাষচন্দ্র বসু: ফরওয়ার্ড ব্লক (১৯৩৯) → আজাদ হিন্দ সরকার (১৯৪৩) → INA বিচার (১৯৪৫)। RIN বিদ্রোহ: বোম্বাই, ১৯৪৬।
PDF ডাউনলোড
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।
PDF ডাউনলোড