Chapter 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া : সহযোগিতা ও বিদ্রোহ (Cooperation & Revolt)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 30 MCQ | 21 SAQ | 8 Broad Questions
সমাজ সংস্কার
বিদ্রোহ
১৮৫৭
নারীশিক্ষা
🕉️
সমাজ সংস্কার
ব্রাহ্ম | আর্য | সতীদাহ | বিধবা বিবাহ
⚔️
মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭
সিপাহি বিদ্রোহ | গণবিদ্রোহ
🌾
কৃষক বিদ্রোহ
সাঁওতাল | নীল | মুন্ডা
📚
নারীশিক্ষা
রমাবাই | সাবিত্রীবাই | রোকেয়া
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
30 টি
1. সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য কে প্রধান আন্দোলন গড়ে তোলেন?
ক) ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
খ) খ) রাজা রামমোহন রায়
গ) গ) স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী
ঘ) ঘ) কেশবচন্দ্র সেন
ব্যাখ্যা: রাজা রামমোহন রায় (Raja Rammohan Roy) সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক একটি আইন পাস করে সতীদাহ প্রথাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
2. হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন কবে পাস হয়?
ক) ক) ১৮২৯
খ) খ) ১৮৫৬
গ) গ) ১৮৭২
ঘ) ঘ) ১৮৯১
ব্যাখ্যা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (Hindu Widows' Remarriage Act) পাস হয়। বিদ্যাসাগর শাস্ত্রীয় যুক্তি প্রদর্শন করে প্রমাণ করেন যে, বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত।
3. ব্রাহ্ম সমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ক) স্বামী বিবেকানন্দ
খ) খ) রাজা রামমোহন রায়
গ) গ) মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) ঘ) কেশবচন্দ্র সেন
ব্যাখ্যা: রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ব্রাহ্ম সমাজ (Brahmo Samaj) প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে ১৮১৫ সালে তিনি আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ব্রাহ্ম সমাজ একেশ্বরবাদ, মূর্তিপূজার বিরোধিতা, নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের পক্ষে কাজ করে।
4. আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক) ক) রাজা রামমোহন রায়
খ) খ) স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী
গ) গ) স্বামী বিবেকানন্দ
ঘ) ঘ) কেশবচন্দ্র সেন
ব্যাখ্যা: স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (Swami Dayanand Saraswati) ১৮৭৫ সালে আর্য সমাজ (Arya Samaj) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বেদকে সর্বোচ্চ ধর্মগ্রন্থ মনে করতেন এবং মূর্তিপূজা, বাল্যবিবাহ ও পুরোহিততন্ত্রের বিরোধিতা করে বিধবা বিবাহ ও নারীশিক্ষার সমর্থন করেন।
5. এশিয়াটিক সোসাইটি কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ক) ওয়ারেন হেস্টিংস
খ) খ) উইলিয়ম জোনস
গ) গ) জেমস মিল
ঘ) ঘ) লর্ড বেন্টিঙ্ক
ব্যাখ্যা: স্যার উইলিয়ম জোনস (Sir William Jones) ১৭৮৪ সালে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের চর্চা ও ইংরেজি অনুবাদ।
6. বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, জাতপাতের বিরুদ্ধে কারা সোচ্চার ছিলেন?
ক) ক) নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী
খ) খ) রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ
গ) গ) মুসলিম লীগ
ঘ) ঘ) ব্রিটিশ প্রশাসন
ব্যাখ্যা: নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল (Young Bengal) গোষ্ঠী হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর ছাত্রদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। তাঁরা জাতপাত, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতি কুপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং সমাজকে আধুনিকতার পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
7. সাঁওতাল বিদ্রোহ (সাঁওতাল হুল) কবে সংঘটিত হয়?
ক) ক) ১৮৫৫-৫৬
খ) খ) ১৮৫৯-৬০
গ) গ) ১৮৭৫
ঘ) ঘ) ১৮৯৯-১৯০০
ব্যাখ্যা: সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সাঁওতাল হুল (Santhal Rebellion) ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয়। সিধু ও কানহুর নেতৃত্বে সাঁওতালরা জমিদার, মহাজন ('দিকু') ও ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহ দমনের পর সাঁওতাল পরগনা গঠিত হয়।
8. মুন্ডা বিদ্রোহের (উলগুলান) নেতা কে ছিলেন?
ক) ক) সিধু
খ) খ) কানহু
গ) গ) বিরসা মুন্ডা
ঘ) ঘ) তিতুমির
ব্যাখ্যা: বিরসা মুন্ডা (Birsa Munda) ১৮৯৯-১৯০০ সালে মুন্ডা উপজাতির নেতৃত্বে মুন্ডা উলগুলান (Munda Ulgulan) বা মুন্ডা বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। মুন্ডাদের জমি বহিরাগত 'দিকু'দের হাতে চলে যাওয়া এবং জমিদার-মহাজন-মিশনারি-উপনিবেশিক সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ হয়।
9. বারাসাত বিদ্রোহের নেতা কে ছিলেন?
ক) ক) সিধু ও কানহু
খ) খ) মির নিসার আলি (তিতুমির)
গ) গ) বিরসা মুন্ডা
ঘ) ঘ) মঙ্গল পাণ্ডে
ব্যাখ্যা: মির নিসার আলি (তিতুমির — Titu Mir) বারাসাত অঞ্চলে ওয়াহাবি বিদ্রোহ (Wahabi Movement) পরিচালনা করেন (১৮৩১)। তিনি নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করে বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। ব্রিটিশ বাহিনী কামান দেগে তাঁর কেল্লা ধ্বংস করে দেয়।
10. দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটকটি কবে প্রকাশিত হয়?
ক) ক) ১৮৫৭
খ) খ) ১৮৬০
গ) গ) ১৮৭৫
ঘ) ঘ) ১৯০৫
ব্যাখ্যা: দীনবন্ধু মিত্র (Dinabandhu Mitra) ১৮৬০ সালে 'নীলদর্পণ' (Nil Darpan) নাটক রচনা করেন। এই নাটকে বাংলার নীলচাষীদের ওপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের নির্মম চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি নীল বিদ্রোহের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে।
11. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সূচনা কোথায় হয়?
ক) ক) কলকাতা
খ) খ) ব্যারাকপুর
গ) গ) মিরাট
ঘ) ঘ) দিল্লি
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে ব্যারাকপুরের সেনাছাউনিতে সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে (Mangal Pandey) এক ইউরোপীয় সেনা আধিকারিককে গুলি করেন। এটাই ছিল মহাবিদ্রোহের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। পরবর্তীতে মে মাসে মিরাটের সেনাছাউনি থেকে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
12. কোন্ গুজব ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের তাত্ক্ষণিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
ক) ক) বেতন কমানোর গুজব
খ) খ) এনফিল্ড রাইফেলের টোটায় গরু ও শুকরের চর্বি মেশানোর গুজব
গ) গ) মোগল সম্রাটকে হত্যার গুজব
ঘ) ঘ) কোম্পানি বাতিল হওয়ার গুজব
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের তাত্ক্ষণিক কারণ ছিল— নতুন এনফিল্ড রাইফেলের টোটাগুলিতে গরু ও শুকরের চর্বি মেশানোর গুজব। টোটা দাঁত দিয়ে কেটে রাইফেল ভরতে হতো, ফলে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিরা মনে করেন কোম্পানি তাদের জাত ও ধর্ম নষ্ট করতে চাইছে।
13. মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বিদ্রোহীরা কী ঘোষণা করেন?
ক) ক) ইংল্যান্ডের সম্রাট
খ) খ) হিন্দুস্তানের সম্রাট
গ) গ) বাংলার নবাব
ঘ) ঘ) ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল
ব্যাখ্যা: মিরাট থেকে বিদ্রোহ করে সিপাহিরা দিল্লি গিয়ে মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে 'হিন্দুস্তানের সম্রাট' (Emperor of Hindustan) বলে ঘোষণা করে। বাহাদুর শাহ জাফর বাধ্য হয়ে বিদ্রোহীদের সমর্থন দেন।
14. সাঁওতাল বিদ্রোহীদের তাদের জমি থেকে উচ্ছেদকারী বহিরাগতদের কী নামে ডাকা হতো?
ক) ক) বর্গি
খ) খ) দিকু
গ) গ) বণিক
ঘ) ঘ) ইজারাদার
ব্যাখ্যা: সাঁওতালরা বহিরাগত জমিদার, মহাজন ও ইজারাদারদের 'দিকু' (Diku) বলত। দরিদ্র সাঁওতালদের জমি দখল করে এবং চড়া সুদে ঋণের বোঝা দিয়ে দিকুরা সাঁওতালদের শোষণ করত। এই শোষণের বিরুদ্ধেই ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
15. ফরাজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক) ক) তিতুমির
খ) খ) হাজি শরিয়তউল্লাহ
গ) গ) সৈয়দ আহমদ বেরলভি
ঘ) ঘ) মির নিসার আলি
ব্যাখ্যা: হাজি শরিয়তউল্লাহ (Haji Shariatullah) পূর্ব বাংলার ফরিদপুর অঞ্চলে গরিব চাষিদের নিয়ে ফরাজি আন্দোলন (Faraizi Movement) গড়ে তোলেন। এই আন্দোলন জমিদার, নীলকর ও উপনিবেশিক প্রশাসনের বিরোধিতা করেছিল।
16. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে কী ব্যবস্থা চালু করে?
ক) ক) দ্বৈত শাসন
খ) খ) রানি ভিক্টোরিয়ার প্রত্যক্ষ শাসন
গ) গ) মোগল শাসন ফিরিয়ে আনে
ঘ) ঘ) ভারতীয়দের হাতে শাসন ছেড়ে দেয়
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৫৮ সালে একটি আইন পাস করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটায়। ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের (রানি ভিক্টোরিয়া) হাতে ন্যস্ত হয়। গভর্নর জেনারেলের পরিবর্তে 'ভাইসরয়' পদ সৃষ্টি করা হয়। ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর থেকে এই নতুন শাসন ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
17. নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) দুজন নেতার নাম লেখো।
ক) ক) সিধু ও কানহু
খ) খ) তিতুমির ও দুদুমিঞা
গ) গ) বিশ্বচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস
ঘ) ঘ) নানা সাহেব ও তাতিয়া টোপি
ব্যাখ্যা: নীল বিদ্রোহের (১৮৫৯-৬০) দুজন প্রধান নেতা ছিলেন— নদীয়া জেলার বিশ্বচরণ বিশ্বাস ও যশোর জেলার দিগম্বর বিশ্বাস। বাংলার লাখ লাখ কৃষক এই বিদ্রোহে সম্মিলিতভাবে নীলচাষ বর্জন করে নীলকর সাহেবদের প্রতিরোধ করেছিলেন।
18. প্রার্থনা সমাজ (Prarthana Samaj) কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ক) কলকাতা
খ) খ) মাদ্রাজ
গ) গ) বোম্বাই
ঘ) ঘ) পুনা
ব্যাখ্যা: প্রার্থনা সমাজ (Prarthana Samaj) ১৮৬৭ সালে বোম্বাইতে (মুম্বাই) প্রতিষ্ঠিত হয়। আত্মারাম পাণ্ডুরঙ্গ, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ এর নেতৃত্ব দেন। ব্রাহ্ম সমাজের মতো এরাও একেশ্বরবাদ, মূর্তিপূজার বিরোধিতা ও সামাজিক সংস্কারের পক্ষে ছিলেন।
19. পণ্ডিতা রমাবাই কোন্ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন?
ক) ক) সতীদাহ প্রথা বন্ধ
খ) খ) নারীশিক্ষা ও বিধবা নারীদের আত্মনির্ভরতা
গ) গ) ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন
ঘ) ঘ) কৃষক বিদ্রোহ
ব্যাখ্যা: পণ্ডিতা রমাবাই (Pandita Ramabai) ছিলেন এক বিধবা ব্রাহ্মণ নারী, যিনি সামাজিক বাধা নস্যাৎ করে বিধবা নারীদের শিক্ষা ও আত্মনির্ভরতার জন্য কাজ করেন। তিনি নিজের মেয়েকে নিয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে ডাক্তারি পড়েন এবং পুনায় বিধবা নারীদের জন্য আশ্রম স্থাপন করেন।
20. সৈয়দ আহমদ খান কোন্ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন?
ক) ক) হিন্দু কলেজ
খ) খ) আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (MAO College)
গ) গ) সংস্কৃত কলেজ
ঘ) ঘ) কলকাতা মাদ্রাসা
ব্যাখ্যা: স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সমাজকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ১৮৭৫ সালে আলিগড়ে মুহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল (MAO) কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন— যা পরবর্তীতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে (Aligarh Muslim University) পরিণত হয়।
21. ওয়াহাবি আন্দোলনের সূচনা কোথায় হয়েছিল?
ক) ক) ভারত
খ) খ) আরব
গ) গ) তুরস্ক
ঘ) ঘ) ইরান
ব্যাখ্যা: ওয়াহাবি আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল আরবে (Arabia), আব্দুল ওয়াহাবের নেতৃত্বে। ভারতে এর নেতৃত্ব দেন সৈয়দ আহমদ বেরলভি। তিতুমির (মির নিসার আলি) ওয়াহাবি মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলায় ব্রিটিশ ও জমিদার বিরোধী সংগ্রাম গড়ে তোলেন।
22. রানি লক্ষ্মীবাই কোন্ অঞ্চলের নেতৃত্ব দেন ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে?
ক) ক) দিল্লি
খ) খ) ঝাঁসি
গ) গ) লক্ষ্ণৌ
ঘ) ঘ) কানপুর
ব্যাখ্যা: রানি লক্ষ্মীবাই (Rani Lakshmibai) ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ঝাঁসির (Jhansi) নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশদের সাথে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করে তিনি শহীদ হন। লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতিতে তাঁর দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার নাকচ করায় তিনি ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
23. জ্যোতিরাও ফুলে কাদের জন্য কাজ করেছিলেন?
ক) ক) জমিদার
খ) খ) নিম্নবর্ণের মানুষ ও নারীশিক্ষা
গ) গ) ব্রিটিশ আধিকারিক
ঘ) ঘ) উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ
ব্যাখ্যা: জ্যোতিরাও ফুলে (Jyotirao Phule) ও তাঁর স্ত্রী সাবিত্রীবাই ফুলে মহারাষ্ট্রে নিম্নবর্গের মানুষের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং নারীশিক্ষার জন্য লড়াই করেন। ১৮৫১ সালে পুনায় তিনি প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তার 'সত্যশোধক সমাজ' নিচুতলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।
24. কত সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে?
ক) ক) ১৮৫৭
খ) খ) ১৮৫৮
গ) গ) ১৮৭৭
ঘ) ঘ) ১৯৪৭
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি আইন পাস করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটায়। ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর থেকে ভারত সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অধীনে আসে।
25. মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র কবে জারি হয়?
ক) ক) ১৮৫৭
খ) খ) ১৮৫৮
গ) গ) ১৮৭৭
ঘ) ঘ) ১৯১১
ব্যাখ্যা: ১৮৫৮ সালে মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র (Queen Victoria's Proclamation) জারি করা হয়। এই ঘোষণাপত্রে ভারতীয়দের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, আইনের চোখে সমতা এবং কোম্পানির অধীনে করা চুক্তিগুলি সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
26. সাঁওতাল বিদ্রোহের পর সাঁওতালদের জন্য কী গঠন করা হয়?
ক) ক) সাঁওতাল রাজ্য
খ) খ) সাঁওতাল পরগনা
গ) গ) সাঁওতাল কাউন্সিল
ঘ) ঘ) সাঁওতাল সেনাবাহিনী
ব্যাখ্যা: সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-৫৬) পর ব্রিটিশ প্রশাসন সাঁওতালদের স্বার্থ ও সুরক্ষার ব্যাপারে কিছুটা সচেতন হয় এবং সাঁওতাল পরগনা (Santhal Pargana) নামে একটি স্বতন্ত্র জেলা গঠন করে, যেখানে সাঁওতালদের জন্য কিছু বিশেষ সুরক্ষা বিধান রাখা হয়।
27. নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী কাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে?
ক) ক) রামমোহন রায়
খ) খ) হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও
গ) গ) বিদ্যাসাগর
ঘ) ঘ) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্যাখ্যা: হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (Henry Louis Vivian Derozio) ছিলেন কলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক। তাঁর ছাত্রদের নিয়ে গড়ে ওঠা নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল (Young Bengal) গোষ্ঠী প্রচলিত কুসংস্কার, জাতপাত, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল।
28. বিদ্যাসাগর বাংলা শিক্ষার প্রসারের জন্য কী করেছিলেন?
ক) ক) ইংরেজি শিক্ষার বিরোধিতা
খ) খ) বাংলা বর্ণপরিচয় ও সহজ পাঠ রচনা, মডেল স্কুল স্থাপন
গ) গ) সংস্কৃত শিক্ষার বিরোধিতা
ঘ) ঘ) ফরাসি স্কুল স্থাপন
ব্যাখ্যা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা শিক্ষার প্রসারে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন। তিনি বাংলা বর্ণপরিচয়, সহজ পাঠ, কথামালা প্রভৃতি সহজপাঠ্য বই রচনা করেন। সহকারি স্কুল পরিদর্শক হিসেবে বাংলার বিভিন্ন জেলায় কয়েকটি মডেল স্কুল তৈরি করেন এবং বুঝেছিলেন যে, সরকারি ব্যয়ের বাইরেও শিক্ষা বিস্তারের বিকল্প পরিকল্পনা প্রয়োজন।
29. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে কি শুধু 'সিপাহি বিদ্রোহ' বলা যায়?
ক) ক) হ্যাঁ, শুধু সিপাহিরাই বিদ্রোহ করেছিল
খ) খ) না, অনেক জায়গায় সাধারণ জনগণ, কৃষক, অভিজাতরাও যোগ দিয়েছিলেন
গ) গ) শুধু ইউরোপীয়রা জানত
ঘ) ঘ) এটি একটি পৌরাণিক ঘটনা
ব্যাখ্যা: অনেক ব্রিটিশ লেখক ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে শুধু 'সিপাহি বিদ্রোহ' (Sepoy Mutiny) বলতে চাইলেও, ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ করে যে অনেক জায়গায় সিপাহিদের সাথে স্থানীয় অভিজাত, কৃষক ও সাধারণ জনগণও একজোট হয়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, নানা সাহেব, রানি লক্ষ্মীবাই, কুঁয়ার সিং প্রমুখের নেতৃত্ব এটিকে গণবিদ্রোহের চরিত্র দিয়েছিল।
30. সঞ্জীবনী পত্রিকায় আসামের চা-বাগান শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে কে লিখেছিলেন?
ক) ক) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
খ) খ) দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়
গ) গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঘ) ঘ) অক্ষয়কুমার দত্ত
ব্যাখ্যা: দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় আসামের চা-বাগানগুলির ইউরোপীয় মালিকদের অত্যাচারের খবর স্বচক্ষে ঘুরে দেখে সঞ্জীবনী পত্রিকাতে প্রকাশ করে শ্রমিকদের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর সঙ্গী রামকুমার বিদ্যারত্নও ধারাবাহিক ভাবে 'কুলী-কাহিনী' নিবন্ধ লিখেছিলেন।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
21 টি
1. ভদ্রলোক (Bhadralok) শ্রেণি কাদের বলা হতো? তাঁদের ভূমিকা কী ছিল?
উনিশ শতকের বাংলা ও অন্যান্য প্রেসিডেন্সি শহরে (কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ) পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, ইংরেজি জানা এবং কোম্পানির অধীনে চাকরিজীবী বা জমিদার-ব্যবসায়ী যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠেন, তাঁদেরই 'ভদ্রলোক' (Bhadralok) বলা হতো। তাঁরা আর্থিক সচ্ছলতা ও সামাজিক মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। ভূমিকা: ভদ্রলোক শ্রেণিই সমাজ সংস্কার আন্দোলনের (ব্রাহ্ম সমাজ, প্রার্থনা সমাজ) নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষণা করেন। সতীদাহ বিলোপ, বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষার মতো বিষয়ে তাঁরা উদ্যোগী হয়েছিলেন। তবে সমালোচকদের মতে, তাঁদের আন্দোলন শহর ও উচ্চবর্ণকেন্দ্রিক ছিল— সাধারণ গ্রামীণ মানুষের সাথে যোগাযোগ কম ছিল।
2. রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে কী জানো?
রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথাকে (স্বামীর চিতায় স্ত্রীর সহমরণ) 'নারীর প্রতি চরম অবিচার' ও 'ধর্মের নামে অন্ধকূপ হত্যা' বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি নিজে বারাণসীর ঘাটে গিয়ে সতীদাহ প্রতিরোধে জনমত গড়ে তোলেন। শাস্ত্রীয় তর্কে তিনি দেখান: (১) নারীর স্বভাবগত বুদ্ধিহীনতার অভিযোগ অমূলক— তাদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে বলেই তারা অজ্ঞ, জন্মগতভাবে নয়, (২) সহমরণের নামে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা অমানবিক ও শাস্ত্রবিরুদ্ধ। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ নিষিদ্ধ করে আইন জারি করেন।
3. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলন ও নারীশিক্ষায় অবদান কী ছিল?
বিধবা বিবাহ আন্দোলন: বিদ্যাসাগর হিন্দু শাস্ত্র (বিশেষ করে পরাশর সংহিতা) ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। রক্ষণশীল সমাজের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (Act XV) পাস হয়। নারীশিক্ষা: বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষাকে প্রগতির মূল চাবিকাঠি মনে করতেন। তিনি বেথুন স্কুলের সাথে যুক্ত থেকে মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন। স্কুল পরিদর্শক থাকাকালে নিজ খরচে বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলা বর্ণপরিচয় রচনার মাধ্যমে সহজ ভাষায় শিক্ষার ভিত রচনা করেন।
4. ব্রাহ্ম সমাজ কে, কেন প্রতিষ্ঠা করেন? এর মূলনীতি কী ছিল?
রাজা রামমোহন রায় ১৮১৫ সালে 'আত্মীয় সভা' এবং পরে ১৮২৮ সালে ব্রাহ্ম সমাজ (Brahmo Samaj) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার কারণ: (১) একেশ্বরবাদ (একমাত্র পরমব্রহ্মের উপাসনা)— মূর্তিপূজা ও বহুদেবতাবাদের বিরোধিতা, (২) সমাজ থেকে কুসংস্কার, সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, জাতপাতের মতো অনাচার দূর করা, (৩) নারীজাতির শিক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধি। মূলনীতি: একেশ্বরবাদ, সব ধর্মের সারসত্যে বিশ্বাস, যুক্তি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে সামাজিক সংস্কার। পরবর্তীতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম সমাজ আরও বিস্তৃত হয় এবং বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সময় তা জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে সাধারণ কৃষক শ্রেণির সাথে এর দূরত্ব ছিল।
5. আর্য সমাজ ও স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর সংস্কার কার্যক্রম কী ছিল?
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ১৮৭৫ সালে আর্য সমাজ (Arya Samaj) প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মূল মতবাদ ছিল 'বেদে প্রত্যাবর্তন' (Back to the Vedas)— বেদই সর্বোচ্চ ধর্মগ্রন্থ ও সমস্ত বিজ্ঞানের আকর। সংস্কার কার্যক্রম: (১) মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধিতা, (২) বাল্যবিবাহ, পুরোহিততন্ত্রের বিরোধিতা, (৩) বিধবা বিবাহ ও নারীশিক্ষার জোরালো সমর্থন, (৪) হিন্দুধর্মের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও বাহ্যিক আচারসমূহের সমালোচনা। পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে আর্য সমাজের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। তবে দয়ানন্দের মৃত্যুর পর আর্য সমাজ ক্রমেই উগ্র হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী রূপ ধারণ করে।
6. নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল (Young Bengal) গোষ্ঠী কাদের নেতৃত্বে গঠিত হয়? তাদের আদর্শ কী ছিল?
হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (Henry Louis Vivian Derozio) ছিলেন কলকাতা হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষক (১৮০৯-১৮৩১)। তিনি ছাত্রদের মধ্যে মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদের বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করেন। তাঁর ছাত্রদের নিয়ে গঠিত গোষ্ঠীই 'নব্যবঙ্গ' বা 'ইয়ং বেঙ্গল' (Young Bengal) নামে পরিচিত হয়। আদর্শ: (১) সামাজিক কুপ্রথা— জাতপাত, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, মূর্তিপূজার কঠোর বিরোধিতা, (২) যুক্তিবাদ ও স্বাধীন চিন্তার সমর্থন, (৩) পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আস্থা। তবে ব্রিটিশ শাসন ও ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন ছিল। পরবর্তীকালে এই গোষ্ঠীর অনেকেই নিজেদের পূর্ববর্তী উগ্র মতামত থেকে সরে আসেন।
7. মুসলিম সমাজে সংস্কারের জন্য স্যার সৈয়দ আহমদ খানের অবদান কী?
স্যার সৈয়দ আহমদ খান (Sir Syed Ahmed Khan) উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণ ও শিক্ষা সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। অবদান: (১) ১৮৭৫ সালে আলিগড়ে মুহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল (MAO) কলেজ প্রতিষ্ঠা— যা পরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়, (২) এই কলেজে মুসলিম ছাত্রদের পাশাপাশি হিন্দু ছাত্ররাও পড়তেন, (৩) তিনি মুসলিমদের মধ্যে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করান এবং ইসলাম ও আধুনিকতার মধ্যে সংযোগসাধনের চেষ্টা করেন, (৪) তবে তাঁর সংস্কারগুলি ছিল মূলত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজকেন্দ্রিক— গরিব মুসলমানদের ওপর এর তেমন প্রভাব পড়েনি।
8. সাঁওতাল বিদ্রোহ (সাঁওতাল হুল) কেন হয়েছিল? এর ফলাফল কী হয়েছিল?
সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬): সিধু ও কানহুর নেতৃত্বে সাঁওতাল উপজাতির মানুষের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ। কারণ: (১) জমিদার, বহিরাগত মহাজন (যাদের 'দিকু' বলা হতো) সাঁওতালদের জমি দখল করে ও চড়া সুদে ঋণের জালে আবদ্ধ করে, (২) জোর করে বেগার শ্রম খাটানো হতো এবং অতিরিক্ত খাজনা আদায় করা হতো, (৩) ইউরোপীয় রেলওয়ে কোম্পানির ঠিকাদারদের অত্যাচার, (৪) ব্রিটিশ আইন-শাসন আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারাকে গ্রাস করছিল। ফলাফল: ব্রিটিশ বাহিনী নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে— অসংখ্য সাঁওতাল নিহত হন। তবে ব্রিটিশ প্রশাসন সাঁওতালদের স্বার্থরক্ষায় কিছুটা সচেতন হয় এবং 'সাঁওতাল পরগনা' নামে পৃথক জেলা গঠন করে। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকায় সাঁওতালদের পক্ষ নিয়ে লেখেন।
9. নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো। 'নীলদর্পণ' নাটকের ভূমিকা কী ছিল?
নীল বিদ্রোহ (Indigo Revolt): বাংলার নদীয়া, যশোর, পাবনা প্রভৃতি জেলায় নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের সম্মিলিত অসহযোগ ও বিদ্রোহ। বিশ্বচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস ছিলেন বিশিষ্ট নেতা। কৃষকরা নীলচাষ সম্পূর্ণ বর্জন করে নীলকুঠি আক্রমণ করে। দীনবন্ধু মিত্র ১৮৬০ সালে 'নীলদর্পণ' (Nil Darpan) নাটক রচনা করেন, যেখানে নীলকর অত্যাচারের নির্মম চিত্র অঙ্কিত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং ইউরোপীয় মহলে এই নাটক সাড়া ফেলে। নাটকের প্রভাবে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি হয় এবং সরকার ১৮৬০ সালে একটি কমিশন গঠন করে। শেষপর্যন্ত জোরপূর্বক নীল চাষ করানো বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
10. তিতুমিরের (তিতু মীর) বারাসাত বিদ্রোহ সম্পর্কে কী জানো?
মির নিসার আলি (তিতুমির) ওয়াহাবি মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে বারাসাত অঞ্চলে ইংরেজ ও জমিদার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৮৩১ সালে তিতুমির সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং নিজেকে 'বাদশাহ' ঘোষণা করে বারাসাতে একটি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। নারকেলবেড়িয়া বিদ্রোহ নামেও এটি পরিচিত। নদীয়া, ফরিদপুর প্রভৃতি অঞ্চলেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলন স্থানীয় জমিদার, নীলকর ও ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ছিল। ব্রিটিশ বাহিনী কামান দেগে বাঁশের কেল্লা ধ্বংস করে দেয় এবং তিতুমির শহীদ হন।
11. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের কারণগুলি কী কী?
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি চার ভাগে ভাগ করা যায়: (১) সামরিক কারণ— সিপাহিদের বেতন কমানো, ভাতা বন্ধ, সমুদ্র পারাপারে জাতিচ্যুতির ভয় এবং এনফিল্ড রাইফেলের টোটায় গরু-শুকরের চর্বির গুজব, (২) অর্থনৈতিক কারণ— কৃষক, শিল্পী, কারিগরদের জীবিকাহানি, চড়া রাজস্ব, জমি হারানো, (৩) রাজনৈতিক কারণ— স্বত্ববিলোপ নীতি (ডালহৌসি) ও অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিতে দেশীয় রাজাদের ক্ষমতাচ্যুতি (ঝাঁসি, সাতারা, নাগপুর), (৪) সামাজিক-ধর্মীয় কারণ— মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণ, পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কার আইনগুলিকে (বিধবা বিবাহ আইন, রেলওয়ে) হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্ম ও সমাজ কাঠামোর প্রতি আক্রমণ বলে মনে করছিলেন।
12. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার কী কী পরিবর্তন আনে? রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রের মূল বিষয় কী ছিল?
মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশ সরকার বড়ো ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করে: (১) ১৮৫৮ সালের আইনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের শাসন সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের (রানি ভিক্টোরিয়া) হাতে ন্যস্ত করা হয়, (২) গভর্নর জেনারেলের পরিবর্তে 'ভাইসরয়' পদ সৃষ্টি— লর্ড ক্যানিং প্রথম ভাইসরয়, (৩) ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র (Queen's Proclamation) জারি, যার মূল বিষয়: ভারতীয়দের ধর্মীয় বিষয়ে পূর্ণ সহিষ্ণুতা, আইনের চোখে সবার সমতা, কোম্পানির অধীনে করা চুক্তি সম্মান, আর কোনো রাজ্য গ্রাস না করার প্রতিশ্রুতি, এবং যোগ্য ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের আশ্বাস, (৪) সিপাহি বাহিনীতে আমূল সংস্কার— ইউরোপীয় সৈন্যদের অনুপাত বাড়ানো, 'সামরিক জাতি' তত্ত্বে শিখ, গুর্খা ও রাজপুতদের নিয়োগ বৃদ্ধি।
13. বিরসা মুন্ডা ও মুন্ডা উলগুলান সম্পর্কে কী জানো?
বিরসা মুন্ডা (Birsa Munda) ১৮৯৯-১৯০০ সালে ছোটনাগপুর অঞ্চলের মুন্ডা উপজাতির নেতৃত্বে মুন্ডা উলগুলান (Munda Ulgulan) বা মহাবিদ্রোহ পরিচালনা করেন। কারণ: দীর্ঘদিন ধরে মুন্ডাদের জমি বহিরাগত জমিদার-মহাজন ('দিকু'), খ্রিস্টান মিশনারি ও ঔপনিবেশিক সরকারী কর্মচারীদের হাতে চলে গিয়ে মুন্ডারা ভূমিহীন ও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। মুন্ডারা বিশ্বাস করত বিরসা এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন নেতা। বিদ্রোহের লক্ষ্য ছিল: দিকুদের বিতাড়ন, জমি পুনরুদ্ধার এবং ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিরসার শাসন কায়েম করা। উপনিবেশিক প্রশাসনের কঠোর দমন-পীড়নে বিদ্রোহ পরাস্ত হয়। পরে ব্রিটিশ সরকার মুন্ডাদের জন্য ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন (CNT Act, ১৯০৮) পাস করতে বাধ্য হয়।
14. সাঁওতাল বিদ্রোহ ও নীল বিদ্রোহের মধ্যে একটি তুলনামূলক আলোচনা করো।
সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬) এবং নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০) উভয়ই ছিল ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ। সাদৃশ্য: (১) উভয় বিদ্রোহের পিছনে অর্থনৈতিক শোষণ ও বেদখলি মুখ্য কারণ— সাঁওতালদের জমিদার ও দিকু-মহাজনেরা জমি থেকে উচ্ছেদ করছিল, নীলচাষীদের জমি থেকে নীলকররা উচ্ছেদ করছিল, (২) উভয় ক্ষেত্রেই ঋণের ফাঁদ (সাঁওতালদের দিকুদের কাছে, কৃষকদের নীলকরদের 'দাদন'-এর কাছে) বিদ্রোহের ইন্ধন জোগায়, (৩) উভয় বিদ্রোহই ছিল সম্মিলিতভাবে নির্দিষ্ট শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। পার্থক্য: (১) সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল উপজাতি সম্প্রদায়ভিত্তিক, নীল বিদ্রোহ ছিল পেশাভিত্তিক কৃষক বিদ্রোহ, (২) নীল বিদ্রোহে বাংলার শিক্ষিত সমাজ (হিন্দু প্যাট্রিয়ট, নীলদর্পণ) সক্রিয়ভাবে সমর্থন ও সহানুভূতি জানালেও সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় তেমন দেখা যায়নি।
15. হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পর্কে কী মত প্রকাশ করেছিলেন?
হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (Harish Chandra Mukherjee) ছিলেন 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' (Hindu Patriot) পত্রিকার সম্পাদক। সাঁওতাল বিদ্রোহের (১৮৫৫-৫৬) খবর কলকাতায় পৌঁছানোর পর তিনি তাঁর পত্রিকায় সাঁওতালদের পক্ষ নিয়ে অত্যন্ত সাহসী ও মানবিক বক্তব্য রাখেন। তিনি লিখেছিলেন: 'শান্ত ও সৎ সাঁওতাল জাতি বিদ্রোহ করতে যে বাধ্য হয়েছে, তার পিছনে অনেক কারণ আছে।' তিনি উল্লেখ করেন, সাঁওতালদের জোর করে বেগার খাটানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত খাজনা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। হরিশচন্দ্রের মত ছিল— 'যারা এসব শান্তিপ্রিয় সাঁওতালদের উপর অত্যাচার করে তাদের বিদ্রোহ করতে বাধ্য করেছে, তাদেরই শাস্তি হওয়া উচিত, সাঁওতালদের নয়। তাঁরা শুধু চায় নিজেদের জঙ্গল ও উপত্যকার মধ্যে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকার।'
16. কীভাবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ ও ঝাঁসিতে ছড়িয়ে পড়েছিল?
মিরাটের সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিল্লির দিকে যাত্রা করে এবং মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে 'হিন্দুস্তানের সম্রাট' ঘোষণা দিয়ে নেতৃত্ব দিতে বাধ্য করে। ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও অযোধ্যার বিভিন্ন সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। কানপুরে নানা সাহেব (পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র) কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং নিজেকে পেশোয়া ঘোষণা করেন। লক্ষ্ণৌতে বেগম হজরত মহলের নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়। ঝাঁসিতে রানি লক্ষ্মীবাই দত্তক পুত্রের অধিকার খর্ব হওয়ায় ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং তাতিয়া টোপির সাথে মিলে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনা করে শেষ পর্যন্ত শহীদ হন। এভাবে উত্তর ও মধ্য ভারতের প্রায় সব অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় অভিজাত ও সাধারণ জনগণ সিপাহিদের সাথে যুক্ত হয়ে এটিকে গণবিদ্রোহের চরিত্র দেয়।
17. উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাগুলি কী কী ছিল?
উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনগুলি (ব্রাহ্ম, প্রার্থনা, আর্য সমাজ) যতই প্রগতিশীল হোক, তাদের কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা ছিল: (১) নগরকেন্দ্রিকতা— আন্দোলনগুলি মূলত কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ, পুনার মতো শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কাছে এর বার্তা পৌঁছয়নি, (২) উচ্চবর্ণ-অভিজাত চরিত্র— সংস্কারকদের অধিকাংশই ছিলেন উচ্চবর্ণের (ব্রাহ্মণ, কায়স্থ) প্রতিনিধি; জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে তেমন সোচ্চার ছিলেন না, (৩) ভাষাগত সীমাবদ্ধতা— বাংলার সংস্কারকেরা ইংরেজি ও সংস্কৃত-মেশানো বাংলা ব্যবহার করতেন, যা সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের বোধগম্য ছিল না, (৪) সীমিত সামাজিক ভিত্তি— শুধুমাত্র শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকরাই এসব আন্দোলনের ধারক-বাহক ছিলেন; সমাজের নিচুতলার মানুষ, কৃষক, উপজাতি সম্প্রদায় এই আন্দোলনের বাইরে ছিলেন, (৫) ধর্মকেন্দ্রিকতা— সংস্কারকেরা ধর্মশাস্ত্রের সঠিক ব্যাখ্যার উপরেই বেশি জোর দিয়েছিলেন, ফলে অনেকেই শাস্ত্রীয় তর্কে আটকে সামগ্রিক সামাজিক বিপ্লবের ডাক দিতে পারেননি।
18. প্রার্থনা সমাজ ও জ্যোতিরাও ফুলের সত্যশোধক সমাজের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল?
প্রার্থনা সমাজ (Prarthana Samaj): ১৮৬৭ সালে বোম্বাইতে আত্মারাম পাণ্ডুরঙ্গ ও মহাদেব গোবিন্দ রানাডের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত। এটি ব্রাহ্ম সমাজের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত ছিল— একেশ্বরবাদ, মূর্তিপূজার বিরোধিতা, বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা ও বর্ণভেদ দূরীকরণের পক্ষে কাজ করত। কিন্তু এটিও মূলত উচ্চবর্ণীয়, শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। সত্যশোধক সমাজ (Satyashodhak Samaj): ১৮৭৩ সালে মহারাষ্ট্রে জ্যোতিরাও ফুলে প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল আমূল ভিন্ন ধারার— ফুলে ছিলেন নিম্নবর্গের মানুষদের (শূদ্র, অতি-শূদ্র, দলিত) মুক্তির প্রবক্তা। তাঁর মতে, ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যই ভারতীয় সমাজের সব অনাচারের মূল। তিনি বর্ণপ্রথা, অস্পৃশ্যতা ও পুরোহিততন্ত্রের উচ্ছেদ এবং নারী-শূদ্র-দলিতের শিক্ষা ও সমানাধিকারের পক্ষে লড়েছিলেন। এই আন্দোলন নিচুতলার মানুষদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
19. বিদ্যাসাগর কেন মনে করতেন শিক্ষার জন্য সরকারি অনুদান যথেষ্ট নয়? তিনি কী বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উপনিবেশিক সরকারের শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত অর্থ অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করতেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সরকারের সীমিত অনুদানের মাধ্যমে গোটা দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব নয়। তাই তিনি শিক্ষা বিস্তারের জন্য বিকল্প পরিকল্পনার কথা বলেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল: (১) ধনী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থানুকূল্যে বিদ্যালয় স্থাপন, (২) স্থানীয় জনগণের সহায়তায় গ্রামে গ্রামে পাঠশালা গঠন, (৩) সরকার থেকে বৃত্তি ও অনুদানের পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালী মানুষদের দায়িত্ব নিতে হবে। নিজে তিনি এই আদর্শ বাস্তবায়িত করেন— স্কুল পরিদর্শক থাকাকালে নিজের ব্যক্তিগত খরচে বহু বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
20. ওয়াহাবি আন্দোলন ও ফরাজি আন্দোলনের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য কী?
সাদৃশ্য: (১) উভয় আন্দোলনই ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রকৃত মূলনীতিতে প্রত্যাবর্তন চেয়েছিল, (২) উভয়ই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদার, নীলকর ও মহাজন শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, (৩) উভয়ই ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সাথে যুক্ত করেছিল। বৈসাদৃশ্য: (১) ওয়াহাবি আন্দোলন (তিতুমির, সৈয়দ আহমদ বেরলভি) আরবের আব্দুল ওয়াহাবের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত— সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রাম ও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল, (২) ফরাজি আন্দোলন (হাজি শরিয়তউল্লাহ, দুদুমিঞা) পূর্ব বাংলার কৃষক সমাজে ইসলামি কর্তব্য (ফরজ) পালনের ওপর বেশি জোর দিত এবং প্রাথমিকভাবে অহিংস পথে সংস্কার চেয়েছিল— পরে দুদুমিঞার নেতৃত্বে সশস্ত্র রূপ নেয়, (৩) ওয়াহাবিরা আদর্শগতভাবে সব কুসংস্কার ও পীর-দরগাহ পূজার বিরোধিতা করলেও ফরাজিরা তা তেমন তীব্রভাবে করেনি।
21. রানি লক্ষ্মীবাইয়ের নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ কীভাবে ১৮৫৭-র বিদ্রোহে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল?
ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই (Rani Lakshmibai) ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র। লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতিতে তাঁর দত্তক পুত্র দামোদর রাওয়ের উত্তরাধিকার নাকচ করায় রানি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি পুরুষের মতো অশ্বারোহণ, অস্ত্রচালনা ও সেনাপরিচালনা করতেন। অন্য নেতাদের (তাতিয়া টোপি, রাও সাহেব) সাথে সমন্বয় করে তিনি গোয়ালিয়র দুর্গ দখল করেন। ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করতে করতে ১৮৫৮ সালের ১৭ জুন কোটার কি সেরাই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। ব্রিটিশ জেনারেল হিউ রোজ স্বয়ং স্বীকার করেছিলেন যে, 'বিদ্রোহীদের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র পুরুষ।' রানি লক্ষ্মীবাইয়ের আত্মত্যাগ ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও ব্রিটিশ বিরোধী চেতনার অমর প্রতীক হয়ে আছে।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
8 টি
1. উনিশ শতকের ভারতীয় সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, চরিত্র ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো। ব্রাহ্ম সমাজ ও আর্য সমাজের তুলনামূলক বিচার করো।
প্রেক্ষাপট
উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে ভারতীয় সমাজে এক নতুন সচেতনতার জন্ম হয়। কোম্পানি প্রশাসন প্রথম দিকে সামাজিক বিষয়ে নিরপেক্ষ নীতি নিলেও, ১৮০০-এর দশকের গোড়া থেকে কিছু মানবিক সংস্কার আইন (যেমন ১৮০৩ সালে সাগর দ্বীপে শিশুহত্যা নিষিদ্ধ) পাস করে। তবে এগুলি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ভারতীয় সমাজ সংস্কারকেরা নিজেরাই অগ্রসর হন।
চরিত্র
- নগরকেন্দ্রিক: কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজের মতো বড়ো শহরে এগুলির কেন্দ্র ছিল।
- উচ্চবর্ণ-অধ্যুষিত: বেশিরভাগ নেতাই ছিলেন ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণের শিক্ষিত ব্যক্তি।
- ভদ্রলোক পরিচালিত: সংস্কার আন্দোলনগুলির পৃষ্ঠপোষক ও নেতৃত্ব মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণি।
- ধর্মশাস্ত্রভিত্তিক যুক্তি: অধিকাংশ সংস্কারকই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজ সংস্কারকে ন্যায্যতা দিতে চেয়েছেন।
সীমাবদ্ধতা
- গ্রামীণ ও সাধারণ কৃষক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।
- জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি।
- ইংরেজি ও সংস্কৃত-মেশানো বাংলা সাধারণের অজ্ঞাত ছিল।
- সমাজের নিচুতলার মানুষদের (কৃষক, দলিত, আদিবাসী) জন্য তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ব্রাহ্ম সমাজ বনাম আর্য সমাজ
| বিষয় | ব্রাহ্ম সমাজ | আর্য সমাজ |
| প্রতিষ্ঠাতা | রাজা রামমোহন রায় (১৮২৮) | স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (১৮৭৫) |
| কেন্দ্র | কলকাতা | পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম ভারত |
| মূল দর্শন | একেশ্বরবাদ, সব ধর্মের সারসত্য | 'বেদে প্রত্যাবর্তন', বেদই সর্বোচ্চ জ্ঞানের উৎস |
| মূর্তিপূজা | তীব্র বিরোধিতা | তীব্র বিরোধিতা |
| ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন | সীমিত | পরে উগ্র হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী |
| সামাজিক ভিত্তি | শিক্ষিত ভদ্রলোক | মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী |
2. সতীদাহ প্রথা রদ ও হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আন্দোলনের তুলনামূলক আলোচনা করো। রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের মধ্যে আদর্শগত সাদৃশ্য ও ভিন্নতা কী ছিল?
সতীদাহ প্রথা রদ (১৮২৯)
রাজা রামমোহন রায় সতীদাহকে 'নারীর প্রতি চরম অন্যায়' আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি নিজে সতীদাহস্থলে উপস্থিত থেকে প্রতিরোধ করতেন এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমাণ করেন যে সহমরণ ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় লর্ড বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সতীদাহ নিষিদ্ধ করে আইন (Regulation XVII) জারি করেন।
বিধবা বিবাহ আন্দোলন (১৮৫৬)
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পরাশর সংহিতা ও অন্যান্য শাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (Act XV) পাস হয়। বিদ্যাসাগর নিজে কয়েকটি বিধবা বিবাহের আয়োজনও করেন।
সাদৃশ্য ও ভিন্নতা
সাদৃশ্য: (১) দুজনেই নারীদের মর্যাদা ও অধিকার বৃদ্ধির জন্য সংগ্রাম করেছেন, (২) দুজনেই শাস্ত্রীয় যুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক সংস্কারকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন, (৩) উভয় ক্ষেত্রেই ব্রিটিশ প্রশাসনের আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংস্কার সাধিত হয়।
ভিন্নতা: (১) রামমোহন সতীদাহকে শাস্ত্রবিরুদ্ধ ও অমানবিক প্রমাণে বেশি জোর দেন, বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহকে শাস্ত্রসম্মত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, (২) রামমোহনের লড়াই ছিল মৃত্যুভয় ও অগ্নিপরীক্ষার বিরুদ্ধে— পুরো প্রথা বাতিলের, বিদ্যাসাগরের লড়াই নারীর জীবন পুনরুদ্ধার ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার।
3. সাঁওতাল বিদ্রোহ ও নীল বিদ্রোহ— কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ হিসাবে এদের তাৎপর্য আলোচনা করো। শিক্ষিত সমাজ এই দুই বিদ্রোহকে কীভাবে দেখেছিল?
সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬)
সিধু ও কানহুর নেতৃত্বে সাঁওতাল উপজাতির এই বিদ্রোহ ছিল ঔপনিবেশিক যুগের অন্যতম বড়ো উপজাতি বিদ্রোহ। 'দিকু' (জমিদার-মহাজন) ও ব্রিটিশ প্রশাসনের দ্বৈত শোষণই ছিল মূল কারণ। সাঁওতালদের জমি থেকে উচ্ছেদ, বেগার শ্রম, অত্যধিক সুদের ঋণ ও ইংরেজ রেল ঠিকাদারদের অত্যাচার বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০)
বাংলার কৃষকদের ওপর নীলকর সাহেবদের 'দাদন' প্রথা, দমন-পীড়ন ও অমানুষিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ। বিশ্বচরণ ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে কৃষক সম্মিলিতভাবে নীলচাষ বর্জন করেন।
শিক্ষিত সমাজের প্রতিক্রিয়া
দুই বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত সমাজের প্রতিক্রিয়ায় বড়ো ফারাক ছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু সমাজের অনেকে (এমনকি কিছু সংবাদপত্র) প্রথমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। তবে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন ব্যতিক্রম— তিনি 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট'-এ জোরালো যুক্তি দিয়ে সাঁওতালদের পক্ষ নেন। অন্যদিকে নীল বিদ্রোহ শিক্ষিত সমাজে ব্যাপক সহানুভূতি পায়। দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটক, মাইকেল মধুসূদনের ইংরেজি অনুবাদ, হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার খবর— সব মিলে নীল বিদ্রোহ বাঙালি শিক্ষিত সমাজে জাতীয় চেতনার জন্ম দেয়। এই পার্থক্যের একটি ব্যাখ্যা হতে পারে— নীল বিদ্রোহ ছিল বাংলার চিরায়ত কৃষক সমাজের, আর সাঁওতাল ছিল 'ভিন্ন' উপজাতি— যাদের প্রতি শিক্ষিত ভদ্রলোকের সহানুভূতি স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়নি।
4. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে কি 'সিপাহি বিদ্রোহ' না 'জাতীয় বিদ্রোহ' বলা উচিত? যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করো। বিদ্রোহের সীমাবদ্ধতাগুলি কী ছিল?
সিপাহি বিদ্রোহ নাকি জাতীয় বিদ্রোহ?
সিপাহি বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) মতবাদ: অনেক ব্রিটিশ লেখক এবং কোম্পানিপন্থী ঐতিহাসিক দাবি করেছেন যে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল নিছক সিপাহিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ— সাধারণ জনগণ এই সুযোগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল মাত্র।
গণবিদ্রোহ/জাতীয় বিদ্রোহ মতবাদ: অন্যদিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকেরা (যেমন বিনায়ক দামোদর সাভারকর) দাবি করেন, এটি ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। এর পক্ষে যুক্তি:
- বিদ্রোহ শুধু সেনাছাউনিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি— দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি, এলাহাবাদ, বিহারে সাধারণ জনগণ, কৃষক, অভিজাতরাও যোগ দিয়েছিলেন।
- মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে প্রতীকী নেতা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
- সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশীয় রাজন্যবর্গ (ঝাঁসি, সাতারা, নাগপুর) ব্রিটিশদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন।
- দিল্লিতে বিদ্রোহীরা 'হিন্দুস্তানের সম্রাট'-এর অধীনে একটি বিকল্প শাসন গড়ে তুলেছিলেন।
তবে একে পুরোপুরি 'জাতীয়' বলা চলে না— কারণ দক্ষিণ ভারত, বাংলা (নীল বিদ্রোহ সত্ত্বেও) বিদ্রোহে যোগায়নি।
সীমাবদ্ধতাসমূহ
- সীমিত ভৌগোলিক বিস্তার: প্রধানত উত্তর ও মধ্য ভারতেই বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ ছিল।
- ঐক্যের অভাব: বিদ্রোহীদের কোনো সমন্বিত নেতৃত্ব, পরিকল্পনা বা কেন্দ্রীয় কমান্ড ছিল না।
- প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা: অস্ত্রশস্ত্র, টেলিগ্রাফ, রেলপথের মতো প্রযুক্তি ব্রিটিশদের পক্ষে ছিল।
- অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব: অনেক ভারতীয় রাজা (গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, পাতিয়ালা) ও ব্যবসায়ী ব্রিটিশদের পক্ষে ছিলেন।
উপসংহারে বলা যায়, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল একইসাথে সিপাহি, কৃষক, সামন্ত ও নাগরিক অসন্তোষের বিস্ফোরণ— যার মধ্যে জাতীয় চেতনার বীজ নিহিত ছিল, কিন্তু তখনও তা পূর্ণাঙ্গ 'জাতীয় আন্দোলন'-এর রূপ নিতে পারেনি।
5. মুসলিম সমাজে সংস্কার আন্দোলনের ধারা বর্ণনা করো। ওয়াহাবি, ফরাজি ও আলিগড় আন্দোলনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যে কী পার্থক্য ছিল?
উনিশ শতকে মুসলিম সংস্কার ধারা
ব্রিটিশ শাসনের অধীনে মুসলিম সমাজ অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়েছিল। ইংরেজি শিক্ষা ও কোম্পানির চাকরি থেকে দূরে থাকায় আর্থ-সামাজিকভাবেও পশ্চাৎপদতা বাড়ে। এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি ভিন্ন স্বভাবের সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠে।
তিনটি প্রধান ধারা
| বিষয় | ওয়াহাবি আন্দোলন | ফরাজি আন্দোলন | আলিগড় আন্দোলন |
| প্রবর্তক | সৈয়দ আহমদ বেরলভি, তিতুমির | হাজি শরিয়তউল্লাহ, দুদুমিঞা | স্যার সৈয়দ আহমদ খান |
| অঞ্চল | উত্তর ভারত, বারাসাত (বাংলা) | পূর্ব বাংলা (ফরিদপুর) | আলিগড়, উত্তর ভারত |
| মূল উদ্দেশ্য | ইসলামের বিশুদ্ধিকরণ, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং ব্রিটিশ বিরোধী জিহাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম | ইসলামি কর্তব্য (ফরজ) পালন, জমিদার-নীলকর বিরোধী কৃষক স্বার্থ সংরক্ষণ | পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণ ও প্রগতি |
| পদ্ধতি | সশস্ত্র সংগ্রাম, বাঁশের কেল্লা (তিতুমির) | প্রথমে অহিংস, পরে সশস্ত্র প্রতিরোধ | শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (MAO College), পত্রিকা, রচনা |
| ব্রিটিশ নীতি | কঠোর বিরোধী | বিরোধী | সহযোগিতামূলক (ব্রিটিশের সাথে সহাবস্থান) |
| সামাজিক ভিত্তি | কৃষক ও নিম্ন মধ্যবিত্ত | গরিব কৃষক | উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলিম |
পার্থক্যের সারমর্ম: ওয়াহাবি ও ফরাজি উভয়ই ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদী ও ব্রিটিশবিরোধী; ওয়াহাবিরা সশস্ত্র জিহাদে বিশ্বাসী ছিল, ফরাজিরা প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় কর্তব্যে জোর দিত। অন্যদিকে, আলিগড় আন্দোলন ছিল আধুনিকতাবাদী ও ব্রিটিশ সহযোগিতাপন্থী— শিক্ষাকে অগ্রগতির মূল হাতিয়ার মনে করত।
6. উনিশ শতকে নারীশিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের আন্দোলনের ধারা কী ছিল? পণ্ডিতা রমাবাই, সাবিত্রীবাই ফুলে ও বেগম রোকেয়ার অবদান আলোচনা করো।
নারীশিক্ষা আন্দোলনের ধারা
উনিশ শতকের সমাজ সংস্কারকেরা বুঝেছিলেন যে, সমাজের অর্ধেক অংশকে শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন ছাড়া প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়। রামমোহন রায় থেকে বিদ্যাসাগর— সকলেই নারীশিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। সরকারও বৃত্তি ও অনুদানের ব্যবস্থা করে।
তিন অগ্রণী নারী
- পণ্ডিতা রমাবাই (১৮৫৮-১৯২২): ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে হয়েও সংস্কৃত শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। অল্প বয়সে বিধবা হন। সমস্ত সামাজিক বাধা নস্যাৎ করে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন, পরে নিজের মেয়েকে নিয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে ডাক্তারি পড়েন। পুনা শহরে বিধবা নারীদের জন্য 'শারদা সদন' নামে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। রক্ষণশীলদের তীব্র সমালোচনার মুখেও নারী শিক্ষা ও স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যান।
- সাবিত্রীবাই ফুলে (১৮৩১-১৮৯৭): জ্যোতিরাও ফুলের স্ত্রী, যিনি স্বামীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীশিক্ষা ও দলিতোদ্ধারে আত্মনিয়োগ করেন। ১৮৫১ সালে পুনায় প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন— সেখানে নিজেই শিক্ষিকা হিসেবে পড়াতেন। পথেঘাটে লোকে পাথর ছুঁড়ত, গোবর ফেলত, তবুও তিনি থেমে যাননি।
- বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২): বাংলার মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত। 'সুলতানার স্বপ্ন' (১৯০৫) ও 'অবরোধবাসিনী' (১৯২৯) রচনা করে নারী সমাজের ওপর পর্দাপ্রথা ও পুরুষতান্ত্রিকতার কুপ্রভাব তুলে ধরেন। ১৯১১ সালে কলকাতায় 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন।
এঁরা প্রত্যেকেই শুধু নারীশিক্ষার কথা বলেননি— নিজেরা শিক্ষিত হয়ে, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে অন্যান্য নারীদের জন্যও পথ খুলে দিয়েছিলেন।
7. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী চারজন প্রধান ব্যক্তিত্বের ভূমিকা আলোচনা করো: (ক) বাহাদুর শাহ জাফর, (খ) নানা সাহেব, (গ) রানি লক্ষ্মীবাই, (ঘ) তাতিয়া টোপি।
বাহাদুর শাহ জাফর (মোগল সম্রাট)
বৃদ্ধ সম্রাট (৮২ বছর) দিল্লিতে বন্দিজীবন কাটাচ্ছিলেন। মিরাটের বিদ্রোহী সিপাহিরা দিল্লি পৌঁছে তাঁকে 'হিন্দুস্তানের সম্রাট' বলে ঘোষণা দিলে তিনি বাধ্য হয়ে বিদ্রোহের প্রতীকী নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দিল্লির পতনের পর ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হন এবং রেঙ্গুনে নির্বাসিত হয়ে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
নানা সাহেব (কানপুরের পেশোয়া)
শেষ মারাঠা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের দত্তক পুত্র। ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতিতে তাঁর পেনশন বন্ধ হয়ে যায়। এই ক্ষোভে তিনি কানপুরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেকে পেশোয়া ঘোষণা করেন। বিদ্রোহ দমনের পর আত্মগোপন করেন— তাঁর পরিণতি আজও রহস্যময়।
রানি লক্ষ্মীবাই (ঝাঁসি)
স্বত্ববিলোপে দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার খর্ব হওয়ায় ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পুরুষের মতো যুদ্ধ পরিচালনা, অশ্বারোহণ ও দুর্গ রক্ষা করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ১৮৫৮ সালের ১৭ জুন কোটার কি সেরাইয়ের যুদ্ধে শহীদ হন।
তাতিয়া টোপি (গেরিলা নেতা)
নানা সাহেবের বিশ্বস্ত সহচর ও গেরিলা কৌশলের সেরা কারিগর। দিল্লি পতনের পরও ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত টিকে থেকে উত্তর ও মধ্য ভারতে ব্রিটিশ বাহিনীকে ঘুরিয়ে ফেরেন। শেষে বিশ্বাসঘাতক মানসিংহের মাধ্যমে ধরা পড়েন এবং ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেন।
8. মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রে (১৮৫৮) ভারতীয়দের প্রতি কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল? এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসননীতিতে কী কী পরিবর্তন আসে?
রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র (নভেম্বর ১, ১৮৫৮)
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের রেশ ধরেই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইন (Government of India Act 1858) পাস করে এবং রানি ভিক্টোরিয়ার নামে একটি ঘোষণাপত্র জারি করা হয়।
প্রধান প্রতিশ্রুতিসমূহ
- ধর্মীয় নিরপেক্ষতা: কোনো ভারতীয় প্রজার ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনায় হস্তক্ষেপ করা হবে না। সকল ধর্মের প্রতি সমশ্রদ্ধা প্রদর্শন।
- আইনের চোখে সমতা: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য আইনের সমান সুরক্ষা।
- চুক্তির সম্মান: কোম্পানির করা সকল চুক্তি ও সন্ধি (দেশীয় রাজ্যগুলির সাথে) যথাযথ মান্য হবে।
- সাম্রাজ্য বিস্তার বন্ধ: ভবিষ্যতে আর কোনো দেশীয় রাজ্য দখল করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করা হবে না।
- চাকরির সুযোগ: জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্যতা অনুযায়ী ভারতীয়রা সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাবে।
- সাধারণ ক্ষমা: যেসব বিদ্রোহী সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়, তাদের সাধারণ ক্ষমা প্রদান।
পরিবর্তিত নীতি
- কোম্পানির অবসান: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ২৫০ বছরের শাসনের চূড়ান্ত অবসান। ভারত এখন সরাসরি রানি ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অধীনে।
- ভাইসরয় পদ সৃষ্টি: গভর্নর জেনারেলের পরিবর্তে রানির প্রতিনিধি হিসেবে ভাইসরয়
- সামরিক পুনর্বিন্যাস: সিপাহি বাহিনীতে ইউরোপীয় ও ভারতীয় অনুপাত পুনর্নিধারণ, 'সামরিক জাতি' তত্ত্ব প্রয়োগ।
- দেশীয় রাজাদের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন: স্বত্ববিলোপ নীতির অবসান; দেশীয় রাজন্যবর্গের উত্তরাধিকার স্বীকার। ভারতীয় অভিজাতদের ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতি অনুগত করার কৌশল।
মনে রেখো!
রামমোহন: সতীদাহ বিলোপ (১৮২৯), ব্রাহ্ম সমাজ (১৮২৮)। বিদ্যাসাগর: বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬), নারীশিক্ষা। দয়ানন্দ: আর্য সমাজ (১৮৭৫)। সাঁওতাল হুল (১৮৫৫-৫৬): সিধু-কানহু। নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬০): বিশ্বচরণ-দিগম্বর, নীলদর্পণ। মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭: এনফিল্ড রাইফেল, বাহাদুর শাহ জাফর, লক্ষ্মীবাই। রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র (১৮৫৮): কোম্পানি শাসনের অবসান, ভাইসরয় পদ সৃষ্টি।
PDF ডাউনলোড
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।
PDF ডাউনলোড