সাত ভাই চম্পা (বিষ্ণু দে)

বিখ্যাত বাঙালি কবি বিষ্ণু দে রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'সাত ভাই চম্পা' কবিতার সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্ভুক্ত কবি বিষ্ণু দে রচিত 'সাত ভাই চম্পা' কবিতার সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. কবিতার বিষয়সংক্ষেপ

রূপকথার আড়ালে দেশপ্রেম: কবি বিষ্ণু দে রচিত 'সাত ভাই চম্পা' কবিতাটি রূপকথার মোড়কে লেখা একটি গভীর দেশপ্রেমমূলক কবিতা। এখানে 'চম্পা' হলো পরাধীন, অবদমিত ভারতবর্ষ বা বাংলা মায়ের রূপক এবং রূপকথার রাজকুমার বা সাত ভাই হলো এদেশের তরুণ ও মুক্তিকামী বীর সন্তানরা, যারা মাতৃভূমির মুক্তির অপেক্ষায় প্রাণপণ সংগ্রাম করে চলেছে।

বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস: কবি কবিতায় বাঙালির অতীত বীরত্ব ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেছেন। একসময় অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞানের আলো নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত, চিন ও মঙ্গোলিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বাঙালির খ্যাতি সিংহল (শ্রীলঙ্কা) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। চাঁদ সদাগর ও শ্রীমন্ত সদাগরের মতো বাঙালি বণিকরা শ্যাম, কাম্বোজ এবং যবদ্বীপে (জাভা) বাণিজ্য করতে গিয়ে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। কৃষক, শ্রমিক, রাজা, মাঝি—সবাই যুগে যুগে এই চম্পাকে বা দেশের আসল রূপটিকে খুঁজে ফিরেছে।

মুক্তির আহ্বান: চম্পার মায়ার আকর্ষণে বহু মানুষ 'বৈতরণী' বা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে। কিন্তু পরাধীনতার গ্লানিতে বাংলা আজ দুস্থ ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। রূপকথার কাঞ্চনমালা বা কড়ির পাহাড় তাকে মুক্তি দিতে পারবে না। তাই কবি চম্পাকে তার এই মলিন ছদ্মবেশ ঘুচিয়ে আসল রূপ ধারণ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। যখন এই শৃঙ্খলমোচন হবে, তখন 'জনগণমন'-এ স্বাধীনতার তীব্র সুখ অনুভূত হবে এবং বাংলার সাত ভাই (বীর যুবসমাজ) জেগে উঠে সমগ্র বিশ্বকে নন্দিত করবে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
অবহেলেঅনায়াসে / বিনা ক্লেশেগৌরীশৃঙ্গহিমালয় পর্বত / মাউন্ট এভারেস্ট
দীপঙ্করঅতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞাননিষিদ্ধ দেশতিব্বত
শাঙনশ্রাবণ মাসনৃপরাজা / সম্রাট
ভাটিয়ালিমাঝিমাল্লাদের গাওয়া লোকগানসাড়সাড়া / শব্দ বা সাড়া পাওয়া
অবিনশ্বরযার বিনাশ বা ধ্বংস নেইহিরণমায়াসোনার মতো উজ্জ্বল মোহ বা মায়া
বৈতরণীমৃত্যুর পর পার হওয়ার পৌরাণিক নদীখেইসূত্র / কিনারা বা দিশা
কাঞ্চনমালারূপকথার দুঃখিনী নারী চরিত্রছদ্মবেশনিজের আসল পরিচয় গোপন করার বেশ

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'সাত ভাই চম্পা' কবিতাটির রচয়িতা কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) জীবনানন্দ দাশ (গ) বিষ্ণু দে (ঘ) কাজী নজরুল ইসলাম
উত্তর: (গ) বিষ্ণু দে
২. কবিতাটিতে 'পারুল-রাঙানো রাজকুমার' বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?
(ক) বাংলার কৃষকদের (খ) বাংলার তরুণ ও যুবকদের (গ) দেশের নেতাদের (ঘ) রাজাদের
উত্তর: (খ) বাংলার তরুণ ও যুবকদের
৩. 'নিষিদ্ধ দেশে দীপঙ্করের শিখা' - এখানে 'নিষিদ্ধ দেশ' বলতে কোন্ দেশকে বোঝানো হয়েছে?
(ক) চিন (খ) জাপান (গ) তিব্বত (ঘ) মঙ্গোলিয়া
উত্তর: (গ) তিব্বত
৪. দীপঙ্করের নাম আর কোথায় লেখা হয়?
(ক) রাশিয়ায় (খ) কাম্বোজে (গ) মঙ্গোলিয়ায় (ঘ) যবদ্বীপে
উত্তর: (গ) মঙ্গোলিয়ায়
৫. 'গৌরীশৃঙ্গ মাথা হেঁট টলোমলো' - গৌরীশৃঙ্গ কী?
(ক) গৌড় রাজ্যের রাজধানী (খ) এভারেস্ট বা হিমালয় পর্বত (গ) একটি নদীর নাম (ঘ) একটি দ্বীপ
উত্তর: (খ) এভারেস্ট বা হিমালয় পর্বত
৬. চম্পাকে কারা চিনেছিল?
(ক) সিংহল (খ) আরব (গ) ইউরোপ (ঘ) পারস্য
উত্তর: (ক) সিংহল
৭. 'অশ্বের খুরে, লাঙলের ফলা টেনে' - কারা চম্পাকে খোঁজে?
(ক) রাজা ও মন্ত্রী (খ) সৈন্য ও বণিক (গ) কৃষক ও রাজা (নৃপ) (ঘ) শ্রমিক ও মাঝি
উত্তর: (গ) কৃষক ও রাজা (নৃপ)
৮. কপিলমুনির দ্বীপ কোথায় অবস্থিত?
(ক) সুন্দরবনে (খ) গঙ্গাসাগরে (গ) আন্দামানে (ঘ) সিংহলে
উত্তর: (খ) গঙ্গাসাগরে
৯. শ্যাম-কাম্বোজে কারা হাড় রেখে আসে?
(ক) বাংলার বণিকরা / সদাগররা (খ) সন্ন্যাসীরা (গ) কৃষকরা (ঘ) রাজারা
উত্তর: (ক) বাংলার বণিকরা / সদাগররা
১০. কবিতায় কোন্ দুই সদাগরের নাম উল্লেখ আছে?
(ক) চাঁদ ও ধনপতি (খ) ধনপতি ও শ্রীমন্ত (গ) চাঁদ ও শ্রীমন্ত (ঘ) চাঁদ ও সনকা
উত্তর: (গ) চাঁদ ও শ্রীমন্ত
১১. 'বাহিরকে ঘর আপনকে করে পর' - কীসের লোভে মানুষ এমন করে?
(ক) অর্থের লোভে (খ) পারুল মায়ার লোভে (গ) ক্ষমতার লোভে (ঘ) যশের লোভে
উত্তর: (খ) পারুল মায়ার লোভে
১২. অন্ধ আবেগে মানুষ কোথায় ডোবে?
(ক) সমুদ্রে (খ) নদীতে (গ) বৈতরণীতে (ঘ) পুকুরে
উত্তর: (গ) বৈতরণীতে
১৩. 'বৈতরণী' কী?
(ক) স্বর্গের নদী (খ) পাতালের নদী (গ) মৃত্যুর পর পার হওয়ার পৌরাণিক নদী (ঘ) একটি হ্রদ
উত্তর: (গ) মৃত্যুর পর পার হওয়ার পৌরাণিক নদী
১৪. চম্পা কোথায় নেই?
(ক) সোনার পাহাড়ে (খ) কড়ির পাহাড়ে (গ) রূপোর পাহাড়ে (ঘ) মণির পাহাড়ে
উত্তর: (খ) কড়ির পাহাড়ে
১৫. কে চম্পার খেই জানে না?
(ক) পারুল (খ) রাজকন্যা (গ) কাঞ্চনমালা (ঘ) পদ্মাবতী
উত্তর: (গ) কাঞ্চনমালা
১৬. কবি চম্পাকে কী ঘোচাতে বলেছেন?
(ক) দুঃখ (খ) দারিদ্র্য (গ) দুস্থ ছদ্মবেশ (ঘ) মায়া
উত্তর: (গ) দুস্থ ছদ্মবেশ
১৭. 'এ মাহ ভাদরে ভরা বাদরের শেষে' - এখানে কোন্ মাসের কথা বলা হয়েছে?
(ক) আষাঢ় (খ) শ্রাবণ (গ) ভাদ্র (ঘ) আশ্বিন
উত্তর: (গ) ভাদ্র
১৮. চম্পার মুখ দেখে কবি কোন্ সুখের কথা বলেছেন?
(ক) শান্তি (খ) মুক্তি! মুক্তি! তীব্র সুখ (গ) আনন্দ (ঘ) উল্লাস
উত্তর: (খ) মুক্তি! মুক্তি! তীব্র সুখ
১৯. 'খুলে দাও মুখ, রৌদ্রে জ্বলুক...' - কী জ্বলবে?
(ক) আলো (খ) আগুন (গ) গান (ঘ) শিখা
উত্তর: (গ) গান
২০. সাত ভাই জাগলে কী হবে?
(ক) যুদ্ধ হবে (খ) রূপকথা সত্যি হবে (গ) দেশ-দেশ নন্দিত হবে (ঘ) রাজকন্যা খুশি হবে
উত্তর: (গ) দেশ-দেশ নন্দিত হবে

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. 'চম্পা! তোমার মায়ার অন্ত নেই' - কবিতায় চম্পা কে?
উত্তর: কবিতায় চম্পা একদিকে যেমন বাংলার চিরপরিচিত রূপকথার চরিত্র, অন্যদিকে সে অবিনশ্বর বাংলা দেশ বা পরাধীন মাতৃভূমির স্বাধীনতার এক অবিস্মরণীয় রূপক।
২. বাংলার ছেলেরা কী অবহেলে সয়?
উত্তর: দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় এবং চম্পার মায়ায় আকৃষ্ট হয়ে বাংলার বীর ছেলেরা সমস্ত রকম বাধা-বিপত্তি ও যন্ত্রণা অবহেলে বা অনায়াসে সহ্য করে।
৩. 'গৌরীশৃঙ্গ মাথা হেঁট টলোমলো' - গৌরীশৃঙ্গের এমন অবস্থার কারণ কী?
উত্তর: পরাধীনতার গ্লানিতে এবং বাংলার দুর্দশা দেখে গর্বিত হিমালয়ের সর্বোচ্চ শিখর গৌরীশৃঙ্গ বা এভারেস্ট যেন লজ্জায় মাথা হেঁট করে টলোমলো অবস্থায় রয়েছে।
৪. 'দীপঙ্করের শিখা' কোথায় কোথায় জ্বলে?
উত্তর: অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জ্ঞানের আলো বা শিখা নিষিদ্ধ দেশ তিব্বতে এবং চিনে প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল।
৫. চম্পাকে কারা কারা খুঁজেছে?
উত্তর: চম্পাকে বা মাতৃভূমির স্বাধীনতাকে যুগে যুগে কৃষক, রাজা, শ্রমিক, মাঝি এবং বাংলার বণিকরা আকুল হয়ে খুঁজে ফিরেছে।
৬. 'অশ্বের খুরে, লাঙলের ফলা টেনে' - বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: এর মাধ্যমে কবি দেশের রাজাদের যুদ্ধযাত্রা (অশ্বের খুরে) এবং সাধারণ কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমকে (লাঙলের ফলা) বুঝিয়েছেন, যা দিয়ে তারা চম্পাকে অন্বেষণ করেছে।
৭. চাঁদ ও শ্রীমন্ত সদাগর কোথায় হাড় রেখে আসে?
উত্তর: প্রাচীন বাংলার বণিক চাঁদ ও শ্রীমন্ত সদাগর নীল-কমলের দেশে এবং শ্যাম-কাম্বোজে সামুদ্রিক বাণিজ্য করতে গিয়ে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দেয় বা হাড় রেখে আসে।
৮. 'অন্ধ আবেগে বৈতরণীতে ডোবে' - কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: মাতৃভূমির স্বাধীনতার (চম্পার) মায়ায় আকৃষ্ট হয়ে বহু মুক্তিকামী মানুষ নিজেদের প্রাণের পরোয়া না করে অন্ধ আবেগে মৃত্যুকে (বৈতরণী পার হওয়া) আলিঙ্গন করেছে।
৯. 'খুলে দাও মুখ, রৌদ্রে জ্বলুক গান' - এর অর্থ কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো—পরাধীনতার অন্ধকার ও গ্লানি ঘুচিয়ে চম্পা যেন তার আসল রূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং দেশের সর্বত্র স্বাধীনতার আলোয় মুক্তির গান বেজে ওঠে।
১০. 'কড়ির পাহাড়ে চম্পা, তুমি তো নেই' - কড়ির পাহাড় বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কড়ির পাহাড় হলো রূপকথায় বর্ণিত একটি কাল্পনিক স্থান, যা আসলে অসম্ভব বা অবাস্তব কিছুর প্রতীক। দেশমাতা বাস্তবে এমন কোনো কল্পনার জগতে লুকিয়ে থাকতে পারে না।
১১. কাঞ্চনমালা কে?
উত্তর: কাঞ্চনমালা হলো বাংলার লোককথা বা রূপকথার এক পরিচিত দুঃখিনী নারী চরিত্র, যে নিজে দাসী হয়ে অশেষ কষ্ট ভোগ করেছিল।
১২. 'ঘোচাও চম্পা, দুস্থ ছদ্মবেশ' - ছদ্মবেশ কেন?
উত্তর: পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে বাংলা তার শৌর্য-বীর্য ও আসল রূপ হারিয়ে যে মলিন, দুর্বল রূপ ধারণ করেছে, কবি তাকেই বাংলার 'দুস্থ ছদ্মবেশ' বলেছেন।
১৩. 'এ মাহ ভাদরে ভরা বাদরের শেষে' - কথাটি কার লেখা কোন্ পদের কথা মনে করায়?
উত্তর: কথাটি মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি বিদ্যাপতির লেখা বিখ্যাত বৈষ্ণব পদ "এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর। এ ভরা বাদর মাহ ভাদর..." -এর কথা মনে করিয়ে দেয়।
১৪. 'চকিতে দেখাও জনগণমনে মুখ' - এখানে 'জনগণমন' শব্দটি কীসের ইঙ্গিত দেয়?
উত্তর: এখানে 'জনগণমন' শব্দটি যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ভারতের জাতীয় সংগীতের কথা স্মরণ করায়, তেমনি এটি সমগ্র দেশবাসীর সম্মিলিত চেতনার ইঙ্গিত দেয়।
১৫. 'সাত ভাই জাগে' - এই জাগরণের ফল কী?
উত্তর: সাত ভাই অর্থাৎ বাংলার ঘুমন্ত বীর যুবকদের জাগরণের ফলে পরাধীনতার অবসান ঘটে এবং দেশ ও জাতি মুক্তির চরম সুখে নন্দিত বা আনন্দিত হয়ে ওঠে।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. 'সাত ভাই চম্পা' কবিতায় রূপকথার মোড়কে কীভাবে বাংলার অতীত ঐতিহ্য ও বীরত্বের কাহিনি ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: কবি বিষ্ণু দে 'সাত ভাই চম্পা' কবিতায় বাংলার এক অতি পরিচিত রূপকথার আবরণে মাতৃভূমির এক গৌরবময় অতীত ও বীরত্বের ইতিহাসকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।

কবিতায় 'চম্পা' কেবল রূপকথার ফুল নয়, সে হলো শাশ্বত ও অবিনশ্বর বাংলা দেশ। আর 'সাত ভাই' বা 'পারুল-রাঙানো রাজকুমার' হলো এদেশের অগণিত বীর ও সাহসী সন্তান। বাংলার অতীত গৌরব যে শুধুমাত্র দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বোঝাতে কবি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এনেছেন। তিনি বলেছেন কীভাবে অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞানের আলো নিষিদ্ধ দেশ তিব্বত, চিন ও মঙ্গোলিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বাঙালির মেধা ও সাহসিকতাকে সিংহল বা শ্রীলঙ্কাও কুর্নিশ জানিয়েছিল।

অন্যদিকে, চাঁদ সদাগর ও শ্রীমন্ত সদাগরের মতো বাঙালি বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সমুদ্র পেরিয়ে শ্যাম, কাম্বোজ ও যবদ্বীপ পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছিল এবং প্রয়োজনে দেশের জন্য বিদেশের মাটিতে হাড় রেখে এসেছিল। যুগে যুগে বাংলার কৃষক, রাজা, মাঝি এবং শ্রমিকরা নিজেদের রক্ত-ঘাম দিয়ে এই দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। এইভাবে কবি রূপকথার খোলসের আড়ালে বাঙালির অতীত শৌর্য, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক বিস্তারের এক অনবদ্য বীরত্বের আখ্যান রচনা করেছেন।

২. "তোমাকে খুঁজেছে জানো কি কৃষকে নৃপে..." - চম্পাকে কারা, কীভাবে খুঁজেছে তার বিবরণ দাও।

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত অংশটি কবি বিষ্ণু দে রচিত 'সাত ভাই চম্পা' কবিতা থেকে গৃহীত।

খোঁজার বিবরণ: কবিতায় 'চম্পা' হলো অবিনশ্বর মাতৃভূমির প্রতীক বা বাংলার পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার রূপক। এই স্বাধীনতা বা মাতৃভূমির প্রকৃত রূপকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যুগে যুগে চম্পার অন্বেষণ করেছে।

কবি বলেছেন, কৃষক তার লাঙলের ফলা দিয়ে মাটি চিরে চম্পাকে খুঁজেছে, অর্থাৎ কঠোর পরিশ্রম করে সোনার ফসল ফলানোর মধ্য দিয়ে সে দেশের উন্নতি ঘটাতে চেয়েছে। অন্যদিকে, নৃপ বা রাজা অশ্বের খুরে বা যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব প্রদর্শনের মাধ্যমে মাতৃভূমিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। শ্রমিক তার হাতুড়ির শক্ত ঘায়ে এবং কাস্তের বাঁকা শানে নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে। এমনকি মাঝিরা যখন নদীতে নৌকা বেয়ে যায়, তখন তাদের ভাটিয়ালি গানেও সেই চম্পার বা স্বদেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসার সুর বেজে ওঠে। এছাড়া প্রাচীনকালের কপিলমুনির দ্বীপে বা কলিঙ্গ, কঙ্কণ ও গুজরাটেও বাংলার এই শাশ্বত রূপকে খোঁজার নিরন্তর প্রয়াস চলেছে।

৩. "ঘোচাও চম্পা, দুস্থ ছদ্মবেশ" - চম্পার 'দুস্থ ছদ্মবেশ' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? কবি কেন এই ছদ্মবেশ ঘোচাতে বলেছেন?

উত্তর: দুস্থ ছদ্মবেশ: 'সাত ভাই চম্পা' কবিতায় 'চম্পা' হলো বাংলা মা বা আমাদের শাশ্বত জন্মভূমি। দীর্ঘকাল বিদেশি শাসনে পরাধীন থাকার ফলে বাংলা তার অতীত গৌরব, শৌর্য-বীর্য এবং জাঁকজমক হারিয়ে ফেলেছে। পরাধীনতার শেকলে আবদ্ধ, শোষিত ও নিপীড়িত মাতৃভূমির এই শ্রীহীন, হতশ্রী এবং মলিন রূপটিকেই কবি 'দুস্থ ছদ্মবেশ' বলে অভিহিত করেছেন।

ছদ্মবেশ ঘোচানোর কারণ: বাংলা মায়ের এই রূপ তার আসল রূপ নয়। তার অতীত ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। অতীশ দীপঙ্করের মতো জ্ঞানী এবং চাঁদ সদাগরের মতো সাহসী বণিক এই বাংলারই সন্তান ছিলেন। তাই কবি চান না যে বাংলা চিরকাল এই পরাধীনতা ও দুর্বলতার আবরণে নিজেকে লুকিয়ে রাখুক। রূপকথার কাঞ্চনমালা বা অবাস্তব কড়ির পাহাড় বাংলার এই মুক্তি আনতে পারবে না। তাই কবি চম্পাকে তার এই মলিন ও পরাধীনতার 'দুস্থ ছদ্মবেশ' অবিলম্বে ত্যাগ করে স্বাধীনতার আলোয় নিজের প্রকৃত, অবিনশ্বর ও তেজস্বী রূপটি প্রকাশ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

৪. "চম্পা, তোমার অবিনশ্বর প্রাণ / এ কোন হিরণমায়ায় রেখেছ ঢেকে" - উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিটি কবি বিষ্ণু দে রচিত 'সাত ভাই চম্পা' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: 'অবিনশ্বর' শব্দের অর্থ হলো যার কোনো ধ্বংস বা বিনাশ নেই। আর 'হিরণমায়া' বলতে বোঝায় সোনার মতো উজ্জ্বল মোহ বা কোনো স্বর্ণালি বিভ্রম। কবিতায় 'চম্পা' হলো স্বাধীন ও চিরন্তন মাতৃভূমির রূপক। কবি বলেছেন, যুগে যুগে কত বীর রাজকুমার, অগণিত সাধারণ ছেলে দেশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। চম্পার বাহুর নির্দেশে হাসিমুখে তারা মৃত্যুর নদী 'বৈতরণী' পার হয়ে গেছে। তাদের এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যে, বাংলা মায়ের প্রাণশক্তি বা চেতনা সত্যিই অবিনশ্বর। তাকে কোনো বিদেশি শক্তি ধ্বংস করতে পারবে না।
কিন্তু তবুও, এই অবিনশ্বর প্রাণশক্তি আজ পরাধীনতার গ্লানিতে যেন এক মোহজালে বা হিরণমায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। দেশবাসী যেন এক ঘোর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আসল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে। তাই কবি আক্ষেপ করে বলেছেন, যে জাতির এত অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও বীরত্ব রয়েছে, তারা কেন আজও মোহ বা বিভ্রমের চাদরে নিজেদের ঢেকে রেখেছে।

৫. 'সাত ভাই চম্পা' কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এর মাধ্যমেই রচনার অন্তর্নিহিত ভাব বা মূল সুরটি প্রকাশ পায়। কবি বিষ্ণু দে তাঁর কবিতাটির নাম রেখেছেন বাংলার অতি পরিচিত রূপকথা 'সাত ভাই চম্পা'র অবলম্বনে।

রূপকথায় আমরা দেখেছি, সাতজন ভাই ও এক বোন পারুল রাজপ্রাসাদের ষড়যন্ত্রে প্রাণ হারায় এবং পরে তারা চম্পা ও পারুল ফুল হয়ে ফোটে। পারুলের ডাকে সাত ভাই চম্পা ফুল থেকে মানুষ রূপে ফিরে আসে। আলোচ্য কবিতায় কবি এই রূপকথাটিকে পরাধীন ভারতের মুক্তি-সংগ্রামের এক অসামান্য রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এখানে 'চম্পা' হলো পরাধীন, অবদমিত ভারতবর্ষ বা বাংলা দেশ, যে তার আসল রূপ হারিয়ে ছদ্মবেশে রয়েছে। আর 'সাত ভাই' বা 'রাজকুমার' হলো এদেশের তরুণ ও মুক্তিকামী বীর সন্তানরা।

কবিতা জুড়ে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে বাংলার যুবকরা চম্পার মায়ায় অবহেলে সকল যন্ত্রণা সহ্য করেছে এবং মৃত্যুর নদী পার হয়েছে। শেষে কবি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ভাদ্রের ভরা বর্ষার অবসানে অর্থাৎ দুঃখের রাতের শেষে চম্পা তার আসল রূপ দেখাবে এবং সাত ভাই অর্থাৎ দেশের বীর সন্তানরা জেগে উঠে 'মুক্তি'র তীব্র আনন্দে মেতে উঠবে। যেহেতু সমগ্র কবিতাটি এই রূপকথার মোড়কেই দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বুনেছে, তাই 'সাত ভাই চম্পা' নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • দীপঙ্কর = দীপ + কর
  • নিষিদ্ধ = নি + সিদ্ধ
  • উদ্ধার = উৎ + হার
  • বিচ্ছিন্ন = বি + ছিন্ন
  • দিগন্ত = দিক্ + অন্ত

সমাস নির্ণয়

  • রাজকুমার: রাজার কুমার (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • গৌরীশৃঙ্গ: গৌরীর শৃঙ্গ (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • নীলকমল: নীল যে কমল (কর্মধারয় সমাস)
  • জন্মভূমি: জন্মের ভূমি (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • অবিনশ্বর: নয় বিনশ্বর (নঞ তৎপুরুষ সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • মুখ ➜ মৌখিক
  • নিষেধ ➜ নিষিদ্ধ
  • দিন ➜ দৈনিক
  • শরীর ➜ শারীরিক
  • যন্ত্রণা ➜ যন্ত্রণাদায়ক

সাত ভাই চম্পা কবিতা সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

কবিতাটি প্রখ্যাত বাঙালি কবি বিষ্ণু দে-র লেখা। এটি মূলত রূপকথার মোড়কে লেখা একটি গভীর দেশপ্রেমমূলক কবিতা, যেখানে বাংলার পরাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে।

কবিতায় 'পারুল-রাঙানো রাজকুমার' বা 'সাত ভাই' বলতে পরাধীন বাংলার সেই সমস্ত মুক্তিকামী তরুণ ও বীর যুবকদের বোঝানো হয়েছে যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে।

দীর্ঘ পরাধীনতার ফলে বাংলা তার গৌরব হারিয়ে যে হতশ্রী ও মলিন রূপ ধারণ করেছে, কবি তাকেই চম্পার 'দুস্থ ছদ্মবেশ' বলেছেন এবং কবি চম্পাকে এই ছদ্মবেশ ঘোচাতে বলেছেন।