Chapter 3: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ
সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাখ্যা | 28 MCQ | 22 SAQ | 8 Broad Questions
বায়ুচাপ উচ্চচাপ নিম্নচাপ সমচাপ রেখা বায়ুপ্রবাহ ব্যারোমিটার ঘূর্ণিঝড় উচ্চতা ও চাপ
📊
বায়ুচাপ
সমুদ্রপৃষ্ঠে ১০১৩.২৫ mb | মাপা হয় ব্যারোমিটারে
⬆️
উচ্চচাপ (H)
শীতল ও ভারী বায়ু | পরিষ্কার আবহাওয়া
⬇️
নিম্নচাপ (L)
উষ্ণ ও হালকা বায়ু | বৃষ্টি-ঝড়
🌪️
ঘূর্ণিঝড়
প্রবল নিম্নচাপ | সাইক্লোন-টাইফুন
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য - একনজরে
| বলয়ের নাম | অবস্থান | ধরন | কারণ |
| নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় | ০°-৫° উ/দ | নিম্নচাপ | তাপ → বায়ুর উৎক্ষেপণ |
| ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় | ৩০° উ ও ৩০° দ | উচ্চচাপ | উপর থেকে নিমজ্জন |
| উপমেরু নিম্নচাপ বলয় | ৬০° উ ও ৬০° দ | নিম্নচাপ | উষ্ণ-শীতল বায়ুর মিলন |
| মেরু উচ্চচাপ বলয় | ৯০° উ ও ৯০° দ | উচ্চচাপ | অত্যন্ত শীতল → নিমজ্জন |
MCQ - বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (ব্যাখ্যাসহ)
28 টি
1. বায়ুর চাপ মাপার যন্ত্রের নাম কী?
ক) ক) থার্মোমিটার
খ) খ) ব্যারোমিটার
গ) গ) অ্যানিমোমিটার
ঘ) ঘ) রেইন গেজ
ব্যাখ্যা: বায়ুর চাপ মাপার যন্ত্র হল ব্যারোমিটার (Barometer)। ১৬৪৩ সালে বিজ্ঞানী টরিসেলির আবিষ্কৃত সূত্র অনুসারে পারদ ব্যারোমিটার তৈরি হয়। বায়ুর চাপ কমলে পারদস্তম্ভ নেমে যায়, চাপ বাড়লে পারদস্তম্ভের উচ্চতা বাড়ে।
2. সমুদ্র সমতলে স্বাভাবিক বায়ুচাপ কত মিলিবার?
ক) ক) ৭৬০ মিলিবার
খ) খ) ১০১৩.২৫ মিলিবার
গ) গ) ৯৮০ মিলিবার
ঘ) ঘ) ১০৫০ মিলিবার
ব্যাখ্যা: সমুদ্রপৃষ্ঠে স্বাভাবিক বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার (mb) বা ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভের চাপের সমান। পৃথিবীতে বায়ুচাপ সাধারণত ৯৮০ mb থেকে ১০৫০ mb পর্যন্ত দেখা যায়। ১ মিলিবার = ০.০২৯৫৩ ইঞ্চি পারদস্তম্ভের চাপ।
3. উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে বায়ুর চাপের কী পরিবর্তন হয়?
ক) ক) বায়ুচাপ বাড়ে
খ) খ) বায়ুচাপ কমে
গ) গ) বায়ুচাপ একই থাকে
ঘ) ঘ) কখনো বাড়ে কখনো কমে
ব্যাখ্যা: সমুদ্র সমতলে বায়ুচাপ সবচেয়ে বেশি হয়। উপরের দিকে উঠলে বায়ুর ঘনত্ব কমে যায় এবং বায়ুর চাপও কমতে থাকে। প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে ১ সেমি পারদস্তম্ভের সমান বায়ুচাপ কমে। মাউন্ট এভারেস্টে (৮৮৪৮ মি) বায়ুচাপ মাত্র ৩০০ মিলিবার।
4. প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতা বাড়লে বায়ুচাপ কত কমে?
ক) ক) ১ সেমি পারদস্তম্ভ
খ) খ) ২ সেমি পারদস্তম্ভ
গ) গ) ৫ মিলিবার
ঘ) ঘ) ১০ মিলিবার
ব্যাখ্যা: ভূমির উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে বায়ুর ঘনত্ব কমে এবং বায়ুর চাপও কমে। প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে ১ সেমি পারদস্তম্ভের সমান বায়ুচাপ কমতে থাকে। এই কারণে পাহাড়ি অঞ্চলে বায়ুচাপ কম হয়।
5. বায়ু উত্তপ্ত হলে কী ঘটে?
ক) ক) বায়ু সংকুচিত হয় ও চাপ বাড়ে
খ) খ) বায়ু প্রসারিত হয় ও চাপ কমে
গ) গ) বায়ুর ঘনত্ব বাড়ে
ঘ) ঘ) বায়ু নীচে নেমে আসে
ব্যাখ্যা: বায়ু উত্তপ্ত হলে বায়ুর অণুগুলো গতিশীল হয়ে পড়ে এবং পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়। ফলে বায়ু প্রসারিত হয়, হালকা হয় ও উপরে উঠে যায়। বায়ুর ঘনত্ব কমে যায় এবং নির্দিষ্ট আয়তনে বায়ুর অণুর সংখ্যা কমে যায় — তাই বায়ুর চাপ কমে।
6. বায়ু শীতল হলে কী ঘটে?
ক) ক) বায়ু প্রসারিত হয়
খ) খ) বায়ু সংকুচিত হয় ও চাপ বাড়ে
গ) গ) বায়ু উপরে উঠে যায়
ঘ) ঘ) বায়ুর চাপ কমে
ব্যাখ্যা: বায়ু শীতল হলে বায়ুর অণুগুলো পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে, বায়ু সংকুচিত হয় এবং ঘনত্ব বেড়ে যায়। ফলে বায়ু ভারী হয়ে নীচের দিকে নেমে আসে। নির্দিষ্ট আয়তনে বায়ুর অণুর সংখ্যা বেড়ে যায় — তাই বায়ুর চাপ বাড়ে।
7. উচ্চচাপ অঞ্চল কী দ্বারা চিহ্নিত করা হয়?
ক) ক) 'L' চিহ্ন
খ) খ) 'H' চিহ্ন
গ) গ) 'N' চিহ্ন
ঘ) ঘ) 'P' চিহ্ন
ব্যাখ্যা: আবহাওয়া মানচিত্রে যে সব স্থানের বায়ুর চাপ আশেপাশের চেয়ে বেশি, তাকে উচ্চচাপ অঞ্চল (High Pressure Area) বা সংক্ষেপে 'H' দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। আর যেখানে বায়ুচাপ কম, তাকে নিম্নচাপ অঞ্চল বা 'L' দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।
8. নিরক্ষীয় অঞ্চলে সাধারণত কী ধরনের বায়ুচাপ দেখা যায়?
ক) ক) উচ্চচাপ
খ) খ) নিম্নচাপ
গ) গ) স্বাভাবিক চাপ
ঘ) ঘ) চাপ থাকে না
ব্যাখ্যা: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারা বছর সূর্যের তাপ বেশি পড়ে, তাই বায়ু উত্তপ্ত ও প্রসারিত হয় এবং উপরে উঠে যায়। ফলে ভূপৃষ্ঠের কাছে বায়ুর ঘনত্ব কমে এবং নিম্নচাপ (Low Pressure) অঞ্চল সৃষ্টি হয়। একে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় বলে।
9. মেরু অঞ্চলে সাধারণত কী ধরনের বায়ুচাপ দেখা যায়?
ক) ক) নিম্নচাপ
খ) খ) উচ্চচাপ
গ) গ) স্বাভাবিক চাপ
ঘ) ঘ) পরিবর্তনশীল চাপ
ব্যাখ্যা: মেরু অঞ্চল অত্যন্ত শীতল। শীতল বায়ু সংকুচিত ও ভারী হয় এবং নীচের দিকে নেমে আসে। ফলে ভূপৃষ্ঠের কাছে বায়ু বেশি ঘন হয় এবং উচ্চচাপ (High Pressure) অঞ্চল সৃষ্টি হয়। শীতল মেরু অঞ্চলে তাই বায়ুর চাপ বেশি।
10. বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ কী?
ক) ক) তাপমাত্রার সমতা
খ) খ) বায়ুচাপের পার্থক্য
গ) গ) বৃষ্টিপাত
ঘ) ঘ) ভূমির উচ্চতা
ব্যাখ্যা: বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ হল বায়ুচাপের পার্থক্য (Pressure Gradient)। বায়ু সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয় — যেমন জল উঁচু থেকে নিচু জায়গায় গড়িয়ে যায়। চাপের পার্থক্য যত বেশি, বায়ুর গতিবেগ তত বেশি হয়।
11. বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে বায়ুচাপের কী পরিবর্তন হয়?
ক) ক) বায়ুচাপ বাড়ে
খ) খ) বায়ুচাপ কমে
গ) গ) কোন পরিবর্তন হয় না
ঘ) ঘ) প্রথমে বাড়ে পরে কমে
ব্যাখ্যা: জলীয়বাষ্পযুক্ত বায়ু, জলীয়বাষ্পহীন বায়ুর থেকে হালকা হয়। তাই বায়ুতে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি হলে বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং বায়ুর চাপ কমে যায়। ফলে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় এবং আবহাওয়া অশান্ত হয়ে ঝড়, বৃষ্টি হতে পারে।
12. সমচাপ রেখা (Isobar) কাকে বলে?
ক) ক) সমান তাপমাত্রার রেখা
খ) খ) সমান বায়ুচাপের রেখা
গ) গ) সমান উচ্চতার রেখা
ঘ) ঘ) সমান বৃষ্টিপাতের রেখা
ব্যাখ্যা: আবহাওয়া মানচিত্রে নির্দিষ্ট সময়ে একই পরিমাণ বায়ুচাপযুক্ত অঞ্চলগুলোকে যে কল্পিত রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয়, তাকে সমচাপ রেখা বা Isobar বলে। এই রেখাগুলো আঁকাবাঁকা হয় এবং পরস্পরকে স্পর্শ বা অতিক্রম করতে পারে না।
13. সমচাপ রেখাগুলো পরস্পরের খুব কাছাকাছি থাকলে কী বোঝায়?
ক) ক) বায়ুচাপের পার্থক্য কম
খ) খ) বায়ুচাপের পার্থক্য বেশি
গ) গ) বায়ু শান্ত আছে
ঘ) ঘ) তাপমাত্রা সমান
ব্যাখ্যা: সমচাপ রেখাগুলো যেখানে পরস্পরের খুব কাছাকাছি চলে আসে, সেই অঞ্চলে বায়ুর চাপের পার্থক্য (Pressure Gradient) বেশি হয়। চাপের পার্থক্য বেশি হলে বাতাসও প্রবল বেগে ছুটে আসে — ফলে সেখানে প্রবল বায়ুপ্রবাহ বা ঝড় হতে পারে।
14. নিম্নচাপ অঞ্চলে আবহাওয়া সাধারণত কেমন থাকে?
ক) ক) পরিষ্কার ও শান্ত
খ) খ) মেঘলা, বৃষ্টি ও অশান্ত
গ) গ) গরম ও শুষ্ক
ঘ) ঘ) ঠান্ডা ও কুয়াশাচ্ছন্ন
ব্যাখ্যা: নিম্নচাপ অঞ্চলে বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। উপরের স্তরে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এলে বায়ুর মধ্যে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ সৃষ্টি করে এবং বৃষ্টিপাত, ঝড়, অশান্ত আবহাওয়া সৃষ্টি হয়। উষ্ণ নিরক্ষীয় অঞ্চলে তাই নিম্নচাপ ও বৃষ্টিপাত বেশি।
15. উচ্চচাপ অঞ্চলে আবহাওয়া সাধারণত কেমন থাকে?
ক) ক) মেঘলা ও বৃষ্টি
খ) খ) ঝড়ো হাওয়া
গ) গ) পরিষ্কার ও শান্ত
ঘ) ঘ) তুষারপাত
ব্যাখ্যা: উচ্চচাপ অঞ্চলে শীতল ও ভারী বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ খুবই কম থাকে। এই কারণে সাধারণত মেঘ, বৃষ্টি কিছুই হয় না — পরিষ্কার ও শান্ত আবহাওয়া থাকে। শীতল মেরু অঞ্চল ও শীতকালে স্থলভাগে উচ্চচাপ দেখা যায়।
16. পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য নিরক্ষীয় অঞ্চলের বাতাস কোন দিকে ছিটকে যায়?
ক) ক) মেরুর দিকে
খ) খ) দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে
গ) গ) পূর্ব দিকে
ঘ) ঘ) পশ্চিম দিকে
ব্যাখ্যা: পৃথিবীর আবর্তন বেগ নিরক্ষরেখার কাছে সবচেয়ে বেশি। এই কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বাতাস দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলের (৩০° উ/দ) দিকে ছিটকে যায়। ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চলে নিম্নচাপ এবং দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়।
17. উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে চাল-ডাল সিদ্ধ করতে অসুবিধা হয় কেন?
ক) ক) অক্সিজেন কম থাকায়
খ) খ) বায়ুচাপ কম থাকায় জলের স্ফুটনাঙ্ক কমে যায়
গ) গ) তাপমাত্রা কম থাকায়
ঘ) ঘ) বাতাস বেশি থাকায়
ব্যাখ্যা: বায়ুচাপ কমলে জলের স্ফুটনাঙ্ক (ফুটন্ত তাপমাত্রা) ১০০°C-এর কমে নেমে যায়। উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে (যেমন গোমুখ, ৩৯০০ মি) বায়ুচাপ অনেক কম, তাই জল কম তাপমাত্রায় ফুটতে শুরু করে — খাদ্যবস্তু সঠিকভাবে সিদ্ধ হয় না।
18. পর্বতারোহীরা সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যান কেন?
ক) ক) রান্নার জন্য
খ) খ) উচ্চতায় অক্সিজেন কম থাকায় শ্বাস নিতে কষ্ট হয়
গ) গ) আগুন জ্বালানোর জন্য
ঘ) ঘ) পানীয় হিসেবে
ব্যাখ্যা: উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে বাতাসের পরিমাণ কমে যায়, ফলে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণও এতটাই কমে যায় যে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এ কারণেই পর্বতারোহীরা (মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে) সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যান।
19. প্রবল বেগে ছুটে আসা বাতাস ধ্বংসাত্মক রূপ নিলে তাকে কী বলা হয়?
ক) ক) সমুদ্র স্রোত
খ) খ) সাইক্লোন, টাইফুন, হ্যারিকেন
গ) গ) জেট স্ট্রিম
ঘ) ঘ) পশ্চিমা বায়ু
ব্যাখ্যা: উচ্চচাপ ও নিম্নচাপের মধ্যে চাপের পার্থক্য খুব বেশি হলে বায়ু প্রবল বেগে ছুটে আসে। এই প্রবল বায়ু ধ্বংসাত্মক রূপ নিলে তাকে সাইক্লোন (ভারত মহাসাগর), টাইফুন (প্রশান্ত মহাসাগর), হ্যারিকেন (আটলান্টিক) বা টর্নেডো (স্থলভাগ) বলা হয়।
20. ব্যারোমিটারে স্বাভাবিক অবস্থায় পারদস্তম্ভের উচ্চতা কত থাকে?
ক) ক) ১০০ সেমি
খ) খ) ৭৬ সেমি
গ) গ) ৫০ সেমি
ঘ) ঘ) ৩০ সেমি
ব্যাখ্যা: পারদ ব্যারোমিটারে একটি একমুখ বন্ধ কাঁচের নল পারদ ভর্তি করে উপুড় করে বসানো থাকে। স্বাভাবিক বায়ুচাপে কাঁচ নলের মধ্যে প্রায় ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভ থাকে। বায়ুচাপ কমলে পারদ নেমে যায়, চাপ বাড়লে পারদস্তম্ভের উচ্চতা বাড়ে।
21. বায়ু সবসময় কোন দিকে প্রবাহিত হয়?
ক) ক) নিম্নচাপ থেকে উচ্চচাপের দিকে
খ) খ) উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে
গ) গ) পূর্ব থেকে পশ্চিমে
ঘ) ঘ) উত্তর থেকে দক্ষিণে
ব্যাখ্যা: বায়ু সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। যেমন জল উঁচু জায়গা থেকে নিচু জায়গায় গড়িয়ে যায়, তেমনি বায়ুও চাপের পার্থক্যের কারণে উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে ছুটে যায়। চাপের পার্থক্য যত বেশি, বাতাস তত জোরে বয়।
22. বায়ুচাপ মাপার একক কী?
ক) ক) ডিগ্রি সেলসিয়াস
খ) খ) মিলিবার
গ) গ) মিলিমিটার
ঘ) ঘ) কিলোমিটার
ব্যাখ্যা: বায়ুর চাপ মাপা হয় মিলিবার (Millibar বা mb) এককে। ১ মিলিবার = ০.০২৯৫৩ ইঞ্চি পারদস্তম্ভের চাপের সমান। সমুদ্রপৃষ্ঠে স্বাভাবিক বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার। আবহাওয়া মানচিত্রে সমচাপ রেখাগুলো মিলিবার এককেই দেখানো হয়।
23. পৃথিবীর কোন অঞ্চলে আবর্তন বেগ সবচেয়ে বেশি?
ক) ক) মেরু অঞ্চলে
খ) খ) ক্রান্তীয় অঞ্চলে
গ) গ) নিরক্ষীয় অঞ্চলে
ঘ) ঘ) সুমেরু বৃত্তে
ব্যাখ্যা: পৃথিবীর আবর্তন বেগ নিরক্ষরেখার কাছে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১৬৭০ কিমি/ঘণ্টা) এবং মেরুর দিকে ক্রমশ কমতে থাকে। এই অধিক বেগের কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বাতাস ছিটকে দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে যায় এবং নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টি হয়।
24. বায়ুর চাপের তারতম্যের ফলে কী সৃষ্টি হয়?
ক) ক) ভূমিকম্প
খ) খ) বায়ুপ্রবাহ বা বাতাস
গ) গ) সুনামি
ঘ) ঘ) অগ্নুৎপাত
ব্যাখ্যা: বায়ুচাপের পার্থক্যই বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ। উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে বাতাস প্রবাহিত হয়। বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমেই পৃথিবীতে উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ অঞ্চলের মধ্যে বায়ুচাপের সমতা বা ভারসাম্য বজায় থাকে।
25. গরম জলের বোতলে ঠান্ডা পড়লে বোতলটি তুবড়ে যায় কেন?
ক) ক) বাইরের বাতাসের চাপে
খ) খ) ভিতরের জল জমে যাওয়ায়
গ) গ) প্লাস্টিক গলে যাওয়ায়
ঘ) ঘ) তাপমাত্রা কমে যাওয়ায়
ব্যাখ্যা: গরম জল ভরা বোতলের ভিতরের বাতাস গরম হয়ে কিছুটা বেরিয়ে যায়। ঠান্ডা হলে ভিতরের বাতাস সংকুচিত হয়ে শূন্যস্থান তৈরি করে। তখন বাইরের বাতাসের প্রবল চাপে বোতলটি তুবড়ে যায় — এটি বায়ুর চাপের প্রমাণ।
26. জলীয়বাষ্পের অভাব থাকলে কী ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়?
ক) ক) নিম্নচাপ
খ) খ) উচ্চচাপ
গ) গ) মাঝারি চাপ
ঘ) ঘ) চাপ থাকে না
ব্যাখ্যা: জলীয়বাষ্প বায়ুকে হালকা করে এবং নিম্নচাপ সৃষ্টি করে। জলীয়বাষ্পের অভাব থাকলে বাতাস ভারী হয় এবং উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়। উচ্চচাপ অঞ্চলে সাধারণত মেঘ-বৃষ্টি হয় না, আবহাওয়া পরিষ্কার ও শান্ত থাকে।
27. সমচাপ রেখাগুলো পরস্পরকে স্পর্শ করতে পারে কি?
ক) ক) পারে
খ) খ) পারে না
গ) গ) কেবল মেরুতে পারে
ঘ) ঘ) কেবল নিরক্ষরেখায় পারে
ব্যাখ্যা: সমচাপ রেখাগুলো (Isobars) পরস্পরকে কখনো স্পর্শ বা অতিক্রম করতে পারে না। কারণ একই বিন্দুতে দুটি ভিন্ন বায়ুচাপ থাকতে পারে না। এগুলো সমান্তরাল বা আঁকাবাঁকা রেখার মতো থাকে।
28. ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড়কে কী বলা হয়?
ক) ক) হ্যারিকেন
খ) খ) টাইফুন
গ) গ) সাইক্লোন
ঘ) ঘ) টর্নেডো
ব্যাখ্যা: বিভিন্ন মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের নাম ভিন্ন: ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে 'সাইক্লোন' (Cyclone), প্রশান্ত মহাসাগরে 'টাইফুন' (Typhoon), আটলান্টিক মহাসাগরে 'হ্যারিকেন' (Hurricane), স্থলভাগে 'টর্নেডো' (Tornado)।
SAQ - সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পূর্ণ উত্তর)
22 টি
1. বায়ুচাপ কাকে বলে?
বায়ুচাপ (Air Pressure): পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল তার ওজনের কারণে ভূপৃষ্ঠের ওপর যে চাপ প্রয়োগ করে, তাকে বায়ুচাপ বলে। বায়ুচাপ সর্বমুখী — অর্থাৎ বায়ু কোনো বস্তুর উপর সবদিক থেকে চাপ দেয়। সমুদ্র সমতলে স্বাভাবিক বায়ুচাপ ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভের চাপের সমান বা ১০১৩.২৫ মিলিবার। বায়ুচাপ মাপা হয় ব্যারোমিটার যন্ত্রে।
2. ব্যারোমিটার কী? এটি কীভাবে কাজ করে?
ব্যারোমিটার (Barometer) হল বায়ুর চাপ মাপার যন্ত্র। ১৬৪৩ সালে বিজ্ঞানী টরিসেলি এটি আবিষ্কার করেন। পারদ ব্যারোমিটারে একটি পারদভর্তি পাত্রে একটি একমুখ বন্ধ পারদ ভর্তি কাঁচের নল উপুড় করে বসানো থাকে। স্বাভাবিক বায়ুচাপে কাঁচ নলের মধ্যে প্রায় ৭৬ সেমি পারদ থাকে। বায়ুচাপ কমলে পারদ নেমে যায়, চাপ বাড়লে পারদস্তম্ভের উচ্চতা বাড়ে।
3. উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে বায়ুচাপ কমে কেন?
উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে বায়ুর চাপ কমে যাওয়ার কারণ: (১) সমুদ্র সমতলে মাধ্যাকর্ষণ ও উপরের স্তরের চাপে বায়ুর অণুগুলো পরস্পরের কাছে থাকে — ঘনত্ব ও চাপ বেশি। (২) উপরের দিকে উঠলে বায়ুর অণুগুলো পরস্পর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়ে — ঘনত্ব কমে। (৩) প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতা বাড়লে ১ সেমি পারদস্তম্ভের সমান বায়ুচাপ কমে। মাউন্ট এভারেস্টে (৮৮৪৮ মি) বায়ুচাপ মাত্র ৩০০ মিলিবার।
4. বায়ু উত্তপ্ত হলে চাপ কমে কেন?
বায়ু উত্তপ্ত হলে বায়ুর অণুগুলো গতিশীল হয়ে পড়ে এবং পরস্পর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। ফলে বায়ু প্রসারিত হয় (আয়তন বাড়ে) এবং হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। নির্দিষ্ট আয়তনে বায়ুর অণুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় বায়ুর ঘনত্ব কমে যায়। ঘনত্ব কমলে বায়ুর চাপও কমে যায়। উষ্ণ নিরক্ষীয় অঞ্চলে এ কারণেই নিম্নচাপ দেখা যায়।
5. বায়ু শীতল হলে চাপ বাড়ে কেন?
বায়ু শীতল হলে বায়ুর অণুগুলো গতি হারিয়ে পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে বায়ু সংকুচিত হয় (আয়তন কমে), ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং বায়ু ভারী হয়ে নীচের দিকে নেমে আসে। নির্দিষ্ট আয়তনে বায়ুর অণুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বায়ুর চাপ বাড়ে। শীতল মেরু অঞ্চলে এই কারণেই উচ্চচাপ দেখা যায়।
6. উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ অঞ্চল কাকে বলে?
উচ্চচাপ অঞ্চল (High Pressure Area, 'H'): যে স্থানের বায়ুচাপ আশেপাশের অঞ্চলের চেয়ে বেশি — যেমন শীতল মেরু ও ক্রান্তীয় অঞ্চল। শীতল ও ভারী বাতাস নীচে নেমে আসায় উচ্চচাপ সৃষ্টি হয়। এখানে আবহাওয়া পরিষ্কার ও শান্ত। নিম্নচাপ অঞ্চল (Low Pressure Area, 'L'): যেখানে বায়ুচাপ আশেপাশের চেয়ে কম — যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চল। উত্তপ্ত ও হালকা বায়ু উপরে উঠে যাওয়ায় নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। এখানে মেঘ, বৃষ্টি ও অশান্ত আবহাওয়া।
7. সমচাপ রেখা (Isobar) কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্য কী?
সমচাপ রেখা (Isobar): আবহাওয়া মানচিত্রে নির্দিষ্ট সময়ে একই পরিমাণ বায়ুচাপযুক্ত অঞ্চলগুলোকে যে কল্পিত আঁকাবাঁকা রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয়, তাকে সমচাপ রেখা বলে। বৈশিষ্ট্য: (১) এগুলো মিলিবার (mb) এককে দেখানো হয়, (২) পরস্পরকে স্পর্শ বা অতিক্রম করতে পারে না, (৩) রেখাগুলো পরস্পরের খুব কাছাকাছি এলে বায়ুচাপের পার্থক্য বেশি বোঝায় → প্রবল বায়ুপ্রবাহের সম্ভাবনা।
8. বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ কী? ব্যাখ্যা করো।
বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ হল বায়ুচাপের পার্থক্য (Pressure Gradient)। নিয়ম: বায়ু সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয় — যেমন জল উঁচু থেকে নিচু জায়গায় গড়িয়ে যায়। চাপের পার্থক্য যত বেশি হয়, বাতাস তত জোরে বয়। বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমেই পৃথিবীতে উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ অঞ্চলের মধ্যে চাপের ভারসাম্য বজায় থাকে।
9. বায়ুতে জলীয়বাষ্পের ভূমিকা কী?
জলীয়বাষ্পে পূর্ণ বায়ু শুষ্ক বায়ুর থেকে হালকা হয় — কারণ জলীয়বাষ্পের ঘনত্ব কম। ফলে বায়ুতে জলীয়বাষ্প বেশি থাকলে বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় → বায়ুর চাপ কমে → নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে আবহাওয়া অশান্ত হয়ে ঝড়, বৃষ্টি, দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হতে পারে। আবার জলীয়বাষ্পের অভাব থাকলে বাতাস ভারী হয়ে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয় এবং আবহাওয়া পরিষ্কার থাকে।
10. নিরক্ষীয় অঞ্চলে নিম্নচাপ কেন সৃষ্টি হয়?
নিরক্ষীয় অঞ্চলে নিম্নচাপ সৃষ্টির কারণ: (১) সারা বছর সূর্যের তাপ লম্বভাবে পড়ায় এখানে বায়ু অত্যন্ত উত্তপ্ত ও প্রসারিত হয়, (২) হালকা বায়ু উপরে উঠে যায় — ভূপৃষ্ঠের কাছে বায়ুর ঘনত্ব কমে, (৩) পৃথিবীর আবর্তন বেগ নিরক্ষরেখায় সবচেয়ে বেশি হওয়ায় বাতাস দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে ছিটকে যায়। এই সম্মিলিত কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলে নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টি হয়।
11. ক্রান্তীয় অঞ্চলে (৩০° উ/দ) উচ্চচাপ কেন দেখা যায়?
ক্রান্তীয় অঞ্চলে (৩০° উত্তর ও দক্ষিণে) উচ্চচাপ দেখা যাওয়ার কারণ: (১) নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ বায়ু উপরে উঠে ক্রান্তীয় অঞ্চলে পৌঁছে শীতল ও ভারী হয়ে নীচে নেমে আসে (বায়ুর নিমজ্জন), (২) নীচে নেমে আসা বায়ুর ঘনত্ব বেড়ে যায়, (৩) পৃথিবীর আবর্তনের প্রভাবে নিরক্ষীয় বাতাস এখানে ছিটকে এসে জমা হয়। এ কারণে দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলে উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয়।
12. মেরু অঞ্চলে উচ্চচাপ কেন হয়?
মেরু অঞ্চলে উচ্চচাপের কারণ: (১) মেরু অঞ্চল সারা বছর অত্যন্ত শীতল — শীতল বায়ু সংকুচিত ও ভারী হয়, (২) ভারী বায়ু নীচের দিকে নেমে আসে (বায়ুর নিমজ্জন), (৩) ভূপৃষ্ঠের কাছে বায়ুর ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। ফলে মেরু অঞ্চলে উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয়। এখানে সাধারণত পরিষ্কার ও শান্ত আবহাওয়া থাকে।
13. ঝড়ের আগে আশপাশ থমথমে হয়ে থাকে কেন?
ঝড়ের আগে আশপাশ থমথমে থাকার কারণ: ঝড় সৃষ্টির আগে ঐ অঞ্চলে প্রবল নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে চারপাশের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বাতাস জোরে ছুটে আসার আগে কিছু সময় বাতাসের গতি স্তব্ধ হয়ে যায় — গাছের পাতাও নড়ে না। একেই 'ঝড়ের আগে শান্তি' বা 'Calm before the Storm' বলে। এটি প্রবল বায়ুপ্রবাহ আসার পূর্বাভাস।
14. উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে রান্না করতে সমস্যা কেন হয়?
উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে (যেমন গোমুখ, ৩৯০০ মিটার) বায়ুর চাপ সমুদ্র সমতলের তুলনায় অনেক কম। বায়ুচাপ কমলে জলের স্ফুটনাঙ্ক (ফুটন্ত তাপমাত্রা) ১০০°C-এর নিচে নেমে যায়। যেমন ৩৯০০ মি উচ্চতায় জল মাত্র ৮০°-৮৫°C তাপমাত্রাতেই ফুটতে শুরু করে। এই কম তাপমাত্রায় চাল-ডাল সঠিকভাবে সিদ্ধ হয় না। প্রেসার কুকারে উচ্চচাপ তৈরি করে এই সমস্যার সমাধান করা হয়।
15. পর্বতারোহীরা অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্গে নেন কেন?
উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে বায়ুর ঘনত্ব ও পরিমাণ কমে যায়। ফলে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মাউন্ট এভারেস্টের (৮৮৪৮ মি) শীর্ষে বায়ুচাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের এক-তৃতীয়াংশ — অক্সিজেন এত কম যে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং জীবনসংশয় হতে পারে। তাই পর্বতারোহীরা নিরাপদে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যান।
16. ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন কী?
ঘূর্ণিঝড় (Cyclone): যখন কোনো স্থানে প্রবল নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় এবং চারপাশের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বাতাস প্রচণ্ড বেগে ছুটে এসে ঘূর্ণির আকারে কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হয়, তখন তাকে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন বলে। নামকরণ: ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে 'সাইক্লোন', প্রশান্ত মহাসাগরে 'টাইফুন', আটলান্টিকে 'হ্যারিকেন', স্থলে 'টর্নেডো'। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে শান্ত 'চক্ষু' (Eye) থাকে এবং চারপাশে ১২০-২৫০ কিমি/ঘণ্টা বেগে বাতাস বয়।
17. বোতলের ভিতর ফুঁ দিয়ে কীভাবে বায়ুর চাপ বোঝা যায়?
পরীক্ষা: একটি প্লাস্টিকের বোতল কিছুটা জল ভরে মুখটা ভালো করে একটি সরু নল ঢুকিয়ে বন্ধ করো। নলের মধ্যে দিয়ে জোরে কয়েকবার ফুঁ দাও। বোতলের ভিতরের বাতাসে ফুঁ দেওয়ায় ভিতরের চাপ বেড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর নল থেকে মুখ সরালে ভিতরের চাপে জল নল বেয়ে জোরে বেরিয়ে আসে। এটি বায়ুর চাপের একটি সহজ প্রদর্শন।
18. ঠান্ডা জলের বোতল তুবড়ে যায় কেন?
যখন গরম জল প্লাস্টিকের বোতলে ভরা হয়, তখন ভিতরের বাতাস উত্তপ্ত ও প্রসারিত হয়ে কিছুটা বেরিয়ে যায়। বোতল ঠান্ডা হলে ভিতরের বাতাস সংকুচিত হয় এবং ভিতরে আংশিক শূন্যস্থান (Vacuum) তৈরি হয়। বাইরের বাতাসের প্রবল চাপে (প্রায় ১০১৩ mb) বোতলটি তখন তুবড়ে যায়। এটি বোঝায় যে বায়ুর উল্লেখযোগ্য চাপ রয়েছে।
19. বায়ুর উৎক্ষেপণ ও নিমজ্জন বলতে কী বোঝো?
বায়ুর উৎক্ষেপণ (Ascent of Air): উষ্ণ অঞ্চলে বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে যায় — একে উৎক্ষেপণ বলে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের কাছে বায়ুর ঘনত্ব কমে → নিম্নচাপ সৃষ্টি। বায়ুর নিমজ্জন (Descent of Air): শীতল অঞ্চলে বায়ু ঠান্ডা ও ভারী হয়ে ভূপৃষ্ঠের দিকে নেমে আসে — একে নিমজ্জন বলে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের কাছে ঘনত্ব বেড়ে → উচ্চচাপ সৃষ্টি। এই উৎক্ষেপণ ও নিমজ্জন প্রক্রিয়াই পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয় সৃষ্টির মূল কারণ।
20. আবহাওয়া মানচিত্রে সমচাপ রেখার ভূমিকা কী?
আবহাওয়া মানচিত্রে সমচাপ রেখা (Isobar) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে: (১) এটি বায়ুচাপের আঞ্চলিক বণ্টন দেখায়, (২) কোথায় উচ্চচাপ ('H') ও নিম্নচাপ ('L') আছে তা নির্দেশ করে, (৩) রেখাগুলোর ঘনত্ব থেকে বায়ুপ্রবাহের গতিবেগ অনুমান করা যায়, (৪) সম্ভাব্য ঝড়-বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করে, (৫) জাহাজ ও বিমান চলাচলের জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি হয় এর থেকে।
21. বায়ুপ্রবাহ কীভাবে পৃথিবীতে চাপের ভারসাম্য বজায় রাখে?
পৃথিবীতে সর্বত্র বায়ুচাপ সমান নয় — কোথাও উচ্চচাপ, কোথাও নিম্নচাপ। বায়ুপ্রবাহ উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে এই চাপের পার্থক্য বা ভারসাম্যহীনতা দূর করে। নিরক্ষীয় নিম্নচাপ থেকে বাতাস উপরে উঠে ক্রান্তীয় অঞ্চলে গিয়ে নেমে আসে, আবার ক্রান্তীয় উচ্চচাপ থেকে বাতাস নিরক্ষীয় ও মেরু নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়। এই চক্রাকার প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর বায়ুচাপের সমতা বজায় থাকে।
22. সমচাপ রেখা ও অক্ষরেখার মধ্যে পার্থক্য কী?
পার্থক্য: (১) সমচাপ রেখা হল সমান বায়ুচাপ যুক্ত স্থানের সংযোগকারী রেখা; অক্ষরেখা হল নিরক্ষরেখার সমান্তরাল পূর্ব-পশ্চিমের রেখা যা অক্ষাংশ নির্দেশ করে। (২) সমচাপ রেখা বাস্তব তথ্য (আবহাওয়া) ভিত্তিতে আঁকা হয় এবং পরিবর্তনশীল; অক্ষরেখা স্থায়ী ও জ্যামিতিক ভাবে নির্ধারিত। (৩) সমচাপ রেখা আঁকাবাঁকা ও বক্র হতে পারে, অক্ষরেখা পূর্ণবৃত্ত। (৪) সমচাপ রেখা আবহাওয়া মানচিত্রে ব্যবহৃত; অক্ষরেখা ভৌগোলিক মানচিত্রে। উভয়ই পরস্পরকে স্পর্শ বা ছেদ করতে পারে না।
Broad Questions - বড়ো প্রশ্নোত্তর (বিস্তারিত আলোচনা)
8 টি
1. বায়ুচাপ কাকে বলে? বায়ুচাপের তারতম্যের কারণগুলি বিস্তারিত আলোচনা করো। পারদ ব্যারোমিটার কীভাবে বায়ুচাপ মাপে তা ব্যাখ্যা করো।
বায়ুচাপ (Air Pressure)
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল তার ওজনের কারণে ভূপৃষ্ঠের ওপর যে চাপ প্রয়োগ করে, তাকে বায়ুচাপ বলে। বায়ুচাপ সর্বমুখী — অর্থাৎ বায়ু কোনো বস্তুর উপর সবদিক থেকে চাপ দেয়। সমুদ্র সমতলে স্বাভাবিক বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার বা ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভের চাপের সমান।
বায়ুচাপের তারতম্যের কারণ:
- উচ্চতা: সমুদ্র সমতল থেকে উপরে উঠলে বায়ুর ঘনত্ব কমে → চাপ কমে। প্রতি ১১০ মিটারে ১ সেমি পারদস্তম্ভ কমে।
- উষ্ণতা: উত্তপ্ত বায়ু প্রসারিত ও হালকা হয়ে উপরে উঠে → নিম্নচাপ। শীতল বায়ু সংকুচিত ও ভারী হয়ে নেমে → উচ্চচাপ।
- জলীয়বাষ্প: বেশি জলীয়বাষ্প → বায়ু হালকা → নিম্নচাপ। কম জলীয়বাষ্প → বায়ু ভারী → উচ্চচাপ।
- পৃথিবীর আবর্তন: নিরক্ষীয় অঞ্চলে আবর্তন বেগ বেশি → বাতাস ছিটকে যায় → নিম্নচাপ।
পারদ ব্যারোমিটার:
পারদ ব্যারোমিটারে একটি পারদভর্তি পাত্রে একমুখ বন্ধ পারদ ভর্তি কাঁচের নল উপুড় করে বসানো থাকে। স্বাভাবিক বায়ুচাপে কাঁচ নলে প্রায় ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভ থাকে। বায়ুচাপ কমলে পারদ নেমে যায়, বায়ুচাপ বাড়লে পারদস্তম্ভের উচ্চতা বাড়ে। পাত্রের পারদের উপর বায়ুর চাপ পড়ে এবং তা নলের পারদকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় ধরে রাখে।
2. উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। এদের মধ্যে পার্থক্যগুলি টেবিল আকারে লেখো। পৃথিবীর প্রধান বায়ুচাপ বলয়গুলি কী কী?
উচ্চচাপ ও নিম্নচাপের বৈশিষ্ট্য:
| বিষয় | উচ্চচাপ (High Pressure) | নিম্নচাপ (Low Pressure) |
| চিহ্ন | 'H' | 'L' |
| বায়ুর তাপমাত্রা | শীতল | উষ্ণ |
| বায়ুর গতি | বায়ু নীচে নেমে আসে (নিমজ্জন) | বায়ু উপরে উঠে যায় (উৎক্ষেপণ) |
| বায়ুর ঘনত্ব | বেশি (ভারী) | কম (হালকা) |
| জলীয়বাষ্প | খুব কম | বেশি |
| আবহাওয়া | পরিষ্কার ও শান্ত | মেঘলা, বৃষ্টি, অশান্ত |
| উদাহরণ | মেরু অঞ্চল, ক্রান্তীয় অঞ্চল | নিরক্ষীয় অঞ্চল |
পৃথিবীর প্রধান বায়ুচাপ বলয়:
- নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (০°-৫° উ/দ): সারা বছর উত্তপ্ত → বায়ু উপরে উঠে → নিম্নচাপ।
- ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (৩০° উ ও ৩০° দ): উপর থেকে শীতল বায়ু নেমে আসে → উচ্চচাপ।
- মেরু উচ্চচাপ বলয় (৯০° উ ও ৯০° দ): অত্যন্ত শীতল → বায়ু সংকুচিত ও নীচে নেমে → উচ্চচাপ।
- উপমেরু নিম্নচাপ বলয় (৬০° উ ও ৬০° দ): ক্রান্তীয় ও মেরু বায়ুর মিলনে সৃষ্টি।
3. বায়ুপ্রবাহ কী? বায়ুপ্রবাহের কারণ ও ফলাফল বিস্তারিত আলোচনা করো। সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় কীভাবে সৃষ্টি হয়?
বায়ুপ্রবাহ (Wind)
উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে বাতাসের অনুভূমিক চলাচলকে বায়ুপ্রবাহ বা বাতাস বলে। এটি বায়ুচাপের পার্থক্যের ফল।
বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ:
- বায়ুচাপের পার্থক্য (Pressure Gradient): উচ্চচাপ → নিম্নচাপে বায়ুপ্রবাহ। পার্থক্য যত বেশি, বাতাস তত জোরে বয়।
- তাপমাত্রার পার্থক্য: তাপের তারতম্যে বায়ুচাপের পার্থক্য সৃষ্টি হয়।
- পৃথিবীর আবর্তন (কোরিওলিস বল): বাতাসের দিক পরিবর্তন করে (উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে, দক্ষিণে বাঁ দিকে)।
ফলাফল:
- পৃথিবীতে বায়ুচাপের ভারসাম্য বজায় থাকে
- তাপ ও আর্দ্রতার বণ্টন হয়
- বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে
- জীবজগতের জন্য প্রয়োজনীয় বাতাসের চলাচল
ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন:
যখন সমুদ্রের উপর প্রবল নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় এবং চারপাশের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে বাতাস প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণির আকারে কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হয়, তখন তাকে সাইক্লোন বলে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে 'সাইক্লোন', প্রশান্ত মহাসাগরে 'টাইফুন', আটলান্টিকে 'হ্যারিকেন'। কেন্দ্রে থাকে শান্ত 'চক্ষু' (Eye)। বাতাসের গতিবেগ ১২০-২৫০ কিমি/ঘণ্টা হতে পারে।
4. সমচাপ রেখা (Isobar) কী? আবহাওয়া মানচিত্রে এর ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত আলোচনা করো। সমচাপ রেখা থেকে কীভাবে বায়ুপ্রবাহ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যায়?
সমচাপ রেখা (Isobar)
আবহাওয়া মানচিত্রে নির্দিষ্ট সময়ে একই পরিমাণ বায়ুচাপযুক্ত অঞ্চলগুলোকে যে কল্পিত আঁকাবাঁকা রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয়, তাকে সমচাপ রেখা বা Isobar বলে। Iso = সমান, Bar = চাপ।
বৈশিষ্ট্য:
- মিলিবার (mb) এককে প্রকাশিত — সাধারণত ৯৮০ থেকে ১০৫০ mb
- পরস্পরকে কখনো স্পর্শ বা অতিক্রম করতে পারে না
- উচ্চচাপ ('H') ও নিম্নচাপ ('L') কেন্দ্র চিহ্নিত করে
- রেখাগুলো পরস্পরের কাছাকাছি → চাপের পার্থক্য বেশি → জোরালো বাতাস
- রেখাগুলো দূরে দূরে → চাপের পার্থক্য কম → হালকা বাতাস
আবহাওয়ার পূর্বাভাস:
- সমচাপ রেখার ঘনত্ব দেখে বোঝা যায় কোথায় বাতাসের গতি প্রবল হতে পারে
- 'L' চিহ্নিত অঞ্চলে মেঘ, বৃষ্টি ও ঝড়ের সম্ভাবনা
- 'H' চিহ্নিত অঞ্চলে পরিষ্কার ও শান্ত আবহাওয়া
- সমচাপ রেখার বিন্যাস দেখে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও তীব্রতা অনুমান
- জাহাজ ও বিমান চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান
5. উচ্চতা, তাপমাত্রা ও জলীয়বাষ্প কীভাবে বায়ুচাপকে প্রভাবিত করে? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করো। বায়ুর উৎক্ষেপণ ও নিমজ্জন প্রক্রিয়া কী?
বায়ুচাপকে প্রভাবিত করার উপাদান:
১. উচ্চতা:
সমুদ্র সমতলে বায়ুচাপ সর্বোচ্চ (১০১৩.২৫ mb)। উপরে উঠলে বায়ুর অণু ছড়িয়ে পড়ে → ঘনত্ব কমে → চাপ কমে। উদাহরণ: মাউন্ট এভারেস্টে (৮৮৪৮ মি) বায়ুচাপ মাত্র ৩০০ mb। প্রতি ১১০ মি উচ্চতায় ১ সেমি পারদস্তম্ভ কমে।
২. তাপমাত্রা:
উষ্ণ বায়ু প্রসারিত ও হালকা → উপরে উঠে → নিম্নচাপ। শীতল বায়ু সংকুচিত ও ভারী → নীচে নেমে → উচ্চচাপ। উদাহরণ: নিরক্ষীয় অঞ্চলে নিম্নচাপ, মেরু অঞ্চলে উচ্চচাপ।
৩. জলীয়বাষ্প:
জলীয়বাষ্প হালকা — এটি বায়ুতে মিশলে বায়ু হালকা হয়ে নিম্নচাপ সৃষ্টি করে। আবার জলীয়বাষ্প কম থাকলে বায়ু ভারী → উচ্চচাপ। উদাহরণ: মরুভূমিতে শুষ্ক বায়ু → উচ্চচাপ, সমুদ্র উপকূলে আর্দ্র বায়ু → নিম্নচাপ।
বায়ুর উৎক্ষেপণ ও নিমজ্জন:
উৎক্ষেপণ (Ascent): উষ্ণ অঞ্চলে বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় → ভূপৃষ্ঠে নিম্নচাপ। নিমজ্জন (Descent): শীতল অঞ্চলে বায়ু ভারী হয়ে নীচে নেমে আসে → ভূপৃষ্ঠে উচ্চচাপ। এই দুই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ চক্র সৃষ্টি হয়।
6. পৃথিবীর বিভিন্ন বায়ুচাপ বলয়গুলির অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত বর্ণনা করো। নিরক্ষীয় নিম্নচাপ ও ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?
পৃথিবীর বায়ুচাপ বলয়:
পৃথিবীপৃষ্ঠে সাতটি প্রধান বায়ুচাপ বলয় রয়েছে। এগুলো অক্ষাংশ অনুযায়ী অবস্থিত এবং তাপমাত্রা ও পৃথিবীর আবর্তনের কারণে সৃষ্টি।
| বলয়ের নাম | অবস্থান | ধরন | কারণ |
| নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় | ০°-৫° উ/দ | নিম্নচাপ | সারাবছর তাপ → বায়ুর উৎক্ষেপণ |
| ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (উত্তর) | ৩০°-৩৫° উ | উচ্চচাপ | উপর থেকে বায়ুর নিমজ্জন |
| ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (দক্ষিণ) | ৩০°-৩৫° দ | উচ্চচাপ | উপর থেকে বায়ুর নিমজ্জন |
| উপমেরু নিম্নচাপ বলয় (উত্তর) | ৬০°-৬৫° উ | নিম্নচাপ | উষ্ণ ও শীতল বায়ুর মিলন |
| উপমেরু নিম্নচাপ বলয় (দক্ষিণ) | ৬০°-৬৫° দ | নিম্নচাপ | উষ্ণ ও শীতল বায়ুর মিলন |
| মেরু উচ্চচাপ বলয় (উত্তর) | ৮৫°-৯০° উ | উচ্চচাপ | অত্যন্ত শীতল → বায়ুর নিমজ্জন |
| মেরু উচ্চচাপ বলয় (দক্ষিণ) | ৮৫°-৯০° দ | উচ্চচাপ | অত্যন্ত শীতল → বায়ুর নিমজ্জন |
নিরক্ষীয় নিম্নচাপ সৃষ্টির কারণ:
- সারা বছর সূর্যের লম্বরশ্মি → প্রচণ্ড তাপ
- বায়ু উত্তপ্ত ও প্রসারিত → হালকা হয়ে উপরে উঠে (উৎক্ষেপণ)
- পৃথিবীর আবর্তন বেগ এখানে সর্বাধিক → বাতাস ছিটকে ক্রান্তীয় অঞ্চলে যায়
ক্রান্তীয় উচ্চচাপ সৃষ্টির কারণ:
- নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উপরে ওঠা বায়ু ক্রান্তীয় অঞ্চলে পৌঁছে শীতল ও ভারী হয়
- ভারী বায়ু নীচে নেমে আসে (নিমজ্জন)
- নীচে বায়ু জমা হয়ে ঘনত্ব ও চাপ বাড়ে
7. পাহাড়ি অঞ্চলে রান্না করতে সমস্যা হয় কেন? প্রেসার কুকার কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করে? মাউন্ট এভারেস্টে বায়ুচাপ ও জলের স্ফুটনাঙ্কের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করো।
পাহাড়ি অঞ্চলে রান্নার সমস্যা:
উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে বায়ুচাপ কমে যায়। সমুদ্র সমতলে ১০১৩ mb চাপে জলের স্ফুটনাঙ্ক (ফুটন্ত তাপমাত্রা) ১০০°C। কিন্তু উচ্চতা বাড়লে:
- প্রতি ১০০০ মিটার উচ্চতায় জলের স্ফুটনাঙ্ক প্রায় ৩°C করে কমে
- গোমুখে (৩৯০০ মি) জল ফোটে মাত্র ৮৫°-৮৮°C-তে
- মাউন্ট এভারেস্টে (৮৮৪৮ মি) জল ফোটে মাত্র ৭০°C-তে
এই কম তাপমাত্রায় চাল-ডাল সঠিকভাবে সিদ্ধ হয় না — খাবার আধা-সিদ্ধ থেকে যায়।
প্রেসার কুকারের ভূমিকা:
প্রেসার কুকার একটি বদ্ধ পাত্র যাতে কৃত্রিমভাবে উচ্চচাপ তৈরি করা হয়। চাপ বাড়লে জলের স্ফুটনাঙ্ক বেড়ে যায় (১০০°C-এর বেশি)। ফলে কম উচ্চতা বা উচ্চচাপের পরিবেশ তৈরি করে খাদ্যবস্তু সঠিকভাবে সিদ্ধ করা সম্ভব হয়। পর্বতারোহীরা তাই প্রেসার কুকার ব্যবহার করেন।
মাউন্ট এভারেস্টের তথ্য:
- উচ্চতা: ৮৮৪৮ মিটার
- বায়ুচাপ: মাত্র ৩০০ মিলিবার (সমুদ্রপৃষ্ঠের ≈ ৩০%)
- জলের স্ফুটনাঙ্ক: মাত্র ৭০°C
- অক্সিজেন: সমুদ্রপৃষ্ঠের এক-তৃতীয়াংশ
8. বায়ুর চাপ ও বায়ুপ্রবাহের সাথে ঘূর্ণিঝড়ের সম্পর্ক আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গে আমফান, ইয়াস ইত্যাদি ঘূর্ণিঝড় কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? ঘূর্ণিঝড়ের সময় কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?
ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রক্রিয়া:
ঘূর্ণিঝড় (Cyclone) সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন:
- সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৭°C-এর বেশি: উষ্ণ জল থেকে জলীয়বাষ্প উপরে উঠে
- প্রবল নিম্নচাপ: সমুদ্রের উপর গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়
- চাপের প্রচণ্ড পার্থক্য: চারপাশের উচ্চচাপ থেকে বাতাস প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসে
- পৃথিবীর আবর্তন (কোরিওলিস বল): বাতাসে ঘূর্ণি সৃষ্টি করে
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়:
বঙ্গোপসাগর একটি উষ্ণ ও অগভীর সাগর। এপ্রিল-মে ও অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেশি থাকে। এই সময় প্রবল নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম হয়। আমফান (২০২০), ইয়াস (২০২১) এভাবেই সৃষ্টি হয়েছিল — বাতাসের গতি ছিল ১৫০-১৮৫ কিমি/ঘণ্টা।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় সতর্কতা:
- আবহাওয়ার সতর্কবার্তা ও বুলেটিন নিয়মিত শোনা
- উপকূল থেকে নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয় নেওয়া
- বাড়ি মজবুত ও জানালা বন্ধ রাখা
- জরুরি খাদ্য, জল, ওষুধ, টর্চ মজুত রাখা
- প্রশাসনের নির্দেশ মেনে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া
মনে রেখো!
বায়ুচাপ: সমুদ্রপৃষ্ঠে ১০১৩.২৫ mb বা ৭৬ সেমি পারদ | প্রতি ১১০ মি উচ্চতায় ১ সেমি পারদ কমে |
উষ্ণ বায়ু → প্রসারিত → হালকা → নিম্নচাপ | শীতল বায়ু → সংকুচিত → ভারী → উচ্চচাপ |
বায়ুপ্রবাহ: উচ্চচাপ → নিম্নচাপ | ব্যবহৃত যন্ত্র: ব্যারোমিটার |
সমচাপ রেখা: সমান চাপের রেখা (Isobar) | সাইক্লোন: প্রবল নিম্নচাপে ঘূর্ণিঝড়