Chapter 3: ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা (Establishment of Colonial Authority)
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 30 MCQ | 22 SAQ | 8 Broad Questions
প্রেসিডেন্সি
রেগুলেটিং অ্যাক্ট
শিক্ষা
পুলিশ ও সেনা
🏛️
প্রেসিডেন্সি
মাদ্রাজ | বোম্বাই | বাংলা
⚖️
আইন ও বিচার
রেগুলেটিং অ্যাক্ট | পিটের আইন | কর্নওয়ালিস কোড
📚
শিক্ষা
মেকলে মিনিট | উডের ডেসপ্যাচ | হিন্দু কলেজ
🛡️
পুলিশ ও সেনা
দারোগা | সিপাহি | সামরিক জাতি
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
30 টি
1. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান তিনটি প্রেসিডেন্সি কোন কোনটি?
ক) ক) কলকাতা, দিল্লি, মাদ্রাজ
খ) খ) মাদ্রাজ, বোম্বাই, কলকাতা (বাংলা)
গ) গ) সুরাট, কলকাতা, বোম্বাই
ঘ) ঘ) কলকাতা, লাহোর, করাচি
ব্যাখ্যা: ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য মাদ্রাজ, বোম্বাই ও কলকাতা (বাংলা)— এই তিনটি প্রেসিডেন্সি কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এগুলি ছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক প্রশাসনিক একক।
2. রেগুলেটিং অ্যাক্ট কত সালে পাস হয়েছিল?
ক) ক) ১৭৬৫
খ) খ) ১৭৭৩
গ) গ) ১৭৮৪
ঘ) ঘ) ১৭৯৩
ব্যাখ্যা: রেগুলেটিং অ্যাক্ট (Regulating Act) ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয়। এই আইনের মাধ্যমে বাংলার গভর্নরকে 'গভর্নর জেনারেল' পদে উন্নীত করা হয় এবং ভারতের উপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ বলবৎ হয়।
3. রেগুলেটিং অ্যাক্ট অনুসারে প্রথম গভর্নর জেনারেল কে হন?
ক) ক) লর্ড কর্নওয়ালিস
খ) খ) রবার্ট ক্লাইভ
গ) গ) ওয়ারেন হেস্টিংস
ঘ) ঘ) লর্ড ওয়েলেসলি
ব্যাখ্যা: রেগুলেটিং অ্যাক্টের অধীনে বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস (Warren Hastings) প্রথম গভর্নর জেনারেল হন। তাঁর অধীনে মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের গভর্নরেরা কাজ করতেন।
4. পিট প্রণীত ভারত শাসন আইন (Pitt's India Act) কবে পাস হয়?
ক) ক) ১৭৭৩
খ) খ) ১৭৮১
গ) গ) ১৭৮৪
ঘ) ঘ) ১৭৯৩
ব্যাখ্যা: পিট প্রণীত ভারত শাসন আইন (Pitt's India Act) ১৭৮৪ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়ম পিট (কনিষ্ঠ)-এর উদ্যোগে পাস হয়। ১৭৮৫ সালের ১ জানুয়ারি এটি বলবৎ হয়। এর ফলে ব্রিটেনের পার্লামেন্টের নজরদারি আরও বাড়ে এবং বোর্ড অফ কন্ট্রোল গঠিত হয়।
5. ওয়ারেন হেস্টিংস কত সালে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটান?
ক) ক) ১৭৬৫
খ) খ) ১৭৭০
গ) গ) ১৭৭২
ঘ) ঘ) ১৭৮৪
ব্যাখ্যা: ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বৈত শাসনব্যবস্থার (Dual System) অবসান ঘটিয়ে কোম্পানি সরাসরি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল এবং তাঁর সময়কালে প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়।
6. লর্ড কর্নওয়ালিস কত সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করেন?
ক) ক) ১৭৭২
খ) খ) ১৭৮৪
গ) গ) ১৭৯৩
ঘ) ঘ) ১৮১৩
ব্যাখ্যা: লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করেন। এই ব্যবস্থায় জমিদারদের স্থায়ীভাবে ভূমি রাজস্ব বন্দোবস্ত দেওয়া হয় এবং তাঁদের রাজস্বের পরিমাণ চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
7. সংস্কৃত কলেজ কবে ও কার উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক) ক) ১৭৮১; ওয়ারেন হেস্টিংস
খ) খ) ১৮১৭; ডেভিড হেয়ার
গ) গ) ১৮২৪; এইচ.এইচ. উইলসন
ঘ) ঘ) ১৮৩০; আলেকজান্ডার ডাফ
ব্যাখ্যা: সংস্কৃত পণ্ডিত এইচ.এইচ. উইলসনের নেতৃত্বে ১৮২৪ সালে কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ (Sanskrit College) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চার পাশাপাশি পাশ্চাত্য জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো।
8. হিন্দু কলেজ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এর সাথে কারা যুক্ত ছিলেন?
ক) ক) ১৮১৭; স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট, ডেভিড হেয়ার, রাজা রামমোহন রায়
খ) খ) ১৮২৪; উইলিয়ম কেরি
গ) গ) ১৭৯১; জোনাথন ডানকান
ঘ) ঘ) ১৮৩০; আলেকজান্ডার ডাফ
ব্যাখ্যা: ১৮১৭ সালে কলকাতায় হিন্দু কলেজ (Hindu College) প্রতিষ্ঠিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট ও ডেভিড হেয়ার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী ছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ও এই কলেজের সাথে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষিত ও ধনী ব্যক্তিরাও কলেজ পরিচালনার সহায়তায় যুক্ত হয়েছিলেন।
9. মেকলে মিনিট (Macaulay's Minute) কত সালে পেশ করা হয়?
ক) ক) ১৮১৩
খ) খ) ১৮৩৫
গ) গ) ১৮৪৩
ঘ) ঘ) ১৮৫৪
ব্যাখ্যা: লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে তাঁর বিখ্যাত 'মেকলে মিনিট' (Macaulay's Minute) পেশ করেন। তিনি ইংরেজি ভাষায় পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের পক্ষে জোরালো সুপারিশ করেন এবং ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞানচর্চাকে হেয় প্রতিপন্ন করেন। এর ভিত্তিতেই ইংরেজি শিক্ষা সরকারি নীতিতে পরিণত হয়।
10. উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch) কত সালে পেশ করা হয়? এর গুরুত্ব কী?
ক) ক) ১৮১৩
খ) খ) ১৮৩৫
গ) গ) ১৮৫৪
ঘ) ঘ) ১৮৭০
ব্যাখ্যা: উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch) ১৮৫৪ সালে স্যার চার্লস উডের নেতৃত্বে পেশ করা হয়। এই প্রতিবেদনে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত একটি সুগঠিত শিক্ষাকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়। একে 'ভারতীয় শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা' বলা হয়।
11. বেথুন স্কুল কী? কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ক) ছেলেদের স্কুল, ডেভিড হেয়ার
খ) খ) মেয়েদের স্কুল, জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন
গ) গ) মিশনারি স্কুল, আলেকজান্ডার ডাফ
ঘ) ঘ) সংস্কৃত স্কুল, উইলিয়ম জোনস
ব্যাখ্যা: জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন (John Elliot Drinkwater Bethune) ১৮৪৯ সালে কলকাতায় মেয়েদের জন্য 'বেথুন স্কুল' (বর্তমানে বেথুন কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল উপনিবেশিক ভারতে নারীশিক্ষা বিস্তারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
12. জেমস রেনেল কে ছিলেন?
ক) ক) গভর্নর জেনারেল
খ) খ) ভারতের সার্ভেয়র জেনারেল বা জরিপ বিভাগের প্রধান
গ) গ) বিচারপতি
ঘ) ঘ) শিক্ষাবিদ
ব্যাখ্যা: জেমস রেনেল (James Rennell) ছিলেন ভারতের প্রথম সার্ভেয়র জেনারেল (Surveyor General)। ১৭৬৭ সালে তাঁকে জরিপ বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তিনি বাংলার নদীপথগুলি জরিপ করে ১৬টি মানচিত্র তৈরি করেন এবং পরবর্তীতে সমগ্র ভারতের একটি বিস্তৃত মানচিত্র (Atlas of Bengal) প্রণয়ন করেন।
13. ইজারাদারি বন্দোবস্ত কী?
ক) ক) স্থায়ী জমিদারি
খ) খ) নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে পাঁচ বছরের জন্য জমি ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা
গ) গ) রায়তওয়ারি ব্যবস্থা
ঘ) ঘ) মহলওয়ারি ব্যবস্থা
ব্যাখ্যা: ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে ইজারাদারি বন্দোবস্ত (Farming System) চালু করেন। একে পাঁচসালা বন্দোবস্তও বলে। এতে নিলামে সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দানকারী ব্যক্তিকে পাঁচ বছরের জন্য জমির ইজারা দেওয়া হতো। পরে নানা সমস্যার কারণে তুলে দেওয়া হয়।
14. সিপাহি বাহিনী গঠনে প্রাথমিক অবস্থায় কোন শ্রেণির লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়?
ক) ক) নিম্নবর্ণের কৃষক
খ) খ) উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ও রাজপুত কৃষক
গ) গ) পাহাড়ি উপজাতি
ঘ) ঘ) ইউরোপীয় সৈন্য
ব্যাখ্যা: প্রাথমিকভাবে কোম্পানি সিপাহি বাহিনীতে জাতিভিত্তিক ধারণার বিরোধিতা না করায় উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ও রাজপুত কৃষকেরা সহজেই জায়গা করে নিতেন। তাঁরা নিয়মিত বেতন ও বেশি সুযোগ-সুবিধা পেতেন।
15. বোর্ড অফ কন্ট্রোল (Board of Control) কবে গঠিত হয়?
ক) ক) ১৭৭৩
খ) খ) ১৭৮৪
গ) গ) ১৭৯৩
ঘ) ঘ) ১৮১৩
ব্যাখ্যা: পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪) অনুসারে বোর্ড অফ কন্ট্রোল (Board of Control) গঠিত হয়। এই বোর্ড কোম্পানির সামরিক ও অসামরিক শাসন এবং রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার সমস্ত দায়িত্ব পায়। এর মাধ্যমে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সরাসরি ভারতীয় প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হয়।
16. লর্ড কর্নওয়ালিসের বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
ক) ক) ভারতীয় বিচারক নিয়োগ
খ) খ) রাজস্ব ও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ এবং কোড বা বিধিবদ্ধ আইন প্রণয়ন
গ) গ) মুঘল আইন বহাল রাখা
ঘ) ঘ) পঞ্চায়েতি বিচার চালু
ব্যাখ্যা: লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে দেওয়ানি ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব আলাদা করে দেন এবং জেলা থেকে সদর পর্যন্ত আদালত ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে সাজিয়ে তোলেন। তিনি আইনগুলোকে সংহত করে কোড বা বিধিবদ্ধ আইন (Cornwallis Code) চালু করেন। তবে প্রধান বিচারপতি হিসেবে ইউরোপীয়রাই থাকতেন।
17. বাংলায় কলকাতা মাদ্রাসা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়? এর প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক) ক) ১৭৮১, ওয়ারেন হেস্টিংস
খ) খ) ১৭৯১, জোনাথন ডানকান
গ) গ) ১৮১৭, ডেভিড হেয়ার
ঘ) ঘ) ১৮২৪, এইচ.এইচ. উইলসন
ব্যাখ্যা: ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা (Calcutta Madrasah) প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল আরবি ও ফারসি ভাষাচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে প্রশাসনের কাজে এই ভাষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়োগ করা যায়।
18. বেনারস হিন্দু কলেজ কে, কবে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ক) ওয়ারেন হেস্টিংস, ১৭৮১
খ) খ) জোনাথন ডানকান, ১৭৯১
গ) গ) উইলিয়ম জোনস, ১৭৮৪
ঘ) ঘ) ডেভিড হেয়ার, ১৮১৭
ব্যাখ্যা: ১৭৯১ সালে বেনারসে (বারাণসী) জোনাথন ডানকান হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল— ওই কলেজে শিক্ষিত ব্যক্তিরা ঔপনিবেশিক শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে সুগঠিত করার কাজে সহায়তা করবেন।
19. এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) কে, কবে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক) ক) ওয়ারেন হেস্টিংস, ১৭৭২
খ) খ) উইলিয়ম জোনস, ১৭৮৪
গ) গ) জোনাথন ডানকান, ১৭৯১
ঘ) ঘ) জেমস মিল, ১৮১৭
ব্যাখ্যা: উইলিয়ম জোনস (Sir William Jones) ১৭৮৪ সালে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যগুলি (বিশেষত সংস্কৃত) ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ও জ্ঞানের সাথে পাশ্চাত্যের পরিচয় ঘটানো।
20. ১৮৭০ সালের দশকে কোম্পানির সেনাবাহিনীতে প্রায় কতজন সিপাহি ছিল?
ক) ক) ৫০,০০০
খ) খ) ১,০০,০০০
গ) গ) ২,৫০,০০০
ঘ) ঘ) ৫,০০,০০০
ব্যাখ্যা: ১৮৫০-এর দশকে ব্রিটিশ কোম্পানির সেনাবাহিনীতে প্রায় ২,৫০,০০০ সিপাহি ছিল। এই বিশাল সেনাবাহিনীর পিছনে কোম্পানি মোট রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় করত। সিপাহি বাহিনী ছিল উপনিবেশিক শাসনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
21. 'সামরিক জাতি' ধারণা কী?
ক) ক) যুদ্ধে অদক্ষ জাতি
খ) খ) কিছু জাতিগোষ্ঠীকে যুদ্ধে বিশেষ দক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়োগের নীতি
গ) গ) ইউরোপীয় সেনাবাহিনী
ঘ) ঘ) নৌবাহিনী
ব্যাখ্যা: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর কোম্পানি পাঞ্জাবের শিখ, নেপালি গুর্খা, উত্তর ভারতের রাজপুত প্রভৃতিকে 'সামরিক জাতি' (Martial Race) বলে চিহ্নিত করে তাদের সেনাবাহিনীতে বেশি করে নিয়োগ করতে থাকে। ধারণা ছিল এরা যুদ্ধে অনেক বেশি দক্ষ এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত থাকবে।
22. মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির দুটি প্রশাসনিক কেন্দ্র কী কী?
ক) ক) মাদ্রাজ ও বোম্বাই
খ) খ) গ্রীষ্মকালে উটাকামুন্ড, শীতকালে মাদ্রাজ
গ) গ) কলকাতা ও সুরাট
ঘ) ঘ) পাটনা ও মাদ্রাজ
ব্যাখ্যা: মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির দুটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল— গ্রীষ্মকালে উটাকামুন্ড (Ooty) এবং শীতকালে মাদ্রাজ। দক্ষিণ ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল এই প্রেসিডেন্সির অধীন ছিল, যার মধ্যে তামিলনাড়ু, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশের বেশ কিছু অঞ্চল পড়েছিল।
23. বোম্বাই প্রেসিডেন্সির গোড়াপত্তন কোন বাণিজ্যকেন্দ্রে হয়েছিল?
ক) ক) কলকাতা
খ) খ) সুরাট
গ) গ) কোচিন
ঘ) ঘ) মাদ্রাজ
ব্যাখ্যা: বোম্বাই প্রেসিডেন্সির মূল গোড়াপত্তন হয়েছিল সুরাটে ব্রিটিশ কোম্পানির খাঁটি তৈরির মাধ্যমে। ধীরে ধীরে পশ্চিম ও মধ্য ভারত এবং আরব সাগরের উপকূল অঞ্চল মিলে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি গড়ে ওঠে। শুরুতে এটি পশ্চিম প্রেসিডেন্সি নামেও পরিচিতি পেয়েছিল।
24. রাজা রামমোহন রায় কেন সংস্কৃত শিক্ষা ও সংস্কৃত কলেজের বিরোধিতা করেছিলেন?
ক) ক) সংস্কৃত তাঁর পছন্দ না হওয়ায়
খ) খ) তিনি মনে করতেন পাশ্চাত্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাই দেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন
গ) গ) তিনি ফারসি শিক্ষা চাইতেন
ঘ) ঘ) তিনি আরবি শিক্ষার পক্ষে ছিলেন
ব্যাখ্যা: ১৮২৩ সালে রাজা রামমোহন রায় লর্ড আমহার্স্টকে একটি চিঠি লিখে জানান যে, তিনি সংস্কৃত শিক্ষা ও সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান (গণিত, বিজ্ঞান, দর্শন) শিক্ষিত হলেই ভারতের প্রকৃত উন্নতি হবে— সংস্কৃত কলেজ নয়।
25. ইজারাদারি বন্দোবস্তের সমস্যাগুলি কী ছিল?
ক) ক) ইজারাদাররা গ্রামের বাইরের লোক ছিল এবং ধার্য রাজস্ব বেশি হওয়ায় অনেকেই তা শোধ করতে পারেনি
খ) খ) কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল
গ) গ) আইনের জটিলতা ছিল
ঘ) ঘ) ফসলহানি হচ্ছিল
ব্যাখ্যা: পাঁচসালা ইজারাদারি বন্দোবস্তের বেশ কিছু বড় সমস্যা ছিল: অনেক ইজারাদারই গ্রাম সমাজের বাইরের লোক ছিলেন, ফলে গ্রামের উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না এবং ধার্য রাজস্ব বাস্তব আদায় ক্ষমতার থেকে অনেক বেশি হতো। এতে অনেক ইজারাদার দেয় রাজস্ব শোধ করতে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে যেতেন।
26. বাংলা ব্যাকরণ 'A Grammar of the Bengal Language' কে রচনা করেন?
ক) ক) উইলিয়ম জোনস
খ) খ) নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড
গ) গ) উইলিয়ম কেরি
ঘ) ঘ) জোনাথন ডানকান
ব্যাখ্যা: নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (Nathaniel Brassey Halhed) ১৭৭৮ সালে 'A Grammar of the Bengal Language' রচনা করেন। হুগলির জন অ্যাক্সিজ-এর ছাপাখানায় এই বই ছাপা হয় এবং সেখানেই প্রথম চলিত বাংলা হরফ ব্যবহৃত হয়েছিল।
27. সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সংকোচন করা হয় কবে?
ক) ক) ১৭৭৩
খ) খ) ১৭৮১
গ) গ) ১৭৮৪
ঘ) ঘ) ১৭৯৩
ব্যাখ্যা: ১৭৮১ সালের একটি সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ও এখতিয়ার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। বলা হয়— রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত কোনো মামলা সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারের বাইরে থাকবে এবং কোম্পানির গভর্নর ও গভর্নর-ইন-কাউন্সিলের কাজকর্মে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
28. মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির গোড়াপত্তন কোন দুর্গের মাধ্যমে হয়েছিল?
ক) ক) ফোর্ট উইলিয়ম
খ) খ) সেন্ট জর্জ দুর্গ
গ) গ) ফোর্ট সেন্ট ডেভিড
ঘ) ঘ) লালকেল্লা
ব্যাখ্যা: ১৬৩৯ সালে কোম্পানি মাদ্রাজপত্তনম গ্রামে সেন্ট জর্জ দুর্গ (Fort St. George) তৈরি করে। এই দুর্গকে কেন্দ্র করেই সেন্ট জর্জ দুর্গ প্রেসিডেন্সি বা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি গড়ে ওঠে। এটি ছিল ব্রিটিশদের দক্ষিণ ভারতীয় প্রধান কেন্দ্র।
29. রেগুলেটিং অ্যাক্টের ফলে কলকাতা কী হয়ে ওঠে?
ক) ক) ধ্বংস হয়
খ) খ) ভারতের ব্রিটিশ শাসনের রাজধানী
গ) গ) একমাত্র বাণিজ্যকেন্দ্র
ঘ) ঘ) ধর্মীয় কেন্দ্র
ব্যাখ্যা: রেগুলেটিং অ্যাক্টের (১৭৭৩) ফলে বাংলার গভর্নরকে গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয় এবং তাঁর অধীনে মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের গভর্নরেরা আসেন। এই আইনের ফলেই কলকাতা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের রাজধানীতে পরিণত হয়।
30. কোম্পানি কোন সময়টিতে ভারতীয় শাসকের মতো করে শাসন চালাত?
ক) ক) ১৭৫৭ পর্যন্ত
খ) খ) ১৮১৩ সাল পর্যন্ত
গ) গ) ১৭৭৩ পর্যন্ত
ঘ) ঘ) ১৮৫৭ পর্যন্ত
ব্যাখ্যা: পাঠ্যবই অনুসারে, ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোম্পানি ভারতীয় শাসকের মতো করে শাসন চালাত। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে এবং উপনিবেশিক শাসন যন্ত্রকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
22 টি
1. ভারতে ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সি ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে ওঠে? তিনটি প্রেসিডেন্সির নাম করো।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আদতে ছিল একটি বণিক সংস্থা। ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্যের স্বার্থে তারা মাদ্রাজ (সেন্ট জর্জ দুর্গ), বোম্বাই (সুরাট) ও কলকাতা (ফোর্ট উইলিয়ম)— এই তিনটি প্রধান বাণিজ্যঘাঁটি গড়ে তোলে। ক্রমে এই তিনটি ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে তিনটি আলাদা প্রেসিডেন্সি তৈরি হয়: (১) মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি (১৬৩৯ থেকে)— দক্ষিণ ভারত ও পূর্ব উপকূলের অঞ্চল নিয়ে, গ্রীষ্মকালীন সদর উটাকামুন্ড ও শীতকালীন সদর মাদ্রাজ। (২) বোম্বাই প্রেসিডেন্সি— পশ্চিম ও মধ্য ভারত এবং আরব সাগরের উপকূল অঞ্চল নিয়ে, মূল বাণিজ্যকেন্দ্র সুরাট থেকে ধীরে ধীরে বোম্বাই কেন্দ্রে স্থানান্তরিত হয়। (৩) বাংলা প্রেসিডেন্সি (ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ প্রেসিডেন্সি)— বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ও পরবর্তীতে পাঞ্জাব, উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এর অন্তর্গত হয়। তিনটি প্রেসিডেন্সিই লন্ডনের কোম্পানি পরিচালকগোষ্ঠীর (Council of Directors) সাথে সরাসরি যোগাযোগ রেখে নিজ নিজ কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
2. রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩) কী? এর গুরুত্ব কী ছিল?
রেগুলেটিং অ্যাক্ট (Regulating Act, ১৭৭৩): ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক পাস হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন, যার দ্বারা ভারতে কোম্পানির শাসনের উপর ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রথমবারের মতো বলবৎ হয়। প্রধান বিধান: (১) বাংলার গভর্নরকে 'গভর্নর জেনারেল' পদে উন্নীত করা হয়— প্রথম গভর্নর জেনারেল হন ওয়ারেন হেস্টিংস, (২) মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের গভর্নরেরা তাঁর অধীনে কাজ করবেন, (৩) গভর্নর জেনারেলের পদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর, (৪) চারজন সদস্য নিয়ে একটি গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল গঠিত হবে। গুরুত্ব: এই আইনের মাধ্যমেই কলকাতা ভারতের ব্রিটিশ শাসনের রাজধানীতে পরিণত হয় এবং কেন্দ্রীভূত প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
3. পিট প্রণীত ভারত শাসন আইন (Pitt's India Act, ১৭৮৪) সম্পর্কে কী জানো?
পিটের ভারত শাসন আইন (Pitt's India Act, ১৭৮৪): ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়ম পিট (কনিষ্ঠ)-এর উদ্যোগে পাস হয়। ১৭৮৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বলবৎ। প্রধান বিধান: (১) একটি 'বোর্ড অফ কন্ট্রোল' (Board of Control) গঠিত হয়— যা কোম্পানির সামরিক ও অসামরিক শাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব পায়, (২) ভারতে কোম্পানির সমস্ত প্রশাসনিক কাজ গভর্নর জেনারেলের কতৃর্ত্ব মেনে চলতে বাধ্য হবে বলে স্পষ্ট বলা হয়। গুরুত্ব: এর ফলে ভারতে কোম্পানির কার্যকলাপের ওপর ব্রিটেনের পার্লামেন্টের নজরদারি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সম্পদ ব্রিটিশ-স্বার্থে পরিচালিত করার উদ্যোগ জোরদার হয়।
4. ওয়ারেন হেস্টিংসের বিচার ব্যবস্থার সংস্কার সম্পর্কে কী জানো?
ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে সরাসরি কোম্পানির শাসন চালু করেন। তাঁর বিচার ব্যবস্থার সংস্কার: (১) প্রতি জেলায় একটি করে দেওয়ানি আদালত (Civil Court) ও একটি ফৌজদারি আদালত (Criminal Court) তৈরি করা হয়, (২) দেওয়ানি আদালতগুলিতে প্রধান ছিলেন ইউরোপীয়রা এবং দেশীয় আইন ব্যাখ্যার জন্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও মুসলিম মৌলবী নিযুক্ত হন, (৩) ফৌজদারি আদালতগুলিতে একজন করে কাজী ও মুফতি থাকতেন— দেখভালের দায়িত্ব ইউরোপীয়দের হাতে। ১৭৭৪ সালে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা হয়, স্যার এলিজা ইম্পে ছিলেন প্রথম প্রধান বিচারপতি। ১৭৮১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সংকোচন করে দেওয়ানি মামলা ও রাজস্ব বিষয়ে তার ক্ষমতা সীমিত করা হয়।
5. লর্ড কর্নওয়ালিসের বিচার সংস্কারের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে গুরুত্বপূর্ণ বিচার সংস্কার করেন, যা কর্নওয়ালিস কোড নামে পরিচিত। বৈশিষ্ট্য: (১) দেওয়ানি ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব সম্পূর্ণ আলাদা করে দেওয়া হয়— জেলা কালেক্টরকে শুধু রাজস্ব আদায়ের কাজ দেওয়া হয় এবং বিচারের দায়িত্ব পৃথক বিচার বিভাগকে দেওয়া হয়, (২) জেলা থেকে সদর পর্যন্ত ধাপে ধাপে আদালত ব্যবস্থা সাজানো হয়, (৩) নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিলের অধিকার স্বীকার করা হয়, (৪) আইনগুলোকে সংহত করে একটি বিধিবদ্ধ কোড বা আইনগ্রন্থ তৈরি করা হয়। তবে সীমাবদ্ধতা: সমস্ত আদালতেই প্রধান বিচারপতি হতেন ইউরোপীয়রা এবং ভারতীয়দের পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছিল।
6. ঔপনিবেশিক পুলিশ ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে ওঠে?
লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে জেলাগুলির আইন-শৃঙ্খলা দেখভালের জন্য পুলিশ থানা ব্যবস্থা চালু করেন। প্রতিটি থানার দায়িত্ব পান 'দারোগা'। দারোগাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন। এই ব্যবস্থাকে 'ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার' হিসেবে দেখা হতো— এর মূল লক্ষ্য ছিল 'আইনের শাসন' (Rule of Law) প্রতিষ্ঠা। পরবর্তীতে পুলিশ ব্যবস্থার নানা সংস্কার করা হতে থাকে। ১৮৪৩ সালে সিন্ধু প্রদেশ অঞ্চলে নতুন ধাঁচের পুলিশ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয় এবং ক্রমে আলাদা পুলিশ আইন প্রণীত হয়।
7. কোম্পানির সেনাবাহিনী বা সিপাহি বাহিনী সম্পর্কে কী জানো?
কোম্পানি ক্রমে এক বিশাল স্থলবাহিনী (সিপাহি বাহিনী) গড়ে তোলে। প্রাথমিকভাবে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ও রাজপুত কৃষকেরা সিপাহি বাহিনীতে সহজেই জায়গা করে নিতেন ও বেশি সুযোগ-সুবিধা পেতেন। ১৮২০-এর দশক থেকে মারাঠা, মহীশূরের পাহাড়ি উপজাতি ও নেপালি গুর্খাদের নিয়োগ শুরু হয়। ১৮৫০-এর দশকে সিপাহির সংখ্যা প্রায় ২,৫০,০০০-এ পৌঁছায় এবং সেনাবাহিনীর পিছনে রাজস্বের ৪০% ব্যয় হতো। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর 'সামরিক জাতি' তত্ত্বে পাঞ্জাবের শিখ, গুর্খা, রাজপুতদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ১৯১৪ সালের মধ্যে তথাকথিত সামরিক জাতির লোকেরা সেনাবাহিনীর তিন-চতুর্থাংশ গঠন করে।
8. পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে মেকলে মিনিটের ভূমিকা কী ছিল?
লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে তাঁর বিখ্যাত 'মেকলে মিনিট' (Macaulay's Minute) পেশ করেন। তিনি মনে করতেন, ব্রিটিশরাই জাতিগতভাবে উন্নত এবং তাদের হাত ধরেই উপনিবেশ হিসেবে ভারতে আধুনিকতা আসবে। তাই তিনি ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞানচর্চাকে (সংস্কৃত ও ফারসি) হেয় প্রতিপন্ন করে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা প্রসারের পক্ষে জোরালো সুপারিশ করেন। তাঁর সুপারিশ অনুসারে— যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতীয় ভাষায় শিক্ষার চর্চা করবে, তারা কোনো সরকারি অনুদান পাবে না। মেকলে মিনিটের মাধ্যমেই সরকারি নীতিতে পরিণত হয় ইংরেজি শিক্ষা।
9. উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch, ১৮৫৪) কী? এর গুরুত্ব বুঝিয়ে দাও।
স্যার চার্লস উডের নেতৃত্বে ১৮৫৪ সালে শিক্ষা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন পেশ করা হয়, যা 'উডের ডেসপ্যাচ' (Wood's Despatch) বা উডের সুপারিশ নামে পরিচিত। সুপারিশ: (১) প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত একটি সুগঠিত শিক্ষাকাঠামো গড়ে তোলা হোক, (২) পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ও ভারতীয়— উভয় ভাষাই ব্যবহার করা হবে। গুরুত্ব: এই প্রতিবেদনকে 'ভারতীয় শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা' বলা হয়। এর ভিত্তিতেই ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা এক সুসংহত রূপ লাভ করে।
10. ভারতে নারীশিক্ষা বিস্তারের প্রথম পদক্ষেপ কী ছিল?
উপনিবেশিক শিক্ষানীতির শুরুর দিকে নারীশিক্ষা পুরোপুরি উপেক্ষিত ছিল। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই নারীশিক্ষার বিস্তার শুরু হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের উদ্যোগে ১৮৪৯ সালে কলকাতায় 'বেথুন স্কুল' (বর্তমানে বেথুন কলেজ) প্রতিষ্ঠা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও এক্ষেত্রে তাঁর অকৃত্রিম সহযোগী ছিলেন। এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক নারীশিক্ষার প্রথম আলোকবর্তিকা। তবে মিশনারিরাও (যেমন আলেকজান্ডার ডাফ) নারীশিক্ষার পক্ষে কাজ করেছিলেন।
11. রাজা রামমোহন রায় কেন সংস্কৃত শিক্ষার বিরোধিতা করেছিলেন?
রাজা রামমোহন রায় পাশ্চাত্য আধুনিক শিক্ষার জোরালো সমর্থক ছিলেন। ১৮২৩ সালে তিনি গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে একটি চিঠি লিখে জানান যে, সংস্কৃত ভাষায় প্রাচীন শাস্ত্রচর্চার জন্য সরকারি অর্থব্যয় করে সংস্কৃত কলেজ স্থাপন না করে, বরং পাশ্চাত্যের গণিত, দর্শন, রসায়ন, শারীরবিদ্যা প্রভৃতি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় করা উচিত। তিনি মনে করতেন— 'প্রাচীন পুঁথি ঘেঁটে ভারতের কোনো উন্নতি হবে না, বরং পাশ্চাত্য জ্ঞানের আলোকেই দেশ আলোকিত হবে।'
12. এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
স্যার উইলিয়ম জোনস ১৭৮৪ সালে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি (Asiatic Society) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল: (১) প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, বিশেষ করে সংস্কৃত ভাষায় লেখা গ্রন্থগুলি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা, (২) ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জ্ঞানের সাথে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের পরিচয় করানো, (৩) ভারতীয় শিক্ষিত মানুষদের সাথে ব্রিটিশদের এক সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা, যার ভিত্তিতে ঔপনিবেশিক প্রশাসন আরও সুগম হয়ে উঠবে। উইলিয়ম জোনস নিজে 'মনুসংহিতা' ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং কালিদাসের 'অভিজ্ঞানম শকুন্তলম' প্রথম ইউরোপে পরিচিত করান।
13. জেমস রেনেল ও জমি জরিপের ইতিহাস সংক্ষেপে লেখো।
জেমস রেনেল (James Rennell) ছিলেন ভারতের প্রথম সার্ভেয়র জেনারেল। ১৭৬০ সালের দিকে ২৪ পরগনার জমি জরিপের কাজ শুরু করেন জ্যাজ্বল্যাণ্ড; তাঁর অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন হগু ক্যামেরন। ১৭৬৪ সালে বাংলার নদীপথগুলি জরিপ করেন জেমস রেনেল। ১৭৬৭ সালে কোম্পানি তাঁকে ভারতের সার্ভেয়র জেনারেল বা জরিপ বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করে। তিনি বাংলার নদীপথ মিলিয়ে মোট ১৬টি মানচিত্র তৈরি করেন। ক্রমে তাঁর তৈরি মানচিত্রগুলি ভারতের ভূমি-রাজস্ব নির্ধারণ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
14. ইজারাদারি বন্দোবস্ত কী এবং কেন তা ব্যর্থ হয়েছিল?
ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে জুন মাসে এক নতুন ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেন, যা ইজারাদারি বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। পদ্ধতি: নিলামে যিনি সর্বোচ্চ রাজস্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করতেন, তাঁর সাথে পাঁচ বছরের জন্য জমির বন্দোবস্ত দেওয়া হতো— তাই একে 'পাঁচসালা বন্দোবস্ত'-ও বলা হতো। ব্যর্থতার কারণ: (১) অধিকাংশ ইজারাদার গ্রাম সমাজের বাইরের লোক হওয়ায় জমির প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা ও রাজস্ব নির্ধারণে অজ্ঞ ছিলেন, (২) ধার্য রাজস্ব বাস্তব আদায়যোগ্য রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যেত— ফলে ইজারাদাররা রাজস্ব শোধ করতে ব্যর্থ হতেন ও দেউলিয়া হয়ে যেতেন, (৩) গ্রাম সমাজের স্থানীয় কাঠামোয় ভাঙন ধরে। এইসব সমস্যার কারণে এ ব্যবস্থাকে ১৭৯০ সালে তুলে দিয়ে পরে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) চালু করেন।
15. ওয়ারেন হেস্টিংসের শিক্ষা ও ভাষাচর্চায় ভূমিকা কী ছিল?
ওয়ারেন হেস্টিংস উপনিবেশিক শাসনকে সুগম করার জন্য শিক্ষা ও ভাষাচর্চাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাঁর অবদান: (১) ফারসি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষা জানা লোকদের রাজস্ব দপ্তরে নিয়োগ, (২) হিন্দু ও মুসলিম আইন ইংরেজিতে অনুবাদ করানোর উদ্যোগ— যার ফলে নাথানিয়েল হ্যালহেডের সম্পাদনায় 'A Code of Gentoo Law' প্রকাশিত, (৩) হ্যালহেডের লেখা বাংলা ব্যাকরণ 'A Grammar of the Bengal Language' (১৭৭৮)— প্রথম চলিত বাংলা হরফ ছাপা, (৪) এলিজা ইম্পের আইনগুলোর ফারসি ও বাংলা অনুবাদ (জোনাথন ডানকান কর্তৃক, ১৭৮৩), (৫) ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা— আরবি ও ফারসি ভাষাচর্চার সুযোগ করে দেওয়া।
16. লর্ড কর্নওয়ালিসের পুলিশ ব্যবস্থা সংস্কার কেন করা হয়?
লর্ড কর্নওয়ালিস উপলব্ধি করেছিলেন যে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই উপনিবেশিক শাসন টেকসই হবে না— আইনের শাসন (Rule of Law) বলবৎ করতে একটি দক্ষ ও নিয়ন্ত্রিত পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজন। ১৭৯৩ সালে তিনি জেলাগুলিতে পুলিশ থানা ব্যবস্থা চালু করেন এবং প্রতিটি থানার দায়িত্বে একজন করে 'দারোগা' নিযুক্ত করেন। দারোগাদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেটরা। মূল লক্ষ্য ছিল: (১) আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা— যাতে কোম্পানি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিদ্রোহ, ডাকাতি, ঠগী দস্যুদের দমন ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, (২) রাজস্ব আদায় সহজতর করা, (৩) ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের প্রতিপত্তি ও নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করা। পরবর্তীতে ১৮৪৩ সালে সিন্ধু প্রদেশে আরও নতুন ধাঁচের পুলিশ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়।
17. সামরিক জাতি তত্ত্ব কী এবং কেন চালু হয়েছিল?
'সামরিক জাতি' (Martial Race) তত্ত্ব ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের একটি কৃত্রিম বর্ণবাদী ধারণা। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা অনুভব করে, উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণ ও রাজপুত সিপাহিদের ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক। তাই তারা পাঞ্জাবের শিখ, নেপালের গুর্খা, উত্তর ভারতের রাজপুত প্রভৃতিকে 'যুদ্ধে স্বাভাবিকভাবে দক্ষ ও ব্রিটিশের প্রতি অনুগত' জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে— যা 'সামরিক জাতি তত্ত্ব' নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুসরণ করে ঐসব জাতিগোষ্ঠীর লোকদেরই সেনাবাহিনীতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে ১৯১৪ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ছিল তথাকথিত 'সামরিক জাতি'-র লোক। এই নীতি ভারতীয় জাতিগুলিকে বিভক্ত করারও এক কৌশল ছিল।
18. কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?
ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক ও ব্যবহারিক। তখনও মুঘল প্রভাবিত রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থায় ফারসি ও আরবি ভাষার ব্যাপক প্রচলন ছিল। হেস্টিংস চেয়েছিলেন, মাদ্রাসায় শিক্ষিত ভারতীয় (মুসলিম) ছাত্ররা আরবি ও ফারসি ভাষায় পারদর্শী হয়ে কোম্পানির প্রশাসন, রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থায় কাজ করবে এবং ঔপনিবেশিক শাসনকে সুগঠিত করবে। একই উদ্দেশ্যে দশ বছর পর ১৭৯১ সালে জোনাথন ডানকান বেনারসে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
19. হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার পটভূমি কী ছিল?
কলকাতায় ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে কেবল সরকারি নয়, বরং কলকাতার শিক্ষিত ও ধনী ভারতীয় ব্যক্তিবর্গেরও ভূমিকা ছিল। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট এবং সমাজ সংস্কারক ডেভিড হেয়ার এ কলেজ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ উদ্যোগী ছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ও কলেজের কাজকর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই কলেজের মাধ্যমেই কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং পরবর্তীকালে বাঙালি নবজাগরণের (Bengal Renaissance) কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
20. মিশনারিদের শিক্ষাবিস্তারে ভূমিকা কী ছিল?
উপনিবেশিক ভারতে মিশনারিরা আধুনিক শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যদিও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টধর্ম প্রচার। ১৮৩০ সালে আলেকজান্ডার ডাফ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জেনারেল অ্যাসেম্বলি'জ ইনস্টিটিউশন (General Assembly's Institution) ছিল উল্লেখযোগ্য। মিশনারিরা শুধু ছেলেদের নয়, মেয়েদের শিক্ষার জন্যও বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। উইলিয়ম কেরি সারামপুর মিশনে এসে বাংলা গদ্যের বিকাশ ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাইবেলের অংশবিশেষ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করাও মিশনারিদের বড়ো কাজ ছিল। তাঁদের ছাপাখানাগুলি থেকে বহু বাংলা বই ও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়।
21. ঔপনিবেশিক বিচার ব্যবস্থা ভারতীয়দের জন্য কী সমস্যা তৈরি করেছিল?
মুঘল আমলের বিচার ব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশ আমলের বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধারণ ভারতীয়রা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। সমস্যাসমূহ: (১) আদালতের ভাষা ইংরেজি হওয়ায় সাধারণ মানুষ আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারত না, (২) সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিচারকের পদে ইউরোপীয়রা বসায় ভারতীয়রা বিচার ব্যবস্থার মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়, (৩) বিচার কাঠামোকে সংহত করে কোড বা বিধিবদ্ধ করায় তা হয়ে ওঠে অনমনীয় ও জটিল, (৪) ভারতীয় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথার সাথে অনেক সময় ইউরোপীয় আইনের সংঘাত হতো, (৫) বিচার ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ছিল। এককথায়, বিচার ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যতম প্রধান নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
22. প্রেসিডেন্সি ব্যবস্থায় কাউন্সিল ও গভর্নরের ভূমিকা কী ছিল?
তিনটি প্রেসিডেন্সি— মাদ্রাজ, বোম্বাই ও বাংলা— প্রতিটিই স্বতন্ত্র 'কাউন্সিল' (Council)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এই কাউন্সিলগুলি সরাসরি লন্ডনের কোম্পানি পরিচালকগোষ্ঠীর (Council of Directors) সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত। প্রতিটি কাউন্সিলের একজন সদস্যকে ঐ খাঁটির 'গভর্নর' নিযুক্ত করা হতো। গভর্নর ও তাঁর কাউন্সিল প্রেসিডেন্সির আইন-শৃঙ্খলা, বাণিজ্য, রাজস্ব, বিচার প্রশাসন পরিচালনা করতেন। রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩) পাসের পর বাংলার গভর্নর 'গভর্নর জেনারেল' পদে উন্নীত হন এবং অন্য প্রেসিডেন্সিগুলির গভর্নরেরা তাঁর অধীনে কাজ করতে বাধ্য হন। পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪) গভর্নর জেনারেলের কর্তৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করে।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর
8 টি
1. রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩) ও পিট প্রণীত ভারত শাসন আইন (১৭৮৪)— এই দুই আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কীভাবে ভারতের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল? বিশ্লেষণ করো।
রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩)
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক পাস হওয়া এই আইনটির মাধ্যমে ভারতে কোম্পানি শাসনের উপর প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
- গভর্নর জেনারেল পদ সৃষ্টি: বাংলার গভর্নরকে গভর্নর জেনারেল (ওয়ারেন হেস্টিংস) পদে উন্নীত করা হয়। মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ের গভর্নরেরা তাঁর অধীনে কাজ করতে বাধ্য হন।
- গভর্নর জেনারেল-ইন-কাউন্সিল: চারজন সদস্য নিয়ে একটি কাউন্সিল গঠিত হয়, যার মাধ্যমে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধ্যতামূলক হয়।
- কলকাতা রাজধানী: এই আইনের ফলেই কলকাতা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের রাজধানীতে পরিণত হয়।
- দুই প্রেসিডেন্সির উপর নিয়ন্ত্রণ: মাদ্রাজ ও বোম্বাইকে কলকাতার অধীনস্থ করে প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ ঘটানো হয়।
পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪)
রেগুলেটিং অ্যাক্টের ত্রুটিগুলি দূর করতে এই আইন আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
- বোর্ড অফ কন্ট্রোল (Board of Control): ছয়জন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত এই বোর্ড কোম্পানির সামরিক, অসামরিক শাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পায়।
- দ্বৈত শাসনের অবসান: কোম্পানি ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বোর্ডের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি নীতি নির্ধারণ করতে থাকে।
- কর্তৃত্বের স্পষ্টীকরণ: স্পষ্টভাবে বলা হয় যে ভারতে কোম্পানির সমস্ত প্রশাসনিক কাজ গভর্নর জেনারেলের কর্তৃত্ব মেনে চলবে।
বিশ্লেষণ: প্রথম আইনটি ভারতীয় প্রশাসনকে এক ছাতার নীচে এনে রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণ করে, দ্বিতীয়টি ব্রিটিশ সংসদের হাতে সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়ে কোম্পানিকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সম্প্রসারিত বাহুতে পরিণত করে।
2. ওয়ারেন হেস্টিংস ও লর্ড কর্নওয়ালিসের বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের তুলনামূলক আলোচনা করো। এই সংস্কারগুলি ভারতীয়দের উপর কী প্রভাব ফেলেছিল?
ওয়ারেন হেস্টিংসের সংস্কার (১৭৭২-১৭৮১)
- জেলা আদালত: প্রতিটি জেলায় একটি দেওয়ানি ও একটি ফৌজদারি আদালত স্থাপন।
- দেওয়ানি আদালতে: প্রধান ছিলেন ইউরোপীয়রা; আইন ব্যাখ্যার জন্য ভারতীয় পণ্ডিত ও মৌলবী নিযুক্ত।
- সুপ্রিম কোর্ট (১৭৭৪): কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা। প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পে।
- সীমাবদ্ধতা: সুপ্রিম কোর্ট ও কোম্পানির আদালতের মধ্যে এখতিয়ারগত দ্বন্দ্ব।
লর্ড কর্নওয়ালিসের সংস্কার (১৭৯৩ — কর্নওয়ালিস কোড)
- ক্ষমতা পৃথকীকরণ: রাজস্ব আদায় (কালেক্টর) ও বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ আলাদা করা।
- আদালতের স্তরবিন্যাস: জেলা → প্রাদেশিক → সদর দেওয়ানি ও ফৌজদারি — ধাপে ধাপে সাজানো।
- আইনের কোডিফিকেশন: বিধিবদ্ধ আইন বা কোড প্রণয়ন।
- আপিলের অধিকার: নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিলের ব্যবস্থা।
ভারতীয়দের উপর প্রভাব
- ইউরোপীয় একচেটিয়া: সমস্ত উচ্চ বিচারকের পদ ইউরোপীয়দের হাতে; ভারতীয়রা সহায়ক মাত্র।
- আইনের জটিলতা: ইংরেজি ভাষা ও কোডিফাইড আইন সাধারণ ভারতীয়দের বোধগম্য ছিল না।
- বিচারহীনতা: ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া ভারতীয়দের বিচারপ্রার্থী হতে নিরুৎসাহিত করে।
- সামগ্রিক: বিচার ব্যবস্থা হয়ে ওঠে শাসনের হাতিয়ার, নিরপেক্ষ ন্যায়বিচারের স্থান নয়।
3. ভারতে উপনিবেশিক প্রেসিডেন্সি ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে ওঠে? মাদ্রাজ, বোম্বাই ও বাংলা প্রেসিডেন্সির পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করো।
উৎপত্তি ও বিকাশ
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আদতে ছিল একটি বণিক সংস্থা। ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্যের স্বার্থে তারা প্রথমে ১৬১১-১২ সালে মসলিপত্তনম ও সুরাটে খাঁটি তৈরি করে। ১৬৩৯ সালে মাদ্রাজের কাছে সেন্ট জর্জ দুর্গ প্রতিষ্ঠা করে। ১৬৮৭ সালে সুরাট থেকে বোম্বাই কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, কলকাতা ফোর্ট উইলিয়ম কেন্দ্র করে হয়ে ওঠে বাংলার প্রধান বাণিজ্যঘাঁটি। ক্রমে এই তিনটি কেন্দ্রকে ঘিরেই তিনটি স্বতন্ত্র প্রেসিডেন্সি গড়ে ওঠে।
| বৈশিষ্ট্য | মাদ্রাজ | বোম্বাই | বাংলা (কলকাতা) |
| কেন্দ্র | সেন্ট জর্জ দুর্গ | সুরাট → বোম্বাই | ফোর্ট উইলিয়ম |
| অধীন এলাকা | দক্ষিণ ভারত, পূর্ব উপকূল | পশ্চিম ও মধ্য ভারত, আরব সাগর উপকূল | বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম, উত্তর ভারত, পাঞ্জাব |
| বিশেষত্ব | দুই সদর (উটাকামুন্ড — গ্রীষ্ম, মাদ্রাজ — শীত) | শুরুতে 'পশ্চিম প্রেসিডেন্সি' নামে পরিচিত | ফোর্ট উইলিয়ম প্রেসিডেন্সি; ১৭৭৩ থেকে প্রশাসনিক রাজধানী |
বৈশিষ্ট্য
- প্রত্যেকটি প্রেসিডেন্সি নিজস্ব কাউন্সিলের মাধ্যমে লন্ডনের পরিচালকগোষ্ঠীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ রেখে চলত।
- প্রত্যেকটির একজন করে গভর্নর থাকতেন।
- ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট কলকাতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে গভর্নর জেনারেল-এর অধীনে অন্য দুটি প্রেসিডেন্সিকে আনে।
4. ভারতে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের পটভূমি ও বিভিন্ন কমিটি/প্রতিবেদনের ভূমিকা আলোচনা করো। মেকলে মিনিট ও উডের ডেসপ্যাচের গুরুত্ব কী?
প্রাথমিক পটভূমি
শুরুতে কোম্পানি ভারতীয় প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করেনি। ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথম প্রশাসনের প্রয়োজনে কলকাতা মাদ্রাসা (১৭৮১) ও সংস্কৃত শিক্ষার চর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে সরকারি নীতিতে পরিবর্তন আসে।
গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
- জেনারেল কমিটি অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশন (১৮২৩): কোম্পানির উদ্যোগে শিক্ষাবিস্তারের নীতি নির্ধারণে গঠিত হয়। প্রাচ্যবাদী বনাম পাশ্চাত্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র হয়।
- মেকলে মিনিট (১৮৩৫): লর্ড মেকলের প্রতিবেদন। প্রস্তাব: ইংরেজি ভাষায় পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা সরকারি নীতি হওয়া উচিত। সংস্কৃত ও ফারসি শিক্ষা বাদ। 'ভারতীয়দের রক্তে ইংরেজি সাহিত্য প্রবাহিত করতে হবে'— এটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। সরকার নীতি গ্রহণ করে।
- উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): স্যার চার্লস উডের প্রতিবেদন। একে 'ভারতীয় শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা' বলা হয়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত স্তরভিত্তিক শিক্ষাকাঠামোর নীলনকশা। ইংরেজি ও ভারতীয় ভাষা— উভয় মাধ্যম। এর ফলেই ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
মূল্যায়ন
মেকলে মিনিট শিক্ষার অভিমুখ নির্ধারণ করে দেয়, আর উডের ডেসপ্যাচ তাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়। একসাথে এরা আধুনিক ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত তৈরি করে— যদিও প্রাচ্য জ্ঞানধারার প্রতি চরম অবহেলা ছিল এই নীতির অন্ধকার দিক।
5. কোম্পানির ভূমি রাজস্ব নীতি ও জরিপ কার্যক্রমের বিবর্তন আলোচনা করো। ইজারাদারি বন্দোবস্ত কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
জমি জরিপের সূচনা
পলাশির যুদ্ধের পর ১৭৬০ সালে কোম্পানি ২৪ পরগনার জমিদারি পায়। ক্লাইভ তখন জরিপবিদদের খোঁজ শুরু করেন। জ্যাজ্বল্যাণ্ড প্রথম জরিপ শুরু করেন, কিন্তু কাজ শেষ হবার আগে মারা গেলে হগু ক্যামেরন তা শেষ করেন। ১৭৬৪ সালে জেমস রেনেল বাংলার নদীপথ জরিপ করেন। ১৭৬৭ সালে তিনি ভারতের প্রথম সার্ভেয়র জেনারেল নিযুক্ত হন। রেনেল-এর বাংলা, বিহার, অযোধ্যা, এলাহাবাদের ১৬টি মানচিত্র বিখ্যাত।
ইজারাদারি বন্দোবস্ত (১৭৭২)
ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথমে নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে ৫ বছরের জন্য জমি ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেন— একে ইজারাদারি বা পাঁচসালা বন্দোবস্ত বলে।
ব্যর্থতার কারণ
- বহিরাগত ইজারাদার: অধিকাংশ ইজারাদারই গ্রাম সমাজের বাইরের লোক ছিলেন, ফলে গ্রামের প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন।
- অতিরিক্ত রাজস্ব ধার্য: নিলামের প্রতিযোগিতায় রাজস্বের পরিমাণ কৃত্রিমভাবে বেড়ে যেত— যা বাস্তবে আদায় করা সম্ভব ছিল না।
- রাজস্ব খেলাপ: অনেক ইজারাদার নির্ধারিত রাজস্ব জমা দিতে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে যেতেন।
- স্থানীয় কাঠামোর অবক্ষয়: গ্রামীণ সমাজ ও কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
এরপর ১৭৯০ সালে দশসালা বন্দোবস্ত চালু হলেও শেষমেশ ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করে জমিদারদের স্থায়ী মালিকানা স্বীকার করে নেন।
6. ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনী (সিপাহি বাহিনী) কীভাবে গড়ে ওঠে? সিপাহি নিয়োগে কী কী পরিবর্তন আসে এবং কেন ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর 'সামরিক জাতি' তত্ত্ব প্রয়োগ করা হয়?
সিপাহি বাহিনীর গোড়াপত্তন
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমদিকে ভারতীয় শাসকদের মতো করেই শাসন চালাত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল। এই বাহিনী 'সিপাহি বাহিনী' নামে পরিচিত।
প্রাথমিক নিয়োগ নীতি
- প্রথম দিকে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ও রাজপুত কৃষকদের সহজেই নিয়োগ দেওয়া হতো।
- তাঁরা নিয়মিত বেতন ও বেশি সুযোগ-সুবিধা পেতেন— যা সিপাহি পেশাকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
- ফলে সিপাহি বাহিনীতে জাতিভিত্তিক প্রাধান্য দেখা দেয়।
পরিবর্তন (১৮২০-এর দশক থেকে)
- মারাঠা, মহীশূর অঞ্চলের পাহাড়ি উপজাতি এবং নেপালি গুর্খাদের নিয়োগ শুরু হয়।
- উচ্চবর্ণীয় সিপাহিদের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে থাকে।
- তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
১৮৫৭-র বিদ্রোহ ও 'সামরিক জাতি' তত্ত্ব
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা অনুভব করে, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক। তখন ব্রিটিশরা পাঞ্জাবের শিখ, নেপালের গুর্খা, রাজস্থানের রাজপুত, পাঠান প্রভৃতিকে 'যুদ্ধে স্বাভাবিকভাবে দক্ষ' এবং 'ব্রিটিশের প্রতি অনুগত' 'সামরিক জাতি' (Martial Race) হিসেবে চিহ্নিত করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিতে শুরু করে। ১৯১৪ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীর তিন-চতুর্থাংশই ছিল এই তথাকথিত 'সামরিক জাতি'-র সদস্য।
7. রাজা রামমোহন রায় ও অন্যদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কেন ভারতীয় প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা উপনিবেশিক শিক্ষানীতিতে উপেক্ষিত হয়েছিল? মেকলে-পরবর্তী শিক্ষানীতির রূপরেখা দাও।
প্রাচ্যবাদী বনাম পাশ্চাত্যবাদী
ওয়ারেন হেস্টিংস, উইলিয়ম জোনস, এইচ.এইচ. উইলসনের মতো 'প্রাচ্যবাদী' (Orientalist) পণ্ডিতেরা ভারতের প্রাচীন সংস্কৃত, ফারসি ও আরবি জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করলেও উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে 'পাশ্চাত্যবাদী' (Anglicist) গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসতে থাকে।
রামমোহনের অবস্থান
রাজা রামমোহন রায় ১৮২৩ সালে লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখে জানান, সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সরকারি অর্থ পাশ্চাত্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের (গণিত, রসায়ন, দর্শন) শিক্ষায় ব্যয় করা উচিত— কারণ 'প্রাচীন পুঁথি ঘেঁটে ভারতের উন্নতি হবে না'।
মেকলের প্রভাব ও পরবর্তী নীতি
মেকলে মিনিট (১৮৩৫) স্পষ্ট ঘোষণা করে— 'ইংরেজিতেই হবে শিক্ষার মাধ্যম, কারণ ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যই উন্নততর।' প্রাচ্য জ্ঞানচর্চাকে তিনি হেয় করেন। এরপর:
- সরকারি অনুদান: ভারতীয় ভাষায় শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারি অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়।
- উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): পাশ্চাত্য শিক্ষার কাঠামো তৈরির নীলনকশা। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত স্তরভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। ইংরেজি ও ভারতীয় ভাষা— উভয় মাধ্যম মেনে নেওয়া হলেও কার্যত ইংরেজি মাধ্যমই প্রধান হয়ে ওঠে।
- বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (১৮৫৭): কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।
ফলে প্রাচীন টোল, মাদ্রাসা, পাঠশালাগুলি ধীরে ধীরে অবলুপ্তির মুখে পড়ে এবং পাশ্চাত্য শিক্ষাই ভারতীয় শিক্ষিত সমাজের প্রধান ধারা হয়ে ওঠে।
8. ভারতে উপনিবেশিক শাসন কাঠামোয় প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী কীভাবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছিল? 'আইনের শাসন' প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা আলোচনা করো।
ত্রিমুখী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে যে উপনিবেশিক কাঠামো তৈরি করেছিল, তার তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছিল— আমলাতন্ত্র (Civil Administration), পুলিশ (Police) ও সেনাবাহিনী (Army)। এরা একে অপরের পরিপূরক রূপে কাজ করত।
- আমলাতন্ত্র (Civil Service): নীতি প্রণয়ন, রাজস্ব আদায় ও বিচার কাঠামোর হাড়িকাঠ। গভর্নর জেনারেল, কাউন্সিল থেকে শুরু করে জেলা কালেক্টর পর্যন্ত পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ছিল ইউরোপীয় কর্তৃত্বে পরিচালিত এক কঠোর আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
- সেনাবাহিনী (Army): সাম্রাজ্য বিস্তার, প্রতিরক্ষা, বিদেশি শক্তির আক্রমণ রোধ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের প্রধান হাতিয়ার। কোম্পানির মোট রাজস্বের ৪০% সেনাবাহিনীর পেছনে ব্যয় হতো।
- পুলিশ (Police): আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, চোর-ডাকাত, ঠগী দমন এবং রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে প্রজাসাধারণের ওপর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির কাজ করত।
'আইনের শাসন' ও পুলিশ
লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে জেলায় থানা ও দারোগা ব্যবস্থা চালু করে 'Rule of Law' তথা আইনের শাসন বলবৎ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবে এই 'আইনের শাসন' ভারতীয় প্রজার সুরক্ষার চেয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের স্থায়িত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই বেশি কাজ করেছিল। পুলিশ ছিল সেই নিয়ন্ত্রণের বাস্তব রূপকার। ১৮৪৩ সালে সিন্ধু প্রদেশে নতুন পুলিশ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক পুলিশি কাঠামো আরও শক্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়।
পরিপূরকতা
সেনাবাহিনী বাইরের হুমকি ও বড় বিদ্রোহ দমন করত, পুলিশ ভেতরের অপরাধ ও ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা, আর আমলাতন্ত্র এদের মধ্যে সমন্বয় রেখে কর, আইন ও নিয়ন্ত্রণের জাল বুনত। একসাথে এরা উপনিবেশিক কর্তৃত্বের এক অখণ্ড নিপীড়ন-কাঠামো গঠন করেছিল।
মনে রেখো!
তিন প্রেসিডেন্সি: মাদ্রাজ (সেন্ট জর্জ), বোম্বাই (সুরাট→বোম্বাই), বাংলা (ফোর্ট উইলিয়ম)। রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩): ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথম গভর্নর জেনারেল, কলকাতা রাজধানী। পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪): বোর্ড অফ কন্ট্রোল গঠন। কর্নওয়ালিস কোড (১৭৯৩): বিচার ও রাজস্ব পৃথকীকরণ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। মেকলে মিনিট (১৮৩৫): ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে। উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা।
PDF ডাউনলোড
সম্পূর্ণ অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর PDF আকারে ডাউনলোড করো।
PDF ডাউনলোড