ইলিয়াস (লিও তলস্তয়)

বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় রচিত নবম শ্রেণীর পাঠ্য 'ইলিয়াস' গল্পের সম্পূর্ণ আলোচনা, শব্দার্থ এবং প্রশ্নোত্তর। তরজমা: মণীন্দ্র দত্ত।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নবম শ্রেণীর সাহিত্য সঞ্চয়ন বইয়ের অন্তর্গত বিশ্ববিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় রচিত 'ইলিয়াস' গল্পটির সম্পূর্ণ বিষয়সংক্ষেপ, শব্দার্থ, এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (MCQ, SAQ ও ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন) ছাত্রছাত্রীদের সহজভাবে প্রস্তুতির জন্য নিচে প্রদান করা হলো।

১. গল্পের বিষয়সংক্ষেপ

প্রাথমিক অবস্থা ও উন্নতি: উফা প্রদেশে বসবাসকারী বাস্কির উপজাতির মানুষ ইলিয়াস বিয়ের পর সাধারণ অবস্থায় ছিল (৭টি ঘোটকী, ২টি গোরু ও ২০টি ভেড়া)। কিন্তু সে এবং তার স্ত্রী শাম-শেমাগির ৩৫ বছরের কঠোর পরিশ্রমে তারা প্রচুর সম্পত্তির অধিকারী হয় (২০০ ঘোড়া, ১৫০ গোরু-মোষ এবং ১২০০ ভেড়া)। তাদের প্রতিপত্তি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

পারিবারিক অশান্তি ও দুর্দিন: বড়োলোক হওয়ার পর তাদের ছেলেরা আয়েশি হয়ে ওঠে। বড়ো ছেলেটি মারামারিতে মারা যায় এবং ছোটো ছেলে এক ঝগড়াটে মেয়েকে বিয়ে করে পিতা-মাতার অবাধ্য হয়, ফলে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর ইলিয়াসের দুর্দিন শুরু হয়। ভেড়ার পালে মড়ক, শীতে গোরু-মোষের মৃত্যু এবং কিরঘিজদের ঘোড়া চুরির ফলে ৭০ বছর বয়সে ইলিয়াস সম্পূর্ণ সর্বহারা হয়ে পড়ে।

সত্যিকারের সুখের সন্ধান: সর্বস্বান্ত ইলিয়াস ও তার স্ত্রীকে মহম্মদ শা নামে এক প্রতিবেশী আশ্রয় দেয়। তারা মহম্মদ শার বাড়িতে মজুরের কাজ শুরু করে। একদিন মহম্মদ শার বাড়িতে এক মোল্লাসহ অতিথিরা এলে, অতিথিরা ইলিয়াসের পূর্বের ও বর্তমান অবস্থার কথা জেনে অবাক হয়। তখন ইলিয়াসের স্ত্রী শাম-শেমাগি জানায় যে, ধনী অবস্থায় তাদের এক মুহূর্তের জন্য শান্তি বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার সময় ছিল না; সারাক্ষণ শুধু সম্পত্তির দুশ্চিন্তা আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া চলত। কিন্তু আজ মজুর হিসেবে কাজ করে তারা দুশ্চিন্তামুক্ত, শান্তিতে ঘুমাতে পারে এবং আত্মার কথা ভাবার সময় পায়। অর্থাৎ, সম্পত্তির মোহ ত্যাগ করেই তারা জীবনের প্রকৃত সুখ ও শান্তি খুঁজে পেয়েছে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ

শব্দঅর্থ / প্রতিশব্দশব্দঅর্থ / প্রতিশব্দ
বাস্কিররাশিয়ার একটি নির্দিষ্ট উপজাতিঘোটকীমাদী ঘোড়া
কুমিসঘোড়ার দুধ থেকে তৈরি বিশেষ পানীয়বোলবোলাওপ্রতিপত্তি / খ্যাতি / দাপট
কিরবিজ / কিরঘিজএক যাযাবর উপজাতিমড়কমহামারি / সংক্রামক ব্যাধি
দুর্ভিক্ষখাদ্যাভাব / আকালের অবস্থামোল্লাইসলাম ধর্মের পণ্ডিত বা ধর্মগুরু
বাবাইবয়স্কদের সম্মানজনক সম্বোধনঠাক্কাবয়স্ক মহিলাদের সম্মানজনক সম্বোধন
সর্বহারাযার সবকিছু হারিয়ে গেছেঅতিথি-বৎসলতাঅতিথিদের প্রতি যত্ন বা ভালোবাসা
তল্লাটঅঞ্চল / এলাকাতামাশামশকরা / মজা করা

৩. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) ২০ টি প্রশ্ন

১. 'ইলিয়াস' গল্পটির রচয়িতা কে?
(ক) ম্যাক্সিম গোর্কি (খ) লিও তলস্তয় (গ) আন্তন চেখভ (ঘ) আলেকজান্ডার পুশকিন
উত্তর: (খ) লিও তলস্তয়
২. ইলিয়াস কোন প্রদেশের মানুষ ছিল?
(ক) মস্কো (খ) সাইবেরিয়া (গ) উফা (ঘ) কাজান
উত্তর: (গ) উফা
৩. ইলিয়াস কোন উপজাতির লোক ছিল?
(ক) কিরঘিজ (খ) বাস্কির (গ) তাতার (ঘ) কসাক
উত্তর: (খ) বাস্কির
৪. বিয়ের এক বছর পর বাবার মৃত্যুর সময় ইলিয়াসের কয়টি ঘোড়া ছিল?
(ক) ৭টি (খ) ৫টি (গ) ১০টি (ঘ) ২০টি
উত্তর: (ক) ৭টি
৫. কত বছর পরিশ্রম করে ইলিয়াস প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছিল?
(ক) ২৫ বছর (খ) ৩০ বছর (গ) ৩৫ বছর (ঘ) ৪০ বছর
উত্তর: (গ) ৩৫ বছর
৬. ইলিয়াসের চূড়ান্ত সমৃদ্ধির সময় তার কতগুলো ভেড়া ছিল?
(ক) ৫০০ (খ) ১০০০ (গ) ১২০০ (ঘ) ১৫০০
উত্তর: (গ) ১২০০
৭. ইলিয়াসের বড়ো ছেলে কীভাবে মারা যায়?
(ক) রোগে ভুগে (খ) যুদ্ধে (গ) মারামারিতে পড়ে (ঘ) ঘোড়া থেকে পড়ে
উত্তর: (গ) মারামারিতে পড়ে
৮. ইলিয়াসের সবচাইতে ভালো ঘোড়াগুলো কারা চুরি করেছিল?
(ক) কিরবিজরা (খ) বাস্কিররা (গ) কসাকরা (ঘ) প্রতিবেশীরা
উত্তর: (ক) কিরবিজরা
৯. কত বছর বয়সে ইলিয়াস সম্পূর্ণ সর্বহারা হয়ে পড়ে?
(ক) ৬০ বছর (খ) ৬৫ বছর (গ) ৭০ বছর (ঘ) ৭৫ বছর
উত্তর: (গ) ৭০ বছর
১০. ইলিয়াসের স্ত্রীর নাম কী ছিল?
(ক) আন্না (খ) শাম-শেমাগি (গ) নাতাশা (ঘ) মারিয়া
উত্তর: (খ) শাম-শেমাগি
১১. বুড়ো-বুড়িকে কে আশ্রয় দিয়েছিল?
(ক) ইলিয়াসের ছোট ছেলে (খ) গ্রামের প্রধান (গ) মহম্মদ শা (ঘ) মোল্লা
উত্তর: (গ) মহম্মদ শা
১২. গ্রীষ্মকালে ইলিয়াস মহম্মদ শার কী কাজ করত?
(ক) ঘোড়া চরাত (খ) তরমুজের ক্ষেতে কাজ করত (গ) কাঠ কাটত (ঘ) ঘর পরিষ্কার করত
উত্তর: (খ) তরমুজের ক্ষেতে কাজ করত
১৩. "অর্ধ-শতাব্দী ধরে আমরা সুখ খুঁজেছি..." - অর্ধ-শতাব্দী মানে কত বছর?
(ক) ২৫ বছর (খ) ৫০ বছর (গ) ৭৫ বছর (ঘ) ১০০ বছর
উত্তর: (খ) ৫০ বছর
১৪. মহম্মদ শার বাড়িতে কারা অতিথি হয়ে এসেছিল?
(ক) একদল আত্মীয় ও মোল্লা (খ) গ্রামের লোকজন (গ) কিরঘিজরা (ঘ) সরকারি লোক
উত্তর: (ক) একদল আত্মীয় ও মোল্লা
১৫. অতিথিদের কী মাংস খেতে দেওয়া হয়েছিল?
(ক) গোরুর (খ) মুরগির (গ) ঘোড়ার (ঘ) ভেড়ার
উত্তর: (ঘ) ভেড়ার
১৬. "তার সুনাম ছড়িয়েছিল বহুদূর" - কার সুনামের কথা বলা হয়েছে?
(ক) মহম্মদ শার (খ) মোল্লার (গ) ইলিয়াসের (ঘ) শাম-শেমাগির
উত্তর: (গ) ইলিয়াসের
১৭. ইলিয়াসকে সম্মান জানিয়ে কী বলে ডাকা হয়েছিল?
(ক) হুজুর (খ) বাবাই (গ) মোল্লা (ঘ) ঠাক্কা
উত্তর: (খ) বাবাই
১৮. ঘোড়ার দুধ দিয়ে তৈরি পানীয়কে কী বলে?
(ক) পনির (খ) মাখন (গ) কুমিস (ঘ) শরবত
উত্তর: (গ) কুমিস
১৯. ইলিয়াসের মতে, সুখ-দুঃখের পুরো সত্য কথা কে বলতে পারবে?
(ক) ইলিয়াস নিজে (খ) মহম্মদ শা (গ) মোল্লা (ঘ) তার স্ত্রী
উত্তর: (ঘ) তার স্ত্রী
২০. মোল্লা শাম-শেমাগির কথা শুনে কী মন্তব্য করেছিলেন?
(ক) এগুলো পাগলের প্রলাপ (খ) খুবই জ্ঞানের কথা (গ) এগুলো মিথ্যা (ঘ) হাসির কথা
উত্তর: (খ) খুবই জ্ঞানের কথা

৪. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ) ১৫ টি প্রশ্ন

১. 'ইলিয়াস' গল্পের লেখক ও অনুবাদক কে?
উত্তর: 'ইলিয়াস' গল্পটি লিখেছেন বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়। গল্পটির বাংলায় তরজমা বা অনুবাদ করেছেন মণীন্দ্র দত্ত।
২. বাবার মৃত্যুর সময় ইলিয়াসের সম্পত্তির পরিমাণ কতটা ছিল?
উত্তর: বাবার মৃত্যুর সময় ইলিয়াস খুব ধনীও ছিল না, আবার দরিদ্রও ছিল না। তার সম্পত্তির পরিমাণ ছিল— সাতটা ঘোটকী, দুটো গোরু আর কুড়িটা ভেড়া।
৩. ইলিয়াস কীভাবে প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছিল?
উত্তর: ইলিয়াস এবং তার স্ত্রী সকলের আগে ঘুম থেকে উঠত আর সকলের পরে ঘুমাত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের এই ৩৫ বছরের একটানা কঠোর পরিশ্রম ও সুব্যবস্থার ফলেই তারা প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছিল।
৪. ইলিয়াসের চরম উন্নতির সময় তার কী কী বিষয়-সম্পত্তি ছিল?
উত্তর: পঁয়ত্রিশ বছর পরিশ্রমের পর ইলিয়াসের দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ এবং বারোশো ভেড়া হয়েছিল। এছাড়াও তার অনেক ভাড়াটে মজুর ও মজুরানি ছিল।
৫. ইলিয়াস অতিথিদের কীভাবে আপ্যায়ন করত?
উত্তর: দূরদূরান্ত থেকে আসা অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে ইলিয়াস তাদের কুমিস, চা, শরবত এবং মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করত। অতিথি এলে সে ভেড়া এমনকি সংখ্যায় বেশি হলে ঘোটকীও মারত।
৬. ইলিয়াসের ছোটো ছেলেকে কেন বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল?
উত্তর: ইলিয়াসের ছোটো ছেলে এক ঝগড়াটে বউ বিয়ে করার পর পিতা-মাতার অবাধ্য হতে শুরু করে এবং তাদের আদেশ অমান্য করতে থাকে। এই কারণেই তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
৭. ইলিয়াসের সম্পদ কীভাবে নষ্ট হতে শুরু করে?
উত্তর: প্রথমে ভেড়ার পালে মড়ক লেগে অনেক ভেড়া মারা যায়। পরের বছর খড়া বা দুর্ভিক্ষের কারণে শীতে অনেক গোরু-মোষ মারা যায় এবং সবশেষে কিরবিজরা তার ভালো ঘোড়াগুলো চুরি করে নিলে তার সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়।
৮. সর্বহারা হওয়ার পর ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর সম্বলের মধ্যে কী অবশিষ্ট ছিল?
উত্তর: সর্বহারা হয়ে বাড়ি ছাড়ার সময় তাদের সম্বলের মধ্যে ছিল কেবল কাঁধে একটা বোঁচকা, যার মধ্যে ছিল একটি লোমের তৈরি কোট, টুপি, জুতো আর বুট।
৯. মহম্মদ শা কে ছিলেন? তিনি ইলিয়াসকে কী সাহায্য করেছিলেন?
উত্তর: মহম্মদ শা ছিলেন ইলিয়াসের এক ভালো প্রতিবেশী, যিনি খুব ধনীও ছিলেন না আবার গরিবও ছিলেন না। ইলিয়াসের অতিথিবৎসলতার কথা মনে রেখে তিনি বুড়ো-বুড়িকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে তাদের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করেছিলেন।
১০. মহম্মদ শার বাড়িতে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী কী কাজ করত?
উত্তর: গ্রীষ্মকালে ইলিয়াস মহম্মদ শার তরমুজের খেতে কাজ করত এবং শীতকালে গোরু-ঘোড়াদের খাওয়াতো। তার স্ত্রী শাম-শেমাগি ঘোটকী দুইত এবং কুমিস তৈরি করত।
১১. "ভাগ্য যেন চাকার মতো ঘোরে..." - উক্তিটি কার এবং কেন করা হয়েছে?
উত্তর: উক্তিটি মহম্মদ শার বাড়িতে আসা এক অতিথির। একসময়ের প্রবল ধনী ইলিয়াসের আজকের সর্বহারা হয়ে মজুর খাটার চরম দুরবস্থার কথা শুনে আক্ষেপ করে অতিথি এই কথাটি বলেছিলেন।
১২. "আপনারা হয়তো আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। বরং আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন।" - ইলিয়াস কেন এ কথা বলেছিল?
উত্তর: ইলিয়াস মনে করত, মেয়েরা মনের কথা অকপটে বলতে পারে। তাদের মনে যা, মুখেও তাই থাকে। তাই সুখ-দুঃখের পুরো সত্যটি তার স্ত্রীর মুখ থেকে শুনলেই অতিথিরা তা বিশ্বাস করবেন ভেবে সে এই কথা বলেছিল।
১৩. ধনী থাকা অবস্থায় ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর কীসের দুশ্চিন্তা ছিল?
উত্তর: ধনী অবস্থায় তাদের দুশ্চিন্তা ছিল অতিথিদের আপ্যায়ন নিয়ে, মজুরদের কাজে ফাঁকি দেওয়া নিয়ে, নেকড়ে কর্তৃক বাছুর নিয়ে যাওয়ার ভয় এবং চোর কর্তৃক ঘোড়া চুরির ভয় নিয়ে।
১৪. সর্বহারা হয়ে মহম্মদ শার বাড়িতে মজুর খেটে তারা কেন প্রকৃত সুখী হয়েছিল?
উত্তর: মজুর হিসেবে কাজ করায় তাদের কোনো সম্পত্তির হারানোর দুশ্চিন্তা বা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ছিল না। তারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারত এবং প্রভুর কাজ করে পেট ভরে খেতে পেত। সবচেয়ে বড়ো কথা, তারা আত্মার কথা ভাবার এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার সময় পেয়েছিল।
১৫. শাম-শেমাগির কথা শুনে মোল্লা সাহেব কী বলেছিলেন?
উত্তর: শাম-শেমাগির মুখে জীবনের পরম সত্যের কথা শুনে মোল্লা সাহেব বলেছিলেন, এটি খুবই জ্ঞানের কথা। সে যা বলেছে তার সবটাই সত্য এবং পবিত্র গ্রন্থেও এমনটাই লেখা আছে।

৫. রচনাধর্মী প্রশ্ন (Broad Questions) ০৫ টি প্রশ্ন

১. ইলিয়াস কীভাবে চরম দারিদ্র্য থেকে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিল এবং আবার কীভাবে সে সব কিছু হারিয়ে সর্বহারা হয়ে পড়ল?

উত্তর: বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় রচিত 'ইলিয়াস' গল্পে ইলিয়াসের জীবনের উত্থান-পতনের এক করুণ কাহিনি ফুটে উঠেছে।

সম্পত্তির উত্থান: বাবার মৃত্যুর সময় ইলিয়াসের সম্পত্তি ছিল মাত্র সাতটা ঘোটকী, দুটো গোরু আর কুড়িটা ভেড়া। কিন্তু ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগি ছিল চরম পরিশ্রমী। তারা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করত। তাদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুব্যবস্থার ফলেই পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে তারা বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়। তাদের ঘোড়া, গোরু-মোষ এবং ভেড়ার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তারা ওই তল্লাটের সবচেয়ে বিত্তবান ব্যক্তিতে পরিণত হয়।

সম্পত্তির পতন: ইলিয়াসের ছেলেরা বড়োলোক হওয়ার পর আয়েশি হয়ে যায় এবং অবাধ্য হওয়ার কারণে ছোটো ছেলেকে ইলিয়াস বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। ছেলেকে বাড়ি ও কিছু গবাদি পশু দেওয়ায় ইলিয়াসের সম্পত্তিতে টান পড়ে। এরপর দুর্ভাগ্যের শুরু হয়—প্রথমে মড়কে ভেড়ার পাল উজাড় হয়, তারপর দুর্ভিক্ষের কারণে শীতকালে ঘাস-খড়ের অভাবে বহু গোরু-মোষ মারা যায়। সবশেষে কিরবিজ উপজাতির দস্যুরা তার সবচেয়ে ভালো ঘোড়াগুলো চুরি করে নিয়ে যায়। বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক অক্ষমতার কারণে সে আর ক্ষতি সামলাতে পারেনি। শেষে বাধ্য হয়ে সর্বস্ব বিক্রি করে ৭০ বছর বয়সে সে একেবারে সর্বহারা হয়ে অন্যের বাড়িতে মজুর খাটতে বাধ্য হয়।

২. "অর্ধ-শতাব্দী ধরে আমরা সুখ খুঁজেছি; ততদিন ধনী ছিলাম, কখনও সুখ পাইনি।" - উক্তিটির বক্তা কে? ধনী থাকা অবস্থায় তারা কেন সুখ পায়নি?

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হলেন লিও তলস্তয়ের 'ইলিয়াস' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইলিয়াসের বৃদ্ধা স্ত্রী শাম-শেমাগি। মহম্মদ শার বাড়িতে আসা অতিথিদের সামনে তিনি এই কথাগুলি বলেছিলেন।

সুখ না পাওয়ার কারণ: দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়ে সেই তল্লাটের শ্রেষ্ঠ ধনী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল। কিন্তু বিপুল সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনে দুশ্চিন্তাও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। শাম-শেমাগির জবানিতে জানা যায়, ধনী থাকার সময় তাদের এক মুহূর্তের জন্যও মানসিক শান্তি ছিল না। অতিথিদের ঠিকমতো আপ্যায়ন করা হলো কি না, মজুররা কাজে ফাঁকি দিচ্ছে কি না, নেকড়ে এসে ঘোড়ার বাচ্চা বা বাছুর নিয়ে গেল কি না, কিংবা চোর এসে সম্পদ চুরি করল কি না—এইসব দুশ্চিন্তায় তাদের রাতে ঘুম হতো না। তাছাড়া কাজের মতবিরোধ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও প্রায়ই ঝগড়া হতো। সারাক্ষণ শুধু বৈষয়িক সম্পদের পাহারাদারি করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে দুটো ভালো কথা বলার বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার মতো কোনো সময় তাদের ছিল না। তাই অফুরন্ত প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও তারা কোনোদিন প্রকৃত সুখ পায়নি।

৩. "আজ এমন সুখের সন্ধান আমরা পেয়েছি যে আর কিছুই আমরা চাই না।" - কোন সুখের কথা বলা হয়েছে? সর্বহারা হয়েও তারা কীভাবে সেই সুখ লাভ করল?

উত্তর: সুখের পরিচয়: এখানে মোহমুক্ত, দুশ্চিন্তাহীন এবং ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত এক পরম আত্মিক সুখের কথা বলা হয়েছে, যা ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে উপলব্ধি করেছিল।

সুখ লাভের কারণ: সত্তর বছর বয়সে ইলিয়াস তার সারাজীবনের উপার্জিত সমস্ত সম্পদ হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে এবং প্রতিবেশী মহম্মদ শার বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মজুরের কাজে নিযুক্ত হয়। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি চরম দুর্গতির অবস্থা হলেও, এই অবস্থাই তাদের জীবনে প্রকৃত শান্তি বয়ে আনে। কারণ, এখন তাদের কোনো সম্পদ হারানোর ভয় নেই, চোর-ডাকাত বা নেকড়ের দুশ্চিন্তা নেই এবং মজুরদের তদারকি করার চাপ নেই। তারা মালিকের দেওয়া কাজটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে করে এবং নিশ্চিন্তে পেট ভরে খেতে ও ঘুমাতে পারে। সম্পদের মোহ দূর হওয়ায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর কোনো ঝগড়া হয় না, বরং তারা নিজেদের আত্মার কথা ভাবার এবং ঈশ্বরের কাছে মন খুলে প্রার্থনা করার অফুরন্ত সময় পেয়েছে। জাগতিক সম্পদের বিনাশই তাদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির দরজা খুলে দিয়েছিল বলেই তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও পরম সুখ লাভ করেছিল।

৪. 'ইলিয়াস' গল্পে মহম্মদ শা চরিত্রের পরিচয় দাও। গল্পে তার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: লিও তলস্তয় রচিত 'ইলিয়াস' গল্পে মহম্মদ শা হলেন একজন সহৃদয়, দয়ালু এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রতিবেশী।

চরিত্রের পরিচয় ও ভূমিকা: মহম্মদ শা খুব বিত্তবান ছিলেন না, আবার দরিদ্রও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সচ্ছল ও ভালো মনের মানুষ। ইলিয়াস যখন তার সমস্ত সম্পদ হারিয়ে বৃদ্ধ বয়সে পথে এসে দাঁড়ায়, তখন তার বিতাড়িত সন্তান বা পুরোনো বন্ধুরা কেউই তাকে সাহায্য করতে আসেনি। কিন্তু মহম্মদ শা ইলিয়াসের অতীত অতিথিবৎসলতা ও সুনামের কথা ভুলে যাননি। ইলিয়াসের চরম দুর্দশা দেখে তাঁর হৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও সর্বহারা ইলিয়াস এবং তার স্ত্রী শাম-শেমাগিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন।
তাঁদের বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী তরমুজের খেতে কাজ করা, পশুদের খাওয়ানো বা ঘোটকী দোয়ানোর মতো কাজ দিয়ে তিনি তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর বাড়িতে অতিথিরা এলে তিনি সসম্মানে ইলিয়াসকে তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। গল্পটিতে মহম্মদ শা চরিত্রটি না থাকলে ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর চরম পরিণতির পর তাদের সত্য উপলব্ধি বা আত্মোপলব্ধির জায়গাটি তৈরি হতো না। তাই গল্পের পটভূমি পরিবর্তনে মহম্মদ শার মানবিক ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

৫. "এটাই মানুষের জীবন... ঈশ্বর আমাদের কাছে সত্যকে উন্মুক্ত করেছেন।" - মন্তব্যটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: উৎস: উদ্ধৃত উক্তিটি লিও তলস্তয়ের 'ইলিয়াস' গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। কথাগুলি বলেছেন স্বয়ং ইলিয়াস, মহম্মদ শার অতিথিদের উদ্দেশ্যে।

তাৎপর্য: মহম্মদ শার বাড়িতে আমন্ত্রিত অতিথিরা যখন শুনতে পান যে একসময়ের ধনকুবের ইলিয়াস ও তার স্ত্রী বর্তমানে চরম দরিদ্র হয়েও আগের চেয়ে বেশি সুখী, তখন তারা বিস্মিত হয়ে হেসে ওঠেন। অতিথিদের এই হাসি দেখে ইলিয়াস গাম্ভীর্যের সঙ্গে আলোচ্য উক্তিটি করেন।
সাধারণ মানুষের ধারণা, টাকা-পয়সা ও ধনসম্পদই জীবনের একমাত্র সুখের চাবিকাঠি। ইলিয়াসও জীবনের পঞ্চাশটা বছর এই অবুঝ ধারণা নিয়েই সম্পদের পিছনে ছুটেছিল। কিন্তু যখন সে সব হারিয়ে নিঃস্ব হলো, তখন সে বুঝতে পারল সম্পদ মানুষকে কেবল দুশ্চিন্তা, ভয়, লোভ আর পারিবারিক কলহ ছাড়া কিছুই দেয় না। অন্যদিকে, দারিদ্র্যের মধ্যে কোনো হারানোর ভয় নেই, সেখানে থাকে ঈশ্বরভক্তি ও মানসিক প্রশান্তি। অর্থাৎ, বৈষয়িক সম্পদ প্রকৃত সুখ নয়, বরং আত্মার শান্তি ও ঈশ্বরে সমর্পণই হলো জীবনের প্রকৃত সত্য। ঈশ্বর তাদের সম্পদ কেড়ে নিয়ে দারিদ্র্যের ছদ্মবেশে তাদের সামনে জীবনের এই চরম সত্য ও প্রকৃত সুখকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন—এটাই উক্তিটির মূল তাৎপর্য।

৬. ব্যাকরণগত প্রশ্ন (Grammar)

সন্ধি বিচ্ছেদ

  • দূরান্তর = দূর + অন্তর
  • শতাব্দী = শত + অব্দ + ঈ
  • অর্ধেক = অর্ধ + এক
  • দুশ্চিন্তা = দুঃ + চিন্তা
  • উন্মুক্ত = উৎ + মুক্ত

সমাস নির্ণয়

  • গৃহস্বামী: গৃহের স্বামী (ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস)
  • অতিথিবৎসল: অতিথির প্রতি বৎসল (সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস)
  • সুখশান্তি: সুখ ও শান্তি (দ্বন্দ্ব সমাস)
  • সর্বহারা: সর্ব (সবকিছু) হারিয়েছে যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)
  • অর্ধশতাব্দী: অর্ধ শতাব্দীর সমাহার (দ্বিগু সমাস)

পদ পরিবর্তন

  • সম্পত্তি ➜ সম্পন্ন
  • দরিদ্র ➜ দারিদ্র্য
  • অভাব ➜ অভাবী
  • দিন ➜ দৈনিক
  • পবিত্র ➜ পবিত্রতা

ইলিয়াস গল্প সম্পর্কিত সাধারণ প্রশ্ন (FAQs)

গল্পটির রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়। গল্পটি বাংলায় তর্জমা করেছেন মণীন্দ্র দত্ত।

ইলিয়াস যখন তার সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি হারিয়ে চরম দরিদ্র অবস্থায় মহম্মদ শার বাড়িতে মজুরের কাজ করত, তখনই সে সম্পত্তির মোহ থেকে মুক্ত হয়ে জীবনে প্রকৃত সুখ খুঁজে পেয়েছিল।

ভেড়ার পালে মড়ক, শীতে খাদ্যের অভাবে গোরু-মোষের মৃত্যু এবং কিরঘিজ দস্যুদের ঘোড়া চুরির কারণে ইলিয়াসের প্রচুর সম্পত্তি নষ্ট হয়ে যায়।